ইউসুফ চিয়াং শিহেজী উপত্যকার রক্তাক্ত ঘটনার বিবরণ শেষ করার পর চুপ করল।
সবাই চুপচাপ।
মসজিদের মেঝেতে জমে থাকা পুরু চাপ চাপ রক্তের জমাট স্রোতটা যেন তাদের সবার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। ভেসে উঠেছে স্বজনহারা শত মানুষের বিলাপ ধ্বনি।
হাসান তারিক, আব্দুল্লায়েভ, আহমদ ইয়াং সবারই মাথা নিচু। আহমদ মুসার শূন্য দৃষ্টি বাইরে নিবদ্ধ।
মেইলিগুলির দু’তলার পারিবারিক ড্রইংরুমে বসে তারা কথা বলছে।
তখন বেলা আড়াইটা। আহমদ মুসা খেয়ে এসে এই ড্রইংরুমে দাদির সাথে আলাপ করছিল। সাথে ছিল হাসান তারিক এবং আহমদ ইয়াং। এই সময়ই শিহেজী উপত্যকার দুঃসংবাদ নিয়ে ইউসুফ চিয়াং ও আব্দুল্লায়েভ প্রবেশ করে।
কথা শুরু হলে দাদি উঠে গেছে। ইউসুফ চিয়াং ও আব্দুল্লায়েভের চোখ-মুখ দেখেই বুঝেছে বড় ধরণের কিছু ঘটেছে।
দাদির কাছে খবর শুনে মেইলিগুলি এসে দাঁড়িয়েছে ড্রইংরুমের উত্তর পাশের পার্টিশন ডোরের ওপারে। ইউসুফ চিয়াং এর সব কথা তার কানে গেছে। আহমদ মুসার বেদনার্ত শূন্য দৃষ্টি সে পরিস্কার দেখতে পাচ্ছে। তার বুকটা কাঁপছে।
নির্বাক নিরবতার অবসান ঘটিয়ে আহমদ মুসাই প্রথম কথা বলল। সে বাইরে থেকে তার শূন্য দৃষ্টি ফিরিয়ে এনে ইউসুফ চিয়াং এর উপর নিবদ্ধ করল। শুকনো মুখ, উস্কো-খুস্কো চেহারা ইউসুফ চিয়াং ও আব্দুল্লায়েভের।
আহমদ মুসা বলল, তোমরা এখন কোথেকে আসছ?
ইউসুফ চিয়াং বলল, মুসা ভাই, ইবনে সাদ মসজিদ এবং ইমাম বোখারী মাদ্রাসার সামনে থেকে ‘রেড ড্রাগনে’র যে দু’জন ধরা পড়েছে, ওদের কাছ থেকে রেড ড্রাগনের দু’টো ঘাঁটির সন্ধান পেয়েছিলাম। মনে করেছিলাম ধীরে সুস্থে আজ রাতে সেখানে অভিযানে যাব। কিন্তু শিহেজীর খবর পাওয়ার পর আর থামতে পারিনি। আপনার অনুমতি নেবার সময় পাইনি। আব্দুল্লায়েভ ও লোকজনসহ সেখানেই গিয়েছিলাম।
-কি খবর?
-দুই ঘাটিতে মোট চৌদ্দজনকে পাওয়া গেছে! তার মধ্যে পাঁচজন মারা গেছে। অবশিষ্টদের ধরে ঘাটিতে পাঠিয়ে দিয়েছি। যারা ধরা পড়েছে তাদের মধ্যে শিহেজীর অপারেশনে অংশ নেয়া লোকও আছে।
আহমদ মুসার চোখ দুটি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, মুবারকবাদ তোমাদের, ইউসুফ।
একটু থেমে আহমদ মুসা বলল, তোমরা তো দুপুরে খাও নি?
-মুসা ভাই, অনেক জরুরী কথা আছে।
-হবে। আগে খেয়ে নাও।
আহমদ মুসা মা-চু কে ডাকল।
মেইলিগুলি দরজা থেকে সরে গেল রান্না ঘরের দিকে।
অল্পক্ষণ পরে মা-চু এসে ইউসুফ চিয়াং ও আব্দুল্লায়েভকে নিয়ে গেল খাবার ঘরে।
ওরা খেয়ে এলে আহমদ মুসা প্রথমেই জিজ্ঞেস করল, আহতদের চিকিৎসার কি ব্যবস্থা হয়েছে?
-আহতদের মধ্য থেকে সকালতক আরো বিশজন মারা গেছে। সকালে সরকারী এম্বুলেন্স যায়। ওতে করে কিছু পাঠানো হয়েছে শিহেজী ট্যুরিস্ট হাসপাতালে, কিছু আনা হয়েছে উরুমুচিতে। বলল ইউসুফ চিয়াং।
কথা শেষ করে একটু থামল ইউসুফ চিয়াং। তারপর বলল, অবস্থা খুব ভয়াবহ, মুসা ভাই। আগামীকাল সকালে হানদের শিহেজীর ঐ পাঁচশ’ বাড়িতে এনে পুনর্বাসন করা হচ্ছে। আমরা কি করব?
