ধীরে ধীরে চোখ খুলল আহমদ মুসা! চিৎ হয়ে শুয়েছিল। চোখ দুটি খুলতেই সামনের দেয়ালে গিয়ে চোখ পড়ল। দেয়ালে একটি ছবি টাঙানো-কাবা শরীফের ছবি। চোখ বুজলো আহমদ মুসা। মুহূর্তকাল পরেই আবার চোখ খুললেন। চোখ এবার নিজের উপর। গায়ের ওপর সাদা একটা উলের চাদর, নরম বিছানা। আবার তার চোখ দু’টি গিয়ে পড়ল সেই কাবা শরীফের ছবির ওপর। সেখান থেকে ঘরের চারিদিকে একবার চোখ বুলাতে গিয়ে ডান দিকে ঘুরতেই চোখ গিয়ে পড়ল আবদুল গফুরের ওপর। জগতে সব উৎসুক্য নিয়ে উজ্জ্বল চোখে তাকিয়ে থাকা কাঁচা-পাকা চুলের শক্ত সুঠাম পুরুষ। মাথায় কাজ করা টুপি, ঢিলা পোষাক- মধ্য এশিয়ার তুর্কী মুসলমানরে একটা প্রতিচ্ছবি। ভ্রু-কুঁচকে উঠল আহমদ মুসার। পাশেই বিস্ময় নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ইকরামভ ও ফাতিমা ফারহানা। আহমদ মুসার চোখ তাদের ওপর দিয়েও ঘুরে এল, ফাতিমা ফারহানার ওপর চোখ পড়তেই চোখ নামিয়ে নিলো আহমদ মুসা। চোখ ঘুরে আবার গিয়ে পড়ল আবদুল গফুরের ওপর।
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ। প্রথমে মুখ খুললেন আহমদ মুসা।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম। জবাব দিলেন আবদুল গফুর।
আবার ঘরের চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিল আহমদ মুসা। গ্রামের একটা কুটির বৈ নয়। কাঁচা দেয়াল, কাঁচা মেঝে। ঐ তো দরজা দিয়ে বালু পাথরের কাঁচা উঠান দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তাকে তো বাক্সে পুরে বিমানে করে তাসখন্দে আনা হচ্ছিল।
আহমদ মুসা উঠে বসতে যাচ্ছিল। ইকরামভ তড়িৎ এসে আহমদ মুসাকে উঠে বসতে সাহায্য করল। আহমদ মুসা উঠে বসে তার দিকে চেয়ে বলল, শুকরিয়া।
ধন্যবাদ। বলল ইকরামভ।
আহমদ মুসা আবদুল গফুরের দিকে চাইল। তারপর চোখ দু’টি নিচে নামিয়ে বলল, আমি কোথায়? আপনারা কে? কেমন করে আমি এখানে এলাম?
এটা তাজিকিস্তানের একটা পাহাড়ী গ্রাম। বললেন আবদুল গফুর। তাজিকিস্তান! একরাশ বিস্ময় ঝরে পড়ল আহমদ মুসার কন্ঠে। তার চোখ দু’টি বুঁজে এল মুখটিও তার যেন রক্তিমাভ হয়ে উঠল। ঠোঁটেও কেমন যেন একটা কাঁপন।
চোখ দু’টি খুলল সে। হঠাৎ দুফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তার দু’গন্ড বেয়ে। তাড়াতাড়ি মুছে নিয়ে বলল, মাফ করবেন, আমি অভিভুত হয়ে পড়েছি কি করে এলাম এখানে!
নদীতে একটা বাক্স আমরা পেয়েছি। বললেন, আবদুল গফুর।
নদীতে? বাক্স? আজ কয় তারিখ?
