মিখাইল প্রেত্রভ এবং কুতাইবাদের নিয়ে বিমানটা যখন বোখারা বিমান বন্দরে পৌছাল তখন ১টা। বিমান বন্দরে তাদের স্বাগত জানাল আহমেদ মুসা, হাসান তারিক, আলী ইব্রাহিম, আলদর আজিমভ প্রমুখ সাইমুম নেতারা।
সবাই এসে উঠলো সরকারি অতিথি ভবনে। বিমান বন্দর থেকে আসার পথেই তারা ইমাম বোখারী মসজিদের আজান শুনল। সরকারী অতিথি ভবন থেকে দূরে নয় ইমাম বোখারীর বিখ্যাত মাদ্রাসা ও মসজিদটা। সবাই ওখান থেকে নামায পড়ে এল। তারপর খাওয়া দাওয়া শেষ করল।
আহমদ মুসা অতীতের স্মৃতি বিজড়িত ইমাম বোখারীর বিখ্যাত মাদ্রাসা চত্বরকেই ক্ষমতা গ্রহণের মঞ্চ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। সকাল থেকেই লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠেছে মাদ্রাসার গোটা এলাকা। কাজাকিস্তান ও উজবেক এলাকা থেকে দলে দলে লক এসে হাজির হয়েছে বোখারায়।
উঁচু প্রাচীর ঘেরা ইমাম বোখারী মসজিদে নেতৃবৃন্দ অবস্থান করছেন। মাদ্রাসার বিশাল গেটের বাইরে মঞ্চ সাজানো হয়েছে। সামনের জায়গাটা পরিষ্কার করে বিশাল ময়দানে পরিণত করা হয়েছে।
ঠিক আসরের নামাযের পরেই অনুষ্ঠান শুরু হল। আসর নামাযের পর মানুষ বসেছিল, সেই বসা থেকে তাদের আর উঠতে হল না। কোরআন শরীফ তেলাওয়াতের মাধ্যমে শুরু হল অনুষ্ঠান। কোরআন তেলাওয়াত করলেন ইমাম বোখারী মাদ্রাসার তরুণ মোহাদ্দেস সাইমুমের কর্মী হাফেজ মহিউদ্দিন বোখারী। তাঁর দরাজ কণ্ঠের প্রাণ স্পর্শী তেলাওয়াত লাখো জনতার মাঝে এক অভূতপূর্ব ভাবাবেগের সৃষ্টি করল। অনেকেরই মন চলে গিয়েছিল সুদূর অতীতে। এই বোখারায় এমন মুক্ত কণ্ঠের তেলাওয়াত একদিন হতো। তারপর কতদিন তা আর শোনা যায়নি। কে জানত আবার তা যাবে শোনা এমন করে। আল্লাহ্র অশেষ রহমত। তিনি ইমাম বোখারির বোখারাকে, ইমাম মুসলিমের বোখারাকে এবং লাখো মুসলিমের বোখারাকে আবার মুক্ত করেছেন। অনেকের চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল।
কোরআন তেলাওয়াত শেষ হলে আহমদ মুসা মাইকে দাঁড়ালেন। লাখো উদ্বেলিত জনতার উদ্দেশ্যে সালাম জানিয়ে তিনি বললেন, ‘আজ শুকরিয়া জ্ঞাপনের দিন। আপনারা রাব্বুল আলামিনের প্রশংসা-কীর্তন করুন। আর আজ আমাদের নেতা মুহাম্মাদ রসুল্লাহকে মুক্ত কণ্ঠে হৃদয় ভরে সালাম জানাবার দিন। আপনারা তার জন্য দুরুদ পাঠ করুন। মুক্ত মধ্য এশিয়ার মুক্ত এই বোখারা নগরীতে মুসলিম সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আমরা সমবেত হতে পেরেছি আল্লাহর অশেষ দয়ার ফলেই এবং তার নবী (স) এর পথ অনুসরণের মাধ্যমেই। এই মহানগরীর পতনের মাধ্যমেই একদিন এই ভূখণ্ডে দু’শ বছরের মুসলিম শাসনের পতন ঘটেছিল, গলায় নেমে এসেছিল আমাদের পরাধীনতার শৃঙ্খল। আজও চোখে ভাসছে, এই মহানগরীর পতনের শেষ মুহূর্তে ধন-সম্পদ রক্ষায় আকুল, প্রাণ ভয়ে ভীত দুর্বল ঈমানের শাসকরা পালিয়েছেন কিন্তু এই মাদ্রাসা চত্বরে মুজাহিদরা এক হাতে কোরআন জড়িয়ে, অন্য হাতে তলোয়ার নিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন লাল ফৌজের সাথে। তাঁরা শেষ রক্ষা করতে পারেননি। তাদের পতাকা ভূলুণ্ঠিত হয়েছিল। সেই ভূলুণ্ঠিত পতাকা আজ আমরা তুলে ধরব আবার। এই পতাকা তুলে ধরবেন সাইমুম নেতা, কর্নেল কুতাইবা। নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত তিনই দেশকে নেতৃত্ব দেবেন আপনাদের অনুমতি নিয়ে। আপনারা সম্মত আছেন?
