ঘুম ভাঙতেই উঠে বসল রোকাইয়েভা। ঘরে আলো জ্বলছে তখনও। কেউ আসেনি। তাহলে এ ঘরে ভাইয়া আসেনি? মনটা আনচান করে উঠল। ছুটল ভাইয়ার ঘরের দিকে। শূন্য ঘর। বেরিয়ে এল ঘর থেকে। দোতলার বারান্দা থেকে গেট দেখা যায়। দেখল, গেট বন্ধ। পূর্ব আকাশে শুকতারা জ্বল জ্বল করছে। এখনও বেশ অন্ধকার। অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে কালকের রাতের আশংকাটা আবার মনে জাগল। দাদীর ঘরে এলো রোকাইয়েভা। দাদী ফজরের নামায শেষ করে উঠে দাঁড়াচ্ছেন। রোকাইয়েভা বলল, দাদী ভাইয়া….. কথা শেষ করতে পারল না। গলাটা যেন বন্ধ হয়ে এল তার ।
চিন্তা করছিস কেন, আসবে।কত কাজে কত জায়গায় যেতে পারে।
কিন্তু টেলিফোন-ভাইয়ার টেলিফোন নিরব কেন? এমন তো কোনদিন হয়নি। ভাইয়া বাড়িতে না জানিয়ে তো কোথাও থাকেন না!
তোর ভাইয়া যে কাজ করে, অনেক সময় বলার সুযোগ নাওতো পেতে পারে?
কিন্তু তার অফিস? তিনি না পারলে অফিস তো জানিয়েছে? দাদী কোন উত্তর দিলেন না। তাঁর চোখেও চিন্তার একটা কালো ছায়া। সত্যিই উমর জামিলব এমন তো কোন দিন করেনি। সে ডিউটি পাগল সত্য, কিন্তু বাড়ীর প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্যে সে বিন্দুমাত্রও অবহেলা করে না। মনের এ চিন্তা চাপা দিয়ে দাদী বললেন, এখনও তো নামায পড়িসনি। যা নামায পড়ে আয়, মনটা ভালো হবে।
দাদী কুরআন শরীফ পড়ছিলেন। রোকাইয়েভা নামায পড়ে এসে তার পাশে বসল। এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠল। মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল রোকাইয়েভার। ভাইয়ার কোন খবর? ছুটে গেল সে বাইরে। একটি খাম হাতে ঘরে ফিরে এল। বন্ধ খাম। কারো নাম নেই খামে।
কে দিল? জিজ্ঞেস করলেন দাদী।
দারোয়ানকে কে যেন দিয়েছে। আপনাকে দিতে বলেছে।
পড়তো দেখি।
খাম ছিঁড়ে চিঠি বের করল রোকাইয়েভা। চার ভাঁজ করা চিঠি খুলে পড়তে লাগল সে।
চিঠি পড়তে গিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল রোকাইয়েভা। তার হাত থেকে পড়ে গেল চিঠি। বিছানায় লুটিয়ে পড়ল রোকাইযেভার দেহটা। দাদী কুরআন শরীফ বন্ধ করে টেবিলে রেখে রোকাইয়েভার পাশ থেকে চিঠি তুলে নিলেন। পড়লেন-
দাদী, আমি জামিলভের এক ভাই। জামিলভ নেই। আপনারা, আমরা কেউ কোন দিন আর তাকে খুঁজে পাব না। তাসখন্দ জেল থেকে সাইমুম নেতা হাসান তারিক, তিনজন বিদ্রোহী নেতা এবং ভিকটর নামের একজন জেল কর্মচারী পালিয়েছে। ভিকটরের সন্দেহজনক গতিবিধি রিপোর্ট হওয়ার পরেও জামিলভ তাকে সুযোগ দিয়েছে, ব্যবস্থা গ্রহণের কোন নির্দেশ দেয়নি। অর্থাৎ জেল পালানোর ঘটনার সাথে তার যোগসাজস ছিল। সুতরাং বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে জামিলভ দন্ডিত হয়েছেন।
দুঃখ করবেন না দাদী। এ দেশে জামিলভদের সারি বড় দীর্ঘ। আরও কত দীর্ঘ হবে কে জানে!
