রাত নটা। দক্ষিণে কাগায়ানের পার্ললেন ধরে দ্রুত এগোচ্ছিল একজন লোক। লম্বা চওড়া। কাল স্যুট, কাল জুতা। টাইটিও একদম নিরেট কালো। লেনের আবছা অন্ধকারে লোকটিকে মনে হচ্ছে ছায়ার মতো। মাথা নীচু করে ছায়া মূর্তিটি দ্রুত এগিয়ে চলছিল মার্কোস রোডের দিকে।
আমেরিকান কাট চুল। লাল মুখ। টিপ-টপ ভদ্রলোক। ইস্ত্রির ভাঁজে কোন খুঁত নেই। এক দৃষ্টিতেই মনে হয়, একজন সম্ভ্রান্ত বিদেশী। কোন দিকে না তাকিয়ে একমনে এগিয়ে যাচ্ছে সে!
ভদ্রলোকের হাতে একটি বড় ধরনের এটাচি। পার্ললেন পার হয়ে সে গিয়ে পড়ল মার্কোস রোডে। মার্কোস রোড ধরে সে হন হন করে এগিয়ে চলল উত্তর দিকে।
উত্তর দিকে থেকে দু’টি রক্তচক্ষু তীব্র বেগে এগিয়ে আসছে। সমগ্র রাস্তা আলোকিত হয়ে উঠেছে ছুটে আসা গাড়ির হেডলাইটের উজ্জ্বল আলোতে।
ভদ্রলোকের ভ্রূদ্বয় কুঞ্চিত হলো। কিন্তু দৃঢ় পদক্ষেপে সমান তালে সে এগিয়ে চলল সামনে।
ছুটে আসা গাড়িটি পুলিশের। গাড়িটির রিয়ার লাইটের নীচে জ্বল জ্বল করছে- মিন্দানাও পুলিশ।
পুলিশের জীপটি এসে ভদ্রলোকের পাশে থেমে গেল। ক্যাঁচ করে বিশ্রি এক শব্দ উঠল।
জীপে দুজন আরোহী। একজন ড্রাইভার আর অন্যজন পুলিশ অফিসার।
পাশে জীপ থেমেছে, কিন্তু ভ্রুক্ষেপ নেই ভদ্রলোকের। চলা তার থামেনি। জীপ থেকে পুলিশ অফিসারটি নেমে পড়ল।
-এই যে। ভদ্রলোককে সম্বোধন করে ডাকল পুলিশ অফিসারটি।
ভদ্রলোক থামল। পিছনে ফিরে চাইলোও। কিন্তু দাঁড়িয়ে রইলো, এলো না।
পুলিশ তার কাছে এগিয়ে গেল। বলল, কে আপনি? তার মুখে বিরক্তির স্বর।
পরিস্কার ইংরেজীতে ভদ্রলোকটি জবাব দিল, ফিলিপাইন কনটিনেটাল ট্রেডিং এজেন্সির বিজিনেস রিপ্রেজেনটেটিভ -জেমস কার্টার।
ম্যনিলার কনটিনেনটাল ট্রেডিং এজেন্সি আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন আমেরিকান প্রতিষ্ঠান। পুলিশ অফিসারটি স্বর কিঞ্চিত নরম করে বলল, কোথায় চলেছেন?
ইয়ারপোর্ট সুপার মার্কেটের বিজিনেস ইন্টারন্যাশনাল অফিসে।
-ডোন্ট মাইন্ড, যেহেতু দায়িত্ব, তাই আপনার ব্যাগটা আমার একবার দেখতে হবে।
ব্যগটি এগিয়ে দিয়ে ভদ্রলোক বলল, বেশ, দেখুন, দেখুন।
ব্যাগ খুলে দেখল, ইলেকট্রনিকস গুডসের লিটারেচার আর ছ্যাম্পুলে ব্যাগ ভর্তি। এটা-ওটা একটু নেড়ে-চেড়ে ব্যাগটি পুলিশ অফিসার ভদ্রলোকের হাতে দিয়ে দিল।
এমন সময় আর একটি জীপ এসে দাঁড়াল। বিশাল বপু একজন অফিসার উকি দিল জীপ থেকে। জিজ্ঞেসা করল, কি ব্যাপার জেম?
