‘সরি, জনাব,’ রাহাকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠেছে ইন্সপেক্টর যাদব, ‘এক্সিকিউটিভ ম্যানেজারের কাছ থেকে আমরা ইনফরমেশন নিয়েছি। নো মাস্টার কি। আপনার কেতাবি জাসুসকে অওর একবার কৌশিশ করতে হবে, মিস্টার রাহা।’
রাহা রঘুপতি যাদবের দিকে একবার তাকিয়েছেন, তারপর ঠোঁটের এক চিলতে হাসি বজায় রেখেই বলেছেন, ‘তা হলে সুরজিতের প্রথম অনুমান ভুল হল। দ্বিতীয় চেষ্টা হিসেবে বলা যেতে পারে, খুনি কাজ সেরে বাইরে বেরিয়ে এসে শক্ত কোনও তার বা ওই জাতীয় কিছু দিয়ে তিনশো আট নম্বরের দরজা লক করে দেয়।’
মাথা নাড়লেন এসিজি : ‘সরি, ভাস্করবাবু। কাল রাতে আমি আর রঘুপতি হাতেকলমে সে-চেষ্টা করে দেখেছি, পারিনি। তা ছাড়া আতসকাচ দিয়ে তন্নতন্ন করে খুঁজেও আমরা দেবারতি মানির দরজার লকের গায়ে সন্দেহজনক কোনও আঁচড়ের দাগ দেখতে পাইনি।’
ভাস্কর রাহা একটু অপ্রস্তুত হলেন। তাঁর গালে রক্তের উচ্ছ্বাসের ছোঁওয়া লাগল। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে তিনি আবার বললেন, ‘ধরা যাক, দেবারতিকে খুন করার পর খুনি দরজার চাবিটা নিয়ে বেরিয়ে এল বাইরে। তারপর দরজা লক করে চাবিটা…বাইরের টেরাস থেকে ছুড়ে দিয়েছিল দেবারতির ঘরের জানলা দিয়ে। তখনই চাবিটা গিয়ে পড়ে জানলার কাছে রাখা টেবিলের ওপরে।’
কিন্তু কথা শেষ করেই আপনমনে এপাশ ওপাশ মাথা নাড়লেন ভাস্কর রাহা। বললেন, ‘নাঃ, এই সলিউশনটা বড্ড কষ্টকল্পিত…’
‘হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন, ‘ রত্নাবলী বলে উঠলেন তড়িঘড়ি করে, ‘নীচের টেরাস থেকে পাঁচতলার ঘরের জানলা দিয়ে চাবি ছুড়ে দেওয়াটা হয়তো অসম্ভব নয়, তবে অবাস্তব। তা ছাড়া কেউ দেখে ফেলার ভয়ও রয়েছে। বিশেষ করে মেয়েটা নীচে পড়ার সময় যখন অমন সাঙ্ঘাতিক একটা শব্দ হয়েছে।’
‘কারেক্ট অবজারভেশন, মিসেস মুখার্জি,’ বললেন অশোকচন্দ্র, ‘সুতরাং সুরজিৎ সেন হার মানলেন।’ হাসলেন তিনি : ‘তবুও সহযোগিতার জন্যে ধন্যবাদ, ভাস্করবাবু।’
একমাত্র কাতিলই জানে কীভাবে সে মেয়েটাকে কোতল করেছে। ভাবল রঘুপতি। আর জানলেও স্যারের কথায় সে থোড়াই অ্যাকচুয়াল সলিউশনটা বলবে! বরং উলটোপালটা আজগুবি কোনও থিয়োরি ঝটপট বাতলে দেবে।
সাত
সিগারেট শেষ হয়ে গিয়েছিল। এটা নতুন সিগারেট ধরালেন এসিজি। এভাবেই পুরোনোরা পুড়ে ছাই হয়—নতুন আসে তার শূন্যস্থান পূরণ করতে। দেবারতির জায়গাও কেউ একজন দখল করে নেবে। কিন্তু ওর মা? ভদ্রমহিলা সম্পর্কে এসিজি সংক্ষেপে যতটুকু জেনেছেন, তাতে দুঃখ হয়। ওঁর লড়াই কখনও বিশ্রাম পেল না। স্বামী আর একমাত্র মেয়ের শ্মশানে ওঁকে শ্মশানবন্ধু হতে হল। আর বেঁচে থাকার জন্য এখনও ওঁকে নীল আলোয় শরীর দুলিয়ে গান গেয়ে সকলের মনোরঞ্জন করতে হবে।
ঘরের প্রত্যেকেই অশোকচন্দ্রের কথা বলার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কয়েক মিনিট একমনে সিগারেটে টান দিয়ে তিনি ইশারায় রঘুপতি যাদবকে কাছে ডাকলেন। যাদব তার হাতের কাগজপত্র একটা সোফায় নামিয়ে রেখে পেন পকেটে গুঁজে এগিয়ে এল এসিজির কাছে।
‘তুমি লালবাজারে ফোন করে দেবারতি মানির পোস্ট মর্টেম রিপোর্টটা তাড়াতাড়ি রেডি করার জন্যে একটু তাগাদা দাও। আজ রাতের মধ্যেই পেলে ভালো হয়। বুঝতেই পারছ, ”সুপ্রভাত” পত্রিকা এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। আর শোনো, লাঞ্চের পর আমরা দশজন রাইটারের দশটা রুম একটু ঘুরেফিরে দেখব—।’
‘আমাদের রুম সার্চ করবেন?’ রূপেন মজুমদার আহত স্বরে জিগ্যেস করলেন।
অশোকচন্দ্র তাঁর দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, ‘এটাকে ঠিক সার্চ বলা যায় না। কারণ, কী খুঁজতে হবে সেটাই আমার জানা নেই।’
রঘুপতি যাদব ঘরের টেলিফোনের কাছে এগিয়ে গেল। রিসিভার তুলে রিসেপশনে লালবাজারের লাইন চাইল।
রত্মাবলী অশোকচন্দ্রকে দেখছিলেন। বয়েসে তাঁর চেয়ে হয়তো দু-চার বছরের ছোটই হবেন, কিন্তু কী অদ্ভুত পরিশ্রম করতে পারেন!