যুবায়েরভ।
চিঠি পড়া শেষ করলেন দাদী। কিন্তু মনে হচ্ছে চিঠি পড়া শেষ হয়নি তাঁর। চিঠি ঐভাবেই তাঁর হাতে ধরা। চোখ দুটি চিঠির ওপরই নিবদ্ধ। স্থির অচঞ্চল তিনি। দৃষ্টি শূন্য। যেন তিনি পাথর হযে গেছেন।
পল পল করে সময় কেটে গেল। পাশে বিছানায় পড়ে কাঁদছে রোকাইয়েভা। এক সময় মুখ ফিরিয়ে দাদী সেদিকে তাকালেন। দাদীর দুচোখে দুফোঁটা অশ্রু টলমল করে উঠল। রোকাইয়েভার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, কাঁদিস না বোন, আমার জামিলভ বীরের মৃত্যুবরণ করেছে। শহীদ সে। ওর জন্য গর্ব কর।
তারপর দাদী ধীরে ধীরে উঠলেন। জামিলভের কক্ষে এলেন। টেবিলের ওপর জামিলভের একটা বাঁধানো ফটো। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যখন ডিগ্রী নিয়ে বেরোয়, তখনকার তোলা। ফটোটি হাতে তুলে নিয়ে বললেন, কাজ দিয়ে প্রমাণ করে যাবি বলেই কি মুখে কিছু কোনদিন বলিসনি?
দাদীর চোখের এক ফোঁটা পানি ফটোর স্বচ্ছ কাঁচে গিয়ে পড়ল। জানালা দিয়ে আসা সকালের এক টুকরো রোদে তা জ্বল জ্বল করে উঠল।
রোকইয়েভা দাদীর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। চেখের পানিতে গোটা মুখ তার ধোয়া। তার দিকে চেয়ে দাদী বললেন, জামিলভ তার পূর্ব পুরুষের মান রেখেছে। তোদের মুসলিম পূর্ব পুরষেরা জান দেয়াকে ভয় করেনি, যেদিন থেকে এ ভয় দানা বেঁধে বসল, সেদিন থেকেই আমাদের সর্বনাশের ঘোর অমানিশা শুরু।
আবার কলিং বেল বেজে উঠল। বেরিয়ে গেল রোকাইয়েভা। ফিরে এল হাতে একটি কাগজ নিয়ে। একটা সরকারী নির্দেশ পত্র। রোকাইয়েভার মুখটা যেন বেদনায় আরো নীল দেখা গেল।
কি ওটা? জিজ্ঞেস করলেন দাদী।
একটা নির্দেশ পত্র।
সরকারী নির্দেশ পত্র? কি আছে ওতে?
বিশ্বাসঘাতক জামিলভের সমস্ত স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। তিনদিনের মধ্যে বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে।
কান্নায় ভেঙে পড়ল রোকাইয়েভা। দাদী রোকাইয়েভাকে টেনে নিয়ে পাশে বসালেন। বললেন, মন শক্ত কর বোন। আরো অনেক কিছুর জন্য আমাদের প্রস্ত্তত থাকতে হবে।
একটু থামলেন দাদী। তারপর বললেন, জাতিকে ভালোবাসার বড় বড় কথা অনেক বলেছি, ভালোবাসি যে তার পরীক্ষাও তো দিতে হবে! তোর ভাই তা পেরেছে, তুই পারবি না রোকাইয়েভা?
