বাইরে থেকে আলাদা তালা দেওয়া থাকে নাকি?
আলাদা কোন তালা নয়, দরজার সঙ্গেই ইয়েল-লকের সিস্টেম আছে, তাতেই চাবি দেওয়া থাকে। আর ডাঃ চৌধুরী বাড়িতে যতক্ষণ থাকেন তখনও একমাত্র ডাঃ চৌধুরীর খাস ভৃত্য রাম ব্যতীত দ্বিতীয় কোন ব্যক্তির তাঁর ঘরে প্রবেশের হুকুম নেই। কেউ যায়ও না।
শুনেছিলাম ত্রিভঙ্গের নাকি একটি ছেলে আছে, যে ছেলেটাকে ডাঃ চৌধুরী অত্যন্ত ভালোবাসেন?
হ্যাঁ, অগ্নিবাণ। তার ব্যাপারটা যেন ও বাড়িতে একটু স্বতন্ত্র।
কি রকম?
দিনের বেলা একটা-দেড়টার পর ডাঃ চৌধুরী যখন হাসপাতাল থেকে ফেরেন, ভাইপোটিকে সঙ্গে করে তিনতলায় নিয়ে যান। অগ্নিবাণ দুপুরে তাঁর সঙ্গেই খায়। সারাটা দ্বিপ্রহর সে তার জ্যাঠার কাছেই থাকে। বিকেলে চেম্বারে যাওয়ার আগে যখন ডাক্তার তিনতলা থেকে নেমে আসেন, অগ্নিবাণকে সঙ্গে করে দোতলায় দিয়ে যান। আবার রাত্রে সাড়ে আটটা থেকে নটার মধ্যে যখন বাড়ি ফিরে আসেন, অগ্নিবাণকে সঙ্গে করে উপরে নিয়ে যান। সে তার জ্যাঠার সঙ্গেই রাত্রে যা খাবার খায়, তারপর রাম তাকে তার মার কাছে পৌঁছে দিয়ে যায়। অগ্নিবাণকে ডাঃ চৌধুরী শুধু ভালবাসেন যে তা নয়, তার উপরে ডাক্তারের একটা বিশেষ দুর্বলতা আছে বলেই মনে হয় আমার।
মৃদুলা দেবীর সঙ্গে ডাক্তারের সম্পর্ক কি রকম?
বিশেষ বোঝবার উপায় নেই। দুজনেই অত্যন্ত গম্ভীর প্রকৃতির ও স্বল্পবাক।
পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে কথাবার্তা বলেন না?
হ্যাঁ, মধ্যে মধ্যে দুজনের কথাবার্তা হয় দেখেছি। সত্যি কথা বলতে কি মিঃ রায়, ডাঃ চৌধুরী, তাঁর ভাই ত্রিভঙ্গ, তাঁর স্ত্রী মৃদুলা দেবী যেন যে যার নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। একই বাড়িতে সকলে থাকেন বটে তবে কারো সঙ্গে কারো হৃদয়ের বড় একটা যোগাযোগ আছে বলে মনে হয় না। প্রত্যেকেই যেন যে যার একটা স্বতন্ত্র জগতে বাস করছে। কখনও কোন চেঁচামেচি বা গোলমাল শুনবেন না। অদ্ভুত শান্ত যেন বাড়িটা। ও বাড়িতে অগ্নিবাণ যদি না থাকত তো বাড়িতে মানুষ-জন আছে বলেই মনে হত না। কেমন যেন একটা চাপা আশঙ্কার থমথমানি বাড়িটার সর্বত্র।
বাড়িটা ঠিক রাস্তার ওপরে, নয়?
না। বড় বড় দুটো চারতলা ফ্ল্যাট-বাড়ির মাঝখান দিয়ে সরু একটা প্যাসেজের মধ্যে দিয়ে কয়েক পা এগিয়ে গেলে তবে বাড়িটা। প্যাসেজটা অবশ্য সরু হলেও তার মধ্যে দিয়ে বড় গাড়ি অনায়াসেই যাতায়াত করতে পারে। প্রায় দশ-বারো কাঠা জায়গা নিয়ে বাড়িটা। কাঠা তিনেক জায়গার ওপরে বাড়িটা। পিছনের দিকে একটা বাগান আছে। বাগানের চারপাশে প্রায় মানুষপ্রমাণ উঁচু প্রাচীর বাড়ির সীমানাটাকে ঘিরে রেখেছে।
পিছনে বাগানের ওপাশে কোন রাস্তা আছে,লক্ষ্য করেছ?
