যাহা হউক, অনন্তর একখানি দ্রুতগামী গাড়ি লইয়া আমি, সুবেদার ও তাহার আত্মীয়কে সমভিব্যাহারে লইয়া বালিগঞ্জে গমন করিলাম।
কথিত আড়গড়ার সম্মুখে উপস্থিত হইলে, আমাদিগকে সেই স্থানে রাখিয়া সেই আত্মীয় আমানতের সংবাদ আনিবার নিমিত্ত আড়গড়ার ভিতর গমন করিল, এবং কিয়ৎক্ষণ পরে প্রত্যাবর্তন করিয়া কহিল, আমানত ও হকদার কেহই এ পর্যন্ত দেশে যায় নাই, আজ সন্ধ্যার সময় যাইবে।
আমি। হকদার দেশে যায় নাই; কিন্তু সে এখন কোথায়, তাহ আমানত কিছু বলিতে পারিল?
আত্মীয়। আমানত আর আমাকে কি বলিবে?. হকদার যে স্থানে আছে, তাহা আমি স্বচক্ষে দেখিয়া আসিয়াছি।
আমি। সে এখন কোথায়?
আত্মীয়। সে এখন আমানতের বাসায় বসিয়া রহিয়াছে।
আমি। তুমি নিজ চক্ষে দেখিয়া আলিয়াছ?
আত্মীয়। হ মহাশয়! আমি স্বচক্ষে দেখিয়া আসিতেছি। বিশ্বাস না করেন, বলুন, আমি তাহাকে ডাকিয়া আপনার সম্মুখে আনিয়া উপস্থিত করিতেছি।
আমি। সে-ই ভাল, তাহাকে একবার ডাকিয়া আমার সম্মুখে আনয়ন কর।
আমার কথা শুনিয়া সেই আত্মীয় পুনরায় সেই আড়গড়ার ভিতর প্রবেশ করিল, এবং অতি অল্প সময়ের মধ্যেই হকদারকে আনিয়া আমার সম্মুখে উপস্থিত করিল। তাহাকে দেখিয়া সুবেদার কহিল, হা মহাশয়! এ-ই আমার ভাই। এখন দেখিতেছি, সেই মৃতদেহ দেখিয়া আমি ঠিক চিনিতে পারি নাই।
হকদারকে সঙ্গে লইয়া আমি প্রত্যাবর্তন করিলাম। হক দাকে জীবিত দেখিয়া সকলেই বিস্মিত হইলেন।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
অনুসন্ধানের এক অধ্যায় শেষ হইল। আমি বালিগঞ্জ হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া সেই মৃতদেহ আর থানায় দেখিতে পাইলাম না। যে স্থানে শব পরীক্ষা হয়, সেই স্থানে সেই শব তখন প্রেরিত হইয়াছিল।
সেই স্থানে গমন করিয়া দেখিলাম, সেই স্থানেও সেই মৃতদেহ দেখিবার নিমিত্ত অনেক লোকের সমাগম হইয়াছে।
যে বাক্সের ভিতর মৃতদেহ পাওয়া যায়, সেই বাকের ভিতর ঔষধের একটা ছোট শিশি পাওয়া গিয়াছিল, তাহা পাঠকগণ পূর্ব হইতে অবগত আছেন। সেই শিশির উপরকার লেভেলে ব্যাথগেট কোম্পানির নাম লেখা ছিল। একজন কৰ্মচারী সেই শিশিটা লইয়া ব্যাথগেট কোম্পানির বাড়ীতে গমন করিয়াছিলেন।
লাস পরীক্ষার স্থানে আমরা গিয়া উপস্থিত হইবার পর, সেই কর্মচারী ব্যাথগেট কোম্পানির ঔষধালয় হইতে প্রত্যা বৰ্তন করিলেন ও কহিলেন, এই শিশিতে যাহা লেখা আছে, ব্যাথগেট কোম্পানি তাহাদিগের খাতা-পত্ৰ দেখিয়া, তাহা অপেক্ষা আর অধিক কোন সংবাদ প্রদান করিতে পারি লেন না।
