আহমদ মুসা আগে, মুর হামসার পিছনে আবার কখনো তারা পাশাপাশি সামনে এগিয়ে চলছিল। সামনেই আপোয়ান উপত্যকা।একটি গিরীখাত পেরিয়ে ওপারে গেলেই তারা গিয়ে পৌছবে আপোয়ান উপত্যকায়।
পড়ন্ত বেলা। পশ্চিমের গিরী শৃঙ্গটির আড়ালে ঢাকা পড়েছে সূর্য। উপরে মেঘের কোলে রোদ চিকচিক করছে, কিন্তু নীচের ধরনী ঢাকা পড়েছে দৈত্যকার এক ছায়ায়।
সামনেই গিরীখাত। গিরীখাতের উপর কাঠের তৈরী একটি সেতু, সেতুটি লতা-পাতার ক্যামোফ্লেজে ঢাকা।
বামপাশে ঘুরে থুথু ফেলতে গিয়েছিল আহমদ মুসা। হঠাৎ একটি সিগারেটের কার্টুনে নজর পড়তেই সে ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরল এবং নেমে পড়ল ঘোড়া থেকে?
রাস্তার ধার থেকে সিগারেটের বাক্সখানা সে ধীরে ধীরে তুলে নিল। ‘রেডক্লাগ’ সিগারেটের বাক্স। সোভিয়েট ইউনিয়নের মিনস্কে তৈরী এ দামী সিগারেট সাধারণতঃ সোভিয়েট অফিসিয়ালসরাই ব্যবহার করে থাকে। আহমদ মুসার সমগ্র অনুভূতি জুড়ে একটি প্রশ্ন জ্বলজ্বল করে উঠলঃ মিন্দানাওয়ের দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলের এই অজ্ঞাত রাস্তার ধারে এই সিাগারেট এলো কি করে? সিগারেটের বাক্স উল্টিয়ে নিল আহমদ মুসা। একটি লেখার প্রতি নজর পড়তেই ভ্রু-কুঁচকে গেল তার। রুশ হস্তাক্ষর। কে যেন রুশ অংকে একটি হিসাব করেছে। ৩২০ মাইল¸ ১০ = ৩২ ঘন্টা। আরও খুটিয়ে দেখল সে। সিগারেটের বাক্সের ধারে কিছু পরিমাণ মাটি লেগে আছে। মাটি তখনও শুকিয়ে যায়নি। আহমদ মুসা অনুমান করলো, ঘন্টা খানেক আগে কেউ রাস্তার উপর থেকে ওখানে ওটা ছুড়ে মেরেছে। সতর্ক হয়ে উঠল আহমদ মুসা। শিকারী বাঘের মত একবার সে চারিদিকে চাইল।
পাশেই মুর হামসার বোবা দৃষ্টি মেলে চেয়েছিল আহমদ মুসার দিকে। আহমদ মুসা তাকে জিজ্ঞেস করলো, এখান থেকে জাম্বুয়াঙ্গোর দুরত্ব কত হামসার?
-৩২ মাইলের মত।
-ঠিক?
-হাঁ। কেন?
-কোন উত্তর না দিয়ে আহমদ মুসা আবার জিজ্ঞেস করলো, আমরা ফিরে আসছি আজ হেড কোয়ার্টারে এ কথা কেউ জানে মুর হামসার?
-জানে।
-কে?
-শিরী।
-শিরীকে তুমি কবে জানিয়েছ?
-গতকাল।
-কোন জায়গা থেকে?
-জাম্বুয়াঙ্গো থেকে।
-জাম্বুয়াঙ্গো থেকে?
-হাঁ।
আহমদ মুসার চোখ দু’টি চিকচিক করে উঠল। যেন কিছু খুঁজে পেয়েছে সে। পুনরায় সে বলল, মুর হামসার, তুমি কী জানিয়েছিলে শিরীকে?
-জানিয়েছিলাম, আমরা কিছুক্ষণের মধ্যে যাত্রা করছি, পৌছব ইনশাআল্লাহ আগামীকাল বিকেলের দিকে।
আর কিছু বলল না আহমদ মুসা। মুহূর্তকালের জন্য চিন্তার অতল গভীরে চলে গেল সে। তারপর চোখ খুলে পুলের উপর দিয়ে সামনের রাস্তার দিকে চেয়ে সে বলল, হেড কোয়ার্টারে পৌছার জন্য এ ছাড়া আর কি দ্বিতীয় পথ নেই?
শুকনো কন্ঠে মুর হামসার বলল, না মুসা ভাই। একটু থেমে আবার সে বলল, কি ঘটছে তা কি জানতে পারি?
-নিশ্চয় বন্ধু। কিন্তু এখন নয়, আগে আমরা পৌছি।
-কিন্তু কোন পথে?
-গিরীখাত কত গভীর?
-প্রায় হাজার ফুটের মত।
-এই গিরীখাতের শেষ কোথায়?
-অনেকটা পথ ঘুরে আপোয়ান উপত্যকায় গিয়ে শেষ হয়েছে।
-চল আমরা গিরীপর্বতের পথ ধরে উপত্যকায় গিয়ে উঠবো।
আহমদ মুসা ও মুর হামসার ঘোড়া ছেড়ে দিয়ে রাস্তা পিছনে রেখে গিরীপর্বতের পথ ধরল। বড় কষ্টকর এ যাত্রা। মুহূর্তের অসাবধানতায় পা ফসকে গেলে ছয় শ’ হাত গভীরে গিরীর্বতের বুকে চির সমাধি লাভ হবে।
সন্ধার মধ্যেই তারা গিরীবর্তের খাড়া ঢাল পার হয়ে অপেক্ষাকৃত সমতল জায়গায় গিয়ে পৌছল। পথ চলা সহজতার হয়ে উঠল তাদের। কিন্তু সেই সাথে নেমে এলো রাত্রির কালো অন্ধকার। আকাশে চাঁদ নেই তারার আলোয় তারা পথ চলতে লাগল। মুর হামসার বলল, রাত্রিটা কোথাও বসে কাটিয়ে দিলে হয় না?
আহমদ মুসা বলল, মনে হচ্ছে নতুন এক সংকট সামনে, বসে থেকে সময় নষ্ট করার সময় নেই। এসো আজ একটু কষ্ট করি।
-আমি আমার জন্য ভাবছি না, কিন্তু আপনি অনভ্যস্ত……
-আমার জন্য ভেব না বন্ধু, কি করব এ দেহকে অত মায়া করে!
-আপনার কেউ নেই মুসা ভাই?
-কেন, উপরে আল্লাহ, তার নীচে তোমরা। আর কি চাই?
-কেন, মা, বাবা, ভাই, বোন, স্ত্রী, পুত্র, কন্যা কত কি তো মানুষ চায়?
-চাইলেই সবাই কি তা পেয়ে যেতে পারে?
-কিন্তু চাওয়ার বেদনাও কি আপনার নেই?
-আমি মানুষ। মানবিক বেদনার উর্ধে আমি নই মুর হামসার। কিন্তু মানবিক দায়িত্ব ও কর্তব্য ফেলে যদি আমি সে বেদনার পশরা মেলে বসি, তাহলে চোখের জল ফেলে আর আকাংখার শূন্য রাজ্যে হাত পা ছুঁড়তেই তো দিন কেটে যাবে।
মুর হামসার আর কিছু বলল না। এই বিরাট মানুষটির লৌহ হৃদয়ের অন্তরালে একান্ত নিজস্ব এক বেদনার নির্ঝরনী বয়ে চলেছে, তা যেন মুর হামসারকেও স্পর্শ করল। পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজনহীন এই মানুষটি তার হৃদয়ের আরো গভীরে যেন দাগ কেটে বসল।
মধ্যরাত পার হয়ে গেছে। আপোয়ান উপত্যকা আর বেশী দূরে নেই। দুজনে আগে পিছে ঘনিষ্ঠ হয়ে চলছিল। হঠাৎ আহমদ মুসা থেমে যাওয়ায় মুর হামসার গিয়ে তার সাথে ধাক্কা খেলো। কিছু বলতে যাচ্ছিল মুর হামসার। আহমদ মুসা তার মুখ চেপে ধরল। আঙুল দিয়ে ইষাণ কোণে ইংঙ্গিত করলো। মুর হামসার তাকিয়ে দেখল প্রায় শ’ গজ দূরে হাত দু’য়েকের মত ব্যবধানে বিড়ালের চোখের মত দু’টি অগ্নিপিন্ড।
আহমদ মুসা ফিসফিসিয়ে বলল, খেয়াল কর, বাতাসে দামী তামাকের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। নিশ্চয়ই ওখানে বসে কেউ সিগারেট খাচ্ছে।
-কিন্তু কে সিগারেট খাবে ওখানে বসে?
-ওরা কারা?
-রাশিয়ান।
-রাশিয়ান? কেমন করে বুঝলে?
-মিন্দানাওয়ে কি রাশিয়ার সিগারেট আসে? আপো পর্বতের ঘাঁটিতে পিসিডার কেউ কি রাশিয়ান সিগারেট খায়?
-কখনও না।
-তাহলে আপো পর্বতে রাশিয়ান সিগারেট এলো কি করে?
মুর হামসার মুহূর্তকাল ভেবে নিয়ে বলল, আপনি ঠিকই অনুমান করেছেন, কিন্তু…..
-কিন্তু, কেন ওরা আসবে, এইতো?
-আমি তাই ভাবছি।
-এর উত্তরও পাবে, এখন এস।
বিড়ালের মত গুড়ি মেরে নিঃশব্দে তারা এগিয়ে যেতে লাগল সামনে। আহমদ মুসার চোখে ইনফ্রারেড গগলস। দু’জনের হাতেই সাইলেন্সার লাগানো রিভলভার।
আহমদ মুসা দেখতে পেল দু’জন লোক একটি গুহার মুখে বসে আছে। তাদের থেকে হাতদশেক দুরে একটি পাথরের আড়ালে গিয়ে বসল আহমদ মুসা ও মুর হামসার।
লোক দু’টি নীচুস্বরে আলাপ করছিল। কি বলছিল, তা শোনার জন্য আহমদ মুসা সমস্ত মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করল ওদিকে। হঠাৎ মুর হামসার একটি ধাক্কা খেয়ে আহমদ মুসা একপাশে কাত হয়ে পড়ল। বিরাট একটি পাথরের খন্ড তার মাথার এক পাশ ঘেঁষে পড়ে গেল। বিরাট একটি পাথরের খন্ড তার মাথার এক পাশ ঘেষে পড়ে গেল। মাথাটি যন্ত্রনায় ঝিম ঝিম করে উঠলো আহমদ মুসার। আর একটু হলেই মাথাটা গুড়ো হয়ে যেতো একদম। পাথরটি পড়ে যাওয়ার পরক্ষণেই একটি ’দুপ’ শব্দ শুনতে পেল এবং পিছনে একজন আর্তনাদ করে পড়ে গেল।
আহমদ মুসা মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে তাড়াতাড়ি সামনে তাকাল। দেখল লোক দু’টি উঠে দাড়িয়েছে। তাদের হাতে রিভলবার। এগিয়ে আসছে তারা। আহমদ মুসা তার রিভলভার উচু করল। সাইলেন্সার লাগানো রিভলবার থেকে নিঃশব্দে দুটি গুলি বেরিয়ে গেল। মাত্র হাত পাঁচেক দুরে লোক দু’টি হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল।
মুর হামসার আহমদ মুসার কাছে সরে এসে বলল, আপনার মাথার আঘাত কেমন মুসা ভাই?
