প্রিয় তারিক,
প্রিয় বলেই সম্বোধন করলাম। কারণ, আমার ফ্লাট, আমার অফিস আর আমি নিয়ে আমার যে ছোট্ট জগত সেখানে এই মুহূর্তে আপনার চেয়ে প্রিয় আর আমার কেউ নেই। আমি মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্রী, সুন্দরীও। একদিন এজন্য আমার গর্বের অন্ত ছিল না। কিন্তু আজ বুঝতে পারছি, এ দুটি জিনিসই আমার ক্ষতি করেছে সবচেয়ে বেশি।
আমার আব্বা মারা গেছেন আজ থেকে পনের বছর আগে। একটি ভাই মাত্র ছিলো। নাম আবু উমরভ।
ফ্র-এর রেড আর্মির একজন কর্নেল সে। সেই যে আফগান যুদ্ধে গেছে আর ফিরে আসেনি! কেউ বলে মারা গেছে, কেউ বলে সে মুজাহিদদের পক্ষে যোগ দিয়েছে। আমি যখন মস্কো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্টারন্যাশনাল রিলেশানস এ প্রথম স্থান অধিকার করে পাস করলাম তখন ভেবেছিলাম শিক্ষকতার চাকুরী আমি পাচ্ছি। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় এ বৃত্তিকেই আমার পছন্দ বলে লিখেছিলাম। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকুরী পেলাম না। আমার একজন সহপাঠি আগেই বলেছিল, কোন তুর্কিকে এ চাকুরী দেয়া হবে না। তার কথাই সত্য হলো। পাস করার পর আমাকে ফরেন সার্ভিসে যোগ দিতে বলা হলো। সেই সাথে আমাকে জানান হলো, ফরেন সার্ভিসে যোগ দেবার আগে দু’বছর আমাকে গোয়েন্দা বিভাগে কাটাতে হবে এ বৃত্তি আমার পছন্দ নয়, কিন্তু এ কথা প্রকাশের কোন সাধ্য আমার ছিল না। বেঁচে থাকতে হলে এ আদেশ মানতে হবে।
ফ্র-এর গোয়েন্দা বিভাগে ক্যারেকটার এ্যাসাসিনেশান স্কোয়াডে আমাকে রাখা হলো। শুনলাম আমার রূপ আর বুদ্ধিই নাকি এর কারণ। বিদেশ থেকে আসা অনেক নামী-দামীদের সঙ্গ দিয়ে তাদের বাগে আনতে হবে যার জন্য রূপ আর গুণ দুই-ই প্রয়োজন। এর আগে দু’টো এ্যাসাইনমেন্ট আমি পেয়েছি। দু’টোতেই ফেল করেছি। নিজের ক্যারেকটার এ্যাসাসিনেট করতে চাইনি বলে কারো চরিত্র আমি এ্যাসাসিনেট করতে পারিনি। এই দায়িত্ব থেকে মুক্তির জন্য আমি সবিনয় অনুরোধ জানিয়েছিলাম। তার উত্তরে তারা আপনার এ্যাসাইনমেন্টটা আমাকে দিয়েছে, বলে দিয়েছে আমি যদি এ এ্যাসাইনমেন্টে সফল হই, তাহলে এ দায়িত্ব থেকে আমাকে মুক্তি দেয়া হবে এবং বিবাহ করে সংসার জীবনে প্রবেশ করতে অনুমতি দেয়া হবে। আপনাকে শয্যা সঙ্গী করাই ছিল আমার এ্যাসাইনমেন্ট। এ জন্য যে জায়গাটি নির্দিষ্ট ছিল সেখানে ছিল গোপন টেলিভিশন ক্যামরা। দিনের পর দিন বিভিন্ন ভঙ্গিতে এখানে ছবি উঠত। এ ছবিগুলো দিয়ে আপনাকে ব্ল্যাকমেইল করা হতো। এই ভাবে আপনাকে হাতের মুঠোয় এনে, আপনাকে মুসলিম বিশ্বে আপনার সংগঠনের মধ্যে ছেড়ে দেয়া হতো কম্যুনিস্টদের বিশ্বজোড়া ‘ফ্র’-এর পক্ষে গোয়েন্দাগিরির জন্য।
তাদের এ আশা আমি পূরণ করেত পারিনি। আমার রূপ যৌবন যা এই প্রথমবারের মত বিলিয়ে দিতে চেয়েছিলাম আমার নতুন জীবনের জন্য, আপনার পাথরের মত হৃদয়ে কোনই কম্পন সৃষ্টি করতে পারেনি। তৃতীয় বার ব্যর্থ হলাম আমি। এ ব্যর্থাতার নিশ্চয় ক্ষমা নেই। গতকাল আমি আমার ব্যর্থতার রিপোর্ট ডিপার্টমেন্টকে দিয়েছি। আজ সন্ধ্যায় আমাকে ডাকা হয়েছে। জানিনা কোন ভাগ্য আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
আগে হলে ভয় পেতাম বর্তমান অবস্থায়। কিন্তু ভয় না করার শিক্ষা আমি আপনার কাছ থেকে পেয়েছি। যে কোন পরিণতির জন্য আমি আজ প্রস্ত্তত। শুধু একটাই দুঃখ, পরম প্রভুর বিচার দিনের যে জগতকে আপনি বিশ্বাস করতে আমাকে শেখালেন, সেই জগতের কোন পাথেয় আমার নেই। আর একটা দুঃখ, আপনাকে আর দেখতে পাব না কোন দিন।
