গুলরোখ রাষ্ট্রীয় খামার থেকে ৮০ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে পাহাড়ের ৪ হাজার ফুট উঁচুতে একটি হ্রদ এবং একটি সুন্দর উপত্যকা ঘিরে একটি পর্যটন কেন্দ্র। হ্রদের চারদিক বেষ্টন করে যে ফল ও ফুলের বাগান গড়ে তোলা হয়েছে তা দেখার মত। নাম দেয়া হয়েছে লেনিন স্মৃতি পার্ক। এই পার্ক থেকে একটা সুপরিসর উপত্যকা বেরিয়ে গেছে দক্ষিণ দিকে। এই উপত্যকায় ফলের চাষ হয়। গোটা গ্রীষ্মকালটা ভ্রমণকারীদের পদভারে জমজমাট থাকে এই পর্যটন কেন্দ্র। উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, প্রভৃতি সব অঞ্চল থেকেই ছুটি ও অবসর বিনোদনের জন্য লোক আসে এখানে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ভীড় বাড়ে।
লেলিন স্মৃতি পার্ক ছাড়িয়ে উপত্যকার পথ ধরে এগিয়ে চলছিলেন আতাজানভ ও কর্ণেল কুতাইবা। উপত্যকার মাঝামাঝি জায়াগায় ঘন গাছে ঢাকা খামার বাড়ী। উপত্যকার রাষ্ট্রীয় খামারের পরিচালক আলদর আজিমভ এই খামার বাড়ীতে বাস করেন। আতাজানভের সহপাঠী ও বন্ধু এবং আতাজানভের মতই সাইমুমের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি।
আতাজানভ ও কুতাইবা খামার বাড়ীর গেটের কাছে পৌঁছে একটা নির্দিষ্ট নিয়মে নিজেদের মাথায় হাত বুলালেন। সংগে সংগে খুলে গেল খামার বাড়ীর দরজা। দরজা খুলে দারোয়ান দরজার এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে। বাজের মত তার চোখ। তার ডান হাতটা ঢিলা ওভারকোটের পকেটে। বুঝাই যায় ওখানে কি আছে।
বাড়িতে প্রবেশের পথে আরেকটা দরজা। দরজার সামনে গিয়ে দু’জনেই বিশেষ নিয়মে তাদের শাহাদাত ও মধ্যমা অঙ্গুলি ঠোঁট দ্বারা স্পর্শ করলেন। দরজা খুলে গেল। এখানেও দরজার পাশে আরেক জন দাঁড়িয়ে, ঐ ভাবেই তার হাত ট্রাউজারের পকেটে।
দরজার পরেই চারকোণা একটি উঠান। এটাই বাড়ির বাইরের আঙিনা। আঙিনার উত্তর পাশের বারান্দার সিঁড়িতে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন আলদর আজিমভ। তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে আমির উসমান, আনোয়ার ইব্রাহিম এবং হাসান তারিক।
আলদর আজিমভ, কুতাইবা এবং আতাজানভকে হাসান তারিকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। কুতাইবা বহুক্ষণ জড়িয়ে ধরে থাকলেন হাসান তারিককে। তারপর বললেন, আমাদের অতি কাছে থেকেও অনেক কষ্ট পেয়েছেন। দুর্ভাগ্য, আমরা জানতে পারিনি।
হাসান তারিক বললেন, না, দুঃখের কিছু নেই। আল্লাহ ঠিক যখন এ খবরটা আপনাদের জানাবার তখনই জানিয়েছেন এবং আলহামদুল্লিাহ আপনারা সিদ্ধান্ত নিতে দেরী করেননি।
বারান্দা পেরিয়ে সবাই পাশের একটা রুমে ঢুকে গেলেন। সেখানে আরও ক’জন আগে থেকেই বসা ছিলেন।
এখানে একটু বলা প্রয়োজন, আলদর আজিমভের এই বাড়ী উজবেকিস্তান সাইমুমের অপারেশনাল হেড কোয়াটার্স। শুধু এই বাড়ী নয়, এই উপত্যকা প্রকল্পের সব লোকই সাইমুমের কর্মী। এই খামার বাড়ী ঘিরে উপত্যকায় ছড়ানো ছিটানো রয়েছে অনেকগুলো সংকেত শিবির। সবগুলোই সশস্ত্র। একেকটা সংকেত শিবির হাজার সৈন্যের বাহিনীকেও মুকাবিলা করার শক্তি রাখে। আবার বিপদের সময়ে উপত্যকা খালি করে পাহাড়ের গোপন দুর্গম পথে তারা অল্প সময়েই সীমান্তের ওপারে আফগানিস্তানে গিয়ে পৌঁছতে পারে।
