সৈনিক ভ্যানটি এগিয়ে চলছে আহমদ মুসাদের নিয়ে। আহমদ মুসা ড্রাইভিং সিটে। পাশে কুতাইবা। পেছনে দু’জন।
ড্রাইভিং সিটে একটা অয়্যারলেস সেট পড়েছিল। আহমদ মুসা সেটা কর্ণেল কুতাইবার হাতে তুলে দিয়ে বলল, দেখ কোন কাজে লাগে কিনা?
সামনেও একটা গাড়ির হেডলাইট দেখা গেল। অর্থাৎ উত্তর দিকের মত দক্ষিন দিক থেকেও আরেকটা গাড়ি আসছে। আহমদ মুসা বলল, আমরা আসছি যখন ওরা জানে তখন ফাঁদে ফেলার কোন আয়োজনই ওরা বাদ রাখেনি কুতাইবা।
একটু থামল আহমদ মুসা। তারপর বলল, আমুদরিয়া ব্রিজের অপর মাথায় আমাদের লোকেরা অপেক্ষা করছে। ওখানে আমাদের পৌছতেই হবে।
এ সময় কুতাইবার হাতের ওয়্যারলেস কথা বলে উঠল। আর্মি কোডে কথা বলছে। উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর জানতে চাচ্ছে, কি হয়েছে, কি ঘটেছে?
কর্নেল কুতাইবার আর্মি কোড মুখস্থ। সে উত্তর দিল, ঘটনাটা পরিষ্কার অন্তর্ঘাতমুলক, অন্য কিছু নয়। আমরা ফিরে আসছি। একবার আমুদরিয়ার ওপারটা ঘুরে আসব।
কুতাইবার দিকে চেয়ে হাসল আহমদ মুসা। বলল, শুকরিয়া, কুতাইবা। ওয়েল ডান।
সামনে থেকে যে গাড়ি দু’টো আসছে ও দুটোও আর্মির গাড়ি। আলোক সংকেতে এটা জানিয়ে ওরা এ গাড়ির পরিচয় জানতে চাচ্ছে।
কর্নেল কুতাইবার দিকে একবার তাকিয়ে আহমদ মুসা আলোক সংকেত দিল, সব ঠিক আছে, আমরা ওদিকের পেট্রলে যাচ্ছি।
কুতাইবা আহমদ মুসার দিকে চেয়ে হাসল। বলল, ধন্যবাদ মুসা ভাই। আপনার আলোক-সংকেত নিখুঁত হয়েছে।
আহমদ মুসা কম্যুনিস্ট সেনাবাহিনীর শব্দ, আলো এক কথায় আর্মি কোড কর্নেল কুতাইবার কাছ থেকেই শিখেছে।
সামনে অর্থাৎ দক্ষিন দিক থেকে আসা গাড়িটি সাইড নিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল উত্তর দিকে। আহমদ মুসার গাড়ি সাইড নিয়ে ও গাড়িটাকে পেরিয়ে এসে দ্রুত ছুটে চলল দক্ষিন দিকে। আহমদ মুসা তার গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দিল। কুতাইবার দিকে তাকিয়ে বলল, ও গাড়িটা স্পটে গিয়েই সব বুঝতে পারবে এবং বুঝতে পেরে শুধু পাগলের মত ফিরে আসা নয়, খবরটা সে রিলে করবে সব জাগায়। তার আগেই আমাদের ব্রীজ পেরুতে হবে।
তীর বেগে এগিয়ে চলেছে গাড়ি। দূরে আমুদরিয়া ব্রীজের উপর আলোর সারি দেখা যাচ্ছে। গাড়ি এগিয়ে চলেছে ঐ ব্রীজ লক্ষ্যে। ব্রীজের ওপারে সাইমুমের যে লোকেরা তাদের রিসিভ করার কথা তারা কি আসতে পারবে এদের মারমুখো-মরিয়া এই আয়োজনের মধ্যে?
আর এক মিনিটের মধ্যে গাড়ি পৌছে যাবে ব্রীজের মুখে। আরো কিছুটা পথ এগিয়েছে গাড়ি। এমন সময় ব্রীজের মুখে লালবাতি জ্বলে উঠল। ছ্যাঁৎ করে উঠল আহমদ মুসার মন। খবর কি এখানে ইতিমধ্যে পৌঁছে গেছে? না এটা কোন রুটিন ব্যাপার?
স্টিয়ারিং হাতে আহমদ মুসা কুতাইবার দিকে মুখ না ঘুরিয়েই বলল, তুমি সেনাবাহিনীর একজন কর্ণেল। এ হিসেবেই পরিস্থিতির মোকাবিলা করবে। এখানে যাদের পাবে তারা নিশ্চয়ই জুনিয়র অফিসার।
গাড়ির হেডলাইটে দেখা যাচ্ছে ব্রীজের মুখে একজন অফিসার দাঁড়িয়ে, তার পাশেই একটা গাড়ি দাঁড়ানো। আহমদ মুসা পকেট থেকে মিনি দূরবীনটা বের করে চোখে লাগাল। দেখল, দাঁড়ানো অফিসারের কাঁধে পুলিশ অফিসারের ইনসিগনিয়া, গাড়িটাও পুলিশের। খুশি হলো আহমদ মুসা। বিষয়টা কুতাইবাকে জানিয়ে বলল, ওদের ধমক দিলেই চলবে। আর ওরা যখন অস্ত্র বাগিয়ে নেই, তখন নিশ্চয় ওরা সব খবর জানে না।
আহমদ মুসা গাড়িটা একদম পুলিশ অফিসারটির পাশে দাঁড় করাল, যাতে কুতাইবা তার মুখোমুখি হতে পারে।
কুতাইবার বাম বাহুটি গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আছে। তাতে কর্ণেলের ইনসিগনিয়া জ্বল জ্বল করছে। পুলিশ অফিসারটি তা দেখেই লম্বা একটা স্যালুট দিল।
কুতাইবা মাথাটা ঈষৎ ঝুঁকিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, এই লাল সংকেত কেন?