লক্ষ্য লক্ষ্য হাত উপরে উঠলো। ধ্বনি উঠলো লক্ষ্য কণ্ঠে, নারায়ে তাকবীর, আল্লাহ্ আকবর, আহমদ মুসা জিন্দাবাদ, কর্নেল কুতাইবা জিন্দাবাদ, সাইমুম জিন্দাবাদ।
জনতার কণ্ঠ নীরব হয়ে এলে আহমদ মুসা বলল, আমি ভাই কুতাইবাকে জনতার সামনে দাঁড়িয়ে তার দায়িত্ব গ্রহণের জন্য অনুরোধ করছি।
কুতাইবা কাঁদছিল। কয়েকজন ধরে তাকে মাইকের সামনে নিয়ে এল। সে আহমদ মুসাকে জড়িয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো। কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বলল, মুসা ভাই আপনি সরে দাঁড়াবেন না। এ দায়িত্ব আপনার। আমার উপর জুলুম করবেন না।
আহমদ মুসা তার কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল, ভাই আন্দলনের তরফ থেকে যার উপর যে দায়িত্ব আসবে তা গ্রহণ করতে পিছপা না হওয়াই তো ইসলামের শিক্ষা। তুমি না ইসলামের সৈনিক! এমন দুর্বল হলে চলবে কেন?
বলে তাকে মাইকে দাঁড় করিয়ে দিল আহমদ মুসা। কুতাইবা অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে বিসমিল্লাহ বলে সংক্ষেপে শুধু এইটুকু বলতে পারল, ‘আমাদের নেতা মুসা ভাইয়ের কণ্ঠে যে দায়িত্বের ঘোষণা হয়েছে, যে দায়িত্বের জন্য আপনারা আমাকে সমর্থন করেছেন, আল্লাহকে হাজির-নাজির জেনে তাঁর সাহায্যের উপর ভরসা করেই সে দায়িত্ব আমি গ্রহন করলাম। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।’
কুতাইবা সরে এল মাইক থেকে। প্রথমেই আহমদ মুসা তাকে জড়িয়ে ধরে স্বাগত জানাল। তারপর একে একে এল হাসান তারিক, আলদর আজিমভ, আনোয়ার ইব্রাহিম, আলী ইব্রাহিম প্রমুখ সাইমুম নেতারা। সবশেষে রুশ সাধারণ তন্ত্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মিখাইল প্রেত্রভ কুতাইবার একটা হাত তুলে নিয়ে চুমু খেয়ে তাকে স্বাগত জানাল।
এরপর রুশ সাধারণ তন্ত্রের পক্ষ থেকে মিখাইল প্রেত্রভের কথা বলার পালা।
মিখাইল প্রেত্রভ মাইকে এলেন। জনতাকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বললেন, আপনাদের আবেগ-অনুভুতি, আপনাদের উৎসাহ উদ্দীপনা এবং স্বাধীনতা-প্রীতি, আপনাদের নৈতিকতা, চরিত্র এবং ইতিহাস সৃষ্টি আমাকে অভিভূত করেছে। রুশ সাধারণতন্ত্রের পক্ষ থেকে আপনাদের মধ্য এশিয়া মুসলিম সাধারণতন্ত্রের সরকার এবং জনগণকে আমি স্বাগত জানাচ্ছি এবং আপনাদের স্বাধীনতাকে আমি অভিনন্দিত করছি। এই সাথে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে অব্যাহত সুসম্পর্ক ও সহযোগিতা রক্ষা করে চলার ব্যাপারে রুশ সাধারণতন্ত্রের পক্ষ থেকে আমি প্রতিশ্রুতি দান করছি।
কথা শেষ করলেন মিখাইল প্রেত্রভ।
তিনি মাইক থেকে সরে এলেন। আহমদ মুসা তাকে জড়িয়ে ধরে স্বাগত জানালেন। তারপর কুতাইবাও।