‘পারবো’ বলে দাদীকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল রোকাইয়েভা।
তাসখন্দ কম্যুনিস্ট পার্টির সেক্রেটারীয়েটের কমিটি রুম। নিরাপত্তা কমিটির বৈঠক। মস্কো থেকে ছুটে এসেছেন ‘ফ্র’-এর প্রতিরক্ষা প্রধান কলিনকভ, গোয়েন্দা সংস্থা ‘রিও’-এর চীফ কুলিকভ এবং মিলিটারী ইন্টেলিজেন্সের প্রধান সার্জি মোকলভ। এই মিটিংয়ে হাজির আছে উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তানের ‘ফ্র’-এর ফাস্ট সেক্রেটারীদ্বয় এবং দুই রাজ্যস্থ ‘ফ্র’-এর গোয়েন্দা ও পুলিশ প্রধানরা।
‘রিও’ চীফ কুলিকভ বলল, দেশের এই দক্ষিণাঞ্চলে সাম্প্রতিককালে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে যা আমাদের কম্যুনিস্ট ব্যবস্থাকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এই বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্যই আজকের বৈঠক। মাননীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী কলিনকভ এখন এ ব্যাপারে কিছু বলবে।
কলিনকভ নড়েচড়ে বসল। সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল, দেশের এ অঞ্চলে সম্প্রতি এক সংগে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে যাকে খুব ছোট করে দেখা যাচ্ছে না। জামিলভ ও আলিয়েভার বিশ্বাসঘাতকতাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে করতে পারছি না। তাদের বিশ্বাসঘাতকতার চরিত্র একই রকম- ধর্মীয় স্বকীয়তা বোধের উন্থান। এই উথানটা ডেনজারস। আগুনের মত তা ছড়িয়ে পড়তে পারে। বহুদিন এই চেতনা উৎখাতের জন্য আমরা প্রাণপণ চেষ্টা করেছি। কিন্তু তা উৎখাত হয়নি। গোপনে গোপনে তা সজীব সবল হয়ে উঠেছে। আগে এটা তেমন একটা নজরে পড়তো না, কিন্তু তা এখন নজরে পড়ার মত প্রবল হয়েছে। এ কথাগুলো আপনাদের কারো অজানা নয়, গত দু’বছরের পরিসংখ্যান আপনাদের সবারই নজরে আছে।
একদিকে এই অবস্থা, অন্যদিকে হাসান তারিকের জেল থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং আহমদ মুসা গায়েব হওয়া আমাদের কাছে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আপনারা জানেন, হাসান তারিক সাইমুমের একজন প্রথম সারির নেতা- যারা ফিলিস্তিনে একটা অসাধ্য সাধন করেছে্ আর আহমদ মুসাতো ফিলিস্তিন ও মিন্দানাও বিপ্লবের নায়ক। সংগঠন গড়ে তোলার একটা যাদুকরী ক্ষমতা রয়েছে তার। এ ছাড়া গোটা মুসলিম বিশ্বে তার এমন একটা ইমেজ গড়ে উঠেছে যে, সে যেখানেই যায় একটা অপ্রতিরোধ্য আবেগ ও প্রাণ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। সেই আহমদ মুসা প্লেন-ক্রাশের পর রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়ে গেছে। তন্ন তন্ন করে অনুসন্ধানের পর আমরা নিশ্চিত হয়েছি, বাক্স সমেত আহমদ মুসাকে কে বা কারা উদ্ধার করেছে। বিধ্বস্ত বিমানের সব কিছুই আমরা পেয়েছি, একমাত্র ঐ বাক্স ছাড়া। বাক্স উদ্ধারের জন্য পাহাড়, উপত্যকা, নদী এবং নদী তীরবর্তী এলাকা সবই অনুসন্ধান করা হয়েছে। ‘ফ্র’- এর বিশ্বাস, সে এদেশেই আছে।
সুতরাং সব মিলিয়ে আমরা একটা উদ্বেগজনক অবস্থারই আলামত দেখতে পাচ্ছি। এ অবস্থায় আমাদের করনীয় কি তা নিয়েই আজ আমরা আলোচনা করব।
কলিনকভ থামল। এবার কথা বলল মিলিটারী ইন্টেলিজেন্সের প্রধান সার্জি মোকলভ। সে বলল, বর্তমান অবস্থার পেছনে আফগানিস্তানও একটা ফ্যাক্টর। এ সম্পর্কে স্যার কিছু বললে ভালো হত।
হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন। বলল কলিনকভ, ‘তবে এ ব্যাপারে একথা বলাই যথেস্ট যে, আমরা সেদিক থেকে একটা অকল্পণীয় বিপদের সম্মুখীন যা আপনারা সকলেই জানেন। ভাষা, বংশ ও জাতিগত একটা সাদৃশ্যের কারণে আফগানদের ভাব ও মানসিকতা শুধু নয় সেখান থেকে গেরিলা ও চরদের অনুপ্রবেশের ঘটনাও বেড়ে গেছে। তারা ব্যাপকভাবে এদেশে আশ্রয়ও পাচ্ছে।
থামল কলিনকভ। সবাই কিছুক্ষণ নিরব। তারপর প্রথমে কথা বলল কুলিকভ। বলল, ফিলিস্তিন ও মিন্দানাওয়ে সাইমুম যে পন্থা ও পদ্ধতিতে কাজ করেছে সেটা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে তাদের ব্যাপারে আমাদের কর্মকৌশল ঠিক করা হোক এটা আমাদের প্রস্তাব।
ঠিক বলেছেন। আমি এটা নোট করলাম। কিন্তু এটা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। ইতিমধ্যে আমাদের কি করা দরকার?