পুলিশ অফিসারটি নরম কন্ঠে বলল, স্যার এই মাত্র নির্দেশ এল সব গাড়ি আটকে রাখার জন্য।
-ও অল রাইট। শত্রুরা ঢুকে পড়েছে কিনা, এর দরকার আছে। কোন গাড়ির নাম্বার কিছু জানিয়েছে?
না স্যার বলেছে চেষ্টা করছে। তবে গাড়িটা সেনাবাহিনীর ক্যারিয়ার ভ্যান।
ছ্যাৎ করে উঠল কুতাইবার মন। কিন্তু বাইরে তার কোন প্রকাশ ঘটল না। খুশী হলো যে নাম্বারটা তারা এখনও পায়নি।
এ সময় আহমদ মুসা স্টার্টারে একটু চাপে দেয়ায় ইঞ্জিন শব্দ করে নড়ে উঠল গাড়িটি। সংকেত বুঝতে পেরে কুতাইবা পুলিশ অফিসারকে লক্ষ্য করে বলল, ওকে, চারদিকে নজর রাখ আমরা আসছি।
পুলিশ অফিসারটিকে একটু বিহবল মনে হল। সে যেন কিছু বলতে চায় কিন্তু পারল না। তার সামনে দিয়ে গাড়িটি তীরের মত উঠে গেল ব্রীজে।
আহমদ মুসা বলল, আলহামদুলিল্লাহ, তোমার অভিনয় ভাল হয়েছে। ব্রীজের সামনের মুখেও এ ধরনের বাধা নিশ্চয় আছে কিন্তু ওখানে আর দাঁড়াতে চাই না।
ব্রীজের মাঝামাঝি এসে আহমদ মুসা সাইমুমের কোডে একবার হর্ণ বাজালো। মুহুর্তকাল পরে সামনে ব্রীজের ওপারে অনেক দুর থেকে আরেকটা হর্ণ বেজে উঠল সাইমুমের কোডে।
আহমদ মুসা এবং কুতাইবা দুজনের মুখই খুশীতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ব্রীজের সামনের প্রান্তটি এখন দেখা যাচ্ছে। ওখানে সেই লাল আলো। অর্থাৎ দাঁড়াতে হবে।
দেখা গেল ব্রীজের মুখের পাশেই একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনে দুজন পুলিশ অফিসার। হঠাৎ এ সময় আরেকটা গাড়ি এসে সেখানে দাঁড়াল। সেনাবাহিনীর একটি সুদৃশ্য জীপ। নিশ্চয় গাড়িটি কোন উচ্চপদস্থ অফিসারের।
জীপটি দাঁড়াল রাস্তার ডান ধার ঘেঁষে। বাম দিকে প্রচুর জায়গা। আহমদ মুসা ঠিক করল এদিক দিয়েই সে স্লিপ করবে।
এ সময় সেখানে থেকে আহমদ মুসার গাড়ির প্রতি সংকেত এল গাড়ি দাঁড় করাবার জন্য। আহমদ মুসা বলল, কুতাইবা আমরা না দাঁড়ালে অবশ্যই ওরা গুলি করবে।
একটু থামল আহমদ মুসা। একটু হাসল। তারপর নিজেই আবার বলল, আশা করি এ সুযোগ তারা পাবে না।
আর দু’শ গজ দুরেই ব্রীজের মুখ, ওখানেই দাঁড়িয়ে আছে জীপটি। আহমদ মুসা গাড়ির গতি কমিয়ে দিল। বোঝা যাচ্ছে ব্রীজের মুখে গিয়েই গাড়িটি দাঁড়াবে। বিস্ময়ে একবার কুতাইবা কিছু বলতে সাহস পেল না। কিন্তু ভিতরে ভিতরে ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল কুতাইবা। ঐ জীপের উর্ধ্বতন সামরিক অফিসারের সন্মুখে পড়লে তার কিছুই বলার থাকবে না সেখানে।
আহমদ মুসার গাড়িটি ধীর গতিতে ব্রীজের মুখ পেরিয়ে জীপটির সমান্তরালে দাঁড়িয়ে পড়তে যাচ্ছে।
ব্রীজের ডানপাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন পুলিশ অফিসার আহমদ মুসার গাড়ির দিকে এগুবার জন্য নড়ে উঠল। জীপটির দরজাও নড়ে উঠল। মাঝ বয়সি একজন জেনারেল গাড়ি থেকে নামার জন্য তৈরী হলেন। জীপের পেছনে জেনারেলর ৪ সদস্যর স্কোয়াডটিও জীপের দরজায় হাত দিল তা খোলার জন্য।
গড়িয়ে গড়িয়ে আহমদ মুসার গাড়িটি জীপের সমান্তরালে এসেই যেন প্রচন্ড এক লাফ দিয়ে উঠল। প্রবল এক ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়িটি তীরের মত ছুটে চলল সামনে।
পুলিশ অফিসার দুজন জীপের ঐ পাশ দিয়ে জীপের মাথা বরাবর পৌঁছেলিল। হাতের স্টেনগান তাদের মাথার উপর উঠল কিন্তু সামনে জীপের আড়াল থাকায় আহমদ মুসার গাড়িকে তাক করতে পারল না।
জেনারেল এবং তার স্কোয়াড জীপ থেকে নামছিল। যখন নামা তাদের শেষ হলো, তখন আহমদ মুসার গাড়ি অনেক দুর এগিয়ে গেছে। স্টেনগানের গুলী তখন সেখানে অকেজো।
