শিহেজী উপত্যকা। সবুজ এক খণ্ড চাদর যেন। তিয়েনশান থেকে নেমে আসা একটা ছোট্ট নদী বয়ে গেছে উপত্যকার মধ্য দিয়ে। নদীর দু’পাশে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে সবুজ গমের ক্ষেত। উপত্যকার প্রান্ত দিয়ে উইঘুর ও কাজাখ মুসলমানদের বসতি। দু’হাজার পরিবার এই উপত্যকায় বাস করত।
উপত্যকার মুখে অনেকখানি উপরে সবুজ বনানী ঘেরা পাহাড়ের কোলে বিরাট একটা হ্রদ। সেই হ্রদ থেকে প্রস্রবণ আকারে পানির স্রোত আছড়ে পডছে নিচের উপত্যাকায়। বলা যায় মিনি জলপ্রপাত। ওপরে তিয়েনশানের বরফমোড়া সফেদ শিরপা, তার নিচে সবুজ বনানীর অপরূপ বেষ্টনির মধ্যে বিশাল হ্রদ, হ্রদ থেকে সবুজ উপত্যকায় ঝরে পড়া রূপালী প্রস্রবণ। সব মিলিয়ে শিহেজী উপত্যকা সিংকিয়াং এর আকর্ষণীয় স্থানগুলোর মধ্যে একটি। হ্রদ ঘিরে একটা পর্যটন কেন্দ্রও গড়ে উঠেছে। সবুজ বনানী ঘেরা কালো হ্রদে নৌবিহার এক আকর্ষণীয় বিষয়।
সবুজ শিহেজী প্রাচুর্যের দিক দিয়েও উল্লেখযোগ্য। পাহাড়ের কোলে হওয়া সত্তেও এর ভূ প্রাকৃতি এমন যে এখানে প্রচুর গম উৎপাদন হয়ে থাকে। এখানকার চাহিদা মিটিয়েও প্রচুর গম দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পাঠানো হয়।
এই শিহেজী উপত্যকায় স্মরণাতীত কাল থেকে উইঘুর এবং কাজাখরা বাস করছে। এখানে শতকরা এক’শ ভাগই মুসলমান। কিন্তু পর্যটন কেন্দ্রের নামে এখানে কম্যুনিস্ট সরকার হান গোষ্ঠীর বহু অমুসলমান লোককে এনে বসিয়েছে। তাদের বসাবার জন্যে জমি এ্যাকুয়ারের মাধ্যমে যে উইঘুর ও কাজাখ মুসলমান পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে তাদেরকে আর শিহেজি উপত্যকায় বসতি স্থাপনের অনুমতি দেয়া হয়নি। এইভাবে এখানে একদিকে মুসলমানদের সংখ্যা কমানো হয়েছে অন্যদিকে অমুসলমান চীনাদের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। পর্যটন এলাকাসহ শিহেজী উপত্যাকায় হানগোষ্ঠীর পাঁচ’শ পরিবার আসন গেড়ে বসেছে।
এরপর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নাম দিয়ে উপত্যকার ওপর এলাকায় প্রায় দু’হাজার একর ফসলি জমি এ্যাকুয়ার করা হয়েছিল। শত প্রতিবাদ সত্তেও জাতীয় স্বার্থের নাম দিয়ে এই এলাকা থেকে মুসলমানদের জোর করে উচ্ছেদ করা হয়েছে। অতীতের মত তারাও এই উপত্যকার অন্য কোথাও বসতি স্থাপনের অধিকার পায়নি, এমনকি তাদেরকে উপত্যকার আত্মীয় স্বজনদের আশ্রয়েও থাকতে দেয়া হয়নি। বাস্তুহারা হয়ে শত শত মুসলিম পরিবার অতি কষ্টের যাযাবার জীবন যাপন করছে।