৪ঠা সেপ্টেম্বর। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দ্রুত উত্তর দিল ইকরামভ।
তাহলে কি ওরা আমাকে বিমান থেকে ফেলে দিয়েছে, না বিমান ক্রাশ করেছে? আহমদ মুসার একরাশ বিস্ময়।
কি হয়েছে, ঘটনা কি বলুন? বললেন আবদুল গফুর।
গত সন্ধায় ওরা আমাকে বিমানে তুলেছে। আমাকে তাসখন্দে নিয়ে যাবার কথা বলে আমি জানি।
এমন সময় কিসের যেন ক্ষীণ একটা আওয়াজ ভেসে এল। সবাই উৎকর্ণ হল- জমাট বাঁধা একটা আওয়াজ।
অনেকগুলো হেলিকপ্টার এক সাথে উড়ছে। বলল আহমদ মুসা।
সবাই আহমদ মুসার দিকে তাকাল। কিসের আওয়াজ তারা এখনও তা ধরতে পারেনি।
ইকরামভ দৌড়ে বেরিয়ে গলে। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বলল, কিছুই দেখা যায় না। ততক্ষণে শব্দও মিলিয়ে গেছে।
হেলিকপ্টারের শব্দ আপনি কি করে বুঝলেন? প্রশ্ন করল ইকরামভ।
আমার কান ভুল না শুনলে ও শব্দ হেলিকপ্টারেরই। শুয়ে পড়তে পড়তে বলল আহমদ মুসা। মাথাটা তার বেদনায় ছিঁড়ে যাচ্ছে।
আপনার পরিচয় কি, কে আপনি? প্রবল উৎসুক্য ঝরে পড়ল ইকরামভের কন্ঠে।
আহমদ মুসা কথা বলার আগে কথা বলে উঠলেন আবদুল গফুর। বললেন, থাক এ প্রশ্ন এখন। উনি অসুস্থ। বলে আহমদ মুসার কাছে সরে এসে নরম গলায় বললেন, অসুস্থ বোধ করছেন?
আহমদ মুসা আবদুল গফুরের দিকে মাথা ঘুরিয়ে বলল, আপনাদের পরিচয় জানি না। কিন্তু আপনি আমার পিতার বয়সের। আপনি বলে সম্বোধন করে আমাকে লজ্জা দেবেন না।
চমকে উঠলেন বৃদ্ধ আবদুল গফুর। একটি মুখ তার চোখে ভেসে উঠল, সেই হারানো বড় ছেলে। ঠিক এই বয়সেরই ছিল। ঠিক এমনই ছিল তার সুঠাম শরীর। আনমনা হয়ে পড়লেন তিনি।
কষ্ট দিলাম আপনাকে? বলল আহমদ মুসা।
‘না বাবা’ হঠাৎ মুখ থেকে বেরিুয়ে এল বৃদ্ধের। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, বলছিলাম তুমি অসুস্থ বোধ করছ কিনা?
না তেমন কিছু নয়। মাথায় ব্যথা। গায়ে কিছু ব্যথা বোধ হচ্ছে। আবদুল গফুর ফাতিমা ফারহানার দিকে ফিরে বললেন, দেখ গরম পানি হয়েছে কি না, হলে দিয়ে যেতে বল। একটু গরম দুধও আনতে বল।
হঠাৎ আবার সেই শব্দ ভেসে এল। এবার আর ও স্পষ্ট। ইকরামভ ছুটে বেরিয়ে গেল আবার। বৃদ্ধ আবদুল গফুরও উঠানে দিয়ে দাড়ালেন। অল্পক্ষণ পর ফিরে এল সবাই।
আহমদ মুসা ইকরামভের দিকে তাকালো। ইকরামভই কথা বলল প্রথম। বলল, চারটি হেলিকপটার এসে আবার চলে গেল।
চোখ দু’টি বন্ধ হয়ে এল আহমদ মুসার পরিস্কার এখন তাঁর কাছে, বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। অজান্তেই শিউরে উঠলেন তিনি। বিধ্বস্ত বিমান থেকে তাহলে তাঁকে বহনকারী বাক্স নদীতে এসে পড়েছে!
