-মুখ এখনও শুকনা কেন? কোথেকে আসছো রুনার মা?
-আপনার অসুখের কথা বড় সাহেবকে জানানো হয়নি, বড় সাহেব রাগ করেছেন? শিরীর চোখ দু’টি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, আমার অসুখের কথা কেমন করে উনি জানলেন?
-আমি বলেছি।
-তুমিই তো বলেছে, তাহলে রাগ করলেন কেন উনি?
-আমি তো বলিনি, উনিই জিজ্ঞেস করেছিলেন।
-হঠাৎ কেমন করে জিজ্ঞেস করলেন উনি?
-না, উনি জিজ্ঞেস করছিলেন-রুনার মা, ফুলদানিতে শুকনো ফুল কেন?
-তুমি কি বললে?
-আমি বললাম, আপামনির অসুখ।
-তারপর?
-আমাকে বকাবকি করলেন। খলিলকে ব্যারাকে পাঠালেন ডাক্তার আনতে।
শিরী আর কিছু বললো না। চোখ বুজলো সে। তার মনে আনন্দ বেদনার ঢেউ। ওর কাছ থেকে আর কি চাই। একটু স্মরণ করেছেন, করুণা করেছেন এই তো যথেষ্ট। উনি কাছে আসবেন আমাকে দেখতে অমন দুঃসাহসিক আকাংখা কি আমার সাজে।
খলিল সংবাদ দিল ডাক্তার এসেছে। রুনার মা গিয়ে ডাক্তার নিয়ে এলো।
সব শুনে ঔষধ দিয়ে চলে গেল ডাক্তার।
পাশেই বসে রয়েছে রুনার রুনার মা। শিরী এপাশ ওপাশ ফিরছে, স্বস্তি পাচ্ছে না কিছুতেই। রুনার মা বলল, কষ্ট লাগছে আপামনি?
-না রুনার মা। একটু থেমে বলল, তুমি বসে বসে কষ্ট করছো কেন? শুয়ে আরাম করগে যাও।
-না। বড় সাহেব তোমার কাছে কাছেই থাকতে বলেছেন আমাকে। শিরী কিছু বলল না। অনেকক্ষণ পরে এক সময় ধীরে ধীরে বলল, উনি ঘরে আছেন রুনার মা?
-কে?
-তোমার বড় সাহেব?
-না, বাইরে গেছেন।
-আমি দাঁড়াতে পারব হাঁটতে পারব না। তুমি ধরে আমাকে একটু ওঁর ঘরে নিয়ে যাবে?
-কেন?
-আগে বল, পারবে কি না?
-তোমার হুকুম কোনটা না মেনেছি?
-তাহলে যাও বাগান থেকে ফুলদানির জন্য কয়েকটি গোলাপ নিয়ে এসো।
শিরী রুনার মা’র কাঁধে হেলান দিয়ে আহমদ মুসার কক্ষে গেল। দুর্বল হাতে ধীরে ধীরে ফুল সাজিয়ে রাখল। বিছানায় চাদর পাড়ার ঢং দেখে হাসল শিরী। বলল, এতদিনেও কাজ শিখলে না রুনার মা!
