দু হাতে মুখ ডেকে কাঁদছিল ফায়জাভা। নিঃশব্দ কান্না।
রশিদভের কাহিনী বলছিল তুঘরীল তুগান। তার চোখের নীচে ঘুকিয়ে যাওয়া অশ্রুর দাগ। সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে কথা বলছিল সে। তার শুন্য দৃষ্টি জানালা দিয়ে বাহিরের দিকে নিবদ্ধ। বলছিল সে, নিজের কথা স্বীকার করল কিন্তু বলল না তার সাথে কেউ ছিল।
চুপ করল তুঘরীল তুগান। চোখ বন্ধ করে কিছু ভাবল। তার পর চোখ খুলে সোজা হয়ে বসল। একটু ঝুঁকে পড়ে ডাকল, মা ফায়জাভা!
ফায়জাভা মুখ তুলল। অশ্রু ধোয়া তার মুখ।
তুঘরীল তুগান বলল, তাদের গোয়েন্দা কর্মীর দেহ থেকে দ্বিতীয় যে গুলী পাওয়া গেছে, সেটা আমার পিস্তলের সে ব্যাপারে তারা নিশ্চিত। সে গুলী ছুড়ল তা তারা বের করবেই। আমাকে যে তারা ছেড়েছে এটা তাদের সাময়িক কৌশল।
একটু থামল তুঘরীল তুগান, একটু ঢোক গিলল। আর একটু নড়ে-চড়ে বসে বলল, মা ফায়জাভা, তোকে নিয়ে আজ রাতেই কোথাও চলে যেতে চাই।
ফায়জাভা চমকে উঠল। মুখ তুলে বলল, কেন আব্বা?
রশিদভের মতই তোকে তারা নিয়ে যাবে, আমি তা সইতে পারবোনা। বলে দুহাতে মুখ ঢাকল তুঘরীল তুগান। শক্ত ও কঠোর প্রকৃতির তুঘরীল তুগান শিশুদের মত কেঁদে উঠল।
ফায়জাভা উঠে এল। পাশে দাঁড়িয়ে পিতার মাথায় বুলিয়ে বল, তুমি কিছু ভেবনা আব্বা, আমি কোন কিছুকেই ভয় করি না। ‘চুপ কর’, বলল তুঘরীল তুগান, ‘আমি জীবিত থাকতে তোর গায়ে কেউই হাত তুলতে পারে না, আমি তা হতে দেব না। আজ রাতেই আমরা চলে যাব এখান থেকে।’
পিতার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে ফায়জাভা বলল, কোথায় যাব আব্বা?
-জানি না। কেন এত বড় দেশে তোকে নিয়ে মাথা গুজবার এতটুকু জায়গা কোথাও পাবনা ?
এই কষ্টের মধ্যেও হাসি পেল ফায়জাভার। তার আব্বা অবুঝ হয়ে গেল নাকি? কম্যুনিস্ট দেশে সরকার সর্বনিয়ন্তা। তার সাথে বিরোধ করে কেউ এখানে বাঁচার অধিকার পায় না, নিরাপদ জায়গা তার আবার কোথায় মিলবে? আমরা কি দেশ ত্যাগ করতে পারব?
-প্রয়োজন হলে তাই করবো। আমাদের পুর্ব পরুষেরা এই কম্যুনিস্টদের অত্যাচারে, তাদের হাত থেকে নিজেদের ঈমান আকীদা রক্ষার জন্য লাখ লাখ সংখ্যায় দেশ ত্যাগ করেছে। আমরা তাদের পথ অনুসরন করব।
-কিন্তু সাইমুমেরা তো দেশের ভেতরে থেকেই দেশকে, জাতিকে মুক্ত করার জন্য কাজ করছে। বলল ফায়জাভা।
-আমার যেটুকু বোঝার বাকী ছিল রশিদভ তা বুঝিয়ে দিয়ে গেছে। ওদের পাশে দাঁড়াতে পারলে গৌরব বোধ করব।
ফায়জাভা কিছু বলতে যাচ্ছিল। এমন সময় দারোয়ান এসে দরজায় দাঁড়াল। তার সাথে তিনজন পুলশি অফিসার।
পুলিশ অফিসারদের উপর নজর পড়তেই তুঘরীল তুগান উঠে দাঁড়াল। গোটা দেহে তার রক্তের এক উষ্ণ স্রোত বয়ে গেল।
একজন পুলশি অফিসার দরজা পেরিয়ে এগিয়ে এল। বলল, ফায়জাভাকে জেনারেল বোরিসের অফিসে নিয়ে যেতে এসেছি।
চমকে উঠল না তুঘরীল তুগান। শুধু ডান হাতটা তার একবার মুষ্টিবদ্ধ হলো। এগিয়ে এল সে পুলিশ অফিসাররে দিকে। মুখ তার ভাবলশেহীন। কন্তিু চোখের দৃষ্টিতে এক তীক্ষ্মতা।
শেষ মুহূর্তে এগিয়ে আসা পুলিশ অফিসার বোধ হয় কিছু সন্দেহ করেছিল। তার হাতটা কোমরের বেল্টে ঝুলানো রিভলবারের বাঁটে উঠে এসেছিল। কিন্তু যতটা সে ভাবেনি, তার চেয়েও দ্রুত ঘটনাটা ঘটে গেল। তুঘরীল তুগান প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে পুলিশ অফিসারটির খাপ থেকে রিভলবার ছিনিয়ে নিল এবং সংগে সংগেই গুলী বর্ষিত হলো তার হাতের রিভলবার থেকে। ঢলে পড়ল পুলিশ অফিসারটির রক্তাক্ত দেহ।
চোখের পলকে ঘটে গেল ঘটনাটা। মুহূর্তের জন্য একটা কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা ছড়িয়ে পড়ল বাকি দু’জন পুলিশ অফিসারের মধ্যে। কিন্তু পরক্ষণেই তারা ঝাঁপিয়ে পড়ল তুঘরীল তুগানের উপর। তুঘরীল তুগান তার রিভলবার উঁচু করে তুলে ধরছিল। তারা ঝাঁপিয়ে পড়ার সাথে রিভলবারের একটা ফায়ার হলো। গুলীটা ব্যর্থ হলো না। একজন পুলিশ অফিসারের বুকের বাম পাশে ঢুকে গেল গুলীটা। এক পাশে ঢলে পড়ে গেল তার দেহ।
