আমি নিজে যে প্রস্তাব করিব মনে করিয়াছিলাম, সেই স্ত্রীলোকটী আপনা হইতেই সেই প্রস্তাব করিল। সুতরাং বিনা-বাক্যব্যয়ে আমি তাহাতে সম্মত হইলাম, এবং আমার সমভিব্যাহারে যে গাড়ি ছিল, সেই গাড়িতে উঠিতে কহি লাম। রোদন করিতে করিতে সেই স্ত্রীলোকটী তিন চারিটী ছোট ছোট বালক-বালিকার সহিত সেই গাড়িতে গিয়া উপবেশন করিল। আমি তাহাদিগকে সঙ্গে লইয়া সেই মৃতদেহ যে স্থানে রক্ষিত ছিল, সেই স্থান অভিমুখে প্রস্থান করিলাম। গাড়িতে আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, তুমি কি মেহের আলির কন্যা?
স্ত্রীলোক। হাঁ মহাশয়!
আমি। তোমরা কয় সহোদরা?
স্ত্রীলোক। আমি ভিন্ন আমার পিতার পুত্র কন্যা আর কেহই নাই।
আমি। রব্বানি কি তোমার স্বামী?
স্ত্রীলোক। হাঁ।
আমি। রানি কি তোমার পিতার বাড়ীতেই থাকে?
স্ত্রীলোক। না।
আমি। সে কোথায় থাকে?
স্ত্রীলোক। যে স্থানে পিতার বাড়ী, তাহার সম্নিকটে অপরের বাড়ীতে আমরা বাসা করিয়া থাকি।
আমি। এ পুত্র কন্যা কয়েকটা কাহার?
স্ত্রীলোক। এ কটী সকলই আমার।
আমি। তোমাদের থাকিবার স্থান আছে শুনিতেছি, তবে তুমি তোমার পিতার বাড়ীতে রহিয়াছ কেন?
স্ত্রীলোক। আমি আমার পিতার বাড়ীতে থাকি না, কেবল আমার স্বামীর অনুসন্ধান করিবার নিমিত্তই পিতার বাড়ীতে আসিয়াছিলাম।
আমি। তোমার স্বামীর অনুসন্ধান করিতেছ কেন?
স্ত্রীলোক। তিনি বাড়ী ছাড়া হইয়া কখনও কোন স্থানে থাকেন না; কিন্তু দুই রাত্রি বাড়ীতে না আসায়, আমি কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না যে, তিনি কোথায় গেলেন। তাহার যদি কোনরূপে সন্ধান হয়, তাই জানিবার নিমিত্ত পিতার নিকট আগমন করিয়াছিলাম।
আমি। তিনি কবে বাড়ী হইতে বাহির হইয়া গিয়াছেন?
স্ত্রীলোক। পরশ্ব সন্ধ্যার কিছু পূর্বে তিনি বাড়ী হইতে বহির্গত হইয়া গিয়াছেন।
আমি। কি জন্য, ও কোথায় যাইতেছেন, তাহার কিছু বলিয়া গিয়াছিলেন কি?
স্ত্রীলোক। হাঁ, একরূপ বলিয়াছিলেন। আমাদিগের অবস্থা ভাল নহে; সামান্য যাহা তিনি উপার্জন করেন, তাহার দ্বারা কায়ক্লেশে কোনরূপে এই কয়েকটা বালক-বালিকাকে লইয়া জীবন ধারণ করিয়া থাকি। গত পরশ্ব তারিখে কোন স্থানে কাৰ্য হয় নাই। সুতরাং সে দিবস কিছু উপার্জনও হয় নাই। গৃহে অতি সামান্যই চাউল ছিল, তাহাই বন্ধন করিয়া বালক-বালিকা কয়টাকে দিয়া, অবশিষ্ট যাহা ছিল, তাহাই আমরা উভয়ে আহার করিলাম। বলা বাহুল্য, তাহাতে আমাদিগের অর্ধাশনও হইল না। পরে রাত্রিকালের নিমিত্ত গৃহে আর কিছুই ছিল না। পূর্বে কয়েক বৎসর তিনি কায করিয়াছিলেন, তাহার জন্য কয়েক স্থানে তাহার কিছু পাওনা ছিল, যদি তাহার মধ্যে কাহারও নিকট হইতে কিছু আদায় করিয়া আনিতে পারেন, তাহা হইলে রাত্রির একরূপ সংস্থান হয়, এই আশায় তিনি বাড়ী হইতে বহির্গত হইয়া যান।
আমি। তিনি কি কাৰ্য্য করিতেন?
