আহমদ মুসা প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের পেছনে বাগানের একটা গাছের অন্ধকারে এসে বসল। পেছনের প্রাচীর টপকে আহমদ মুসা এখানে প্রবেশ করেছে। প্রাচীরের ওপারের তিনজন প্রহরী তাকে ধরে ফেলেছিল, যেন তারা তার জন্যেই অপেক্ষা করছিল। তবে তাদের সামলাতে গুলীর ব্যবহার করতে হয়নি। কারাত চালিয়েই তাদের কয়েক ঘণ্টার জন্যে ঘুম পাড়ানো গেছে।
আহমদ মুসা তোয়া নগরীর স্যাটেলাইট ফটোর উপর পেন্সিল টর্সের আলো ফেলে আবার তার উপর চোখ বুলাতে লাগল।
প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ ঘিরে যে সিকিউরিটি জোন, তার মধ্যে পেছনে এই দিকটাই নিরাপদ, নিঃর্ঝঞ্চাট। অতএব বন্দীরা এদিকেই থাকা স্বাভাবিক। আহমদ মুসা এদিকটাই বেছে নিয়েছে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে প্রবেশের জন্যে।
আহমদ মুসা প্রেসিডেন্ট প্রসাদের স্যাটেলাইট ফটোর উপর আবার নজর বুলাতে লাগল। পেছনের দিকে নিরাপত্তার বাড়তি ব্যবস্থা হিসেবে ছোট একটা গার্ড ব্যারাক রয়েছে। ব্যারাকের পর তিন-চার গজের একটা ফাঁকা জায়গা। তারপর কাঁটাতারের বেড়া। বেড়ার পর প্রাসাদের দেয়াল।
দেয়ালের জানালাগুলোর ওপর চোখ বুলাচ্ছিল আহমদ মুসা।
আকস্মিক একটা টর্চের তীব্র আলোতে সে আলোকিত হয়ে ওঠল।
চমকে ওঠে আহমদ মুসা উপর দিকে তাকানোর বদলে আলোর বাইরে দাঁড়ানো ছায়ামূর্তির হাঁটু লক্ষ্যে মাথা সামনে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। লোকটির হাঁটুতে আহমদ মুসার মাথা প্রচন্ড শক্তিতে আঘাত হানল।
আঘাত লোকটির জন্যে অভাবিত ও আকস্মিক ছিল। সে হুমড়ি খেয়ে পড়ল উপুড় হয়ে আহমদ মুসার ওপর। সাথে সাথে টর্চের আলোও নিভে গিয়েছিল।
সে পড়ে গিয়ে স্থির হওয়ার আগেই আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়ে অন্ধকারেই তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। লোকটি ওঠার চেষ্টা করছিল। আহমদ মুসা তাকে সামলানোর জন্যে সময়ক্ষেপণ করতে চাইল না। লোকটির নাগাল পেয়েই আহমদ মুসা লোকটির কানের নিচের জায়গাটায় তার ডান হাতের দু’টি মোক্ষম কারাত চালাল। লোকটি কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলল।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়ে গার্ড ব্যারাকের দিকে এগোলো। এ গার্ডের খোঁজে অন্যেরাও এদিকে আসতে পারে। গাছের অন্ধকার থেকে বেরোনোর পর মাটিতে শুয়ে পড়ে দেহটা গুটিয়ে নিয়ে গড়িয়ে চলল গার্ড রুমের দিকে।
গার্ড রুমের সম্মুখটা প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের দিকে। পেছনে তিনটি পর্যবেক্ষণ জানালা। জানালাগুলো দেয়ালের লেভেলে বাইরে বেরিয়ে আসা। এর তিন দিকে তিনটি জানালা।