তুঘরীল তুগান পড়ে গিয়েছিল। হাতের রিভলবার ছিটকে পড়েছিল হাত থেকে। তৃতীয় পুলিশ অফিসারটি এসে চেপেছিল তার উপর। পুলিশ অফিসারটির দু’হাত চেপে বসেছিল তুঘরীল তুগানের গলায়। তুঘরীল তুগান তার ডান হাত পাকিয়ে ঘুষি লাগাল তার কানের নীচে ঠিক নরম জায়গাটার লক্ষ্যে। কিন্তু মাথাটা চকিতে ঘুরিয়ে নেয়ায় ঘুষিটা গিয়ে লাগল ঘাড়ের নীচের জায়গাটায়। এই সময় পুলিশ অফিসারের হাতটা কিছুটা আলগা হয়ে গিয়েছিল। তুঘরীল তুগান এক ধাক্কায় তাকে ঠেলে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। উঠে দাঁড়িয়েই আবার ঝাঁপ দিল পুলিশ অফিসারটির উপর। কিন্তু পুলিশ অফিসারটি ততক্ষণে তার রিভলবারটি তুলে নিয়েছিল। সে রিভলবারের গুলী তুঘরীল তুগানের বুকটি একদম এফোড় ওফোড় করে দিল।
ফায়জাভা পিতার ছিটকে পড়া রিভলবারটা কুড়িয়ে নিয়েছিল। পিতৃহন্তা পুলিশ অফিসারটির রিভলবার অন্য দিকে ঘুরবার আগেই ফায়জাভার রিভলবার অগ্নি বৃষ্টি করল পর পর দু’বার। পুলিশ অফিসারটির মাথা একেবারে গুড়ো হয়ে গেল।
গুলীর শব্দ শুনে বাইরে থেকে দু’জন পুলিশ অফিসার ছুটে আসছিল। উদ্যত রিভলবার হাতে তারা এসে দাঁড়াল সেই দরজায়।
ফায়জাভা গুলী করে রিভলবারটা ফেলে দিয়েই ঝুঁকে পড়েছিল পিতার মুখের উপর। পাগলের মত ডাকছিল সে তার আব্বাকে।
উদ্যত রিভলবার হাতে দাঁড়ানো দু’জন পুলিশ অফিসারের একজন বলল, এবার আসুন মিস ফায়জাভা, অনেক করেছেন।
চকিতে চোখ তুলে তাকিয়েই ফায়জাভা ছুটল রিভলবারের দিকে।
-রিভলবারে হাত দিবেন না ফায়জাভা, হাত একেবারে গুড়ো করে দেব-চিৎকার করে উঠল একজন পুলিশ অফিসার।
ফায়জাভা দাঁড়িয়ে গেল।
সেই পুলিশ অফিসার আবার চিৎকার করে উঠল, বেরিয়ে আসুন জেনারেল বোরিস অপেক্ষা করছেন।
ফায়জাভা দাঁড়িয়েই থাকল।
পুলিশ আবার গর্জে উঠল, শেষ বারের মত বলছি, আসুন আমাদের সাথে। তা না হলে বলপ্রয়োগ করতে হবে আমাদের।
এইবার ফায়জাভা বেরিয়ে এলো।
আগে আগে সে চলল, পিছনে দু’জন পুলিশ অফিসার।
বাইরে এসে গাড়ির দিকে তিনজন এগুচ্ছিল। আগে ফায়জাভা পেছনে উদ্যত রিভলবার হাতে দু’জন পুলিশ অফিসার।
হঠাৎ এ সময় দু’টো গুলীর শব্দ হলো। আর্তনাদ করে দু’জন পুলিশ অফিসার লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। দু’জনের মাথাই গুলীতে এফোড় ওফোড় হয়ে গেছে।
কয়েক মুহূর্ত বিস্ময়ের ঘোর নিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় ভাবে দাঁড়িয়ে ছিল ফায়জাভা। এই সময় দু’জন যুবক এসে দাঁড়াল তার পাশে। দু’জনেই ফায়জাভার পরিচিত। একজন কলখজের গণনিরাপত্তা অফিসার আহমদভ আরেকজন স্টোর সিকুরিটি অফিসার আলী খান।
তারা এসে সালাম দিল। তারপর নরম এবং দ্রুত কণ্ঠে বলল, মিস ফায়জাভা গাড়িতে উঠুন।
তাদের সালাম দেয়া শুনে ফায়জাভা যতটা আশান্বিত হয়েছিল, তাদের গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে সে আশাটা তিরোহিত হতে চাইল। ফায়জাভা জিজ্ঞেস করল, আমাকে কোথায় যেতে হবে?
তারা মুখ না তুলে চোখ নীচু রেখেই জবাব দিল, আমরা সাইমুমের কর্মী, আমরা খোঁজ নিতে এসেছিলাম আপনাদের।
ফায়জাভা আর কোন কথা না বলে পুলিশের ঐ গাড়িতে এসে বসল। ড্রাইভিং সহ সামনের দুই সিটে গিয়ে বসল ঐ দুই যুবক।
গাড়ি চলতে শুরু করেছে।
দু’জন যুবকের একজন বলল, দেরী করেছি আমরা আসতে মিস ফায়জাভা। ওরা আসবে আমরা জানতাম কিন্তু এত তাড়াতাড়ি আসবে জানতাম না।
ফায়জাভা বলল, আপনাদের এই পরিচয় জেনে খুশী হয়েছি।
-আপনাদের পরিচয় জেনেও আমরা খুশী হয়েছি। দুঃখিত যে, আমরা ওদের জন্য কিছুই করতে পারলাম না।
তারপর সবাই চুপ। লাইট নিভিয়ে অন্ধকার পথে কলখজের বাইরের, এবড়ো থেবড়ো রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলছিল গাড়ি। প্রায় তিন ঘণ্টা পরে কলখজের উত্তর প্রান্তে পশ্চিমের এক উপত্যকায় এসে গাড়ি দাঁড়াল।
গাড়ি দাঁড়াতেই দু’দিক থেকে দু’টি ছায়ামুর্তি গাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে নেমে আহমদভ সামনের জনকে উদ্দেশ্য করে বলল, কি খবর আসলাম সবাই এসেছে?
-এসেছেন।
-শহীদরা?
