জেনারেল বোরিস আশ্রয় নিয়েছিল আল্লাবখশ গ্রামের উত্তরে পামির সড়কের ধার দিয়ে যে পাহাড় সেই পাহাড়ে।
সেদিন সন্ধ্যায় আল্লাবখশ গ্রামে যখন আহমদ মুসার হেলিকপ্টারটি নামে, তখন জেনারেল বোরিসের একজন লোক নেমে এসেছিল এই গ্রামে। এখানে কারা থাকে তার খোঁজ নেবার জন্য। গ্রামের লোকদের মুখে সেই জানতে পারে আহমদ মুসা এসেছে আব্দুল গাফুরের বাড়িতে । সে ফিরে গিয়ে জেনারেল বোরিসকে এ খবর জানায়। এ খবর শুনে সাত রাজার ধন মানিক পাওয়ার মতই তার চোখ দু’টি আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কি করতে হবে সংগে সংগে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।
সন্ধ্যার পর পরই পাহাড়ী গ্রামগুলো ঘুমিয়ে পড়ে। রাত ৯টার মধ্যেই আল্লাবখশ গ্রামের সব বাতি নিবে গেল।
রাত ১১টার দিকে ডজন খানিক সাথী নিয়ে জেনারেল বোরিস নেমে এল আল্লাবখশ গ্রামে। বিড়ালের মত নিঃশব্দে হামাগুড়ি দিয়ে ওরা পৌছল আব্দুল গফুরের বাড়ীতে। আব্দুল গফুরেরে বৈঠকখানার দরজায় গিয়ে যখন ওরা পৌছল তখন রাত ১১টা পনের। দরজা ভাল করে পরীক্ষা করল জেনারেল বোরিস। ইস্পাতের কবজা দিয়ে চৌকাঠের সাথে দরজা লাগানো। হাসল জেনারেল বোরিস।
তারপর ব্যাগ খুলে একটা লম্বা তার এবং একটা ছোট হাইপাওয়ার ক্লোরোফরম সিলিন্ডার বের করল। তারটা সে সংযোগ করল ক্লোরোফরম সিলিন্ডারের সাথে। এরপর ছিদ্রওয়ালা তারটা দরজার নীচে ফাঁক দিয়ে ঢুকিয়ে দিল ঘরের ভিতর। ঘরের মাঝ বরাবর তারটা পৌছেছে এমনটা যখন মনে হল তখন সিলিন্ডারের সুইচটা অন করে দিল। গ্যাস তারের মধ্য দিয়ে ঘরে প্রবেশ করতে লাগল। পাঁচ মিনিটের খালি হয়ে গেল সিলিন্ডার। তারপর আরও পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করল জেনারেল বোরিস।
বাড়তি পাঁচ মিনিট পেরিয়ে গেলে জেনারেল বোরিস ব্যাগ থেকে লেসার বীম সিলিন্ডার বের করল। লেসার বীম দিয়ে দরজার সবগুলো কবজা কয়েক মিনিটে ধোঁয়া করে দিল। তারপর তিন-চার জনে ধরে দরজাটা সরিয়ে নিল।
জেনারেল বোরিসরা সবাই গ্যাস মাক্স পরা। তারা ঘরে ঢুকে পেন্সিল টর্চ জ্বালিয়ে দেখল ঘরের এক পাশে আহমদ মুসা, আরেক পাশে ইকরামভ । তাদের নেড়ে-চেড়ে দেখল, তাদের কারোরই জ্ঞান নেই।
জেনারেল বোরিসের নির্দেশে তিনজন এগিয়ে এসে অজ্ঞান আহমদ মুসাকে কাঁধে তুলে নিল। তারপর সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরের অন্ধকারে মিশে গেল।
খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেছিল আব্দুল্লায়েভ। নদীর ঘাটের কাজ সেরে বাড়ির ভিতর ঢুকতে গিয়ে দক্ষিণে বৈঠকখানার দরজার দিকে তাকাতেই তার চোখ ছানাবড়া হয় উঠল। বৈঠকখানার দরজা গোটাটাই দরজার এক পাশে বারান্দায় কাত হয়ে পড়ে আছে। কি ভূতুড়ে কান্ড। আব্দুল্লায়েভ দৌড়ে গেল বৈঠকখানায়। খোলা দরজা দিয়ে ভোরের আলো ঘরে ঢুকেছে। সব কিছুই পরিষ্কার চোখে পড়ছে। আহমদ মুসার বিছানার দিকে চোখ পড়তেই বুকটা কেঁপে উঠল তার থর থর করে। আহমদ মুসার বিছানা খালি, নেই সে। অন্য বিছানায় শুয়ে আছে ইকরামভ। তাকে ধাক্কা দিল, কোনই সাড়া দিল না ইকরামভ। তার অংগ প্রত্যঙ্গ শিথিল। জ্ঞান হারিয়েছে ইকরামভ? আরেক দফা চমকে উঠার পালা আব্দুল্লায়েভের। হঠাৎ আব্দুল্লায়েভের মনে হল তার মাথা ঝিমঝিম করছে, এতক্ষণে অনুভব করল কি একটা অপরিচিত গন্ধ চারদিকে, গ্যাস কি? আঁৎকে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে এল আব্দুল্লায়েভ। বাড়ির ভেতরের আঙিনায় গিয়ে আব্দুল্লায়েভ চীৎকার করে উঠল, সর্বনাশ হয়ে গেছে!
সেই চীৎকার শুনে হন্ত-দন্ত হয়ে বেরিয়ে এল আব্দুল্লায়েভের মা, আব্দুল্লায়েভের স্ত্রী, এবং ফারহানা।
ফারহানাকে দেখেই আব্দুল্লায়েভ ডুকরে কেঁদে উঠল, সর্বনাশ হয়ে গেছে ফারহানা, বৈঠক খানার দরজা ভাঙা, আহমদ মুসা নেই। আব্দুল্লায়েভের কথা শেষ হবার সাথে সাথে ‘আল্লাহ’ বলে এক বুক ফাটা চীৎকার করে উঠল ফারহানা। জ্ঞানহীনা তার দেহটা ঢলে পড়ল মাটির উপর।
আব্দুল্লায়েভের স্ত্রী, আব্দুল্লায়েভের মা ছুটে গেল বৈঠকখানায়। ভাঙা দরজা, শূন্য ঘর, অজ্ঞান ইকরামভকে দেখে তারাও কেঁদে উঠল চীৎকার করে।
মধ্য এশিয়া মুসলিম সাধারণতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট কুতাবার হেলিকপ্টার বহর যখন আল্লাবখশ গ্রামে পৌছল, তখন সুর্য সবে উঠেছে। হেলিকপ্টার থেকে নামল কর্নেল কুতাইবা, হাসান তারিক এবং তাদের সাথে বোরখা পরা দুই মহিলা শিরিন শবনম এবং আয়েশা আলিয়েভা।
হেলিকপ্টার থেকে নেমে বিস্মিত হলো কুতাইবা, আহমদ মুসা নেই এমনকি আব্দুল্লায়েভও নেই। এমনটা তো হবার কথা নয়।
হেলিকপ্টার থেকে নেমে তার একটু এগুতেই কুতাইবার পরিচিত ইমাম মোল্লা নুরুদ্দিন তাদের দিকে এগিয়ে এল। তার মুখ শুকনো, চেহারা বিধ্বস্ত।
বিস্তিত কুতাইবা প্রশ্ন করল, কি খবর নুরুদ্দীন?