দুনিয়াতে আমার আর কেউ নেই। যদি কোনদিন বাইরে বেরুতে পারেন, যদি আমার ভাই বেঁচে থাকে, আর তার যদি দেখা আপনি পান, মনে যদি থাকে এই দুঃখিনীর কথা, তাহলে বলবেন একজন মুসলিম উজবেক মহিলা হিসাবেই তার বোন মৃত্যুবরণ করেছে।
আপনার- আয়িশা আলিয়েভা
উমর জামিলভের অফিস কক্ষ। বিশাল টেবিল। রিভভিং চেয়ারে বসে আছে উমর জামিলভ। তার সামনে একটা ফাইল খোলা। ফাইলটি আয়িশা আলিয়েভার। গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়ছে সে ফাইল।
গুরুতর অভিযোগ আলিয়েভার বিরুদ্ধে। তিন তিনবার তার মিশন ফেল করেছে। এটা শুধু ব্যর্থতা নয়, অবাধ্যতা বলে-এর ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পার্টি ও রাষ্ট্রের স্বার্থের চেয়ে সে তার বস্তাপঁচা নৈতিকতাকে বড় করে দেখেছে। এই অবাধ্যতা তাকে সকল প্রকার দায়িত্বের অনুপুযুক্ত এবং শাস্তিযোগ্য করে তুলেছে। এই অপরাথের নির্ধারিত শাস্তি হলো, সাইবেরিয়া অথবা সুদূর কোন লেবার ক্যাম্পের (শ্রম শিবির) জীবন বরণ করে নেয়া।
কিন্তু আলিয়েভার অপরাধ আরও গুরুতর। সে শত্রুর সাথে যোগাসাজস করেছে, শত্রুর কাছে রাষ্ট্রের গোপন তথ্য ফাঁস করেছে। লাইব্রেরী কক্ষের টেলিভিশন ক্যামেরা এবং টেপ এর সাক্ষী। ফাইলে তার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। ফাইলে রয়েছে আলিয়েভার সেই সর্বশেষ চিঠিও যা সে হাসান তারিককে দিয়েছিল। আলিয়েভা যখন হাসান তারিককে চিঠি দেয় এবং হাসান তারিক যখন চিঠি পড়ছিল, সবই দেখেছে সিকিউরিটি লোকরা কনট্রোল রুম থেকে। চিঠি পড়তে অর দু’মিনিট দেরী করলে চিঠি আর পড়া হতো না হাসান তারিকের। যখন চিঠিটি পড়ছিল হাসান তারিক, সিকিউরিটির লোকেরা ছুটছিল সে রুমের দিকে। চিঠি পড়ার মুহূর্তকয় পরেই তারা সেখানে গিয়ে হাজির হয়। টেপ এবং চিঠি দুই-ই মনোযোগ দিয়ে পড়ল উমর জামিলভ। পড়তে পড়তে ঘেমে উঠেছিল সে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরেও কপালে জমে উঠেছে তার বিন্দু বিন্দু ঘাম। হাসান তারিকের কথার মধ্যে বার বার তার দাদীর মুখ সে ভেসে উঠতে দেখেছে।
দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলে মনটাকে শক্ত করল উমর জামিলভ। আলিয়েভার শেষ অপরাধটা অত্যন্ত গুরুতর। এ বিদ্রোহের একমাত্র শাস্তি ফায়ারিং স্কোয়াড। আর এ সুপারিশ করার দায়িত্ব তার ওপরই অর্পণ করা হয়েছে।
ইন্টারকমে নির্দেশ দিল, সাতটায় আয়িশা আলিয়েভা আসবে। এলেই এখানে পাঠাবে। ও প্রান্ত থেকে উত্তর এল, ইয়েস স্যার।
ফাইলটি বন্ধ করে চেয়ারে গা এলিয়ে দিল উমর জামিলভ। একটু রেস্ট নেবার জন্য ফাইল বন্ধ করল বটে, কিন্তু সংগে সংগে দেশের ফাইলটা খুলে গেল তার সামনে। দেশ বলতে আপাতত সে মধ্য এশিয়াকেই বুঝাচ্ছে। কি ঘটছে এখানে! প্রশাসন যাই বলুক না কেন, খবর তো আমাদের কাছে আছে। জনমত ক্রমশঃই বিগড়ে যাচ্ছে। আর যতই এ প্রবণতা বাড়ছে, শাসন ততই কঠোর করা হচ্ছে। কিন্তু ফল কি হচ্ছে তাতে? ‘ফ্র’-এর কম্যুনিস্ট শাসনের সাথে এ অঞ্চলের তুর্কিদের মনের ব্যবধান ক্রমশঃই বাড়ছে। বড় ক্ষতি করেছে আফগান যুদ্ধ। যা এ অঞ্চলের মানুষ কোনদিন কল্পনা করেনি, যা সম্ভব বলে কোনদিন ভাবেনি, আফগানদের সংগ্রাম আজ তাকেই সম্ভব প্রমাণ করে দিয়েছে। আফগানিস্তানের যুদ্ধ না বাঁধলে শত বছরেও এ চেতনা হয়তো মানুষের মনে জাগতো না।
৭টা বেজে ৫ মিনিট। দরজায় নক হলো। চেয়ারে সোজা হয়ে বসে বলল, এস। দরজায় নব ঘুরিয়ে ভেতরে ঢুকল আয়িশা আলিয়েভা। পরণে সেই পোষাক, যে পোষাকে সে হাসান তারিকের কাছে গিয়েছিল। সামনের একটা চেয়ার দেখিয়ে বলল, বস।
বসল আয়িশা আলিয়েভা।
ধীরে ধীরে আলিয়েভার ফাইল খুলল উমর জামিলভ। খুলতে খুলতে গম্ভীর কন্ঠে বলল, কি জন্য তোমাকে ডাকা হয়েছে জান?
