রঘুপতি আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘রাম কি লীলা রামহি জানে। তো যাই হোক, ওরা দুজনে ঘরে ঢুকে দ্যাখে মুকেশ তেওয়ারি বিছানার কাছে একটা চেয়ারে কাত হয়ে পড়ে আছে। ডাঁয়ে হাথে রিভলভার ঝুলছে। আর বুকের বাঁ দিকে গোলি কি নিশান। খতম। ব্যস। তখন প্রীতম দাস চৌধুরি তার দোস্ত সুদেশকে বলে মুকেশ তেওয়ারি সুইসাইড করেছে। বড়ি আফসোস কি বাত। তাতে সুদেশ তেওয়ারি হঠাৎই খেপে যায়। ও বলে, না, ওর দাদা খুন হয়েছে। তারপর ও ঘরের সবক’টা দরওয়াজা আর খিড়কি ভালো করে দেখে। লেকিন সব অন্দরসে বন্ধ। একদম ছিটকিনি লাগানো, গুপ্তাসাব। অন্য কোনও লোক যে মুকেশকে খুন করে হাতে রিভলভার সাজিয়ে দিয়ে পালিয়ে যাবে তার কোনও উপায় নেই। কামরার দরওয়াজা-খিড়কি সব অন্দর থেকে পাক্কা বন্ধ ছিল। কিন্তু তাতেও সুদেশ তেওয়ারি বুঝতে চায় না। ও খালি বলে, আমার বড়াভাইকে কেউ সাজিশ করে খুন করেছে। সুইসাইড না-মুমকিন। ইমপসিবল।’
রঘুপতি একটু থামল। এসিজি কফি শেষ করে ফেলেছিলেন। কাপটা রেখে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘দাদা খুন হয়েছে বলে সুদেশ তেওয়ারি গোঁ ধরে বসে আছে কেন?’
রঘুপতি হেসে বলল, ‘এইখানেই মজা, স্যার। সেদিন বিকেলে মুকেশ তেওয়ারি নাকি ভাইকে বলেছিল, আগামীকাল অর্থাৎ, গতকাল বেওসার কীসব হিসাবকিতাব নিয়ে বসবে। আজকাল হিসেবপত্তরে নাকি উলটা-সিধা গড়বড় দেখা যাচ্ছে। এর জন্যে মুকেশ পুরোপুরি প্রীতমকেই দায়ী করেছে। এ ছাড়া দু-ভাইয়ে মিলে কাল সকালে ওদের এক বুড়ি মওসিকে বড়বাজারে দেখতে যাবে প্ল্যান করেছিল। তারপর তো সাড়ে ছ’টায় কাজিয়া। আর সাড়ে বারোটায় মুকেশ তেওয়ারির খেল খতম। এই সব কারণেই সুদেশ কিছুতেই মানতে পারছে না ওর দাদা খুদকুশি মানে, সুইসাইড করেছে।’
রঘুপতি উঠে দাঁড়াল চেয়ার ছেড়ে। হাত-পা নেড়েচেড়ে আড়মোড়া ভাঙল।
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে এসিজি জিগ্যেস করলেন, ‘রিভলভারটা কার?’
রঘুপতি ঘাড় ফিরিয়ে দেখল বৃদ্ধকে। বলল, ‘কার আবার, মুকেশ তেওয়ারির! রিপোর্টে লেখা আছে।’
‘গুলি কি ক্লোজ রেঞ্জ থেকে করা হয়েছিল? ব্যালিস্টিক রিপোর্ট কী বলছে?’
‘ক্লোজ রেঞ্জ। কোনও গোলমাল নেই। কিন্তু সুদেশ তেওয়ারি হইচই শুরু করে দিয়েছে। আর প্রীতম দাস চৌধুরির দাঁত বের করা হাসি আমি সইতে পারছি না। ষোলো আনা মোটিভ রয়েছে, কিন্তু কোনও সবুত নেই।’ বাঁ হাতের চেটোয় ডান হাতে ঘুষি মারল রঘুপতি যাদব। বলল, ‘শয়তানটাকে অন্দর করতে পারলে মউজ করে পালিশ লাগাব। কিন্তু…।’
‘আঃ, রঘুপতি।’ অশোকচন্দ্র স্নেহের সুরে ধমক দিয়ে বললেন, ‘তুমি ঠান্ডা হয়ে বোসো দেখি। তোমাকে আমি প্রমাণ-টমান সব জোগাড় করার মতলব বাতলে দিচ্ছি।’
রঘুপতি যাদব চেয়ারে গিয়ে বসল বটে, কিন্তু তার মুখে অসন্তোষের ছোঁয়া লেগে রইল।
এসিজি বললেন, ‘সুদেশ কি গুলির আওয়াজ শুনেছিল?’