শিরী চাদর ঠিক করতে যাবে, এমন সময় আহমদ মুসার টেবিলের অয়্যারলেস যন্ত্রে লাল সংকেত জ্বলে উঠল, সাথে সাথে একটানা সংকেত শব্দ।
শিরী একটু দ্বিধা করল। একটু ভাবল। হয়তো কোন জরুরী মেসেজ। শিরী গিয়ে অয়্যারলেস রিসিভার তুলে নিল।
ওপার থেকে কন্ঠ ভেসে এলো, আবদুল্লাহ জাবের স্পিকিং।
-আমি শিরী বলছি। মুর হামসারের বোন।
-আমি মুসা ভাইকে চাই।
-উনি বাইরে গেছেন।
-আপনি কি মেসেজ রিসিভ করবেন? একটু দ্বিধা করলো শিরী। তারপর বলল, নিশ্চয় করব।
এই সময় আহমদ মুসা এসে দরজায় দাঁড়াল। শিরীকে অয়্যারলেসে দেখে আহমদ মুসা প্রথমে অবাক হলো। কিন্তু টেবিলের ফুলদানির দিকে চেয়ে ব্যাপারটা কিঞ্চিৎ আঁচ করতে পারলো। অলক্ষ্যে এক হাসির রেখা খেলা গেল যেন তাঁর ঠোঁটে।
ছোট্ট একটি কাশি দিয়ে ধীর পদে ঘরে ঢুকল আহমদ মুসা। চকিতে মুখ তুলল শিরী। আহমদ মুসাকে দেখেই সে উঠে দাঁড়াল। হাত থেকে পড়ে গেল অয়্যারলেস রিসিভার। অবশ হয়ে গেল তার গোটা শরীর। পড়ে যাচ্ছিল সে। আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি ধরে ফেলল তাকে। নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিল তার বিছানায়।
অজ্ঞান হয়ে গেছে শিরী। মুখে তার পানির ছিটা দিল আহমদ মুসা। মিনিট তিনেকের মধ্যেই তার জ্ঞান ফিরে এলো।
এমন অবস্থার জন্য রুনার মা প্রস্তুত ছিল না। সে মেঝের মাঝখানে দাড়িয়ে কাঁপছিল। আহমদ মুসা তাকে বলল, শিরীকে একটু বাতাস কর রুনার মা, আমি ওদিকে একটু দেখি। তারপর উঠতে উঠতে শিরীকে বলল, আর একটু রেষ্ট নাও, তারপর উঠবে।
আহমদ মুসা গিয়ে রিসিভার তুলে নিল। ওদিকে আবদুল্লাহ জাবেরের উৎকন্ঠা সপ্তমে উঠেছিল। আহমদ মুসার কন্ঠস্বর পেয়েই সে জিজ্ঞেস করল, কিছু ঘটেছে জনাব?
-না কিছু ঘটেনি। অসুস্থ শিরী হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে গেছে। ভাল আছে এখন। বল, কি খবর?
-আজ দুপুরে কাগায়ানে সোভিয়েট এয়ার ফোর্সের প্রতীক চিহ্নিত দু’টি মাউন্টেন ট্রান্সপোর্ট জেট ল্যান্ড করছে। কিন্তু আরোহীদের প্রত্যেকেই ইহুদী প্যারাট্রুপারস। চারজন সোভিয়েট অফিসারকে ওদের সাথে দেখা গেছে।
-প্যারাট্রুপারসদের সংখ্যা কত?
-দুই জেটে বিশজন। আরও দু’টি নাকি আছে।
-তাহলে আরও বিশজন। তুমি কি আচঁ করছ?
-আমি বুঝতে পারছি না, এই সব অত্যাধুনিক মাউন্টে জেট এখানে কেন?
হাসলো আহমদ মুসা। বলল, কারণ ঐ জেটগুলোর পক্ষেই শুধু আপো-পর্বতের অসমতল উপত্যকায় ল্যন্ড করা সম্ভব।
-বুঝেছি জনাব, অসম্ভব দুঃসাহস।
-কাজের জন্য অসম্ভব দুঃসাহসই প্রয়োজন।
একটু থেমে আহমদ মুসা আবার বলল, সোভিয়েট ইউনিয়ন ও ইরগুন জাই লিউমির এটা এক যৌথ ব্লিৎস-ক্রিগ-পরিকল্পনা। কিন্তু এ পরিকল্পনাকে আপো-পর্বত পর্যন্ত গড়াতে দেয়া যাবে না। আমি আসছি।
-আজই আসছেন?