কিন্তু সেই দু’হাজার একর জমিতে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হলো না। গড়ে উঠতে লাগল বসতবাটি। আধুনিক প্যাটার্নের সুন্দর বাংলোতে ভরে গেল ঐ এলাকা। জানা গেল পাঁচশ হান পরিবার আসছে ওখানে স্থায়ীভাবে বাস করার জন্য। এই খবরে ধৈর্যের বাধ ভেঙ্গে গেল উপত্যকার মুসলিম অধিবাসিদের। এই হানরা এখানে এসে বসলে অমুসলমানদের সংখ্যা উপত্যকার মোট জনসংখ্যার অর্ধেক হয়ে যাবে। উপত্যকার মুসলমানদের কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে গেল, উপত্যকার গোঁটা জনপদ থেকেই এলাকার কম্যুনিস্ট সরকার মুসলমানদের তাড়াতে চায়।
উপত্যকার মুসলমানরা সম্মিলিতভাবে সরকারের এই উদ্যোগের প্রতিবাদ করল এবং দাবী করল যে, যেহেতু এখানে জল বিদ্যুৎ প্রকল্প হলো না, তাই এই জমি যাদের ছিল সেই বাস্তুহারাদের এনে এখানে পুনর্বাসন করা হোক? সেই সাথে তারা ঘোষণা করল, কিছুতেই আমরা এখানে হানদের বসতি স্থাপন করতে দেব না।
কিন্তু তাদের প্রতিবাদ ও দাবীর কোনই জবাব দিল না সরকার। বরং তারা গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হলো আর সরকার পরিকল্পনা নিল সৈন্যবাহিনী মোতায়েন করে হানদের এনে এখানে বসানোর।
ওদিকে যে হান গোষ্ঠীর লোকরা এখানে আসবে তাদের সর্দার ওয়াংহুয়া এ এলাকা দেখে গেছে। এখানে সবুজ ফসলের হাতছানিতে তাদের চোখে লোভের আগুন চিকচিক করে উঠেছে। সেই সাথে তারা উইঘুর ও কাজাখদের ক্ষোভের আগুনও প্রত্যক্ষ করেছে। সব দেখে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, শুধু সরকারের উপর নির্ভর করলে তাদের তাদের চলবে না। মুসলমানদের সম্মিলিত দাবীর মুখে বর্তমান সরকারের গণতন্ত্রমুখী কেন্দ্র দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, সিদ্ধান্ত পাল্টিয়ে ফেলতেও পারে। সুতরাং ওয়াংহুয়া চরম মুসলিম বিদ্ধেসী কট্টর কম্যুনিস্ট ‘রেড ড্রাগনের’ সাহায্য প্রার্থনা করল। ‘রেড ড্রাগনের’ চোখ আগে থেকেই নিবদ্ধ ছিল। তারা এবার প্রস্তাব পেয়ে লাফিয়ে উঠল।
তারপর তারা উপত্যকার এক হাজার মুসলিম পরিবার কে কিভাবে মুঠোয় এনে হানদের নিরাপদে বসানো যাবে তার একটা পরিকল্পনা দাড় করাল।
পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়ে গেল তাদের।
সে দিন কয়েকটি ছায়ামূর্তি শিহেজী উপত্যকার মুসলিম জনপদে প্রবেশ করল। শিহেজী গ্রামের পাশ দিয়ে একটি পাকা রাস্তা শিহেজী লেকের দিকে চলে গেছে। সেই রাস্তার ধারেই শিহেজীর জামে মসজিদ। এ জামে মসজিদ ছাড়াও কয়েকটি ওয়াক্তিয়া মসজিদ আছে উপত্যকার চারদিকে ছড়ানো শিহেজী গ্রামে। জামে মসজিদের পেছনে একটা গম ক্ষেতে গাড়ি লুকিয়ে রেখে তারা প্রবেশ করল গ্রামে।