-আনা হয়েছে। এখন জনাব ইউসুফ শামিল এলেই দাফন হবে।
ইউসুফ শামিল কলখজ আদালতের তিন বিচারপতিদের একজন। অবশিষ্ট দু’জন বিচারপতি রুশ। একমাত্র তিনিই তুর্কি। ইউসুফ শামিল সাইমুমের সারাকায়া ইউনিটের প্রধান।
গাড়িতে আবার উঠে বসল আহমদভ। গাড়ি আবার চলতে শুরু করল। মিনিট পনের চলার পর গাড়ি উপত্যকার পশ্চিম প্রান্তে এসে দাঁড়াল। সেখানে অনেকগুলো লোক, কেউ বসে কেউ দাঁড়িয়ে। এক জায়গায় গোল হয়ে কিছু লোক দাঁড়িয়ে। পাশাপাশি দু’টো লাশ সেখানে রাখা। একটি জামায়াতিনের, অন্যটি রশিদভের। জামায়াতিনের লাশ ছিল মর্গে, আর রশিদভের লাশ বাজারে টাঙিয়ে রাখা হয়েছিল। কিন্তু টাঙানো বেশীক্ষণ থাকেনি, রাতের অন্ধকার নামতেই স্থানীয় জনসাধারণের সাথে মিলে সাইমুম কর্মীরা রশিদভের লাশ নিয়ে এসেছে। আর জামায়াতিনের লাশ মর্গ থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। শহীদের লাশ অবমাননার শিকার হবে, কবর পাবে না, সাইমুম এটা বরদাশত করতে পারেনি। তাই এই দাফনের ব্যবস্থা।
ইউসুফ শামিল এসে পৌছলেন অল্পক্ষনের মধ্যেই। এসেই তিনি কথা বললেন ফায়জাভার সাথে। ফায়জাভাকে সান্তনা দিয়ে স্বস্নেহে বললেন, তোমার আব্বা, তুমি, রশিদভ ও জামায়াতিনের জন্য আমরা গৌরব বোধ করছি। দুঃখ করো না, তোমার কোন চিন্তা নেই। সাইমুম তোমার নিজ পরিবার। এখানে পিতার স্নেহ, মায়ের ভালবাসা, ভাইয়ের আদর সবই পাবে।
কবর তৈরীই ছিল, ইউসুফ শামিল আসার সংগে সংগে জানাজা হয়ে গেল। তারপর দুই শহীদকে দাফন করা হলো। যাতে কবরের চিহ্ন সবার নজরে না পড়ে এ জন্য পাথর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হলো সবটা জায়গা জুড়ে।
দাফন শেষে মুনাজাত শেষ করার পর ইউসুফ শামিল বলল, আমাদের পশ্চিম উজবেকিস্তানের এরাই প্রথম শহীদ। এদের দিয়েই উদ্বোধন হলো এখানকার শহীদী ঈদগাহের। এই শহীদী ঈদগাহ আমাদের জীবনের প্রতীক, জয়েরও প্রতীক। অনেক দুরে সুবহে সাদেকের যে আলোক রেখা ফুটে উঠেছে, তা মুক্তির সূর্যোদয়ে রূপান্তরিত হবে এ শহীদের রক্তভেজা পথ বেয়েই।
সবাই নীরব, কারো মুখে কোন কথা নেই। উপত্যকা পথে এগিয়ে আসা গাড়ির শব্দে নীরবতা ভংগ হলো। সবাই ওদিকে মুখ ফিরাল।
গাড়ি এসে থামল তাদের সামনে, গাড়িতে অনেকগুলো নতুন শহীদের লাশ। গাড়ি থেকে নামল আবদুল্লা জমিরভ, বলল সে, সন্দেহ করে আজ যাদের ওরা গ্রেফতার করেছিল, অকথ্য নির্যাতনের পর সন্ধ্যায় সবাইকে ওরা হত্যা করেছে। বাজারেই ফেলে রেখে গিয়েছিল ওদের সবাইকে, সকলের দেখার জন্য। আরো লাশ আসছে অন্য গাড়িতে।
কারো মুখে কোন কথা যোগাল না, নীরব সবাই, মাথা নীচু। রাতের অন্ধকার না থাকলে দেখা যেত কারো চোখই শুকনো নেই।
নীরবতা ভাঙল ইউসুফ শামিল, বলল, এমন একটা দিন আসবে জানতাম কিন্তু এত তাড়াতাড়ি আসবে তা ভাবিনি। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা দরকার আমাদের মনে হচ্ছে মুক্তির সোনালী দিগন্ত আর খুব বেশী দুরে নয়।
এক পাশে দাড়িয়েছিল ফায়জাভা। রশিদভের দেহ কবরস্থ হওয়ার পর তার চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। সেখানে এসে দাড়িয়েছে কঠোর শপথের এক দীপ্তি।
ইউসুফ শামিল তার দিকে এগিয়ে এল। বলল, এখন তোমাকে আমার বাসায় পাঠিয়ে দেই। কাল তুমি যাবে আমাদের মহিলা হেডকোয়াটার লেনিন স্মৃতি পার্কে। অনেক সংগ্রামী বোন তুমি সেখানে পাবে।
নীরবে মাথা নেড়ে সায় দিল ফায়জাভা।
৪
তাসখন্দের ১১ তলা বিশিষ্ট প্রশাসনিক ভবন। ভবনের ১০ম তলার বিশাল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ। উজবেক ফার্স্ট সেক্রেটারীর অফিস এটা, তার বিশাল চেয়ারটি শুন্য, তার শূন্য চেয়ারে বসে আছে জেনারেল বোরিস। সারাকায়ার ঘটনার পর ফিরে এসেই জেনারেল বোরিস উজবেকিস্থান সহ এ অঞ্চলের সবগুলো মুসলিম রিপাবলিকের সরকার এবং কম্যুনিষ্ট পার্টিকে বরখাস্ত করেছে। কোন মুসলিম নেতৃত্বকেই সে আর বিন্দুমাত্রও বিশ্বাস করে না।
জেনারেল বোরিসের মুখ সেই আগের মতই টকটকে লাল। সে কথা বলছিল সদ্য মস্কো থেকে আসা ঐ এলাকার জন্য ‘ফ্র’ নিযুক্ত গভর্নর আদ্রে শিপিলভের সাথে। বলছিল সে, প্রতিটি মুসলমান একটা করে শয়তানের বাচ্চা। সুযোগ পেলেই ওরা তোমাকে কাল সাপের মত ছোবল দেবে। সারাকায়ায় কম্যুনিষ্ট পার্টি, কমসমল কিছুই আমাদের হাতে ছিল না। কম্যুনিষ্ট পার্টি ও কমসমলের নেতারাই আমাদের নিরাপত্তা এজেন্টদের হত্যা করে সাইমুমের পথ নিরাপদ করে দিয়েছে। ছদ্মবেশী শয়তান তুঘরীল তুগানেরও মুখোশ শেষ পর্যন্ত খসে পড়েছে। অবাক ব্যাপার, সাধারণ মুসলমানরাও রাতারাতি যেন একদম পাল্টে গেছে। সাইমুমের কোন খবর ওদের কাছ থেকে পাওয়া যায় না। রশিদভের লাশ তারা সরিয়ে নিয়ে মুসলিম কায়দায় দুরের এক উপত্যকায় দাফন করেছে। জেনারেশনের পর জেনারেশন কম্যুনিষ্ট শাসনে থাকলেও ওদের মুসলমানিত্ব আমরা খতম করতে পারিনি, মুসলমানিত্ব খতম না করে আমরা ওদের ঈমান খতম করতে পারবো না। বলশেভিকদের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা ‘ফ্র’রা কাজ করব। ওদেরকে আমাদের মনে করে যে শাসনের সুযোগ দিয়েছিলাম তা আর নয়।
-কিন্তু মুসলিম অফিসার ও কর্মচারীদের গণ ট্রান্সফারের আমাদের সিদ্ধান্ত, বলল আদ্রে শিপিলভ, মুসলিম জনগণের মধ্যে কি বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে না?