-খোদা করেন ভোর হবার আগেই আমি কাগায়ানে পৌছে যাব।
আহমদ মুসা লাইন কেটে দিল। ওদিকে শিরী আহমদ মুসার বিছানায় শুয়ে লজ্জায় মরে যাচ্ছিল। গোটা দেহে অপরিচিত এক অদৃশ্য মধুর ছোঁয়াছ যেন অনুভব করছে সে। শিরীর মনে পড়ল, অয়্যারলেস টেবিল থেকে সে পড়ে যাচ্ছিল, কে যেন এসে তাকে ধরল, তারপর আর কিছুই মনে পড়ে না। ওখান থেকে তাঁকে বিছানায় আনল কে? রুনার মা? অসম্ভব তার পক্ষে। তাহলে উনি? কথাটা মনে হতেই গোটা দেহ তার থর থর করে কেঁপে উঠল। চোখ খুলে চাইবার সাধ্যও যেন নেই তার। আহমদ মুসার সবগুলো কথা সে শুনতে পাচ্ছিল, কিন্তু চোখ খুলে একবারও ওর দিকে চাইতে পারছিল না।
আহমদ মুসা অয়্যারলেস টেবিল থেকে উঠে দাড়িয়ে রুনার মাকে লক্ষ্য করে বলল, রুনার মা, শিরীর দিকে লক্ষ্য রেখ। যখন যেটা হয়, হসপিটাল থেকে ওষুধ এনে দেবে। আমি বলে যাব সবাইকে। আর মুর হামসার আজ কিংবা কালের মধ্যেই এসে পড়বে।
আহমদ মুসা বাথরুমে প্রবেশ করল। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে দেখল শিরীও নেই, রুনার মাও নেই। ঠোঁটে তার একটুকরো হাসি ফুটে উঠলো। কিন্তু মন তার কেঁপে উঠলে ভীষণ ভাবে। সজ্ঞানে কিংবা অজ্ঞানে কোন প্রশ্রয় কি সে দিয়েছে শিরীকে? না কখনও না। শিরীর সাথে তার দেখা এবং যা যা ঘটেছে সবই ঘটনা প্রবাহের স্বাভাবিক ফলশ্রুতি। এমন কতই তো ঘটতে পারে-ঘটে থাকে। তবু আহমদ মুসা মেনে নিল, সাবধান হতে হবে। সোলো রাজকুমারীর দুঃখের বোঝা যেন সে আর না বাড়ায়।
আহমদ মুসা পোশাক পরে তার সেই পরিচিত ব্যগটি তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। উঠার সময় ফুলদানি থেকে একটি গোলাপ তুলে নিল, কিন্তু পরক্ষনেই কিছুটা কম্পিত হাতে সে গোলাপটি রেখে দিল ফুলদানিতে। কিন্তু রেখে দিয়েও স্বস্তি পেল না সে। মন যেন অতি স্পষ্ট কন্ঠে বলল, ফুলটি রেখে দিয়েই কি তুমি তোমার দুর্বলতাকে মুছে ফেলতে চাইছ? আবার কেঁপে উঠার পালা আহমদ মুসার। বিবেকের আলো যেখানে পৌছে না মনের এমন অবচেতন জগতে সে কি কোন অন্যায় করে বসে আছে তাহলে?
পা দু’টি তার থেমে গেল। উপরের দিকে চেয়ে বলল, ‘প্রভূ আমার মনকে তো আমি তোমার আনুগত্য থেকে পৃথক করে রাখিনি?
তারপর সে আবার পা’ দুটি চালিয়ে দিল সামনে।
৮
কাগায়ান শহর। কাগায়ান উপসাগর থেকে ৫০ মাইল দক্ষিণ পূর্বে অবস্থিত উত্তর মিন্দানাওয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর কাগায়ান।
ফিলিপাইন পরিষদের প্রাক্তন সিনেটর আববাস এ্যালেনটো কাগায়ান শহরের মানচিত্র বুঝিয়ে দিচ্ছিল আহমদ মুসাকে।
মুল কাগায়ান শহরের লোক সংখ্যা ৮ থেকে ১০ হাজারের মত। শহরতলী সমেত এর লোক সংখ্যা এখন প্রায় বিশ হাজার। কাগায়ান থেকে দক্ষিণ দিকে মাইলের পর মাইল চলে গেছে নয়নাভিরাম ধানের ক্ষেত।
কাগায়ান ছিল সুখ ও সমৃদ্ধির নগর। বিশ বছর আগেও এখানে ছিল শতকরা নববই জন মুসলমান। আমেরকিান ও পর্তুগিজ মিশনারীদের প্রলোভন ও নিপীড়নের পরও এখানে খৃস্টানদের সংখ্যা শতকরা ৫ ভাগের বেশী হয়নি। এখানে অভাব বস্তুটা ছিল মানুষের অজানা, তাই মিশনারীদের কৌশল এখানে বড় বেশী কাজে আসেনি।
কিন্তু কাগায়ানবাসীদের এই প্রতিরোধ ক্ষমতা তাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দেখা দিল। মিশনারীদের সব কলাকৌশল ব্যর্থ হলে ঘরবাড়ী ও সহায়-সম্পত্তি থেকে তাদের উৎখাত করা হলো শক্তির জোরে। শুধু কাগায়ান নয়, দিভাও, জাম্বুয়াঙ্গো, কোটাবাটো, প্রভৃতি শহরে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো। এই উৎখাত অভিযানে ৩০০০ হাজার হতভাগ্য মুর মুসলমান নিহত হলো এবং ১০ হাজার হলো আহত। আর ৫০ হাজার মুসলমান তাদের বাড়ী ঘর, সহায়-সম্পত্তি সব কিছু হারিয়ে পথে গিয়ে দাড়াঁল। তাদের জায়গায় এনে বসানো হলো উত্তর ফিলিপাইন থেকে শ্বেতাংগ ও নেটিভ খৃস্টানদের।
-কিন্তু এসব সংবাদ তো প্রকাশ পায়নি?