মাঝখানের জানালার নিচে গিয়ে উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা। তাকালো ঘরের ভেতরে।
ছয়-সাতজন গার্ড বসে চা খাচ্ছে। সবার সামনেই একটি করে ষ্টেনগান।
একজন বলল, জনাথনের চা তো ঠান্ডা হয়ে গেল। এখনও আসছে না কেন। বাইরেটা একটু দেখতে পাঠানো হলো, কি হলো তার।
অন্য একজন বলল, তোমরা তাড়াতাড়ি চা-খাওয়া শেষ করো। আজকের রাতটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। হুকুম এসেছে, পাহারায় যেন সামান্য গাফিলতিও না হয়। ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলে, সোজা গুলী করার হুকুম এসেছে। তোমরা তাড়াতাড়ি করো।
ঘর থেকে বের হওয়ার একমাত্র দরজা পশ্চিম দিকে। ওদেরকে ঘরে আটকাতে হবে, নয়তো শেষ করতে হবে। ওরা বেরিয়ে এলে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে ঢোকার আগেই আরেক ঝামেলায় পড়তে হবে।
আহমদ মুসা দ্রুত গুড়ি মেরে দৌড়ে গার্ড ব্যারাকের সামনে গিয়ে পৌছল। বারান্দার সিঁড়ি ভেঙে দ্রুত গিয়ে দরজার মাঝখানে দাঁড়াল।
ভেতরে সাত জনের একবারে প্রান্তের জন আহমদ মুসাকে দরজায় এসে দাঁড়াতে দেখেই সে দ্রুত দরজার আড়ালে সরে গিয়েছিল। আহমদ মুসার তা নজর এড়ায়নি।
সে দরজার আড়াল নিয়ে এগোচ্ছিল আহমদ মুসার দিকে।
আহমদ মুসা তার ‘ব্ল্যাক ক্যানন’ সামনের লোকদের দিকে তাক করে এক ধাপ সামনে এগিয়েই চোখের পলকে রিভলবার বাঁ দিকে ঘুরিয়ে ট্রিগার টিপেই রিভলবারের নল সামনে নিয়ে এল।
‘ব্ল্যাক ক্যানন’ গুলী করার পর একটুও শব্দ হলো না।
সাথীকে গুলী খেয়ে পড়ে যেতে দেখে ওরা পাগলের মত ষ্টেনগানগুলো পাশ থেকে তুলে নিয়ে আহমদ মুসার দিকে ঘুরতে গেল।
আহমদ মুসার নীরব কামান ‘ব্ল্যাক ক্যানন’ নীরবে গুলী বৃষ্টি করে সবার ওপর দিয়ে ঘুরে এল।
আহমদ মুসার দু’চোখ সবার ওপর দিয়ে ঘুরে এসে নিশ্চিত হয়ে দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে এল।
বারান্দা থেকে নিচে মাটিতে ঝাপিয়ে পড়ে দেহটা গুটিয়ে দেহকে দ্রুত গড়িয়ে নিয়ে কাঁটাতারের বেড়ার পাশে গিয়ে স্থির হলো।
তারপর শুয়ে থেকেই জুতার গোড়ালি খুলে ভেতর থেকে রকেটাকৃতির ক্ষুদ্র ‘গামা বিমার’ (গামা রে’ উৎক্ষেপক) বের করল।
আহমদ মুসা বুঝেছে, কাঁটাতারের বেড়া বিদ্যুতায়িত করে রাখা হয়েছে। সে দেখতে পাচ্ছে তার কয়েক ধাপ পেছনে, কাঁটাতারের বেড়ার সাথে একটা বাদুড় পাখি আটকে আছে। সম্ভবত বাদুড়টা নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় বেড়ার বিদ্যুৎ তাকে টেনে নিয়েছে। আহমদ মুসা জানে ইদানিং বেড়ার বিদ্যুৎ প্রবাহটা বেশ শক্তিশালী ও আকর্ষণযোগ্য কিছু বেড়ার কাছাকাছি হলেই তাকে টেনে নেয় ধ্বংস করার জন্যে।