-করবে, বলল জেনারেল বোরিস, করবে জেনেও এটা করা হয়েছে। কারণ এর কোন বিকল্প নেই। জামিলভের মত বিশ্বস্ত অফিসার, তুঘরীল তুগানের মত বহু বছরের নির্ভরযোগ্য সাথী, রশিদভ ও জামায়াতিনের মত তুখোড় এবং নিবেদিত প্রাণ কর্মী যখন বিগড়ে গেছে, বিগড়ে গিয়ে বিদ্রোহীদের দলে যোগ দিয়েছে এবং তাদের বন্দুক নির্মম হয়ে উঠেছে আমাদের বিরুদ্ধে, তখন মুসলমানদের আর কাউকেই বিশ্বাস করা যায় না। কারও উপরেই সামান্যতম নির্ভরতাও রাখা যায় না। এ অবস্থায় মুসলিম অঞ্চল থেকে তাদের সরিয়ে দেয়াই তাদের জন্য সবচেয়ে লঘু দন্ড। এই পদক্ষেপই আপাতত ‘ফ্র’ নিয়েছে। প্রতিক্রিয়া প্রকাশের পথ না পেলেই তা অবশেষে থেমে যাবে। আর অফিসার কর্মচারীদের অসন্তোষ? ওর পরোয়া আমরা করি না। মস্কোসহ রুশ অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় এমনভাবে ওদের ছড়িয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে যে ওরা সেই পরিবেশে মাথা তোলার কোন সুযোগই পাবে না।
এই সময় জেনারেল বোরিসের ইন্টারকম কথা বলে উঠল। পি.এ জানাল ব্রিগেডিয়ার পুশকিন সাক্ষাতের জন্য অপেক্ষা করছেন।
জেনারেল বোরিস ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে জবাব দিল, ৫ মিনিট পর পাঠাও। পি.এ’র সাথে কথা শেষ করে সে ইন্টারকমে কথা বলল পার্সোনাল সেক্রেটারী ভিক্টর কমাকভের সাথে। বলল, ভিক্টর এখনি নির্বাচনের উপর ফাইলটা নিয়ে এস।
নির্বাচন সংক্রান্ত ফাইলে চোখ বুলাচ্ছিল জেনারেল বোরিস। স্প্রিং-এর পার্টিশন ডোর ঠেলে প্রবেশ করল ব্রিগেডিয়ার পুশকিন।
ব্রিগেডিয়ার পুশকিন কম্যুনিষ্ট সেনাবাহিনীর সাউদার্ণ কমান্ডের গণসংযোগ বিভাগের প্রধান ছিলেন। মুসলিম নিয়ন্ত্রিত প্রশাসন ভেংগে দেবার পর হোম এ্যাফেয়ার্সের দায়িত্ব তার উপর পড়েছে।
ব্রিগেডিয়ার পুশকিন বসলে ফাইলে মুখ রেখেই জেনারেল বোরিস জিজ্ঞেস করল, কতদুর এগুলো পুশকিন?
নির্বাচনী জোনের পুনর্গঠন শেষ হয়েছে। নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব বন্টনও শেষ করেছি। যে কোন সময় নির্বাচন….
কথা শেষ করতে না দিয়েই জেনারেল বোরিস অনেকটা বিরক্তির সাথেই বলে উঠল, আসল কথায় আসছ না কেন? মনোনয়নের কতদুর?
