গভীর রাত। প্যাসেফিক শিপিং লাইনের একটি জাহাজ এসে নোঙ্গর ফেলল সেই দ্বীপে। আহমদ মুসা ও আবদুল্লাহ হাত্তাকে এনে হাত-পা বেধে ঢুকিয়ে দেয়া হল সেই জাহাজের অন্ধকার সেলে। এরপরই জাহাজ নোঙ্গর তুলল। ভারত মহাসাগরের পানি কেটে কেটে সে জাহাজ এগিয়ে চলল ফিলিপাইনের মিন্দানাও দ্বীপের দিকে।
০৩. মিন্দানাওয়ের বন্দী
ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে চোখ খুলল আহমদ মুসা। হাত-পা নাড়তে গিয়ে একটুও পারল না। কঠিন ভাবে বাঁধা। মনে পড়ল তার, দু’জন লোক এসে প্রথমে আবদুল্লাহ হাত্তাকে একটি ইনজেকশন দিল, তারপর তাকেও একটি। তারপর কি ঘটেছে কিছুই জানে না সে। পাশ ফিরে শুতে চেষ্টা করল আহমদ মুসা। পাশ ফিরতে গিয়ে কান মেঝেতে ঠেকার সাথে সাথে একটি গুম গুম আওয়াজ তার কানে এল। কান পেতে শুনল সে। কয়েক মুহূর্ত শুনেই বুঝতে পারল, শক্তিশালী কোন ইঞ্জিনের শব্দ। পরক্ষণেই আহমদ মুসা অনুভব করল মেঝেটাও যেন মৃদু কাঁপছে। আহমদ মুসার সমস্ত ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠল-তাহলে সে কোন পানি জাহাজে? কোথাও পাচার করা হচ্ছে তাকে?
অনেক কষ্টে আহমদ মুসা উঠে বসল। পেট পিঠের সাথে লেগে গেছে। ক্ষুধায় জ্বলছে সারাটা পেট। একটু সরে বসতে গিয়ে হঠাৎ পায়ে কি যেন ঠেকল। সাথে ভারী কণ্ঠের একটি প্রশ্ন-কে?
-হাত্তা ভাই আপনি? উল্লোসিত কণ্ঠ আহমদ মুসার।
-একি, মুসা ভাই এখানেও আপনি আমার সাথে?
-সাথেই তো ছিলাম।
-কিন্তু এতো ভালো লক্ষণ নয়?
-কেন?
-আমি তো এগিয়ে চলেছি মৃত্যুর দিকে। আমি আপনাকে সাথী করে নিতে পারি না।
আহমদ মুসা এগিয়ে গেল হাত্তার দিকে। তার বাঁধা দুটি হাত হাত্তার হাত দুটিকে খুঁজে নিল। শান্ত গম্ভীর কণ্ঠে বলল সে, হতাশ হয়েছেন হাত্তা ভাই? কিন্তু জীবন মৃত্যুর ফায়সালা তো এভাবে জমিনে হয়না।
-আমি জানি, এ ফয়সালা আসে আসমান থেকে। কিন্তু আমার মন যেন বলছে এ কথা।
মুহূর্তের জন্য থামল হাত্তা। তারপর বলল আবার, তুমি জানো না মুসা ভাই, দীর্ঘ পনের বছরের বিনিদ্র প্রচেষ্টা আজ ওদের সফল হয়েছে।
আহমদ মুসা চিন্তা করছিল। বলল, যতটা চিনেছি ওরা সেই কুখ্যাত ক্লু-ক্লাক্স-ক্ল্যান। কিন্তু এ শ্বেত-সন্ত্রাসবাদীরা মিন্দানাও-এ কেন?
-এখানে সে শ্বেত-সন্ত্রাস এবং খৃস্টান স্বার্থ এক হয়ে গেছে।
-কি রকম?