আল্লাহ তাঁকে রক্ষা করেছেন, তিনি শুকরিয়া জ্ঞাপন করলেন আল্লাহর দরবারে।
সবাই তাকিয়ে ছিল আহমদ মুসার দিকে। সবাই বুঝছে, ভাবছে আহমদ মুসা, কিছু বলবেন তিনি। আহমদ মুসা চোখ খুললেন। বললেন এ্যারোফ্লোটের একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে আশেপাশে কোথাও।
একটু থামলেন আহমদ মুসা। আবদুল গফুর, একরামভ ও ফাতিমা ফারহানা সাবর চোখেই উদ্বেগ ঝরে পড়ল। একটা বিষন্নতা এসে ছড়িয়ে পড়ল সবার চোখে মুখে।
আহমদ মুসা আবার শুরু করলেন, বুঝতে পারছি, ঐ বিমান থেকেই আমাকে নিয়ে বাকা্রটি ছিটকে পড়েছে নদীতে।
‘আ’! করে একটা অস্ফুট শব্দ তুলে দু’হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়ল ফাতিমা ফারহানা। আবদুল গফুর ও ইকরামভের চোখও বিস্ময়ে বিস্ফারিত। কেউ কোন কথা বলতে পারলো না। কথা বললো প্রথম আহমদ মুসাই। বললেন, পাহাড়ে পড়লে কি হত আল্লাহই জানেন। আল্লাহ যাকে রক্ষা করতে চান এভাবেই রক্ষা করেন।
ঠিক বলেছ, আল্লাহর কুদরত বলা ছাড়া এর আর কোন ব্যাখ্যা নেই। বললেন আবদুল গফুর।
এ এক চমৎকার কাহিনী হবে। বলল ইকরামভ।
ফাতিমা ফারহানার চোখ থেকে বিস্ময়ের ঘোর এখনও কাটেনি। এ সময় গরম পানি এল। আবদুল গফুর আহমদ মুসাকে বললেন, গরম পানি দিয়ে ভালো করে অজু করে নাও। নাস্তার পরে কথা বলব।
আহমদ মুসা কথা শেষ করলেন। বললেন, কিভাবে কারকভে বন্দী হলেন কিভাবে বোম্বাইয়ে আনা হল, তাসখন্দে তাঁকে চালান দেয়া হচ্ছে কিভাবে। তার সব কিছুই কারকভের বৃদ্ধের কাছে জানলেন।
আবদুল গফুর, একরামভ এবং ফাতিমা ফারহানা উদগ্রীব হয়ে শুনছিল তাঁর কথা। আহমদ মুসার কথা শেষ হয়ে কথা বলে উঠল ইকরামভ। বলল, কিন্তু বিশ্ব রেড সংস্থা ‘ফ্র’-এর সাথে আপনার শত্রুতা কিসের? আপনি কে তা তো বললেন না?
ম্লান একটা হাসি খেলে গেল আহমদ মুসার ঠোঁটে। চাইল ইকরামভের দিকে। শুয়ে শুয়ে কথা বলছিল আহমদ মুসা। উঠে বসলো ধীরে ধীরে। আবদুল গফুর, ইকরামভ ও ফাতিমা ফারহানার তিন জোড়া উৎসুক চোখ আহমদ মুসার ওপর নিবদ্ধ। যেন সবাই জানতে চায় এ প্রশ্নের উত্তর।
আহমদ মুসা ধীরে ধীরে মুখ খুলল। তার শূন্য দৃষ্টি জানালা দিয়ে বাইরে নিবদ্ধ। যেন অতীতের কোন অতলে হারিয়ে গেছে। বলল, কম্যুনিস্টদের বিশ্ব রেড সংস্থা ‘ফ্র’-এর সাথে কোন শত্রুতা আমার নেই। আমি এ সরকারের কোন ক্ষতি করিনি। আমার অপরাধ একটাই, আমি আমার মুসলিম জাতিকে জীবনের জীয়নকাঠির পরশে ঘুম থেকে জাগাতে চেয়েছি, পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে তাদের মুক্ত করতে চেয়েছি।
হৃদয়ের কোন তলদেশ থেকে কথাগুলো বেরিয়ে এল। আবেগ ও মমতায় মাখানো শেষের কথাগুলো বড্ড ভারী শোনাল।
তিনজনই কিছুক্ষণ নিরব। ইকরামভই আবার নিরবতা ভাঙল। বলল, আপনার পরিচয় কি, দেশ কোথায়, বলবেন কি?
