সারাকায়ার মহাসড়কটি খিভা, বোখারা, সমরকন্দ হয়ে তাসখন্দ গেছে, সেই পথ ধরে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিল শাহীন সুরাইয়া। সেই-ই একমাত্র আরহী। গাড়ীর পেছনটা লাগেজে ভর্তি।
গাড়ি তখন বোখারা পার হয়ে সমরকন্দের পথে চলছিল। বেলা পড়ে এসেছে। রোদের সাদা রংটা এখন হলুদ।
মরুপথ ধরে এগিয়ে চলছিল গাড়ি। চারদিকেই দিগন্ত জোড়া মাঠ। জনমানবের চিহ্ন কোথাও নেই। অখন্ড এক নীরবতা চারদিক জুড়ে। এ নীরবতার একটা সৌন্দর্য আছে। কিন্তু এ সৌন্দর্যের অশরীরি স্পর্শের মাঝে ভীতির একটা শিহরণও রয়েছে। শাহীন সুরাইয়া গোয়েন্দা বিভাগে চাকুরী করে। বিপদ-আপদের সাথেই তার খেলা। তবু জনমানবহীন পরিবেশের এ জমাট নীরবতা তার মনের উপর চাপ সৃষ্টি করছিল।
প্রায় ১২০ কিলোমিটার বেগে এগিয়ে চলছিল শাহীন সুরাইয়ার গাড়িটি। হঠাৎ বিশ্রি এক শব্দ করে থেমে গেল ইঞ্জিন, দাঁড়িয়ে পড়ল গাড়ি।
উদ্বিগ্ন শাহীন সুরাইয়া গাড়ি থেকে নামল। ইঞ্জিনের উপরের ডালাটা খুলে সে বুঝতে চেষ্টা করল ইঞ্জিনের কি হয়েছে। ইঞ্জিন দেখে সে চমকে উঠল, ইঞ্জিনের ফুয়েল লাইনটা একেবারেই জ্বলে গেছে। ইঞ্জিনের ডালাটা বন্ধ করে হতাশভাবে এসে রাস্তার উপর সে ধপ করে বসে পড়ল।
আরো উদ্বিগ্ন হলো সে বেলার দিকে চেয়ে। অল্পক্ষণ পরেই রাত নামবে। যদি কোন গাড়ি না আসে! এসব ভেবে মনটা কেঁপে উঠল তার। একটা অজানা ভয় এসে তাকে ঘিরে ধরল। সে যে মেয়ে মানুষ, এ বোধটাও এ সময় তার কাছে বড় হয়ে উঠল।
শাহীন সুরাইয়া কিছুক্ষণ বালির উপর কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে থাকল। তারপর উঠে ব্যাগ খুলে দূরবীন লাগিয়ে রাস্তার উপরেই নজর বুলাল। রাস্তার দক্ষিণ প্রান্তে তাকাতে গিয়ে তার চোখ দু’টি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। একদম দিগন্তের কোলে একটা সচল বিন্দু তার চোখে ধরা পড়ল, চোখ থেকে দূরবীন সে আর নামাতে পারল না।
ক্রমে সচল কালো বিন্দুটি বড় হয়ে উঠল। হ্যাঁ, একটি গাড়ি, একটি কার। গাড়িটি আরও এগিয়ে এলে নাম্বার দেখে বুঝল গাড়িটা বেসরকারী। যাই হোক , খুব খুশি হল শাহীন সুরাইয়া।
চোখ থেকে দূরবীনটি নামিয়ে পকেটে পুরে সে গাড়ির কাছে গেল। মনে করল, গাড়ি থেকে মালপত্র নামিয়ে রাখবে যাতে করে দেরী না করে গাড়িতে উঠা যায়। কিন্তু পরক্ষণেই মনে করল, কি হবে, না জেনে আগাম এসব করে লাভ কি!