খৃস্টান ক্রসের প্রচারে সহায়তা দানের জন্য মিন্দানাও ও সোলো দ্বীপপুঞ্জে শ্বেত সন্ত্রাস ক্লু-ক্লাক্স-ক্ল্যান আজ এক সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে।
মুহূর্ত খানেক থেমে আবার শুরু করল আবদুল্লা হাত্তা। জর্জ বানার্ডশ’র সেই বিখ্যাত উক্তিটি আপনি নিশ্চয় জানেন যে, ‘‘পশ্চিমারা যখন কোন দেশ দখল করতে চায়, তখন সেখানে তারা খৃস্ট ধর্মের বার্তা নিযে মিশনারী পাঠায়। স্থানীয় অধিবাসীদের দ্বারা মিশনারী নিহত হয়। এরপর খৃস্টধর্ম রক্ষার বাহানা তুলে পশ্চিমী দেশগুলো সেখানে সসৈন্যে ছুটে যায় এবং স্বর্গের এক মহাদান হিসাবে দেশটি জয় করে নেয়।’’ ঠিক এমনিই ঘটেছে মিন্দানাও ও সোলোদ্বীপপুঞ্জে। স্পেনের ক্যাথলিক উপনিবেশিকরা সেখানে কি করেছে সে দীর্ঘ ইতিহাস বাদ দিলাম। সাম্প্রতিক কালের কথাই শুনুন। আজ থেকে বিশ বছর আগে দক্ষিণ মিন্দানাও- এর জাম্বুয়াঙ্গোতে একদল খৃস্টান মিশনারী উপস্থিত হলো। তাদের নিরাপত্তার জন্য অতি নিকটে মরো উপসাগরের কূলে নোঙ্গর করা থাকল সজ্জিত বিরাট এক রনপোত। জাহাজ থেকে মিশনারীর যখন নামত, তাদরে কোমরে ঝুলানো থাকত লম্বা চোঙওয়ালা রিভলভার। হাতে থাকত বই, বিস্কুট, সুন্দর সুন্দর সিট কাপড়। তারা জাম্বুয়াঙ্গোতে একটি বাইবেল শিক্ষার স্কুল খুলল। প্রতিদিন সন্ধায় সেখানে নাচ গানের অনুষ্ঠান ও ছবি দেখানো হতো। স্বর্ণাভ চুলের শেতাংগ তরুণীরা সেখানে নাচ গান করত। অনেকদিনের চেষ্টার পর তারা জাম্বুয়াঙ্গোর আফানি গোত্রের সর্দার শরিফ আফানিকে হাত করল। তারপর শুরু হলো জোর করে লোকদের বাইবেল স্কুলে ভর্তি, বাধ্যতামূলকভাবে ইংরেজী শিক্ষা ও লোকদের নাম পরিবর্তনের পালা। জাম্বুয়াঙ্গোর হুজুর মাখদুম (ওস্তাদ) জাফর আলী মিশনারীদের এ আচরণের তীব্র প্রতিবাদ করলেন। সেই দিন রাতেই মাখদুম জাফর আলী জাম্বুয়াঙ্গোর মসজিদে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হলেন। পরদিন আফানি গোত্রের ক্রুদ্ধ লোকেরা হত্যা করল তাদের গোত্র প্রধান শরিফ আফানিকে এবং সেই সাথে পুড়িয়ে দিল বাইবেল স্কুল। তারা উপকূল থেকে তীর বৃষ্টি করল মিশনারী রনপোতের দিকে। তীরের জবাবে জাহাজ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে এল মেশিন গানের গুলী। এরপর জাহাজ থেকে কামানের গোলাবর্ষণ করে জাম্বুয়াঙ্গোর আফানি জনপদ মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হলো। আফানিরা উপকূল থেকে অভ্যন্তর ভাগে পালিয়ে এলো।
এই ঘটনার পর থেকে শুরু হল গুপ্ত হত্যার হিড়িক। মিন্দানাও এর চারদিকে উপকূল সংলগ্ন স্থানে মিশনারী সাইনবোর্ডের আড়ালে প্রায় ২০টির মত শ্বেতাংগ ঘাটি প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। শক্তির ছত্রছায়ায় ওগুলো টিকে আছে। ঐখান থেকেই দেশের অভ্যন্তরে গুপ্ত হত্যা চালানো হচ্ছে। এ পর্যন্ত ২৯৮ জন বিখ্যাত মখদুম (ওস্তাদ বা মওলানা) নিহত হয়েছেন এবং এক হাজারেরও বেশী মুর যুবক প্রাণ দিয়েছে তাদের হাতে।
কথার মাঝখানে আহমদ মুসা বলে উঠল, কি ভয়ংকর কথা। চলছে এটা এখনও হাত্তা?