-তেমন কিছু না।
একটু থেমে আহমদ মুসা আবার বলল, আমাদের চুপচাপ কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে ওদের আর কেউ আছে কিনা দেখতে হবে।
প্রায় পাঁচ মিনিট চুপচাপ কেটে গেল। কোন সাড়া শব্দ নেই কোথাও। আহমদ মুসা বলল, উঠে দাঁড়াও মুর হামসার, ওদের আর কেউ নেই এখানে। টর্চ জ্বালল আহমদ মুসা।
টর্চের আলো মুর হামসারের গুলিতে নিহত লোকটির মুখের উপর পড়তেই মুর হামসার আঁৎকে উঠে বলল, এযে, আমাদের সিকিউরিটি গার্ড শওকত আলী।
-আমি আশ্চর্য হইনি মুর হামসার। এমন না ঘটলেই আমি বিস্মিত হতাম।
কথা শেষ করে সে বলল, এস এবার আসল দু’টাকে দেখি।
টর্চের আলো ফেলে দু’জনকেই খুটিয়ে খুটিয়ে দেখল আহমদ মুসা। দুজনেই রাশিয়ান। দু’জনেরই মাঝারী ধরনের গঠন দেহের।
আহমদ মুসা সার্চ করল ওদের জুতার গোড়ালী থেকে মাথার চুল পর্যন্ত। রিভলভার, মানিব্যাগ ও কয়েক ধরনের ক্ষুদ্র অস্ত্র ছাড়া আর কিছুই ছিল না তাদের কাছে।
গুহার মধ্যে টর্চের আলো ফেলল আহমদ মুসা। দু’টি বিছানা পাতা রয়েছে। বিছানা বালিশ দেখে মুর হামসার বলল, এসব তো পিসিডার বালিশ, এখানে এল কেমন করে?
-যেমন করে শওকত আলী। বলে সে মুর হামসারের দিকে চেয়ে বলল, এখানকার কাজ আপাততঃ শেষ চল তাড়াতাড়ি হেড কোয়ার্টারে।
হেড কোয়ার্টারে যখন তারা পৌছিল, তখন রাত তিনটা। আহমদ মুসার মাথার আঘাত বেশ গুরুতরই হয়েছিল। রক্তে তার জামা কাপড় ভিজে গেছে। এক থোপ রক্ত তার মাথার চুলে জট পাকিয়ে গেছে। মুর হামসার আহমদ মুসাকে নিয়ে সোজা পিসিডার ক্লিনিকে গিযে উঠল।
ক্লিনিকে পৌছে আহমদ মুসা মুর হামসারকে বললো, তুমি যাও হামসার। আমি ব্যান্ডেজ নিয়ে আসছি। যাবার সময় আলী কাওসারকে বলে যাও তৈরী থাকতে। আমি শীঘ্রই বেরুব।
আলী কাওসার আপো পর্বতের নিরাপত্তা প্রধান।
মুর হামসার আহমদ মুসার মুখের দিকে একবার চেয়ে আর দ্বিরুক্তি করল না। নীরবে সে পথে নামল আবার। যেতে যেতে ভাবল, এমন গুরুতর আহত তবু এক এক মিনিট বিশ্রামের চিন্তা করছে না। কি ত্যাগ, কি অপূর্ব নিষ্ঠা। এমন নেতার নির্দেশে মৃত্যুর মুখে এগিয়ে যেতেও আনন্দ আছে।
আলী কাওসারের সঙ্গে দেখা করে মুর হামসার বাড়ী পৌছল গিয়ে। নক করল দরজায়। নির্দিষ্ট নিয়মে নির্দিষ্ট সংখ্যায়। খুলে গেল দরজা। শিরী দরজা খুলে দিয়েছে। মুর হামসারকে সহাস্যে স্বাগত জানাতে গিয়ে তার উপর নজর পড়তেই শিরী উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল, তোমার জামায় রক্ত কেন ভাইয়া?
মুর হামসার চকিতে একবার তার জামার দিকে চেয়ে বলল, আহমদ মুসা আহত।
-আহত? কোথায় তিনি? কন্ঠ যেন শিরীর আর্তনাদ করে উঠল। নিজের কন্ঠস্বরে যেন সেও লজ্জা পেল। সংকুচিতা হয়ে পড়ল সে। বোনের দিকে চকিতে একবার চেয়ে মুর হামসার বলল, ক্লিনিকে ব্যান্ডেজ নিয়ে উনি আসছেন।
ধীর স্বরে শিরী বলল, কি ঘটেছে ভাইয়া?
মুর হামসার জামা কাপড় খুলতে খুলতে সমস্ত ঘটনা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শিরীকে শোনাল।
শিরী কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলো না। তার চোখে-মুখে উদ্বেগ উত্তেজনা। এক সময় তার চোখ দু’টি ছলছলে হয়ে উঠল। বলল, আপনারা আসছেন, একথা আমাকে জানানোর সাথে এই ঘটনার কোন সম্পর্ক রয়েছে ভাইয়া?
-আমিও বুঝতে পারছিনা বোন?
-উনি আমাকে সন্দেহ করেছেন? শিরীর কন্ঠ ধরে এল।
মুর হামসার কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু বাইরে থেকে দরজায় নক্ করার শব্দ ভেসে এল। মুর হামসার উঠে গেল দরজা খুলে দেওয়ার জন্য।
শিরী উঠে গেল তার ঘরের দিকে। মুর হামসারের সাথে ঘরে প্রবেশ করল আহমদ মুসা। প্রবেশ করেই মুর হামসারকে বলল, তুমি একটু শিরীকে জিজ্ঞেস কর, আমরা আসব, সে কথা তার কাছ থেকে কোন ভাবে অন্যকারো কাছে প্রকাশ পেয়েছিল কিনা?
-এখানেই ওকে ডাকি?
-থাক। এই একটি মাত্রই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে এস।
মুর হামসার চলে গেল পিছন দিকের পর্দা ঠেলে শিরীর ঘরে।
শিরী আহমদ মুসার কথা শুনতে পেয়েছিল। মুর হামসার যেতেই সে বলল, আপনার অয়্যারলেস পেয়েই আমি রুনার মাকে বলেছিলাম, আগামী কাল বিকালে ভাইয়ারা আসবেন, ঘরগুলো পরিষ্কার করতে হবে, তুমি আমার সাথে থেক, ‘থামল শিরী’ পরে বলল, আর কাউকেতো কিছু বলিনি ভাইয়া? গলা কাঁপছে শিরীর।
মুর হামসার চলে গেল। শিরী খাটের রেলিং ধরে যেমন দাঁড়িয়েছিল, তেমনি ভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। তার বিষন্ন মুখে যে অভিব্যাক্তি, তার চেয়ে বহু গুন বেশী বেদনার ভার তার হৃদয়ে।
আহমদ মুসা মুর হামসারের কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে বলল, কাউকে ডেকে রুনার মাকে ডাকতে পাঠাও মুর হামসার। এই মুহূর্তে তাকে আমরা চাই।
-আমিই যাই মুসা ভাই।
-কিন্তু তোমার অনেক কষ্ট হয়েছে।
-আপনার শতাংশের একাংশ নয়।
-আমি আহমদ মুসা সামান্য মানুষ, কিন্তু তুমি পূর্ব এশিয়ার এক শ্রেষ্ঠ রাজ বংশের সন্তান।
-এগুলো মানুষের কৃত্রিম পোশাক, মানুষ, সে মানুষই।
বলে মুর হামসার উঠে দাঁড়াল। যেতে যেতে সে বলল, আপনি খেয়ে নিন মুসা ভাই, আমি আসছি।
মুর হামসার চলে গেলে আহমেদ মুসা তার কক্ষে চলে গেল। প্রথমেই কাপড় ছাড়ল সে। কক্ষটাকে কেমন যেন নতুন নতুন মনে হচ্ছে তার কাছে। কক্ষের চারিদিকে নজর বুলাল সে, কক্ষটিকে নতুন করে সাজানো হয়েছে। ঘরের সবকিছু সাজানো গোছানো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। বক-সাদা বেডসিড নিখুতভাবে বিছানো। বালিশে নতুন কভার। মাথার পার্শ্বের টিপয়ে একগুচ্ছ রজনী গন্ধা। কাপড় চোপড় আলনায় পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখা। ডাইনিং টেবিলে খাবার ঢেকে রাখা। সবকিছুর মধ্যে আহমদ মুসা আন্তরিকতার এক নিবিড় স্পর্শ অনুভব করল।
বিছানায় গা এলিয়ে দিল সে। এক মধুর গন্ধে তার মন ভরে গেল। বালিশ বিছানায় মাখানো সেন্ট থেকে এটা আসছে অনুভব করল আহমদ মুসা। এ বিশেষ সেন্ট আরও একদিন সে পেয়েছিল। মনে পড়ল তার সেদিন অজ্ঞানাবস্থা থেকে জ্ঞান ফিরে আসার পর প্রথম এ সেন্টই তার নাকে এসেছিল। মাথার কাছে বসা ছিল শিরী। ভাবল আহমদ মুসা, এ ঘর সাজানো তাহলে শিরীর কাজ। মনে মনে হাসল সেঃ ঘরের শোভা ওরা। ঘরকে তাই এমন শোভামন্ডিত করা ওদের দ্বারাই সম্ভব।
দশ মিনিটের মধ্যে মুর হামসার ফিরে এল। সাথে রুনার মা। মুর হামসারের গৃহের একমাত্র পরিচারিকা। বয়স চল্লিশের কোঠায়।
ওদের ঘরে ঢুকতে দেখে আহমদ মুসা উঠে বসল। রুনার মাকে এক নজর খুটিয়ে দেখে নিল, সে। রুনার মার ঘুম জাগা চোখে-মুখে কেমন যেন একটা উদ্বেগ ফুটে উঠছে।
আহমদ মুসা রুনার মাকে প্রশ্ন করল ঘরের এসব কে সাজিয়েছে?
-কেন, শিরী আম্মা।
-তুমি সাথে ছিলে না?
-জি।
-তুমি জানতে আজ আমরা আসব?
-জি।
-কেমন করে জানতে?
-শিরী আম্মা বলেছিল।
-আচ্ছা রুনার মা, আমরা আজ আসব, একথা তুমি কাউকে বলেছিলে?
-বলেছিলাম।
-কাকে?
-আলী কাওসারকে।
-আলী কাওসার? কোন আলী কাওসার? আপো পর্বতের সিকিউরিটি প্রধান আলী কাওসার?
-জি।
একটু ভেবে আহমদ মুসা প্রশ্ন করল, তুমি তাকে এমনিতেই বলেছিলে, না তোমাকে সে জিজ্ঞাসা করেছিল?
-সে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, সাহেবরা কখন আসবে তুমি আমাকে বলতে পার রুনার মা?
-আর কাউকে বলোনি?
-জি না, বলিনি।
-ভেবে দেখ রুনার মা।
-গত দু’দিনে আলী কাওসার ছাড়া কারো সাথে আমার দেখাই হয়নি।
-তুমি এখন যেতে পার।
রুনার মা চলে গেল। আহমদ মুসা মুর হামসারকে জিজ্ঞাসা করল, আলী কাওসারকে তুমি পেয়েছিলে মুর হামসার?