গাড়ির কাছ থেকে সরে এসে আবার দূরবীনটি চোখে লাগাল সে। এবার গাড়ির সব কিছুই পরিস্কার। গাড়িতে তিনজন আরোহী। পিছনের সিটে দু’জন। সামনের ড্রাইভিং সিটে একজন, তিনজনই পুরুষ কিন্তু দূরবীনের লেন্সে তাদের মুখ এখনও ধরা পড়ছে না। আনন্দের মাঝেও একটা উৎকন্ঠা জাগছে, লোকগুলো কি তাকে গাড়িতে নেবে? কেমন হবে লোকেরা? রাস্তা-ঘাটে পশু-বৃত্তির খবর আজকাল প্রায়ই পাওয়া যাচ্ছে, বুকটা কেঁপে উঠল শাহীন সুরাইয়ার।
গাড়িটা কাছে এসে গেছে। তীব্র বেগে ছুটে আসছে গাড়িটা। সুরাইয়া তার গাড়িতে বাম হাত রেখে ডান হাত উঁচু করে গাড়িটাকে দাঁড়াবার জন্য সংকেত দিল। সংকেত পাওয়ার পরই গাড়িটার গতি শ্লো হয়ে গেল। গাড়িটা ধীর গতিতে এসে সুরাইয়ার গাড়ি অতিক্রম করে প্রায় ৫০ গজ গিয়ে থেমে গেল। দেখা গেল গাড়ির আরোহীরা গাড়িতে বসেই সুরাইয়ার গাড়িটাকে তীক্ষ্ণভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
সুরাইয়াও গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। গাড়ির আরোহী তিনজনই গাড়ি থেকে নেমে এল। তিনজন আরোহীর দু’জন ক্লিন শেভ অন্যজনের সুন্দর মুখ ঘিরে সুন্দর দাড়ি। প্রথম দৃষ্টিতেই তিনজনকে সৌম্য-শান্ত ভদ্রলোক বলে মনে হয়। সুরাইয়ার মন সাহসী হয়ে উঠল। তার উপর সুরাইয়ার মনে হল দাড়িওয়ালা মুখটাকে কোথায় সে দেখেছে।
সুরাইয়া কিছু বলার আগেই ওদের মধ্য থেকে সেই দাড়িওয়ালা লোকটা বলল আপনাদের গাড়ির কি হয়ছে?
-গাড়ির ফুয়েল লাইনটা জ্বলে গেছে।
নিজের গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে ক্লিন শেভদের একজনের দিকে তাকিয়ে সেই দাড়িওয়ালা লোকটা বলল দেখে এস ইঞ্জিনটা।
ওরা সবাই গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। ইঞ্জিন দেখে ফিরে এসে বলল মেরামতের কোন সুযোগ নেই এখানে।
দাড়িওয়ালা লোকটা শাহীন সুরাইয়ার দিকে চেয়ে বলল আপনার নাম কি? যাবেন কোথায়?
-যাব তাসখান্দে। নাম আমার শাহীন সুরাইয়া।
-গাড়ি তো আপনাকে রেখেই যেতে হবে, সমরকন্দ পর্যন্ত আমরা আপনাকে পৌছাতে পারব।
-ধন্যবাদ ঐ পর্যন্ত হলেই আমার চলবে, বাকি পথের ব্যবস্থাটা আমি করতে পারব। শাহীন সুরাইয়ার জিনিসপত্র সেই ক্লিন শেভড দু’জনই ধরাধরি করে এনে এ গাড়িতে তুলল, তারপর সামনের সীটে সুরাইয়াকে বসিয়ে দাড়িওয়ালা সহ একজন পেছনের সীটে বসল।
গাড়ি আবার চলতে শুরু করল।
শাহীন সুরাইয়া ভুলতে পারছিলনা দাড়িওয়ালা ঐ চেহারাকে। সে যেন কোথায় দেখেছে। এক সময় সে মাথা ঘুরিয়ে পিছনের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল, আপনাকে যেন কোথায় দেখেছি।
উত্তরে সেই লোকটি বলল, কিছু মনে করবেন না, আপনার বাড়ি কোথায়?
-সারাকায়া।
-সারাকায়া?
আকস্মিক এক জিজ্ঞাসা ফুটে উঠল লোকটির কণ্ঠে।
-সারাকায়া আপনি চিনেন?
-জানি সারাকায়াকে
-কাউকে চিনেনে?