-চলছে, তবে বাধাবন্ধনহীনভাবে নয়। আজ থেকে পনের বছর আগে আমরা এর মোকাবিলার জন্য প্যাসেফিক ক্রিসেন্ট ডিফেন্স আর্মি (পিসিডিা) নামে এক গুপ্ত সৈন্যদলের সৃষ্টি করেছি। এ পর্যন্ত আমরা ওদের প্রায় ১০০ জন এজেন্ট ধরেছি। দেশের অভ্যন্তরে ওদের কাজ অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। কিন্তু ওদের ঘাটির বিরুদ্ধে আমরা কিছুই করতে পারছি না। খুবই মজবুত ঘাঁটি ওদের। ইলেকট্রিক তারে ঘেরা, আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত। স্বল্প পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রও সেখানে রয়েছে। ছোট ছোট হেলিকপ্টারও নামে ঘাঁটিতে।
-কেন? মোকাবিলার মত আধুনিক অস্ত্র পিসিডার নেই? বলল আহমদ মুসা।
-অস্ত্র এবং ট্রেনিং দুইয়েরই অভাব। অবশ্য ইন্দোনেশিয়ার জ্ঞাতি ভাইদের কাছ থেকে কিছু কিছু আধুনিক অস্ত্র আমরা পাচ্ছি, কিন্তু তা পরিমাণে ও মানে কোন দিক দিয়েই যথেষ্ট নয়। তবু পিসিডা আজ এইটুকু করতে পেরেছে যে, পিসিডার চোখ এড়িয়ে ওদের এজেন্টরা আর অবাধ বিচরণ করতে পারছে না। কিন্তু…..
আহমদ মুসা কথার মাঝখান থেকে বলে উঠলো, যে এজেন্টরা ধরা পড়েছে তাদের কি পরিচয় তোমরা জেনেছ হাত্তা ভাই?
-ক্লু-ক্লাক্স-ক্লান। ওদের প্রত্যেকের ট্রাওজার ব্যান্ডে সাদা সাপ, সাপের মুখে লাল রঙের তিনটি সি (ট্রিপলসি) দেখা গেছে। একটু থেমে আবদুল্লাহহ হাত্তা আবার বলল, যে কথা বলছিলাম। নতুন এক বিপদ দেখা দিয়েছে। ভয়ংকর সে বিপদ। প্রায় দু’মাস আগে পশ্চিম মিন্দানাও-এর সোলো সাগর উপকূলের ‘নান্দিওনা’ নামক জায়গায় প্রায় দু’শ’ মুর (মিন্দানা ও সোলো দ্বীপপুঞ্জের মুসলমানরা মুর নামে অভিহিত) মুক্তা সংগ্রহে রত ছিল। পরে দু’ শ’ জনের সকলকেই উপকূল ভূমিতে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। তাদের দেহের রঙ হয়েছিল লালচে নীল। মিন্দানাওয়ের ডাক্তার কবিরাজদের কেউই এ মৃত্যুর কারণ বলতে পারেনি। এর দু’ মাস পরে রাজধানী শহর দাভাও থেকে ৩০ মাইল দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত দাভাও উপসাগর তীরবর্তী ‘লানাডেল’ নামক মূর জনপদ একইভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। ঘটনার আগের দিন সন্ধায় ‘লানাডেল’ থেকে আসা একজন পিসিডা কর্মী বলেছে, সেদিন সন্ধায় সে দু’টি শ্বেতাংগ স্পিড বোর্টকে লানাডেলের দিকে যেতে দেখেছে। আমাদের স্থির বিশ্বাস, কোন রোগ বা নৈসর্গিক কোন ঘটনা এ মৃত্যুর কারণ নয়, নিশ্চয় ট্রিপল সি’র কোন চক্রান্ত এটা। এই দুই ঘটনার পর মিন্দানাও ও সোলো দ্বীপপুঞ্জের মানুষ উদ্বেগ-আতংকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছে।