জেনারেল জীপটি ঘুরিয়ে পিছু নেবার নিদেশ দিল। কিন্তু সামনের দিকে তাকিয়ে দেখল, গাড়ির পেছনের যে আলো দেখা যাবার কথা তা দেখা যাচ্ছে না। অথাৎ সব আলো নিভিয়ে দেয়া হয়েছে। অন্ধকারে হাতড়ানো নিরর্থক।
জেনারেল অয়্যারলেস তুলে নিল হাতে।
ঝড়ের বেগে চলছিল আহমদ মুসার গাড়ি। সব লাইট নিভানো। অন্ধকারে এক দৈত্যর মতই মনে হচ্ছে গাড়িটাকে।
অনেক খানি এগিয়ে সাইমুম কোডে আবার হর্ণ বাজালো আহমদ মুসা। মুহুর্তেই উত্তর এল পাশের এলাকা থেকে। অল্পক্ষণের মধ্যেই দক্ষিণ থেকে একটা হেডলাইট এগিয়ে এল। আলোর সংকেত দেখে বুঝল ওটা সাইমুমের গাড়ি।
আহমদ মুসা ও কুতাইবা গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। পেছন থেকে ওরা দুজনও নামল।
ক্যারিয়ার ভ্যানটি ফেলে রেখে সাইমুমের জীপটিতে চড়ে আহমদ মুসা এবং অন্যরা একটা ছোট রাস্তা ধরে এগিয়ে চলল পশ্চিম দিকে। আঁকা-বাঁকা পথে দশ মিনিট ড্রাইভের পর তারা কলখজের লিগ্যাল এইড অফিসে এসে পৌঁছল।
গাড়ির ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে আবদুল্লাহ জমিরভ গাড়ির দরজা খুলে আহমদ মুসা ও কুতাইবাকে নামিয়ে নিয়ে বলল, এখন আপনাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে আমার সাথী রসুলভ। আমি গাড়ি নিয়ে এখানে আমার অফিসেই থাকব। জমিরভ সারাকায় কলখজের লিগ্যাল এইড অফিসের জাজ এডভোকেট।
আহমদ মুসা বলল, তুমি যাচ্ছ না তাহলে?
-না জনাব, আমার দায়িত্ব পথের এ দিকটা পাহারা দেয়া। যদি কেউ ফলো করে থাকে, কিংবা জানতে পেরে থাকে, তাহলে আমার অফিস পর্য্ন্ত এসেই যেন সে ঠেকে যায়।
আহমদ মুসা সবাইকে নিয়ে রসুলভের পিছনে পিছনে লিগ্যাল অফিসের পাশের গলিপথ ধরে কলখজের বিশাল গোডাউন চত্বরের দিকে এগিয়ে চলল। সাইমুমের আজ বৈঠক বসেছে ঐখানেই।
৩
‘ফ্র’ এর নতুন সিকিউরিটি চীফ জেনারেল বোরিস বেবিয়ার এর গোটা মুখটাই লাল টকটকে। বুকভরা ক্রোধ ও ক্ষোভের আগুন যেন ঠিকরে পড়েছে মুখ দিয়ে।
চেয়ার থেকে উঠে সে পায়চারী করছিল।
প্রশাসন ও নিরাপত্তা বিভাগের কয়েকজন উর্ধ্তন অফিসার টেবিল ঘিরে বসে আছে। সকলেরই মুখ গম্ভীর, অবস্থা বিব্রতকর।
জেনারেল বোরিসকে গত রাতের ঘটনা যেন কুরে কুরে খাচ্ছিল। তার চোখের সামনে দিয়ে আহমদ মুসা গাড়ি হাকিয়ে চলে গেল, কিছুই করতে পারল না সে! তাদের শক্তি-সামর্থ্যকে আহমদ মুসা যেন ছেলেখেলার মত তাচ্ছিল্য করল।
কোথায় হাওয়া হয়ে গেল তারা। ব্রীজের পশ্চিমে কিছু দুরে সেনাবাহিনীর ক্যারিয়ার ভ্যানটা পরিত্যক্ত পাওয়া গেছে। কোন দিকে গেল ওরা? প্রধান সড়ক ধরে যায়নি। যেখানে গাড়ি পাওয়া গেছে সেখান থেকে তিনটা গলি তিন দিকে বেরিয়ে গেছে। রাতেই সে গলিগুলো এবং গলির আশে পাশের জায়গা আতি-পাতি করে সার্চ করা হয়েছে, কিন্তু কোন কিছুই পাওয়া যায়নি। রাত তখন তো ১০টাও হয়নি। লোকজন সবাই রাস্তায় কিংবা বাড়ি বা বাড়ির আশে পাশেই ছিল। কিন্তু কেউ কিছুই বলেনি। সবারই এক জবাব, তারা তেমন কিছু দেখেনি। সব গাদ্দার। এরা দেখলেও কিছু বলবে না। ব্যাপারটা তাই ঘটেছে। তা না হলে নতুন চারজন লোক সবার সামনে দিয়ে চলে গেল আর কারোর নজরে পড়ল না, এটা একেবারেই মিথ্যা কথা। ঠিক আছে, মিথ্যার শাস্তি ওরা পাবে।
উত্তেজিত জেনারেল বোরিস তার অস্থির পায়চারীটা থামাল। থেমে দাঁড়িয়ে টেবিলের একেবারে ডান পাশে টেকো মাথা এক রাশ দুঃশ্চিন্তার ছাপ মুখে নিয়ে বসে থাকা গোয়েন্দা অফিসার কর্নেল ভাদিনের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার তদন্ত শেষ হয়েছে? জামায়াতিন মরল কার গুলিতে?