-চিনি।
-দু একজনের নাম করুন।
-রসিদভ জামায়াতিন তুঘরীল তুগান।
-রসিদভকে চিনতেন আপনি আমি রসিদভের বোন।
-রসিদভের বোন আপনি। একটা বিস্ময়বেগ সেই লোকটির কণ্ঠে।
-রসিদভের খবর জানেন? কিছুটা ভারী কণ্ঠস্বর সুরাইয়ার।
-জানি, কিন্তু বলুন কেন এমন হল?
সুরাইয়া কোন জবাব দিল না। সে স্মৃতির গোটাটা হাতড়িয়ে ফিরছিল এই দাড়িওয়ালাকে সে কোথায় দেখেছে। অবশেষে সে প্রশ্ন করল আপনাকে কোথায় দেখেছি তা তো বললেন না?
-আমার প্রশ্নের আগে জবাব দিন।
-রসিদভ বিদ্রোহের শাস্তি পেয়েছে।
মানুষ কি মনে করে, সত্যই সে কোন অপরাধ করেছিল?
সুরাইয়ার সমৃতির দরজা যেন হঠাৎ খুলে গেল। তার গোয়েন্দা দপ্তরে রক্ষিত রাজনৈতিক টার্গেটদের ফটোর প্যানেল তার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ভেসে উঠল। ফটোর আহমদ মুসাকে জলজ্যান্ত সামনে দেখে মুহূর্তের জন্য বিহবল হলো সুরাইয়া। কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে পেছন দিকে আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি এবার আপনাকে চিনেছি আপনি আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা একটু হেসে নির্দ্বিধায় বলল, হ্যাঁ বোন আমি আহমদ মুসা। তুমি রশিদভের বোন। আমাকে তুমি না চিনলেও আমার পরিচয় তুমি পেতে। রশিদভ উত্তর উজবেকিস্তানের প্রথম শহীদ। কিন্তু একটা প্রশ্ন করি তুমি তো আমাকে কোথাও দেখার কথা না। দেখার কথা বলছ কেমন করে, চিনলেই বা কি করে?
সুরাইয়া বলল আমি গোয়েন্দা বিভাগে চাকুরী করি। ফাইলে আপনার ছবি দেখেছি।
-গোয়েন্দা বিভাগে চাকুরী কর? তোমার ভাইয়ের কথা তুমি জানতে না?
-জানতাম, আমি এসব ব্যাপারে সতর্ক হয়ে চলতেও বলেছিলাম। কিন্তু আবেগকে সে দমিয়ে রাখতে পারেনি।
বলতে বলতে কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠল সুরাইয়ার
-তোমার ভাইয়ের জন্য আমরা গর্বিত সুরাইয়া।
-জনাব আমি আমার একমাত্র ভাইকে হারিয়ে বেদনা বোধ করি কিন্তু সে আমারও গর্বের বস্তু।
কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ। তীব্র বেগে এগিয়ে চলছে গাড়ি। নীরবতা ভাঙল আহমদ মুসাই প্রথম। বলল বোন সুরাইয়া সম্ভবত তোমার কাছে অনেক খবর আছে।
-জি হ্যাঁ। বলল সুরাইয়া।
তারপর একটু থেমে আবার সেই কথা বলে উঠল, আমাকে মস্কোতে ট্রান্সফার করা হয়ছে। তাসখন্দ হয়ে আমি সেখানেই যাচ্ছি। আপনি খবর জানতে চেয়েছেন। ঠিকই খবর আছে। মুসলিম সংখ্যাধিক্য নিয়ে গঠিত সরকার ও পার্টি ভেঙ্গে দেবার পর সামরিক ও বেসামরিক সমস্ত মুসলিম আফিসারকে মধ্য এশিয়া অঞ্চল থেকে রুশ অঞ্চলে ট্রান্সফার করে হয়েছে সহায়-সম্পদ সব সহ। মনে হয় তারা আর কোন দিন দেশে ফেরার সুযোগ পাবে না। আমরা মনে করেছিলাম সরকারী কর্মচারীদের ট্রান্সফার করারা মধ্যেই ব্যাপারটা সীমিত থাকবে। কিন্তু তা নয়। রাজনৈতিক ও সমাজনেতাদেরকেও রুশ অঞ্চলে চালান দেয়া হচ্ছে। যাতে করে ক্ষমতাচ্যুত এই নেতারা এখানে থেকে কোন প্রকার অসন্তোষ ছড়াতে না পারে।
আহমদ মুসা চুপ করে তার কথা শুনছিল। সুরাইয়ার কথা থামলেও চুপ করেই থাকল আহমদ মুসা। যেন কোন ভাবনার অতলে নিমজ্জিত সে। অনেকক্ষণ পর কথা বলল আহমদ মুসা। বলল সে, আচ্ছা সুরাইয়া সরকারের কোন শাখা এটা ডিল করছে? কে কোথায় যাচ্ছে এই একজ্যাক্ট রেকর্ডটা কোত্থেকে জানা যাবে?
