আমি। তাহার জামাইকে তুমি চিন কি?
২য় ব্যক্তি। তাহার একটী জামাই ছিল জানি।
আমি। সে জামাই এখন কোথায়?
২য় ব্যক্তি। তাহা আমি বলিতে পারি না।
আমি। তাহার নাম কি?
২য় ব্যক্তি। তাহার নামটা যে কি, তাহা আমার স্মরণ নাই।
আমি। তুমি যে মৃতদেহ দেখিয়া আসিলে, উহা মেহের আলির জামাতার মৃতদেহ বলিয়া বোধ হয় না কি?
২য় ব্যক্তি। সেইরূপই বোধ হয়; কিন্তু আমি ঠিক চিনিয়া উঠিতে পারিতেছি না।
আমি। (প্রথম ব্যক্তির প্রতি) কেমন, তোমার কি বোধ হয়? যে মৃতদেহ দেখিয়া আসিলে, তাহা মেহের আলির জামাতার মৃতদেহ বলিয়া বোধ হয় কি?
১ম ব্যক্তি। আমি মেহের আলিকেই চিনি না, তাহার জামাতাকে চিনিব কি প্রকারে?
আমি। তোমার মত মিথ্যাবাদী মুসলমান জাতির ভিতর আর আছে কি না, জানি না। এখনই তুমি তোমার এই সঙ্গীকে বলিতেছিলে যে, ওই মৃতদেহ মেহের আলির জামাতার। আর আমি তোমাকে যেমন জিজ্ঞাসা করিলাম, অমনি সকল কথা অস্বীকার করিলে! তোমার মত নির্বোধ লোক আমি আর দেখি নাই। এই মৃতদেহ যে কাহার, এই সংবাদ যে বলিয়া দিতে পারিবে, সে পঞ্চাশ টাকা পারিতোষিক পাইবে, এই কথা তুমি শুন নাই কি?
১ম ব্যক্তি। শুনিয়াছি; কিন্তু আমি যখন চিনিতে পারি নাই, তখন কাহার নাম করিব?
আমি। তোমার মিথ্যা কথা আর আমি শুনিতে চাহি না। তুমি যেরূপ প্রকৃতির লোক, তোমার সহিত সেইরূপ ভাবে ব্যবহার না করিলে, তোমার নিকট হইতে কোন কথা পাইবার প্রত্যাশা নাই। যাহাতে তুমি প্রকৃত কথা সহজে বলিতে সক্ষম হও, আমি এখনই তাহার উপায় করিতেছি। তুমি একটু অপেক্ষা কর, তোমার সমভিব্যাহারী ব্যক্তিকে আর দুই চারিটী কথা আমি অগ্রে জিজ্ঞাসা করিয়া লই; তাহার পর আমার বিবেচনা মত ব্যবহার আমি তোমার প্রতি করিতেছি।
এই বলিয়া আমি সেই দ্বিতীয় ব্যক্তিকে পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলাম, মেহের আলির জামাতা কোথায় থাকে, তাহা তুমি বলিতে পার কি?
২য় ব্যক্তি। না মহাশয়! আমি তাহার বাড়ী জানি না।
আমি। মেহের আলির বাড়ী জান?
২য় ব্যক্তি। তাহা জানি।
আমি। তুমি আমাকে সেই বাড়ী দেখাইয়া দিতে পার?