-পেয়েছিলাম।
-ঘরে পেয়েছিলে?
-জি।
-সে ঘুমিয়ে ছিল, না জেগে ছিল?
-জেগে ছিল।
-তার পরণে ঘুমানোর পোশাক, না বাইরের পোশাক ছিল?
-বাইরের পোশাক।
একটু চিন্তা করল। তারপর বলল সে আবার, রাশিয়ানদের পুতুল হিসাবে তাহলে সে-ই এখানে কাজ করছে মুর হামসার। ওর চিন্তাধারা সম্মন্ধে জান কিছু তুমি?
-হো-চি মিন, চে-গুয়ে ভারার ভিষণ ভক্ত সে। ওদের অনেক বই আমি তার কাছে দেখেছি। থামল মুর হামসার। আবার সে বলল, কিন্তু এ ষড়যন্ত্র কি চায়?
-আমার মৃত্যু, সেই সাথে মিন্দানাওয়ের মানুষের ইসলামী চেতনার উৎখাত।
বলে আহমদ মুসা রাশিয়ানদের কাছ থেকে পাওয়া মানিব্যাগ থেকে একটি চিঠি বের করে মুর হামসারের হাতে দিল।
ব্যগ্রভাবে চিঠি হাতে নিয়ে চোখের সামনে মেলে ধরল। লেখা ছিলঃ
কমরেড উচিনভ।
তোমরা পাঠানো রিপোর্ট এখানে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
ফিলিস্তিনের ঐ আপদ কেমন করে মিন্দানাওয়ে গেল আমরা বুঝতে পারছি না। যা হোক, মিন্দানাওয়ে ফিলিস্তিনের পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হলে সেখানে মার্কসবাদের সফল প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে, আহমদ মুসাকে মিন্দানাওয়ের মাটি থেকে সরাতে হবে। সরাতে হবে চিরদিনের জন্য পৃথিবীর বুক থেকে। তুমি যার সহযোগিতা পেয়েছ, তাতে সফলতার আশা আমরা করি। তুমি তাকে বলোঃ সেই হবে মিন্দানাওয়ের হো-চি-মিন।
শেষ কথাঃ দক্ষিণ ভিয়েতানাম বিজয়ের প্রধান স্তম্ভ কমরেড জেনারেল শোপিলভকে তোমার সাহায্যে পাঠালাম। তোমার এবং তার এখন একটিই কাজ হবেঃ আহমদ মুসাকে হত্যা করা।
কাগনোয়ারভিট
চেয়ারম্যান
সোভিয়েট ফার ইস্ট ইনটেলিজেন্স
সার্ভিস (ফিলিপাইন শাখা)
চিঠি পড়ে অনেক্ষণ মুখ দিয়ে কথা সরল না মুর হামসারের। অনেকক্ষণ পর সে ধীর কন্ঠে বলল, মিন্দানাওয়ের এই হো-চি-মিন কে হবে মুসা ভাই।
-আলী কাওসার।
-জাতির সাথে এত বড় বিশ্বাস-ঘাতকতা সে করল?
-মুর হামসার কিছু বলতে যাচ্ছিল। ঘড়ির দিকে চেয়ে আহমদ মুসা বলল, আর কোন কথা নয় মুর হামসার। তৈরী হয়ে নাও এক্ষুনি। কালকের সূর্যোদয়ের পূর্বেই এ বিশ্বাস-ঘাতকদের উৎখাত করতে হবে মিন্দানাওয়ের মাটি থেকে।
মুর হামসার তার কক্ষে চলে গেল। আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে নিল। পকেটে রিভলবার। কাঁধে ঝুলছে সাব মেশিনগান। এ ছাড়া একটি গ্যাস রিভলভারও রয়েছে তার বাম পকেটে।
সজ্জিত হয়ে মুর হামসারের ঘরে ঢুকল আহমদ মুসা। মুর হামসারের ঘর থেকে শিরী তার ঘরে যাচ্ছিল। একেবারে আহমদ মুসার মুখোমুখী পড়ে গেল সে। দৃষ্টি বিনিময় হলো দু’জনের। শিরীর অশ্রু-ধোয়া চোখ।
শিরী চলে গেল তার ঘরে। আহমদ মুসা মুর হামসারকে জিজ্ঞারা করল, শিরীর কি হয়েছে মুর হামসার। গম্ভীর কন্ঠস্বর তার।
-ঐ যে আমাদের আসার খবর সে রুনার মাকে বলেছে, এখন সে মনে করছে এটা করে বিরাট অপরাধ সে করে ফেলছে। আমি অনেক বুঝিয়েছি, তবু…..
হো হো করে হেসে উঠল আহমদ মুসা। বলল, বলো তাকে, এ ধরনের অপরাধ যারা করে, তাদের চোখে পানি থাকে না, থাকে প্রতিরোধ কিংবা প্রতিশোধের বহ্নি শিখা।
আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই বাইরের কড়া নড়ে উঠল। পরিচিত সংকেত। মুর হামসার গিয়ে বাইরের গেট খুলে দিল। প্রবেশ করল আপোয়ান উপত্যকার নিরাপত্তা প্রহরী মুখতার।
মুখতার আহমদ মুসার সামনে এসে দাঁড়াল। হাপাচ্ছে সে। বলল, আমাদের আপোয়ান উপত্যকার ওপারে কাঠের ব্রীজ ধ্বসে গেছে। তার সঙ্গে গার্ড তাওছেরও মারা গেছে।
-ধ্বসে পড়েছে? তোমরা কোন বিষ্ফোরণের শব্দ পাওনি?
-তাওছের ব্রীজের মধ্যখানে পৌছার সঙ্গে সঙ্গে প্রচন্ড এক শব্দে ব্রীজটি ভেঙ্গে পড়েছে।
-সংবাদটা আলী কাওসারকে দাওনি?
-তাঁর ঘর বন্ধ। পেলামনা তাকে।
-তার ঘর বন্ধ?
-জি।
আহমদ মুসা দ্রুত দৃষ্টি বিনিময় করল মুর হামসারের সাথে। বলল, দেরী করে ফেলেছি আমরা। মুর হামসার তোমরা এস, আমি চললাম।
-কোথায় যাবেন আপনি?
-আলী কাওসারের খোঁজে।
-কোথায় পাবেন তাকে?
-পাহাড়ের সেই গুহায়। দেরী হয়ে গেলে সেখান থেকে সে ভাগবে।
আহমদ মুসা দ্রুত বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। তাঁর পিছে পিছে মুর হামসার এবং মুখতারও।
আহমদ মুসা তীরের ফলার মত নেমে গেল পাহাড় থেকে। তারপর অপোয়ান উপত্যকার সমতল ভূমির উপর দিয়ে সে ছুটছে দক্ষিণ দিকে। মুর হামসাররা অনেক পিছনে পড়ে গেছে তাঁর।
অন্ধকারে হাতড়িয়ে চলছে আহমদ মুসা। টর্চ আছে হাতে, কিন্তু জ্বালাবার সুযোগ নেই। আহমদ মুসার অনুমান সত্য হলে সামনেই তার শত্রু। আলী কাওসার তাদেরকে অক্ষত দেহে ঘাঁটিতে ফেরতে দেখে ষড়যন্ত্র ফাস হওয়া সম্পর্কে নিশ্চয় সন্দিহান হয়ে পড়েছে। সুতরাং এই গুহায় তার প্রভূদের কাছে সে ছুটে আসবে সেটাই স্বাভাবিক।
পাহাড়ের সেই গুহাটি এসে পড়েছে। আর মাত্র পঞ্চাশ গজের মত। আহমদ মুসা ইনফ্রারেড গগলসটি পরে নিল। হাতে ছয়ঘরা বাঘা রিভলভার। শিকারী বিড়ালের মত হামাগুড়ি দিয়ে এগুতে লাগল সে।
হঠাৎ তার মনে হল সামনের অন্ধকারটি নড়ছে। যেন এগিয়ে আসছে অন্ধকারটি। আহমদ মুসা থেমে গেল। রুদ্ধ নিঃশ্বাসে অপেক্ষা করতে লাগল সে। একটি পাথরের আড়ালে সে মাথা গুঁজে হামাগুড়ি দিয়ে বসে রইল। অন্ধকারটি তার সামনে দিয়েই যাচ্ছিল। আলী কাওসারকে সে পরিষ্কার চিনতে পারল। আলী কাওসারের পিছনে আর কাউকে না দেখে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা। পিছু নিল সে আলী কাওসারের। পিছনে পদশব্দ শুনে আলী কাওসার থমকে দাঁড়িয়েছিল। আহমদ মুসা গম্ভীর কন্ঠে বলল, ফিরতে চেষ্টা করোনা। যেমন যাচ্ছ, তেমনি এগিয়ে যাও।
কিন্তু আহমেদ মুসার কথা শেষ হবার আগেই আলী কাওসারের একটি হাত বিদ্যুৎ গতিতে উপরে উঠে এল।
আহমদ মুসা ট্রিগারে হাত রেখেই কথা বলছিল। সুতরাং আলী কাওসারের তর্জ্জনি তার ট্রিগারে চাপ দেবার আগেই আহমদ মুসার তর্জ্জনি চাপ দিল তার ট্রিগারে । একটি বুলেট আলী কাওসারের ডান বক্ষ ভেদ করল। আহমদ মুসা চেয়েছিল তার ডান হাতে গুলী করতে, কিন্তু আলী কাওসারের ডান হাতের বৃদ্ধাংগুলি ছুয়ে তা লাগল গিয়ে বুকে।
আর্তনাদ করে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল আলী কাওসারের দেহ।
মুর হামসাররা এসে পড়েছে।
টর্চের আলো জ্বলে উঠল।
রক্তে ভাসেছে আলী কাওসারের লাশ।
আহমদ মুসা ধীর কন্ঠে বলল, চেয়েছিলাম ওকে জীবন্ত ধরতে কিন্তু পারলাম না। বড্ড বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল সে।
-এ বিশ্বাস-ঘাতকদের হাত থেকে যত তাড়াতাড়ি অব্যাহতি পাওয়া যায়, ততই লাভ। মুর হামসার বলল।
-কিন্তু আলী কাওসারের মৃত্যুর সাথে সাথে আমরা এই য়ড়যন্ত্রের সাথে লিংক হারিয়ে ফেললাম। শিকড় আরো রয়ে গেল কি না!
-ষড়যন্ত্র থাকলে লিংক আমরা পাবই, যেমন এক সিগারেটের কেস থেকে এতবড় এক ষড়যন্ত্রের উদঘাটন হল। থামল মুর হামসার। বলল, সে আবার, আচ্ছা মুসা ভাই, আমি বুঝতে পারছিনা, আপনি ব্রীজের উপর দিয়ে না গিয়ে এদিকে এসেছিলেন কেন?
