‘গোলমাল! কীসের গোলমাল?’ শোকের মধ্যেও খানিকটা উত্তেজিত হয়ে পড়লেন অর্কদেব।
রঘুপতি ভুরু কুঁচকে অর্কদেবকে দেখছিল। এসিজি বুঝতে পারলেন, ও যদি সরাসরি এই কেসের দায়িত্বে থাকত তা হলে এখনই হয়তো রুক্ষভাবে কিছু বলে বসত।
বিজন শর্মা শান্তভাবে নরম গলায় বললেন, ‘মিস্টার সরকার, আপনার বাবার ঘরের দরজা-জানলা ভেতর থেকে ছিটকিনি এঁটে বন্ধ ছিল। সেই অবস্থায় টেবিলে জ্বলন্ত সিগারেট আর কাগজপোড়া ছাই পাওয়া গেল—অথচ ঘরের কোথাও দেশলাই কিংবা লাইটারের চিহ্নমাত্র নেই। অবশ্য দেশলাই কি লাইটার পাওয়া গেলেও আমাদের সন্দেহ থেকে যেত ওই সিগারেট পরমেশ্বরবাবু আদৌ ধরিয়েছেন কিনা। কারণ, উনি মারা গেছেন সকাল ছ’টা থেকে আটটার মধ্যে, অথচ সিগারেটটা ন’টার সময়েও জ্বলছিল। সুতরাং অন্য কেউ নিশ্চয়ই ওই সিগারেট ধরিয়েছে, কাগজ পুড়িয়েছে। কিন্তু…।’
শর্মার কথার খেই ধরে রঘুপতি বলল, ‘লেকিন অওর কোই যদি সিগারেট জ্বালাবে তো সে দরওয়াজা-খিড়কি বন্ধ করে ঘর থেকে পালাবে কেমন করে?’
অশোকচন্দ্র গুপ্ত অর্কদেব সরকারের অনুমতি নিয়ে একটা সিগারেট ধরালেন। সেটায় গভীর টান দিয়ে আমেজে চোখ বুজে ধোঁয়া ছাড়লেন। তারপর বললেন, ‘সুইসাইড হোক বা হোমিসাইড হোক, তাতে আপনার তো কোনও প্রবলেম হওয়ার কথা নয়, অর্কদেববাবু!’
‘না, তা নয়…তবু…।’
রঙ্গলাল গোস্বামী এই প্রথম মুখ খুললেন, ‘আসলে এসিজি স্যার জানতে চান : ”সুইসাইড, না হোমিসাইড/খাঁটি গোল, না সেমসাইড।” ‘
অর্কদেব অবাক হয়ে রঙ্গলালের মুখের নিকে তাকিয়ে রইলেন।
বাইরের উঠোনে বাচ্চা দুটো ‘গোল! গোল!’ করে প্রবল চিৎকার করছিল। অর্কদেব বিরক্ত হয়ে সোফা ছেড়ে উঠে গেলেন জানলার কাছে। চেঁচিয়ে ধমকে উঠলেন, ‘তুতুন! মিমো! কী হচ্ছে! গোলমাল কোরো না—এখানে আমি গেস্টদের সঙ্গে কথা বলছি।’
সাময়িকভাবে বাচ্চাদুটোর চেঁচামেচি কমে গেল।
এসিজি অর্কদেবকে বললেন, ‘আমি আপনার বাবার ঘরটা একবার দেখব।’
পেন্ডুলাম-ঘড়িতে মিষ্টি সুরে সাড়ে আটটার ঘণ্টা বাজতে শুরু করল।
ওঁরা উঠে দাঁড়াতেই কোথা থেকে একটা বড়সড় মাপের কানঝোলা লোমওয়ালা কুকুর ঘরে এসে ঢুকল। কুকুরটার গায়ের রং উজ্জ্বল হলদে-বাদামি। সামান্য লেজ নেড়ে কুকুরটা অর্কদেব সরকারের পায়ের কাছে গা ঘষতে লাগল।
এসিজি কুকুরটার জাত চিনতে পারলেন : গোল্ডেন রিট্রিভার।
অর্কদেব কুকুরটাকে ‘টমি! টমি! গো।’ বলতেই ওটা গম্ভীর চালে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
এসিজিকে উদ্দেশ করে অর্কদেব বললেন, ‘চলুন, ওপরে চলুন। মিস্টার শর্মা তো ঘরটা সিল করে রেখে গেছেন—।’
বিজন শর্মা ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘হ্যাঁ। চলুন, খুলে দিচ্ছি।’