-প্রকাশ পাবে কি করে, সংবাদ সরবরাহ সংস্থাগুলোর কাছে এ কোন সংবাদই নয়। মিন্দানাওবাসীদের বিদ্রোহের খবরই শুধু প্রকাশ পায়, তাদের উপর জুলুম-নির্যাতনের যে স্টিমরোলার চলছে তা প্রকাশ পায় না।
আহমদ মুসা সম্মতিসূচক মাথা নাড়াল শুধু। আববাস এলেনটো আবার বলতে শুরু করল কাগায়ানের শহরতলীতে মুসলমানদের কিছু ছিটেফোটা বসতি আজও রয়েছে।
কাগায়ান শহরের মূল আবাসিক এলাকা শহরের দক্ষিণাংশে। উত্তরাংশে কয়েকটি শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে। এই উত্তরাংশেই সম্প্রতি একটি বিমান ক্ষেত্র নির্মিত হয়েছে। বিমান ক্ষেত্রের পশ্চিম, উত্তর ও পূর্বাংশে অসমতল বনভূমি। বিমান ক্ষেত্রটি সূদৃঢ় কাটাতার দিয়ে ঘেরা। কাটাতারের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহ চলছে সর্বক্ষন। এই বিমান ক্ষেত্রের দক্ষিণাংশে টারমিনাল ভবনের সামনে রানওয়ের উপর দাঁড়িয়ে আছে চারটি মাউন্টেন-জেট।
থামল আববাস এ্যালেনটো। আহমদ মুসা শহরের রাস্তা ঘাটের অবস্থান নিয়ে তন্ময় হয়ে পড়ল। শহরের প্রধান রাস্তাটি শহরের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে উত্তরাংশের টারমিনাল ভবন পর্যন্ত বিসত্মৃত। এই রাস্তার ধারেই সকল সরকারী অফিস ও গুরুত্বপূর্ণ বিল্ডিং। রাস্তাটির পূর্বনাম ছিল ‘আলনিকাদ’ রোড। কাগায়ানে যারা প্রথমে বসতি স্থাপন করেছিল, তারা এসেছিল জুলু দ্বীপের ‘বুদ আজাদ’ অঞ্চল থেকে। জুলু দ্বীপে যিনি ইসলামের আলো ছড়িয়ে ছিলেন, তিনি ‘মুহাম্মদ আমানুলল্লাহ আল-নিফাদ’ নামে অভিহিত। তাঁর নাম অনুসারেই এ রাস্তার নামকরণ করা হয়েছিল। কিন্তু রাস্তাটির নাম এখন ‘মার্কোস এভিনিউ’। কাগায়ানের মুসলিম উচ্ছেদের পরিকল্পনাকারী সেন্টজন মার্কোসের নাম অনুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে।
আহমদ মুসা আববাস এ্যালেনটোকে জিজ্ঞেস করলেন, কাগায়ানের পাওয়ার ষ্টেশনটি কোথায়?