একটু ঢোক গিলেই ব্রিগেডিয়ার পুশকিন বলল, আমরা অনেকটা এগিয়েছি। উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, কাজাখস্তান, কিরঘিজিস্তান- এই পাঁচটি রাজ্যের জন্য ১০০টি সুপ্রিম সোভিয়েতের সিট রয়েছে। এ ১০০টি সিটের জন্য সংশ্লিষ্ট এলাকায় বসবাসকারী ১০০ জন রুশীয়কে পাওয়া গেছে। কিন্তু রাজ্য কংগ্রেসের ৫০০টি সিটের জন্য দেড়শ’র বেশী রুশীয়কে অনেক চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। তার উপর সমস্যা দাঁড়িয়েছে রুশরা কেউ ভয়ে প্রার্থী হতে রাজী হচ্ছে না।
প্রায় কথা কেড়ে নিয়ে জেনারেল বোরিস বলল, ভয় রাখ তোমার। ওরা সব নির্বাচিত হয়ে ঘাড়টা বাড়িয়ে দিয়ে তুর্কীদের মধ্যে ঘুরে বেড়াবে নাকি যে ভয়ে ওদের কাঁপতে হবে।
একটু থেমে জেনারেল বোরিস আবার বলল, রাজ্য কংগ্রেসের বাকী সিটগুলোর জন্য এমন সব মুসলমান খুঁজে বের কর যারা আধুনিক শিক্ষিত এবং কোন প্রকার ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলে না। আগামী ১৫ দিনের মধ্যেই তোমাকে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। মুসলিম রিপাবলিকগুলোর সরকার ও কম্যুনিষ্ট পার্টি ভেঙে দেয়ায় আন্তর্জাতিকভাবে নানা সন্দেহ করার কারণ সৃষ্টি হয়েছে। জাতিগত নিপীড়নের অভিযোগ ইতিমধ্যেই অনেকে তুলেছে। সুতরাং তাড়াতাড়ি একটা নির্বাচন করে সবাইকে বুঝাতে হবে নিছক একটা অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবেই ঐ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
কথা শেষ করে চেয়ারে পা এলিয়ে চোখ বুজল জেনারেল বোরিস। এর অর্থ কথা তার শেষ।
কোন কথা না বলে ফাইলটা হাতে তুলে নিয়ে উঠে দাড়াল ব্রিগেডিয়ার পুশকিন।
তখন সন্ধ্যা।
৫ জন সৈনিক পরিবেষ্টিত নির্বাচনী অফিসার বেরিয়ে গেল আহমদ নুরভের বাড়ি থেকে। রুস নির্বাচনী অফিসার পেছন ফিরে তাকালে দেখতে পেত এক রাশ কালি যেন ঢেলে দেয়া হয়েছে আহমদ নুরভের মুখে।
নির্বাচনী অফিসার বেরিয়ে গেলে আহমদ নুরভ অন্ধকার মুখ নিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল। বাড়ির হলরুমে তখন সন্ধ্যা নাচ চলছে। স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, বন্ধু-বান্ধব সবাই ওখানে জুটেছে। প্রতিদিনই বিনোদনের এ আসর বসে। হলের মাঝখানে গোল টেবিলে সুদৃশ্য পানাধার এবং পানপাত্র। রুশীয় মদ ভদকার কড়া আমেজে নাচের উচ্ছ্বলতা পাখির মত যেন পাখা মেলে।
আষাড়ের আকাশের মত অন্ধকার মুখ নিয়ে আহমদ নুরভ গিয়ে নাচ ঘরের একটা সোফায় ধপ করে বসে পড়ল। তার উপর প্রথমে চোখ পড়ল সাদেকার। সাদেকা আহমদ নুরভের বড় মেয়ে। বয়স বাইশ। তাসখন্দ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাশ করে বেরিয়েছে সে। সে এক বন্ধুর সাথে নাচছিল। নাচ ছেড়ে দিয়ে সে পিতার কাছে এসে বসল।
-কি হয়েছে আব্বা, অসুস্থ তুমি? বলল উৎকণ্ঠিত সাদেকা।
-না মা। সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল আহমদ নুরভ।
-না আব্বা, আমি দেখতে পাচ্ছি তুমি কেমন যেন মুষড়ে পড়েছ, কি হয়েছে বল। ডাক্তার ডাকব?
-না মা, আমি অসুস্থ নই।
-তাহলে?
-মন খারাপ লাগছে।
-কেন কি হয়েছে?
এই সময় আহমদ নুরভের স্ত্রী এসেও তাদের পাশে বসল। তার চোখেও প্রশ্ন।
সাদেকা বলল, আব্বা চল ড্রয়িংরুমে। বলে সাদেকা তার আব্বাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে ড্রয়িং রুমে চলল। পিছনে পিছনে আহমদ নুরভের স্ত্রীও চলল।
ড্রয়িং রুমে আহমদ নুরভের পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে সাদেকার হাতে তুলে দিল কিছু না বলে।
সাদেকা কাগজটিতে দ্রুত চোখ বুলাল। বলল, একি আব্বা, এ যে রাজ্য কংগ্রেজের জন্য তোমার মনোনয়ন পত্র। তুমি কি ভোটে দাঁড়াচ্ছ? শাদেকার শেষ বাক্যটি বিস্ময়সূচক এক চিৎকারের মত শোনাল।
আহমদ নুরভ বলল আমি দাঁড়াচ্ছি না, আমাকে দাঁড় করিয়ে দেয়া হচ্ছে।
-জোর করে?
-জোর করবে কেন আদেশ দিচ্ছে। এ আদেশ অমান্য করলে ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে অভিযুক্ত হতে হবে।
-দাঁড়ানো, না দাঁড়ানোর মত নাগরিক স্বাধীনতাটুকুও কি নেই?
-হাসালে মা। সব বুঝেও স্বাধীনতার নাম করছ?
-তাহলে সাইমুম সব সত্য কথাই বলে।
-আমি পঁচে গেছি মা, ওদের মত সত্য বলার সৎ সাহসও আমার নেই। মনে হয় এ দিকটি বিবেচনা করেই ‘ফ্র’-এর কম্যুনিস্ট সরকার আমার উপর তাদের আস্থা স্থাপন করেছে।
-কিন্তু আব্বু, ‘বিদ্রোহী’ হওয়ার অভিযোগ থেকে বাঁচতে গিয়ে তো তোমাকে জাতির বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করতে হবে। কম্যুনিস্ট সরকার মুসলিম প্রভাবিত প্রশাসন ও পার্টি ভেঙ্গে দিয়ে এই নির্বাচন নামের প্রহসনের মাধ্যমে এ অঞ্চলের রুশ অধিবাসী এবং মুসলিম নামের লোকদের নিয়ে একটা বশংবদ পার্টি ও প্রশাসন গড়তে চায়। এ কাজে যে মুসলমান তাদের সহযোগিতা করবে তারা জাতি-বিদ্রোহী এবং দালাল হিশেবেই চিহ্নিত হবে।
-আমার তো সেটাই উদ্বেগের বিষয় মা। একটা দীর্ঘশ্বাস চাপতে চাপতে বলল আহমদ নুরভ।
আহমদ নুরভ একজন সরকারী সুবিধাভোগী পার্টি কর্মী এবং গোয়েন্দা ও ইনফরমার। পূর্ব উজবেকিস্তানে এক বিরাট চরণ ক্ষেত্রের মালিক সে।
সবাই নীরব। এবারও প্রথমে কথা বলল সাদেকাই। বলল সে, চল আব্বা, তোমাকে মসজিদের বাবাখান হুজুরের কাছে নিয়ে যাই। এই অবস্থায় আমি মনে করি তিনিই উপযুক্ত পরামর্শ দিতে পারেন।
আহমদ নুরভ বলল, কোন দিন ওপথে পা বাড়াইনি, কোন দিন তার কাছে যাইনি, আজ কোন মুখে তার কাছে যাব সাদেকা?