জানি স্যার।
কি জান? আলিয়েভের দিকে না তাকিয়েই জিজ্ঞেস করল উমর জামিলভ।
আমার বিচারের জন্য।
এবার মুখ তুলল উমর জামিলভ। কি যেন সে পাঠ করতে চাইল আয়িশা আলিয়েভার মুখে। তারপর বলল, দন্ড কি তুমি স্বীকার করে নিচ্ছ?
আমার স্বীকার করা না করার কি মূল্য আছে স্যার?
আলিয়েভা তুমি অবুঝ নও। তুমি নিজের ওপর অবিচার করছ। কিছুটা ধমকের সুরেই কথাগুলো বলল উমর জামিলভ। তারপর একটু থেমে আবার বলল, মিশন তোমার ফেল করেছে, এটার ব্যাখ্যা হয়তো দেয়া যায়। কিন্তু তোমার এ চিঠির অর্থ কি আলিয়েভা? বলে চিঠিটি এগিয়ে দিল আলিয়েভার দিকে। চিঠির নজর পড়তেই চমকে উঠল আলিয়েভা। কিন্তু তা মুহুর্তের জন্য। পরে তার মুখটা আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল। চোখে-মুখে দৃঢ়তার একটা চিহ্ন ফুটে উঠল।
উমর জামিলভ আলিয়েভার দিকে তাকিয়েছিল। যেন পাঠ করছিল তার মুখকে। আবার কথা শুরু করল সে, হাসান তারিকের সাথে তোমার যে কথাগুলো হয়েছিল তা কি তোমার মনে পড়ে আলিয়েভা? দেখ তারও বিবরণ এখানে আছে। বলে ফাইল থেকে পিন আঁটা কয়েক শিট কাগজ দিল আলিয়েভার দিকে।
আলিয়েভা কাগজটিতে কি আছে না দেখেই বলল, আমি সবই স্বীকার করে নিচ্ছি স্যার।
স্বীকার তো তোমাকে করতেই হবে। তোমার কোন বক্তব্য আছে কিনা তাই বল।
জামিলভের স্বরটা এবার কঠোর শুনাল। মনে হলো, আলিয়েভার এ সরাসরি কথাগুলো সে পছন্দ করছে না। যেন সে চাইছে, আলিয়েভা কারণ দর্শাও অভিযোগের। আত্মপক্ষ সমর্থন করুক।
আলিয়েভা বলল, আমি দুঃখিত স্যার, আমার কোন বক্তব্য নেই। চিঠিতে আমি যা লিখেছি সজ্ঞানেই লিখেছি, টেপে আমার যে কথাগুলো আছে তা সচেতনভাবেই বলেছি।
একটু থামল আলিয়েভা। তারপর বলল, এখনও বলতে বললে এই কথাগুলো অমন করেই আমি বলব। আমি একটি কথাও মিথ্যা বলিনি।
শত্রুর সাথে যোগসাজস এবং শত্রুকে তথ্য সরবরাহের অভিযোগ তাহলে স্বীকার করে নিচ্ছ?
আমি আমার চিন্তা ও আমার কথা এমন একজনকে জানিয়েছি যাকে আমি শত্রু মনে করি না।
তুমি গোয়েন্দা বিভাগের একজন অফিসার তা তুমি জান?
জানি, কিন্তু আমার একটা ব্যক্তিসত্ত্বাও আছে।
আমি তোমার জন্য দুঃখিত আলিয়েভা, তুমি অবুঝের মত কথা বলছ, আর নিজের সর্বনাশ ডেকে আনছ।
দুঃখিত স্যার, আমি এ দুর্বিসহ জীবন আর সইতে পারছি না। আমাদের ঈমান, আমাদের পরিচয় সবই তো কেড়ে নিয়েছেন, চরিত্রের পবিত্রতাটুকু তাও আমি রাখতে পারবো না। স্যার, এ জীবন কি কোন জীবিতের জীবন?