আববাস এ্যালেনটো দক্ষিণ কাগায়ানের একটি স্থান দেখিয়ে দিল। বলল সে, কার্কোস এভেনিউ থেকে পার্ক ষ্ট্রিট সোজা পশ্চিম দিকে চলে গেছে। এ রাস্তা দিয়ে সিকি মাইল যাবার পর আর একটি রাস্তা পাওয়া যাবে-হোয়াইট স্ট্রিট। এ স্ট্রিটের শেষ প্রান্তে পাওয়ার স্টেশন।
-পাওয়ার ষ্টেশন থেকে মার্কোস এভেনিউতে পৌছার সোজা পথ নেই?
-আছে। আবাসিক এলাকার মধ্য দিয়ে। বড় পেচানো রাস্তা। পাওয়ার স্টেশনের পিছন থেকে বেরিয়ে এ রাস্তা আবাসিক এলাকার মধ্যদিয়ে পূর্ব দিকে এগিয়ে গেছে।
আহমদ মুসা কিছু বলতে যাচ্ছিল। বাইরে থেকে দরজায় কয়েকটি টোকা পড়ল এ সময়। আহমদ মুসা ও আববাস এ্যালেনটো উৎকর্ণ হয়ে উঠল। আবার পড়ল টোকা সেই নির্দিষ্ট নিয়মে। পরিচিত সংকেত।
আববাস এ্যলেনটো গিয়ে দরজা খুলে দিল। প্রবেশ করল শ্রমিক গোছের একজন লোক। পরণে মালয়ী ধরনের লুংগী। গায়ে শার্ট ঝুলের কামিজ। ছোট করে ছাঁটা চুল। চোখ দু’টির চাউনিতে কেমন বোকা বোকা ভাব।
আববাস এ্যলেনটো পরিচয় করিয়ে দিল- নাম আবিদ। কিন্তু কাগায়ানে জন নামে পরিচিত। সবাই জানে সে একজন নিষ্ঠাবান নেটিভ খৃস্টান। পিসিডার একজন প্রথম শ্রেণীর কর্মী আবিদ। টার্মিনাল ভবনের বহিরাঙ্গনের একটি ভ্যারাইটি স্টোরের মালিক সে। মাউন্টেন জেট সম্পর্কিত তথ্য সেই সরবরাহ করেছে।
আহমদ মুসাকে দেখিয়ে সে আবিদকে বলল, ইনি আহমদ মুসা- তোমাদের নেতা।
বিস্ময় ও আনন্দে চিক চিক করে উঠল আবিদের চোখ। সসম্ভ্রম ছালাম জানাল। আহমদ মুসা হাত বাড়িয়ে দিল। আবিদও বাড়িয়ে দিল হাত। হ্যান্ডসেক করল দু’জনে।
আববাস এ্যালেনটো বলল, এবার খবর বলো আবিদ।
আবিদ বলল, আজ সকালে মাইকেল এ্যঞ্জেলো এসেছেন দিভাও থেকে। তার সাথে কে আর একজন এসেছেন। দীর্ঘাঙ্গ, লাল চেহারা চুলহীন মাথা, নাম- ডেভিড এমরান।
-কি বললে নাম? ব্যগ্র কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো আহমদ মুসা।
-ডেভিড এমরান?
আহমদ মুসা বিস্মিত হলো। ধাড়ি ইহুদি ডেভিড এমরান কাগায়ানে এসেছে। ‘ইরগুন জাই লিউমি’র অপারেশন বিভাগের প্রধান ডেভিড এমরান তাহলে আহমদ মুসাকে হাতে পাবার জন্য পাগল হয়ে উঠেছে। হাসল আহমদ মুসা। বলল সে, তারপর আবিদ?
-টার্মিনাল ভবনের পাশে ওরা একটা হাসপাতাল সাজিয়েছে। ডাক্তার আছে, নার্স আছে। বেলা একটার দিকে ৪টি মাউন্টেন জেটই পরপর সারিবদ্ধভাবে রানওয়েতে গিয়ে দাঁড়াল। মাথা থেকে পা পর্যন্ত কিম্ভুত-কিমাকার পোশাকে আবৃত লোকগুলো গিয়ে বিমানে উঠল।
আহমদ মুসা দ্রুত জিজ্ঞেস করল, মুখও আবৃত ছিল ওদের?