-না আব্বা, তার মত লোক হয় না। দুনিয়ার কোন মানুষ সম্পর্কে তার কোন কু ধারণা নেই।
এবার মুখ তুলল আহমদ নুরভের স্ত্রীও। বলল সে, সাদেকা ঠিক বলেছে, আমি অনেকবার গেছি তার দরবারে।
-গেছ তুমি, কেন? বিস্ময়ে প্রশ্ন তুলল আহমদ নুরভ।
-সাদেকার নাম সুলতানা সাদেকা এবং ছেলে পেটভের নাম ‘আহমদ ওমর’ তার কাছ থেকেই নেয়া। ছেলে মেয়ের কানে তিনিই এসে কালেমা পড়ে গেছেন এবং আকিকা তার মাধ্যমেই দিয়েছি।
-এত সব তো আমি জানি না, বলনি তো কোন দিন আমকে?
-বলিনি ভয়ে।
আহমদ নুরভ কোন কথা বলল না। তার শূন্য দৃষ্টি চেয়ে থাকল ড্রয়িং রুমের জানালা দিয়ে বাইরে মাঠের দিকে।
নীরবতা ভেঙ্গে সাদেকা বলল, চল আব্বা বাবাখান হুজুরের কাছে।
আহমদ নুরভ নীরভেই উঠে দাঁড়াল, বলল, চল।
বিবিখান গ্রামটি পাশ দিয়ে খরস্রোতা একটা ঝরনা। সে ঝরনার পাশে একটা উঁচু টিলা। টিলার উপর সবুজ বাগান বেষ্টিত একটা ভাঙ্গা মসজিদ। মসজিদের পাশেই ভাঙ্গা একটা মাজার। বলা হয় মাজারটি বিবিখানের। কাহিনী প্রচলিত আছে, বিবিখান আরব দেশীয় একজন পুণ্যবতী মহিলা। বাগদাদের পতনকালে হালুকার একজন সেনাপতি বন্দিনী বিবিখানকে বিয়ে করে মধ্য এশিয়ার এখানে নিয়ে আসেন। শীঘ্রই বিবিখানের চরিত্র-প্রভায় মধ্য এশিয়ার এ অঞ্চলে ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়ে। তিনি বিবিখানে একটি মাদ্রাসা গড়ে সারাজীবন এলাকার মহিলাদের তালিম তরবিয়াতে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। তিনি ছিলেন সবার মা। মানুষ অপরিসীম ভয় ও ভক্তি করত তাকে। তার মৃত্যুর পর মসজিদ-মাদ্রাসা গৃহের পাশেই তাকে কবরস্থ করা হয়। ভক্তদের দোয়া ও দর্শনের একটা কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায় সেটা। গড়ে ওঠে প্রভাবশালী এক মাজার। মধ্য এশিয়ার কোন শাসকই একবার বিবিখানে না এসে পারত না। কিন্তু কম্যুনিস্টরা দেশ দখলের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। তাদের হাজার হাজার মসজিদ মাদ্রাসা ধ্বংস তালিকার মধ্যে বিবিখানও ছিল। কিন্তু তারা জনমত দেখে বিবিখানে হাত দিতে পারেনি। তাই বিবিখান এখনও টিকে আছে কিন্তু ভাল অবস্থায় নয়। চারদিকে প্রাচীর ভেঙ্গে গেছে, মাজার ও মসজিদের দেয়াল ফেটে গেছে। সেখান থেকে ইট খসে পড়ছে কিন্তু কম্যুনিস্ট সরকার থেকে মেরামতের কোন অনুমতি নেই। তারা চায় এ মসজিদ-মাজার আপনাতেই ধ্বংস হয়ে যাক। কিন্তু এ অবস্থার মধ্যেও ভক্তরা রাতের আঁধারে মসজিদ-মাজারের ভাঙ্গা স্থানে দু’একটি করে ইট সিমেন্ট লাগায়। এভাবেই ইবাদতের এই কেন্দ্রটি আজও বেঁচে আছে।
বৃদ্ধ সৈয়দ জিয়াউদ্দিন বাবাখান মসজিদ মাজারের ইমাম ও মুতাওয়াল্লি। কম্যুনিস্ট গোয়েন্দাদের কড়া নজরে ছিলেন তিনি। তিনি তার সবুজ টিলাটির বাইরে আর কোথাও যেতেন না। ইদানিং তিনি একটু করে বাইরে বের হন। সাইমুমের প্রভাব-প্রতিপত্তি এ অঞ্চলে বেড়ে যাওয়ায় মসজিদটাও এখন সরগরম হয়ে উঠেছে। যারা এতদিন নামাজের জন্য আসতে ভয় পেত তারা এখন মসজিদে আসতে শুরু করেছে। সৈয়দ জিয়াউদ্দিন বাবাখানের সাথে আহমদ মুসার আকস্মিক সাক্ষাৎ এ অঞ্চলে জাগরণের এক তড়িৎ প্রবাহ সৃষ্টি করেছে। সাক্ষাতের ঘটনাটা এই রকম।
সময়টা হবে মাস দুই আগের।
অনেক বছর পর অনেক অনুরুদ্ধ হয়ে কোকন্দের মীর-ই আরব মাদ্রাসায় বার্ষিক অনুষ্ঠানে তিনি গিয়েছিলেন। দু’দিন সেখানে অবস্থানের পর তিনি সেদিন বিবিখানে ফিরছিলেন। বেশ একটু রাত হয়েছে। মীর-ই আরব মাদ্রাসার ছাত্র তাঁর একমাত্র পুত্র সৈয়দ রফীউদ্দিনকে সাথে নিয়ে ফিরছিলেন তিনি। ঝরনার ধার বেয়ে সুন্দর রাস্তাটা ধরে আসছেন তারা। ঐ তো দূরে টিলার উপর সবুজ বাগান ঘেরা বিবিখানকে মনে হচ্ছে একটা জমাট অন্ধকার। হঠাৎ সেই অন্ধকারের বুক চিরে বেরিয়ে এল এক আজানের ধ্বনি। ইথারের কণায় ভর করে কেঁপে কেঁপে তা এসে প্রবেশ করল কানে।
চমকে উঠে জিয়াউদ্দিন বাবাখান হাত ঘড়ির দিকে তাকাল। দেখল, রাত ৮টা বাজে। বিবিখান মসজিদের এশার আযানের সময় এটা। ঠিক সময়েই আযান দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এ আযান দিচ্ছে কে? আযান দেয়ার তো ওখানে, ঐ লোকালয়ে কেউ নেই! আর এত সুন্দর আযান। অপূর্ব ছন্দ, অপরূপ উচ্চারণ। প্রতিটি শব্দ যেন মর্মে পশে যাচ্ছে। এত মধুর হতে পারে আযান। এ কোন বেলাল এলো বিবিখানে।