নুরুদ্দীন কেঁদে ফেলল। একটু সামলে নিয়ে সে বলল, আব্দুল গফুরের বৈঠকখানার দরজা ভাঙা, আহমদ মুসা নেই।
-কি বলছ নুরুদ্দীন, বলে চীৎকার করে উঠল কুতাইবা।
তারপর তারা দৌড় দিল আব্দুল গফুরের বাড়ীর দিকে। তাদের পেছনে আয়েশা আলিয়েভা এবং শবনম।
বৈঠকখানার খুঁটিতে ঠেস দিয়ে কাঁদছিল আব্দুল্লায়েভ। কুতাইবা এবং হাসান তারিক সেখানে পৌছতেই সে উঠে দাড়াল। তাদের নিয়ে প্রবেশ করল বৈঠকখানায়।
ঘরে ঢুকে পাগলের মত হয়ে গেল কুতাইবা এবং হাসান তারিক। হাসান তারিক সেই গ্যাস সিলিন্ডার, সেই তার এবং চৌকাঠের কব্জাগুলো পরীক্ষা করে গালে হাত দিয়ে বসে পড়ল মাটিতে। দু’চোখ দিয়ে ঝরঝর করে নেমে এলো অশ্রু। কুতাইবা আহমদ মুসার বিছানায় মুখ লুকিয়ে শিশুর মত কাঁদতে লাগল। দরজায় দাঁড়িয়ে আয়েশা আলিয়েভা এবং শবনম। দু’হাতে মুখ ঢেকে তারা কাঁদছে।
আব্দুল্লায়েভের মা এসে আয়েশা আলিয়েভাকে বলল, এস তোমরা ফারহানার কাছে। ওর জ্ঞান এখনও ফেরেনি।
-কোথায় ফারহানা, বলে ছুটল তারা বাড়ীর ভিতর।
ফারহানার জ্ঞান তখন ফিরে এসেছে, ইকরামভেরও জ্ঞান তখন ফেরানো হয়েছে। সবার অশ্রু শুকিয়ে গেছে।
বৈঠকখানার ভেতরের দরজায় ফাতিমাকে ঘিরে দাড়িয়েছিল শিরিন শবনম, আয়েশা আলিয়েভা, ফাতিমা ফারহানার মা ও ভাবী। বৈঠকখানার ভেতরে আব্দুল্লায়েভ, কুতাইবা হাসান তারিক এবং ইকরামভ। বৈঠকখানার বাইরের বারান্দা ও উঠানে সাইমুম কর্মীরা।
গভীর ভাবনায় নিমজ্জিত হাসান তারিক। কি অংক কষছে যেন সে। অবশেষে নীরবতা ভেংগে কথা বলল সে। বলল, আমার অনুমান যদি মিথ্যা না হয় তাহলে আমি বলতে পারি মুসা ভাইকে জেনারেল বোরিস অথবা তার লোকেরা কিডন্যাপ করেছে। আমরা জানি, বিপ্লবের পর সে পামির সড়ক ধরেই পালিয়ে এসেছে। সে পাহাড়ে কোথাও আশ্রয় নিয়েছিল, আল্লাবখশ গ্রামে আসার কথা কোন ভাবে জানতে পারে সে এর সুযোগ গ্রহণ করেছে।
এখন প্রশ্ন হলো, আহমদ মুসাকে কিডন্যাপ করে সে কোথায় নিয়ে যাবে? নিশ্চয় এ দেশে সে থাকবে না, রাশিয়াতেও যাবে না, আফগানিস্তানও যেতে পারবে না। বাকি থাকে চীন। আমার মতে চীনেই সে যেতে পারে। সেখানকার ফ্রদের সাহায্য নেবার জন্যে।
থামল হাসান তারিক।
তারপর উঠে দাঁড়াল।বলল, আমি এই মূহুর্তেই জেনারেল বোরিসের অনুসরণ করতে চাই। পামিরের পথে প্রান্তরে কিংবা তিয়েনশানের ওপারে শিংকিয়াং এ অথবা যেখানেই হোক তাকে খুঁজে বের করব, তার হাত থেকে ছিনিয়ে আনব আহমদ মুসাকে, ইনশাআল্লাহ।
আব্দুল্লায়েভ এসে তার পাশে দাঁড়িয়ে বলল আমি আপনার পাশে থাকব। আমি এ অঞ্চল এবং চীনের বহুকিছুই চিনি।
অশ্রু ঝরছিল কুতাইবার চোখ দিয়ে। সে বলল, আমিও আহমদ মুসার ভাই, আমিও কি এ অভিযানে শামিল হতে পারিনা?
হাসান তারিক বলল, না আহমদ মুসা যে পবিত্র ও গুরুদায়িত্ব তোমাকে দিয়েছেন সেটা পালন করা তোমার প্রথম কর্তব্য।
একটু থেমে হাসান তারিক বলল, কুতাইবা তোমার এখনই যে দায়িত্ব সেটা হল, আমাদের এ ভূখন্ডের অধীন সমস্ত বন-জংগল এবং পাহাড় চষে ফেলা যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় জেনারেল বোরিস এদেশে নেই।
বেলা তখন ৮টা।
হাসান তারিক এবং আব্দুল্লায়েভ প্রস্তুত হল যাত্রার জন্য। ফাতিমা ফারহানা, আয়েশা আলিয়েভা ও শবনম দাঁড়িয়েছিল।
ওদের সামনে দাঁড়িয়ে হাসান তারিক বলল, আয়েশা ফাতিমা ফারহানাকে নিয়ে তুমি তাসখন্দে দাদীর কাছে থাকবে। ফারহানার আব্বাকে আজই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে। এদের পরিবারের সবাইকে আজই তাসখন্দে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
মেয়েরা সবাই কাঁদছিল।
হাসান তারিক বলল, সবাই তোমরা সাইমুমের কর্মী। কাঁদা তোমাদের শোভা পায় না। যে বিপদ এসেছে আল্লাহ তা থেকে আমাদের উদ্ধার করবেন। তোমরা দোয়া করো।
বলে হাসান তারিক ও আব্দুল্লায়েভ বেরিয়ে এল আব্দুল গফুরের বাড়ী থেকে। কিছুটা পথ তারা যাবে গাড়িতে। তারপর ইয়াকে চড়ে দুর্গম পামির পাড়ি দিয়ে তাদের পৌছতে হবে তিয়েনশানের ওপারে।
ফাতিমা ফারহানা, আয়েশা আলিয়েভা এবং শিরিন শবনম দরজায় দাঁড়িয়েছিল। হাসান তারিক এবং আব্দুল্লায়েভ চোখের আড়ালে হারিয়ে যেতেই তিনজনের হাতই উপরে উঠল। আরজ করল তারা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে; ‘হে আল্লাহ এ অভিযান সফরের অভিভাবক একমাত্র তুমিই। তুমি তাদের সফল কর। আহমদ মুসা সহ তাদের সবাইকে আবার ফিরিয়ে এনো আমাদের মাঝে।‘
তিনটি হৃদয়ের কান্না বিজড়িত এই আকুল প্রার্থনার সবুজ শব্দমালা ইথারের পাখায় ভর করে উড়ে চলল আল্লাহর আরশের দিকে।
০৭. তিয়েনশানের ওপারে
আব্দুল গফুরের বাড়ি থেকে তারা মাত্র কয়েক’শ গজ এগিয়েছে। হেলিকপ্টারের কাছে পৌঁছতে এখনও অনেকটা পথ বাকী। হাসান তারিক আগে আগে চলছিল, পেছনে আব্দুল্লায়েভ। রাস্তার দু’ধারে আব্দুল্লায়েভদের গমের ক্ষেত। বলিষ্ঠ সবুজ গমের গাছগুলো দু’ফুটের মত লম্বা হয়ে উঠেছে। সামনে রাস্তার ডানপাশে একটা ঝোপ।
উদ্দেশ্যহীন দৃষ্টিটা সামনে ছড়িয়ে পথ চলছিল হাসান তারিক। মনে মনে গুন গুন করে আল-কোরআনের একটা আয়াত পাঠ করছিলঃ ‘রাব্বানাগ ফিরলানা যুনুবানা ওয়া ইসরাফানা ফি আমরিনা ওয়া সাব্বিত আকদামানা ওয়ানসুরনা আলাল কাউমিল কাফিরীন।’
হঠাৎ হাসান তারিকের চোখে পড়ল কারো একটা মাথা যেন ঝোপের বাইরে এসেই আবার ঝোপের আড়ালে মিলিয়ে গেল। হাসান তারিকের সতর্ক স্নায়ুতন্ত্রী জুড়ে একটা উষ্ণ স্রোত বয়ে গেল। হঠাৎই মনটা তার তোলপাড় করে উঠল। চিন্তা দ্রুত হলো। কে লুকাল ওমন করে ঝোপের মধ্যে কেন লুকালো?
পেছন দিকে না ফিরেই হাসান তারিক জিজ্ঞেস করল, ‘আব্দুল্লায়েভ’ পাড়ায় তোমাদের কি কোন শত্রু আছে?’
‘না’-আবাদুল্লায়েভ জবাব দিল। তারপর উল্টো প্রশ্ন করল, ‘কেন এ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছেন?’ আব্দুল্লায়েভের কন্ঠে বিস্ময়। হাসান তারিক কোন জবাব দিল না আব্দুল্লায়েভের প্রশ্নের। নানা চিন্তা তার মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল। হঠাৎ তার মনে প্রশ্ন জাগল, জেনারেল বরিসরা কি চলে গেছে? বড় একটা শিকার তারা ধরেছে বটে, কিন্তু আর কি শিকার নেই? মধ্য এশিয়া মুসলিম সাধারণতন্ত্রের প্রধান কর্ণেল কুতায়বাও কি লোভনীয় শিকার নয়? এই কথা চিন্তা করার সাথে সাথে হাসান তারিকের মনটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। সেই সাথে পীড়া অনুভব করল মনে, এই সহজ সম্ভাবনার কথাটা কেন তাদের আগে মনে হয়নি।
তখনও ঝোপটা ১শ গজের মত দূরে। নিশ্চিত না হয়ে আর এগুনো ঠিক মনে করল না হাসান তারিক।
দাঁড়িয়ে পড়ল সে। বিস্মিত আব্দুল্রায়েভ পাশে এসে দাঁড়াল। হাসান তারিকের গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, ‘কিছু ঘটেছে তারিক ভাই?’ তার কন্ঠে উদ্বেগ।
আব্দুল্রায়েভের প্রশ্নের প্রতি কোন মনোযোগ না দিয়ে হাসান তারিক জিজ্ঞেস করল, ‘কেউ বা কারা যেন এ ঝোপে লুকিয়ে আছে। তারা এ পাড়ার কেউ হতে পারে বলে কি তুমি মনে কর?’