-জি, হাঁ। বলল আবিদ।
আবিদ আবার বলতে শুরু করল বেলা ১টার সময় জেটগুলোর টেক-অফের কথা ছিল। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে বিমানগুলো আকাশে উড়ল না। আরোহীরা সবাই নেমে এলো বিমান থেকে। আমি জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, কি যেন খবর এসেছে, তাই যাত্রা বন্ধ।
ভ্রু কুঁচকে গেল আহমদ মুসার। কিন্তু কিছু বলল না।
আবিদ আবার শুরু করল, যাত্রা বন্ধ হয়ে যাবার পর সকলের মধ্যে কেমন যেন ত্রস্ত ভাব লক্ষ্য করা গেছে। পুলিশ কর্তাদের নিয়ে দু’বার মিটিং হয়েছে বড় কর্তাদের।
আহমদ মুসা গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল। সে যেন আনমনা হয়ে পড়েছে। আবিদ, মাইকেল এ্যাঞ্জেলা, ডেভিড এমরান, আর সেই কমান্ডোরা থাকছে কোথায়?
-টারমিনাল রেস্ট হাউজে।
-রেস্ট হাউজ অর্থাৎ বিমান ক্ষেত্র থেকে শহরে আসবার কয়টি পথ আছে?
-একটি মার্কোস এভেনিউ। বিমান ক্ষেত্রটি শহর থেকে একটি খাল দ্বারা বিচ্ছিন্ন। খালের উপর মার্কোস এভেনিঊ-এর ব্রিজ একমাত্র সংযোগ পথ।
-ব্রিজে প্রহরী থাকে?
-না, কিন্তু আজ পুলিশ মোতায়েন দেখেছি ব্রিজে।
আহমদ মুসা ঠোঁট কামড়ে ধরল দাঁত দিয়ে। মুহূর্তখানেক চিন্তা করল সে। বলল, তারপর তুমি থাক কোথায়?
-স্টোরেই থাকি।
-বেশ তোমাকে টারমিনালের রেস্ট হাউজে ওদের দিকে নজর রাখতে হবে। আমি যথাসময়ে পৌছব। মনে রেখ, তোমার ঘরে আলো জ্বলে থাকার অর্থ তুমি নেই, কিছু ঘটেছে। আর আলো নিভানো থাকলে তার অর্থ হবে সবকিছু ঠিক আছে। আচ্ছা তুমি যাও।
আবিদ সালাম জানিয়ে চলে গেল। আহমদ মুসা গিয়ে ঘর বন্ধ করে দিল। তারপর তার ব্যাগ খুলে একটি ক্ষুদ্র বাক্স বের করলো। বাকো্রর পাশে একটি বোতামে চাপ দিতেই উপরের ঢাকনি সরে গেল। ক্ষুদ্র অয়্যারলেস যন্ত্র।
শর্ট ওয়েভ কাটা ঘুরিয়ে যোগাযোগ করলো আপো পর্বতের হেড কোয়ার্টারে।
ওপার থেকে মুর হামসারের গলা পেয়ে খুশী হলো আহমদ মুসা। বলল, মুর হামসার, তুমি কখন ফিরলে?
-ঘন্টা দু’য়েক আগে ফিরেছি।
-শিরী কেমন?
-জ্বরের কোন কমতি নেই।
-দেখ, ওর প্রতি নজর রেখ।
মুহূর্তখানেক থামল মুসা। তারপর বলল, রুনার মা কোথায়?
-কেন? এখন শিরীর কাছে।
-আমি ফেরার পূর্বে দরজার বাইরে বেরুতে দিবে না তাকে। বাইরের সকলের সাথে সব রকমের দেখা সাক্ষাত বন্ধ। দরকার হলে তাকে ঘরে বন্ধ করে রাখবে। আর এখনি ওর কাছ থেকে জেনে নাও, আমি কাগায়ানে এসেছি, এ কথা সে কাকে বলেছে। এ কথা তার কাছ থেকে বের করে নিতেই হবে।
-কিছু ঘটেছে ভাইয়া? উৎকন্ঠিত স্বর মুর হামসারের।
-আমি আপো পর্বতে নেই, আমি কাগায়ানে চলে এসেছি, এ খবর কাগায়েনে পৌছেছে বলে স্থির নিশ্চিত আমি? কিন্তু পৌছল কি করে? নিশ্চয় আপো পর্বত থেকে এ খবর এখানে জানানো হয়েছে।
-সাংঘাতিক ব্যাপার, ঘরে শত্রু……….
