উপন্যাসের চেয়েও অবিশ্বাস্য অনেক ঘটনা অনেক সময়েই আমাদের জীবনে ঘটে নায়েব মশাই। অবশ্য আমার ধারণা ছিল ব্যাপারটা আপনার অজ্ঞাত নয়।
না মিঃ রায়, আপনি হয়ত জানেন না। মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরীর আমি মাইনেকরা ভৃত্য হলেও তাঁর সঙ্গে কোনদিন আমার প্রভু-ভৃত্য সম্পর্ক ছিল না। বন্ধু এবং ভায়ের মতই আমরা পরস্পর পরস্পরের কাছে ছিলাম। তাঁর জীবনের কোন ঘটনাই আমার অজ্ঞাত ছিল না কোন দিন। সেক্ষেত্রে এতবড় একটা ঘটনা তিনি আমার কাছে লুকিয়ে রেখেছেন এ কথা আমি বিশ্বাসই করতে পারি না। সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য।
হয়ত এমনও হতে পারে সর্বদা তিনি সব কথা আপনার কাছে বললেও ঐ ব্যাপারটা কোন বিশেষ কারণেই আপনার কাছ থেকে গোপন করেছিলেন
কারণ বলছেন, কি তার এমন কারণ থাকতে পারে! আর সত্যিই যদি আপনি যা বলছেন তাই হয়ে থাকে, তাহলে তো এত বড় একটা ঘটনা তিনি নিঃশব্দে চাপা দিয়ে যাবেন, তাই বা কেমন করে সম্ভব বা বিশ্বাসযোগ্য বলুন? তারপর একটু থেমে বললেন, আপনি জানেন না মিঃ রায়, কিন্তু আমি জানি, হেমপ্রভাকে তিনি জীবনাধিক ভালবাসতেন। তাঁর পায়ে কাঁটাটি ফুটলেও তিনি বুক পেতে দিতে পারতেন। আর অমনি একটা ব্যাপারকে তিনি নীরবে সহ্য করে যাবেন!
নায়েব মশাই, আপনি অবিবাহিত। বিবাহিত স্বামী-স্ত্রীর প্রেম ও ভালবাসার রাস্তাটা এমন জটিল যে তার অনেক সময় হদিসই পাওয়া যায় না। বিশেষ করে আমাদের এই বাংলাদেশে কোন কোন স্বামী-স্ত্রী জীবনব্যাপী গরমিল অসামঞ্জস্যকে এমনভাবে সহিষ্ণুতা ও সামাজিক নিয়মকানুনের চাপে পড়ে কাটিয়ে দিয়ে যায় যে, জীবিতকালে তো নয়ই মৃত্যুর পরেও সেটার কোন আভাসমাত্রও হয়ত পাওয়া যায় না। অবশ্য আপনি মনে করবেন না যে আমি এমন কিছু বলতে চাইছি স্বর্গীয় মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী হেমপ্রভা দেবী সম্পর্কে। এবং এক্ষেত্রে সেটা খুব বড় কথাও আপাতত নয়। আমি যেটা সম্পকে স্থিরনিশ্চিত হতে চাই সেটা হচ্ছে, সত্যি সত্যি হেমপ্রভা দেবীরও এইখানেই মৃত্যু হয়েছিল কিনা এবং তাঁর মৃতদেহ নন্দনকাননের বকুলবৃক্ষের তলেই মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরীর কলকাতা হতে প্রত্যাবর্তনের পর সাতদিন বাদে তিনিই আবিষ্কার করেছিলেন কিনা।
এসব আপনি কি বলছেন মিঃ রায়? হেমপ্রভার মৃতদেহও সেই বকুল বৃক্ষতলেই কর্তা কলকাতা হতে ফিরে এসে আবিষ্কার করেছিলেন?