একটু চিন্তা করল আব্দুল্লায়েভ। তারপর বলল, আমাকে দেখার পর কোন উদ্দেশ্যে কেউ এই ঝোপে লুকাবে এমন কেউ এই পাড়ায় নেই।’ একটু দম নিয়ে সে বলল, ‘এমন কিছু কি ঘটেছে তারিক ভাই?’
‘হ্যাঁ।’ সংক্ষিপ্ত জবাব দিল হাসান তারিক।
‘তাহলে আমি দেখি’ বলে সামনের দিকে পা বাড়াতে চাইল আব্দুল্লায়েভ। হাত বাড়িয়ে তাকে বাধা দিল হাসান তারিক। বলল, ‘কোন ব্যাপারকেই ছোট করে দেখা ঠিক নয় আব্দুল্লাহ, রিভলবারটা বের করে নাও। দেখ ওটা গুলি ভর্তি আছে কিনা।’ বলে হাসান তারিক নিজেও জ্যাকেটের পকেট থেকে নিজের রিভলভারটা বের করে নিল।
এই সময় পেছনে আব্দুল্লায়েভের বাড়ির দিক থেকে সাব মেশিনগানের একটানা ব্রাশফায়ারের আওয়াজ ভেসে এল।
চমকে উঠে পেছন ফিরল দু’জনেই। মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত। ঝোপের দিক থেকে গর্জে উঠল কয়েকটা সাবমেশিনগান।
বিদ্যুত বেগে দু’জনেই বসে পড়ল। বসে পড়েই এক হাতে রিভলভার অন্য হাতে আব্দুল্লায়েভের হাত ধরে টেনে নিয়ে দৌড় দিল হাসান তারিক রাস্তার ডান পাশে একটা গাছের আড়ালে।
সেই ঝোপ থেকে ওরা জনা পাঁচেক লোক গুলি করতে করতে ছুটে আসছিল রাস্তা দিয়ে। প্রায় ৫০ গজ দূরে ওরা এসে পড়েছে। ওদের চোখে সন্ধানী দৃষ্টি, কিছুটা বিমূঢ় ভাবও। দু’জন মানুষ হঠাৎ কোথায় গেল এটাই বোধ হয় চিন্তা। কিন্তু তাদেরকে খুব সতর্ক মনে হলো না। লক্ষ্যহীনভাবে গুলির দেয়াল সৃষ্টি করে সৈনিকরা যেমন আত্মরক্ষামূলকভাবে সামনে এগোয়, তাদের আচরণটা সে রকমই। তাদের লক্ষ্য রাস্তা বরাবর সামনের দিকে, পাশের দিকে তাদের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।
আরো কাছে চলে এসেছে তারা। গাছের গুড়ির সাথে মিশে রিভলভার বাগিয়ে অপেক্ষা করছিল হাসান তারিক। গাছের বাম পাশ দিয়ে ছুটে যাচ্ছিল ওদের গুলি। কিছু গুলি এসে গাছে বিদ্ধ হচ্ছিল। কচিৎ দু’একটা গাছের ডান পাশ দিয়ে আসছিল। ওরা যখন আরও কাছে এসে পড়ল; তখন ডান পাশ দিয়ে গুলি আসা বন্ধই হয়ে গেল। হাসান তারিক এবার তার রিভলভারের ট্রিগারে আঙ্গুল চেপে মাথাটা একটু বাড়াল।
হঠাৎ ওদের একজনের দৃষ্টিতে পড়ে গেল হাসান তারিক। চোখাচোখি হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ওর ষ্টেনগানের মাথাটা এদিকে মোড় নিতে যাচ্ছিল। কিন্তু তারিক তাকে আর সুযোগ দিল না। দু’হাতে রিভলভার ধরে ডান হাতের শাহাদাত আঙ্গুলি দিয়ে প্রচন্ডভাবে চেপে ধরল ট্রিগার। সাইমুমের এম-১০ অটোমেটিক রিভলভার ঝাঁকি দিয়ে জেগে জেগে উঠল। ছুটে চলল গুলির বৃষ্টি। স্পট টার্গেট, লক্ষ্যভ্রষ্ট হবার কোনই কারণ নেই। মাত্র কয়েক সেকেন্ড। পাঁচটি লাশ মুখ থুবড়ে পড়ে গেল মাটিতে।
আরও কয়েক সেকেন্ড পার হলো। না; আর কেউ এল না। গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল হাসান তারিক এবং আব্দুল্লায়েভ।
‘ফ্র’ -এর ইউনিফরম পরা লাশগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে ছুট দিল হাসান তারিক আব্দুল্লায়েভের বাড়ীর দিকে। পেছনে তার আব্দুল্লায়েভ । গুলি বৃষ্টির শব্দ তখনও আসছে সেদিক থেকে। হাসান তারিকরা যখন বৈঠকখানার চত্বরে পৌছঁল, তখন গুলি থেমে গেছে এবং বাড়ির গেট ও বৈঠকখানার দরজা দিয়ে সাইমুম কর্মীরা সাবমেশিনগান বাগিয়ে বেরিয়ে আসছিল।
হাসান তারিক ওদের বলল, ‘এদিক থেকে আর কোন ভয় নেই, পাঁচ জনকে শুইয়ে রেখে এসেছি। এখানে খবর কি? কিছু হয়নি তো? হাসান তারিকের কন্ঠে উদ্বেগ।
একজন সাইমুম কর্মী বলল, ‘জনাব কুতায়বা ভাল আছেন কিন্তু. ……..’
‘কিন্তু কি?’ প্রশ্ন করল হাসান তারিক। প্রশ্ন করেই কোন জবাবের অপেক্ষা না করে হাসান তারিক এবং আব্দুল্লায়েভ ছুটে গেল বাড়ির ভেতর। দেখল তারা, বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে খামার বাড়ির সাথে যে প্যাসেজ সেই প্যাসেজে পড়ে আছে দু’টি দেহ। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে কুতাইবা এবং ইকরামভ। আর ডান দিকে বড় ঘরের দরজার সামনে শিরীন শবনম ব্যান্ডেজ বাঁধছে আয়েশা আলিয়েভার বাম বাহুতে, কনুয়ের নিচে। আয়েশা আলিয়েভার ডান হাতে তখনও এম-১০ রিভলভার।
আয়েশা আলিয়েভা এবং শিরীন শবনমকে ওখানে দেখে ছ্যাঁৎ করে উঠল হাসান তারিকের বুকটা। তাহলে প্যাসেজে ঐ মেয়ে দু’টির লাশ কাদের?
ছুটে গেল হাসান তারিক সেখানে। দেখল বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া দু’টি দেহ। একটি ফাতিমা ফারহানার, আরেকটা তার ভাবী আব্দুল্লায়েভের স্ত্রী আতিয়ার।
হাসান তারিকের চোখ ফেটে অশ্রু নেমে এল। অশ্রু নামছিল কুতাইবা এবং ইকরামভের চোখ দিয়েও। কারও মুখে কোন কথা নেই। অনেক্ষণ পর মুখ খুলল কুতাইবা। বলল, ‘ওরা দু’দিক থেকেই হামলা করেছিল। আপনারা সামনের দিকটা না ঠেকালে হয়তো আরও বিপদ হতো। কিন্তু সর্বনাশ তো হয়েই গেল, কি জবাব দেব আমরা মুসা ভাইকে ……….’
রুমালে চোখ মুছল কুতাইবা।
হাসান তারিক বলল, আমাদের ভূল হয়েছে। কেউ আমরা এ চিন্তা করিনি যে, ‘ফ্র’ শুধু একটা শিকার নিয়েই সন্তুষ্ট হবে না, তাদের জাল আরও থাকতে পারে।
-মুসা ভাইয়ের ব্যাপারটা আমাদের এতটাই অভিভূত করছিল যে আমরা কিছু ভাবতে পারিনি। তবু আল্লাহর শুকরিয়া যে, তারা তাদের লক্ষ্য হাসিল করতে পারেনি।
-কেন, ফারহানা ………..