জেম নামক পুলিশ অফিসারটি বুটের গোড়ালি ঠুকে কড়া একটি স্যালুট দিয়ে বলল, কনটিনেনটাল ট্রেডিং এর প্রতিনিধি যাচ্ছে সুপার মার্কেটের বিজিনেস ইন্টারন্যাশনাল অফিসে।
একটু থামল। আবার বলল, চেক করেছি, ছেড়ে দিব?
-মাথা খারাপ হয়েছে, চাকুরি খোয়াবে? কনট্রোল রুমে পৌছে দাও, ছাড়া-না ছাড়া তারাই বিচার করবে।
জীপটি চলে গেল। জিমি ভদ্রলোককে উদ্দেশ্য করে বললো, চলুন মশায়, আপনাকে কনট্রোল রুমে দিয়ে আসি।
জীপে উঠতে উঠতে ভদ্রলোকটি বলল, কিছু ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে? কি ব্যাপার মিঃ জিম?
জিম বিরক্তির স্বরে বলল, ঐ কি যেন আহমদ মুসা শহরে ঢুকেছে তাই এই সতর্কতা। দেখুন মিঃ কার্টার বড় সুখে আছেন আপনারা বিজিনেস নিয়ে. আর………..
ভদ্রলোক মিঃ কার্টার কথার মাঝখান থেকে বলে উঠল, বিজিনেস ভালো লাগে আপনার?
-লাগতেই হবে। চাকুরীর নিকুচি করি। ইম্পোর্ট লাইসেন্স করেছি কয়েকটা, কিন্তু ওর ভালো-মন্দ প্যাঁচ-পুঁচ তেমন বুঝি না।
-আসুননা একদিন বিজিনেস ইন্টারন্যাশনালে, আপনাদের জন্যই তো আমরা রয়েছি।
-ঠিক বলেছেন। যেতেই হবে একদিন। কাগজ-পত্র সব নিয়ে যাব।
মিঃ কার্টার একটু চিন্তা করে বলল, দেখুন মিঃ জিম কি বিপদে পড়লাম, আমাকে আবার ফিরতে হবে সেই হোয়াইট রোডে।
-হোয়াইট রোডে কেন?
-পাওয়ার হাউজের পিছনেই আমার বাসা। রাত দশটার মধ্যে না হলে ভীষণ অসুবিধা হবে বাসায়।
-মশায়, কনট্রোল রুমে গেলে তো ছাড়বেই না আজ রাতে আর। ভীষণ কাড়াকড়ি। কি যেন খবর এসেছে তারপর থেকে কর্তারা আহার-নিদ্রা করেননি। কে কে যেন এসেছে আরও। ইয়ারপোর্টের রেস্ট রুমে বসে শুধু শলা পরামর্শ করে যাচ্ছেন।
-তাহলে?
জিম একটু চিন্তা কের বলল, উপায় একটি করা যায়। সামনের মোড়ে আপনাকে নামিয়ে দিচ্ছি, ওখান থেকে গলি পথ ধরে লেক সার্কাসের ভিতর দিয়ে পাওয়ার হাউজের পিছনে গিয়ে উঠতে পারবেন।
-ও? মিঃ জিম। চিরকৃতজ্ঞ থাকব এর জন্য আমি।
মোড়ের উপর গাড়ী এসে পড়ল। থামল গাড়ি।
মিঃ কার্টার নেমে পড়ল গাড়ি থেকে। গাড়ি থেকে মিঃ জিম বলল, আবার দেখা হবে মিঃ কার্টার। বলে সে গাড়ি ছেড়ে দিল।
মোড়ে মার্কোস রোড থেকে দু’টি রাস্তা দু’দিকে বেরিয়ে গেছে। একটি পূর্বদিকে, অন্যটি পশ্চিম দিকে। পশ্চিমের রাস্তা ধরে পশ্চিম দিকে এগিয়ে চলল মিঃ কার্টার। মিনিট সাতেক চলার পর একটি রাস্তা পেল সে । রাস্তাটি লেক সার্কাস রোড থেকে বেরিয়ে দক্ষিণ দিকে লেক সার্কাসের অভ্যন্তরে চলে গেছে। এই রাস্তা দিয়ে লেক সার্কাসে প্রবেশ করবে কি না ভাবছিল মিঃ কার্টার। এমন সময় একজন লোককে পেয়ে গেল সে। লোকটি লেক সার্কাসের দিক থেকে আসছিল। মিঃ কার্টার তাকে জিজ্ঞেস করলো, এই রাস্তা দিয়ে কি হোয়াইট রোডে পৌছতে পারি?