আহমদ মুসা গামা বিমার টর্চ হাতে নিয়ে ফায়ার লকটি অন করে বেড়ার সবচেয়ে নিচের তারটিকে লক্ষ্য করে গামা বিমারের লাল বোতামটি অন করে দিল। চোখের পলকে তারটি কেটে গেল, বিদ্যুৎ সামান্য স্পার্ক করার সুযোগ পেল না। এর উপরের তারটিও সে একইভাবে কেটে ফেলল। দু’ফুট উচ্চতা পরিমাণ ফাঁকা জায়গা তাতে সৃষ্টি হলো। এরপর আহমদ মুসা গড়িয়ে দু’আড়াই গজ পরিমাণ পেছনে গিয়ে কাঁটাতার দু’টির এ পাশটাও কেটে দিল। তার দু’টি মাটিতে পড়ে গেল।
আহমদ মুসা কাঁটাতারের খন্ড দুটি সরিয়ে দু’ফুট উঁচু এবং সাত ফুটের দীর্ঘ স্পেস দিয়ে খুব সহজে গড়িয়ে ভেতরে ঢুকে গেল।
ভেতরে ঢোকার পর শুয়ে থেকেই অপেক্ষা করতে লাগল।
কাঁটাতার কাটার সময় বিদ্যুৎ তরঙ্গে বিপরীত ওয়েভ সৃষ্টি হওয়া কিংবা তার কেটে পড়ার পর দুটি বিদ্যুৎ ওয়েভে যে ছেদ পড়েছে তার একটা প্রতিক্রিয়া কনট্রোল রুমের রাডারে স্পন্দিত হতে পারে। সেক্ষেত্রে তারা এখনি ছুটে আসবে, এখানে।
আসলও তারা।
আহমদ মুসা তাদের জন্যেই অপেক্ষা করছিল, কিন্তু সে তা টের পেল না।
তারা এল আহমদ মুসার দিক থেকে।
তারা এসে যখন আহমদ মুসার দিকে ষ্টেনগান তাক করে চিৎকার করে ওঠল, শুয়োরের বাচচা হাত তুলে উঠে দাঁড়া। তোর খেলা শেষ। যথেষ্ট ভুগিয়েছিস আমাদের।
আহমদ মুসা মাথার ওপর হাত রেখে উঠে দাঁড়াল। যেন সে মাথার পেছন দিকটা ধরে আছে।
ওরা তিনজন।
একজনের হাতে উদ্যত ষ্টেনগান। অন্য দু’জনের হাতে রিভলবার। আহমদ মুসা হাত তুলে উঠে দাঁড়ানোর পর তারা রিভলবার নামিয়ে নিয়েছে।
রিভলবারধারী একজন, তাকে বেরিয়ে আসতে বলল। আমরা কষ্ট করে ওখানে যাব কেন?
ষ্টেনগানধারী তার ষ্টেনগানের নল নেড়ে ইশারা করে বলতে লাগল বেরিয়ে এস।
আহমদ মুসার নজর ছিল লোকটার ষ্টেনগানের নলের দিকে। যে মুহূর্তেই ইশারা করতে গিয়ে ষ্টেনগানের নল নড়েছে। সে মুহূর্তেই আহমদ মুসার ডান হাত মাথা থেকে কয়েক ইঞ্চি নিচে গিয়ে জ্যাকেটের গোপন পকেটে তার ‘ব্ল্যাক ক্যানন’-এর বাট ধরে চোখের পলকে তা ঘুরিয়ে এনে গুরী করল ষ্টেনগানধারীকে।
রিভলবারধারী দু’জন আহমদ মুসাকে গুলী করার জন্য তাদের রিভলবার তুলছিল দ্রুত।
ষ্টেনগানধারীকে গুলী করার পর আহমদ মুসা তার অটোমেটিক ‘ব্ল্যাক ক্যানন’-এর ট্রিগার থেকে তার তর্জনী তুলল না। শুধু ‘ব্ল্যাক ক্যানন’- এর নিঃশব্দ গুলীর ঝাঁক তাদের ঘিরে ফেলে।
ষ্টেনগানধারীর মত তারাও আতংকগ্রস্ত চোখ ও ঝাঁঝরা বুক নিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