-এ যাত্রা তাদের টার্গেট ছিল মধ্য এশিয়া মুসলিম সাধারণতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট কর্ণেল কুতাইবা। আমার অনুমান যদি ভুল না হয়ে থাকে তাহলে বলতে পারি, হেলিকপ্টার থেকে আপনাকে নামতে দেখেই তারা এ অপারেশনের পরিকল্পনা করেছে। লক্ষ্যহীন লোক হত্যার অপারেশন হলে তারা ভোর রাতেই আরেক অপারেশনে আসত।
-আপনি কি মনে করেন, ওরা আশেপাশেই আছে? মুসা ভাইকে কি তাহলে আশেপাশেই পাওয়া যাবে?
-‘না’ আমি তা মনে করি না। মুসা ভাইকে মধ্য এশিয়ার কোথাও রাখার মত জায়গা তাদের নেই। মনে হয়, আশেপাশে তাদের কোন সংঘবদ্ধ লোকও আর নেই। থাকলে এত বড় অপারেশনে তারা মাত্র এ’কজন আসতো না।
হাসান তারিকের হাতে মারা পড়েছিল পাঁচজন ‘ফ্র’ কর্মী, আর এদিকে মারা পড়েছে ওরা সাতজন। ওদের লাশ খামার বাড়ির গোলা ঘরের পাশে এবং প্যাসেজের মুখে দু’পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ওরা এ পথেই বাড়িতে প্রবেশ করতে চেয়েছিল।
কুতাইবা চুপ করে কি যেন ভাবছিল। এসময় আব্দুল্লায়েভ বলল, ‘তারিক ভাই, আয়েশা আপা আহত! ওদিকে। ……….
হাসান তারিক আব্দুল্লায়েভের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। তার কাঁধে হাত দিয়ে ধীর কন্ঠে উচ্চারণ করল, ‘কিন্তু আব্দুল্লাহ তোমার স্ত্রী, তোমার বোন আহত নয়, নিহত।’
-না তারিক ভাই, ওরা নিহত নয়, ওরা শহীদ।
বলতে বলতে আব্দুল্লায়েভের চোখ দিয়ে অশ্রুর দু’টি ধারা নেমে এল। সে তাড়াতাড়ি চোখ দু’টি মুছে বলল, ‘শহীদদের দাফনের ব্যবস্থা করতে হবে। তার আগে আব্বার কাছে একবার ……………’
-যাব চল, তার আগে আয়েশাকে একটু দেখে আসি।
আয়েশা ফারহানার ঘরে চলে গিয়েছিল। হাসান তারিক সে ঘরের দরজায় গিয়ে ছোট্ট একটা কাশি দিল। সঙ্গে সঙ্গে সে ঘর থেকে শিরীন শবনম বেরিয়ে গেল।
হাসান তারিক ঘরে ঢুকল। আয়েশা আলিয়েভা মাথা নিচু করে খাটের উপর বসে ছিল। হাসান তারিক সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, আঘাতটা কেমন, কেমন বোধ করছ এখন?’
আয়েশা কোন জবাব দিল না। ‘ফারহানা আপা চলে গেলেন’ বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।
হাসান তারিক পাশে বসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘আমাদের ধৈর্য্য ধরতে হবে আয়েশা, আল্লাহর পরিকল্পনা আমরা জানি না। খবর পেয়ে আমরা এলাম বিয়ে দিতে। কিন্তু দু জনই এখন আমাদের নাগালের বাইরে।
ওড়নার কোণা দিয়ে চোখ মুছে আয়েশা বলল, ‘তোমাদের বিদায় দিয়ে আমরা এ ঘরেই এসে বসেছিলাম। ফারহানা কাঁদছিল। আমি সান্তনা দিলে ডুকরে কেঁদে উঠল। বলল ‘আমি সহ্য করতে পারছি না আয়েশা। ও কেমন আছে কোথায় আছে –এ প্রশ্নের ছুরি যে আমার হৃদয়কে টুকরো টুকরো করে কাটছে অবিরাম।’
ফারহানার মনকে অন্যদিকে সরিয়ে নেবার জন্যই বোধহয় ওর ভাবী এই সময় বলল, ‘চল খামার বাডি থেকে ঘুরে আসি। আব্বার নাস্তার সময় হয়েছে ছাগলের দুধ দুইয়ে আনতে হবে।’
বলে ওর ভাবী ফারহানাকে টেনে নিয়ে বেরিয়ে গেল। ওরা বেরিয়ে গেলে আমি একটু গা এলিয়ে দিলাম বিছানায়।
মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত। হঠাৎ ওদিকে থেকে ‘আয়েশা’ বলে একটা চিৎকার আমার কানে এল। ফারহানার গলা। আমি সংগে সংগে উঠে বসলাম। ঠিক এ সময় একটা ব্রাশ ফায়ারের শব্দ কানে এল। আমি আমার রিভলবারটা নিয়ে ছুটলাম ওদিকে। প্যাসেজটির মুখে যেতেই দেখলাম কয়েকজন গুলি করতে করতে বাডির ভেতরে ছুটে আসছে, আমি এখানে দেয়ালের কোণায় শুয়ে পডে রিভলভার থেকে ওদের দিকে গুলি করতে লাগলাম। হঠাৎ গুলি বৃষ্টির মুখোমুখি হয়ে ওরা থমকে দাডাল। কিন্তু বৃষ্টির মত গুলি আসতেই থাকল। একটা গুলি এসে আমার কনুই এর নীচে লাগল। গুলিটা বিদ্ধ হয়নি। বাহুর একটা অংশ ছিডে নিয়ে পিছলে গেছে। এ সময় বৈঠকখানার দিক থেকে ছুটে এল ভাই কুতাইবা এবং সাইমুম কর্মীরা।
হাসান তারিক বলল, কর্নেল কুতাইবা ওদের টার্গেট ছিল। আল্লাহ্ এক অপূরণীয় ক্ষতি থেকে মুসলিম মধ্য এশিয়াকে রক্ষা করেছেন। এ সময় আব্দুল্লায়েভ ঘরের সামনে এসে একটা কাশি দিল।
-‘আসছি আবদুল্লাহ’ বলে হাসান তারিক তাড়াতাড়ি উঠে দাড়াল এবং ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
কুতাইবা, হাসান তারিক, আবদুল্লাহ সকলে অসুস্থ বৃদ্ধ আব্দুল গফুরের ঘরে প্রবেশ করল। ইকরামভ আগে থেকেই পিতার পাশে বসে ছিল। পাশে দাঁড়িয়েছিল আব্দুল্লায়েভের মা। এরা ঘরে ঢুকলে আব্দুল্লায়েভের মা ঘরের এক পাশে সরে গেল।
সবাই গিয়ে বৃদ্ধের কাছে তার বিছানার চার পাশে ঘিরে বসল। বৃদ্ধের চোখ দু’টি বোজা। সবারই মুখ নীচু কারো মুখে কোন কথা নেই। আবদুল্লাহ ডাকল আব্বা…..