-এটা কয়েকদিন হল জেনারেল বোরিসের নিজস্ব দপ্তরে চলে গেছে। একমাত্র সেখান থেকেই এটা জানা যেতে পারে।
-আচ্ছা তুমি তো মস্কো যাচ্ছ। সেখানকার গোয়েন্দা বিভাগে যোগ দেয়ার জন্যই?
-জি হ্যাঁ।
-তুমি কি কখনও ভেবছ সাইমুমের সাথে তোমার সম্পর্ক কি হবে?
-অতীতে ভাবতে সাহস পাইনি। আজ মনে হচ্ছে ভাবা দরকার। এখন আপনি যা আদেশ করবেন।
নতুন সমরখন্দ নগরীর প্রবেশ গেট আর বেশী দুরে নয়। গেটের উজ্জল আলোর নীচে চেকপোস্টের অবস্থান স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আহমদ মুসা বলল, আমরা শহর কে বাম পাশে রেখে এখন দক্ষিন দিকে এগিয়ে যাব। তোমাকে গেটে নামিয়ে দিলেই তো চলে।
-জি হ্যাঁ, চলবে।
গাড়ি গেটের কাছাকাছি এসে গেছে। সুরাইয়া পিছন দিকে মাথা ঘুরিয়ে বলল, আমি তো নির্দেশ পেলাম না?
আহমদ মুসা বলল সুরাইয়া তুমি সচেতন এবং বুদ্ধিমতী। মস্কো গিয়ে তোমার চলার পথ তোমাকেই খুজে নিতে হবে। আমি আশা করি তা তুমি পারবে। নির্দেশও তুমি সে পথ থেকেই পাবে।
সুরাইয়ার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, বলল আমি তা পারব। দোয়া করবেন আমার চাকুরী যেন আমার জাতির কাজেই লাগে।
গেটের এপারেই বাস স্টপেজ এবং একটি যাত্রী ছাউনি। যাত্রীদের বিশ্রাম নেবার জায়গা। সুরাইয়া সেখানেই নেমে গেল।
সুরাইয়াকে নামিয়ে দিয়ে গাড়ি ছুটল দক্ষিণ দিকে। কর্নেল কুতাইবা গাড়ি ড্রাইভ করছিল। আহমদ মুসার পাশে ছিল হাসান তারিক।
তুর্কমেনিস্তানে ১০ দিনের সংগঠনিক সফর শেষে তারা ফিরছে হেড কোয়ার্টার শহীদ আনোয়ার পাশা ঘাটিতে।
পথ অনেক দুরের।
ঝড়ের বেগে এগিয়ে চলছে গাড়ি।
৫
শাহিন সুরাইয়ার সহপাঠিনী বান্ধবীর ছোট বোন রাইছা। সেই সুত্রে সুরাইয়া গত তিন উইক এন্ড অর্থাৎ শনিবার বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রাবাসে রাইছার ওখানে গেছে। রাইছা খুশি হয়েছে, অনেক আলাপ হয়েছে তার সাথে। গত শনিবারে রাইছার রুমে দেখা হয়েছে খোদেজায়েভা এবং তাহেরাভার সাথে। আলোচনায় দেশের প্রসংগও এসেছে। বুঝা গেছে দেশের সব ব্যাপারেই তারা