এরপর লক্ষ কণ্ঠের তকবীর ধ্বনির মধ্য দিয়ে এশিয়া মুসলিম সাধারণতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট কর্নেল কুতাইবা কালেমা খচিত পতাকা উত্তোলন করলেন। আহমদ মুসার কান্না বিজড়িত এবং হৃদয় নিংড়ানো মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হল মধ্য এশিয়া মুসলিম সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অনুষ্ঠানটি।
অনুষ্ঠানের ডায়াস থেকে নামছিলেন আহমদ মুসা। এমন সময় আহমদ মুসার সেক্রেটারি হিসেবে নিযুক্ত আবু আমর একটা চিঠি দিলেন তাঁর হাতে। ডায়াস থেকে নেমে খাম খুলে দেখল ফাতিমা ফারহানার চিঠি। চিঠি দেখেই চমকে উঠলো, কোন খারাপ খবর নয় তো।
পড়ল চিঠি। চিঠিতে ফারহানা লিখেছে তার পিতা খুবই অসুস্থ, দ্রুত অবস্থার অবনতি ঘটছে। তার পিতা দেখতে চায় একবার আহমদ মুসাকে। আহমদ মুসা চিঠিটা কুতাইবার হাতে দিল। কুতাইবা পড়ে তা হাসান তারিকের হাতে দিল।
কুতাইবা বলল, মুসা ভাই হেলিকাপ্টার নিয়ে আজই চলে যান আপনি। হাসান তারিক বলল, ব্যবস্থা তাহলে করে ফেলি মুসা ভাই?
আহমদ মুসা মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বলল, বেশ কর।
৮
আল্লাবখশ গ্রামের মাঝখানে কম্যুনিটি ময়দানে আহমদ মুসার হেলিকপ্টার গিয়ে নামল। গ্রামে এই প্রথম একটি হেলিকপ্টারের অবতরণ। গ্রামের বহু লোক সেখানে জমা হয়েছে। আবদুল্লায়েভ এবং ইকরামভও সেখানে এসছে। সকলের মনেই জিজ্ঞাসা কে আসছে?
ছোট্ট এটাচিকেস হাতে আহমদ মুসা নামল হেলিকপ্টার থেকে। এখানে কারও সে পরিচিত নয়। শুধু ইকরামভ তাকে চিনল। বড় ভাই আবদুল্লায়েভ কে বলল, ইনিই আহমদ মুসা।
শুনেই আবদুল্লায়েভ দ্রুত সেদিকে ছুটল। কাছে গিয়ে বলল, মুসা ভাই আমি আবদুল্লায়েভ, ফারহানার বড় ভাই।
আহমদ মুসা তাকে জড়িয়ে ধরল। বলল, দেখা এতদিন হয়নি কিন্তু আপনাকে জানি, বহু শুনেছি আপনার তৎপরতার কথা।
ইকরামভ কাছে আসতেই আহমদ মুসা তাকে জড়িয়ে ধরল। কপালে চুমু খেয়ে বলল, এতদিন পরে মুসা ভাই?
-জান তো, কেমন অবস্থায় কেটেছে দিন, বলে তিনজন চলতে শুরম্ন করল। ইকরামভ আহমদ মুসার হাত থেকে এটাচি কেস নিজের হাতে নিয়েছে।
চলতে চলতে আহমদ মুসা আবদুলস্নায়েভকে বলল, আব্বা কেমন আছেন?
-ভাল নয়, গতকাল থেকে কথাও ভাল করে বলছেন না।
-এই অবস্থায় হাসপাতালে নেয়াই ভাল হবে।
-কিন্তু উনি কিছুতেই রাজী হন না।
-আপনারা রাজী থাকলে আমি কালই হেলিকপ্টারে তাঁকে তাসখন্দ নিয়ে যেতে চাই।
-ফারহানাও যদি রাজী হয় আমরা খুশীই হব।
-কেন ফারহানা রাজী নয়?
-তার কথা হল, আব্বা যা চান না, তাঁর জীবনের শেষ কালে তা করা আমাদের উচিত নয়।
-ঠিক আছে দেখা যাবে।
আহমদ মুসাকে এনে তুলল তারা আগের সেই বৈঠকখানাতেই। তবে এবার বৈঠকখানা কিছু বদলেছে। ফরাশের বদলে চেয়ার-টেবিল, সাধারণ খাটিয়ার বদলে সুন্দর খাট।
আহমদ মুসা বলল, অনেক পরিবর্তন তো দেখছি আবদুল্লায়েভ?