ধীরে ধীরে বৃদ্ধ চোখ খুলল। চারদিকে একবার চাইল। তারপর চোখ দু’টি স্থির করল কুতাইবার দিকে। কুতাইবার চোখ ছলছল করছে। বিমুঢ় একটা ভাব কিভাবে কথা তুলবে যেন ভেবে পাচ্ছে না।
বৃদ্ধ তার দুর্বল হাত দিয়ে কুতাইবার একটা হাত তুলে নিয়ে বলল, ‘আমি সব জানি তোমরা যা বলবে। আহমদ মুসাকে ওরা নিয়ে গেছে। আমার বৌমা, আমার ফাতিমা চিরতরে হারিয়ে গেছে।’
বৃদ্ধের দু’চোখ থেকে দু’ফোটা অশ্রু নেমে এল। কিন্তু গলা তার একটুও কাঁপল না। সে বলল, ‘আমার আহমদ মুসা ফিরে আসবেই। আল্লাহ্ তার সহায়। আমার মা আর ফিরবে না, না ফিরুক। আয়েশা, শবনম এবং আরও অনেক মা আমি পেয়েছি।’
একটু থামল বৃদ্ধ তারপর আবার শুরু করল, ‘তোমরা বুঝবে না আমার বুকে আজ কত গর্ব। যে দেশের মুক্তি কামনায় আমরা দেশ ছেড়েছি। সে মুক্ত দেশের অধিনায়ক তুমি আমার সামনে। এর চেয়ে বড় আনন্দের আমার আর কিছুই নেই। এখন আমার দুই সন্তান ইকরাম ও আবদুল্লাহ আছে, তাদেরকেও তোমার হাতে তুলে দিলাম।’
বৃদ্ধ আবার চোখ বুজল। হাঁপাচ্ছে সে। অনেক কষ্টে এক নাগাড়ে এতগুলো কথা সে বলেছে। হঠাৎ চোখ খুলল বৃদ্ধ, তার চোখ দু’টি চঞ্চল। কিছু যেন তার মনে পড়েছে। সে আব্দুল্লায়েভের দিকে চেয়ে বলল, ‘বেটা, কাঠের বাক্সের তলায় দেখ রেশমের খাপে একটা তলোয়ার আছে। ওটা বের করে আন।’
আব্দল্লাহ পাশের ঘরে চলে গেল এবং কিছুক্ষণ পর রেশমের খাপে রাখা একটা দীর্ঘ তলোয়ার বের করে আনল।
বৃদ্ধ তলোয়ারটি হাতে নিয়ে খাপ খুলে ফেলল। কুতাইবার দিকে চেয়ে বলল, ‘আজ বহু বছর ধরে এই তলোয়ার আমরা সযত্নে সংরক্ষণ করছি। এ তলোয়ার সাথে জড়িয়ে আছে এক কাহিনী।
যেদিন সন্ধ্যায় কম্যুনিস্ট লাল ফৌজের হাতে বোখারার পতন ঘটে, তার পরদিন সকালে আমাদের মহল্লার রাস্তার পাশে একজন আহত সংজ্ঞাহীন সৈনিককে কুড়িয়ে পাওয়া যায়। তার কোমরে রেশমের খাপে ছিল অসাধারন দীর্ঘ এক তলোয়ার। রাস্তায় দাড়িয়ে ছিল একটি ঘোডা। আমরা বুঝেছিলাম ঐ ঘোড়াই সেই আহত ও সংজ্ঞাহীন সৈনিককে বহন করে আনে। সম্ভবত এখানে এসে সৈনিকটি ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যায়। ঘোড়াও আর প্রভুকে ছেড়ে সামনে এগোয়নি।
শুশ্রুষা করার পর সৈনিকটির জ্ঞান ফিরে আসে। জানতে পারা যায় তার নাম আমীর আব্দুল্লাহ। তিনি বোখারার সেনাধ্যক্ষ আমীর আব্দল্লাহ এ পরিচয় পেয়ে সবাই বিস্মিত হয়ে যায়। সকালে আরও বিস্মিত হয়ে যায় একশ মাইল দুরে এই উজবেক পল্লীতে তার পৌছার কাহিনী শুনে। সেনাধ্যক্ষ আমীর আব্দুল্লাহ বলেছিল, আধুনিক অস্ত্র সজ্জিত বিশাল লাল ফৌজের আক্রমন এবং বিশ্বাসঘাতকদের অন্তর্ঘাত তৎপরতায় নগরীর প্রতিরক্ষা দেয়াল যখন ধ্বসে পড়ে, যখন নগরীর অধিকাংশ এলাকা ওদের হাতে চলে যায়, যখন আমরা বোখারার প্রাণকেন্দ্র মীরই আরব মাদ্রাসা ঘিরে শেষ রক্ষার জন্য লড়াই করছি তখন একটা গুলি এসে আমার বুকের ডান অংশে বিদ্ধ হয়। তারপর কিছু মনে মনে নেই আমার।
আমরা তার জ্ঞান ফিরিয়ে এনেছিলাম, কিন্তু বহু চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারিনি। সেদিনই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর সেই দীর্ঘ তরবারী আমার দাদার হাতে তুলে দেন এবং বলেন, এই তরবারী ইসলামের স্বর্ণযুগের মধ্য এশিয়াকে জাহেলিয়াতের কবল থেকে মুক্তকারী মুসলিম বিজেতা দরবেশ সেনাপতি কুতাইবার। এই তরবারীটি সমরকন্দে মহানবী(সঃ)এর খুলুতাত কুসুম বিন আব্বাসের সৃতি সৌধ শাহ-ই-যিন্দ এ সংরক্ষিত ছিল। লাল ফৌজের হাতে সমরকন্দের পতন হলে এ তরবারী এক সৈনিক নিয়ে এসে আমাকে দেয়। আমার সময় এখন শেষ। এ তরবারী আমি আপনার হাতে দিয়ে গেলাম উপযুক্ত হাতে পৌছে দেবার জন্যে।’
বৃদ্ধ একটু দম নিল। এক নাগাড়ে এত কথা বলায় সে হাপাচ্ছে। তার কপালে দেখা দিয়েছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। আব্দুল্লায়েভ তার পিতার মাথায় ধীরে ধীরে পাখার বাতাস করছিল।
বৃদ্ধ আবার শুরু করল। বলল, ‘আল্লাহু আকবর, আলৌকিকভাবে তরবারীটি আমাদের হাতে পৌছেছে। তা না হলে একজন সংজ্ঞাহীন সৈনিককে একটা ঘোড়া একশ মাইল পথ কিভাবে নিয়ে এল! আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি, হাজার হাজার বছর পর আর এক বিজেতা কুতাইবার হাতে তরবারীটি তুলে দিতে পারলাম। আমি মনে করছি বাবা, নতুন স্বর্ণযুগের যাত্রা শুরুর ইংগিত এটা। আবেগে বৃদ্ধের চোখ দু’টি ছলছল করে উঠল।
কুতাইবা তলোয়ার হাতে নিয়ে ধারের হীরার মত ঔজ্জল্য দেখে মুগ্ধ হোল। চুম্বন করল তরবারিটিকে। তারপর বলল, ‘চাচাজান এ তরবারী গ্রহন করার সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি মুসা ভাই। আমি তার পক্ষে এ তরবারী গ্রহন করলাম।’
বলে কুতাইবা তরবারী হাসান তারিকের হাতে তুলে দিল।
হাসান তারিকও তরবারীটাকে চুম্বন করল। তারপর বলল, ‘চাচাজান আমার মনে হয় সেনাপতি কুতাইবার পর এ তরবারী আর ব্যবহার হয়নি। তা গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল শাহ-ই- যিন্দের শো-কেসে। ঐক্য, সংহতি, শান্তি ও মুক্তির এ তরবারী কোষবদ্ধ হবার পরই মুসলমানদের পতন সুচিত হয় এবং কম্যুনিস্ট লাল ফৌজ সে পতন চুড়ান্ত করে। কম্যুনিস্ট লাল ফৌজের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ইসলামের তরবারী আজ আবার কোষমুক্ত হলো, ইনশাআল্লাহ কোষবদ্ধ হবে না এ তরবারী আর।’
-কিন্তু তারেক ভাই, সেনাপতি কুতাইবার পর কি মধ্য এশিয়ায় কোষমুক্ততরবারী ছিল না?’ জিজ্ঞেস করল আব্দল্লায়েভ।
-হ্যা কোষমূক্ত তরবারী ছিল কিন্তু সে তরবারী ছিল কোন শাসকের কিংবা কোন রাজা বাদশার স্বার্থে। বলল হাসান তারিক ।
-ইসলামের তরবারী এবং একজন মুসলিম শাসকের তরবারীর মধ্য কি কোন পার্থক্য আছে তারিক ভাই?
-পার্থক্য অনেক। একজন মুসলিম শাসকের তরবারী তার রাজ্যের স্বার্থে আরেকজন মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধে ব্যবহার হতে পারে, যেমন অনেক হয়েছে। কিন্তু ইসলামের তরবারী শুধু আল্লাহর জন্যই ব্যবহৃত হয়। অন্যায়ের প্রতিরোধ, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা, ‘মানুষ খোদাদের’ কবল থেকে মানুষের মুক্তি এবং ‘মানুষ প্রভুদের’ রাজত্ব খতম করে আল্লাহর রাজ্যত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যই ইসলামের তরবারী ব্যবহার হয়। এজন্যই ইসলামের তরবারী শান্তির প্রতীক। অন্যদিকে কোন মুসলিম শাসকের তরবারী আল্লাহর বান্দাদের উপর জুলুমের প্রতীক হতে পারে। যার বহু দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে ইতিহাসে।
আব্দুলায়েভের মুখ উজ্জল হয়ে উঠল। আর বৃদ্ধা আব্দুল গফুর যেন কথাগুলো মন্ত্রমুগ্ধের মত গিলছে। ইকরামভ ইতিমধ্যে বাইরে গিয়েছিল। সে ঘরে ঢুকে বলল ‘শহীদদের দাফন….’