আবেগ রুদ্ধ হয়ে এল আয়িশা আলিয়েভার কন্ঠ। তার দিকে তাকিয়ে ছিল জামিলভ। ধীরে ধীরে তার চোখ দুটি নীচে নেমে এল । নত হল মাথা। ভাবছে সে। আলিয়েভার এ কথাগুলোর কি দন্ড তার জানা আছে, কিন্তু তার ঐ জিজ্ঞাসার কোন জবাব তার কাছে নেই, যেমন জবাব জানা নেই তার দাদীর অনেক জিজ্ঞাসার।
ধীরে ধীরে জামিলভ বলল, আলিয়েভা বাস্তববাদী হও। বয়স তোমার কম। যদি তুমি অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা কর, তাহলে আমি চেষ্টা করব তোমার জন্য।
আলিয়েভা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। বলল, এ লাইনে এমন হৃদয় কারো আছে আমার জানা ছিল না। আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ স্যার। কিন্তু আমি কিসের জন্য অনুতপ্ত হবো, কি জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব? এক সময় আমি অন্ধ ছিলাম, চোখ ফিরে পেয়েছি। আমি আর অন্ধ হতে পারবো না স্যার।
সেই নরম সুরে আবার জামিলভ বলল, আরো ভেবে দেখ আলিয়েভা, তোমার ঐ চোখের চেয়ে জীবনটা বড় কিনা?
রুমালে চোখ মুছে আলিয়েভা বলল, স্যার, এ চোখ চোখ নয়, জীবনের মূলমন্ত্র। এর জন্য হাজার নয় লাখ লাখ মানুষ হাসিমুথে তাদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছে, ইতিহাস তাদের কাহিনীতে ভরপুর। আমার এক ক্ষুদ্র জীবন তো কিছুই নয় স্যার।
বিস্মিত জামিলভ তাকিয়ে আছে আলিয়েভার দিকে। এ বিস্ময় দৃষ্টি তার কতক্ষণ থাকতো কে জানে। কিন্তু হলো না। টেলিফোন বেজে উঠল। লাল টেলিফোন! ত্রস্ত হাতে তুলে নিল রিসিভার। ওপার থেকে ভেসে এল উজবেকিস্তান ‘ফ্র’-এর ফার্স্ট সেক্রেটারী কোনায়েভের গলা। বলল, আলিয়েভার ফাইল কখন পাঠাচ্ছ?
অল্পক্ষণ, স্যার।
ঠিক আছে।
ওপার থেকে রিসিভার রাখার শব্দ পাওয়ার পর নিজের রিসিভার রেখে দিল জামিলভ। চেহারা তার বিমর্ষ।
কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে চুপ করে বসে থাকল জামিলভ। তারপর ধীরে ধীরে মাথা তুলে বলল, তোমার সাথে আমার কথা শেষ আলিয়েভা।
আলিয়েভা উঠে দাঁড়াল। তার সাথে উঠে দাঁড়াল জামিলভও। উঠে গিয়ে নিজ হাতে সে দরজা খুলল। আলিয়েভার সাথে সেও বেরিয়ে এসে দরজার বাইরে দাঁড়াল। অস্ফুট প্রায় স্বরে বলল, দুনিয়াতে তোমার কেউ নেই একথা ভেব না আলিয়েভা। জান না তুমি, তোমার অনেক আছে। একটু থেমে জামিলভ বলল, তোমাকে আমার দেবার মত কিছু নেই, আমার শ্রদ্ধা গ্রহণ কর।
জামিলভের কথা শুনে ঘুরে দাঁড়াল আলিয়েভা। কিছু সে বলতে যাচ্ছিল। ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে নিষেধ করল জমিলভ। আলিয়েভা কিছু বলল না। তার চোখ দু’টি মাত্র একবার উজ্জ্বল হয়ে উঠল। চলে গেল আলিয়েভা। নিজের চেয়ারে ফিরে এল জামিলভ। আলিয়েভার ফাইল খুলল। নোট শিট গাঁথাই আছে। কলম তুলে নিল জামিলভ। হাত বড় দুর্বল। কলম কাঁপছে। চোখটা কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসছে তার। হঠাৎ মনে পড়ল ফার্স্ট সেক্রেটারী এ ফাইলের জন্য বসে আছেন। আর তার সাথেই বসে আছে এক সদস্যের ট্রাইবুন্যাল। তাড়াতাড়ি কলম চালাল জামিলভ। অপরাধের গদবাঁধা বিবরণী। তারপর দন্ডাদশের সুপারিশ। লেখা শেষ করল জামিলভ। হাত থেকে কলমটিই গড়িয়ে পড়ে গলে। আলিয়েভা, তার দাদী দু’জনেরই ছবি ভেসে উঠল তার চোখের সামনে। নিষ্পাপ দু’টি মুখ। পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখের ভিজা কোণ মুছে নিয়ে ইন্টারকমে ডেকে পাঠাল পি, এ, কে। ফাইল এখুনি পাঠাতে হবে।