-রাশিয়ান সিগারেটের প্যাকেট এবং তাতে রুশ ভাষায় হস্তাক্ষর থেকে নিশ্চিত বুঝলাম, এখানে এক বা একাধিক রাশিয়ানের আগমন ঘটেছে। তারপর যথন অনুভব করলাম আজ এই সময় আমরা পৌছব এটা এখানে প্রকাশ হয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং সবশেষে যখন দেখলাম আমরা ব্রীজের গোড়ায় পৌছার কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত রাশিয়ানরা এখানে অপেক্ষা করে গেছে তখন বুঝলাম, নিশ্চয় কোন ফাঁদ পেতে রাখা হয়েছে আমাদের জন্য। ব্রীজটি যতটা আমি পর্যবেক্ষণ করেছিলাম সন্দেহের কিছু পাইনি। কিন্তু জানতাম এক ধরনের ম্যাগনেটিক মাইন আবিষ্কৃত হয়েছে, যার চারিদিকে সূক্ষাতিসূক্ষ তার বিছানো থাকে, মানুষের দেহ সে তার স্পর্শ করলেই মাইনে বিষ্ফোরণ ঘটে। আমার হঠাৎ মনে হয়েছিল, ব্রীজের লতা-পাতার ক্যামফ্লেজে সে রকম কোন তার জড়ানো রয়েছে। থামল আহমদ মুসা। একটু পরে বলল, আমার সন্দেহ সত্যি পরিণত হয়েছে। তাওছের ম্যাগনেটিক মাইনের তারেই জড়িয়ে পড়েছিল।
-আপনার দুরদর্শিতা এক বিপর্যয় থেকে আমাদের রক্ষা করল মুসা ভাই।
-কথাটা বড় ব্যক্তিকেন্দ্রীক হল মুর হামসার। এসব সাফল্যের কৃতিত্ব কোন ব্যক্তির নয়, সমষ্টির।
-ব্যক্তির ভূমিকার কি কোন মূল্য নেই এখানে?
-আছে, যেমন দেহের একটি অঙ্গের মূল্য। দেহেক বাদ দিয়ে অঙ্গের পৃথক কোন কৃতিত্ব নেই। সংগঠনও তেমনি দেহের মত। এখানে যদি ব্যক্তি চেতনা ও ব্যক্তি-কৃতিত্বের অহমিকা মাথা তুলে দাড়ায়, তা হলে সংগঠনের ‘সীসার প্রাচীর’ (বানিয়ানুম মারসুস) দেখা দেবে ফাটল।
মুর হামসার মৃগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়েছিল তার প্রিয় নেতার দিকে। নতমুখে দাড়ানো মুখতার এবং পিসিডার কর্মীদের চোখে ঝরে পড়ছিল অপরিসীম শ্রদ্ধা ও বিস্ময়।
পূর্ব আকাশ তখন সফেদ হয়ে উঠছে। স্নিগ্ধ পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে সোবেহ সাদেকের বাতাস।
৫
ক্লু-ক্লাক্স-ক্লান পাগল হয়ে উঠেছে। জলজ্যান্ত জাহাজটি গেল কোথায়? বানিও সেলিবিসের মধ্যে দিয়ে জাহাজটি যখন মাকাসার প্রণালী পার হচ্ছিল তখনও জাহাজটি দিভাও-এর সাথে রেডিও লিংক বজায় রেখেছে। তারপর সেলিবিস সাগর থেকে জাহাজ যাবে কোথায়?
ক্লু-ক্লাক্স-ক্লান ও ইরগুন জাই লিওমির যৌথ অনুসন্ধানকারী দল গত এক মাসে সোলো সাগর, সেলিবিস সাগর, মরো উপ-সাগর ও দিভাও উপ-সাগর চষে ফেলেছে। ক্লু-ক্লাক্স-ক্লান আর কিছু নয় চায় শুধু রেডিয়েশন বম্ব। আবদুল্লাহ হাত্তাকে তো মেরেই ফেলা হয়েছে। সুতরাং জাহাজের ১০০টি রেডিয়েশন বম্ব ফিরে পেলে জাহাজ শুদ্ধ সবকিছু চুলোয় যাক ক্ষতি নেই। আর ইরগুন জাই লিউমি আঙুল কামড়াচ্ছে আহমদ মুসাকে হাতে পেয়ে হারিয়ে। একবার ওকে হাতের মুঠোয় পেলে ফিলিস্তিনের বিজয় উলল্লাসকে তারা থামিয়ে দিতে পারতো।
সুতরাং তারা হন্যে হয়ে খুঁজছে সব জায়গা। সেলিবিস সাগর থেকে মিন্দানাও পর্যন্ত কোন দ্বীপের উপকুল অঞ্চলও তারা বাদ দেয়নি। মিন্দানাও ও সোলো দ্বীপপুঞ্জের সমগ্র উপকুল তারা আতি পাঁতি করে খুঁজেছে। কিন্তু না পেয়েছে তারা জাহাজ না পেয়েছে তারা কোন সূত্র। পাবে কেমন করে? জাহাজটি আপো পর্বতে পৌছার দু’দিন পরেই আহমদ মুসার নির্দেশে উত্তর মিন্দানাওয়ের দুর্গম ও সংকীর্ণ ফাগায়ান উপসাগরে ওটাকে ডুবিয়ে ফেলা হয়েছে।
দীর্ঘ একমাস অনুসন্ধানের পর ক্লান্ত শ্রান্ত অনুসন্ধানকারী দল মিন্দানাওয়ে ক্লু-ক্লাক্স-ক্লানের হেড কোয়ার্টার দিভাওয়ে ফিরে এলো।
রিপোর্ট শুনে মিন্দানাওয়ের ক্লু-ক্লাক্স-ক্লান প্রধান মাইকেল এঞ্জেলো রাগে দুঃখে চুল ছিড়তে লাগল। রেডিয়েশন বম্ব কেলেঙ্কারী প্রকাশ হয়ে পড়ার পর ওগুলো পাওয়ার পথই শুধু বন্ধ হয়নি, সংগঠনের মাথার উপর বিপদের খাড়াও ঝুলছে। কিন্তু এত কিছু করে লাভ হলো কি? পরীক্ষামূলক দু’টি বম্ব ব্যবহার ছাড়া আর কিছুই করতে পারলো না তারা। সব রাগ গিয়ে পড়ল অনুসন্ধানকারী দলের নেতা জন উইলিয়ামের উপর। মাইকেল এঞ্জেলা দাঁত খিঁচিয়ে বলল, অপদার্থ তোমরা। জাহাজ নিশ্চয় আছে কোথাও। রেডিয়েশন বম্বের খবর সেই জাহাজ সূত্র থেকেই খবরের কাগজে প্রকাশ পেয়েছে এবং এটা করেছে এ দেশের নেটিভ মুর শয়তানরাই। তা না হলে খবরটি এম পি আই পেল কি করে?
ক্রিং ক্রিং ক্রিং। মাইকেল এ্যাঞ্জেলোর লাল টেলিফোনটি বেজে উঠল। বিরক্তির সাথে টেলিফোনের রিসিভার তুলে নিল সে।…………
মাইকেল এ্যাঞ্জোলোর পাঁচ তলা ভবনটির নীচে প্রায় ১০০ গজ দূরের একটি পাইলক টেলিফোন বুথে কানে টেলিফোন এলো- কে? মাইকেল এ্যাঞ্জেলোর কন্ঠ।
-লিলিয়েভ। সোভিয়েট ফার ইস্ট ইনটেলিজেন্স সার্ভিসের একটি চিঠি নিয়ে এসেছি।
-কার জন্য?
-আপনার নামে।
-আমার নামে? আমি কে?
-মাইকেল এ্যাঞ্জেলো। ক্লু-ক্লাক্স-ক্লানের মিন্দানাও প্রধান।
-আসুন।
-কখন আসব, এখনি?
-না, এখন আমি ব্যস্ত। আগামীকাল সকাল ন’টা।
-আচ্ছা। বলে টেলিফোন রেখে দিল লিলিয়েভ।
লিলিয়েভ টেলিফোনের রিসিভার রেখে দেবার সাথে সাথে একজন লোক টেলিফোন বুথের বন্ধ দরজার সামনে থেকে সরে গেল। এতক্ষণ সে দরজার ফুটায় কান লাগিয়ে কথোপ-কথন শুনছিল। লোকটি দ্রুত একটি দ্বিতল হোটেলে গিয়ে উঠল।
লোকটি আবদুল্লাহ জাবের। কায়রো থেকে তাকে এনে দিভাও-এ রাখা হয়েছে। দিভাও পিসিডা শাখার অধিনায়ক সে।
এখানে তার পরিচয়ঃ একজন নেটিভ খৃস্টান। ম্যানিলায় রেস্টুরেন্ট চালাত। উন্নতির আশায় এসেছে দিভাওয়ে। হঠাৎ সে হোটেলটি পেয়ে কিনে নিয়েছে। আবাসিক এ হোটেলটিতে মোট ২১ টি কক্ষ। এর একটিতে আবদুল্লাহ জাবের নিজেই থাকে। আবদুল্লাহ জাবের এখানে কলিন্স নামে পরিচিত। সবাই জানে লোকটি বড় আমুদে। অল্পদিনেই সে সবার সাথে সম্পর্ক পাতিয়েছে। দেড়শ’ গজ দুরের ক্লু-ক্লাক্স-ক্লান হেড কোয়ার্টারের সবাই এখন তার ঘনিষ্ঠ খদ্দের।
টেলিফোন বুথ থেকে বেরিয়ে লিলিয়েভ মেয়েটাও এসে হোটেল ঢুকল। আজ ভোরে সে ম্যানিলা থেকে দিভাও এসেছে। সোজা এই হোটেলেই এসে উঠেছে সে।
লিলিয়েভ রাশিয়ান মেয়ে। কিন্তু তার দেহে জাপানী বৈশিষ্ট্যই যেন বেশী। বয়স ২৪/২৫ এর বেশী হবে না। উচ্ছ্বল যৌবনে অপরূপ লাবন্যের মোহনীয় প্রলেপ।
মিনিস্কার্ট পরে মাজা দুলিয়ে হাইহিলের গট্ গট্ শব্দ তুলে যখন লিলিয়েভ হোটেলের করিডোর দিয়ে প্রবেশ করছিল, তখনি আবদুল্লাহ জাবের স্বগতঃ কন্ঠে বলেছিল, ভদ্রে, হয় তুমি বল্লাক মার্কেটের, নয় কোন ভয়ংকর এজেন্ট, নতুবা হবে কলগার্ল।
কিন্তু কোনটি?