ইকরামভকে কথা শেষ করতে না দিয়ে বৃদ্ধা আব্দুল গফুর বলল, ‘আমার শহীদ মা’দের দাফন আমার গোলাপ বাগানে হবে। ফাতিমা গোলাপ বড় ভালবাসত।’
এ নির্দেশ নিয়ে সকলেই বের হয়ে এল ঘর থেকে।
দাফন শেষ হয়েছে এমন সময় আকাশে হেলিকপ্টারের শব্দ পাওয়া গেল। অল্পক্ষণের মধ্যেই অনেকগুলো হেলিকপ্টার শব্দ আকাশে তোলপাড় করে তুলল। কয়েকটি হেলিকপ্টার মাথার উপর চক্কর দিতে লাগল। অধিকাংশই খুব নিচু দিয়ে উড়ে পূর্ব ও উত্তর দিকে চলে গেল। একটা হেলিকপ্টার নেমে এল।
কুতাইবা এবং হাসান তারিকরা আব্দুল গফুরের বৈঠকখানায় বসে অপেক্ষা করছিল। নতুন মধ্য এশিয়া প্রজাতন্ত্রের স্বরাষ্ট্র বিভাগের সেক্রেটারি অয়ারলেসে আগেই জানিয়েছিল, উদ্ধার অভিযানের নেতৃত্ব দিয়ে সাইমুমের ইষ্টার্ন ফ্রন্টিয়ারের অধিনায়ক আনোয়ার ইব্রাহিমকে পাঠানো হচ্ছে। আব্দুল গফুরের বাড়িতে ‘ফ্র’-এর নতুন হামলার পর কুতাইবা অন্যদের সাথে পরামর্শ করে হাসান তারিকদের তিয়েনশান যাত্রা স্থগিত করে দিয়েছিল। জেনারেল বোরিস দেশের ভেতরে এই পূর্বাঞ্চলে ঘাপটি মেরে বসে থাকতে পারে। সুতরাং একটা সার্চ অভিযান না চালিয়ে কিছুটা নিশ্চিত না হয়ে তাদের পাঠানো ঠিক হবে না।
হেলিকপ্টার থেকে নেমে আনোয়ার ইব্রাহিম বৈঠকখানায় এল। সালাম বিনিময়ের পর অশ্রুরুদ্ধ আবেগকে চাপা দিতে গিয়ে আনোয়ার ইব্রাহিম শুরুতে কোন কথাই বলতে পারলনা। কুতাইবা তাকে সান্তনা দিল। হাসান তারিক তার কাঁধে এক ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, ‘ইয়ংম্যান, আমাদের শোককে শক্তিতে পরিনত করতে হবে। এখন প্রতিটা মুহূর্ত আমাদের মূল্যবান।’
আনোয়ার ইব্রাহিম রুমাল দিয়ে চোখ মুছে বলল, ঠিক বলেছেন। তারপর সে কুতাইবার দিকে ফিরে বলল, জনাব, আপনার নির্দেশক্রমে গোটা মাউন্টেন হেলিকপ্টার বহরকে পামির সীমান্তে পাঠানো হয়েছে। সকল রাস্তার সকল পয়েন্টে গাড়ি ও সকল প্রকার যানবাহন সার্চের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সকাল ৭টা থেকে এ আদেশ কার্যকরী হয়েছে। এ ব্যাপারে আমাদের সীমান্ত পর্যন্ত পামির সড়কে বিশেষ পাহারা ও সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। স্থল বাহিনীর কতকগুলো ইউনিট পামির সড়কে টহল দিচ্ছে। পাহাড় জংগলের সম্ভাব্য সকল স্থান চেক করার জন্য গোয়েন্দা বিভাগের বিমান ও স্থল ইউনিটকে কাজে লাগানো হয়েছে। সন্দেহজনক স্থানে প্যারাট্রুপারস নামানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। অল্পক্ষণের মধ্যেই একটা প্রাথমিক রিপোর্ট পাব আশা করছি।
আনোয়ার ইব্রাহিমের কথা শেষ না হতেই তার ওয়ারলেস কথা বলে উঠল। সে কান লাগিয়ে কল রিসিভ করল। শুনতে শুনতে তার মুখটা কেমন যেন অন্ধকার হয়ে উঠল।
গোটা বৈঠকখানায় নিরবতা নেমে এসেছে। সবারই চোখেমুখে একটা উম্মুখ প্রশ্ন। সেই সাথে দুশ্চিন্তার একটা কাল ছায়াও।
আনোয়ার ইব্রাহিম কল রিসিভ শেষ করল। একটু থামল, দম নিল সে। তারপর বলল, আমাদের পামির বায়োলজিক্যাল ইনষ্টিটিউটস্থ ঘাঁটি আজ রাত থেকে বেলা দশটা পর্যন্ত ঘটনার যে সময়ওয়ারী তথ্য সংগ্রহ করেছে, তা থেকে জানাল, মধ্য এশিয়া মুসলিম সাধারণন্ত্রের পতাকাবাহী তিনটি মাউন্টেন ফুড ক্যারিয়ার আজ ভোর রাতে পামির অতিক্রম করেছে। অত্যন্ত দ্রুতগামী ক্যারিয়ারগুলো আজ ভোর ছয়টায় পামির বায়োলজিক্যাল ইনষ্টিটিউট পয়েন্ট পার হয়ে গেছে। কোন কোন পয়েন্ট থেকে কেউ কেউ এ তিনটি ক্যারিয়ারে রুশ সাধারণতন্ত্রের পতাকাও দেখেছে।
থামল আনোয়ার ইব্রাহিম। সবাই চুপচাপ। সবাই যেন ভাবনার এক অতল গভীরে হারিয়ে গেছে।
কথা বলল, প্রথমে হাসান তারিক। বলল, এ ক্যারিয়ার বহর যে জেনারেল বোরিসের আমার মনে হয় এ ব্যাপারে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।
-তাই মনে করো? বলল, কুতাইবা।
-হ্যাঁ, নিশ্চিতভাবে আমি এটা মনে করি। একবার মুসলিম, একবার রুশ পতাকা ব্যবহার থেকেই বুঝা যায়, প্রয়োজনমত সবার চোখকে ধুলা দেবার জন্যই এটা করা হয়েছে এবং বর্তমান অবস্থায় এটা জেনারেল বোরিস হওয়াই স্বাভাবিক।
একটু থেমে হাসান তারিক আবার বলল, ‘এটা আমরা সকলেই জানি জেনারেল বোরিস ছাড়া ‘ফ্র’ পক্ষের আর কেউ এ পথে গাড়ি ঘোড়া নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে পালায়নি।
একটু ভেবে কুতাইবা বলল, ‘ঠিকই বলেছেন আপনি। জেনারেরল বোরিস প্রথমে হেলিকপ্টার নিয়ে পালায়। কিন্তু পরে সে বক্স শহরে হেলিকপ্টার ছেড়ে দিয়ে গোটা পাঁচেক মাউন্টেন ফুড ক্যারিয়ার নিয়ে নেয়। তারই তিনটি হয়তো সে নিয়ে গেছে। কিন্তু একটা জিনিস, সকালের আক্রমন পরিকল্পনায় সে ছিল কিনা?’
-আমার মনে হয়, না। আমি যেটা মনে করছি সেটা হলো, ধরিবাজ ক্রুর বোরিস ধরেই নিয়েছিল এখানে বড় ধরনের আরও শিকার পাওয়া যেতে পারে। এই শিকার পাওয়ার আশায় কিংবা একটা পশ্চাৎবাহিনী হিসেবেই এই গ্রুপকে সে পেছনে রেখে গিয়েছিল।
-তাহলে আমার মনে হয়, আশেপাশে কোথাও জেনারেল বোরিসের অবশিষ্ট দু’টো মাউন্টেন ক্যারিয়ার আমরা পাব। আনোয়ার ইব্রাহিম এ সময় তার ওয়ারলেসে একটা কল রিসিভ করছিল। কুতাইবার কথা শেষ হতেই সে বলল, অবশিষ্ট দু’টো মাউন্টেন ক্যারিয়ারের সন্ধান পাওয়া গেছে। আমাদের একটা সার্চ পার্টি এখানে পামির সড়কের পাশে ও দু’টো খুঁজে পেয়েছে।
-তাহলে আমরা কি এখন নিশ্চিত হতে পারি, জেনারেল বোরিস আমাদের সীমান্ত অতিক্রম করেছে? বলল কুতাইবা।
-ভোর ছ’টায় যদি তাদের পামির বায়োলজিক্যাল ইনষ্টিটিউট পয়েন্টে দেখা গিয়ে থাকে, তাহলে তারা এখন সীমান্ত অতিক্রম না করলেও নিরাপদ অবস্থানে পৌঁছে গেছে।
হাসান তারিক কথা শেষ করল। কেউ কোন কথা বলল না। সবাই চুপ চাপ। কিছুক্ষণ পর মুখ খুলল আব্দুল্লায়েভ। বলল, এবার আমাদের স্থগিত যাত্রা শুরু হতে পারে।
কুতাইবা প্রশ্নবোধকভাবে মুখ তুলল হাসান তারিকের দিকে। হাসান তারিক বলল, আমাদের সময় নষ্ট করা উচিত নয়।
-তাহলে হেলিকপ্টার আপনাদেরকে আমাদের সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে দিক।
-এতে আমরা শত্রুর চোখে পড়া এবং শত্রুর সাবধান হয়ে যাবার সম্ভাবনা থেকে রক্ষা পাবনা। বলল হাসান তারিক।
-তাহলে?