অনেকে মনে করিয়াছিলেন, সেই ঔষধের শিশি হইতে এই অনুসন্ধানের কোন না কোন সুত্র বাহির হইয়া পড়িবে; কিন্তু সেই কর্মচারীর কথা শুনিয়া সকলেই একবারে নীরব হইয়া পড়িলেন। পুনরায় কোন্ উপায় অবলম্বন করিয়া, সকলে এই মোকদ্দমার অনুসন্ধানে নিযুক্ত হইবেন, তাহাই ভাবিতে লাগিলেন।
যে একটী সূত্র পাইয়া আমি এই মোকদ্দমার উদ্ধার করিতে পারিব বলিয়া আশা করিয়াছিলাম, এখন আমার সে আশাও দূর হইয়াছে। পুনরায় আবার কোন্ উপায় অবলম্বন করিব, মনে মনে এইরূপ ভাবিতে ভাবিতে যে স্থানে সেই মৃতদেহ রক্ষিত ছিল, সেই স্থান হইতে বহির্গত হইয়া সদর রাস্তার উপর আসিয়া দাড়াইলাম। আমার সম্মুখ দিয়া কত লোক যে সেই মৃতদেহ দেখিবার নিমিত্ত সেই স্থানে প্রবেশ করিতে লাগিল, এবং কত লোক মৃতদেহ দেখিয়া সেই স্থান হইতে বহির্গত হইয়া যে চলিয়া যাইতে লাগিল, তাহার সংখ্যা করা নিতান্ত সহজ নহে।
আমি সেই রাস্তার উপর দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া ক্রমে ক্লান্ত হইয়া পড়িলাম। সেই রাস্তার ধারে একটা চাউলের দোকান ছিল, ক্ৰমে গিয়া আমি সেই স্থানে উপবেশন করিলাম। আমার সম্মুখ দিয়া তখন পর্যন্ত অনেক লোক সেই স্থানে গমন ও তথা হইতে প্রস্থান করিতে লাগিল। আমি বসিয়া বসিয়া কেবল তাহাদিগকে দেখিতে লাগিলাম, এবং তাহাদের মধ্যে কোন্ ব্যক্তি কি বলে, তাহা সবিশেষ মনোযোগের সহিত শ্রবণ করিতে লাগিলাম।
এইরূপে কিয়ৎক্ষণ বসিয়া থাকিবার পর, একটা কথা হঠাৎ আমার কর্ণে প্রবেশ করিল। একজন মুসলমান অপর একজন মুসলমানকে বলিতেছে, এই মৃতদেহ কাহার, তাহা চিনিতে পারিলে কি?
উত্তরে অপর ব্যক্তি কহিল, না, আমি কিছুই স্থির করিয়া উঠিতে পারিতেছি না; কিন্তু এই ব্যক্তি যে আমার পরিচিত, বা ইহাকে যেন কোথায় দেখিয়াছি, ইহা আমার বেশ মনে হইতেছে।
প্রথম ব্যক্তি। এই ব্যক্তি মেহের আলির জামাই নয় কি?
দ্বিতীয় ব্যক্তি। ঠিক কথা বলিয়াছ। এখন আমার বেশ মনে হইতেছে, এ মেহের আলির জামাই বটে।
এই কথা শুনিয়া আমি উভয়কেই ডাকিলাম। তাঁহারা আমার নিকটে আসিলে, আমি তাহাদিগকে লক্ষ্য করিয়া কহিলাম, ওই মৃতদেহ দেখিয়া তোমরা কিছু চিনিতে পারিলে কি, যে ওই মৃতদেহ কাহার?
১ম ব্যক্তি। না মহাশয়! আমরা কিছুই স্থির করিয়া উঠিতে পারিলাম না।
অমি। মেহের আলিকে তুমি চেন নাকি?
১ম ব্যক্তি। কোন্ মেহের আলি?
আমি। কোন মেহের আলি।
১ম ব্যক্তি। না মহাশয়! আমি কোন মেহের আলিকে চিনি না।
আমি। (দ্বিতীয় ব্যক্তির প্রতি লক্ষ্য করিয়া) কেমন, তুমিও বোধ হয়, মেহের আলিকে চিন না?
২য় ব্যক্তি। আমি এক মেহের আলিকে চিনি।
আমি। সে মেহের আলি কে? .
২য় ব্যক্তি। সে থাকে তালতলায়। সে কোন সাহেব বাড়ীতে খানসামার কাৰ্য্য করে।