সচেতন। এমনকি সরকারী কর্মচারী ও জননেতৃবৃন্দের গনস্থানান্তর সম্পর্কিত সব খবর তারা জানে। কিন্তু তাদের প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারটা অতি সন্তর্পণে এড়িয়ে গেছে। সাইমুম সংক্রান্ত কোন প্রসংগ তো তোলারই সুযোগ হয়নি। তবে সুরাইয়ার সন্দেহ নেই এই সচেতন মেয়েরা কম্যুনিস্ট সরকারের ধামাধরা হতেই পারে না।
অফিসের টেবিলে বসে শাহিন সুরাইয়া গত তিন সপ্তাহের মস্কো জীবনের হিসাব নিকাশ করছিল। কাল আবার শনিবার রাইছার ওখানে যাবে সুরাইয়া।
দেয়াল ঘড়ি থেকে দশটা বাজার সংকেত এল। দশটা অফিসের কাজ শুরুর সময়। সুরাইয়া সব ঝেড়ে ফেলে সামনের ফাইলের দিকে মনোযোগ দিল।
সুরাইয়া মস্কো এসে কোন বাইরের এসাইনমেণ্ট পায়নি। তাকে অফিসে বসানো হয়েছে। সরকারের প্রশাসনিক নির্দেশের একটা কপি গোয়েন্দা বিভাগে আসে। সেই নির্দেশেগুলো রেকর্ড করা এবং তা গোয়েন্দা বিভাগের নির্বাহী ব্রাঞ্চে পাঠানোই তার দায়িত্ব। কাজটা একদমই একঘেয়ে এবং কষ্টকর। এই কয় দিনেই তার গোয়েন্দা অফিসারের চরিত্র কেরানী চরিত্রে রূপান্তরিত হবার যোগাড় হয়েছে।
সামনের ফাইল খুলে রেজিস্টারে নিতে শুরু করল সুরাইয়া। এ সময় মুভিং ক্যারিয়ারে একটা ফাইল এসে বাম দিকের ডেস্কে ছিটকে পড়ল। হোম মিনিস্ট্রির ফাইল। টপ সিক্রেট এবং ইমিডিয়েট ট্যাগ লাগানো। কেন জানি তৎক্ষণাৎ ফাইলটি দেখার কৌতুলহ সে রোধ করতে পারল না। হাতের কাজ বন্ধ করে ফাইলটি সে টেনে নিল। খুলে দেখল সংক্ষিপ্ত একটা নির্দেশ, ভ্যাকেশনে এশিয়ার সকল মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীর বাড়ি যাওয়া নিষিদ্ধ। তাদের উপর চোখ রাখতে হবে, আটকাতে হবে তাদেরকে কোন বিনোদন ট্যুরের ব্যবস্থা করে হলেও।
পড়া শেষে ফাইল ক্লোজ করে সেটা আবার সেই ডেস্কের উপর রেখে দিয়ে আগের কাজে মনোযোগ দিল সুরাইয়া। এ সময় দরজা ঠেলে দ্রুত প্রবেশ করল সেকশন ইনচার্জ টেনিসভ। সে এসে ডেস্ক থেকে হোম মিনিস্ট্রির সেই ফাইল তুলে নিয়ে বলল, কখন এসেছে এ ফাইল?
-এই মাত্র।
-রেকর্ড করেছ?
-না।
-দেখেছ?