মুর হামসারের কথার মাঝখানেই বলে উঠল আহমদ মুসা, রুনার মা’র কাছ থেকে জেনে নিয়ে যে কোন মূল্যে আটক করবে সেই ঘরের শত্রুকে।
-আপনার নির্দেশ পালিত হবে জনাব। আর…..
কথা শেষ করলো না মুর হামসার।
-কিছু বলবে? জিজ্ঞেস করলো আহমদ মুসা।
-শিরী কিছুই খাচ্ছে না, ওষুধও নাকি বমন করে ফেলেছে আজ।
আহমদ মুসা একটু চিন্তা করলো। তারপর বলল, পুরুষ ডাক্তার দিয়ে পরীক্ষা তেমন ভালো হচ্ছে না, একটা কাজ করতে পার?
-কি কাজ?
-স্মার্থা ডাক্তার। স্পাই ডাক্তার হিসেবে ক্লু-ক্লাক্স-ক্লানে সে যোগ দিতে আসছিল মিন্দানাওয়ে। বন্দীখানা থেকে তাকে এনে শিরীকে দেখাতে পার।
-নিরাপদ হবে তাকে আনা?
-তোমাকে অতি সাবধানে এ কাজ করতে হবে এবং এ ব্যাপারে তোমার কারো উপর নির্ভর করা চলবে না। তুমি তাকে আনবে, তুমিই রেখে আসবে তাকে বন্দীখানায়।
-রাজী হবে সে চিকিৎসা করতে?
-তাকে বলো আমি অনুরোধ করেছি। আমার বিশ্বাস, এ অনুরোধ সে রাখবে।
কথা শেষ করে আহমদ মুসা লাইন কেটে দিল। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল আবদুল্লাহ জাবের ও শরীফ আহমদ সুরী।
কথা শেষ হতেই আববাস এ্যালেনটো গিয়ে দরজা খুলে দিল ঘরের। প্রবেশ করলো তারা দু’জনে।
-কি খবর জাবের? ব্যগ্র কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো আহমদ মুসা।
ভিতরে একদম রণ প্রস্তুতি।
-কেমন?
-বিমান ক্ষেত্রের চারিদিকে মেশিনগানের ব্যারিকেড। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বসানো হচ্ছে মেশিনগান। সাদা পোশাকে শহরের বিভিন্ন স্থানে কমান্ডো ইউনিট মোতায়েন করা হয়েছে। সশস্ত্র পুলিশ তো রয়েছেই।
নীরবে কথাগুলো শুনছিল আহম মুসা। কথা শেষ হলো, কিন্তু কোন মন্তব্য করলো না সে। দু’টি হাত তার পিছনে মুষ্টিবদ্ধ। চোখে মুখে ভাবনার এক ভারি পর্দা।
জাবের, শরীফ সুরী, আববাস এ্যালেনটো নতমুখে দন্ডায়মান।
আহমদ মুসা এক সময় টেবিলের কাগায়ান শহরের মানচিত্রের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। চোখ দু’টি তার মানচিত্রে নিবদ্ধ-পলক নেই তাতে। নিঃশব্দে বয়ে চলল কালের স্রোত।
স্বপ্নোত্থিতের মত মুখ তুলল আহমদ মুসা মানচিত্র থেকে। জাবেরকে লক্ষ্য করে বলল সে, মৃত্যু মুখে ঝাপিয়ে পড়বে, এমন কতজন লোক আছে তোমার?
-আপনার নির্দেশ পেলে সকলেই হাসতে হাসতে মৃত্যুর মুখে ঝাপিয়ে পড়বে।
-সবাই নয়, আমি ৫০ জন চাই।
-প্রস্তুত জনাব।
তারপর আহমদ মুসা দীর্ঘক্ষণ ধরে আবদুল্লাহ জাবের, শরীফ সুরী ও আববাস এ্যালেনটোর সাথে পরামর্শ করলো তারপর বিদায় দিল সবাইকে।
ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখল, সবে সন্ধ্যে ৮টা। ৯টায় বেরুবে সে। এখনও এক ঘন্টা সময় আছে।
পরম প্রশান্তিতে বিছানায় গা এলিয়ে দিল সে।