কার্পেট পাতা মেঝেতে সবাই গোল হয়ে বসেছে। কুতাইবার একপাশে বসেছেন হাসান তারিক, অন্য পাশে বসেছেন আলদর আজিমভ। প্রথমে কথা বললেন কুতাইবা। বললেন, আজ একটা অতি গুরুত্ব-পূর্ণ, অতি জরুরী বিষয়ের আলোচনার জন্য এই পরামর্শ সভার অধিবেশন ডাকা হয়েছে। সে কথা বলার আগে আমি আমাদের ভাই, আমাদের মেহমান হাসান তারিক সম্পর্কে বলতে চাই। আল্লাহর অশেষ শুকরিয়া আদায় করছি যে, তাঁর মত অভিজ্ঞ ও দক্ষ সাইমুম নেতাকে আমাদের পাশে পেয়েছি। তাঁর সম্পর্কে আপনারা সবকিছুই সামিজদাদের মাধ্যমে জেনেছেন। নুতন কিছুই বলার নেই।
থামলেন কুতাইবা। তারপর বলতে শুরু করলেন আবার, ইসলামিক রিপাবলিক অব ফিলিস্তিনের মস্কোস্থ এ্যামবেসী গতকাল আমাকে জানিয়েছে, বিশ্বজোড়া এক ছায়া সরকারের মালিক এখানকার ওয়ার্ল্ড রেড সংস্থা ‘ফ্র’ মিন্দানাও বিপ্লবের সময় আহত অবস্থায় আমাদের ভাই, আমাদের নেতা আহমদ মুসাকে বন্দী করে। বিমান তাঁকে নিয়ে আসে এদেশে। কিন্তু পামির এলাকায় প্লেন ক্রাশের পর তিনি হারিয়ে গেছেন। প্লেন ক্রাশে তিনি মারা যাননি, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু কোথায় গেলেন তিনি, এটা এখনও এখানকার সরকার কিংবা অতুল শক্তিধর ‘ফ্র’ কেউই বহু চেষ্টা করেও জানতে পারেনি।
হাসান তারিক সহ সকলের মুখ হা হয়ে গেছে। বিস্ময়ে সকলের চোখ বিষ্ফারিত। হাসান তারিক, আলদর আজিমভ ও আতাজানভ সমস্বরে বলে উঠলেন, আমরা স্বপ্ন দেখছি না তো, আমাদের কান যা শুনছে তা ঠিকই শুনছে তো ইত্যাদি।
শুনতে স্বপ্নের মতই লাগছে, কিন্তু বাস্তব সত্য। ‘ফ্র’-এর হেলিকপ্টার ও গোয়েন্দা দল পামিরের ঐ এলাকা এখনও চষে ফিরছে।
সত্য বলে তো আমাদের বসে থাকার সময় নেই, আল্লাহ জানেন তিনি এখন কোথায় কিভাবে আছেন, বিশেষ করে আহত তিনি! বলল আমির উসমান।
তার সম্পর্কে আমরা দুই অবস্থার কথা চিন্তা করতে পারি, (এক) তিনি একভাবে লুকিয়ে আছেন, (দুই) তিনি কারও আশ্রয়ে আছেন। এই দুইটির যে কোনটি হলে, আমি তাঁর সম্পর্কে জানি, তিনি পথ বের করে আমাদের সামনে আসবেন। বললেন হাসান তারিক।
আল্লাহর কাছে আমাদের প্রার্থনা এই দু’টোর যে কোন একটিই হোক। আসুন আমরা তৃতীয় কোন বিকল্প নিয়ে চিন্তা করবো না। বললেন কুতাইবা। একটু থেমে তিনি আবার বললেন, আমাদের ক’জনকে এখনি তাজিকিস্তানের পামির এলাকার কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছা দরকার। তাদের সাথে নিয়ে আমাদের অনুসন্ধানে লেগে যাওয়া প্রয়োজন।
থামলেন কুতাইবা। এবার আমির ওসমান বলল, আপনিই ঠিক করে দিন কে কোথায় যাবে। আমি শুধু এখানে একটা কথাই বলব, পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর। হাসান তারিক জেল থেকে পালিয়েছেন, আহমদ মুসা হারিয়ে গেছেন। অতএব ‘ফ্র’ এখন ক্ষ্যাপা কুকুরের মত। অনুসন্ধানে আমাদের অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে।
আমি কি এ ব্যাপারে আপনাদের কোন কাজে লাগব? বললেন হাসান তারিক।
না। আপনি আপাতত এই হেড কোয়াটার্সে থাকবেন। এখানে আপনার অনেক কাজ। থামলেন কুতাইবা। তারপর বললেন, এখন বৈঠক এখানেই শেষ করছি। আমি আলদর আজিমভকে অনুরোধ করছি, আতাজানভ এবং হাসান তারিক ছাড়া সকলকে এক ঘন্টার মধ্য রওয়ানার ব্যবস্থা করে দিন, আমি প্রোগ্রাম তাদের দিচ্ছি। বলে কুতাইবা উঠে দাঁড়ালেন।