-না।
দেখার কথা অস্বীকার করল সুরাইয়া। অফিসারকে ফাইলটি তুলে নিতে দেখেই সে বুঝেছে ফাইলটা ভুল করে এখানে পাঠানো হয়েছে।
এখন দেখার কথা স্বীকার করলে ঐ ফাইলের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে গোয়েন্দা দফতরের আইন অনুযায়ী অন্তরীণ থাকতে হবে। অন্তরীণ থাকা তার কাছে বড় কথা নয় কিন্তু এই মুহূর্তে অফিসারটির হন্তদন্ত অবস্থা দেখে ঐ তথ্যটিকে তার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে, যা সাইমুমের কাজে আসতে পারে। সুতরাং মিথ্যা কথা বলা এখানে সে দূষণীয় মনে করেনি।
অফিসারটি ফাইল নিয়ে যেতে যেতে বলল, ফাইলটা আমার কাছেই থাকবে। রেকর্ডের সিরিয়াল আমার একথার নোট থাকলেই চলবে।
অর্থাৎ ফাইলটা রেকর্ড করার জন্যে সুরাইয়াকে দেওয়া হবে না। যেহেতু সে তুর্কী এবং বিশ্বাসে মুসলমান তাই তাকে তাদের বিশ্বাস নেই। ঠোঁটে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল সুরাইয়ার। মনে মনে বলল, বিশ্বাস করলে তাকে দেশের মাটির কোল থেকে ছিন্ন করে এই বিদেশ বিভূঁইয়ে এনে টেবিলে আটকে রাখত না।
অবরুদ্ধ একটা ক্ষোভ দীর্ঘ নিঃশ্বাসের আকারে বেরিয়ে এল সুরাইয়ার বুক থেকে।
সুরাইয়া আবার মনোযোগ দিতে চেষ্টা করল ফাইলে। কিন্তু ফাইলে মন বসছে না। মনে হল এ খবরটা তাড়াতাড়ি সাইমুমের কাছে পৌঁছানো দরকার। আর দিন পরেই ভ্যাকেশান। এখনই ওরা জানতে না পারলে সরকারের ফাদে ছাত্ররা সবাই আটকা পড়ে যাবে, কেউ দেশে যেতে পারবেনা।
সুরাইয়া ভাবল কাল শনিবার, না আজই একবার তাকে রাইছার কাছে যেতে হবে। পথ তাকে বের করতে হবে সাইমুমকে এ খবর জানানোর। আহমদ মুসার নির্দেশের কথা তার মনে পড়ল, পথ বের করার অর্থ আহমদ মুসা সাইমুমকে খুঁজে বের করার কথাই বলেছে। আহমদ মুসা তাকে সাইমুমের খোঁজ দিয়ে দিতে পারতো কিন্তু তা না দিয়ে খুঁজে নিতে বলেছে তাকে। এতে প্রথমে তার মন খারাপ হয়েছিল, পরে বুঝেছে সাইমুমের মত একটা আন্দোলনের জন্য এটাই স্বাভাবিক। এই বোধ আসার পর আহমদ মুসার নেতৃত্বের প্রতি তার দুরদর্শিতার প্রতি সুরাইয়ার ভক্তি শ্রদ্ধা আকাশস্পর্শী হয়ে উঠেছে। সে যে তিন সপ্তাহেও সাইমুমকে খুঁজে পায়নি এটা তার দুর্বলতা, এজন্যে নিজের কাছেই নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে সুরাইয়ার।
সুরাইয়া ঠিক করল আজ অফিস শেষে বাসায় না ফিরে সে সোজা রাইছার ওখানে চলে যাবে। রাইছা ১২ টার দিকেই ক্লাস থেকে হলে ফিরে আসে। দুপুরেই তার সাথে দেখা হবে।
সুরাইয়া একটু আগে সাড়ে ১২ টার দিকেই অফিস থেকে বেরুল, যেতে হবে বাস বদল করে, সময় লাগবে তাতে।
ঠিক দেড়টার সময় সুরাইয়া বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পৌঁছল। রাইছার হলে পৌঁছতে আরও ২০ মিনিট সময় লাগলো তার। সুরাইয়া যখন রাইছার দরজায় দাঁড়াল, তখন বেলা ১ টা বেজে ৫০ মিনিট।
রাইছা রুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। কিছুক্ষণ দাঁড়াল সুরাইয়া কিন্তু ভেতর থেকে সাড়া শব্দ নেই। অবশেষে দরজায় টোকা দিল এক দুই তিন। আবার কছু সময় কেটে গেল। টোকা দিল আবার সেই তিনটা। কোন সাড়া নেই। আবার কিছু সময় অপেক্ষা করল সুরাইয়া। কি ব্যাপার, রাইছা কি ঘুমালো নাকি এই অসময়ে? অসুস্থ নয়তো সে?