দোতলায় ওঠার সিড়ির মুখে মার্বেল পাথরের খাটো স্তম্ভ। সেখান থেকে শুরু হয়ে গেছে পালিশ করা কাঠের মসৃণ রেলিং।
মার্বেল পাথরের ধাপে পা ফেলে ওঁরা ওপরে উঠতে যাবেন, ঠিক তখনই তুতুন আর মিমো ছুটে চলে এল ওঁদের কাছে।
বয়েসে সামান্য ছোট ছেলেটি বল আঁকড়ে ধরে লুকিয়ে পড়তে চাইল অর্কদেবের পিছনে। একইসঙ্গে অনুযোগের সুরে বলল, ‘দ্যাখো না বাপি, দাদা আমার থেকে বল কেড়ে নিচ্ছে।’
বড়জন প্রতিবাদে কী একটা বলতে যাচ্ছিল, অর্কদেব তাকে ধমক দিয়ে থামিয়ে বললেন : ‘তুতুন, কেন এরকম অসভ্যতা করছ! বলো তো, ওঁরা কী ভাববেন!’
তারপর এসিজির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমার দুই ছেলে…ভীষণ দুরন্ত…।’
এসিজি সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বাচ্চা দুটোকে বললেন, ‘তোমাদের দুজনকে একটা ইন্টারেস্টিং ধাঁধা দিই, সলভ করতে পারলে প্রাইজ পাবে।’
এ-কথা শুনেই গোলগাল দু-ভাই ঝগড়া ভুলে এসিজির কাছে চলে এল।
এসিজি বললেন, ‘বলো তো, একটা মশা আর একটা মাছির লড়াই হলে কে জিতবে?’
সঙ্গে-সঙ্গে দুজনে হাঁ করে ভাবতে শুরু করল।
এসিজি হেসে ওদের বললেন, ‘উত্তরটা ভেবে পেলেই আমাকে বলে যাবে—আমি দোতলায় তোমাদের ঠাকুরদার ঘরে আছি।’
ওঁরা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করলেন।
অশোকচন্দ্রের প্রশ্নটা শোনার পর থেকেই রঙ্গলাল গুম হয়ে কী যেন ভাবছিলেন। সেই ভাবুক ভাবটা বজায় রেখেই তিনি বিড়বিড় করে বললেন, ‘প্রশ্নটা বড় কঠিন, বড় ইন্টারেস্টিং/মশা জেতে, নাকি মাছি, করিলে ফাইটিং।’
বিজন শর্মা আর অর্কদেব অবাক হয়ে রঙ্গলালকে দেখলেন। অর্কদেবের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসিও দেখা গেল।
প্রাচীন বিলাসবহুল বাড়িটার প্রতিটি অংশই এসিজিকে মুগ্ধ করছিল। দোতলায় উঠতে-উঠতে তিনি মনে-মনে ভাবছিলেন এইবার বোধহয় একটা বড়সড় পাখির খাঁচা দেখতে পাবেন, অথবা দাঁড়ে বসা অস্ট্রেলিয়ার অপূর্ব কাকাতুয়া।
কিন্তু এসিজিকে হতাশ হতে হল। তবে অর্কদেবকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলেন, তিনতলার ছাদে পাখির খাঁচা একটা ছিল—দেশি-বিদেশি বহু পাখিও ছিল সেখানে। কিন্তু কী এক মড়ক লেগে রাতারাতি সব পাখি মারা যায়। তারপর থেকে পরমেশ্বর আর পাখি পোষেননি।
দোতলায় উঠে পরমেশ্বর সরকারের ঘরের দিকে এগোতে-এগোতে মহিলা-কণ্ঠের কথা শোনা গেল। তার একটু পরেই চওড়া বারান্দার লাগোয়া একটা ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন দুজন ভদ্রমহিলা।
একজনের সিঁথিতে সিঁদুর। ফরসা মোটাসোটা ভারী চেহারা। চোখে চশমা। পরনে গোলাপি তাঁতের শাড়ি। বয়েস পয়তাল্লিশের এদিক-ওদিক হবে।