কুলিকভই আবার কথা বলল। বলল সে, আমরা জামিলভ ও আলিয়েভার ক্ষেত্রে যে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি সেটা অব্যাহত রাখতে হবে। আমাদের মুসলিম কর্মচারীদের এ কথা বুঝাতে হবে, বিদ্রোহ তৎপরতার প্রতি বিন্দুমাত্র দুর্বলতা পেলেও তার শাস্তি মৃত্যুদন্ডের নিচে হবে না। গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক আমাদের যেটা আছে, ঠিকই আছে। শুধু অতুর্কি অফিসারের সংখ্যা এখানে বাড়াতে হবে। যারা অন্য সব কিছুর সাথে স্থানীয় গোয়েন্দা অফিসারসহ স্থানীয় সকল কর্মচারী ও দায়িত্বশীলের কাজের প্রতিও গোপনে নজর রাখবে। আফগানিস্তানের পথে আসা এবং দেশের গোপন ছাপাখানায় ছাপা ইসলামী সাহিত্যর উৎস ও প্রচার বন্ধের লক্ষ্যেও অত্যন্ত কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। একে বিদ্রোহ তৎপরতার সাথে শামিল করে এ অপরাধের জন্য মৃত্যুদন্ডেরই ব্যবস্থা করা উচিত হবে। থামল কুলিকভ।
উজবেক ‘ফ্র’-এর ফার্স্ট সেক্রেটারী বলল, আমি মনে করি বর্তমান অবস্থায় এসব দমনের জন্য কঠোর শাস্তি ও মুসলিম কর্মচারী ও দায়িত্বশীলদের ওপর চোখ রাখার ব্যবস্থা করা হলেই চলবে। একটা ভীতি সৃষ্টি করা গেলেই সাধারণ মানুষের কাছে বিদ্রোহীরা আর কোন আশ্রয় পাবে না।
তাজিক ‘ফ্র’-এর ফার্স্ট সেক্রেটারী চেরনেংকো মাথা নেড়ে উজবেক সেক্রেটারীর কথায় সায় দিল।
কুলিকভ বলল, উজবেক সেক্রেটারী ভালো প্রস্তাব করেছেন। আমরা স্থানীয় কর্মচারীদের অবিস্বাস করবো না, তবে তাদের ওপর নির্ভর করবো না, এই নীতি আমাদের গ্রহণ করতে হবে।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হেসে ‘ফ্র’-এর প্রতিরক্ষা প্রধান কলিনকভ বললো, কুলিকভ সুন্দরভাবে একবাক্যে উজবেক সেক্রেটারীর কথাটাকে প্রকাশ করেছেন। আর আমি আনন্দের সাথে বলছি, আমাদরে বিশ্ব রেড সংস্থা ‘ফ্র’- এর মনের কথাটাই আমাদের মুখে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। চিন্তার এই ঐক্যই আমাদের শক্তি। কথা শেষ করে কলিনকভ উঠে দাঁড়াল। উঠে দাঁড়াল সবাই।
৮
গুলরোখ রাষ্ট্রীয় খামার। পাহাড়ের পাদদেশে ১০ হাজার হেকটর জমি নিয়ে গড়ে উঠেছে এই খামার। আমুদরিয়া নদী থেকে বয়ে আসা খালের পানিই এই খামারের প্রাণ। ধীরে ধীরে পানির সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে, বাড়ছে সেই সাথে খামারের পরিধি।