লোকটি হাঁ সূচক জবাব দিয়ে চলে গেল। মিস্টার কার্টার ঐ রাস্তা দিয়ে লেক সার্কাসে প্রবেশ করলো । রাস্তাটির আবার অনেক শাখা-প্রশাখা। প্রায় মিনিট পনর চলার পর ঠিক চলেছে কি না সন্দেহ হলো মিঃ কার্টারের। সামনে আবার রাস্তাটি দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে চলে গেছে দু’দিকে।
থমকে দাড়াল মিঃ কার্টার। জন-মানবহীন পথ। পাশেই একটি বিরাট অট্রালিকা।
গানের মিষ্টি সুর ভেসে আসছে। মিঃ কার্টার উপরের দিকে চাইল। দোতালার উন্মুক্ত জানালা দিয়ে শোনা যাচ্ছে গান। পরিচিত সুর। উৎকর্ণ হলো মিঃ কার্টার, সুর স্পষ্ট হল। আলাবী বালপকীর গান।
অভিজাত খৃষ্টান এলাকার এই বাড়ী থেকে আলাবী বালপকীর আরবী গান শুনে স্তম্ভীত হলো মিঃ কার্টার। আলাবী বালপকীর গান সোলো দ্বীপপূঞ্জের মুসলমানদের প্রিয় গান। পলস্নী সংগীতের এই আলাবী বালপকীকে সেখানে আরবী সৈয়দ আল্ ফকীহ বলে মনে করা হয়। ইনি মিন্দানাও ও সোলো দ্বীপপুঞ্জের বিখ্যাত সপ্ত ভ্রাতাদের একজন। সোলোর করিম আল-মখদুমের কিছু পরে সৈয়দ আল ফকিহ সোলো দ্বীপপুঞ্জে এসেছিলেন। এই সপ্ত ভ্রাতা অর্থাৎ এই সাতজন অলি আল্লাহই আরব ভূমি থেকে ইসলামের আলো সোলো ও মিন্দানাও দ্বীপপুঞ্জে ছড়িয়ে ছিলেন । প্রায় সহস্র বছর ধরে আলাবী বালপকীর গান সোলোর গ্রাম-গ্রামান্তরে গীতে হয়ে আসছে।
কাছে কোথাও থেকে পেটা ঘড়ির আওয়াজ এলো ঢং ঢং……………।
রাত দশটা বেজে গেল। মিঃ কার্টার একবার নিজের ঘড়ির দিকে চাইল। তারপর সক্রিয় হয়ে উঠল সে।
সে গিয়ে বাড়িটির দরজায় নক করলো। একবার, দুইবার তিনবার সিঁড়ি দিয়ে কারো নেমে আসার শব্দ পাওয়া গেল। ‘কট’ করে সুইচ টেপার শব্দ হলো ভিতরে।
দরজা খুলে গেল। দরজায় দাঁড়িয়ে এক যুবতী। দেশীয় মেয়ে। দীর্ঘ কাল চুল-গলার দু’পাশ দিয়ে বুক বেয়ে কটিদেশ পর্যন্ত নেমে এসেছে।
চোখ মুখ দিয়ে বুদ্ধি যেন ঠিকরে পড়ছে। তার সাথে মিশেছে লাবন্য। এক কথায় অপরূপ মেয়েটি। তার সিণগ্ধ সৌন্দর্য চোখ ধাঁধিয়ে দেয় না, কিন্তু আপনার করে কাছে টেনে নেয়।
মেয়েটি স্পষ্ট কুন্ঠাহীন কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো, কে আপনি?
-আমি একজন বিদেশী। পথ হারিয়েছি।
-কোথা থেকে আসছেন?
-ম্যানিলা থেকে।
-যাবেন কোথায়?
-হোয়াইট রোডে?