আহমদ মুসা আবার চাইল ইকরামভের দিকে। ঠোঁটে আবার সেই ম্লান হাসি। বলল, আমার দেশ কোথায়, এ প্রশ্নের উত্তর কোনদিন আমি ভেবে দেখিনি মিঃ ইকরামভ। একটু থামল। তারপর বলল, কোন দেশকে আমার দেশ বলব? আমার কোন দেশ নেই। গোটা মুসলিম বিশ্বই আমার ঘর।
আবদুল গফুর ও ফাতিমা ফারহানার চোখে বিস্ময়। ইকরামভের চোখে তীক্ষ্ণ কৌতুহল।
কিন্তু কথাটা…..। কথা শেষ না করেই থেমে গেল ইকরামভ।
আহমদ মুসা বললো, বিশ্বাস করার মত নয় অবশ্যই, কিন্তু আমার জন্য এটাই বাস্তবতা। জন্ম আমার সিংকিয়াং-এ। তারপর একদিন উদ্বাস্ত্ত হয়ে ছিটকে পড়েছি বাইরে।
থামল আহমদ মুসা।
ফাতিমা ফারহানার মুখটি নিচু। ইকরামভের চোখে আরও অনেক জিজ্ঞাসা। আর বৃদ্ধ আবদুল গফুরের বুকটি তোলপাড় করছে। ফেলে আসা অতীতটা ভেসে উঠেছে তার চোখে। সব হারানো পাহাড় পর্বত, অভিমুখী উদ্বাস্ত্ত সারি চোখ বুজলেই দেখতে পান তিনি। অনেকেই তো সিমান্ত ডিঙ্গিয়ে চলে গেছে আফগানিস্তান, ইরাক, তুরস্ক ও ভারত উপমহাদেশে। তাঁর ছেলে আল্লাহ বকশ। কোথায় সে! বেচে থাকলে সে তো এখনও এমনি ঠিকানাহীন উদ্ধাস্ত্ত। বুকটি মোচড় দিয়ে উঠল বৃদ্ধের। চোখ তুলে তাকালেন আহমদ মুসার দিকে। এমন বয়সেই আল্লাহ বকশ হারিয়ে গেছে। এমনি করে জাতির জন্যই সে ঘর ছেড়েছে, সব ছেড়েছে।
আবার কথা বলল ইকরামভ। বলল সে, থাক, এ বিষয় পরেও জানা যাবে। আপনার নাম কিন্তু এখনও জানতে পারিনি।
সবাই তাকাল আহমদ মুসার দিকে মনে এ প্রশ্নটা সবারই।
আহমদ মুসা। তার নাম জানিয়ে দিল আহমদ মুসা।
নামটা শুনে ফাতিমা ফারহানা কি যেন ভাবল। তার চোখে জিজ্ঞাসা জেগে উঠতে দেখা গেল। মুখটা কিঞ্চিত আরক্ত হল তার। প্রথম কথা বলল সে, জিজ্ঞেস করল, আপনি ফিলিস্তিনে ছিলেন?
আহমদ মুসা তাকাল ফাতিমা ফারহানার দিকে। ফারহানার চোখে চোখ পড়ল। চোখ নামিয়ে নিল আহমদ মুসা।
ছিলাম। বললো আহমদ মুসা।
সাইমুমের সাথে আপনার সম্পর্ক ছিল?
বিস্মিত চোখে চাইলো আহমদ মুসা ফারহানার দিকে। বললো, ছিল।
ফাতিমার ফারহানর চোখেও বিস্ময়। একটা চাঞ্চল্যও তার চোখেমুখে। আবার প্রশ্ন করল ফাতিমা ফারহানাই, আপনি কি ফিলিস্তিন থেকে মিন্দানাও যান?
‘হ্যাঁ, সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল আহমদ মুসা।
পিসিডার সাথে সেখানে আপনি কাজ করেছেন?
হ্যাঁ।
ফাতিমা ফারহানা অভিভূতের মত তাকিয়ে ছিল আহমদ মুসার দিকে।
তার চোখে যেন জগতের বিস্ময়। আহমদ মুসার বিস্ময়ের ঘোর তখনও কাটেনি।
আপনি এসব জানেন কি করে? বললো আহমদ মুসা।
ফাতিমা ফারহানা একবার ইকরামভের দিকে চেয়ে বলল, সাম্প্রতিক এক সামিজদাদে (সোভিয়েত ইউনিয়নে গোপনে প্রচারিত সাইক্লোস্টাইল করা পত্রিকা) এ সম্বন্ধে একটি নিবন্ধ আমি দেখেছি।
ইকরামভ ফাতিমার দিকে চেয়ে বলল, আমরা কিন্তু কিছুই বুঝলাম না, ফারহানা!