স্বপ্নাবিষ্টের মত শুনছিল আহমদ মুসা। আবদুল্লাহহ হাত্তা থামলে সে যেন স্বপ্ন থেকে জেগে উঠল। ধীর কণ্ঠে বলল, সেখানকার ঘাস ও গাছ পালার অবস্থা কেমন ছিল হাত্তা ভাই?
-ওগুলো পিতাভ রঙ ধারণ করেছিল। কিন্তু কোন লোকেরই প্রাণ ছিল না।
কথাটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে আহমদ মুসার চোখ দুটি বিস্ফরিত হয়ে উঠল, কপালটা হয়ে পড়ল কুঞ্চিত। মুখ থেকে এক যন্ত্রণাদায়ক শব্দ বেরুল-উঃ?
-কি হলো মুসা ভাই? ত্রস্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল হাত্তা।
-এমন ভয়ংকর কথা কানে শুনব তার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না হাত্তা।
-কেন, তুমি কিছু বুঝেছ?
-আমার ধারণা যদি সত্য হয়, তাহলে ওটা মারাত্মক ধরণের পারমাণবিক রেডিয়েশনের ফল।
তোমার ধারণা সত্য মুসা ভাই। আমি এর সূত্র সন্ধানে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইরান, মিশর এবং সর্বশেষে লিবিয়া হয়ে বাড়ি ফিরছিলাম। দেশগুলোর আণবিক বিশেষজ্ঞদের সকলেই একমত যে, এটা মারাত্মক ধরণের রেডিয়েশনের ফল। কিন্তু তাঁরা এর প্রতিরোধের কোন পথ বাতলে দিতে পারেনি, কিংবা আন্তর্জাতিক ফোরামে এর প্রতিবিধানমূলক কোন ব্যবস্থা করতেও তারা রাজনৈতিক কারণে ভয় করেছেন। থামল আবদুল্লাহহ হাত্তা।
আহমদ মুসাও ভাবনার অতল গহবরে ডুবেছিল। কথা বলতে পারল না সেও।
নিঃশব্দ রাত্রির জমাট অন্ধকারে দু’জনই নীরব। কথা বলল প্রথমে আহমদ মুসা।
-এখন কি ভাবছ তাহলে?
-সবাই ত্যাগ করলেও আল্লাহ তো আমাদের ত্যাগ করেননি আমাদের যা আছে, তাই দিয়ে আমরা প্রতিরোধ করব, যদি সফল না হই, তাহলে আমরা মৃত্যুকে বরণ করে নেব। কিন্তু তবু আমরা ক্রুসের খৃস্টবাদের কাছে মাথা নত করবো না।
থামল আবদুল্লাহ হাত্তা। বোধ হয় একটা ঢোক গিলে নিল সে। আবার বলতে শুরু করল, কিন্তু সে সুযোগ হয়ত আমি আর পাব না মুসা ভাই। বলতে বলতে কণ্ঠ তার ভারি হয়ে উঠল। বলতে শুরু করল সে আবার, ভয়ংকর রেডিয়েশনের সংবাদও হয়ত আমি আমার জাতিকে জানাবার সুযোগ পাব না। তারা হয়ত অমনিভাবে নিরুপায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে থাকবে। কান্নায় বুঁজে এল তার কথা।
-ভবিষ্যতের সবকিছুই আমাদের অজানা। আমরা হতাশ হব কেন হাত্তা। শান্তনার শান্তস্বর আহমদ মুসার কণ্ঠে। আবদুল্লাহ হাত্তা নীরব রইল। পরে ধীর কন্ঠে সে ডাকল, মুসা ভাই?