-হোয়াইট রোডে? তাহলে এ পথে এসেছেন কেন? পার্ক রোড ধরে যাওয়া উচিত ছিল আপনার।
মিঃ কার্টার কিছু বলল না।
মেয়েটিই আবার বলল, অনেক গলি-কুচো ঘুরে আপনাকে যেতে হবে হোয়াইট রোডে। থামল একটু। বলল আবার, আপনি ভিতরে একটু বসুন। আমি সংক্ষিপ্ত স্কেচ করে দিচ্ছি।
বলে মেয়েটি ভিতরে সরে দাঁড়াল। আহমদ মিঃ কার্টার গিয়ে বসল সোফাটায়। মেয়েটি সিঁড়ি ভেঙে উপরে চলে গেল।
কক্ষটি বসার ঘর। সারিবদ্ধ সোফাসেটে সাজানো। কক্ষের দেয়ালে মিন্দানাওয়ের কয়েকটি ল্যান্ডস্কেপ। মাঝখানে বড় একটি যীশুর মূর্তি। রৌপ্যের ফ্রেমে বাঁধানো। যীশুর কয়েকটি বাণীও আছে টাঙ্গানো।
মেয়েটি ফিরে এলো। স্কেচ করা একটি কাগজ তুলে দিল মিঃ কার্টারের হাতে।
মিঃ কার্টার একবার ভালো করে চোখ বুলিয়ে ভাঁজ করে পকেটে রেখে দিল। তারপর উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে মেয়েটিকে বলল, একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি আপনাকে?
-নিশ্চয় করতে পারেন!
-আমার ধারণা সত্য হলে, আপনি খৃষ্টান। কিন্তু আলাবী বালপকীর গান আপনি জানলেন কি করে এবং অমন ক্ষমতা দিয়ে সে গান আপনি গাইতে পারলেন কি করে?
প্রশ্ন শুনে মেয়েটির চোখ মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে গেল। পরে চোখ খুলে ধীরে ধীরে মেয়েটি বলল, কেন জানবে না, কেন গাইতে পারব না, আমি কি এ মাটির মেয়ে নই?
-আমার জিজ্ঞাসা হলো, আলাবী বালপকীর মরমী সংগীত সোলোর মুসলমানদের নিজস্ব সম্পদ, কোন খৃষ্টান এটা গাইবে এটা অবিশ্বাস্য।
বেদনার একছায়া খেলে গেল মেয়েটির মুখের উপর দিয়ে। তার ফুলের পাঁপড়ির মত পাতলা ঠোট দু’টি যেন কুঞ্চিত হয়ে পড়ল কিছুটা। নতমুখী সে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে বলল, বিদেশী আপনি, আলাবী বালপকীকে চিনলেন কি করে? আর এখানকার মুসলামানদের একান্ত ঘরের এ কথা আপনি জানলেন কি করে?
-বিদেশীদের পক্ষে এসব জানাকি একান্তই অসম্ভব?
-তাহলে কি আপনি মুসলমান।
-স্বীকার করছি।
-অপরাধ স্বীকারের মত হলো কথাটা। মেয়েটির পাতলা ঠোঁটের উপর দিয়ে এক টুকরো হাসি খেলে গেল।
-মিন্দানাওয়ে মুসলমান হওয়া অপরাধ নয়, তাহলে বলবেন?
মেযেটির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সে এক দৃষ্টিতে মিঃ কার্টারের দিকে চেয়ে আছে। খুঁটে খুঁটে দেখছে তাকে। তারপর সে বাইরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে মিঃ কার্টারের মুখোমুখী দাঁড়িয়ে বলল, আপনার সত্যিকার পরিচয় কি।
-আপনি আমাকে সন্দেহ করছেন?
-হাঁ
-কারণ, ম্যানিলা থেকে কোন মুসলমান এইভাবে কাগায়ান আসতে পারে না। আপনার মত বুদ্ধিমান লোক ম্যানিলা থেকে এসে কাগায়ান পথ ভুল করতে পারে না।
মিঃ কার্টার বিস্মিত দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে চেয়ে রইল। অদ্ভুত বিশ্লেষণ শক্তি মেয়েটির। সাধারণের তালিকায় এ মেয়ে পড়ে না।
আমার পরিচয় পরে হবে, আপনার পরিচয়টা কি জানতে পারি?