৬
পামিরের একটি ছোট্ট গ্রাম। নাম আল্লাহ বকশ। পাহাড়ের ঢালে সুপ্রশস্ত করিডোর। এই করিডোর ঘিরেই গড়ে উঠেছে গ্রামটি। পাশ দিয়েই প্রবাহিত বেগবান ছোট পাহাড়ী নদী। নদীটি নেমে এসেছে সবুজ বনানী ঢাকা পাহাড়ের মাথায় দাঁড়ানো চির বরফ ঢাকা হিন্দুকুশের শৃংগ থেকে। এই আল্লাহ বকশ গ্রামটির সংকীর্ণ পাথুরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ওপর দিকে চাইলেই দেখা যাবে পাহাড়ের গায়ে ওয়ালনাট বৃক্ষের সারি।
গ্রামটি ছোট হলেও শতাধিক তাজিক মুসলিম পরিবারের বাস এখানে। প্রায় এক মাইল লম্বা গ্রামটি। বেশ পাতলা বসতি। প্রতিটি বাড়ি ঘিরেই রয়েছে বহু কষ্টে গড়া বাগান ও শস্য ক্ষেত। শুকনো সময়ে নদী থেকে সংগ্রহ করা বালু, মাটি দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে এ বাগান ও শস্য ক্ষেতগুলো। এ বাগান ও ক্ষেতগুলোতে গমসহ সালবেরী, এপ্রিকট ও পিস ফল প্রচুর পররিমানে জন্মে। তুলাও কিছু কিছু তারা উৎপাদনে করে। এ দিয়েই কাষ্টে-শিস্টে তাদের চলে যায় দিন। পরনির্ভরতা তাদের খুব কম।
গ্রামের পশ্চিম প্রান্ত থেকে একটা সংকীর্ণ গিরিপথ এগিয়ে গেছে উত্তর দিকে। পায়ে হেটেঁ কিংবা ইয়াকে চড়ে এ রাস্তায় যাতায়াত করা যায়। এ রাস্তায় মাইল পাঁচেক এগুলে ঐতিহাসিক পামির সড়কে পৌঁছা যায়। ঐতিহাসিক এ সড়কটি উজবেকিস্তানের ফারগানা থেকে প্রায় একশ মাইল উত্তর-পূর্বে রেল পথের শেষ প্রান্ত থেকে বেরিয়ে ভিয়েনশালা পর্বতামালার মধ্য দিয়ে মালার মত গোটা দুর্গম পামির অতিক্রম করে এসেছে। তারপর পশ্চিমের বকশ নদী অতিক্রম করে স্টালিনাবাদ হয়ে শিরদরিয়া পেরিয়ে উজবেকিস্তানের রাজধানী তাসখন্দ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছে। এই আল্লাহ বকশ গ্রামের সবচেয়ে নিকটবর্তী নগর হল স্টালিনাবাদ। পাঁচশ মাইল দূরে। মাঝখানে বকশ নদীর পানি-বিদ্যুৎ কেন্দ্র ঘিরে আরেকটি শহুরে জনপদ পাওয়া যায়। তারও দুরত্ব এখান থেকে দু’শ মাইলের মত।
গ্রামে সব মিলে পাঁচ’শ লোকের বাস। তরুণ-তরুণীদের একটা বড় অংশ স্টালিনাবাদ, বোখারা, সমরকন্দ ও তাসখন্দের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করে। আরেকটা অংশ পশুপালন ও বিভিন্ন শিল্প-প্রতিষ্ঠানে কাজ করে। এরা সবাই গ্রামের বাইরে থাকে। ছুটি ও অবকাশের সময়গুলো তারা গ্রামে এসে কাটায়। বাকীরা গ্রামে পিতামাতার সাথে সংসার দেখাশুনা করে।
গ্রামের একদম পূর্বপ্রান্তে আবদুল গফুরের বাড়ি। তার বয়স এখন ৭০ বছর। বেশ শক্ত-সামর্থ্য। এখনও যুবকদের মতই তিনি শক্ত পায়ে পাহাড় ডিঙাতে পারেন। গ্রামের তাজিক কবিলার প্রধান ছিলেন তিনি। তার মরহুম আব্বাও এ দায়িত্ব পালন করে গেছেন। এ কবিলার আদি নিবাস ছিল পিয়ান্দজ নদীর উপত্যকা অঞ্চলে। বোখারা, সমরকন্দ দখলকারী কম্যুনিস্টদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের মুক্তি সংগ্রামের সময় এলাকাটি বিধ্বস্ত হয়, জনপদ বিরাণ হয়ে যায়। সেই সময় তাঁর দাদা আবদুর