– বল।
-আমাদের উভয়ের এই সাক্ষাতের মূলে বোধ হয় আল্লাহর এক বিরাট ইচ্ছা কাজ করেছে।
-হয়তো হবে, হাত্তা।
আবদুল্লাহ হাত্তা একটু থেমে বলল, আমার দায়িত্ব আমি তোমার কাঁধে তুলে দিয়ে যেতে চাই।
এমন করে কথা বলো না হাত্তা, জীবন মৃত্যুর যিনি মালিক তিনিই সব কিছু করেন। আমি বলছি, সব কাজেই তুমি আমাকে পাশে পাবে।
আবদুল্লাহ হাত্তা একটু হাসলো। কান্নার মত করুণ সে হাসি। বলল সে, সে সৌভাগ্য আমার হলে দুনিয়ার মধ্যে আমিই হতাম সবচেয়ে সুখী ব্যক্তি। যাক সে কথা। এখন কয়েকটি কাজের কথা শুন। আমার যতদূর বিশ্বাস আমার ও তোমার অপরাধ একরূপ নয়। জাহাজ থেকে নেমে আসার পর ওদের কথোপকথন থেকে যা বুঝেছি, তাতে মনে হয় ট্রিপল সি’ তাদের নিজের ইচ্ছায় তোমাকে আটকায়নি। অন্য কোন এক পক্ষের ইচ্ছা ও অনুরোধ পূরণ করছে মাত্র। সুতরাং তুমি যেটুকু সময় হাতে পাবে, তা আমি পাব না বলে মনে হয়। যদি না পাই, তাহলে, মনে রেখ, পিসিডার গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আমার পরে যিনি পিসিডার নেতা হবেন তার কোড নাম হবে ‘রুড থানডার’ সংক্ষেপে ‘রুথ’। পিসিডার কাছে তোমার পরিচয় হবে ‘রুথ’। পিসিডার সহকারী প্রধান যিনি রয়েছেন, তার নাম মুর হামসার। কোড ‘ব্রাইট ফ্লাস’ সংক্ষেপে ‘বাফ’।
এই সময় বাইরে থেকে ঠক ঠক আওয়াজ ভেসে এলো। ভারি বুট পায়ে যেন কেউ আসছে। আবদুল্লাহ হাত্তার কথা মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে গেল। দু’জনেই কান পেতে রইল। পদশব্দটি তাদের অতি নিকটে এসে থামলো। মনে হলো দরজার বাইরে কেউ এসে দাঁড়াল। পরমুহূর্তেই চাবি খোলার আওয়াজ পাওয়া গেল। আবদুল্লাহ হাত্তা চঞ্চল হয়ে উঠল। বলল, মুসা ভাই? কেউ যেন আসছে। শুন, মনে রেখ, মিন্দানাও-এর ‘আপো পর্বত’ হবে তোমার গন্তব্যস্থল।
আবদুল্লাহ হাত্তার কথার রেশ বাতাসে মিলিয়ে যাবার পূর্বেই তারেদ সামনে খুলে গেল একটি দরজা।
একটি টর্চের আলো এসে তাদের উপর পড়ল। টর্চধারী দীর্ঘাঙ্গ লোকটি উক্তি করল, ‘ও’ তাহলে জেগে উঠা হয়েছে?