কর্নেল বলল, আমাদের গোয়েন্দা কর্মীর গুলিতে।
-অর্থাৎ জামায়াতিন বিদ্রোহীদের পক্ষে যোগ দিয়েছিল?
-ব্যাপারটা তাই দাঁড়াচ্ছে। বলল ভাদিন।
-সবগুলো ডেড বডি পরীক্ষা শেষ হয়েছে?
-হ্যাঁ।
-উল্লেখযোগ্য কিছু আছে তাতে?
কর্নেল ভাদিন একটু নড়ে-চড়ে বসলো। তারপর বলল, গাড়িতে বিস্ফোরণে যারা মারা গেছে তাদের বাদ দিলে অবশিষ্ট দুজন ছাড়া সবাই মারা গেছে সাইমুমের বিশেষ ধরনের পিস্তুল এম-১০ এর গুলিতে। আর দুজন মারা গেছে সাধারণ পিস্তলের গুলিতে। একজনের দেহে ছিল একটা গুলি। আরেকজনের দেহে দুটি।
-এগুলীগুলো কোন পিস্তল থেকে তাহলে এসেছে?
-একটা পিস্তল জামায়াতিন। তার মৃত দেহের কাছেই তার পিস্তলটি পাওয়া গেছে। ওটা থেকে একটা গুলী ছোঁড়া হয়েছিল। অন্য দুটি গুলীর পিস্তলের সন্ধান এখনও পাওয়া যায়নি।
এ সময় কথা বলে উঠল পুলিশ প্রধান তুরিন। সে টেবিলের বাম প্রান্তে বসেছিল। বলল সে, আমরা সারাকায়ার সবগুলো পিস্তল সিজ করেছি এবং সেগুলোকে পাঠানো হয়েছে কেমিক্যাল পরীক্ষার জন্য। পরীক্ষার রিপোর্ট এখনি পাওয়া যাবে। তাতে হয়তো ঐ দুটো গুলীর উৎসের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।
তুরিন থামতেই সহকারী পুলিশ প্রধান এসে ঘরে প্রবেশ করল।
তার দিকে চেয়ে তুরিন বলল, এনেছ রিপোর্ট?
‘এনেছি’ বলে সহকারী পুলিশ প্রধান পকেট থেকে দুটো পিস্তল এবং রিপোর্টের কাগজ পুলিশ প্রধান তুরিনের হাতে তুলে দিল।
কাগজের দিকে নজর বুলিয়ে জেনারেল বোরিসের দিকে তাকিয়ে তুরিন বলল, স্যার আমাদের এক জনের দেহ থেকে যে দুটি গুলী পাওয়া গেছে তা দুজনার দুই পিস্তল থেকে এসেছে।
-কার পিস্তল? বলল জেনারেল বোরিস।
তুরিন পিস্তল দু’টি জেনারেল বোরিসের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলল, একটা হল তুঘরীল তুগানের এবং অন্যটা রশিদভের।
-এ কি বলছ! সত্যি বলছ তুরিন?
সত্যি স্যার, দেখুন পিস্তলের সাথের ট্যাগে মালিকের নাম রয়েছে।
জেনারেল বোরিস তুঘরীল তুগানের পিস্তলটি হাতে নিয়ে ট্যাগটির দিকে একবার নজর দিয়ে বলল, এর অর্থ কি তুরিন? কাল তো তুঘরীল তুগান সারাক্ষণ আমাদের সাথেই ছিল।
তুরিন বলল, রাসায়নিক রিপোর্ট বলছে রশিদভ ও তুঘরীল তুগানের এ পিস্তল থেকে এক সাথেই গুলী ছোঁড়া হয়েছে এবং গুলী দুটি আমাদের দ্বিতীয় লোককে হত্যা করেছে। তুঘরীল তুগান ও রশিদভের কাছ থেকেই ঘটনার সবটা জানা যাবে।
জেনারেল বোরিস মাথা নেড়ে বলল, ওদের কি গ্রেফতার করা হয়েছে?