রহমান তাঁর কবিলার অবশিষ্ট লোক সহ এই পাহাড়ে এসে আশ্রয় নেন। তাঁর পিতার মৃত্যুর পর তিনি এ কবিলার সর্দারী গ্রহণ করেন। কিন্তু তাজাকিস্তানের কম্যুনিস্ট সরকার ততদিনে এ গ্রামেও এসে পৌঁছে। গ্রামের সব যুবক তরুণরা পালিয়ে যায়। তাদের সাথে আবদুল গফুরের বড় ছেলেও পালিয়ে যায়। অনেকেই পরে ফিরে এসেছে, কিন্তু তাঁর ছেলে আর ফিরে আসেনি। গ্রামে কম্যুনিস্ট সরকার আসার পর অনেকের সাথে আবদুল গফুরকেও নিগ্রহের শিকার হতে হয়। তাঁর সর্দারী চলে যায়। কম্যুনিস্ট সরকারের তৈরী একটা রাজনৈতিক ইউনিয়ন গ্রামের সব কিছু দেখার অধিকার পায়। প্রথমে বাইরে থেকে কয়েকজনকে এনে এই রাজনৈতিক ইউনিয়নের দায়িত্ব দেয়া হয়। এখন সে ইউনিয়ন নেই। তার জায়গায় যৌথ খামারের অনুকরণে গঠিত একটা বহুমুখী সমবায় গ্রামের জীবন নিয়ন্ত্রন করে। সমবায় প্রধান আঞ্চলিক কাউন্সিলে এ গ্রামের রাজনৈতিক প্রতিনিধি ও দায়িত্ব পালন করে। হাত ঘুরে আবদুল গফুরের মেজ ছেলে আবদুল্লায়েভের হাতে আজ গ্রাম সমবায়ের দায়িত্ব এসেছে। আবদুল্লায়েভ ছাড়া আবদুল গফুরের আরও তিনটি সন্তান রয়েছে। তৃতীয় ছেলে ইকরামভ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগরে ছাত্র। চতুর্থ ও সর্ব কনিষ্ঠ ছেলে জিয়াউদ্দিন বোখারার মীর-ই-আরব মাদ্রাসার উচ্চ শ্রেণীতে পড়ে। আবদুল গফুরের একটি মাত্র মেয়ে, মেধাবী ছাত্রী। রাষ্ট্রীয় বিশেষ স্কলারশীপ নিয়ে মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে অধ্যয়ন করছে। নাম ফাতিমা ফারহান।
রাতের আল্লাহ বকশ গ্রাম গভীর ঘুমে অচেতন। নিরব গ্রাম, নিরব বনানী, ততোধিক নিরব আদিগন্ত পাহাড় শ্রেণী। কৃষ্ণা নবমীর চাঁদ উঠেছে পূর্ব দিগন্তে। বনানীতে, পাহাড়ে আলো আঁধারের খেলা। ছোট নদীটির বুকে পাহাড়ের কালো ছায়া কালো করে তুলেছে নদীর সফেদ বুককে।
রাতের তৃতীয় যাম প্রায় শেষ। আবদুল গফুরের বাড়ির উত্তর ভিটার দক্ষিণমুখী ঘরের দরজা খুলে গলে। বেরিয়ে এলেন বৃদ্ধ আবদুল গফুর। তিনি এবং তার স্ত্রী আলিয়া এই ঘরেই থাকেন। প্রাচীরে ঘেরা বিশাল ভেতর বাড়িতে আরও পাঁচটি ঘর রয়েছে। এখানে ছেলেরা থাকে। ভেতর বাড়ির পিছন দিকে প্রাচীরের বাইরে একটু দূরে ভেড়া ও ইয়াকের আস্তাবল। আর দক্ষিণ দিকে প্রাচীরের সাথে মেহমানখানা ও বৈঠকখানা। এর পরেই বাগান, তারপর নদী। বাড়ির অন্য তিন দিক ঘিরে বিস্তৃত ক্ষেত। প্রাচীরের গায়ে মেহমান খানায় যাবার একটা দরজা রয়েছে। এছাড়া রয়েছে বাড়ি থেকে বেরুবার প্রধান ফটক। উত্তর প্রাচীরে আস্তাবলে যাবারও রয়েছে আরেকটা দরজা।
আবদুল গফুরের পর তার স্ত্রী আলিয়াও বেরুলেন ঘর থেকে। দু’জনেই তাহাজ্জুদ পড়েন। তাঁরা অজু করে আবার ঘরে চলে গেলেন। তাহাজ্জুদ নামাযের এই অভ্যাস আবদুল গফুর তাঁর পিতার কাছ থেকে পেয়েছেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের মত এ নামাযও তাঁর কাজা হয় না। রাতের এই যে তৃতীয় যামে তিনি উঠেন আর ঘুমান না। তাহাজ্জুদ শেষে তিনি বাগানে, নদীর ধারে কিছুক্ষণ বেড়ান। তারপর মসজিদে ফজরের জামায়াতে শামিল হন। চার পাঁচটি বাড়ি পেরিয়ে একটু পশ্চিমে এগুলেই মসজিদ। আগে মসজিদ আবদুল গফুরের বাড়ির সীমার পরেই যেখানে ফাঁকা জায়গাটা সেখানে ছিল। কম্যুনিস্টরা এ গ্রামে ঢোকার পর এ সমজিদ ভেঙে ফেলে। কয়েক বছর পর গ্রামবাসীদের চাপে তদানিন্তন রাজনৈতিক ইউনিয়ন মসজিদ নির্মাণের অনুমতি দেয়, কিন্তু আগের জায়গায় তা নির্মানের অনুমতি মেলেনি।