আহমদ মুসা সেদিকে আর না তাকিয়ে পেছন ফিরে দৌড় দিল প্রাসাদের দিকে।
আশেপাশেও প্রহরী আছে। আহমদ মুসা তাদের নজরে পড়লে তারাও ছুটে আসবে।
একটা জানালার নিচে গিয়ে দাঁড়াল আহমদ মুসা। স্যাটেলাইট ফটোতে আগেই দেখেছিল এদিকের জানালাগুলো লোহার গরাদে ঢাকা। গরাদের পর আবার কি আছে বলা মুষ্কিল। তবে পাশ্চাত্যের নিয়ম হলো, জরুরি অবস্থা বা সিকিউরিটির অবস্থা বিবেচনা করে গরাদের পেছনে আর কিছু প্রতিবন্ধক রাখে না, যাতে জরুরি অবস্থায় বেরোনো যায়। তাই গরাদ ব্যবস্থাপনা ও গরাদকে তারা যথেষ্ট মজবুত করে।
এ জানালার গরাদ মনে হলো তার চেয়েও মজবুত। গরাদের ইস্পাত প্রায় দুই ইঞ্চি। কামানও এ গরাদের কিছু করতে পারবে না।
কিন্তু আহমদ মুসার কামান নয়, আছে ‘গামা বিমার’। কামানের চেয়েও শক্তিশালী। এর শক্তিশালী অতি বেগুনি রশ্মি এসব ইস্পাতকে নিমিষে টুকরো টুকরো করে ফেলতে পারে।
গামা বিমারটা হাতে নিল আহমদ মুসা।
মনোযোগ দিল গরাদের দিকে।
কিন্তু পরক্ষণেই ভাবল, ভেতরে প্রবেশ করার জন্য আর একটু ভেবে নেয়া দরকার। ঢুকে সে কোন দিকে যাবে! কোন দিকে এমিলিয়াদের পাওয়া যেতে পারে।
একথা ভেবে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের স্যাটেলাইট ফটোগ্রাফটি আবার বের করল। পাশের দেয়াল ও ছাদের গঠনের ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বুলাল। কিন্তু ছাদের লে-আউটে কোন পার্থক্য নেই। একই রকম গোটা ছাদটা। নিখুঁতভাবে দেখতে গিয়ে সব শেষে ছাদের পূর্ব দিকে দক্ষিণ পূর্ব কোণ থেকে কয়েকগজ উত্তরে ছাদের ওপর একটা ঢাকনা দেখতে পেল। এ রকম ঢাকনা গোটা ছাদের আর কোথাও নেই। ঢাকনা কি ঢেকে রেখেছে? আহমদ মুসা খুব ভালো করে দেখল, ঢাকনাটা আড়াই তিনফুটের কম নয়। আর ঢাকনাটা পূর্ব দেয়ালের সাথে লাগোয়া। এর অর্থ একটাই। সেটা হলো ঢাকনাটা একটা সিড়িমুখের ওপর। ভেতর থেকে সিঁড়ি সাধারণত দেয়াল অবলম্বন করেই ওঠে এবং বিপরীত দিকের আরেকটা দেয়ালেই সাধারণত এর শীর্ষটা স্থাপিত হয়। সুতরাং সিঁড়িমুখেই ঢাকনাটা স্থাপিত হয়েছে।
কিন্তু সিঁড়িটা এখানে কেন? সিকিউরিটি জোনে এই সিঁড়ির কারণ কি? এর অর্থ কি এটাই যে সিকিউরিটি জোনের কেন্দ্রবিন্দু এটা? জরুরি অবস্থায় ছাদ যাতে ব্যবহার করা যায়, এজন্যেই এই সিঁড়ির ব্যবস্থা। তাহলে এই এলাকারই কোথাও এমিলিয়া ও খতিব মহোদয়কে বন্দী করে রাখা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তে পৌছার পর আহমদ মুসা জানালার গরাদের দিকে এগোলো।
পকেট থেকে বের করে হাতে নিল ‘গামা রে’ বিমার’।
জানালা কাঁধ পরিমাণ উঁচু।