-নিশ্চয়। ফিলিপাইন সিক্রেট সার্ভিসের একজন অপারেটর।
-আর আমি আহমদ মুসা।
মেয়েটি সামনে দাঁড়িয়েছিল। ভূত দেখার মত অষ্ফুট আর্তনাদ করে সে গিয়ে সামনের সোফায় বসল। দুহাতে মুখ ঢেকে বসে রইল বহুক্ষণ।
ঘড়ির দিকে চেয়ে আহমদ মুসা আঁতকে উঠল। রাত এগারটা। দ্রুত বলল সে, আমি এখন কি যেতে পারি?
-আপনার প্রশ্নে জবাব নিলেন না । মুখ তুলে বলল মেয়েটি। বিধ্বস্ত মুখ তার।
-আমি জবাব পেয়ে গেছি।
-কি জবাব পেয়েছেন?
-আলাবী বালপকীর এক ভক্ত তাঁর সমাজ থেকে দূরে সরে গিয়েও তাকে ভুলতে পারেনি।
আহমদ মুসার এই কথা মেয়েটির উপর যেন ভৌতিক ক্রিয়া করলো। সে অস্থির কন্ঠে বলে উঠল, না, না, না, বালপকীকে নয়, আমার মাকে ভুলতে পারিনি, মায়ের মুখ ভুলতে পারিনি, মায়ের গান, মায়ের কাহিনী ভুলতে পারিনি আমি। বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল মেয়েটি।
রাজ্যের মমতা নেমে এসেছে আহম মুসার চোখে। অন্তর্দ্বন্দ্বে জর্জরিত এই মেয়েটির দিকে সে চেয়ে আছে অনিমেষ চোখে। প্রকাশহীন এই বেদনায় যে মেয়েটি কতদিন থেকে নিষ্পিষ্ট হচ্ছে কে জানে? আজ প্রকাশের পথ পেয়ে প্রতিরোধের কৃত্রিম দুর্গ ভেঙ্গে পড়েছে খান খান হয়ে। প্রলোভনে পড়ে, অবস্থার চাপে কিংবা বাধ্য হয়ে সত্যের আলো থেকে দূরে সরে গিয়ে কত তরুণ-তরুণী এমনিভাবে অন্তর্বেদনায় জর্জরিত হচ্ছে, কে তার খোঁজ রাখে। ভাবতে গিয়ে আহমদ মুসার চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠল।
সে উঠে গিয়ে মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, বোন, তোমাদের এ অবস্থার জন্য দায়ী আমাদের অধঃপতিত সমাজ, পথভ্রষ্ট ধর্মনেতা আর আহাম্মক রাষ্ট্র নেতারা। থামল আহমদ মুসা।
আবার বলল, আজ যে কত আনন্দিত আমি আমাদের এক হারানো বোনকে আমরা ফিরে পেলাম।
মেয়েটি তাড়াতাড়ি উঠে আহমদ মুসার পায়ে সালাম করে উঠে দাঁড়াল। চোখ মুছে বলল, আমার আগের নাম, সাবেরা। আমি এখন থেকে সাবেরা। বলতে বলতে কান্নায় তার কথা জড়িয়ে গেল আবার।
আহমদ মুসা বলল, সাবেরা বোন আমাকে উঠতে হয়। আর দেরী করতে পারি না।
-আপনি হোয়াইট রোডে কেন যাবেন আমি জানি, কিন্তু আমি আপনাকে যেতে দেব না। ঐ পাওয়ার হাউজ আমিই উড়িয়ে দিতে পারব।
-না, বোন। তা হয় না। তুমি আজ অশান্ত, কোন এ্যাসাইনমেন্ট আমি তোমাকে দিতে পারি না আজ।
-কাগায়ান শহরের সমস্ত শক্তি আজ আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। সমগ্র ফিলিপাইন, শ্বেতাঙ্গ আর ইহুদীরা আজ কাগায়ান শহরের দিকে চেয়ে আছে। সমগ্র কাগায়ানে জাল পেতে রাখা হয়েছে আপনাকে ধরার জন্য। আমি আপনাকে কিছুতেই যেতে দেব না এখান থেকে।
আহমদ মুসা গম্ভীর কন্ঠে বলল, আমি কে জান?