উত্তর দিল সহকারী পুলিশ প্রধান। বলল, পুলিশ পাঠান হয়েছে। এখনি তারা গ্রেফতার করে নিয়ে আসবে।
এরপর একটুক্ষণ নীরবতা।
নীরবতা ভঙ্গ করল কর্নেল ভাদিন। বলল, স্যার, জামায়াতিন ও রশিদভের ব্যাপারটা এবং তুঘরীল তুগানের পিস্তল এর ঘটনার পর আমরা আর কাকে বিশ্বাস করব, কার উপর নির্ভর করব? আমি ওদের যতদিন থেকে জানি, জামায়াতিন এবং রশিদভ দুজন অত্যন্ত ভাল ছেলে ছিল, পার্টির কাজে জান কবুল করার মত নিবেদিত প্রাণ ছিল তারা।
পুলিশ প্রধান তুরিন মাথা নেড়ে সমর্থন করল ভাদিনের কথা। জেনারেল বোরিস বলল, তোমার কথা ঠিক ভাদিন। কিন্তু অতীতকে দিয়ে আর বর্তমান বিচার হবে না। ডেভিল সাইমুম সবার মাথা খারাপ করে দিয়েছে। এই খারাপ মাথাগুলোকে গুড়িয়ে দিয়েই আমাদের কম্যুনিস্ট রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে হবে। এ সময় টেলিফোন বেজে উঠল। জেনারেল বোরিস রিসিভার তুলে নিল। ওপারের কথা শুনে নিয়ে বলল, শুধু তুঘরীল তুগানকে পাঠিয়ে দাও।
অল্পক্ষণ পরেই তুঘরীল তুগান ঘরে প্রবেশ করল। একজন পুলিশ অফিসার তাকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে চলে গেল।
তুঘরীল তুগান ধীর পদক্ষেপে এসে টেবিলের সামনে দাঁড়াল। ভাবলেশহীন তার মুখ। কিন্তু তার মধ্য দিয়েও চিন্তার একটা কালো ছায়া ফুটে উঠছে চোখে-মুখে। তবে তার চখে-মুখে দৃঢ়তার ছাপ।
জেনারেল বোরিস তার দিকে তাকিয়ে সামনের খালি চেয়ারটা দেখিয়ে বলল, বসুন মিঃ তুগান।
সবাই নীরব। জেনারেল বোরিস সোজা হয়ে বসে তুঘরীল তুগানের দিকে না চেয়ে অনেকটা স্বগত কণ্ঠেই বলল, আমরা দুঃখিত মিঃ তুগান আপনাকে আজ এভাবে এখানে আসতে হয়েছে। কিন্তু দায়িত্ব দায়িত্বই।
একটু থেমে বলল, আপনাকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই।
-বলুন। ভাবলেশহীন কণ্ঠে বলল তুঘরীল তুগান। একটা পিস্তল তুঘরীল তুগানের দিকে এগিয়ে দিকে এগিয়ে দিয়ে জেনারেল বোরিস বলল, এ পিস্তলটা কার?
পিস্তলটা হাতে নিয়ে নেড়ে-চেড়ে বলল, আমার।
-গতকাল রাতে এ পিস্তলটা কার কাছে ছিল?
-আমার পিস্তল দু’টো। তার একটা গত রাতে আমার কাছে ছিল। আর এ পিস্তলটা ছিল আমার ড্রইং রুমের ড্রয়ারে। সকালে এটা সেখানেই পেয়েছি।
-রাতে কি এটা কেউ ব্যবহার করেছে?
-আমি জানি না।
-এ পিস্তলের গুলীতে আমাদের একজন গোয়েন্দা কর্মী মারা গেছে।
-এ পিস্তলের গুলীতে? ভীষণভাবে চমকে উঠল তুঘরীল তুগান।
-হ্যাঁ, এ পিস্তলের গুলীতে। বলল জেনারেল বোরিস।
এতক্ষণে একটা উদ্বেগ ও আশংকা তুঘরীল তুগানের মুখে-চোখে ফুটে উঠল। সে বলল, এটা কি করে সম্ভব?