এই জবাব পাবার জন্যই আবদুল্লাহ জাবের চোখ রেখেছিল তার প্রতি।
কিন্তু যে জবাব পেল, তা রাতের ঘুম কেড়ে নিল। সোভিয়েট ফার ইস্ট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের এজেন্ট দিভাওতে কেন। পশ্চিমী সন্ত্রাসবাদী সংস্থার কাছে কি চিঠি বয়ে এনেছে লিলিয়েভ? আপো পর্বতে কুপোকাত হবার পর আবার কোন চাল শুরু করেছে তারা।
শেষে মনে মনে একটি বুদ্ধি স্থির করে খুশীতে গুনগুন করে উঠল আবদুল্লাহ জাবের।
নতুন বোর্ডারদের রুমে রুমে শুভেচ্ছা সফর আবদুল্লাহ জাবেরের বিশেষ একটি অভ্যাস।
এই শুভেচ্ছা সফরে সেদিন রাত সাড়ে ন’টায় সে গিয়ে নক করল লিলিয়েভের রুমে।
কয়েক মুহূর্ত কেটে গেল। ভিতর থেকে চাবি খোলার খুট খাট শব্দ এল। দরজা খুলে গেল।
দরজা খুলে আবদুল্লাহ জাবেরকে দেখেই লিলিয়েভ সহাস্যে বলে উঠল, হ্যাল্লো মিঃ কলিন্স, হাউ-ডু-ইউডু আসুন আসুন।
-ও! অল রাইট লিলিয়েভ। বলতে বলতে ঘরে ঢুকল আবদুল্লাহ জাবের।
লিলিয়েভ গিয়ে সোফায় বসল। ওর গায়ে জড়ানো ছিল বড় এক তোয়ালে। ছুড়ে ফেলে দিল তা দূরে। তার গোটা দেহে এখন মাত্র দু’চিলতে কাপড় অবশিষ্ট রইল।
ঘরের চারদিকে নজর বুলাল জাবের। লিলিয়েভের সামনের টেবিলে ছিল একটি রিভলভার, একটি সিগার কেস ও একটি লাইটার। ঘরে আর বাড়তি জিনিসের মধ্যে রয়েছে একটি ব্রিফকেস ও একটি সাইড ব্যাগ।
আবদুল্লাহ জাবের সোফায় বসতে বসতে রিভলভারটির দিকে ইংগিত করে বলল, ও বস্তুটি সরিয়ে নিন মিস লিলিয়েভ, আপনার মত মনোরমার সাথে কোন ঝগড়া-ঝাঁটি আমার নেই।
খিল খিল করে হেসে উঠল লিলিয়েভ। বলল, ‘ইউ আর ইন্টারেষ্টিং মিঃ কলিন্স।’ বলে সে রিভলভার ছুড়ে দিল বিছানার উপর।
-এন্ড নাও মিস লিলিয়েভ কিছু একটা গায়ে জড়িয়ে নিলেই ভাল হয়।
-কেন?
-শান্ত মনে দুটো কথা বলতে পারি।
-মন অশান্ত হওয়ার কি ঘটেছে?
-তোমার অবারিত ওই উত্তাপ?
আবার সেই ঠান্ডা খিলখিল হাসি। বললো সে, সত্যিই তুমি এক প্রাণবন্ত পুরুষ মিঃ কলিন্স। কিন্তু এর পরের আবদারটা হবে কি শুনি।
-মিস লিলিয়েভ ক্লু-ক্লাক্স-ক্লানের জন্য কি সংবাদ বহন করে এনেছো?
লিলিয়েভ বিস্মিত হলো না, নড়ে চড়ে বসল। সেই ঠান্ডা হাসি তার মুখে। বলল, জানতাম এ প্রশ্ন তোমার কাছ থেকে আসবে, কিন্তু এমন সহজ আব্দার হয়ে আসবে, তা ভাবিনি। তুমি কে মিঃ কলিন্স?
-ইরগুণ জাই লিউমি’র ডেভিড আব্রাহাম। আজ একমাস ধরে কলিন্স সেজে হোটেল খুলে বসে আছি আমি।
-প্রমাণ?
-তুমি যে সোভিয়েট ফার ইস্ট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের লিলিয়েভ তার প্রমাণ?
লিলিয়েভ কোন উত্তর দিল না। আবদুল্লাহ জাবেরের চোখে চোখ রেখে কি ভাবছিল। বলল, পাবলিক টেলিফোন বুথে তোমার আড়িপাতা আমি ধরে ফেলতে পেরেছি, কিন্তু আমাকে তুমি সন্দেহ করেছিলে কখন?
-ম্যানিলা থেকে আমাকে জানানো হয়েছিল।
-কিন্তু আমরা ক্লু-ক্লাক্স-ক্লানের জন্য যে সংবাদ বহন করে এনেছি, তা তোমরা জানতে চাও কেন?
-তার সবটুকু আমরা জানতে চাই না, হারানো জাহাজ সম্পর্কে কিছু থাকলে সেটা আমরা জানতে চাই।
-ক্লু-ক্লাক্স-ক্লানের হারানো জাহাজের সাথে ইরগুন জাই লিউমির সম্পর্ক?
জাহাজে ছিল আহমদ মুসা জাহাজের সন্ধান পেলে তারও সন্ধান মিলবে।
-কিন্তু এটা তো ক্লু-ক্লাক্স-ক্লানের কাছ থেকেও জানতে পার।
-না, আমরা আর ওদের মুখাপেক্ষী হতে চাইনে।
৫০ মিলিয়ন ডলার আমরা পানিতে ফেলে দিতে চাইনে আর।
মিটি মিটি ঠান্ডা হাসি হাসছে লিলিয়েভ। সিগারেট কেস থেকে একটি সিগারেট বের করে হাতে নিল। বলল, কিন্তু তুমি কেমন করে বুঝলে যে সোভিয়েত ফার ইস্ট ইনটেলিজেন্স সার্ভিস খয়রাতি প্রতিষ্ঠান? পায়ে হেঁটে এসে এমনি এমনি তোমার পকেটে দিয়ে যাবে খবর?
-আহমদ মুসার উৎখাতের মধ্যে আমাদের কমন ইন্টারেস্ট রয়েছে লিলিয়েভ।
-তাহালে ক্লু-ক্লাক্স-ক্লানকে এ থেকে বঞ্চিত করতে চাও কেন?
-বঞ্চিত নয়, ওদের উপর নির্ভরশীল হতে চাইনা।
-হু। বলে সিগারেটটি মুখে পুরে দিল লিলিয়েভ।
আবদুল্লাহ জাবের লিলিয়েভের চোখের দিকে মুহূর্তের জন্য চেয়ে এক ঝটকায় উঠে দাড়িয়ে লিলিয়েভের মুখ থেকে সিগারেটটি কেড়ে নিতে নিতে বলল, রিভলভারের চেয়েও বড় সিরিয়াস, এর আলপিন হেডড বুলেট।
অদ্ভুত শক্তিশালী নার্ভ লিলিয়েভের। কোন ভাবান্তর এলনা তার মধ্যে। সাপের মত ঠান্ডা সেই নিঃশব্দ হাসি দেখা দিল তার ঠোঁটে। বলল, আমি যতটা মনে করেছিলাম, তার চেয়েও বেশী চালাক তুমি। এস শক্রতা ভুলে গিয়ে আমরা বন্ধু হই।
-কিন্তু তার আগে তোমার হাতের ঐ লাইটার ফেলে দাও। ওতে গ্যাস চেম্বার নেই কে বলবে?
লাইটারটি বিছানার উপর ছুঁড়ে দিতে দিতে লিলিয়েভ বলল, বড় শক্ত চিজ তুমি।
থামল লিলিয়েভ। একটু পরে আবার বলল, তুমি আমাকে জান, আমিও তোমাকে জানি। তুমি শক্তিমান, সুদর্শন, তীক্ষ্ণধী। তোমাকে বন্ধু হিসাবে পেলে আমি সুখী হব মিঃ কলিন্স।
চোখ দু’টি চক্ চকে হয়ে উঠেছে লিলিয়েভের।
-কিন্তু শত্রুতার কোন সুযোগ, কোন উপায়কেই তো তুমি হাতছাড়া করছ না।
লিলিয়েভ হাসল। বলল নিশ্চয়তা দাও, চিঠিটি তুমি চাইবে না।
-বন্ধুর প্রতি বন্ধুর এই কি মনোভাব।
-চিঠির সাথে আমাদের স্বার্থের প্রশ্ন জড়িত।
কত কোটি টাকা নিয়ে সোভিয়েট ইনটেলিজেন্স সার্ভিস ক্লু-ক্লাক্স-ক্লানকে জাহাজ সম্পর্কে তথ্য পরিবেশন করছে?
প্রথমবারের মত লিলিয়েভের চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল। কিন্তু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা না করে বলল, টাকার স্বার্থ নেই, স্বার্থটি অনেক বড়।
-কি সে স্বার্থ?
অপ্রাসঙ্গিক কিন্তু এ প্রশ্ন? এর সাথে ইরগুন জাই লিউমি’র কোন সম্পর্ক নেই।
-নিশ্চয় আছে আমরা যদি সে মূল্য দিয়ে সে চিঠি কিনে নিতে পারি?
-তা যদি সম্ভব হতো আমার আপত্তি ছিল না।
কথাটি শেষ করেই লিলিয়েভ এসে আবদুল্লাহ জাবেরের পাশে বসল। তার মসৃণ উরুটি আবদুল্লাহ জাবেরের উরু স্পর্শ করেছে। ও সোফায় হেলান দিয়ে বসেছে। দু’টি হাত দু’দিকে সোফার উপর দিয়ে প্রসারিত। শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে তার উন্নত বুকের উঠা-নামা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নীরব লিলিয়েভ।
আবদুল্লাহ জাবের বলল, দুনিয়ায় কি অসম্ভব কিছু আছে লিলিয়েভ?
লিলিয়েভ আবদুল্লাহ জাবেরকে জড়িযে ধরে বলল, ওসব সম্ভব অসম্ভবের কথা এখন থাক মিঃ কলিন্স। এস আমরা কিছুক্ষণের জন্য ভুলে যাই সব।
আবদুল্লাহ জাবেরের ঠোটে খেলে গেল এক টুকরা হাসি। বলল সে, এটাই তোমার শেষ অস্ত্র লিলিয়েভ?
লিলিয়েভের হাতের বাঁধন দৃঢ়তর হলো। বলল সে, আবার সেই কথা। এসো না আমরা কিছুক্ষণের জন্য চাকরির জগত থেকে দূরে সরে যাই।
আবদুল্লাহ জাবেরের বাম কাঁধে লিলিয়েভের মাথা। ওর নরম ওষ্ঠাধরের উষ্ণ স্পর্শ সে অনুভব করছে তার গলায়। এক নির্মল শুড়শুড়ি ছড়িয়ে পড়ছে গোটা দেহে। লিলিয়েভের ডান হাত জড়িয়ে রয়েছে তার গলা। আর তার বাম হাত আবদুল্লাহ জাবেরের জানুর উপর ছড়িয়ে রাখা ডান বাহুর উপর ন্যস্ত। লিলিয়েভের বাম হাতের মধ্যমায় একটি আংটি। বড় রকমের নীলাভ পাথর বসানো আংটিতে। পাথরের ঠিক মধ্যখানে সুক্ষ একটি ফুটো চোখে পড়ল আবদুল্লাহ জাবেরের। চেতনার দুয়ারে একটা কথা ঝিলিক দিয়ে গেল তার ডেথরিং-মৃত্যু আংটি।
ম্পাইগার্লদের একটা মোক্ষম অস্ত্র এই ডেথরিং। আংটির পাথরে একটু চাপ পড়লেই ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে সূচের অতি তীক্ষ অগ্রভাগ। ভয়ংকর পটাসিয়াম সাইনাইড মাখানো তাকে তার মাথায়। শেষ অস্ত্র এটা স্পাইগার্লদের। কামনার জালে বেঁধে প্রতিদ্বন্দ্বীকে সে তুলে নেয় বুকে। তারপর নায়ক যখন উন্মুক্ত কামনার অথৈ স্রোতে ভুলে যায় নিজেকে, ভুলে যায় সব কিছু। তখন আস্তে করে সে ডেথরিং চেপে ধরে তার দেহে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই খেলা সাঙ্গ হয়। প্রতিদ্বন্দ্বী ঢলে পড়ে নীল মৃত্যুর কোলে।
আবদুল্লাহ জাবের লিলিয়েভের বাম হাতটি তুলে নিল হাতে। মুখনীচু করে ফিসফিসে কন্ঠে ডাকল, লিলিয়েভ।
লিলিয়েভ কোন কথা বলল না। মুখ উচু করে ওষ্ঠাধার মেলে ধরল। ধীরে ধীরে তা এগিয়ে এল আবদুল্লাহ জাবেরের ঠোট লক্ষ্যে।
আবদুল্লাহ জাবের মুখ ঈষৎ উঁচু করে বলল, কত লোককে এই ডেথ রিং দিয়ে হত্যা করেছ লিলিয়েভ?
এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল লিলিয়েভ। এক লাফে গিয়ে রিভলভার তুলে নিল সে। চোখ ওর ধকধক করে জ্বলছে। রিভলভারের নল আবদুল্লাহ জাবেরের কপাল লক্ষ্যে চেয়ে আছে।
ঘটনাটা এমন আকস্মিকভাবে ঘটে গেল যে, আবদুল্লাহ জাবের বিস্ময় বিমুঢ় হয়ে পড়ল। কিন্তু তা মুহূর্তের জন্য। সে লিলিয়েভের চোখে চোখ রেখে বলল, দেবী যে বাহুপাশ থেকে একেবারে রণভূমে? আমি খারাপ তো কিছু বলিনি।
-আমার বাহুপাশ থেকে তুমিই প্রথম জীবিত বেরিয়ে গেলে। ডেথরিং থেকে বেঁচেছো, কিন্তু এ বুলেট তোমাকে খাতির করবে না।
-কিন্তু আমার দোষটা কোথায়?
আবদুল্লাহ জাবেরের চোখে কিন্তু পলক পড়েনি। লিলিয়েভের চোখও যেন গেথে আছে তার চোখের সাথে।
আবদুল্লাহ জাবেরের সামনে একটি কাঠের টিপয়, তারপর সোফা। সোফার ওপারেই দাড়িয়ে আছে লিলিয়েভ। দুরত্ব প্রায় ৩ গজের মত। ইঞ্চি ইঞ্চি করে আবদুল্লাহ জাবের টিপয়ের দিকে এগুচ্ছিলো। টিপয় পায়ের নাগালে আসলে একবার দেখা যেত।
-তুমি চালাক, আমি স্বীকার করি। কিন্তু আমাকে ফাকি দিতে তুমি পারনি। তুমি জাননা, ইরগুণ জাই লিউমির সাথে আমাদের আগেই চুক্তি হয়ে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আবিষ্কৃত সাগর তলার ‘ঘুমন্ত ক্ষেপনাস্ত্র’ সম্বন্ধনীয় গোপন তথ্য সরবরাহের বিনিময়ে আমরা ওদের আহমদ মুসা সম্পর্কিত তথ্যাদি দিয়ে দিয়েছি। সোলো সাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরের মধ্যবর্তী ‘পাল-ওয়াং’ দ্বীপ যদি ক্লু-ক্লাক্স-ক্লান আমাদের দিতে রাজী হয় তাহলে ওদেরকেও আমরা জাহাজ ও রেডিয়েশন বম্ব সম্পর্কিত সব খবর দিয়ে দিব।
কথা বলার সময় লিলিয়েভের চোখ আনন্দে চিক্ চিক্ করছিল।
কাঠের টিপয়টি আবদুল্লাহ জাবেরের পায়ের আওতায় এসে গেছে। কিন্তু ব্যাপারটা লিলিয়েভের দৃষ্টি এড়াল না। বলল সে, আর এক ইঞ্চি সামনে এগিও না, গুড়ো করে…..
কিন্তু কথা তার শেষ হলো না। আবদুল্লাহ জাবেরের পা বিদ্যুৎ গতিতে উপরে উঠল। এক নিখুঁত আঘাতে কাঠের ক্ষুদ্র টিপয়টি ছুটে চলল লিলিয়েভের মাথা লক্ষ্যে।
একটু সরে দাঁড়িয়েছিল লিলিয়েভ। রিভলভারের নল সরে গিয়েছিল। এই সুযোগেরই অপেক্ষা করছিল আবদুল্লাহ জাবের। সে সোফার উপর দিয়ে এক লাফে ঝাঁপিয়ে পড়ল লিলিয়েভের উপর। লিলিয়েভের তর্জ্জনি রিভলভারের ট্রিগার চেপে ধরল বটে, কিন্তু গুলী গিয়ে পড়ল দক্ষিণের দেয়ালে।
রিভলবার কেড়ে নিল আবদুল্লাহ জাবের। কিন্তু লিলিয়েভ দাঁত দিয়ে প্রচন্ড শক্তিতে কামড়ে ধরেছে তার বাম বাহু। দাঁত বসে যাচ্ছে তার চামড়া কেটে ভিতরে। লিলিয়েভের ডেথরিং এর শিতল স্পর্শ অনুভব করল আবদুল্লাহ জাবের তার বাম পাজরে। প্রচন্ড এক ধাক্কায় সে সরিয়ে দিল লিলিয়েভকে। ভীষণ যন্ত্রণা অনুভব করল জাবের তার বাম বাহুতে। বাম বাহুর খানিকটা মাংস তুলে নিয়ে গেছে লিলিয়েভ। রক্তে ভিজে গেছে লিলিয়েভের মুখ। রক্তে ভেসে যাচ্ছে আবদুল্লাহহ জাবেরের বাম বাহু।
-রক্তপায়ী ডাইনি। বলে এক প্রচন্ড লাথি মারল লিলিয়েভের তলপেটে। বসে পড়ল লিলিয়েভ। তারপর অজ্ঞান হয়ে পড়ল মেঝেতে।
লিলিয়েভের ব্রিফকেস, সাইডব্যাগসহ সমগ্র ঘর আতি-পাতি করে খুঁজল আবদুল্লাহ জাবের। কিন্তু চিঠি কোথাও পেল না। শেষে ওয়েষ্টপেপার বাস্কেটের তলায় সে পেয়ে গেল চিঠিটি।
চিঠিটি পকেটে পুরে লিলিয়েভকে বেঁধে বিছানায় শুইয়ে রেখে দরজার চাবি এঁটে বেরিয়ে এলো জাবের।
আবদুল্লাহ জাবেরের কক্ষে উৎকণ্ঠিতভাবে বসে ছিল হোরায়রা। আবদুল্লাহ জাবেরের রক্তাক্ত হাত, আর বিরাট ক্ষত দেখে চমকে উঠল সে। সে প্রশ্নবোধক দৃষ্টি মেলে ধরল আবদুল্লাহ জাবেরের দিকে।
হোরায়রা দিভাও থেকে পঞ্চাশ মাইল দূরের ছানাবাও অঞ্চলের ছালেমী গোত্রের সরদার জাফর আলীর ছেলে। ১০ বছর আগে মিশনারী ও নেটিভ খৃষ্টানদের সাথে সংঘটিত এক সংঘর্ষে জাফর আলী নিহত হয়। ২৫ বছরের যুবক হোরায়রা এখন পিসিডার একজন নিষ্ঠাবান কর্মী। দিভাওয়ে সে আবদুল্লাহ জাবেরের সহকারী হিসেবে কাজ করছে।
আবদুল্লাহ জাবের হোরায়রাকে লিলিয়েভের ঘরের চাবি দিয়ে বলল, রাত বারটার দিকে লিলিয়েভকে সরিয়ে ফেলতে হবে এখান থেকে। আপাততঃ ওকে রাখতে হবে শহরের বাইরে আমাদের নুরানাও ঘাঁটিতে। তারপর মুসা ভাইয়ের নির্দেশ মোতাবেক যা হয় করা যাবে।
আর সবাইকে বলে দেবে এবং থানাতেও জানিয়ে রাখবে আমাদের ১১ নং বোর্ডার রাত্রিতে বাইরে গিয়ে আর ফিরে আসেনি।
-আচ্ছা জনাব। বলে উঠে দাঁড়াল হোরায়রা।
আবদুল্লাহ জাবের আলমারী খুলে ফার্স্ট এইডের বাক্সটি নিয়ে বাথরুমে প্রবেশ করল।
দরজা টেনে বন্ধ করে বেরিয়ে গেল হোরায়রা।
৬
আপো পর্বতে পিসিডার হেড কোয়ার্টার। আহমদ মুসার কক্ষ। একটি সেক্রেটারিয়েট টেবিলের পাশে রিভলভিং চেয়ারে বসে আছে আহমদ মুসা। তাঁর ডান পাশে এক বৃদ্ধ। মাথায় শ্বেত-শুভ্র বাবরি, মেহেদিরঞ্জিত দাড়ি। সফেদ পোশাক পরিধানে। তাঁর মুখমন্ডল থেকে পবিত্র এক জ্যোতি যেন ঠিকরে পড়ছে। ইনি আবু আল্-মখদুম। সোলো ও মিন্দানাও দ্বীপপুঞ্জে সবচেয়ে প্রাচীন পবিত্র কুঞ্জবন মসজিদের ইমাম। এই মসজিদের পাশেই এক সমাধিতে শুয়ে আছেন করিম আল-মাখদুম। আজ এগার শ’ বছর ধরে সোলো ও মিন্দানাওবাসীদের হৃদয় নিংড়ানো ভক্তি-শ্রদ্ধার কেন্দ্র এই মাজার-এই মসজিদ। সেই সুলতান আবুবকর থেকে সোলো ও মিন্দানাওয়ের সকল সুলতানের রাজ্যাভিষেকের কেন্দ্রও এই মসজিদ- এই মাজার।
আহমদ মুসার বাম পাশে বসেছিল মুর হামসার।
পাশের আপওয়ান উপত্যকা থেকে ভেসে আসছিল আজানের সুর। উপত্যকা অধিত্যকায় ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে কেঁপে কেঁপে আজানের শেষ সুরটুকুও মিলিয়ে গেল বাতাসে।
আলী আল-মখদুমের পাতলা ঠোট দু’টি নড়ে উঠল। অষ্ফুটে শ্রুত হলো তাঁর কণ্ঠ ‘‘আহ! আজ সে কত বছর আগে!! সোলো মিন্দানাও দ্বীপপুঞ্জের মানুষ তখন পশুর মত পশুর সাথে উলঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়াত। পূজা করত তারা জড়পদার্থের। স্রষ্টার কোন পরিচয় তারা জানত না। এমনি দিনে ১৩১১ খৃষ্টাব্দের এক সুবেহ সাদেক। সোলো সাগরের অথৈ জলে ভাসমান সোলো দ্বীপুঞ্জে ‘সীমনুল’ দ্বীপ। কাঠের উপরে লোহার পাত বসানো একটি নৌকা ঢেউয়ের তালে নাচতে নাচতে এসে ভিড়ল সেই দ্বীপে। জাহাজ থেকে প্রথমে নামলেন একজন আরব। পরে আরও কয়েকজন তাঁর চীনদেশী সাথী। সোলো সাগরের পানিতে অজু করলেন তাঁরা। তারপর সোলো ও মিন্দানাও দ্বীপপুঞ্জের ইতিহাসে প্রথম বারের মত ধ্বনিত হলো আজানের সুর- আহ! এই সেই আজান! কিন্তুু যিনি সোলো ও মিন্দানাও দ্বীপুঞ্জের মাটিতে প্রথম আজান দিয়েছিলেন, প্রথম নামাজ পড়েছিলেন, সেই অলি আল্লাহ করিম আল-মখদুম আজ নেই। আমরা তারই অধস্তন। কিন্তু………