দ্রুত পা চালান জিয়াউদ্দিন বাবাখান। ধীর লয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে আযানের ধ্বনি। এমন উচ্চকণ্ঠে আযান বিবিখানে আর কখনও হয়নি কম্যুনিস্ট শাসনামলে। উচ্চকণ্ঠে আযান নিষিদ্ধ করা হয়েছে সেই কবে পণপ্রতিক্রিয়া আর পণ অশ্লীলতার অজুহাত তুলে। এ কোন দুঃসাহসী মানুষ লা-শরীকের উচ্চকণ্ঠের জয়গানে যুগ যুগান্তের সে নীরবতা ভাঙল? অজান্তেই জিয়াউদ্দিন বাবাখান এর চোখ দু’টি ভিজে উঠল আবেগের অশ্রুতে।
মসজিদ চত্বরে গিয়ে পৌঁছলেন জিয়াউদ্দিন বাবাখান। চত্বরে তখন আরো অনেক লোক জমেছে। বাবাখানকে দেখে তারা দু’পাশে সরে দাঁড়াল। সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন বাবাখান। আযান দিচ্ছে সৌম্য শান্ত এক যুবক। সফেদ মুখে সুন্দরভাবে বিন্যস্ত কালো দাড়ি। কোকড়া কালো চুল। নীল চোখ। বলিষ্ট দেহে সামরিক কায়দার পোশাক। কোমরে পিস্তল ঝুলছে। তাঁর দু’জন সাথী এক পাশে দাঁড়িয়ে। কি সুন্দর নুরানী চেহারা তাদের। উপস্থিত সবাই যেন গোগ্রাসে গিলছে। আযানের স্বর্গীয় সুমধুর সুর সবাইকে যেন সম্মোহিত করে তুলছে।
আযান শেষ হলো।
ঠোঁট নেড়ে আযান শেষের দোয়া পড়ল তারা।
আযান শেষে ঘুরে দাঁড়াল আযান দেয়া সেই স্বর্গীয় যুবক। সবার দিকে চোখ বুলিয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল সে জিয়াউদ্দিন বাবাখানের উপর।
ধীরে যুবকটি এসে বাবাখানের সামনে দাঁড়াল। সালাম দিয়ে মুসাফাহা করল। আপনিই কি সৈয়দ বাবাখান, আমাদের মুরুব্বি!
-জি হ্যাঁ। তুমি বাবা? জিজ্ঞেস করল বাবাখান।
-আমি আহমদ মুসা।
‘আহমদ মুসা’ -স্বগত স্বরে উচ্চারণ করল বাবাখান। তাঁর বিস্ময়- বিস্ফারিত চোখ আহমদ মুসার উপর নিবদ্ধ। কী এক ভাব-বিহবলতা তার চোখে-মুখে!
সাইমুম ও আহমদ মুসা সম্পর্কে বাবাখান কিছু কিছু কথা জানতেন। কিন্তু এবার মীর-ই-আরব মাদ্রাসায় গিয়ে তার কাছে সব পরিস্কার হয়েছে। ফিলিস্তিনে এবং মিন্দানাওয়ে আহমদ মুসা যা করেছে, এখানে সে এবং সাইমুম যা করছে সব শুনেছে বাবাখান। সব শুনে বাবাখানের মনে হয়েছে, মহান ইমাম মেহেদী যেদিন আসবেন আসুন, কিন্তু আহমদ মুসা মধ্য এশিয়ায় কম্যুনিষ্ট কবলিত মুসলমানদের ইমাম মেহেদী।
স্বপ্নের সেই আহমদ মুসা তার সামনে! বাবাখানের বিস্ময় ধীরে ধীরে আনন্দে রূপান্তরিত হল। দু’ধাপ এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল আহমদ মুসাকে। বলল, বাবা তুমি দীর্ঘজীবি হও। তুমি আমাদের চোখের মণি আশার আলো। যেমন করে তোমার আযানের ধ্বনি এই এলাকায় যুগ-যুগান্তের জমাট নীরবতার পাষাণ কারা ভেঙেছে, তেমনি করে তোমাদের হাতে কম্যুনিজমের জিন্দানখানা থেকে মধ্য এশিয়ার কোটি কোটি মুসলমানের মুক্তি হোক।
বৃদ্ধের দু’গন্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল অশ্রু। এলাকার সমবেত অনেক মানুষ দেখছিল এই দৃশ্য। তাদের চোখে বিস্ময়! এ কোন যুবক যার কাছে তাদের বাবাখান এমনভাবে গলে যেতে পারে!
আহমদ মুসা বৃদ্ধ বাবাখানকে শান্ত করে তার সাথে পাশে দাঁড়ানো হাসান তারিক ও কর্ণেল কুতাইবাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন।
নামাযের সময় হলো। বাবাখান আহমদ মুসাকে ইমামের আসনে ঠেলে দিলেন। আহমদ মুসা আপত্তি জানালে বাবাখান বলল, ইসলামে ইমামের যে বিধিগত ধারণা তাতে ইমাম তুমিই।
নামায শেষে বাবাখান আহমদ মুসাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন উপস্থিত মুসল্লীদের সাথে। সেই সাথে তিনি বললেন সাইমুমের কথা এবং মুসলমানদের জীবনে আবার কিভাবে সুবহে সাদেকের উদয় হতে পারে সেই কথা। আনন্দে-বিস্ময়ে উপস্থিত সকলের সাথে আহমদ মুসা, হাসান তারিক এবং কর্ণেল কুতাইবা মুসাফাহ করলেন। অপরিচয়ের গন্ডি কোথায় মিলিয়ে গেল। মনে হল, কত পরিচিত স্বজন তারা। সেই থেকে বাবাখান এলাকায় নতুন একটা প্রাণ চাঞ্চল্য এসেছে।
বাদ মাগরিব বাবাখান তার জায়নামাজে বসে তসবিহ পড়ছিলেন।
মসজিদে তখন কেউ নেই।
আহমদ নূরভ, তাঁর স্ত্রী রফিকা এবং মেয়ে সাদেকা এসে প্রবেশ করল মসজিদে। মসজিদে ঢোকার আগে আহমদ নূরভ অজু সেরে নিয়েছে এবং তার মাথায় একটা তুর্কি টুপি শোভা পাচ্ছে, যা এর আগে তার মাথায় কখনও দেখা যায়নি।
আহমদ নূরভের স্ত্রী রফিকা এবং সাদেকা মুখমন্ডল ছাড়া গোটা শরীরটা চাদরে ঢেকে নিয়েছে।
ওরা মসজিদ কক্ষের ডান পাশে গিয়ে বসল।
বেশ কিছুক্ষণ পর এদিকে মুখ ফিরাল বাবাখান। একবার এদিকে চেয়ে মুখটা নামিয়ে নিল। বলল, কি খবর তোমাদের, বলবে কিছু?