-তোমরা এখন কি চিন্তা করছ? আহমদ মুসা জিজ্ঞেস করল।
-হানদের কিছুতেই ওখানে বসতি স্থাপন করতে দেয়া যাবে না। যে হানদের ওখানে আনা হচ্ছে তারা রাজনৈতিক চরিত্রের। রেড ড্রাগনের যারা ধরা পড়েছে তাদের কাছ থেকে জানতে পেরেছি, ঐ হান গোষ্ঠী ও রেড ড্রাগনের যৌথ পরামর্শক্রমেই শিহেজী উপত্যকার হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে।
-মুকাবিলার কোন পথ চিন্তা করেছো?
-শিহেজীর যারা এসেছিল তাদের সাথে আলোচনা করেছি, আজ রাতে আমরা হানদের জন্যে গড়া ঐ নতুন জনপদ উড়িয়ে দিব। তাহলে ওদের আসাটা সাময়িকভাবে বন্ধ হবে। পরবর্তী পদক্ষেপ পরে চিন্তা করা যাবে।
আহমদ মুসা ইউসুফ চিয়াং এর কথা শুনল। কোন কথা বলল না। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, শিহেজী উপত্যকা থেকে যারা এ পর্যন্ত উদ্বাস্তু হয়েছে তারা কোথায়?
-আশেপাশের উপত্যকায় তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
-আজ দিনের মধ্যে তাদের শিহেজী উপত্যকায় একত্রিত কর।
-রাতের মধ্যে তারা হানদের জন্যে তৈরী বাড়িতে উঠে যাবে।
ইউসুফের চোখ দুটি উজ্জ্বল হয়ে উঠল সে আনন্দে লাফিয়ে উঠল আসন থেকে। সে ছুটে গিয়ে আহমদ মুসার একটা হাত তুলে নিয়ে চুমু খেয়ে বলল, এই কথা আমাদের কারো মাথায় আসেনি, মুসা ভাই।
ইউসুফ চিয়াং সিটে গিয়ে বসতে বসতে বলল, তারপর আমরা এক সাথে হয়ে মুকাবিলা করব সরকারী বাহিনীর এবং বসতির জন্যে আসা হানদের।
-ঠিক বলেছ, তবে হানদের ঐ শিহেজী উপত্যকা পর্যন্ত আসতে দেয়া যাবে না।
-তাহলে?
-পথেই ওদের আটকাতে হবে আজ রাতে। খোঁজ নাও কোন পথে তারা আসছে।
-ঠিক বলেছেন মুসা ভাই।
ইউসুফ চিয়াং এর চোখে আর এক দফা আনন্দের ঢেউ খেলে গেল।
-ভাবছিল আহমদ মুসা।
চোখ দু’টি তার বোজা।
একটু পর চোখ খুলে সে বলল, ইউসুফ, তুমি এবং আব্দুল্লায়েভ রাতে শিহেজীর ঘটনা সামলাবে। আমি হাসান তারিক ও আহমদ ইয়াংকে নিয়ে হানদের অগ্রযাত্রার সামনে দাঁড়াব।
ইউসুফ চিয়াং এবং আহমদ ইয়াং এক সাথে বলে উঠল, আপনি অসুস্থ মুসা ভাই।
-না আমি অসুস্থ নই, সম্পূর্ণ সুস্থ।
একটা আবেগ জড়িত ধমকের সুর আহমদ মুসার কন্ঠে।
আহমদ মুসা একটু থামল। তারপর বলল, যে জাতির মানুষ এক হাত কাটা গেলে আরেক হাতে পতাকা ধরে রাখে, সে জাতির কারো অসুস্থতার অজুহাত খাটে না ইউসুফ, আহমদ ইয়াং।
সবাই নিরব। সবার মুখে দৃঢ় এক শপথের ছাপ।
মেইলিগুলি দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিল তখনও। তার চোখ দু’টি উজ্জ্বল। অজ্ঞাতেই কখন যেন দাঁতে দাঁত চেপে ধরেছে সে। ‘আমি অসুস্থ নই, আমি সম্পূর্ণ সুস্থ’-আহমদ মুসার এই উক্তি তার বুকে বেজেছে, কিন্তু বীরোচিত এই বক্তব্য আরো ভাল লেগেছে তার। আর আহমদ মুসার শেষ কথাগুলো তার চোখের সামনে জাতির এক নতুন রূপ তুলে ধরল।
নিরবতা ভেঙ্গে আহমদ মুসাই প্রথম কথা বলল। বলল যে, ইউসুফ হাসান তারিকদের নিয়ে তুমি যাও। সব ব্যবস্থা করে সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসবে।
আর কোন কথা না বলে সালাম জানিয়ে সবাই বেরিয়ে গেল। আহমদ মুসাও চলে গেল তার কক্ষের দিকে।
