আমি। ইহার পর তোমার পিতার সহিত তোমার সাক্ষাৎ হইয়াছিল কি?
স্ত্রীলোক। হইয়াছিল।
আমি। তাহাকে তুমি জিজ্ঞাষ করিয়াছিলে যে, তোমার স্বামী তাহার নিকট গমন করিয়াছিল কি না?
স্ত্রীলোক। জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম।
আমি। তাহাতে সে কি বলিয়াছিল?
স্ত্রীলোক। জিজ্ঞাসা করায়, পিতা যেন আমার উপর বিরক্ত হন, এবং কহেন যে, তিনি তাহার নিকট গমন করেন নাই।
আমি। তোমার পিতার বিরক্ত হইবার কারণ?
স্ত্রীলোক। কারণ যে কি, তাহার কিছুই বুঝিতে পারি নাই।
আমি। তোমার পিতার সহিত কখন তোমার সাক্ষাৎ হইয়াছিল?
স্ত্রীলোক। শেষ রাত্রিতে।
আমি। শেষ রাত্রিতে তোমার পিতার সহিত কোথায় তোমার সাক্ষাৎ হয়?
স্ত্রীলোক। তাঁহারই বাড়ীতে।
আমি। শেষ রাত্রিতে তাহার বাড়ীতে তুমি কি করিতে গিয়াছিলে?, স্ত্রীলোক। শেষ রাত্রিতে আমি তাঁহার বাড়ীতে যাই নাই।
আমি। তবে কখন গিয়াছিলে?
স্ত্রীলোক। পরশ্ব রাত্রিতে যখন দেখিলাম, আমার স্বামী বাড়ীতে প্রত্যাবর্তন করিলেন না, তখন কি করিতে হইবে, তাহার কিছুই স্থির করিতে না পারিয়া, পরদিবস প্রাতঃকালে আমি আমার পিতার বাড়ীতে গমন করিলাম। কিন্তু সে সময়ে পিতার সহিত আমার সাক্ষাৎ হয় না। মাতার নিকট জানিতে পারিলাম যে, রাত্রিতে পিতাও বাড়ীতে আসেন নাই। মাতার নিকট এই ব্যাপার জানিতে পারিয়া মনে করিলাম, তিনি পিতার নিকট গমন করিয়াছিলেন, কোন কার্যের নিমিত্ত পিতা তাঁহাকে তাহার নিকট রাখিয়াছেন, সে জন্য তিনিও বাড়ীতে আসেন নাই, পিতাও বাড়ীতে আসেন নাই। মাতা আর আমাকে সে দিবস আসিতে দিলেন না, আমি সেই স্থানেই থাকিলাম; কিন্তু সমস্ত দিবসের মধ্যে পিতা বাড়ীতে আসিলেন না। ক্রমে রাত্রিও অতিবাহিত হইয়া যাইবার যোগাড় হয়, তথাপি তিনি আগমন করিলেন না। ক্রমে রাত্রি প্রভাত হইবার অতি অল্পমাত্র বাকী আছে, এরূপ সময় পিতা একাকী আসিয়া বাড়ীতে উপস্থিত হন, এবং অতি অল্পক্ষণ মাত্র বাড়ীতে থাকিয়াই তিনি আপন কাৰ্য্যে গমন করেন। সেই সময় পিতাকে আমার স্বামীর কথা জিজ্ঞাসা করিলাম। তিনি আমার কথায় একটু বিরক্তিভাব প্রকাশ করিয়া কহিলেন, না, তোমার স্বামী আমার নিকট গমন করে নাই, বা আজ কয়েক দিবস আমি তাহাকে দেখিও নাই। এই বলিয়া তিনি বাড়ী হইতে বহির্গত। হইয়া যান। যাইবার সময় আমি তাহাকে পুনরায় কহিলাম, তিনি কোথায় গেলেন, কিরূপে আমি তাহার অনুসন্ধান করিব? ইহার উত্তরে পিতা কহেন, সে বালক নহে, তাহার নিমিত্ত আবার কি অনুসন্ধান করিতে হইবে? কোন স্থানে গমন করিয়া থাকিবে; কাৰ্য শেষ হইয়া গেলে, পুনরায় সে আপনা হইতেই আগমন করিবে। তোমার সহিত ঝগড়া করিয়া সে বাড়ী হইতে বাহির হইয়া যায় নাই ত? এই বলিতে বলিতে পিতা বাড়ী হইতে বহির্গত হইয়া গেলেন, আমার আর কোন কথা শুনিলেন না।