-হেলিকপ্টার আমাদেরকে পামির বায়োলজিক্যাল ইনষ্টিটিউট পর্যন্ত পৌঁছে দেবে, তারপর আইস ক্যারিয়ারে করে যতটুকু যাওয়া যায় গিয়ে আমরা ঘোড়া নিয়ে সামনে এগুব।
-তাই হোক। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। বলল, কুতাইবা। তার শেষের কথাগুলো খুব ভারি শোনাল।
২
প্রবল ঝাকুনির মধ্য দিয়ে জ্ঞান ফিরে পেল আহমদ মুসা। জ্ঞান ফিরে পেয়েই সে তড়িঘড়ি উঠে বসল। চোখে তার একরাশ বিস্ময়। কোথায় সে? ফারহানাদের বৈঠকখানাতো এটা নয়। তাহলে কোথায় সে? স্পষ্টই বুঝতে পারছে, একটা উঁচু-নিচু পাথুরে পথের উপর দিয়ে একটা গাড়ীতে করে তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
চারদিকে অন্ধকারটা একটু ফিকে হয়ে এলে সে বুঝল, খাদ্য দ্রব্য পরিবহনের ইয়ারকন্ডিশন ক্যারিয়ারে চড়ে সে চলছে। চারদিকে বন্ধ। কিছুই বোঝার উপায় নেই যে, কোন পথ দিয়ে কোথায় যাচ্ছে সে। চারদিকে হাতড়িয়ে সে দেখল, গাড়ীর মেঝেতে অনেকগুলো বড় বড় ট্রাংক স্যুটকেশ।
এটা এখন তার কাছে পরিষ্কার, শত্রুর হাতে সে বন্দী। কিন্তু কিভাবে? রাত দশটায় সে ফারহানাদের বৈঠকখানায় ঘুমিয়েছে। তারপর সেখানে কি ঘটেছে?
কি ঘটেছে চিন্তা করতে গিয়েই তার বুকটা কেঁপে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবল বড় কিছু ঘটলে তার ঘুম ভাঙবে না কেন? ঘুমানো অবস্থাতেই শত্রুরা তাকে বন্দী করেছে। অর্থাৎ শত্রুরা এ কাজ করেছে নিরবে, কোন শব্দ বা হৈ চৈ না করে।
এ শত্রু কে? কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাকে?
এ সময় ক্লিক করে একটা শব্দ হলো, সংগে সংগে কেবিনের সামনের দিকে খুলে গেল একটা জানালা। দিনের একরাশ আলো এসে প্রবেশ করল কেবিনে। জানালায় একটা মুখ দেখা গেল। মুখ দেখে চমকে উঠল আহমদ মুসা। একি! জেনারেল বরিস!
জেনারেল বোরিসের ঠোঁটে ক্রুর হাসি। বলল, আমাকে দেখে অবাক হয়েছ আহমদ মুসা? ভাবছ, যে শত্রুর সব শেষ করলে সে আবার তোমাকে এভাবে খাঁচায় পুরল কিভাবে। বলে সে হো হো করে এক অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।
আহমদ মুসার মনে তখন অন্য চিন্তা। রক্তপায়ী, নিষ্ঠুর বোরিসরা আব্দুল গফুর, ফারহানাদের কোন ক্ষতি করেনি তো। এদের আকাশ-স্পর্শী প্রতিহিংসা থেকে তারা তো রক্ষা পাবার কথা নয়। চিন্তাটা তাকে মারাত্মকভাবে পীড়া দিতে লাগল।
জেনারেল বোরিসের মুখ থেকে বের করার জন্যেই বোধহয় আহমদ মুসা প্রশ্ন করল, কাউকে জানতে না দিয়ে কাপুরুষের মত একজন ঘুমন্ত মানুষকে চুরি করেছ, তাতে কৃতিত্বের কি আছে জেনারেল বোরিস?
-তোমাকে মুঠোয় পাওয়ার জন্য কাপুরুষ হতে দোষ নেই।
একটু থামল জেনারিল বোরিস। তারপর বলল, ভেব না, ফাঁদ পেতে রেখে এসেছি, আমি বড় শিকার আরও চাই, ছোট শিকার মেরে আমার এখনকার কোন মূল্যবান বুলেট আমি নষ্ট করতে চাই না।
থামল আবার জেনারেল বোরিস। তারপর হাতের পিস্তলটা তুলে আহমদ মুসাকে তাক করে অত্যন্ত কঠোর কন্ঠে বলল, তুমি আমাকে কাপুরুষ বলেছ, শুনে রাখ ‘ফ্র’ এর কেউ কাপুরুষ নয়। আবার যদি এমন বেয়াদবী কর জিহবা কেটে নেব।
-কাউকে গালি দেওয়া আমার অভ্যেস নয়। তুমি আমাকে কাপুরুষের মত বন্দী করেছ সেই কথা আমি বলেছি।
জেনারেল বোরিস আহমদ মুসার কথা শেষ না হতেই তার রিভালবারের ট্রিগারে চাপ দিল। একটা গুলি আহমদ মুসার কানের পাশ দিয়ে গিয়ে পেছনের দেওয়ালে বিদ্ধ হলো। বোরিসের চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছিল। বলল, আহমদ মুসা, জেনারেল বরিস যা বলে তাই করে, মনে রেখ।
জানালা থেকে সরে গেল জেনারেল বোরিস। আহমদ মুসা কেবিনের চারদিকটা দেখে নিল। ঠিক যা অনুমান করছিল তাই, কেবিনটা ষ্টিলের বড় বড় ট্রাংকে ভর্তি। সামনে একপাশে দেখতে পেল কাঠের একটা বাস্কেট। তাতে কয়েক বোতল পানি এবং কতগুলো প্যাকেট। একটা প্যাকেট ছিড়ে দেখল রুটি। খুব ক্ষুধা পেয়েছিল আহমদ মুসার। রুটি খেতে শুরু করল।
আবার ক্লিক শব্দ করে জানালা বন্ধ হয়ে গেল। ঘুট ঘুটে অন্ধকার হয়ে গেল চারদিকটা। অন্ধকারের মধ্যেই রুটি খাওয়া শেষ করল আহমদ মুসা। অন্ধকারে হাতড়িয়ে বোতল থেকে পানিও খেয়ে নিল।
খাবার পরে একটু আরাম বোধ করল আহমদ মুসা। একটা বড় ট্রাংকে হেলান দিয়ে আরাম করে বসতে চেষ্টা করল সে। কিন্তু প্রবল ঝাকুনি এবং এবং ট্রাংকের ধারালো প্রান্ত তাকে কোন আরাম দিল না।
কোথায় যাচ্ছে সে, কোনদিকে যাচ্ছে? এ অন্ধকারে দিক নির্ণয় সম্ভব নয়। হঠাৎ তাঁর খেয়াল হল, জানালা খুললে সূর্যের আলো জানালার বাম প্রান্তকে বেশী আলোকিত করেছিল। অর্থাৎ সূর্য ডান দিকে রয়েছে। এর অর্থ ডান দিকটা পূর্ব। তাহলে গাড়ি এখন উত্তর দিকে যাচ্ছে।
কোন এলাকা, কোন পথের ওপর দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে এখন? আহমদ মুসা নিশ্চিত দেশের অভ্যন্তরের পথ দিয়ে জেনারেল বোরিস এভাবে চলতে পারে না, সে সুযোগ তার নেই। নিশ্চয় এতক্ষণে সব রাস্তা ব্লক করা হয়েছে, চেক করা হচ্ছে। তাহলে এ পাহাড়ী রাস্তা কোনটি? পামির সড়ক কি! হ্যাঁ পামির সড়কই হতে পারে, আহমদ মুসার মনে হল। রাতারাতি সে যদি পামির সড়কের নিম্নাঞ্চল পার হয়ে এসে থাকে, তাহলে পাহাড়ের উপরের পথটা তার জন্যে নিরাপদই হবে। গাড়ীর উত্তর গতি দেখে এটাই মনে হয় গাড়ি আপার পামিরে উঠে এসেছে।
ভাবতে ভাবতে আহমদ মুসা কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম ভাঙল প্রচন্ড গোলাগুলির শব্দে। গাড়ীর সেই জার্কিং নেই। অর্থাৎ গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। মনটা আহমদ মুসার চঞ্চল হয়ে উঠল। গোলাগুলি হচ্ছে কার সাথে? সাইমুম কি জেনারেল বোরিসের সন্ধান পেয়েছে? তারাই কি এসেছে?