হাত যতটা উপরে তোলা যায় তুলে আহমদ মুসা জানালার ২ বর্গফুটের মত জায়গা ‘গামা রে বিমার’ দিয়ে কেটে ফেলল।
কাটা খন্ডটা বাইরে ফেলে দিয়ে লাফ দিয়ে জানালার ওপর উঠে নিচের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে জানালার ওপর রাখা দেহের ভর রেখে দেহের পেছনটা নিচে নামিয়ে দিল।
নিঃশব্দে নেমে গের সে একটা অন্ধকার ঘরের মেঝেয়।
জানালার কাটা অংশ দিয়ে বাইরের আলো এসে পড়েছে ঘরের একাংশে। তাদের ঘরের অন্য অংশের অন্ধকারও ফিঁকে হয়ে গেছে।
ঘরটা একটা বেড রুম। ঘরে চারটি বেড পাতা। কিন্তু কোন বেডেই কেউ নেই।
আহমদ মুসা একটা বেডের পাশে গিয়ে একটা হাত রেখে তাপ পরীক্ষা করল। বেডটা গরম নয়, আবার ঠান্ডাও নয়। তার মানে পনের বিশ মিনিট আগেও এখানে লোক শুয়ে ছিল। গেল কোথায় তারা? এরা নিশ্চয় গার্ড ছিল, বেডের চেহারা দেখে তাই মনে হয়। গার্ডরা রাতে এক সাথে উঠে গেছে কেন? কোন খবর পেয়ে তাদের সবাইকে কি ডিউটিতে ডাকা হয়েছে? তাহলে তার আসার খবর এরা পেয়েছে? হঠাৎ আহমদ মুসার মনে পড়ল ব্যারাকের গার্ডদের কথোপকথনের কথা। তাদেরকেও প্রহরা জোরদার করতে বলা হয়েছিল আহমদ মুসার আরও মনে পড়ল, বাউন্ডারী ওয়ালের বাইরের গার্ডরাও তারই অপেক্ষা করছিল। সব মিলিয়ে তার মনে হলো, সব কিচু মোকাবিলার জন্যে তারা প্রস্তুত রয়েছে।
আহমদ মুসা ঘরের দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে এল। বেরিয়ে এল একটা করিডোরে। তার দু’পাশেই ঘরের সারি। সবগুলোই বন্ধ। সবগুলোকেই গার্ড রুম বলে মনে হলো।
আহমদ মুসা করিডোরের পশ্চিম দিকে এগিয়ে আরেকটা অপেক্ষাকৃত প্রশস্ত করিডোরে এসে পড়ল।
ফটোতে দেখা সিঁড়িঘরটা আরেকটু উত্তরে হবে। আহমদ মুসা তাই প্রশস্ত করিডোরটি ধরে উত্তর দিকে এগোতে লাগল।
কোথাও একজন লোক, কিংবা কোন দিকে কোন সাড়াশব্দও সে পাচ্ছে না। সবাই কি প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের সামনে গিয়ে মোতায়েন হয়েছে?
প্রশস্ত করিডোরটি বড় একটা ঘরের দরজায় গিয়ে শেষ হলো। কিন্তু প্রশস্ত করিডোর থেকে অপেক্ষাকৃত সরু দু’টি করিডোর দু’পাশে বড় ঘরটির ধার ঘেঁষে এগিয়ে গেল। মনে হলো করিডোর দু’টি ঘরটিকে বেষ্টন করে তৈরি। বাইরে থেকেই ঘরটিকে গোলাকার মনে হলো।
এ ঘরটাতেই কি সেই সিঁড়ি। দূরত্বের বিচারে তাই মনে হয়।
ঘরে প্রবেশ করল আহমদ মুসা।
হ্যাঁ, এই ঘরেই সেই সিঁড়িটি।
আহমদ মুসা তাকাল ঘরের চারদিকে।
তার অনুমান ঠিক, ঘরের চারদিক ঘিরেই করিডোর। ঘরের চারদিকের দরজা সাত-আটটির মত হবে। সবগুলোই হা করে খোলা। কোন দরজাই বন্ধ বা হাফ বন্ধ নেই।
হঠাৎ আহমদ মুসার মনে হলো এটা পরিকল্পিত। তাকে ফাঁদে ফেলা হয়েছে।