রফিকা কথা বলল। বলল, বাবাখান হুজুর, আমার স্বামী আহমদ নূরভের একটা ব্যাপারে পরামর্শের জন্য এসেছি।
-কি ব্যাপার? প্রশ্ন করল বাবাখান।
-হুজুর, আমি একটা বিপদে পড়েছি। বলল আহমদ নূরভ।
-বিপদটা কি?
আহমদ নূরভ পকেট থেকে কাগজ বের করে কাগজ বের করে উঠে গিয়ে সেটা বাবাখানের হাতে দিল। বাবাখান কাগজটির উপর নজর বুলিয়ে বলল, এতো দেখি তোমার মনোনয়ন, বিপদটা কোথায় দেখছ?
বাবাখানের মুখে এক টুকরো হাসি।
প্রায় আর্তনাদ করে উঠল আহমদ নূরভ। বলল, কি বলছেন, বিপদ নয় এটা আমার জন্যে?
-এ মনোনয়নে লাভ তো তোমার অনেক।
-কিন্তু বিপদ তো তার চেয়ে বড়।
-কি সেটা?
-জাতির লোকেরা আমাকে শত্রু জ্ঞান করবে, জাতি থেকে আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ব।
-বৈষয়িক স্বার্থের মোহে অনেকেই তো জাতির কোন পরোয়া করেননি।
আহমদ নূরভ হঠাৎ করে কোন জবাব দিল না। কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে চুপ থাকল। তারপর ধীরে ধীরে মাথা তুলে বলল, বাবাখান হুজুর, আমি পাপী, আমি নষ্ট চরিত্র। কিছুক্ষণ আগে পর্যন্তও বৈষয়িক স্বার্থকেই আমি সবার উর্ধ্বে স্থান দিয়েছি। কিন্তু এ মনোনয়ন হাতে পাবার পর আমার মনে হচ্ছে, আমি আমার জাতিকে ভালবাসি, আমার জাতি থেকে আমি বিচ্ছিন্ন হতে পারব না। আমার স্ত্রীর কাছে আমি শুনলাম, আমার স্ত্রী হুজুরের কাছ থেকে আমার ছেলে-মেয়ের নাম নিয়েছে, ছেলে-মেয়েদের আকীকা করেছে এবং ছেলে-মেয়েদের কানে ইসলামের কালেমা পড়িয়ে দিয়েছে। এ কথা শুনে আমার রাগ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আজ দেখছি আমার মন গর্বে ফুলে উঠছে। আজ মনে হচ্ছে,আমি মনে-প্রাণে মুসলমান। মুসলমানিত্ব আমি ত্যাগ করতে পারবো না। কোন কিছুর বিনিময়েও না।
-তুমি মনোনয়ন প্রত্যাখ্যান করলে শুধু তোমার সহায় সম্পদ নয়, জীবন বাঁচানও তোমার দায় হয়ে উঠতে পারে।
-কিন্তু এসব কিছুর চেয়ে ভারী মনে হচ্ছে আমার কাছে মনোনয়নকে। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল বাবাখান। তারপর চোখ খুলে বলল, তুমি সাইমুমকে জান?
-জানি, জাতির মুক্তির জন্য ওরা সংগ্রাম করছে।
-সাইমুম সম্পর্কে তোমার এখন মত কি?
-কম্যুনিষ্ট সরকারের দালালী করার চেয়ে ওদের সহযোগিতা করে মৃত্যুবরণ করাকেই আমি এখন শ্রেয় মনে করছি।
বাবাখান মূহুর্তকাল চুপ করে থাকল। তারপর আহমদ নূরভের দিকে চেয়ে বলল, আহমদ নূরভ আমি তোমার নবজন্মকে অভিনন্দিত করছি। মনোনয়ন প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে জাগতিক স্বার্থের চেয়ে নিজের স্বার্থের চেয়ে জাতির স্বার্থকে তুমি বড় করে দেখলে। আল্লাহ তোমাকে তার জাযাহ দিন এবং আল্লাহ সকলকে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়ার তৌফিক দান করুন।
বাবাখানের কথা শেষ হলে আহমদ নূরভ ধীরে ধীরে উঠে বাবাখানের কাছে এল এবং তাঁর একটি হাত তুলে নিয়ে চুম্বন করে বলল, আপনার নির্দেশ শিরোধার্য করে নিলাম। আপনি দোয়া করুন অতীতের পথভ্রষ্টতা থেকে মুক্ত হয়ে ইসলামের উপর যাতে অটল থাকতে পারি।
বাবাখান ‘আমিন’ বলে চোখ বুজল।
আহমদ নূরভ বুঝল, তাদের যাবার নির্দেশ হয়েছে। তারা বেরিয়ে এল মসজিদ থেকে। বাইরের উন্মুক্ত বাতাস যেন প্রশান্তির এক পরশ বুলিয়ে দিল আহমদ নূরভের শরীরে। বাগানের সবুজটা তার কাছে আগের চেয়ে অনেক বেশী সবুজ ও প্রাণদীপ্ত মনে হল। গাছের ডাল থেকে পাখির গান, গাছের ফাঁক দিয়ে দেখতে পাওয়া ঝরণার সফেদ পানি সবই তার কাছে নতুন মনে হল। হঠাৎ তার মনে হল হৃদয়টা যেন তার স্বচ্ছ স্ফটিকের মত। নতুন এক প্রশান্তি সেখানে। সামনের প্রতিটি পদক্ষেপ মনে হচ্ছে তার কাছে নতুন জীবনে পদার্পণ।