-সেটাই তো আমাদের জিজ্ঞাসা তুগান।
বিমর্ষ তুঘরীল তুগানের কপালে চিন্তার গভীর বলিরেখা। ব্যাপারটা তার কাছে সত্যিই ভুতুড়ে মনে হচ্ছে। সকলেই জানে, গতকাল ঘটনার সময় সে সারাক্ষণ জেনারেল বোরিসের সাথে সাথেই ছিল। কে তার পিস্তল ব্যবহার করবে? তাছাড়া তার পিস্তল খোয়া যায়নি, ড্রয়ারেই ছিল।
নিশ্চিত তুঘরীল তুগানের দিকে চেয়ে জেনারেল বোরিস বলল, ঘটনা আরও আছে মিঃ তুগান। তারপর অপর পিস্তলটি হাতে তুলে নিয়ে বলল, এটা রশিদভের পিস্তল। এ পিস্তলের একটা গুলী এবং আপনার ঐ পিস্তলের একটা গুলী আমাদের নিহত একজন গোয়েন্দা কর্মীর দেহ থেকে পাওয়া গেছে। এর অর্থ আপনার পিস্তল এবং রশিদভের পিস্তল এক সাথেই ছিল।
তুঘরীল তুগানের অন্তরটা এবার সত্যিই কেঁপে উঠল। রশিদভের নাম শুনে হঠাৎ তার মানে ফায়জাভার মুখ ভেসে উঠল। জামায়াতিনের মত রশিদভ এবং ফায়জাভাও তো সাইমুমের প্রতি সহানুভূতিশীল। তাহলে ফায়জাভাই কি কোন পাগলামী করেছে? তার পক্ষেই তো সম্ভব পিস্তল ড্রয়ার থেকে নিয়ে গিয়ে আবার যথাসময়ে যথাস্থানে এনে রাখা! এই ভাবনার উদয় হবার সাথে সাথে তার পিতৃমন কেঁপে উঠল থর থর করে। তাহলে কি ফায়জাভার কথা জানতে পেরেছে? রশিদভকে তো ওরা গ্রেফতার করেছে। ওর কাছ থেকেই তো ফায়জাভার কথাও বেরিয়ে আসবে। আর সাইমুম নিয়ে তার সাথেও রশিদভের আলোচনা হয়েছে, এ কথাও তো রশিদভের কাছ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে।
এতক্ষণে তুঘরীল তুগান সত্যিই দুর্বল হয়ে পড়ল।
তুঘরীল তুগানকে নীরব দেখে জেনারেল বোরিসই আবার বলল, বলুন মিঃ তুগান, আপনি কি বুঝছেন, কতটুকু কি জানেন?
স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করে তুঘরীল তুগান বলল, আমি কিছুই জানি না, কিছুই বুঝতে পারছি না। গত রাতে আমার গোটা ব্যাপারটাই আপনাদের সামনে আছে।
-তা জানি, বলল জেনারেল বোরিস। তার চোখে-মুখে বিরক্তি ও উত্তেজনার চিহ্ন। সে পুলিশ প্রধান তুরিনের দিকে তাকিয়ে বলল, রশিদভকে এখানে হাজির কর। সব কথা তার কাছ থেকেই পাওয়া যাবে।
জেনারেল বোরিস কথা শেষ করতেই সহকারী পুলিশ প্রধান মিঃ রেকফ উঠে দাঁড়াল। বেরিয়ে গেল সে। কয়েক মিনিট পর রশিদভকে নিয়ে সে প্রবেশ করল ঘরে।
রশিদেভের চেহারায় কোন অস্বাভাবিকতার কিছু নেই। চোখে মুখে শান্ত ভাব, কোন উদ্বেগের চিহ্ন তার চোখে পড়ছে না।
মিঃ বেকফ বসল। রশিদভ দাঁড়িয়েই থাকল। কেউ তাকে বসতে বললো না।
জেনারেল বোরিস তার তীক্ষ্ণ চোখটা রশিদভের দিকে একবার তুলে ধরে রশিদভের পিস্তলটা হাতে তুলে নিয়ে নাচাতে নাচাতে বলল, এ পিস্তলটা কার রশিদভ?
ধীরে অথচ স্পষ্ট কণ্ঠে রশিদভ বলল, পিস্তলের ট্যাগে আমার নাম ও দস্তখত থাকলে ওটা আমার।
-পিস্তল থেকে কয়টা গুলী ছুড়েছিলে?
-একটা। দ্বিধাহীন কণ্ঠ রশিদভের।
-আমাদের গোয়েন্দা কর্মীকে হত্যা করেছ, এটা স্বীকার করছ?
-হ্যাঁ আমি তাকে গুলী করেছি।
তুঘরীল তুগানের চোখ দু’টি বিস্ফারিত। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার ঝড় তার ভেতরে। রশিদভের কি মাথা খারাপ হল, এমনভাবে সব স্বীকার করছে সে? এমনিভাবে কি তাহলে তার কথা এবং ফায়জাভার কথা সব বলে দেবে? এক অজানা ভয় এসে তাকে ঘিরে ধরল।
-ঐ গোয়েন্দা কর্মীর দেহে দুটি গুলী ছিল, দ্বিতীয় পিস্তল পাওয়া গেছে, লোক পাওয়া যাচ্ছে না। সেই লোকটি কে যে তোমার সাথে ছিল?