-জানি, আমাদের নেতা।
-অতএব নেতার নির্দেশ অমান্য করো না।
বলে আহমদ মুসা দরজা খুলে বেরিয়ে এলো রাস্তায়। সাবেরা হাত দু’টি উপরে তুলে বলল প্রভু হে, আজ দীর্ঘ ১৪ বছর পর তোমাকে ডাকছি প্রভূ, তুমি হতভাগা এ জাতির মহান নায়ককে হেফাজত করো প্রভু।
৯
হন হন করে এগিয়ে চলেছে আহমদ মুসা। একবার হাত দিয়ে সোল্ডার হোলস্টারে সে তার প্রিয় রিভলবারটি দেখে নিল।
সাবেরার স্কেচটি এমন নিখুঁত যে, বেগ পেতে হচ্ছে না রাস্তা চিনে নিতে। মৃত পুরীর মতই অলি-গলি সব নীরব-নীর্জন। এই নীরবতার মাঝে আহমদ মুসার স্টিল সোলের জুতা বিদঘুটে শব্দ তুলছে।
আর বেশী দূর নয়। স্কেচ অনুসারে শেষ লেনের শেষ মাথা প্রায় এসে গেছে।
লেনটির মাথা জুড়েই পাওয়ার হাউজ। ৮ ফিটের মত উঁচু দেয়াল। দেয়ালের উপর দিয়ে আবার তারকাঁটার জাল। তারকাঁটার জাল যে ইলেকট্রিফায়েড তা সহজেই আঁচ করা যায়।
দেয়ালের বাইরে দিয়েও সেন্ট্রি রয়েছে।
আহমদ মুসা লেনের মুখে অন্ধকার মত জায়গায় দাড়িয়ে রইল। লেনের মুখ থেকে একজন সেন্ট্রিকে দেখা যাচ্ছে। সে হাটতে হাটতে দক্ষিণ দিকে চলে গেল। আর একজন সেন্ট্রিকেও দেখা গেল। সে রাস্তার মোড় পর্যন্ত এসে আবার পশ্চিম দিকে চলে গেল। আহমদ মুসা বুঝল নির্দিষ্ট নিয়মেই এ পেট্রোল চলছে। যখন দক্ষিণের সেন্ট্রি মোড়ে আসবে, তখন এদিকের সেন্ট্রি চলে যাবে পশ্চিমে।
আহমদ মুসা লেনের দেয়ালের পাশে ব্যাগটি রেখে দিল। তারপর পকেট থেকে একটি ছোট্ট শিশি বের করে নিয়ে তা থেকে কিঞ্চিত পরিমাণ তরল পদার্থ রুমালে ঢেলে নিল। দক্ষিণের সেন্ট্রিটি মোড়ের কাছে প্রায় এসে গেছে।
আহমদ মুসা রেডি হলো। ডান হাতে রুমাল। সেন্ট্রিটি মোড়ে এসে মুহূর্তকাল দাড়িয়ে আবার দক্ষিণ দিকে যাত্রা শুরু করল।
আহমদ মুসা পায়ের আঙুলের উপর ভর দিয়ে দ্রুত তার পিছু নিল। নাগালের মধ্যে আসতেই সে বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল তার উপর। বাম হাতে চেপে ধরল গলা, আর ডান হাতে ক্লোরোফরম ভেজান রুমাল ঠেসে ধরলো নাকে। অষ্ফুটে কয়েকবার কোঁক কোঁক করে একেবারে হাত-পা আছড়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ল।
আহমদ মুসা দ্রুত তাকে লেনের অন্ধকারে কোণে টেনে নিয়ে এলো। তারপর তার ইউনিফরম খুলে পরে নিল নিজে। ব্যাগ থেকে প্রয়োজনীয় কয়েকটা জিনিস পকেটে পুরল। এদিকে সেন্ট্রিটি মোড়ে এসে গেছে।
আহমদ মুসা অটোমেটিক রাইফেলটি কাঁধে ফেলে ক্যাপটি কপাল পর্যন্ত নামিয়ে পাওয়ার হাউজের দেয়ালের গা ঘেষে চলতে শুরু করলো।