ফাতিমা ফারহানা একবার আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে নিয়ে বলল, আববা, ভাইয়া, ইনি ইসলামী বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছেন। আবার মিন্দানাওয়ের মুসলিম মুক্তি সংস্থা পিসিডার নেতৃত্বে ইনি ছিলেন।
সকলেরই বিস্মিত দৃষ্টি আহমদ মুসার দিকে। আহমদ মুসা বলল, সবই আপনারা জেনেছেন। আরেকটা খবরও আপনাদের দেই। গত পরশু মিন্দানাও দ্বীপপুঞ্জ মুসলমানরা মুক্ত করেছে এবং মুসলমানদের স্বাধীন ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
কিন্তু সেখান থেকে ‘ফ্র’ এর হাতে আপনি গ্রেপ্তার হলেন কেমন করে? জিজ্ঞেস করল ফাতিমা ফারহান।
এ বিষয়টা পরিষ্কার করতে হলে আমাকে অনেক কথাই বলতে হয়-বলে আহমদ মুসা কাগায়ানে তার আহত হওয়া থেকে শুরু করে হেলিকপ্টারে জাম্বুয়াংগো থেকে কারকভের শিপে আসা পর্যন্ত ঘটনাগুলো সংক্ষেপে বলে গেল।
কিছু বলতে যাচ্ছিল ইকরামভ। হঠাৎ প্রধান ফটক থেকে করাঘাতের শব্দ এল। ভ্রু কুঁচকে উঠল আবদুল গফুরের। অসময়ে এমন করে কে এল! সবাইকে ইংগিতে বসতে বলে আবদুল গফুর উঠে দাঁড়িয়ে যেতে যেতে বললেন, দেখে আসি।
অল্পক্ষণ পর ফিরে এল আবদুল গফুর। চিন্তিত দেখা দেল তাঁকে। বসতে বসতে বললেন তিনি, রাজনৈতিক সেক্রেটারী সাহেব এসেছিলেন। দু’টো খবর দিয়ে গেলেন। স্টালিনাবাদ থেকে আবদুল্লায়েভ জানিয়েছে তার আসতে আরও দু’দিন দেরী হবে। উল্লেখ্য আবদুল গফুরের ছেলে আবদুল্লায়েভ এখানকার গ্রাম প্রশাসক সংস্থা বহুমুখী সমবায়ের সভাপতি। একটি আঞ্চলিক সম্মেলনে যোগ দেবার জন্য দু’দিন আগে স্ট্যালিনাবাদ গেছে। আজই তার ফেরার কথা।
আবদুল গফুর বললেন, দ্বিতীয় খবরটি হল রেডিওতে বলে দেয়া হয়েছে, বিধ্বস্ত বিমানের কোন অংশ কিংবা বিমান থেকে ছিটকে পড়া কোন জিনিস যদি কেউ কোথাও পায় বা দেখতে পায়, তাহলে অবিলম্বে যেন তা নিকটবর্তী কোন সরকারী প্রশাসনকে জানায়।
ইকরামভ এবং ফাতিমা ফারহান দু’জনেই এক সংগে পিতার মুখের দিকে চাইল। তাদের মুখে শংকা। আহমদ মুসার মুখে কোনই ভাবান্তর নেই।
দূর থেকে আকাশে অনেকগুলো হেলিকপ্টার ওড়ার একটা জমাট শব্দ কানে আসছে।
ইকরামভ এবং ফতিমা ফারহানা তাদের আব্বার ঘরে বসে। আবদুল গফুর বাড়ির সবাইকে তার ঘরে ডেকেছেন। অন্য কেউ এখনও পৌঁছায়নি। মেঝেয় ভেড়ার পশমে হাতে বোনা কার্পেট। এ কার্পেটেই বসেছে ইকরামভ এবং ফাতিমা ফারহানা।
ইকরামভ ফাতিমাকে প্রশ্ন করল, যে সামিজদাদের কথা তুই ওখানে বললি, তা পেয়েছিলি কোথায়? ওগুলো তুই পড়িস নাকি?