-হ্যাঁ, এগুলো ফারহানার কাজ। আমরা আব্বাকে বুঝাতে পারিনি, সেই আব্বাকে মতে এনে এসব করেছে।
বৈঠকখানায় বসে আহমদ মুসার মনে পড়ল প্রথম দিনের কথাগুলো।
মাত্র একদিনই সে এদের মাঝে ছিল। কিন্তু এক দিনই এই পরিবারের সাথে যেন সে এক হয়ে গেছে। বৃদ্ধ আবদুল গফুর তাকে তার হারানো ছেলের মতই স্নেহ করে। যাবার দিন ইকরামভের অশ্রুর কথা তার আজও মনে আছে। আর ফারহানা? চিন্তা করতে আর সাহস হল না আহমদ মুসার।
আবদুল্লায়েভ এবং ইকরামভ ভেতরে গিয়েছিল। বৈঠকখানার ভেতরে দরজার ওপাশে পায়ের শব্দ হলো। পর মুহুর্তে সালাম দেয়র শব্দ ভেসে এল ওপাশ থেকে। ফারহানার গলা।
আহমদ মুসা সালাম নিয়ে বলল, কেমন আছ ফারহানা?
-আপনার দোয়ায় ভাল আছি।
-আয়েশা-রোকাইয়েভাদের খবর শুনেছ?
-জী।
ফারহানা একটু থেমেই বলল, আপনাকে যদি মোবারকবাদ দিতে চাই তাহলে কি দোষ হবে?
-কেন, কি মোবারকবাদ?
-মনে আছে নিশ্চয়, এই বৈঠকখানাতেই একদিন আমি এই বিপ্লবকে অসম্ভব বলেছিলাম। আল্লাহর কি ইচ্ছা সেই বিপ্লব সফল করেই আপনি এই বৈঠকখানায় আবার এলেন।
-এ বিপ্লব তো তোমরা সবাই মিলে করেছ। আমার মোবারকবাদ তোমরা নিলে তোমাদের মোবারকবাদ আমার নিতে আপত্তি নেই।
-এ বিনয় আপনার মহত্ব। ফারহানার কন্ঠে যেন অনেকটা ভারী।
আহমদ মুসা কথা পাল্টিয়ে বলল, তুমি নাকি তোমার আব্বাকে হাসপাতালে পাঠাতে রাজী হচ্ছো না?
-আমি হচ্ছি না নয়, আব্বা রাজী নন। আমি তার পক্ষেই কথা বলেছি।
-এখন আমি যদি ওঁকে তাসখন্দ নিয়ে যেতে চাই?
একটু চুপ থেকে ফারহানা বলল, আপনার মতের বাইরে আমার কোন মত নেই। মনে হলো ফারহানার কথাগুলো তার হৃদয়ের কোন অন্ত্মস্থল থেকে বেরিয়ে এল।
আহমদ মুসার হৃদয়টা কেঁপে উঠল। একজন নারী কখন আরেকজনের উপর এমন করে তার সব মত, সব অধিকারকে সঁপে দেয়। আহমদ মুসা হঠাৎ করে কোন কথা বলে উঠতে পারল না। একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, তোমার আব্বার কাছে যেতে চাই, আবদুল্লায়েভকে বল। আবদুল্লায়েভের সাথে আহমদ মুসা আবদুল গফুরের ঘরে প্রবেশ করল।
আবদুল গফুর শুয়েছিল। খুব দুর্বল সে, আহমদ মুসা পাশে গিয়ে বসল। আবদুল্লায়েভ তার আব্বার মাথার কাছে গিয়ে বসল। আব্বা, আমাদের আহমদ মুসা ভাই এসেছেন।
কয়েকবার বলার পর বৃদ্ধ আবদুল গফুর চোখ খুলে বলল, কে কি বললি, আহমদ মুসা! কোথায় আমার বাবা?
আবদুল্লায়েভ বৃদ্ধের মাথা একটু উচু করে তুলে ধরল। আহমদ মুসার দিকে চোখ পড়তেই বলল, বাবা তুমি এসেছ? এস বাবা………..