সেই স্ত্রীলোকটীর সহিত এই সকল কথাবার্তা হইতে হইতে, যে স্থানে সেই মৃতদেহ ছিল, তাহার সন্নিকটে আমা দিগের পাড়ি আসিয়া উপস্থিত হইল।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ।
আমি গাড়ি হইতে অবতরণ করিলে সঙ্গে সঙ্গে বালক বালিকা কয়েকটীর সঙ্গে স্ত্রীলোকটীও গাড়ি হইতে নামিল, এবং আমার পশ্চাৎ পশ্চাৎ সেই ভিড়ের ভিতর প্রবেশ করিল। _ যে স্থানে মৃতদেহটী রক্ষিত ছিল, সেই স্থানে গমন করিয়া সেই মৃতদেহটা আমি তাহাকে দেখাইয়া দিলাম ও কহিলাম, দেখ দেখি, তুমি উহাকে চিনিতে পার কি না?
স্ত্রীলোকটা মৃতদেহের নিকট গমন করিয়া একটু স্থির হইয়া দাঁড়াইল, এবং অনিমিষ-লোচনে অতি অল্পক্ষণ মাত্র নিরীক্ষণ করিয়া বিনা-বাক্যব্যয়ে সেই স্থানে বসিয়া পড়িল।
সেই সময় সেই স্ত্রীলোকটীর অবস্থা দেখিয়া বোধ হইল, আমার সহিত যে স্ত্রীলোকটী আসিয়াছে, এ সে স্ত্রীলোক নহে; এ যেন অপর আর কোন স্ত্রীলোক। এত অল্প সময়ের মধ্যে মনুষ্যের বর্ণ, মুখশ্রী প্রভৃতির যে এত পরিশ বৰ্ত্তন হইতে পারে, ইহা আমি এই প্রথম দেখিলাম; ইহার পূর্বে এরূপ দৃশ্য আমি আর কখনও দেখি নাই। এই ব্যাপার দেখিয়া সেই স্থানে যে কোন ব্যক্তি উপস্থিত ছিল, সকলেই বুঝিতে পারিল যে, ইহার অন্তরে বিষম আঘাত লাগিয়াছে।
সেই সময় আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, এই মৃত দেহ কাহার, তাহা কি তুমি চিনিতে পারিয়াছ?
আমার কথায় স্ত্রীলোকটী কোনরূপ উত্তর প্রদান করিল না।
আমি পুনরায় তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, ইহা কি তোমার স্বামীর মৃতদেহ?
এ কথারও কোন উত্তর পাইলাম না।
সেই স্ত্রীলোকটীর সহিত যে কয়েকটা বালক-বালিকা। আসিয়াছিল, তাহাদিগের মাতার এই অবস্থা দেখিয়া, তাঁহারাও যেন হতবুদ্ধি হইয়া সেই স্থানে দাঁড়াইয়া রহিল। কেবল একটী নিতান্ত ছোট বালিকা তাহার মাতার মুখ ধরিয়া কহিল, মা,বাবা?
বালিকার এই কথা সকলেরই হৃদয়ে শেলসম প্রবেশ করিল। তখন সকলেই বুঝিতে পারিলেন, সেই মৃতদেহ তাহার পিতার।
সেই বালক-বালিকাগণের মধ্যে য়েটী সকলের বড়, তাহাকে আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, এই কি তোমার পিতা?
উত্তরে সে কহিল, ইনিই আমার পিতা।
আমি। ইহারই নাম কি রব্বানি?
বালক। হাঁ।
আমি। মেহের আলি তোমার কে হয়?
বালক। নানা।
আমি। তুমি জান, তিনি কোথায় কার্য করেন?
বালক। জানি।
আমি। সে সাহেবের নাম কি?
বালক। তাহা জানি না।
আমি। কোন্ স্থানে, কোন্ রাস্তায়?