রশিদভ এই প্রশ্ন শুনে ভাবল, তাহলে নিশ্চয় এরা ফায়জাভার সন্ধান পায়নি। তুঘরীল তুগানের নিশ্চয় কিছু বলার কথা নয়। তাছাড়া সে গত রাতের ব্যাপারটা জানেও না। গ্রেফতার না করার কারণ তাহলে এটাই। রশিদভ খুশী হল। ফায়জাভার মুখটা তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। ভাল লাগে তার ফায়জাভাকে। কবে এর শুরু সে জানে না। ফায়জাভার দেশপ্রেম, জাতিপ্রেম, আদর্শ নিষ্ঠা সম্প্রতি তাকে রশিদভের হৃদয়ের একান্ত কাছে এনে দিয়েছে। গত রাতে বিদায়ের সময় রশিদভ ফায়জাভার হাত ধরতে গিয়েছিল, কিন্তু ফায়জাভা হাত টেনে নিয়ে সরে দাঁড়িয়ে বলেছে, আমি মুসলিম, তুমিও মুসলিম, আগের সেই কমরেড নই। সুতরাং আল্লাহ আমাদের মাঝে সীমারেখা টেনে দিয়েছেন তা আমারা মেন চলব। ফায়জাভার এই পবিত্রতা, জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের প্রতি তার আগ্রহ ফায়জাভাকে রশিদভের কাছে এক মহৎ আসনে সমাসীন করছে। তার যাই হোক, ফায়জাভার বাঁচা প্রয়োজন।
রশিদভ বলল, আমার সাথে আর কেউ ছিল না।
-তাহলে দ্বিতীয় গুলী কে করেছে?
-দ্বিতীয় গুলীটাও আমি করেছি।
-এই তো বললে, তুমি একটা গুলী করেছো?
-আমার পিস্তল দিয়ে একটা গুলী করেছি কিন্তু দ্বিতীয় পিস্তল দিয়ে দ্বিতীয় গুলী…।
-অর্থাৎ তোমার হাতে দুটো পিস্তল ছিল।
-দ্বিতীয় পিস্তলটি কোথায় পেলে?
-তুঘরীল তুগানের বাড়ি থেকে চুরি করেছিলাম। আবার কাজ সেরে রেখে আসি।
জেনারেল বোরিস কিছু না বলে উঠে দাঁড়াল। তার চোখ-মুখ লাল টকটকে। সে পায়চারী করতে লাগল। এ সময় সে রশিদভের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল, তুমি মিথ্যা বলছ রশিদভ, তোমার সাথে কে ছিল বল?
তুঘরীল তুঘানের তুগানের মুখটা ভয়ে ফ্যাকাসে। গোটা শরীরটা তার কাঁপছে। এই বুঝি রশিদভ বলে দেয় ফায়জাভার নাম, রশিদভের পিস্তল চুরির কথা তারও বিশ্বাস হয়নি।
জেনারেল বোরিসের প্রশ্নের জবাবে রশিদভ বলল, আমি বলছি আমার সাথে কেউ ছিল না।
ক্রোধে কাঁপছিল জেনারেল বোরিস। রশিদভের জবাব শোনার সাথে সাথে তা চোখ দুটি জ্বলে উঠল আগুনের ভাটার মত। ডান হাত তুলে প্রচন্ড এক ঘুষি দিল সে রশিদভের গালে।
আকস্মিক এই আঘাতে রশিদভ পড়তে পড়তে আবার দাঁড়িয়ে গেল।
ঘুষি মনে হয় লেগেছিল দাঁতের মাড়িতে। রশিদভের মুখ দিয়ে রক্ত আসতে দেখা গেল।
জেনারেল বোরিসকে শিকারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে এমন একটা ক্ষিপ্ত বাঘের মত মনে হচ্ছে। গতকাল থেকেই তার মেজাজ খারাপ। আহমদ মুসারা তার নাকের ডগার উপর দিয়ে চলে গেল একান্তই তাচ্ছিল্ল্য ভরে, এই ব্যর্থতার বেদনা যেন কিছুতেই ভুলতে পারছে না। হাতের কাছেই একটা শিকার পেয়ে যেন সে কালকের শোধটাও নিতে চাচ্ছে।
রশিদভের মুখের রক্ত ঠোঁট বেয়ে বুকের উপর গড়িয়ে পড়ছিল। সেদিকে চেয়ে ক্রুর হাসিতে ফেটে পড়ে বলল, বল, কে ছিল তোর সাথে, আহমদ মুসারা মিটিং কোথায় করল, তা না হলে একেবারে ভর্তা করে ফেলবো।
রশিদভ কোনই জবাব দিল না। যেন কিছুই হয়নি তার, এমনি ভাবেই দড়িয়ে রইল। বেপরোয়া তার মুখ ভংগি।
রশিদভের এই ভাবে নীরব থাকা আগুন ধরিয়ে দিল যেন জেনারেল বোরিসের দেহে। ডান পা তুলে প্রচন্ড এক লাথই মারল রশিদভের কোমরে। রশিদভ হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল মাটিতে। শক্ত মেঝের উপড় পড়ে তার কপালের একাংশ কেটে গেল। পড়ে যাওয়া দেহের উপর আরেকটা লাথি ছুঁড়ে মেরে জেনারেল বোরিস চিৎকার করে বলল, তুরিন, তুরিন, হারামজাদাকে ছাদের সাথে টাঙ্গাও। দেখি ব্যাটা কতক্ষণ মুখ বন্ধ করে থাকে।
তুঘরীল তুগান মুখ নিচু করে বসেছিল। রশিদভের দিকে তাকাবার সাহস পাচ্ছে না। সমস্ত শরীরে কি এক বেদনা তাকে দহন করছে, হৃদয়টা এফোড় ওফোঁড় হয়ে যাচ্ছে তার বেদনায়।
রশিদভকে ছাদের সাথে টাঙ্গানো হলো। তারপর জেনারেল বোরিস নিজ হাতে চাবুক তুলে নিল। নরম স্টিলের মত চামড়ার চাবুক অসীম হিংস্রতা নিয়ে এলোপাথাড়ী পড়তে লাগল রশিদভের উন্মুক্ত শরীরে। রশিদভের গোটা দেহটাই ফেটে রক্তাক্ত হয়ে গেল। ফোঁটায় ফোঁটায় তা পড়ে নীচের মেঝকে লাল করে তুলল। কিন্তু যাকে কথা বলাবার জন্য এই অমানুষিক অত্যাচার করা হচ্ছে, সে রশিদভ একেবারেই নিঃশব্দ, একটা ‘আ’ শব্দ তার মুখ থেকে বের হলো না।
তুঘরীল তুঘানের উদ্ধেগ-উৎকণ্ঠার বেদনা এবার বিস্ময়ে পরিণত হলো। তার যেন বিশ্বাস হতে চাইছে না, এ রশিদভ তাদের সেই রশিদভ। এমন নির্যাতন তো হাতিও চিৎকার করতো। এ ধৈর্য্যের শক্তি রশিদভ পেল কোথায়?