দেয়ালটি দক্ষিণে এসে যেখানে শেষ হযেছে সেখান থেকে পুনরায় তা বেঁকে অল্প একটু গিয়ে উঁচু বারান্দায় শেষ হয়েছে। বারান্দায় এসে মিশেছে হোয়াইট রোডও। বারান্দার সিড়ির নীচে দুই প্রান্তে অটোমেটিক কার্বাইন হাতে দু’জন দাঁড়িয়ে আছে। দক্ষিণ দিকে হোয়াইট রোডের অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। কিছু দূরে দু’টি জীপ দাড়িয়ে আছে। জীপের রং দেখে মনে হচ্ছে আর্মির।
আহমদ মুসা ফুলস্কেপ সাইজের একটি প্রিন্টেড কাগজ বের করে হাতে নিয়ে দ্রুত দৃঢ় পদক্ষেপে বারান্দার সিঁড়ির দিকে এগিয়ে চলল। মনে হচ্ছে যেন জরুরী কোন কাগজ সে অফিসের ডিইটি অফিসারকে দিতে যাচ্ছে । অটোমেটিক কারবাইন হাতে দাড়ানো পুলিশ দু’জন তাকে দেখে নড়ে উঠল। কিন্তু আহমদ মুসা কাগজটি উঁচু করে অফিসের দিকে ইংগিত করে সিঁড়ি ভেঙে দ্রুত বারান্দা অতিক্রম করে অফিসে ঢুকে গেল। সে যে রুমে প্রবেশ করলো, তা একটি হলঘর। হল ঘরে কোন লোক নেই। হল ঘরের পরেই আর একটি রুম। চেয়ার টেবিল পাতা। ডিউটি অফিসার চেয়ারে বসে ঢুলছিল। আহমদ মুসা ঘরে প্রবেশ করেই দরজা বন্ধ করে দিল। শব্দ পেয়ে ডিউটি অফিসার একটু নড়ে চড়ে বসল। চোখ দু’টিও তার খুলে গেল। উদ্যত রিভলভার হাতে একজন অপরিচিত পুলিশকে তার সামনে দাঁড়ানো দেখে সে হকচকিয়ে উঠল। বসে থেকে আপনা হতেই একান্ত অনুগত্যের মত হাত দু’টি উপরে তুলল।
আহমদ মুসা বলল, হাত উপরে তোলা নয় ইঞ্জিন রুমের চাবি দাও। কোন চালাকি করো না। মাথার খুলি উড়িয়ে দেব।
লোকটি কাঁপতে কাঁপতে ড্রয়ার থেকে চাবি নিয়ে ফেলে দিল টেবিলের উপর। আহমদ মুসা দ্রুত টেবিল থেকে চাবি কুড়িয়ে নিল। তারপর রিভলভার উচু করে চাপ দিল ট্রিগারে। একরাশ ধোয়া বেরিয়ে গেল নল দিয়ে। লোকটি জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল চেয়ারের উপর। তারপর চেয়ার থেকে মেঝেতে।
আহমদ মুসা দ্রুত চাবি নিয়ে ভিতরে ঢুকে গেল। ভিতরের উঠান বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সাজ সরঞ্জামে ভর্তি। উত্তর-পশ্চিম কোণে ইঞ্জিন কক্ষ। ভীষণ শব্দে ইঞ্জিন চলছে। আহমদ মুসা দ্রুত সেদিকে অগ্রসর হলো। ওদিক থেকে দু’জন লোক অফিস ঘরের দিকে আসছিল। ওরা তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী। পুলিশকে ওভাবে দ্রুত ইঞ্জিন রুমের দিকে যেতে দেখে তারা বিস্মিত কন্ঠে বলল, কি হয়েছে স্যার?