বেশ কিছুক্ষণ গোলাগুলি চলল। তারপর সব নিরব। গাড়িও স্থির দাঁড়িয়ে আছে, চলছে না। ব্যাপার কি? জেনারেল বোরিসরা কি পালাল? প্রতিটা মুহূর্ত এক এক ঘন্টার মত দীর্ঘ মনে হতে লাগল তাঁর।
আরো কিছুক্ষণ গত হলো। আহমদ মুসার অসহনীয় অপেক্ষার একটা মুহূর্তে হঠাৎ কেবিনের দরজা খুলে গেল। বিকেলের হলুদ রোদ চোখটা তাঁর বাঁধিয়ে দিল, কিন্তু এক পশলা ঠান্ডা ও মুক্ত বাতাসের স্পর্শ খুবই ভাল লাগাল আহমদ মুসার।
কেবিনের দরজার সামনে উদ্যত ষ্টেনগান হাতে দু’জন দাঁড়িয়েছিল। একপাশে পিস্তল হাতে জেনারেল বোরিস দাঁড়িয়ে। গোলাগুলির শব্দ শুনে যে আশাটুকু আহমদ মুসার মনে জেগেছিল, তা দপ করে নিভে গেল।
রিভালবার নাচাতে নাচাতে জেনারেল বোরিস বলল, তাড়াতাড়ি নেমে এস আহমদ মুসা। আহমদ মুসা নামল।
নেমে চারদিকে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে শিউরে উঠল আহমদ মুসা। গাড়ি থেকে আট-দশ গজ দুরে বুলেটে ঝাঝরা অনেকগুলো লাশ পড়ে আছে। একজন মুমূর্ষ মানুষ তখনও কাতরাচ্ছে আর আল্লাহ পানি, আল্লাহ পানি বলে চিৎকার করছে।
ঐ মুমূর্ষ মানুষের কাতরানি শুনে আহমদ মুসার গোটা দেহে অসহনীয় এক জ্বালা ছড়িয়ে পড়ল। দেহের মাংসপেশীগুলো যেন রোষে ফুলে উঠল।
আহমদ মুসা জ্বলন্ত দৃষ্টিতে একবার বোরিসের দিকে তাকাল। তারপর স্থির কন্ঠে বলল, জেনারেল বোরিস, ঐ মুমূর্ষ মানুষকে পানি দাও।
-কেন, ওর আল্লাহ ওকে পানি খাওয়াবে না? ক্রুর হাসিতে ফেটে পড়ল জেনারেল বোরিস।
-ঠিক আছে আমাকেই খাওয়াতে দাও।
জেনারেল বোরিস যেন একটু চিন্তা করল। তারপর বলল, স্বজাতির জন্যে খুব মায়া না?
-স্বজাতি নয়, মানুষের জন্যে।
জেনারেল বোরিস কিছু বলল না। একজনকে ইশারা করে বলল, আহমদ মুসাকে পানির বোতল এনে দাও, পানি খাইয়ে কিছু পূণ্য কামাবে।
আহমদ মুসা পানির বোতল নিয়ে এগিয়ে গেল সেই মুমূর্ষ লোকটির কাছে। পানির বোতলের দিকে চোখ পড়তেই রাজ্যের তৃষ্ণা নিয়ে লোকটি মাথা তুলল।
আহমদ মুসা এক হাতে লোকটির মাথা তুলে ধরে, অন্য হাতে পানির বোতল তার মুখে ধরল।
এমন সময় পাশে দাঁড়ানো জেনারেল বোরিস এক লাথি মারল পানির বোতলে। আহমদ মুসার হাত থেকে ছিটকে বেরিয়ে গেল পানির বোতল।
আহমদ মুসা স্প্রিং এর মত বিদ্যুৎ গতিতে উঠে দাঁড়াল। জেনারেল বোরিস কিছু বুঝার আগেই এক ঝটকায় তার হাত থেকে রিভলভার কেড়ে নিল। কিন্তু পরক্ষণেই পেছন দিক থেকে স্টেনগানের বাটের প্রচন্ড এক আঘাত এসে পড়ল আহমদ মুসার রিভলভার ধরা হাতে। ছিটকে পড়ে গেল রিভলভার।
জেনারেল বোরিস তাড়াতাড়ি রিভলভারটি কুড়িয়ে আহমদ মুসার মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। আগুন ঝরা কন্ঠে বলল, এর শাস্তি যে কি তুমি কল্পনা করতে পার না আহমদ মুসা। কিন্তু আমি তোমাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই। তুমি ‘ফ্র’ এর এক বিরাট পুঁজি। ‘ফ্র’ এক বড় ব্যবসায় করবে তোমাকে দিয়ে।
তবে বেয়াদবির শাস্তির তোমাকে পেতে হবে।
বলে সে পাশের লোককে বলল চাবুক লাগাও। মন থেকে মানুষের জন্যে ওর মায়া দূর হোক।
লোকটা দ্রুত পাশের গাড়ি থেকে চাবুক এনে তিনটি চাবুক লাগাল আহমদ মুসার পিঠে।
চামড়ার চাবুক পিঠে কিভাবে কতটুকু বসে গেল জামা গায়ে থাকায় তা বুঝা গেল না। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে জামা রক্তে ভিজে গেল। আহমদ মুসা পাথরের মত স্থির দাঁড়িয়ে চাবুকের তিনটি আঘাত গ্রহন করল। মুখে সামান্য পরিবর্তনও তার এল না।
জেনারেল বোরিস হেসে বলল, ধন্যবাদ তোমাকে আহমদ মুসা, এ আঘাতে হাতিও চিৎকার করত।
আহমদ মুসা বলল, জেনারেল বোরিস, এই যে নিরীহ মানুষকে তুমি পশুর মত হত্যা করলে, এর শাস্তি থেকে তুমি রেহাই পাবে না মনে রেখো।
-পারলে কেউ ছেড়ে কথা বলবে না আমি জানি, কিন্তু বিশ্বাস কর, ওদের না মেরে উপায় ছিল না। মুখে শয়তানের মতো ক্রুর হাসি টেনে বলল জেনারেল বোরিস।
একটু দম নিয়ে আগের কথার রেশ টেনে সে বলল, আমাদের গাড়ি তো আর চলবে না, তাই তাদের ঘোড়াগুলো আমাদের খুব দরকার। জীবিত থাকতে তো ওদের ঘোড়া নেয়া যাবে না, তাই ওদের মারা। তুমিই বল, হেঁটে গেলে কাশগড়ে যেতে আমাদের কতদিন লাগত।
কথা শেষ করে জেনারেল বোরিস একটু সরে গিয়ে তার লোকজনদের কি যেন র্নিদেশ দিল। এদিকে গাড়ি থেকে মাল সামান নামিয়ে ঘোড়ার পিঠে বোঝাই করা হচ্ছিল।
র্নিদেশ দিয়ে জেনারেল বোরিস গাড়িতে চলে যাবার পর চারজন লোক এসে আহমদ মুসাকে বাঁধল। তার দু’হাতকে শরীরের সাথে রেখে পা থেকে কাঁধ পর্যন্ত প্লাষ্টিক কর্ড দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে বাঁধা হলো। তারপর মাল-সামানের সাথে ঘোড়ার পিঠে বেঁধে রাখা হলো তাকে।
চারটি ঘোড়ার পিঠে মাল-সামান সাজিয়ে অন্য চারটি ঘোড়ায় দু’জন করে উঠল। অবশিষ্ট একটি ঘোড়ায় উঠল জেনারেল বোরিস। মাল-সামান বোঝাই ঘোড়া মাঝখানে রেখে ৯ ঘোড়ার কাফেলা ছোট তারিম নদী উপত্যকা ধরে কাশগড়গামী ঐতিহ্যবাহী পথে যাত্রা করল।
ছোট তারিম নদী আসলে একটা পাহাড়ী ঝর্ণা। ঝর্ণা হলেও বেশ প্রশস্ত এবং স্থানে স্থানে বেশ গভীর। এ পাহাড়ী নদীটি পামির থেকে উৎপন্ন হয়ে দীর্ঘ পাহাড়ী পথ অতিক্রম করে সিংকিয়াং-এর তাকলামাকান মরুভুমির পশ্চিম প্রান্ত দিয়ে প্রবাহিত চীনের দীর্ঘতম নদী তারিমে গিয়ে মিশেছে। লোকে একে তারিমের নামেই ছোট তারিম বলে ডাকে।