হ্যাঁ, তাই। অন্ততঃ কানাইয়ের মার বর্ণিত কাহিনী সেই কথাই বলে।
মিঃ রায়, কানাইয়ের মাকে এ সম্পর্কে ভাল করে জিজ্ঞাসাবাদ করা আমার একান্তই প্রয়োজন।
সে বললাম তো, পরে করলেও আপনার চলবে। তবে আমাকে যদি আপনি বিশ্বাস করেন তবে এইটুকু আপনাকে আমি বলতে পারি, ও সম্পর্কে আমি নিজেও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলাম এবং আমার ধারণা সে মিথ্যা কিছুই বলেনি। উনিশ বৎসর পূর্বে ঠিক যেমনটি ঘটেছিল এবং যেমনটি সে দেখেছিল ঠিক তেমনটিই সে বলেছে, তার মধ্যে কোন কিছু অত্যুক্তি বা অবোধ্য কিছুই নেই।
কিন্তু তাই যদি হবে কানাইয়ের মার কথা যদি সত্যিই ধরে নেওয়া যায়, তাহলে একটা ব্যাপার আমি আদতেই বুঝে উঠতে পারছি না যে, হেমপ্রভার মৃত্যুর ব্যাপারটা এভাবে গোপন করবার মৃত্যুঞ্জয়ের কি উদ্দেশ্য থাকতে পারে?
আমার জিজ্ঞাস্যও তাই সেন মশাই। তিনি তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুর ব্যাপারটা ঐভাবে আগাগোড়া গোপন করে গেলেন কেন সকলের কাছ থেকে, এমন কি আপনার মত সুহৃদের কাছেও কেন গোপন করে গেলেন? অবশ্য ঘটনা হতে যতটুকু জানা যায়, কানাইয়ের মা একান্তভাবেই দৈবক্রমে ব্যাপারটা দেখে ফেলেছিল বলেই আজ আমরা এতদিন পরে সমস্ত ব্যাপারটা জানতে পেরেছি, নচেৎ সেটা হয়ত কেউ জানতে পারত না। আমি যতদূর শুনেছি এবং এইমাত্র আপনার মুখ থেকেও যতটা জানতে পারলাম, আপনার সঙ্গে স্বর্গীয় মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরীর একটা নিকট যোগাযোগ ছিল মনের দিক দিয়ে; তাই জিজ্ঞাসা করছি এমন কোন অতীত কাহিনী বা ঘটনার কথা তাঁর জীবনের আপনি জানেন কি, যার দ্বারা আমরা তাঁর স্ত্রীর রহস্যময় মতুর উপরে কোন অলোকসম্পাত করতে পারি।
কিরীটীর সোজা সরল প্রশ্নে নায়েব বসন্ত সেন কিছুক্ষণের জন্য যেন মাথা নিচু করে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন।
কিরীটী তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে নায়েব বসন্ত সেনের দিকে তাকিয়ে বললে, শুনন নায়েবমশাই, এক বিষয়ে আমি অন্ততঃ স্থিরনিশ্চিত যে মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরীকে নিঠুরভাবে হত্যা করাই হয়েছে। অবশ্য ঘটনার অনেক পরে আমি অকুস্থানে এসেছি, তাহলেও এ মৃত্যু-রহস্যের মীমাংসা করাটা খুব দুঃসাধ্য ব্যাপার হবে না; কেবল কিছু সময় নেবে। কিন্তু আপনাদের সকলের সাহায্য যদি পাই তাহলে মীমাংসার ব্যাপারটা সহজ হয়ে আসে।
আমি তো আপনাকে প্রথম দিনই বলেছি কিরীটীবাবু, আমার যতটুকু সম্ভব সাহায্য আপনাকে আমি করতে প্রস্তুত। এবং একথাও আপনাকে আমি প্রথম দিনই বলেছি, মৃত্যুঞ্জয়ের মত নির্মল ও সৎ চরিত্রের লোক আমি জীবনে বড় একটা দেখিনি। কোন কলঙ্কই তাঁকে স্পর্শ করেনি। অত্যন্ত দৃঢ় নায়েব বসন্ত সেনের কণ্ঠস্বর।
কিরীটী কিছুক্ষণ নিঃশব্দে চুপ করে বসে রইল এবং মধ্যে মধ্যে হস্তধৃত চুরুটটায় মৃদু মৃদু টান দিয়ে ধুমোদগীরণ করতে লাগল।
ইতিমধ্যে বাইরে বৃষ্টি থেমে গিয়েছে। কেবল বর্ষণ-ক্লান্ত রাত্রির কালো আকাশটার গায়ে বিদ্যুতের চমকানি থেকে থেকে নীল আলোর সঙ্কেত জানিয়ে যাচ্ছে।