স্ত্রীলোক। ঘরামীর কাৰ্য্য করিয়া থাকেন। উহার উপর নির্ভর করিয়া আমরা এতগুলি প্রাণী জীবন ধারণ করিয়া থাকি।
আমি। কাহার নিকট তাহার পয়সা পাওনা আছে, ও কাহার নিকটেই বা পয়সার নিমিত্ত গমন করিবে, তাহার কিছু বলিয়াছিল কি?
স্ত্রীলোক। এমন কিছু বলেন নাই, কেবলমাত্র এই বলিয়াছিলেন যে, তিনি প্রথমে আমার পিতার নিকট গমন করিবেন, সেই স্থান হইতে যদি কিছু পান, তাহা লইয়া অপর স্থানে গমন করিবেন, এবং সন্ধ্যার পরই বাড়ীতে প্রত্যাবর্তন করিবেন।
আমি। তোমার পিতার নিকট গমন করিবে কেন?
স্ত্রীলোক। তাহার নিকট কিছু পাওনা আছে, তাহারই নিমিত্ত।
আমি। তোমার পিতার নিকট কিসের পাওনা?
স্ত্রীলোক। আমার পিতা যে স্থানে চাকরী করেন, সেই সাহেবের বাড়ীতে একখানি ছোেট চালাঘর বাঁধা হয়। পিতা সেই সাহেবের খানসামা; তিনি সাহেবের নিকট হইতে সেই ঘর বাঁধিবার কন্ট্রাক্ট গ্রহণ করেন, এবং পরিশেষে নিজে কিছু লাভ রাখিয়া পুনরায় আমার স্বামীকে উহার কন্ট্রাক্ট দেন। আমার স্বামী দিনরাত্রি পরিশ্রম করিয়া কয়েক দিবসের মধ্যে সেই ঘর প্রস্তুত করিয়া দেন। আমার স্বামীকে যে টাকা দিবার কথা ছিল, তাহার সকল টাকা আমার পিতা এখনও তাহাকে প্রদান করেন নাই, কয়েকটা টাকা বাকী আছে। কিন্তু পিতা সমস্ত টাকা সাহেবের নিকট হইতে শোধ করিয়া লইয়াছেন।
আমি। তোমার পিতার নিকট তোমার স্বামীর কত টাকা বাকী আছে?
স্ত্রীলোক। ঠিক জানি না; শুনিয়াছি, অতি সামান্য। বোধ হয়, দুই তিন টাকার অধিক নহে। পাঁচ সাত টাকা বাকী ছিল; দুই আনা, চারি আনা করিয়া প্রায়ই দিয়াছেন, এখন দুই তিন টাকা বাকী আছে মাত্র।
আমি। তোমার পিতার নিকট তিনি প্রথমে গমন করিবে, বলিয়া গিয়াছিল; কিন্তু কোন্ স্থানে গিয়া তোমার পিতার সহিত সাক্ষাৎ করিবে, তাহার কিছু বলিয়া গিয়াছিলেন কি? তোমার পিতার বাড়ীতে যাইবে, কি যে স্থানে তিনি চাকরী করে, সেই স্থানে যাইবে?
স্ত্রীলোক। দিবাভাগে পিতাকে প্রায়ই বাড়ীতে দেখিতে পাওয়া যায় না। পিতা যে সাহেব বাড়ীতে চাকরী করেন, সেই স্থানে গিয়া তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিবেন, এই কথা বলিয়া তিনি বাড়ী হইতে গমন করিয়াছিলেন।
আমি। তোমার পিতা কোন্ সাহেব বাড়ীতে কর্ম করে, তাহা তুমি অবগত আছ কি?
স্ত্রীলোক। না, তাহা আমি জানি না।