‘ও তো বলছে, না শোনেনি।’
‘হোটেলের আর কেউ কিছু শুনেছে?’
একটু ভেবে রঘুপতি বলল, ‘সুলেমান নামে এক বেয়ারা কসম খেয়ে বলছে রাত বারোটা নাগাদ ও একটা ধামাকার শব্দ শুনেছে। কিন্তু সন্ধের পর সুলেমান একটু-আধটু নেশা করে। তো কে জানে আসলি নকশা কী!’
এসিজি নড়েচড়ে বসলেন। সাদা চুলের গোছায় টান মারলেন দু-বার। বললেন, ‘রঘুপতি তুমি ঠিকই বলেছ। মুকেশ তেওয়ারি খুন হয়েছে। আর, ওকে খুন করেছে প্রীতম দাস চৌধুরি।’
রঘুপতি যাদব শিরদাঁড়া টানটান করে বসল। জিজ্ঞাসা করল, ‘লেকিন ক্যায়সে, স্যার? দরওয়াজা-খিড়কি সব তো অন্দরসে বনধ ছিল!’
এসিজি হেসে বললেন : ‘সেটাই তো বন্ধ ঘরের রহস্যের মজা, রঘুপতি। তবে এটুকু তোমাকে বলে রাখি, মুকেশ তেওয়ারিকে গুলি করা হয়েছে বারোটা নাগাদ। তোমার সুলেমানের কথাই বোধহয় ঠিক। খোঁজ করে দেখো, ওই সময়ে প্রীতম দাস চৌধুরি বন্ধুবর সুদেশকে ছেড়ে কিছুক্ষণের জন্যে উধাও হয়েছিল কিনা। তা ছাড়া আমার ধারণা, গুলি করার সময়ে সে হয়তো রিভলভারের মুখে চাদর-টাদর কিছু চাপা দিয়ে থাকবে। তাতে গুলির আওয়াজটা অনেক ভোঁতা শোনাবে। তোমার কাজ হবে সেই দাগি চাদরটা উদ্ধার করা। হয় ওটা হোটেলের স্টোররুমে আছে, নইলে প্রীতম গুঁজে দিয়েছে কোনও উনুনে।’
রঘুপতি অধৈর্য হয়ে বলে উঠল, ‘খুন করার পরে ও কী করল। সেটা ভি বলুন।’
‘বলছি।’ এসিজি একটু দম নিয়ে বললেন, ‘ঘরের জানলাগুলো ঝটপট বন্ধ করে দিল প্রীতম। তারপর দরজার ভেতর দিকের চাবির গর্তে এমন একটা চাবি ঢুকিয়ে দিল যার মাথাটাই কাটা। অর্থাৎ, তালা খোলার জন্যে চাবির যে-অংশটা সবচেয়ে জরুরি সেইটুকুই কেটে বাদ দেওয়া। এই অকেজো চাবিটা দরজার ভেতর দিকে লাগিয়ে প্রীতম বাইরে এসে দরজা টেনে দরজা লক করে দেয় বাইরে থেকেই। হোটেলের মালিক হওয়ার সুবাদে প্রীতমের কাছে মুকেশের ঘরের ডুপ্লিকেট চাবি নিশ্চয়ই ছিল।’
‘সে যাই হোক, জলদি কাজ সেরে প্রীতম ফিরে এল সুদেশের কাছে। এসে এতক্ষণ গরহাজির থাকার জন্যে যা হোক একটা বাহানা শোনাল। তারপর সাড়ে বারোটা নাগাদ মিথ্যে বলল যে, সে একটা তোমার ভাষায়, ধামাকার শব্দ শুনতে পেয়েছে। তখন সে জোর করেই সুদেশকে সঙ্গে নিয়ে মুকেশের ঘরের দরজায় হাজির হয়। ওকে সাক্ষী মানার জন্যে ভেতর দিকে লাগানো অকেজো চাবিটা ওকে দেখায়। এমনিতে ওরকম ভাবে তালায় চাবি ঢোকানো থাকলে বাইরে থেকে চাবি ঢুকিয়ে দরজা খোলা মুশকিল। তাই প্রীতম খবরের কাগজ পেতে কাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে অত সব কাণ্ড করেছে।’