আহমদ মুসার এই চিন্তা শেষ হওয়ার আগেই একটা ভারী কণ্ঠ উচ্চারিত হলো। বলল, ‘আহমদ মুসা তুমি ঠিকই ভেবেছ। তুমি আমাদের ফাঁদে পড়েছ। আটটি ষ্টেনগান তোমাকে ঘিরে আছে।’
থামল কণ্ঠটি।
কণ্ঠটি থামার সাথে সাথেই আট দরজা দিয়ে আটটি উদ্যত ষ্টেনগান তার দিকে এগিয়ে আসছে।
কয়েক মুহূর্ত।
আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে উদ্যত আটজন ষ্টেনগানধারী আহমদ মুসাকে ঘিরে বৃত্তের সৃষ্টি করে দাঁড়াল। বৃত্তের একটা প্রশস্ত মুখ কিন্তু থাকল। মুখটা উত্তরের প্রশস্ত দরজা বরাবর।
চারদিকে ঘেরা ৮টি উদ্যত ষ্টেনগানের মুখে ‘ব্ল্যাক ক্যানন’ দিয়ে আক্রমণে যাওয়া মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার সমতুল্য। আহমদ মুসা তার রিভলবার নামিয়ে নিল।
উত্তরের প্রশস্ত দরজা পথে রাজসিকভাবে হেঁটে একজন প্রবেশ করল ঘরে। আহমদ মুসা তাকে খুব ভাল করে চিনে। সে হলো ইসরাইলের নিরাপত্তা ও কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ‘সিনবেথ’-এর প্রধান জেনারেল শামিল এরফান।
দরজায় থাকতেই সে চিৎকার করে ওঠল আহমদ মুসা তোমাকে এবার আমাদের মত করে হাতে পেয়েছি। প্রথম দর্শনেই তোমাকে গুলী করে মারার কথা, কিন্তু কয়েকটা কথা না বলে পারছি না। তুমি ইসরাইলের যে ক্ষতি করেছ, ইতিহাসে সেরকম ক্ষতি আর কেউ করতে পারেনি। তুমি আমাদের পিতৃভূমি আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছ। এখন আবার পিতৃভূমি উদ্ধার বা প্রতিশোধের একটা অবলম্বন মানে এমিলিয়া ও খতিব আব্দুল্লাহকে কেড়ে নিয়ে যেতে এসেছ। সে আশা তোমার সফল হবে না একথা বলার জন্যেই তোমাকে এই কয়েক মুহূর্ত বাঁচিয়ে রেখেছি। আহমদ মুসা, আমি কৃতজ্ঞ আমাদের দক্ষ গোয়েন্দা অফিসার নিনা নাদিয়ার প্রতি। তুমি তার উপকার করেছিলে, তোমাকে মুক্ত করে সেও তোমার উপকারের বিনিময় হিসেবে। কিন্তু দেশপ্রেমিক নিনা নাদিয়া তুমি যে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে আসছ, এ খবর দিয়ে তোমাকে ধরার ক্ষেত্রে অমূল্য সাহায্য করেছে।
বলতে বলতে সে আহমদ মুসার সামনে এসে দাঁড়াল। আহমদ মুসার হাত থেকে তার ‘ব্ল্যাক ক্যানন’ রিভলবারটা কেড়ে নিয়ে দরজা দিয়ে বাইরের দিকে ছুঁড়ে দিল।
রিভলবারটি ছুঁড়ে দেয়ার পরপরই দরজার ওপারে পাথরের মেঝেয় একটা খট খট শব্দ ওঠল। শব্দটা আহমদ মুসার চোখ দু’টিকে যেন টেনে নিয়ে গেল ঐ দরজা দিয়ে ঘরের বাইরে। দেখল, নিনা নাদিয়া আহমদ মুসার রিভলবারটা তুলে নিচ্ছে।