আর টোকা নয় এবার নাম ধরে ডাক দিল সুরাইয়া।
এবার একটু পরেই দরজা খুলে গেল। দরজা খুলেই রাইছা বলল, মাফ করবেন একটু দেরি হয়ে গেল।
আমিতো ভাবছিলাম তুমি ঘুমিয়ে গেছ, বলে ঘরে ঢুকল সুরাইয়া। দেখল রাইছার সাথে আরেকটা মেয়ে।
সুরাইয়া রাইসার দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে চাইতেই রাইছা বলল, এ আমার বান্ধবী। নাম ফাতিমা ফারহানা। তাজিক মেয়ে।
ফাতিমা ফারহানার সাথে কুশল বিনিময়ের পর সুরাইয়া বলল, তোমরা বোধ হয় নামাজ পড়ছিলে?
আকস্মিক এই প্রশ্নে রাইছা এবং ফাতিমা ফারহানা দুজনেই চমকে উঠল এবং মুহূর্তের জন্যে অপরাধ ধরা পড়ার মত একটা বিমূঢ় ভাব দেখা গেল তাদের মধ্যে।
তাদের অবস্থা দেখে হেসে উঠল সুরাইয়া। তারপর রাইছার গালে একটা টোকা দিয়ে বলল, তোমরা তো কোন অপরাধ করনি, আমি আনন্দিত হয়েছি।
রাইছা বলল, আপনি জানলেন কি করে আমরা নামাজ পড়ছিলাম?
-জানতে পারিনি, বুঝতে পেরেছি।
-কেমন করে?
-তোমাদের মুখের পবিত্রতা দেখে এবং তোমাদের দুজনের মাথায় ওড়না দেখে।
রাইছা ও ফারহানা দুজনেই এ কথা শুনে মাথায় হাত দিল এবং হেসে ওড়না নামিয়ে নিল।
সুরাইয়া গিয়ে ওদের মাথায় ওড়নাটা আবার তুলে দিয়ে বলল, নামিওনা বেশ লাগছে। আমাদের ঐতিহ্য কত সুন্দর!
-সুন্দর ঐতিহ্য আমরা অনুসরণ করতে পারছি কই? এইতো মাথার এই ওড়না কারও নজরে পড়লে সন্দেহ শুরু হয়ে যাবে যে, আমরা ধর্মের আফিম বোধ হয় আবার গলঃধকরণ করছি।
ঠিক বলেছ ফারাহানা, বলে সুরাইয়া একটু পিছন ফিরে গিয়ে দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে এসে বলল, এস তোমরা, বস, আমার জরুরী কথা আছে।
সবাই বসলে সুরাইয়া বলল, আমি একটা খবর নিয়ে এসেছি।
সামনের ভ্যাকেশনে মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের দেশে যেতে দেওয়া হবে না, এ সংক্রান্ত অর্ডার খুব শীঘ্রই বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে আসছে।
-সত্যি! প্রায় কপালে চোখ তুলে প্রশ্ন করল ফারহানা।
-সত্যি। উত্তর দিল সুরাইয়া।
তারপর সবাই চুপচাপ।
নিরবতা ভাঙ্গল সুরাইয়াই। প্রশ্ন করল, তোমরা তো ছাত্র, বলতে পার সরকার কেন এই পদক্ষেপ নিচ্ছে?
রাইছা এবং ফারহানা পরস্পর একবার চোখ চাওয়া চাওয়ি করে চুপ করে থাকল। মনে হল তারা এ প্রশ্নে অস্বস্তি বোধ করছে।
সুরাইয়া একটু হাসল। বুঝতে পারছি তোমরা বলতে একটু দ্বিধা করছ। আমার পরিচয় শুন। আমি গোয়েন্দা বিভাগের একজন অফিসার। সারাকায়ার ঘটনা তোমরা নিশ্চয়ই জান। সে ঘটনায় আমার ছোট ভাই রশিদভ সাইমুমের হয়ে শহীদ হয়েছে। শাস্তিমূলক ট্রান্সফারের শিকার হয়ে আমাকে মস্কো আসতে হয়েছে। আসার পথে ভাগ্যক্রমে সাইমুম নেতা আহমদ মুসার সাথে আমার দেখা হয়, এখানে সাইমুমের সন্ধান করা এবং তাকে সাহায্য সহযোগিতা করা তারই নির্দেশ।
রাইছা ও ফারহানার চোখ দুটি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ফারহানা সুরাইয়ার একটা হাত তুলে নিয়ে চুমু দিয়ে বলল, মাফ করুন আপা।
আমরা কি যে খুশি হলাম আপনাকে পেয়ে। একটু থেমে ফারহানা গভীর আগ্রহ নিয়ে বলল, কোথায় ওর সাথে আপনার দেখা হয়েছে?