প্রতিদিনের মতই তাহাজ্জুদ পড়ে ঘর থেকে বেরুলেন তিনি। কিন্তু নিত্যকার মত সোজা বাইরে না গিয়ে তৃতীয় ছেলে ইকরামভের ঘরের দরজায় দাঁড়ালেন। একটু দাঁড়িয়ে নক করলেন দরজায়। তারপর ডাকলেন ইকরামভ।
অল্পক্ষণ পর ঘর থেকে আওয়াজ এল, জ্বী আব্বা।
উঠ, ভোর হয়েছে নামায পড়।
দু’দিন হলো গ্রীষ্মের বন্ধে বাড়ি এসেছে ইকরামভ ও ফাতিমা ফারহানা। কম্যুনিস্ট যুগের চলমান ধারায় মানুষ ওরা। কিন্তু যত দিন ওরা বাড়িতে ছিল পারিবারিক ও সামাজিক ঐতিহ্য তারা পুরোপুরিই মেনে চলেছে। আরবী শিক্ষার কোন সুযোগ নেই বটে, কিন্তু বাড়িতে ও গ্রামের মক্তবে তারা দোয়া-দরুদ ও কুরআন শরীফ পড়া খুব ছোট বেলাতেই শিখেছে। মসজিদে তারা বেসরকারীভাবে এখনও মক্তব চালায়। প্রথম দিকে কম্যুনিস্ট সরকার এ মক্তব বন্ধ করে দিয়েছিল। সরকারী খাতায় মসজিদটির মত এখনও বন্ধই আছে। জনমতের চাপে স্থানীয় ও আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ গোপনে মক্তবের সম্মতি দিয়েছে।
ইকরামভ ও ফারহানা তাসখন্দ ও মস্কোতে গিয়ে চলমান ধারার সাথে মিশে গেছে বটে, কিন্তু অতীতকে ভুলে যায়নি। বিশেষ করে পিতার প্রতি শ্রদ্ধা ভালবাসা তাদের অপরিসীম। তাই বাড়ি এলে এবং এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে হোস্টেলের নিভৃত কক্ষে তাদেরকে অনেক সময় নামায পড়তে দেখা যায়।
দরজা খুলল ইকরামভ।
ইকরামভকে সালাম দিলেন আবদুল গফুর। লজ্জায় লাল হয়ে গেল ইকরামভ। বলল, মাফ করুন আববা, আমার ভুল হয়েছে।
দেখা হলেই সালাম দেয়া এ সমাজের এক অতি পরিচিত সামাজিকতা। কিন্তু তাসখন্দ, আর মস্কোর সমাজ একে নির্বাসন দিয়েছে। তাই এ ভুল হওয়া স্বাভাবিক। আবদুল গফুর সস্নেহে হেসে বললেন, আল হামদুলিল্লাহ, তুমি অজু কর আমি ফাতিমাকে ডাকি।
ফাতিমা ফারহানাকে ডেকে দিয়ে আবদুল গফুর বেরিয়ে এলেন বাগানে, তারপর গেলেন নদীর ধারে। নদীর তীর থেকে পাথর আর কাদায় গড়া সিঁড়ি নেমে গেছে পানিতে। ঘাটের দু’পাশটা বেড়া দিয়ে আড়াল করা যাতে মেয়েদের কাজ ও গোসল করতে কোন অসুবিধা না হয়।
ঘাটে এসে দাঁড়িয়ে ঘাটের দিকে তাকাতে গিয়ে ঘাটের পূর্ব পাশে বেড়ার দিকে নজর পড়তেই চমকে উঠলেন আবুদল গফুর। একটা বড় কাঠের বাক্স বেড়ায় আটকে পানিতে দুলছে। এগিয়ে গেলেন আবুদল গফুর। নেমে গেলেন পানির কিনারে। সাত-আট ফিট লম্বা একটা কাঠের বাক্স। ভাঙা, পরিত্যক্ত নয়- একদম নতুন। হাঁটু পরিমাণ পানিতে নেমে তিনি বাক্সটিকে টানলেন। টেনে কিনারে আনলেন। বাক্সের একটা মাথা মটিতে তুললেন। বেশ ভারি।
চলে এলেন আবদুল গফুর। ইকরামভ ও ফাতিমাকে বাক্সটির কথা বলে নামাযে চলে গেলেন তিনি।
নামায পড়ে এসে দেখলেন ওরা ধরাধরি করে টেনে বাক্সটি বাগানে নিয়ে এসেছে। আবদুল গফুর আসতেই ইকরামভ বলল, আব্বা বাক্সটা কম্যুনিজমের বিশ্ব রেড সংস্থা ‘ফ্র’-এর। দেখুন, পাঠানো হয়েছে বোম্বাই থেকে তাসখন্দে। পাঠিয়েছে ভারতস্থ বিশ্ব রেড সংস্থা ‘ফ্র’-এর দুতাবাস।
কিন্তু বাক্সটা এখানে নদীতে এল কি করে?