রিভলবার তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল নিনা নাদিয়া। আহমদ মুসা তখনও তার চোখ ফিরিয়ে নেয়নি। চোখাচোখি হয়ে গেল আহমদ মুসার সাথে। আহমদ মুসা নিনা নাদিয়ার চোখে গভীর এক বিস্ময়-মোহিত দৃষ্টি দেখতে পেল। মুখটা তার ভারী, জেনারেল শামিল এরফানের কাছে নিনা নাদিয়ার যে কথা শুনল, তার সাথে নাদিয়ার এই চেহারা মেলে না।
জেনারেল শামিল এরফানের গর্জনে আহমদ মুসা তার চোখ ফিরিয়ে নিল।
জেনারেল শামিল এরফান বলছিল, আহমদ মুসা রেডি হও। মৃত্যু তোমার সামনে।
জেনারেল এরফানের রিভলবার তাক করা আহমদ মুসার দিকে।
তার তর্জনি তার রিভলবারের ট্রিগারে।
খুব আনন্দ হচ্ছে আহমদ মুসা কতদিন ধরে আমি এই ক্ষণটির জন্য অপেক্ষা করছি। তুমি আল্লাহর নাম নাও। আমি তিন পর্যন্ত গুণব। ‘তিন’ শব্দটিই তোমার জীবনের অন্তিম মুহূর্ত ঘোষণা করবে।
এক…. দুই……….. করে গোণা শুরু করল জেনারেল শামিল এরফান।
‘দুই’ বলার পর ‘তি…..’ উচ্চারণের সাথে সাথে একটা গুলীর শব্দ হলো। উপস্থিত গার্ডদের সবার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল আহমদ মুসার দিকে। তারা দেখতে চেয়েছিল গুলী খেয়ে আহমদ মুসার লুটিয়ে পড়ার দৃশ্য। কিন্তু তার বদলে চিৎকার শুনল জেনারেল শামিল এরফানের। গার্ডদের সবার দৃষ্টি ফিরে গেল জেনারেল শামিল এরফানের দিকে।
অন্যদিকে আহমদ মুসা গুলীর শব্দ লক্ষ্যে তাকিয়ে ছিল উত্তরের দরজা দিয়ে বাইরে। দেখল নিনা নাদিয়ার ডান হাতের রিভলবার তখনও জেনারেল শামিল এরফানের দিকে তাক করা। তার রিভলবারের নল থেকে বেরোনো বিস্ফোরণের ধোঁয়া তখনও শেষ হয়ে যায়নি।
আহমদ মুসা নিনা নাদিয়ার দিকে তাকাতেই সে তার বাম হাতের রিভলবার ছুঁড়ে দিল আহমদ মুসার দিকে।
আহমদ মুসা রিভলবারটি হাতে পেয়েই নিজের দেহের পেছনটা মাটিতে ছুঁড়ে দিয়েই ট্রিগার টিপে রেখেই তা ঘুরিয়ে নিল গার্ডদের আটজনের বৃত্তের ওপর দিয়ে। ‘ব্ল্যাক ক্যানন’-এর গুলী বৃষ্টি সবাইকে লাশ করে মাটিতে শুইয়ে দিল।
পলকের মধ্যেই যেন ঘটনাটা ঘটে গেল।
গার্ডরা গুলীর শব্দে প্রথমে তাকিয়ে ছিল আহমদ মুসার দিকে, তারপর চিৎকার শুনে তাকিয়ে ছিল জেনারেল শামিল এরফানের দিকে। এই যে সময় নিয়েছে গার্ডরা, এরই সুযোগ গ্রহণ করল আহমদ মুসা। নিনা নাদিয়ার ছুঁড়ে দেয়া রিভলবার যখন পেল, সেটা গার্ডদের নজরেও পড়েছিল। কিন্তু তখন তারা অপ্রস্তুত। তারা কিছু করার আগেই আহমদ মুসর ‘ব্ল্যাক ক্যানন’-এর তারা শিকার হয়েছে।
গুলী করা শেষ করেই আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়েছে।
নিনা নাদিয়া ছুটে এসেছে দরজার কাছে। বলল, আসুন, এমিলিয়ারা এদিকে বন্দী আছে।
বলেই নিনা নাদিয়া ছুটল উত্তর দিকে। বৃত্তাকার করিডোর ক্রস করে ছুটছে সে উত্তরমুখী আরেকটা করিডোর ধরে।