-উজবেকিস্তানের মরুভূমিতে। বলে সুরাইয়া তার কাহিনীটা খুলে বলল তাদের। ওরা প্রায় মুখ হা করে গোগ্রাসে গিলল সে কাহিনীটা।
আবার প্রশ্ন করল ফারহানাই, ও কেমন আছে, ভাল?
রাইছা অলক্ষ্যে একটা চিমটি কাটল ফারহানাকে। মুখে গাম্ভীর্য টেনে বলল, এসব ব্যক্তিগত প্রশ্ন কেন? ওর প্রশ্ন শুনে উত্তর এখনো দেয়া হয়নি।
ফারহানার মুখে লজ্জার একটা লাল আভা খেলে গেল।
এ দৃশ্যটা নজর এড়াল না গোয়েন্দা অফিসার সুরাইয়ার। কিন্তু তা এড়িয়ে গিয়ে বলল, হ্যাঁ ওটা কি ব্যাপার বলো। ফারহানার দিকে তাকিয়ে নিয়ে রাইছা বলল, সাইমুমের নির্দেশ এসেছে এবার ভ্যাকেশনে সবাইকে দেশে যেতে হবে। কর্মচারী ব্যবসায়ী যারা তাদেরও এ সময় দেশে ফিরতে হবে।
-কর্মচারীদেরকেও?
-হ্যাঁ।
-সবাই কি জানে? আমি তো জানতাম না।
-আপনার সাথে আমাদের পরিচয় না হবার কারনেই আপনি জানতে পারেন নি।
রাইছা কিছু বলার আগেই ফারহানা বলল, ভ্যাকেশনের আর মাত্র ১৫ দিন বাকী। ওরা আট-ঘাট বেধে ফেলার আগেই তো আমাদের কিছু করা দরকার।
-হ্যাঁ তোমরা চিন্তা কর। এ ব্যাপারে যতটুকু সহযোগিতা করতে পারি আমি করব। বলে দাঁড়াল, সুরাইয়া। রাইছা ও ফারহানাও উঠে দাঁড়াল। দুজনেই বলে উঠল, বসবেন না, একটু কিছু……..
-না না, আজ নয়। অফিস থেকে সোজা এসেছি।
সুরাইয়া ঘুরে দাঁড়াতে গিয়ে মুখটা আবার ফারহানার দিকে ফিরিয়ে নিয়ে তার থুতনিতে একটা টোকা দিয়ে বলল, ওকে ভাল সুস্থই দেখেছি। কবে দেখা হল ওর সাথে তোমার?
আকস্মিক এ প্রশ্নে ফারহানা যেন বিব্রত হয়ে পড়ল। একরাশ লজ্জা ছড়িয়ে পড়ল তার চোখে- মুখে।
ফারহানা কিছু বলার আগেই রাইছা বলল, সে এক বিরাট কাহিনী। আপা ঘুমন্ত রাজকুমার কি করে পাতালপুরীতে এল, কি করে রাজকুমারীর জীবন কাঠির স্পর্শে রাজকুমার জাগল সে এক অপরুপ….
ফারহানা রাইছাকে এক ধাক্কা দিয়ে বলল, রাইছা বড় বেয়াদব। আপা ওকে বিশ্বাস করবেন না।
ফারহানার মুখটা লাল হয়ে গেছে লজ্জায়।
রাইছা তার কথা সমাপ্ত করতে না পারার দুঃখে গলা বাড়িয়ে আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল।
সুরাইয়া হাসতে হাসতে ঘর থেকে বেরুতে বেরুতে বলল, আজ আর নয়, আরেকদিন এসে তোমাদের কথা শুনব।