ফাতিমা ইকরামভের দিকে এক পলক চেয়ে একটু হেসে বলল, কেন, পড়তে দোষ কি? আর পাওয়ার কথা বলছ, মস্কো ইউনিভার্সিটির মুসলিম ছাত্র মহলে ওটা নিয়মিতই বিলি হয়। কে বিলি করে কোনদিন দেখেনি, জানিনা। আংগুলে গোনা দু’চারজন ছাড়া সব মুসলিম ছাত্র ছাত্রীই এ সামিজদাদ গোপনে গোপনে পড়ে। তুমি তাসখন্দে এটা কখনও পাওনি, ভাইয়া?
দেখেছি। কিন্তু আমি ওগুলো পড়ি না। ধরা পড়লে জীবনটাই শেষ হয়ে যাবে। গতে মাসেই তো দু’জন ধরা পড়ল! ওদের সংশোধন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। সংশোধন না হলে চিরদিনের জন্য সাইবেরিয়ার দাস শিবিরে যেতে হবে।
একটু থামল ইকরামভ। তারপর আবর বলল, তুই এগুলো পড়া এখন থেকে বাদ দিবি। ধরা পড়লে আর রক্ষে থাকবে না।
কিন্তু ভাইয়া, এ ভয়টা যত বাড়ছে, ঐ সামিজদাদের জনপ্রিয়তা ততই বাড়ছে। এখন এ সামিজদাদের জন্য মুসলিম ছাত্র ছাত্রীরা অধীর ভাবে অপেক্ষা করে। আমি এমন অনেক মুসলিম স্যারকে জানি যারা এ সামিজদাদ পড়েন।
অন্যে যাই করুক তুই এসব পড়িস না।
তুমি ভেব না ভাইয়া আমি এ ব্যাপারে খুব সাবধান আছি। আমি কখনও কোনদিনই কারো সামনে এটা পড়ি না, কারো কাছ থেকে নিই না।
কেমন করে ওগুলো তোর কাছে আসে?
আসে না, আমি প্রতিমাসের পনের তারিখে লাইব্রেরীর নির্দিষ্ট একটা বইয়ের মধ্যে পাই। আমি পড়ে ওখানেই রেখে আসি।
অদ্ভুত ব্যাপার!
অদ্ভূতই ভাইয়া, একটা শক্তিশালী নেটওয়ার্ক না থাকলে এটা সম্ভব হতো না।
আমি তো এত কিছু খেয়াল করি না!
করবে কেমন করে, পড়ার বাইরে কি তুমি কিছু বুঝ?
বুঝে লাভ নেই। বেশী বুঝার ভালো পরিণতি আমি দেখি না।
অর্থাৎ?
আমি তাসখন্দ বিশ্ববিদ্যালয়ে আছি দু’বছর। এই দু’বছরে আমার জানা মতেই দু’শ মুসলিম ছাত্র হারিয়ে গেছে যাদের খোঁজ কেউই কোনদিন পায়নি। আর জেল ও সংশোধন ক্যাম্পে যাদের পাঠানো হয়েছে, তাদের সংখ্যা আরও বেশি।
ভাইয়া একটা কথা বলতো, এমন অত্যাচার দিয়ে গতি শীল কোন কিছুর অগ্রগতি কি রোধ করা যায়?
আমি এতকিছু বুঝি না, বুঝতে চাই না ফারহানা। তোর প্রশ্নের জবাব আহমদ মুসা ভালো দিতে পারবেন। একটু থামল ইকরামভ। তারপর বলল, আচ্ছা ফারহানা লোকটাকে তোর কি মনে হয়?
তুমি আমি তার সম্পর্কে যা ধারণা করছি, তার চেয়ে তিনি অনেক-অনেক বড়। সামিজদাদ পত্রিকায় তাকে বিশ্ব মুসলিম মুক্তি সংগ্রামের নেতা হিসাবে অভিহিত করা হয়েছে। তিনি ফিলিস্তিন এবং মিন্দানাওয়ে যা করেছেন তাতে আমেরিকা ও আমাদের সরকারের পিলে চমকে গেছে বলতে হবে। তার নার্ভটা দেখ? আব্বার বলা দ্বিতীয় খবরটা শুনে আমরা শংকিত হয়েছিলাম, কিন্তু দেখছ তো তাঁর চোখের পাতাটাও নড়েনি!