খামারের পূর্ব পাশে পাহাড়ের গা ঘেঁষে খামারের রেসিডেন্সিয়াল ব্লক। রেসিডেন্সিয়াল ব্লকের মাঝখানে কম্যুনিটি কমপ্লেক্স। কম্যুনিটি কমপ্লেক্সে রয়েছে একটি সমাবেশ হল। এখানে নাচ, গান, নাটক গ্রুপের প্রোগ্রাম লেগেই থাকে। তার পাশে সাংস্কৃতিক স্কুল। এখানে নাচ, গান, নাটক ইত্যাদির প্রশিক্ষণ ও মহড়া চলে। পাশেই একটা লাইব্রেরী রুম। লাইব্রেরীটা কম্যুনিস্ট আদর্শ, কম্যুনিস্ট অর্থনীতি, কম্যুনিস্ট কৃষি, কম্যুনিস্ট সংস্কৃতি প্রভৃতি রাষ্ট্রীয় প্রকাশনার বই দ্বারা ভর্তি। রাষ্ট্রীয় খামারের স্কুলও এই কম্যুনিটি কমপ্লেক্সে অবস্থিত। একটা খেলার মাঠও রয়েছে কম্যুনিটি কমপ্লেক্সে। বিকেল হলেই ভীড় বাড়তে থাকে কম্যুনিটি সেনটারে। এখানে নাচ, গান, নাটক আর ভদকার স্রোতে সকলকে বুঁদ করে রাখা হয়। মেয়েদের পর্দা বিদায় করা হয়েছে বহু বছরের চেষ্টায়। তবু দেখা যায় মাথায় রুমাল বাঁধা অনেকে অবাধ মেলামেশা এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করে।
কম্যুনিটি সেন্টারের দক্ষিণ পাশে তাকালেই মাঠটার ওপারে একটা বড় বাংলো দেখা যায়। ওটা গুলরোখ খামারের ডিরেক্টর মুহাম্মাদ আতাজানভের বাড়ী। আতাজানভ উজবেকিস্তানের একজন সুপরিচিত কৃষিবিদ। তাসখন্দ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষিতে ডক্টরেট নিয়েছেন। দক্ষ একজন কৃষিবিদ। পাহাড়ের অনেক উষর উপত্যকা এবং অনেক মরু মাটিতে তিনি সবুজের সমারোহ এনেছেন। এই গুলরোখ খামারের ও তিনিই স্রষ্টা। আতাজানভ উজবেকিস্তান কৃষি কাউন্সিলেরও সদস্য।
সূর্য উঠলেও ভোরের ঠান্ডা আমেজ তখনও কাটেনি। আতাজানভ তাঁর সোয়ারের ঘোড়াটা আস্তাবলে বেঁধে ঘাম মুছতে মুছতে বাড়ীতে ঢুকে গেলেন। ফজর নামাযের পর উঁচু নীচু পাহাড়ী পথে অশ্বচালনা তাঁর নিয়মিত ব্যায়াম।
নাস্তা সেরে স্টাডিরুমে এসে বসলেন আতাজানভ। আলমারীতে বইয়ের ভীড়ে লুকোনো কুরআন শরীফ বের করে একটা চুমু খেয়ে টেবিলে নিয়ে বসলেন। রুশ ভাষায় লেখা কুরআনের তাফসীর। আফগান মুজাহিদদের কাছ থেকে জোগাড় করেছেন আতাজানভ।
কুরআন পড়ছিলেন আতাজানভ। এ ঘরে অভিধান নিতে এসে মেয়ে নাদিয়া তার আব্বার কুরআন পড়া দেখে তার পাশে দাঁড়িয়ে গেল। কুরআন থেকে মুখ তুলে আতাজানভ বললেন, কিছু বলবে?
না আব্বা, এমনি দেখছিলাম।
তুমি কুরআন পড়ছো তো?
পড়ছি। আচ্ছা আববা একটা কথা, কুরআনের তাফসীর পড়তে যেয়ে দেখছি, কতকগুলো নির্দিষ্ট গুণ থাকলে তবেই সে মূসলমান হবে। তাহলে বংশগত ভাবে কি মুসলমান হওয়া যায়?
যায় না। তবে মুসলিম হয়ে জন্মাবার পর যদি সে আল্লাহকে এক মানে, রাসূলকে রাসূল মানে তাহলে তার পরিচয় মুসলিম অবশ্যই হবে, কিন্তু মুসলিম হবার সব শর্ত এতে পূরণ হবে না এবং পরকালে মুক্তিও আসবে না।
আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদের ক্লাসে আদম শুমারীতে মুসলমানদের জনসংখ্যার উল্লেখ কেন নেই এই প্রশ্নের জবাবে স্যার বলেছিলেন, দেশে ক’জন মুসলমান আছে! বাপ মুসলমান হলে কি ছেলে মুসলমান হয়?