ছায়ামূর্তি ছয়টি গ্রামের বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ল। গ্রামের কয়েকটা নির্দিষ্ট বাড়ির সামনে গিয়ে ওঁৎ পাতল তারা। বাড়িগুলো কাজাখ ও উইঘুরদের উল্লেখযোগ্য কয়েক ব্যাক্তির, তারা শিহেজী উপত্যকায় হানদের পুনর্বাসনের বিরুদ্ধে মুসলিম জনসাধারণকে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
তখন আযান হয়ে গেছে। ফজরের নামাজের জন্যে মানুষ উঠেছে। পুরুষরা নামাজের জন্য তৈরী হয়ে মসজিদের দিকে যাচ্ছে। গাছ-পালা ঘেরা জনপদে তখনও বেশ অন্ধকার।
ছয়টি ছায়ামূর্তি ওঁৎ পেতে আছে সেই ছয়টি গলির মুখে। তাদের হাতে রিভলভার। সাইলেন্সার লাগানো।
সব বাড়ি থেকেই মানুষ মসজিদে এল ঐ ছয়টি বাড়ি ছাড়া। নিঃশব্দ ছয়টি গুলির আঘাতে বাড়ির উঠানে ওদের লাশ লুটিয়ে পড়েছিল। মসজিদে মানুষ যখন নামাযে দাড়াচ্ছিল। রক্তাত্ত লাশ নিয়ে ছয়টি বাড়িতে তখন মাতম।
ছায়ামূর্তি ছয়টি পরে এসে জমা হল সেই মসজিদের সামনে। রিভলভার পকেটে রেখে ওরা কাঁধে ঝুলানো স্টেনগান তুলে নিল হাতে।
মসজিদে তখন জামায়াত শুরু হয়ে গেছে।
ছয়জনের চারজন মসজিদের উঠানে পাহারায় থাকল। আর দু’জন উঠে গেল মসজিদে। তখনও চারদিকটা স্বচ্ছ হয়ে উঠেনি। জনমানবহীন পথ।
একজন মুসল্লী জামায়াত ধরার জন্য দ্রত মসজিদের দিকে আসছিল। স্টেনগানধারী চারজন চীনাকে মসজিদের উঠানে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে আঁৎকে উঠল।
মসজিদের দিকে সে আর না গিয়ে পেছন ফিরে দৌড় দিল এবং চিৎকার করে সবাইকে ডাকতে লাগল।
ঠিক এ সময় চারদিকের নিরবতা ভেঙ্গে পড়ল ব্রাস ফায়ারের শব্দে।
লোকটির চিৎকার এবং ব্রাস ফায়ারের শব্দে চারদিকে একটা আতংক ছড়িয়ে পড়ে। জামে মসজিদের পার্শ্ববর্তী এলাকায় নারী ও বালক শিশু ছাড়া বড়দের প্রায় সবাই গিয়েছিল মসজিদে। যারা ছিল তারা মসজিদের দিকে ছুটল।
কিন্তু তারা যখন মসজিদের উঠানে পৌছল তখন গম ক্ষেতের সেই গাড়িটা চলতে শুরু করেছে। কেউ কেউ ছুটে গেল গাড়ির দিকে। কিন্তু গাড়ি তীব্র গতিতে ছুটে চলেছে তখন উত্তর দিকে, উরুমচির পথে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই গোটা গ্রাম এসে যেন ভেঙ্গে পড়ল জামে মসজিদে।
মসজিদের মেঝে রক্তে ডুবে গেছে।
ত্রিশটি লাশ এনে সারি করে রাখা হয়েছে মসজিদের চত্বরে। আহতের সংখ্যাও প্রায় পঞ্চাশের মত।
সেই ছয়টি লাশও মসজিদের চত্বরে আনা হল।
শোকের মাতম চারদিকে।
মসজিদের বারান্দায় ফেলে যাওয়া একটা চিঠি পাওয়া গেল, তাতে লেখাঃ ‘নতুন হান বসতির দিকে বাঁকা চোখে তাকালে এমনিভাবে দুনিয়া থেকেই উচ্ছেদ হয়ে যেতে হবে’। চিঠির শেষে স্বাক্ষর নেই, শুধু ‘লাল ড্রাগন’ আঁকা।