হ্যাঁ, একটা ব্লাইণ্ড লেন আছে। তার ওপাশে একটা বস্তি।
বাগান থেকে সেই ব্লাইন্ড লেনে যাতায়াত করবার কোন দরজা আছে?
আছে। তবে সেটা সর্বদা তালা লাগানোই থাকে দেখেছি।
বাড়ির ভেতর থেকে পিছনের বাগানে যাবার দরজা কোনখানে?
দুটো দরজা আছে। একটা অন্দরে, অন্যটা বাইরে দিয়ে। সেই পথ দিয়েই মেথর যাতায়াত করে। বাড়ির পিছন দিকে একটা লোহার ঘোরানো সিঁড়ি আছে—মেথরদের দোতলার ও তিনতলার বাথরুমে যাবার জন্য।
ডাঃ চৌধুরী শুনেছি রাত্রি নটার পর বাড়ি ফিরে আর কোথায়ও বার হন না?
তাই।
কখনও বের হন না?
না, আমি খুব মাইনিউটলি লক্ষ্য করে দেখেছি গত পনেরো দিন। সত্যিই তিনি কোথায়ও আর বের হন না।
গাড়িও বের হয় না?
না, সোফার হরিচরণ রাত্রে তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েই গ্যারেজে গাড়ি তুলে রেখে দেয় আর গাড়ি বের করে আবার পরের দিন সকালে। গত পনেরো দিন ঐ নিয়মের কোন ব্যতিক্রমই দেখিনি।
ডাক্তারকে নিজে কখনও গাড়ি চালাতে দেখেছ?
না। হরিচরণের মুখেই একদিন শুনেছি ডাক্তার গাড়ি চালাতে জানেন না।
ঠিক আছে। এবারে তুমি যাও সমীরণ। আর ভবিষ্যতে আমার সঙ্গে কনট্রাক্ট করতে হলে একটা কার্ড ড্রপ করো আমার নামে; খুব যদি জরুরী হয় তো ভুজঙ্গ ডাক্তারের বাড়ির কাছে বড় রাস্তার ওপর যে ড্রাগ হাউস নামে ডিসপেনসারিটা আছে, তার মালিক ভবতারণবাবুকে আমি বলে রেখে দেব, সেখানে ফোন আছে, সেখান থেকে আমাকে ফোন করতে পারবে। আর একটা কথা, ডাক্তারের বাড়িতে যে ফোন আছে সেটা কোথায়, কোন্ ঘরে?
তিনতলায়–বারান্দার দেওয়ালের গায়ে ব্র্যাকেটের উপরে বসানো। ঠিক ডাক্তার চৌধুরীর শোবার ঘরের দরজার মুখে।
০৯. সমীরণ সরকার বিদায়
সমীরণ সরকার বিদায় নিয়ে চলে যাবার পর দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম।
স্পষ্ট বুঝলাম ঘরে বসে থাকলেও কিরীটী চারিদিকে সতর্ক নজর রেখেছে। এবং ব্যারিস্টার রাধেশ রায়ের একমাত্র পুত্র তরুণ ব্যারিস্টার অশোক রায়ের ব্যাপারকে কেন্দ্র করে কিরীটীর চিন্তাধারা যে যে দিকে বিস্তৃত হয়েছিল সেই সব দিকগুলো এখনও তার মন জুড়ে রয়েছে। কিন্তু একটা জিনিস যা আমাকে বিস্মিত করেছিল, অশোক রায়ের ব্যাপারে কিরীটীর এবারকার নিষ্ক্রিয়তা। কখনও কোন রহস্যের সম্মুখীন হলে ইতিপূর্বে কিরীটীকে কখনও এমনি দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় হয়ে বড় একটা বসে থাকতে দেখিনি।
তাই প্রশ্ন না করে পারলাম না, সোজাসুজি কথাটা পাড়লাম।
অশোক রায়ের ব্যাপারটা আর কিছু ভেবেছিস কিরীটী?