আদম শুমারীতে কাদের মুসলমান বলা হবে?
সত্যকে পাশ কাটাবার এটা একটা মতলব।মুসলমানেদর মুসলমানিত্ব নষ্ট করার ব্যবস্থাটা তো ওরাই করেছে।
আতাজানভ আবার কুরআন শরীফ পড়ায় মনোযোগ দিতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় আতাজানভের ছেলে আট বছর বয়সের আহমদ আতাজানভ দৌড়ে এসে পিতার পাশে দাঁড়াল। আতাজানভ তাড়াতাড়ি কুরআন শরীফ বন্ধ করলেন। আহমদ বলল, এটা কি বই আব্বা?
এই একটা বই।
দেখি কি বই। বলে আহমদ বইটিতে হাত দিতে চাইল। আতাজানভ কুরআন শরীফ একটু টেনে নিয়ে বললেন, অজু না করে এ বই ধরে না! যও এখন পড়ো গে।
আহমদের আকর্ষণ যেন এতে আরো বাড়ল। বলল, কি লেখা আছে এতে, গল্প?
গল্প নয়, অনেক ভালো কথা।
কি ভাল কথা?
আল্লাহর কথা।
আল্লাহ কে?
মানুষ এবং সবকিছু তিনি সৃষ্টি করেছেন।
আহমদ তার পিতার দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ের সাথে বলল, কি আব্বা, আমাদের স্যার তো বলেন, স্রষ্টা নেই। আগের মানুষ জানতো না তাই স্রষ্টার কথা বলত।
আতাজানভ বিপদে পড়ে গেলেন। এখন যদি স্রষ্টা আছেন এ কথা ছেলেকে বুঝিয়ে না দেন তাহলে ছেলের কাছে তিনি মিথ্যাবাদী হয়ে যান। আবার যদি বলা হয় স্যার ঠিক বলেননি, তাহলে আহমদের স্যার মিথ্যাবাদী হয়ে যায়। আর আহমদ নিশ্চয় ক্লাসে গিয়ে স্যারকে বলবে সে মিথ্যা কথা বলেছে। তখন ক্রুদ্ধ শিক্ষক আতাজানভের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে আসবে যে, তিনি স্কুলের শিক্ষা কারিকুলামের বিরোধিতা করছেন। আর এ অভিযোগের সাথে সাথেই আতাজানভের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা অনুসন্ধান শুরু হবে। এসব ভেবে নিয়ে আতাজানভ আহমদের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, আহমদ, এসব কথা এখন বুঝবে না, আরও বড় হও বুঝিয়ে দেব, কেমন। যাও এবার পড়ো গে।
আহমদ যেমন ছুটে এসেছিল, তেমনি ছুটে চলে গলে। নাদিয়া বলল, আব্বা, আহমদকে কুরআন শরীফের নামটা বললে কি ক্ষতি হত?
আতাজানভ বললেন, অসুবিধা এই ছিল, আমি কুরআন শরীফ পড়ি এই কথা সে ক্লাসে তার সহপাঠীদের এবং স্যারদের গিয়ে বলত। দেখ না, প্রতিদিন ক্লাসে কি হয় কেমন সে হুবুহু রিপোর্ট করে।
কিন্তু করলেই কি হত?
১০ নং ট্রাকটরের ড্রাইভারের ইয়াসিনভকে চিনতে?
কেন তার চাকুরী এবং খামার থেকে সদস্যপদ বাতিল হলো জান?
না।
গোয়েন্দা দফতরে রিপোর্ট গিয়েছিল, সে মোল্লার কাছে আরবী শিখেছে এবং কুরআন শরীফ পড়ে।
কিন্তু মোল্লারা কুরআন শরীফ পড়লে দোষ হয় না?
দোষ হয়, কিন্তু তাদের সহ্য করা হয়।
কেন?