থামলেন আলী আল-মাখদুম। রুমালে চোখ মুছলেন তিনি। মোহমুগ্ধের মত আহমদ মুসা চেয়ে আছে তাঁর দিকে।
আবার মুখ খুললেন তিনি। তারপর গড়িয়ে গেছে কতদিন। সোলো ও মিন্দানাও দ্বীপপুঞ্জের অন্ধকার বুককে আলোকিত করে তুলল ইসলাম। মানুষকে মানুষ বানাবার সাধনায় মগ্ন হলো মুসলমানরা। আরো পরে সুমাত্রা থেকে এলেন যুবরাজ রাজাহ বরগুইবা আলী এক বিরাট নেŠবহর নিয়ে। ইসলামের শিখা উজ্জ্বলতার হলো আরও। উল্টে চললো কালের পাতা। গত হলো একশ’ উনচলিস্নশ বছর। আরব ভূমি থেকে এলেন পাদুকা মহাসরি মওলানা আস সুলতান শরিফ আল হাসমি সুলতান আবু বকর। সোলো ও মিন্দানাওয়ে মুসলিম সালতানাতের সৃষ্টি হলো তাঁর হাতেই। আইনের বিধিবদ্ধকরণ, শরিয়তী ব্যবস্থা প্রবর্তন, আরবী বর্ণমালার প্রচার ও প্রসার সাধন এবং শাসন সুবিধার জন্য আঞ্চলিক বিভাগ গঠন তার হাতেই সম্পাদিত হলো। তারপর অতি নীরবে, অপরিসীম প্রশান্তিতে এগিয়ে চলল ইসলামের অগ্রযাত্রা ছ’ শ’ বছর ধরে।
থামলেন আলী আল্ মাখদুম। ভাবনার কোন অতল রাজ্যে তিনি হারিয়ে গেছেন। আহমদ মুসা বললেন, তারপর জনাব।
-তারপর শান্তির রাজ্যে ঘটে গেল বিপর্যয়। গলায় ক্রস দুলিয়ে আর হাতে বন্দুক নিয়ে এল খৃষ্টান পর্তুগীজ ও স্পেনীয়রা। তারপরের ইতিহাস অন্যায় আর জুলুমের বিরুদ্ধে সংঘাত আর সংঘর্ষের ইতিহাস।
একটু থামলেন আলী আল্ মাখদুম। তারপর পরিপূর্ণভাবে আহমদ মুসার দিকে চেয়ে তিনি বললেন, সংগ্রামের চুড়ান্ত পর্যায়ে তোমাকে আমরা পেয়েছি বাবা আল্লাহর মহাদান হিসেবে। আমি আশা করি, আমি দোয়া করি অলি আল্লাহ করিম আল মখদুমের দেশে আবার তুমি হাসি ফুটিয়ে তুলবে।
শেষের কথাগুলো বলতে বলতে কন্ঠ ভারী হয়ে উঠল আলী আল মখদুমের। চোখ দু’টি বুজে গেল তার।
সবাই নীরব। নীরবতা ভাঙলেন আহমদ মুসা নিজে। মুর হামসারের দিকে চেয়ে বললেন, ভাবতে বিস্ময় লাগে, এত সম্পদ এত প্রাচুর্য সত্ত্বেও সোলো ও মিন্দানাওবাসীদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি।
মুর হামসার বলল, ভাগ্যের পরিবর্তন তাদের হয়েছে, তাদের অনেকের গলায় ক্রস ঝুলছে। উন্নয়নের ক্ষেত্রে আর কিছু না হোক দেশে আপনি বহু মিশনারী স্কুল ও মিশনারী হাসপাতালের সাইন বোর্ড দেখতে পাবেন। ঐসব মানুষ ধরার ফাঁদে যারা পা দিচ্ছে, তাদেরকে ফিরে পাওয়া যাচ্ছে না।
থামল মুর হামসার। আহমদ মুসা বললো, ঘৃণ্য কৌশল এটেছে ওরা। মিন্দানাওবাসীদের অন্ধকারে রেখে, অনুন্নত রেখে বিশ্ববাসীর অলক্ষ্যে তাদের হজম করে ফেলার পরিকল্পনা এটেছে ওরা।
-বিপদ শুধু একদিক থেকে নয় ভাইয়া। আমাদের অসহায়ত্বের সুযোগ গ্রহণের জন্য কমিউনিষ্ট শক্তি তৎপর হয়ে উঠেছে। আলী কাওছারের ঘটনা তাদের ষড়যন্ত্রের একটা দৃষ্টান্ত মাত্র। এছাড়া রয়েছে ‘ফিলিপাইন জাতীয়তা’ নামক সর্বগাসী ষড়যন্ত্রের আর এক বিষাক্ত থাবা। ত্রিমুখী সংগ্রাম আমাদরে সামনে।
থামল মুর হামসার। কিছু বলার জন্য আহমদ মুসা মুখ খুলেছিল। কিন্তু বলা হলো না। টেবিলের অয়ারলেস যন্ত্রে লাল সংকেত জ্বলে উঠল। একটানা বিচিত্র এক শব্দ উঠল যন্ত্র থেকে।
অয়ারলেস যন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়ল আহমদ মুসা। কানে তুলে নিল অয়ারলেস রিসিভার।
-আহমদ মুসা স্পিকিং।
ওপার থেকে একটি স্পষ্ট কন্ঠ ভেসে এলো, আমি আবদুল্লাহ জাবের।
-কি খবর বল! উৎগ্রীব কন্ঠ বলল আহমদ মুসা।
আবদুল্লাহ জাবের লিলিয়েভের ঘটনা সমস্তটা আহমদ মুসাকে জানাল, তারপর বলল, আমি বলছি, লিলিয়েভের সে চিঠি লিখে নিন জনাব।
আহমদ মুসা বাম হাতে ওয়ারলেস রিসিভার ধরে রেখে ডান হাতে প্যাড ও কলম টেনে নিল। সাইমুমের পরিচিত কোডে প্রেরীত চিঠিটি লিখে চলল সে-
চেয়ারম্যান
ক্লু-ক্লাক্স-ক্লান
দিভাও মিন্দানাও।
আমরা আপনাদের হারানো জাহাজ, রেডিয়েশন বম্ব এবং আহমদ মুসার সঠিক অবস্থানের পুর্ণ তথ্য অবগত রয়েছি। আমরা এসব তথ্য দিয়ে আপনাদের সাহায্য করতে পারি, যদি আপনারা আমাদের সাথে নিম্নলিখিত শর্তে রাজী হনঃ
এক, দক্ষিণ চীন সাগর ও সোলো উপসাগরের মধবর্তী পালওয়াং দ্বীপে সোভিয়েট নৌবহরের স্থায়ী ল্যান্ডিং সুযোগ থাকবে।
দুই, সোলো ও মিন্দানাও দ্বীপপুঞ্জে যীশুর রাজত্ব কায়েম হোক আপত্তি নাই, কিন্তু সেখানে প্রগতিশীল আন্দোলনের পথ বন্ধ করা চলবে না। দিভাও কারাগার থেকে প্রগতিশীল কর্মী চার্লস হ্যামিলটনকে অবিলম্বে ছেড়ে দিতে হবে।
তিন, উত্তর মিন্দানাওয়ের কাগায়ান বেজ সোভিয়েট ইয়ারফোর্সে মাত্র তিনদিনের জন্য ব্যবহারের অনুমতি চায়।
উপরোক্ত শর্তগুলো যদি ক্লু-ক্লাক্স-ক্লান ও তার পরিচালিত সেখানকার সরকার মেনে নেয় তাহলে আমাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য আমরা আমাদের নিজস্ব পথ অনুসরণ করব।
কাগনোয়াভিচ
চেয়ারম্যান,
সোভিয়েট ফার ইষ্ট ইনটেলিজেন্স সার্ভিস
চিঠি নোট শেষ করা হলে আহমদ মুসা বলল, লিলিয়েভ মিশনের ব্যর্থতায় সোভিয়েট ইনটেলিজেন্স আরও পাগল হয়ে উঠবে। আবার আসবে তারা দিভাওয়ে। তা আসুক। তুমি আজই চলে এসো কাগায়ানে। শরিফ সেখানে আছে। তোমাদের কাজ হবে কাগায়ান বেজের কার্যধারার প্রতি নজর রাখা। আর শোন, লিলিয়েভের ব্যাগ-ব্যাগেজ এখন তোমার ১১ নং কেবিনেই তো রয়েছে?
-হ্যাঁ।
-তাহলে, লিলিয়েভের ঐ চিঠি তুমি যেখানে পেয়েছিলে, সেখানেই রেখে দাও গিয়ে। কাল সকালে ক্লু-ক্লাক্স-ক্লান নিশ্চয় সেখানে যাবে, পরে হয়তো আসবে সোভিয়েট ইনটেলিজেন্সেরও কেউ। চিঠি যেন তারা ওখানে পায়। নিরুদ্বেগে তারা তাদের প্লান নিয়ে এগোক সামনে। থামল আহমদ মুসা। একটু থেমে আবার বলল, আর কিছু বলবে জাবের।
-লিলিয়েভকে কি করব? হেড কোয়ার্টারে পাঠিয়ে দেব?
-না, এখানে স্মার্থা আছে। সবাইকে একখানে করা ঠিক হবে না। ওকে ওখানেই আটকে রাখবে।
-আচ্ছা।
-আচ্ছা রেখে দাও।
বলে লাইন কেটে দিল মুসা। তারপর ওয়্যারলেসের কাটা ঘুরিয়ে ভিন্ন এক ওয়েভলেংথে জাম্বোয়াঙ্গোতে এহসান সাবরীর সাথে যোগাযোগ করল।
ওপার থেকে এহসান সাবরীর কন্ঠ ভেসে এল- আমি এহসান সাবরী।
-আমি আহমদ মুসা।
-আদেশ করুন জনাব।
-শুধু আদেশ করার জন্যই কি তোমাদের খোঁজ নিয়ে থাকি এহসান?
-মাফ করুন জনাব। আপনি আমাদের নেতা। আদেশ তো আপনার কাছ থেকে আমরা প্রত্যাশা করি।
-আমি যেটা দিয়ে থাকি, ওটা পথ নির্দেশনা মাত্র, আদেশ নয়। আদেশের অধিকার তো একমাত্র আল্লাহরই। ইনিল্ হুকমো ইলল্লা-লিলল্লাহ’- পড়নি?