টেবিলের চারদিকে আরও যারা বসে আছে, তা তো তারা দেখেনি। ক্রোধে, ক্ষোভে, পরিশ্রমে ক্লান্ত জেনারেল বোরিস একটা চেয়ার টেনে নিয়ে ঘরের এক কোনে বসল। ২ মিনিট টাইম দিলাম। তোর সাথে কে ছিল, কারা আছে বল। তা না হলে একদম গুড়ো করে ছাড়ব।
রশিদভের চোখ বন্ধ ছিল। মুখ চোখ তার প্লাবিত ছিল রক্তে। নীচের দিকে ঝুলে থাকা একটা হাত তুলে অতি কষ্টে সে চোখটা পরিস্কার করল। হাতটা কাঁপছিল।
রক্তের বেড়াজাল ভেংগে চোখ খুলে তাকাল রশিদভ। তারপর ধীরে কন্ঠে বলল, মিথ্যা আশা করবেন না জেনারেল বোরিস, কিছু পাবেন না আমার কাছ থেকে। আমি আপনাদের কমরেড নই, আমি মুসলিম। অত্যাচার দিয়ে নিপিড়ন দিয়ে দেহকে দুর্বল করা যায়, শেষও করা যায়, কিন্তু বিশ্বাসের শক্তিকে স্পর্শ করা যায় না। আপনাদের কাছে আমি কিছুই আশা করি না, আমার ভরসা আল্লাহ…।
চুপ কর হারামজাদার বাচ্চা, আবার বক্তৃতা করা হচ্ছে। বলে জলন্তে এক অগ্নিপিণ্ডের মত লাফিয়ে উঠল জেনারেল বোরিস। পকেট থেকে রিভলবারটা বের করে নিয়ে রশিদভের মুখ লক্ষ করে ট্রিগার টিপল, এক, দুই, তিন। পর পর তিনটা গুলি গিয়ে আঘাত করল রশিদভের মুখে। সমগ্র মুখটা একটা রক্তের পিন্ডে পরিনত হল। প্রবল ভাবে ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল রশিদভের দেহ কয়েকবার। তারপর একবারে স্থির।
তুঘরীল তুগান সেদিকেই স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। এখন আর তার মনে কোন ভয় নাই। রশিদভ তার মনের ভয়ের পর্দাটা যেন কোথায় সরিয়ে দিয়েছে। এখন নিজ হৃদয়ের অন্তঃপুর দিয়ে সুদূর অতিতকেও যেন সে দেখতে পাচ্ছে। সাহসী, সংগ্রামী, চির স্বাধীন, পুর্ব পুরুষের রক্ত যেন তার শিরায় শির শির করে জেগে উঠল। রশিদভের দেহটা যখন কেঁপে স্থির হয়ে গেল, তখন তুঘরীল তুগান চোখ বন্ধ করে মুসলমানের মৃত্যু সংবাদের যা পাঠ করতে হয় সেই ভুলে যাওয়া দোয়াই স্মরন করার ব্যর্থ চেষ্টা করল। জেনারেল বোরিস পিস্তলটা পকেটে ফেলে বলল, তুরিন এই বিশ্বাসঘাতকের কি শাস্তি! আর সন্দেহজনক যাদের ধরেছ, কাউকে ছেড়ো না। হয় তারা মুখ খুলবে, নয়তো তাদের রশিদভের ভাগ্যই বরন করতে হবে।
তুঘরীল তুগানের দিকে চেয়ে জেনারেল বোরিস বলল, সাইমুমের খবর তুমি উপরে জানিয়েছ এবং গত রাতে তুমি আমাদের সাথে ছিলে এই কারনেই তুমি রক্ষা পাচ্ছ কিন্তু পিস্তল রহস্যের ব্যাপারটা তোমাকে সমাধান করতে হবে।
একটু থামল জেনারেল বোরিস। তারপর রুমাল বের করে মুখ মুছতে মুছতে তুঘরীল তুগানকে লক্ষ করেই বলল, তোমার পার্টির লোকজনদের নিয়ে এ্যাসেম্বলী হলে যাও। আমি আসছি।
কথা শেষ করে জেনারেল বোরিস গট গট করে বেরিয়ে গেল।