দুটো কারণে। এক, বিশ্বকে বুঝানো যে, কুরআন শরীফ জানা এবং পড়া এখানে নিষিদ্ধ নয়। দেখনি, আমাদের খামারে একবার বাংলাদেশ থেকে একদল সফরকারী এলে তাদের সামনে মোল্লা মীর ইয়াকুবকে দিয়ে কুরআন শরীফ পড়ানো হয়েছিল? সফরকারীরা সে কি খুশী! অথচ এর একদিন আগেই ইয়াসিনভকে বরখাস্ত করে খামার থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আর দু’নম্বর কারণ হলো, মুসলমানদের মধ্যে একযোগে কোন ক্ষোভ সৃষ্টি হওয়ার কোন কারণ তৈরী না করা। মুসলমানরা এখনও মোল্লাদের ভালোবাসে, তাদের সম্মান করে এবং তাদের কথা শোনেও!
ঠিক বলেছেন আব্বা, বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি নামায গোপনে আমার রুমে পড়ি। আমি জেনেছি যারা মসজিদে নামায পড়তে যায়, কিংবা যারা প্রকাশ্যে নামায পড়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শৃঙ্খলা বিধান বিভাগ এবং কম্যুনিস্ট স্টুডেন্ট লীগ তাদের একটা রেজিস্টার সংরক্ষণ করে।
আতাজানভ কিছু বলার জন্য মুখ খুলছিলেন, এমন সময় কলিংবেল বেজে উঠল। ‘দেখি কে এল’ বলে উঠে দাঁড়ালেন আতাজানভ। কুরআন শরীফ আলমারীতে রেখে স্টাডি রুম থেকে বেরিয়ে ড্রইং রুমে এলেন।
আতাজানভ দরজা খুললেন। গেটে দাঁড়িয়ে কর্ণেল কুতাইবা। আতাজানভ অস্ফুট কন্ঠে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে তাঁকে স্বাগত জানালেন।
ড্রইং রুমে এসে বসলেন কর্নেল কুতাইবা। কপালে তাঁর বিন্দু বিন্দু ঘাম। পথ চলার ক্লান্তি তার চোখে মুখে।
কর্নেল কুতাইবা সাড়ে ছ’ফুট লম্বা দেহের বিশাল মানুষ, ইস্পাতের মত পেটা দেহ। মেদের সামান্য চিহ্ন দেহের কোথাও নেই। সারাদিন অসুরের মত খাটতে পারেন। কর্নেল কুতাইবার আসল নাম কর্নেল গানজভ নাজিমভ। ওয়ার্ল্ড রেড আর্মির একজন কর্নেল। চীন সীমান্তে যুদ্ধের সময় পায়ে আঘাত পান। এই আঘাতের কারণেই তাকে রিটায়ার করিয়ে দেয়া হয়। একটু খুঁড়িয়ে হাটেন। উজবেকিস্তানের খুব বড় ঘরের ছেলে নাজিমভ। তার পিতা শরীফ রশিদভ ছিলেন উজবেক সরকারের প্রধান। রিটায়ারের পর নাজিমভকে ভালো চাকুরী অফার করা হয়েছিল, তিনি যাননি। সড়ক পরিবহনের একটি হেভি ট্রাক বহরের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। নিজেও ট্রাক চালান। তাঁর ট্রাক বহর তাসখন্দ থেকে পামিরের বলতে গেলে মাথায় অবস্থিত তাজিকিস্তানের পামির বায়োলজিক্যাল ইনস্টিটিউট পর্যন্ত যাতায়াত করে। তিনি সাইমুমের সাথে জড়িত হয়েছেন অনেকদিন। একটি ছোট্ট ঘটনা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
নাজিমভ অত্যন্ত ভালোবাসতো তার দাদু ইমসাইল রহিমজানকে। রহিমজান তার যৌবনে যাই করুন পরে তার ভুল বুঝতে পারেন এবং ধর্মানুরক্ত হয়ে পড়েন। সবকিছু থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন জীবন-যাপন করতেন। ছেলে রশিদভ পার্টির ও রাষ্ট্রের উচ্চ পদ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় পিতার খুব কমই খোঁজ নিতে পারত। রহিমজানও কষ্ট বোধ করতেন ছেলের কাজ কর্মে। দাদুর নিঃসঙ্গ জীবনের সাথী ছিল নাতি নাজিমভ। সেনাবাহিনীতে যাবার পরও ছুটি পেলেই নাজিমভ ছুটে আসত দাদার কাছে। ঘন্টার পর ঘন্টা কাটাতেন দাদা-নাতি গল্প করে। নাজিমভ তার দাদুর মত নামায রোযা করতো না। দাদুও তাকে কোনদিন চাপ দেয়নি। শুধু বলতো, এখন বুঝছো না, বুঝবে একদিন।
দাদুর অসুখের খবর পেয়ে নাজিমভ ছুটি নিয়ে ছুটে এসেছিল দাদুর কাছে। দাদু যেন তার পথের দিকেই তাকিয়ে ছিল। ডাক্তারের কাছে নজিমভ শুনলো, তার দাদুর অবস্থা ভালো নয়। নাজিমভ দাদুর কপালে হাত রেখে ব্যাকুলভাবে বলল, তোমার কষ্ট হচ্ছে দাদু?