বলে দু’টি হাত উঁচু করল বৃদ্ধ।
আহমদ মুসা তার আরও কাছে এগিয়ে গেল।
বৃদ্ধের দুর্বল একটি হাত উঠে এলো উপরে। হাত বুলাল সে আহমদ মুসার মাথা, মুখ এবং গায়ে। বুলাতে বুলাতে বলল, গত সন্ধ্যায় রেডিওতে তোমার বক্তৃতা শুনেছি বাবা। আঃ কি আনন্দ। আজ আমি যদি যুবক হতাম, চিৎকার করে ঘুরে বেড়াতাম সারা অঞ্চলটা। বলতাম, মুসলমানরা মরে না। মরার জাতি নয় তারা।
প্রায় চিৎকার করে উঠেছিল বৃদ্ধের কন্ঠ। ক্লান্ত হয়ে পড়ল। সে ধুকল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে বলল, আমার আল্লারাখা আজ জীবিত আছে কিনা জানি না। মরে গেলেও আজ তার আত্মা শান্তি পাবে। তোমরা সবাই তার জন্য দোয়া করো। বলতে বলতে বৃদ্ধের চোখ থেকে নেমে এল দু’ফোটা অশ্রু।
আবার থামল আবদুল গফুর। তারপর সে ধীরে ধীরে চোখ তুলল আহমদ মুসার দিকে। তাকিয়ে দেখল অনেক্ষণ। আহমদ মুসা বৃদ্ধের একটা হাত তুলে নিয়ে বলল, বলবেন কিছু?
-তুমি অনেক বড়, অনেক বড়, অনেক বড়, তা না হলে একটা কথা তোমাকে বলতাম।
-আমাকে লজ্জা দেবেন না, মানুষ হিসেবে কেউই বড় ছোট নয়। বলুন আপনার কথা।
-বলব? বলে বৃদ্ধ চোখ বুজল, কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে চোখ খুলল। চারদিকে তাকাল। দেখল সে আবদুল্লায়েভকে, ইকরামভকে। সবাইকে ছাপিয়ে তার চোখ গিয়ে পড়ল দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা ফারহানার উপর। বৃদ্ধ ডাকল, মা ফারহানা তুমি এসো তো মা।
দু’বার ডাকতেই চাদরে গা-মাথা ঢেকে মাথা নীচু করে সলজ্জ পদক্ষেপে পিতার মাথার কাছে এসে দাড়াল ফারহানা।
বৃদ্ধ ফারহানার একটা হাত হাতে নিয়ে বলল, এই আমার ফাতিমা ফারহানা। আমার আদরের ধন। মহানবী (স) এর মেয়ের নামের সাথে মিলিয়ে এর নাম রেখেছিলাম। সীমাহীন আদর দিয়ে গড়েছি আমার এই মাকে। এই মায়ের দায়িত্ব নেবার কথা কি আমি তোমাকে বলতে পারি বাবা?
আহমদ মুসা মাথা নীচু করে বসেছিল। বৃদ্ধের এই কথার জবাব কোন কথা হঠাৎ তার মুখে জোগাল না। নীরবতার মধ্যে দিয়ে তিল তিল করে বয়ে চলল সময়। সবাই মাথা নীচু ফারহানার দু’গন্ড বয়ে নেমেছে অশ্রুর ঢল।
ধীরে ধীরে মুখ খুলল আমহদ মুসা। মাথা নীচু করেই জবাব দিল, নেব আমি আপনার ফারহানাকে। কিন্তু আব্বা আমি যাযাবর, আমার কোন ঠিকানা নেই। আপনার আদরের ধন কি সুখী হবে আমার কাছে?
শেষের কথাগুলো আহমদ মুসার ভারী হয়ে ভেঙে পড়ল।
‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে বৃদ্ধ উঠে বসতে চেষ্টা করল, আবদুল্লায়েভ তাকে ধরে বসিয়ে দিল। বৃদ্ধ দু’টি হাত উপরে তুলে বলল, হে আল্লাহ! তুমি রহিম, তুমি রহমান। হযরত ফাতিমা (রা) এবং হযরত আলী (রা) এর মতই এদের জীবনকে তুমি সুখী কর, শান্তিময় কর, সুন্দর কর!
আহমদ মুসা, ফাতিমা ফারহানা, আবদুল্লায়েভ, ইকরামভ এবং আড়াল থেকে আবদুল্লায়েভের স্ত্রী এবং আবদুল্লায়েভের মা সবাই বৃদ্ধের সাথে হাত তুলেছিল। মুনাজাত শেষে উঠতে উঠতে আহমদ মুসা বলল, আব্বা আমি তাসখন্দকে জানিয়ে দিচ্ছি কালকেই কুতাইবারা আসবে। বিয়ের ব্যবস্থাটা ওরাই করবে।
বলে আহমদ মুসা বেরিয়ে এল ঘর থেকে। তার সাথে চলে এল আবদুল্লায়েভ এবং ইকরামভও।
তারা বেরিয়ে গেলে আবদুল্লায়েভের স্ত্রী এসে অশ্রুরুদ্ধ ফারহানাকে ধরে নিয়ে গেল। যেতে যেতে বলল, পরম পাওয়ার কান্না বুঝি তাহলে এতই হয়।