এছাড়া আরও একটা ব্যাপার তাঁকে অবাক করছিল। এরই মধ্যে কতরকম তথ্য জোগাড় করে ফেলেছেন ভদ্রলোক। সব তথ্য খতিয়ে দেখে একটা তত্ত্বে সেগুলোকে খাপ খাওয়াতে হবে। তবেই মিলবে অঙ্কের উত্তর। তখন উনি নিষ্ঠুর তর্জনী তুলে ধরবেন দশজনের মধ্যে একজনের দিকে। অশোকচন্দ্রকে দেখে রত্মাবলী কেমন এক ভরসা পাচ্ছিলেন। উনি নিশ্চয়ই পারবেন বেচারি মেয়েটার খুনিকে ধরতে। কিন্তু করঞ্জাক্ষ রুদ্র হলে কি পারত?
ভাস্কর রাহা উসখুস করছিলেন। হঠাৎই যেন ভীষণ ক্লান্ত মনে হচ্ছে নিজেকে। ঘরে গিয়ে একটু বিশ্রাম নিতে পারলে ভালো হত।
এসিজি বোধহয় ব্যাপারটা টের পেয়েছিলেন। ভাস্কর রাহার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘আপনি ইচ্ছে হলে এখন যেতে পারেন, ভাস্করবাবু। পরে দরকার হলে আমি দুশো আট নম্বর ঘরে যাব। আপনি অনেক তথ্য দিয়ে আমাকে সাহায্য করেছেন।’
রত্নাবলী এইবার জিগ্যেস না করে পারলেন না : ‘কিন্তু এইসব তথ্য আপনি মাথায় রাখেন কী করে?’
রত্নাবলীর দিকে তাকিয়ে মোলায়েম করে হাসলেন এসিজি : ‘মিসেস মুখার্জি, এ-ব্যাপারে আমার পদ্ধতি হুবহু শার্লক হোমসের মতো। অন্তত সেভাবে চেষ্টা করি। যেসব তথ্য আমার কোনওদিনও কাজে লাগবে না, সেগুলো আমি মন থেকে মুছে ফেলার আপ্রাণ চেষ্টা করি। যেমন, আলু-পেঁয়াজের দাম, কলকাতার জনসংখ্যা, কিংবা চাঁদের মাটিতে প্রথম কোন মহাকাশচারী পা দিয়েছিলেন। এর কারণ, আমাদের ব্রেন হল একটা ছোট্ট ঘরের মতো। সেটা আমরা পছন্দসই ফার্নিচার—মানে, তথ্য—দিয়ে সাজিয়ে নিতে পারি। সুতরাং সব তথ্যই যদি সেখানে গাদাগাদি করে ঢোকাই তাহলে দরকারি তথ্যটা সেই ভিড়ে হারিয়ে যেতে পারে। তখন সেটা কাজের সময় খুঁজে পেতে কষ্ট হয়। সেইজন্যে আমি খুব হিসেব করে সেই ঘরে নতুন ফার্নিচার ঢোকাই। কারণ, ঘরের দেওয়ালগুলো তো আর রবারের নয় যে চাইলেই জায়গা বেড়ে যাবে! বরং একটা ব্যাপারে আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন—ব্রেনে তথ্য সঞ্চয় করতে-করতে এমন একটা সময় আসবে, যখন নতুন কোনও তথ্য ঢোকানো মানেই হচ্ছে পুরোনো কোনও তথ্যকে বিসর্জন দেওয়া। অর্থাৎ, নতুন তথ্যটা মনে থাকবে বটে, কিন্তু পুরোনোটা কমপ্লিটলি ভুলে যাবেন।’