কি কষ্ট দাদু?
আমি মরে গেলে আমার দেহটাকে তো তোমরা পুড়িয়ে ফেলবে। কিন্তু আমি তো মুসলামান।
দাদু থামলেন হঠাৎ কোন জবাব দিতে পারল না নাজিমভ। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল দাদুর দিকে। সে জানে দাদু কি বলতে চায়। কিন্তু কম্যুনিস্ট ব্যবস্থায় ইসলামী নিয়মে দাফন করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
দাদুই আবার কথা বললেন, জানি এসব কথা তোমাদের কাছে নিরর্থক। কিন্তু আমি তোমাদের মাফ করবো না। বলতে বলতে বৃদ্ধের গন্ড বেয়ে অশ্রুর দুটি ধারা নেমে এল। বৃদ্ধ দাদুকে জড়িয়ে কেঁদে উঠল নাজিমভ। বলল, আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি দাদু, আমার সবটুকু শক্তি দিয়ে চেষ্টা করবো।
নাজিমভ তার সবটুকু শক্তি দিয়েই চেষ্টা করেছে। কিন্তু দুর্বল এক কন্ঠ শত কণ্ঠের ভীড়ে হারিয়ে গেছে। পিতা রশিদভ ধমক দিয়ে নাজিমভকে বলেছে, মুর্খের মত আচরণ করো না, বাস্তববাদী হও।
ব্যার্থ হয়েছে নাজিমভ। ব্যর্থ নাজিমভ দাদুর শেষকৃত্যানুষ্ঠানে আর থাকেনি। দাদুর দেহটাকে যান্ত্রিক দাহ-কেন্দ্রে নিয়ে যাবার জন্য যখন তৈরী করা হচ্ছিল, তখন নাজিমভ চোখ মুছতে মুছতে বাড়ী থেকে বেরিয়ে এসেছিল। চলে এসেছিল নিজ কর্মক্ষেত্রে। তারপর যুদ্ধে আহত হয়ে রিটায়ার করার পর একবার মাত্র বাড়ী গিয়েছিল।
এ ঘটনা নাজিমভের জীবনে আমূল পরিবর্তন আনে। ইসলামের ওপর পড়াশুনা শুরু করেন। এখন দুঃখী মুসলিম জনগণকে মুক্ত করে ইসলামের পূর্ণ প্রতিষ্ঠাই তাঁর জীবনের লক্ষ্য। তাঁর নতুন নাম কর্নেল কুতাইবা। ইতিহাসের কুতাইবা ছিলেন মধ্য এশিয়া অঞ্চলের প্রথম মুসলিম বিজেতা।
কর্ণেল কুতাইবা এখন মধ্যে এশিয়া অঞ্চলের সাইমুমের প্রধান। আতাজানভ নাস্তা আগেই করেছিলেন। কুতাইবা নাস্তা করার পর দু’জনে বেরিয়ে পড়লেন। আতাজানভের জীপে দু’জন চেপে বসলেন। জীপ বেরিয়ে এল খামার কমপ্লেক্স থেকে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে কুতাইবা বললেন, আমরা দু’ঘন্টায় পৌছতে পারব নিশ্চয়?
আতাজানভ মাথা নেড়ে সায় দিলেন। পাহাড়ী পথ বেয়ে এগিয়ে চলল জীপ।