পরিস্কার ইংরেজী কণ্ঠ। উচ্চারণে আমেরিকান ধরন আহমদ মুসার দৃষ্টি এড়ালো না।
টর্চের আলো আবদুল্লাহ হাত্তার মুখে এসে স্থির হলো।
দীর্ঘাঙ্গ কালমূর্তিটি মুখটি ফিরিয়ে কাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘রবার্ট বি কুইক।’
সঙ্গে সঙ্গে রবার্ট নামক বিশাল বপু একজন লোক এসে ঘরে ঢুকল এবং আবদুল্লাহ হাত্তাকে পাঁজা কোলা করে তুলে নিয়ে বেরিয়ে গেল।
আহমদ মুসা রুদ্ধ নিঃশ্বাসে অপেক্ষা করছিল, এবার হয়তো তার পালা আসবে। কিন্তু এলো না। আবদুল্লাহ হাত্তাকে বের করে নিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে টর্চের আলো নিভে গেল। দরজা বন্ধেরও শব্দ শুনল। দরজা বন্ধের শব্দে ছ্যাঁৎ করে উঠলো আহমদ মুসার হৃদয়। কিছু বলার জন্য মনটা তাঁর উস-খুস করে উঠল, কিন্তু সে সুযোগ পেল না।
আবার সেই নিঃসীম ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে গেল ঘরটি। চোখ বুঁজে পড়ে থাকল আহমদ মুসা। হাত্তার জন্য মনের কোথায় যেন এ তীক্ষ্ণ বেদনা চিন চিন করে উঠছে তার। কোথায় নিয়ে গেল তাকে? এই ট্রিপল সি’র মত নৃশংস, রক্তপিপাসু, বর্বর কোন সংগঠন ভূ-পৃষ্ঠের কোথাও রয়েছে কি না সন্দেহ। এরা সভ্য সমাজের শিক্ষিত নরপশু। কিন্তু কি করবে আহমেদ মুসা। টর্চের আলোয় যতটা বুঝা গেছে ঘরটির দেওয়ালগুলো ইস্পাতের তৈরী। নিশ্চয় জাহাজের খোলের ভিতরের কোন বন্দীশালা এটি।
হাত-পা’র বাঁধনের জায়গাগুলো বেদনায় টন টন করছে। বাঁধা হাত মুখের কাছে তুলে নিয়ে দাঁত দিয়ে বাঁধন পরীক্ষা করল সে। পল্লাষ্টিকের কর্ড দিয়ে বাঁধা।
হঠাৎ আহমদ মুসার মনে পড়ল তার জুতার গোড়ালির খোপে ল্যাসার বিম টর্চ রয়েছে। ওটা ব্যবহার করে সহজেই এ বাঁধন থেকে মুক্ত হতে পারে, ঘর থেকেও সে বেরিয়ে যাবার ব্যবস্থা করতে পারে। কিন্তু না, এত তাড়াতাড়ি এটা করা ঠিক হবে না। আগে এদের বুঝতে হবে, জাহাজ এখন কোথায় এবং কোথায় যাচ্ছে তা জানতে হবে। তাছাড়া আবদুল্লাহ হাত্তার কথা যদি সত্য হয়, তাহলে তাকে জানতে হবে ‘ট্রিপল সি’ কার ইচ্ছে বা কার অনুরোধে তাকে এভাবে বন্দী করছে? তাকে নিয়ে এখন কি পরিকল্পনা এদের?
এখন দিন না রাত? জাহাজের এ খোলে বিশেষ করে এ অন্ধ কুঠরিতে দিন-রাত্রি সবই সমান। অন্ধকার এ জগতে সময়েরও কোন হিসেব নেই। হাতের ঘড়ি ওরা খুলে নিয়েছে। হাত দিয়ে পরখ করে দেখল, ডান হাতের অনামিকার আংটিটি ঠিক আছে। খুশী হল আহমদ মুসার মন।