২য়। সবিশেষ আবশ্যক হয়, ত কাজেই দেখাইয়া দিতে হইবে; কিন্তু এখন একটু প্রয়োজন বশতঃ আমাকে স্থানান্তরে গমন করিতে হইতেছে। পরে যখন বলিবেন, সেই সময় আমি আসিয়া আপনাকে সঙ্গে করিয়া লইয়া গিয়া মেহের আলির বাড়ী দেখাইয়া দিব।
আমি। তুমি এখন অপর কার্যে গমন করিতেছ, কিন্তু ইহাও সবিশেষ কাৰ্য্য। কারণ, তোমার সংবাদ যদি ঠিক হয়, অর্থাৎ এই মৃতদেহ যদি মেহের আলির জামাতার হয়, তাহা হইলে সরকার হইতে তুমি একবারে পঞ্চাশ টাকা পাইবে, তদ্ব্যতীত সরকারী কাৰ্য্যে আমাদিগের সাহায্য করাও হইবে। তুমি এখনই আমার সঙ্গে আইস, এবং মেহের আলির ঘর আমাকে দেখাইয়া দেও। তাহা হইলে সেই স্থান হইতে আমি অনায়াসেই সন্ধান লইতে পারি যে, তাহার জামাতা কোথায় থাকে।
আমার কথায় দুই একবার আপত্তি উত্থাপন করিয়া, পরি শেষে সেই ব্যক্তি আমার প্রস্তাবে সম্মত হইল। আমি তাহাকে সঙ্গে লইয়া তৎক্ষণাৎ সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলাম। অপর ব্যক্তি জনৈক প্রহরীর সহিত সেই স্থানে বসিয়া রহিল।
সেই ব্যক্তি আমাকে সঙ্গে করিয়া তালতলায় মেহের আলির বাড়ীতে লইয়া গেল। অনুসন্ধানে জানিতে পারিলাম, মেহের আলি বাড়ীতে নাই। অতি প্রত্যুষে সে আপন কাৰ্য্যে গমন করিয়াছে। মেহের আলির একমাত্র কন্যা, সে সেই সময় মেহের আলির বাড়ীতেই ছিল।
আমরা মেহের আলির বাড়ীর সম্মুখে গমন করিলেই, পাড়ার অনেক লোক আসিয়া সেই স্থানে ভিড় করিয়া ফেলিল। উহাদিগের একজনকে মেহের আলির আত্মীয় বলিয়া অনুমান হইল। তাহাকে মেহের আলির জামাতার নাম জিজ্ঞাসা করায়, সে নিজে তাহা বলিতে পারিল না; কন্তু মেহের আলির বাড়ীর ভিতর গমন করিয়া তাহার নাম জানিয়া আসিয়া আমাকে কহিল, মেহের আলির জামাতার নাম রব্বানি।
যে বাড়ীতে মেহের আলি বাস করে, তাহা মেহের আলির নিজের বাড়ী। উহা একখানি সামান্য খোলার ঘর। রাস্তার উপর সদর দরজা, উহা খোলা রহিয়াছে; কিন্তু সেই দরজার উপর একখানি চটের পরদা ঝুলিতেছে। সেই পরদাটী নিতান্ত পুরাতন, এবং স্থানে স্থানে ছিড়িয়া গিয়াছে।
যে ব্যক্তি বাড়ীর ভিতর গমন করিয়া মেহের আলির জামাতার নাম জানিয়া আসিল, সে ভিতর হইতে আমাদিগের নিকট আসিবার পরেই কয়েকটী স্ত্রীলোক সেই পরদার পার্শ্বে আসিয়া দাঁড়াইল। আমাদিগের প্রেরিত ব্যক্তি রানির নাম আমাকে বলিবার পরই পরদার অন্তরাল হইতে একটা স্ত্রীলোক কহিল, কেন গা কি হইয়াছে?
আমি। রব্বানি কোথায়, তাহাই জানিবার নিমিত্ত এখানে আসিয়াছি।
পরদার অন্তরালবর্তী স্ত্রীলোক। কেন মহাশয়! কেন তাহার অনুসন্ধান করিতেছেন? অন্য তিন দিবস হইতে তিনি যে কোথায় গিয়াছেন, তাহার কিছুই আমরা স্থির করিয়া উঠিতে পারিতেছি না।
আমি। একটা মৃতদেহ পাওয়া গিয়াছে, কেহ কেহ বলিতেছে, উহা মেহের আলির জামাতার দেহ। তাই আমরা জানিতে আসিয়াছি যে, তাহার জামাতা এখন কোথায়।
আমার এই কথা শুনিৰামাত্র সেই পরদার অন্তরালবর্তী স্ত্রীলোকদিগের মধ্য হইতে একটী স্ত্রীলোক হঠাৎ পরদ। ঠেলিয়া বহির্গত হইয়া পড়িল, এবং সেই রাস্তার উপর আমাদিগের সম্মুখে উপস্থিত হইয়া কহিল, আমি বুঝিতে পারিতেছি, আমারই সর্বনাশ হইয়াছে! চলুন, মহাশয়? আমাকে সঙ্গে করিয়া লইয়া চলুন, আমি এখনই গিয়া সেই মতদেহ দেখিয়া আসি।