-কিছু হয়নি, তবু ইঞ্জিন রুমটা একটু চেক করে আসি। তোমরা এখানে একটু দাঁড়াও।
লোক দু’জন আহমদ মুসার ইংরেজী কথা শুনে মনে করল, নিশ্চয় উপর থেকে পাঠানো হয়েছে। তারা আহমদ মুসার নির্দেশ মত ঠায় দাঁড়িয়ে রইল।
আহমদ মুসা দ্রুত গিয়ে ইঞ্জিন রুমে ঢুকে পড়ল। তারপর কাজে লেগে গেল সে।
পকেট থেকে সে ডিম্বাকৃতি একটি বস্তু অতি সন্তর্পনে বের করে নিল। সৌদি অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরীতে তৈরী অত্যাধুনিক ডিনামাইট এটি। এর জন্য পৃথক কোন ফিউজের দরকার হয় না এবং আগুনেরও প্রয়োজন হয় না কোন। এ ডিম্বাকৃতি ডিনামাইটের শীর্ষদেশে চ্যাপটা ধরনের সেফটি পিন রয়েছে। পিনটি খুলে নিলেই এর ভিতরের ক্ষুদ্র অটোমেটিক রিয়্যাকটরে বিষ্ফোরণ ঘটে যায় এবং তা থেকে উৎপাদিত তাপ ক্রমে ক্রমে এমন এক পয়েন্টে উন্নতি হয় যখন গোটা ডিনামাইটটিই ফেটে পড়ে প্রচন্ড বিষ্ফোরণে। এর ধ্বংসকারী ক্ষমতা ভীষণ। প্রায় তিনশ’ বর্গগজ পরিমিত স্থানের সবকিছুকে এটা ধুলায় পরিণত করতে পারে।
আহমদ মুসা সন্তর্পণে সেফটি পিন খুলে নিয়ে অতি সাবধানে তা রেখে দিল মূল ইঞ্জিনের অভ্যন্তরে নির্ভৃত এক কোণে। চট করে কারোরই তা নজরে পড়বে না।
আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি ইঞ্জিন রুম থেকে বেরিয়ে এলো। গেটে তালা লাগিয়ে চাবি ছুড়ে ফেলে দিল পাশের স্তুপিকৃত লোহা-লক্কড়ের মধ্যে। নিরাপদে ডিনামাইটটি পাততে পেরে আনন্দে গুনগুনিয়ে উঠেছিল আহমদ মুসার মন। কিন্তু গুনগুনানি তার থেমে গেল যখন দেখল যাদেরকে সে দাঁড়াতে বলে গিয়েছিল তারা সেখানেই নেই। ধক করে উঠল তাঁর মন। ওদেরকে অমন করে মায়া দেখানো তার ঠিক হয়নি। শত্রুকে পিছনে ফেলে রেখে যাওয়াটা মারাত্মক ভুল হয়েছে তার।
দ্রুত সে ডিউটি রুমের দিকে পা বাড়াল। ডিউটি অফিসার তেমনভাবে পড়ে আছে তার চেয়ারের পাশে। কিন্তু বাইরের দিকের যে দরজা আহমদ মুাসা বন্ধ করে গিয়েছিল, তা খোলা। আর বাম পাশের সংযোগ কক্ষের খোলা দরজা বন্ধ। সন্দেহের এক শীতল স্রোত বয়ে গেল তার দেহে। শির শির করে উঠল তার মেরুদন্ডদেশ। সে তাহলে ট্রাপে পড়েছে?
বাইরের খোলা দরজার দিকে দ্রুত এগোল সে। কিন্তু দরজায় পা দিয়েই দেখতে পেল, কয়েকজন দ্রুত সিড়ি বেয়ে উঠে আসছে। হাতে উদ্যত সাব মেশিন গান।
রিভলভার এক্ষেত্রে অকেজো দেখে আহমদ মুসা দ্রুত বাম হাত দিয়ে প্যান্টের বাম পকেট থেকে স্মোক বম্ব বের করে নিল। বিদ্যুৎ গতিতে তার বাম হাত উপরে উঠল। কিন্তু বম্ব ছুড়তে সে পারল না। একেবারে পেছনে পদশব্দ শুনে সে তড়াক করে পেছনে ফিরল। কিন্তু দেরী হয়ে গেছে তখন। প্রচন্ড এক আঘাত নেমে এলো তার মাথায়। জ্ঞান হারিয়ে আহমদ মুসা লুটিয়ে পড়লো মেঝেতে।
সবাই এসে ঘিরে ধরল তাকে। তাদের মধ্যে থেকে লেফটেন্যান্টের প্রতীক আটা একজন অন্য একজন অন্য একজনকে লক্ষ্য করে বলে উঠল, আলবার্ট তুমি এখনি গিয়ে স্যারকে খবর দাও। জীপ নিয়ে যাও।
একটা কড়া স্যালুট দিয়ে আলবার্ট নামক লোকটি ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি ভেঙ্গে দ্রুত জীপ লক্ষ্যে এগিয়ে গেল।