ফাতিমা ফারহানা বাক্সের গায়ের লেখাগুলো দেখছিল। তখন ফর্সাও হয়ে এসেছে অনেকখানি। একটা লেখা ভালো করে দেখে বলে উঠল, এখানে দেখুন আব্বা, তারিখটা গতকালের।
অর্থাৎ গতকাল বোম্বে থেকে পাঠিয়েছে? ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন আবদুল গফুর।
অবাক লাগছে আব্বা! চিন্তাম্বিত স্বরে বলল ইকরামভ।
চিন্তা করছিলেন আবদুল গফুরও। ফাতিমা ফারহানা তখনও বাক্সটি নেড়েচেড়ে দেখছিল। বলল, দেখুন আব্বা, বাক্সের এই মাথায় অনেকগুলো ফুটো।
ফুটো? চমকে উঠলেন আবদুল গফুর।
তারপর তিনি ঝুঁকে পড়ে বাক্সটি ভালো করে পরীক্ষা করলেন। তারপর বাক্সের দৈর্ঘ্যের দিকে আরেকবার নজর করলেন। চোখ বুঁজে মুহুর্তকাল চিন্তা করে বললেন, মনে হয় এর মধ্যে জীবন্ত কোন কিছু আছে, মানুষও হতে পারে।
আঁৎকে উঠল ইকরামভ ও ফাতিমা ফারজানা দুজনেই।
আবদুল গফুর গম্ভীর কন্ঠে বললেন, ইকরামভ, বাক্সের বাঁধনগুলো কেটে দাও। বাক্স খুলে ফেল।
ইকরামভ বলল, সরকারী বিমানের জিনিস খোলা কি ঠিক হবে?
আমরা কিছুই জানি না, এই খোলাটা সরকারী প্রয়োজনও হতে পারে।
বাক্স খুলছিল ইকরামভ। রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিল ফাতিমা ফারহান ও আবদুল গফুর। বাক্স খোলা হলো। খুলেই আঁৎকে উঠে দু’পা পিছিয়ে গেল ইকরামভ। বলল, আব্বা মানুষ!
দ্রুত বাক্সটির ওপর ঝুঁকে পড়লেন আবদুল গফুর। সূর্য ওঠার তখনও বেশ বাকী থাকলেও ফর্সা হয়ে গেছে। ভোরের সাদা আলোয় আবদুল গফুর দেখলেন, মুখের অংশটা ছাড়া সর্বাঙ্গ পুরো স্পঞ্জে আবৃত। কালো দাঁড়িতে আবৃত সুন্দর একটি মুখ। চোখটি তার বোজা। নাকে হাত রাখলেন আবদুল গফুর। চোখটি তার উজ্জ্বল হয়ে উঠল, না লাশ নয়। জীবিত মানুষ, জীবিত আছে।
তিনি মুখ তুলে ইকরামভ ও ফাতিমার দিকে চেয়ে বললেন, মানুষটি এখনো বেঁচে আছে। বলে তাড়াতাড়ি স্পঞ্জ তুলে টেনে খুলে ফেললেন। তারপর বললেন একরামভ, এস ধর। একে মেহমান খানায় নিয়ে চল। আর ফাতিমা ফারহানার দিকে চেয়ে বলল, মা তুমি যাও, মেহমান খানার এ দিকের দরজাটা খুলে দাও।
মেহমান খানায় শুইয়ে দিলেন অজ্ঞান যুবকটিকে। ত্রিশ বছরের সুন্দর ও সুঠাম দেহী বলিষ্ঠ যুবক। কপাল ও মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা। জলপাই রংয়ের ইউনিফর্ম গায়ে। কোন দেশের কিংবা কোন জাতির পোষাক চিনতে পারলেন না আবদুল গফুর। কিন্তু চুল, রং ও দেহের গড়ন দেখে তার মনে হলো, এই দেশেরই ছেলে সে। একরাশ বিষ্ময় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইকরামভ ও ফারহানার দিকে চেয়ে বললেন, তুর্কিস্তানেরই কোন কবিলার ছেলে আমার মনে হচ্ছে।
হঠাৎ আবদুল গফুরের নজরে পড়ল জামার কলার ব্যান্ডে ক্ষুদ্র একটা মনোগ্রামের মত। ঝুঁকে পড়ে দেখলেন, নতুন এক চাঁদের বুক ভরে জড়ানো অক্ষরে কি যেন লেখা। অক্ষরগুলো মনে হচ্ছে আরবী। চোখ দু’টি তার উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ইকরামভকে বললেন, দেখতো কি লেখা এখানে?
ইকরামভ দেখে বল, না আববা, পড়া যায় না। এটা মনে হচ্ছে কোন কিছুর প্রতীক চিহ্ন-মনোগ্রাম। লেখাগুলো আরবি বলে মনে হয়।
ভাবছিলেন আবুদল গফুর। বললেন, একরামভ তুমি বাক্স, স্পঞ্জ সব কিছু বাড়ির ভেতরে নিয়ে গোডাউনে রাখ। কেউ দেখুক আমি চাই না। সরকারী লোকদের কি খবর দেয়া দরকার নয়?
সময় যায়নি ইকরামভ। লোকটার জ্ঞান ফিরে আসুক। সবই জানা যাবে। তখন প্রয়োজনীয় সব কিছুই করা যাবে।
আর কোন কথা না বলে ইকরামভ চলে গেল। আবদুল গফুর মেয়ে ফাতিমার দিকে চেয়ে একটা গাছের নাম বলে দিয়ে বললেন, সাত-আটটা পাতার রস করে নিয়ে এস। এর জ্ঞান ফিরাতে হবে।