এ সময় আবদুল গফুর ঘরে ঢুকলেন। ইকরামভ ও ফাতিমা ফারহানাকে দেখে বললেন, তোমরা এসেছ, বেশ। যাও, তোমাদের মা আর ভাবীকে ডাক।
সবাই এসে প্রশস্ত মেঝের কার্পেটে আসন নিয়েছে। আবদুল গফুর একটা তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বসেছেন আর সবাই তার সামনে।
সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে আবদুল গফুর বললেন, আমাদের পিতা-পিতামহরা কোন সমস্যা দেখা দিলে সিদ্ধান্ত নিতেন গোত্রের সবাইকে ডেকে পরামর্শ করে। কিন্তু এখন সেদিন নেই। কোন ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার প্রকৃতপক্ষে কোন স্বাধীন ক্ষমতাও আমাদের সমাজের নেই। সে যাক আজ আমি এক সমস্যায় পড়েছি। তোমাদের পরামর্শ চাই। জিয়াউদ্দিন, আবদুল্লায়েভ ওরা কেউ নেই। আবদুল্লায়েভ থাকলে খুবই ভাল হতো। কিন্তু তার জন্য অপেক্ষা করার উপায় নেই।
থামলেন আবদুল গফুর। তারপর আবার শুরু করলেন, আকস্মিক ভাবে আমরা একজন মেহমান পেয়েছি। মেহমানকে কেমন করে পেলাম তোমরা জান। এখন সমস্যা দাঁড়িয়েছে সরকারী নির্দেশ অনুসারে এখনি তাকে সরকারের হাতে তুলে দিতে হবে, অন্যদিকে তাকে সরকারের হাতে তুলে দেয়ার অর্থ তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া। বিপদ হল, তাকে সরকারের হাতে তুলে না দিলে এটা প্রকাশ হয়ে পড়লে যেমন আমাদের পরিবারের ওপর বিপদ আসবে, তেমনি মেহমানকে, অর্থাৎ যে আমাদের শুধু মুসলিম ভাই নয়, যাঁর গোটা জীবনটাই কওমরে জন্য বিলিয়ে দেয়া, তাকে শত্রুর হাতে তুলে দেয়া আমাদের ঐতিহ্য ও ঈমানের দিক দিয়ে চরম দায়িত্বহীনতা হবে। এখন তোমরা চিন্তা করে বল, কোন সিদ্ধান্ত আমরা নেব। সবাই নিরব। সবাই মাথা নিচু করে ভাবছে যেন।
প্রথম মাথা তুলল ইকরামভ। সবার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বলল, আব্বা যদিও মেহমানের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও দুর্বলতা আছে, তবু তাকে সরকারের হাতে তুলে দেয়াই সংগত। সরকারের কাস্টোডি থেকেই আমরা তাকে পেয়েছি, আবার সরকারের কাছেই আমরা তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছি, এতে অন্যায় কিছু আমাদের জন্য নেই। এটা না করলে আমাদের পারিবারিক বিপদের যে আশংকা আছে, তার ঝুঁকি আমরা নিতে পারি না।
থামল ইকরামভ। আবার কিছুক্ষণ চুপচাপ। এবার কথা বলল ফাতিমা ফারহানা। বলল সে, মেহমানের পরিচয় না জানলে ভাইয়া যা বলেছেন তা করা যেত, কিন্তু তাঁর যে পরিচয় আমারা পেয়েছি তাতে তাঁকে সরকারের হাতে তুলে না দিয়েও কি করে আমরা আমাদের পরিবারকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারি সেটাই আমাদের দেখা দরকার।