ওপারে এহসান সাবরীর মুখ লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে। বলল সে, আপনার এ নির্দেশ আমার মনে থাকবে।
শুন এহসান, মিন্দানাওয়ে আমাদের অবস্থান ইরগুন জাই লিউমি, ক্লু-ক্লাক্স-ক্লান ও সোভিয়েট ইন্টেলিজেন্স-এর কাছে অজানা নেই। এখানে ব্যর্থ হবার পর সোভিয়েট ইন্টেলিজেন্স কাগায়ানে বেজ করে কিছু করতে যাচ্ছে। আমার মনে হয় এটা হবে ঐ ত্রিপক্ষের কোন এক যৌথ পরিকল্পনা তুমি প্রস্তুত থেকো। ওদের ওদিকে ব্যস্ততার সুযোগে আমরা জাম্বুয়াঙ্গোতে আঘাত হানব। জাম্বুয়াঙ্গো বন্দর আমাদের হাতে এলে সমগ্র সোলো সাগর ও সেলেবিস সাগরের উপর নজর রাখতে পারবো-আমাদের সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর উপকূল নিরাপদ হবে।
আর শোন, আমাদের ৫০ স্পিড বোটের সবগুলোকেই স্বল্প পাল্লার ক্ষেপনাস্ত্র সজ্জিত করা হয়ে গেছে। এর মধ্যে আমি পাঁচটিকে কাগায়ান উপসাগরে রেখে অবশিষ্টগুলোকে জাম্বুয়াঙ্গো ঘাঁটিতে পাঠিয়ে দিচ্ছি। তুমি এর মধ্যে পাঁচটি তোমার জন্য রেখে অবশিষ্টগুলো ২টি করে সবগুলো উপকূলীয় ঘাঁটিতে পৌছে দেবে। রাতের অন্ধকারে অতি গোপনে সমাধা করবে একাজ।
-কিন্তু পেট্টোলের যে ষ্টক আছে, তা তো খুব অল্প।
-সে চিন্তা আমি করেছি। লিবিয়া থেকে ওয়েল ট্যাংকার এম,ভি, সেনুসি আসছে। ওটা এসে নোঙ্গর করবে নর্থ বোর্নিওর সান্দাকান বন্দরে। সেখান থেকে ইন্দোনেশীয় কোষ্টার পিপা ভর্তি তেল নিয়ে আসবে জাম্বুয়াঙ্গো থেকে ৭৫ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে জনমানবহীন জামুন দ্বীপে। সেখান থেকে তোমাকে তেল সংগ্রহ করতে হবে। নির্দিষ্ট সময় আমি তোমাকে পরে জানাচ্ছি।
-আচ্ছা।
-আর কিছু বলার আছে?
-জি না।
-রেখে দিলাম।
অয়্যারলেস ছেড়ে দিয়ে আলী আল-মখদুমের দিকে চেয়ে আহমদ মুসা বলল, হুজুর, কষ্ট দিলাম আপনাকে, অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখেছি।
-একি বলছ বাবা, আমার ১১০ বছরের জীবনে এমন আনন্দ আমি কোনদিন পাইনি। অপরিসীম কষ্ট করছ তোমরা এ দুঃখী জাতির জন্য। আজ অমি যদি যুবক হতাম………. কান্নায় বৃদ্ধের গলা বুঁজে এলো। থামল সে। ঢোক গিলে আবার সে বলল, আজ মনে হচ্ছে, আমার কর্ম-জীবনের দীর্ঘ ৮০টি বছর বৃথাই নষ্ট করেছি করিম আল-মখদুমের মাজারে বসে তসবি টিপে আর-হা-হুতাশ করে। জালল্লাজালালুহুর তসবি টিপেছি বটে মাজারে বসে, কিন্তু তাঁর প্রতাপে তোমাদেরকে যেমন জাতির মুক্তির জন্য আজ পাগল করে তুলেছে, তেমন তো কোনদিন হয়নি আমার।
বৃদ্ধের দু’গন্ড বেয়ে অবিরাম ধারায় নামছিল অশ্রু। হৃদয়ের বেদনা যেন তাঁর চোখ দু’টি দিয়ে ঠিকরে পড়ছে। সে হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে আহমদ মুসার হাত দু’টি ধরে বলল, তোমাদের কিছু কাজ আমাকে দাও বাবা। এ বৃদ্ধ কিছু করতে না পারলেও শত্রুদের একটি বুলেট, আর কিছু সময় তো নষ্ট করতে পারবে। আর এটাই হবে আমার জীবনের পরম সঞ্চয় তাঁর কাছে।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়ে আলী আল-মখদুমকে ধীরে ধীরে বসিয়ে দিতে দিতে পরম শ্রদ্ধাভরে বললো, যুবকদের জন্য এ প্রেরণা সৃষ্টিই আপনার আজ সবচেয়ে বড় দায়িত্ব জনাব। আহমদ মুসা বলল, তারপর আজ এই রাতে এই মুহূর্তে যে প্রেরণার উষ্ণ পরশ আপনার কাছ থেকে পেলাম, তা অক্ষয় হয়ে থাকবে আমার জীবনে। আপনার অশ্রু হয়ে নেমেছে আপনার চোখে। এ অশ্রুর মূল্য অপরিসীম। এ অশ্রুর জ্বালা যুবকদের পাগল করে। আর এ পাগল যুবকরাই পারে রক্তের সাগর পিছনে ফেলে লক্ষ্যে পৌছুতে।
বয়সের ভারে পীড়িত আলী আল মাখদুম অবসন্ন হয়ে পড়েছে চেয়ারের উপর। চোখ দু’টি তাঁর মুদ্রিত।
আহমদ মুসা মুর হামসারের দিকে চাইল। মুর হামসারের অশ্রুসিক্ত চোখে শপথের দীপ্ত শিখা। ধীর স্বরে আহমদ মুসা তাকে বলল, আজকেই জেদ্দার এমপিআই (মুসলিম প্রেস ইন্টারন্যাশনাল) হেড কোয়ার্টারে একটি চিঠি লিখ। লিখ- ইরগুন জাই লিউমি’ তাদের স্বীয় স্বার্থ সংশিস্নষ্ট একটি তথ্যের বিনিময়ে সোভিয়েট ইন্টেলিজেন্সকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক জটিল মারণাস্ত্র ‘ঘুমন্ত টর্পেডো’ সম্পর্কিত গোপন তথ্য পাচার করছে। আরও বলতে হবে, এই ষড়যন্ত্রের সাথে পেন্টাগনের ইহুদী মারণাস্ত্র বিজ্ঞানীদের যোগ-সাজস রয়েছে। ব্যস এইটুকুই যথেষ্ট।
-কিন্তু এ থেকে আমরা কি বাস্তব ফল লাভ করব ভাইয়া।
-সর্বোচ্চ লাভের কথা বাদ দিলাম, সর্বনিম্ন লাভ হল, এর ফলে ইহুদী স্বার্থ ও মার্কিন স্বার্থের মধ্যে অলক্ষ্যে এক ভেদরেখার সৃষ্টি হবে। ইরগুণ জাই লিউমি ও ইহুদী বিজ্ঞানীদের উপর মার্কিন গোয়েন্দারা চোখ রাখবে যার ফলে ইরগুণ জাই লিউমির পক্ষে সোভিয়েট ইন্টেলিজেন্সকে দেয়া প্রতিশ্রুতি পালন করা কঠিন হবে।
হেসে উঠল মুর হামসার। বলল, ঠিক ভাইয়া, রেডিয়েশন বম্ব কেলেঙ্কারী হয়েছে, এবার ‘ঘুমন্ত টর্পেডো’ কেলেঙ্কারী প্রকাশ হয়ে পড়লে ইহুদী মার্কিন চীড় ধরা স্বার্থে ফাটল ষ্পষ্ট হয়ে উঠবে এবং পরিনামে তা সংঘাতে রূপান্তর লাভ করতে পারে।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। বললো, হুজুরকে শুইয়ে দেবার ব্যবস্থা কর মুর হামসার।
৭
কয়েকদিন খুবই ব্যস্ত ছিল আহমদ মুসা। মিন্দানাও, সোলো, পালওয়াং ও বাসিলান দ্বীপপুঞ্জের পিসিডার প্রশাসন ইউনিটের যে ট্রেনিং এক মাস আগে শুরু হয়েছিল, তা শেষ হয়ে গেল। ‘সুস্থ ও সফল জন-প্রশাসন ব্যবস্থা প্রশাসন কর্মীর চরিত্র ও দক্ষতার উপর নির্ভরশীল’- এরই অনুশীলন চলেছে ট্রেনিং শিবিরে। আহমদ মুসার পরিকল্পনা অনুযায়ী এই প্রশাসন কর্মীদেরকে তাদের স্ব স্ব অঞ্চলে গিয়ে ‘আইনের উৎস আইন ও আইনের ব্যবহার’ শীর্ষক শিক্ষা কোর্সে আরও ছয়মাস করে কাটাতে হবে।
ট্রেনিং কর্মিদের বিদায় দিয়ে সেদিন দুপুরে আহমদ মুসা ফিরে এলো তার কক্ষে। ক্লান্ত দেহ এলিয়ে দিল বিছানায়।
হঠাৎ টেবিলের ফুলদানির দিকে দৃষ্টি আকৃষ্ট হল তার। সঙ্গে সঙ্গে সে উঠে বসলো।
ফুলদানির ফুলগুলো অমন শুকনো কেন? মনে হচ্ছে কয়দিন থেকে ফুল বদলানো হয়নি। এতদিনের মধ্যে এমনটি তো কখনো হয়নি?
আহমদ মুসা লক্ষ্য করল, আলনার কাপড়গুলোও বেশ অগোছালো। যে কাপড় যেভাবে সে রেখেছে, সেই ভাবেই আছে। বিছানারও সেই অবস্থা। চাদর ঠিকাভাবে পাড়া নেই। একদিকে বেশী ঝুলে আছে, অন্যদিকে কম।
এই সময় রুনার মা ঘরে ঢুকল। বলল, জনাবের খাবার তৈরী। আহমদ মুসা ওদিকে কর্ণপাত না করে বলল, ফুলদানিতে শুকনা ফুল কেন রুনার মা?
-আপা মনির অসুখ তো।
-কার শিরীর?
-জি।
-কতদিন ধরে অসুখ?
-আজ চারদিন।
-কি অসুখ?
-জ্বর।
-চারদিন থেকে জ্বর? মুর হামসারকে বাইরে পাঠালাম, সেদিনও কি জ্বর ছিল।
-মুর হামসার তো আমাকে কিছু বলেনি, সে গেল কেন? এটুকু থেমে সে বলল আবার, কি ওষুধ খাচ্ছে?
-ছোট সাহেব ডিসপেনসারী থেকে ওষুধ এনে দিতে বলে গিয়েছিলেন, এনেছি।
-জ্বর কমেনি?
-না, আরও বাড়ছেই যেন?
-রুনার মা, আমাকে এ সংবাদ কেন বলনি? আহমদ মুসার কন্ঠে কঠোরতা ঝরে পড়ল।
রুনার মা ভিত হয়ে পড়ল। ধীরে ধীরে সে বলল, আপামনিও কিছু বলেনি, আমিও বুঝতে পারিনি। মাফ করবেন জনাব।
-শিরীকে কি খেতে দিচ্ছ?
-কিছুই খায় না। মাঝে মাঝে একটু আধটু গ্লুকোজ খায়।
আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি একটি স্লিপ লিখে রুনার মাকে দিয়ে বলল, এটা নিয়ে গার্ডরুমের খলিলকে দাও। সে যেন এখনি গিয়ে ব্যারাকের হসপিটাল থেকে ডাক্তার নিয়ে আসে। আর তুমি গিয়ে ওর কাছে বস। কোথাও যাবে না। রুনার মা সিস্নপ নিয়ে বেরিয়ে গেল। আহমদ মুসা অয়্যারলেসের সামনে গিয়ে বসল। দক্ষিণ মিন্দানাওয়ে মরো উপসাগরের তীরে সাহেলী ঘাঁটির সাথে যোগাযোগ করল সে। মুর হামসার ওখানেই গেছে।