এবার কথা বলল আবদুল্লায়েভের স্ত্রী আতিয়া। বলল সে, সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আমাদেরকে বাস্তববাদী হতে হবে। এই সরকারের আইন আমাদের ভাল লাগুক বা না লাগুক, তার নির্দেশ আমাদের পছন্দ হোক বা না হোক, আমরা কিন্তু সবই মেনে চলছি। কারণ এ আদেশ অস্বীকার করার শক্তি আমাদের নেই। এ ক্ষেত্রেও তাই, সরকারী আদেশ লংঘন করার কোন সামর্থ্য ও সুযোগ যেহেতু আমদের নেই, তাই সরকারী আদেশ মানাই ভাল।
আবদুল গফুরের স্ত্রী স্বামীর দিক চেয়ে বললেন, যেটা ন্যায়ত হয়, সেটাই করুন।
মাথা নিচু করে ভাবছেন আবদুল গফুর। সবাই নিরব। এক সময় মাথা তুললেন তিনি। কথা বললেন। স্থির এবং ধীর কন্ঠ তাঁর।
তোমাদের কথা শুনলাম! তোমরা বলেছ, যুবকটিকে আমরা সরকারের কাস্টোডি থেকে পেয়েছি, কথাটা ঠিক নয়। সে ‘ফ্র’-এর কাস্টোডিতে ছিল। সুতরাং তাকে সরকারের হাতে না দেয়ায় দোষ নেই। তারপরও আমি বিষয়টা নিয়ে অনেক ভেবেছি। কিন্তু মেহমান যুবককে সরকারের হাতে তুলে দেবার চিন্তা যতবারই করতে গেছি, গোটা সত্তা আমার যেন বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। যুবকটি আমাদের জাতির এক অতি মূল্যবান সম্পদ বলেই শুধু নয়, আমি ওর মধ্যে আমাদের আল্লাহ বকশকে খুঁজে পেয়েছি। বেদ্বীন শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ না করে আমাদের আল্লাহ বকশ তো জাতির জন্য এই যুবকটির মত করেই ঘর ছেড়েছে, সুখ-শান্তি সব বিসর্জন দিয়ে হারিয়ে গেছে অনিশ্চিত অন্ধকারে।
বলতে বলতে কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেল বৃদ্ধের। থামলেন তিনি। তাঁর দুচোখ থেকে দুফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
কারও চোখ শুষ্ক নেই। সবার চোখেই পানি। আল্লাহ বকশ এ বাড়ির বড় আদরের সন্তান। এ গ্রামে হিজরত করার পর এ বাড়ির প্রথম সন্তান সে। আবদুল গফুরের পিতা গ্রামের নাম রেখেছিলেন আল্লাহ বকশ। এ গ্রামে এসে প্রথম পাওয়া নতিরও আদর করে নাম রাখেন আল্লাহ বকশ। দুঃসাহসী স্বাধীনচেতা যুবক আল্লাহ বকশ আল্লাহ ছাড়া অর কোন কিছুকেই ভয় করত না।
রুমালে চোখের দু’কোণ মুছে নিয়ে আবর শুরু কররেলন আবদুল গফুর, পরিবারের বিপদের কথা আমিও চিন্তা করেছি। একটা সামাধানও বের করেছি। আমি যুবককে নিয়ে চলে যেতে চাই। পাহাড়ের ওপাশেই তো আফগানিস্তান। তোমরা জান, সীমান্তের এপারেও আমাদের তাজিক, কিরঘীজ, উজবেক ও তুর্কমেন এলাকায় অনেক মুজাহিদ ঘাঁটির পত্তন হয়েছে। একটা আশ্রয় আমরা খুজে পাবই। ‘ফ্র’ এ ঘটনার কখনও খোজ পেলে তোমরা বলে দিও, আমার সাথে তোমাদের কোন সম্পর্ক নেই।
‘আব্বা’ বলে আর্তনাদ করে উঠল ফাতিমা ফারহানা।
ইকরামভ উঠে গিয়ে তার আব্বার হাত ধরে বলল, আব্বা আমাকে মাফ করুন। আমি আল্লাহ বকশের ভাই। কি করতে হবে আমাকে আদেশ করুন।
ইকরামভের দু’গন্ড বেয়ে নামছে অশ্রু ধারা। ঠোঁট দুটি তার দৃঢ় সংবদ্ধ। চোখে শপথের দীপ্তি।