আহমদ মুসা ছুটে গিয়ে নিনা নাদিয়ার পাশাপাশি দৌড়াতে লাগল। দৌড়াতে দৌড়াতে বলল, ধন্যবাদ মিস নিনা নাদিয়া আমার জীবন বাঁচানোর জন্যে।
কোন উত্তর দিল না নিনা নাদিয়া।
আহমদ মুসা তাকাল তার মুখের দিকে। দেখল, তার চোখে অশ্রু, মুখ ভারী।
আহমদ মুসা কিছু বলতে যাচ্ছিল।
থমকে দাঁড়াল নিনা নাদিয়া। বলল, ফিস ফিস করে, আমরা এসে গেছি। সামনে যে দরজা, তার পরে একটা ঘর, গার্ড রুম। গার্ড রুমের পরে আরেকটা দরজা। দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলে একটা বড় হল ঘর। হল ঘরটাতে অনেকগুলো কেবিন। প্রত্যেকটা কেবিনের তিন দিকে দেয়াল, একদিকে মোটা গ্রীলের দেয়াল। তাতেই দরজা।
একটু থেমেই আবার বলে উঠল, সামনে এই যে পুরু ষ্টিলের দরজা, তা ভেতর থেকেই শুধু খোলা যায়। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দরজার স্পিকারে কথা বলতে হবে।
ভেতর থেকে ফটোও দেখবে, কথাও শুনবে। মানুষ ও তার কথা তাদের তালিকার সাথে মিললে তবেই তারা দরজা খুলবে। তালিকার সাথে না মিললে সংগে সংগে তারা এটা জানিয়ে দেবে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের নিরাপত্তা হেডকোয়ার্টারে। তাছাড়া এই দরজায় গোপন ‘বুলেট-হোল’ রয়েছে। এই বুলেট-হোল ব্যবহার করে তারা আক্রমণেও আসতে পারে।
সব শুনে আহমদ মুসা একটু ভাবল। তারপর দরজাটায় তীক্ষ্ণ নজর বুলাল। চৌকাঠের উপরের দেয়াল এবং দরজার ঠিক উপরের ছাদের দিকে সন্ধানী নজর বুলাল। কিন্তু দরজার উপরের ছাদ ও দরজার উপরের দেয়ালে সন্দেহ করার মত সামান্য কিছুও পেল না। তাহলে দেয়ালের গায়ে সেট করা স্পিকার অথবা দরজা সংলগ্ন উপরের দেয়ালের নিচের প্রান্তের কোথাও সার্কিট ক্যামেরার চোখ কি সেট করা আছে।
চিন্তা করেই আহমদ মুসা মাটিতে বসে করিডোরের দুই পাশ দিয়ে গুটি গুটি হেঁটে দরজার মাটি সংলগ্ন কোণায় বসে দরজার উপরের মাথা সংলগ্ন দেয়ালের বটম প্রান্ত দু’পাশ থেকে পরীক্ষা করল। না, সেখানেও সন্দেহজনক কিছু নেই।
আহমদ মুসা নিশ্চিত হলো স্পিকারের সাথেই ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার চোখ সেট করা আছে।
এই উপসংহারে পৌছেই আহমদ মুসা পকেটে ‘গামা রে বিমার’ বের করে হাতে নিয়ে গড়িয়ে দরজার কাছে চলে এল, যাতে ক্যামেরার চোখের বাইরে দিয়ে সে দরজার গোড়ায় পৌছতে পারে।
দরজার গোড়ায় পৌছে আহমদ মুসা দরজার গা ঘেঁষে উঠে দাঁড়াতে লাগল। স্পিকার যে লেবেলে, তার ফুট খানেক নিচে পৌছে হাত ওপরে তুলে স্পিকার হোল টার্গেটে ‘গামা রে বিমার’-এর বোতাম টিপে দিল।
মুহূর্তেই হাওয়া হয়ে গেল স্পিকারের অস্তিত্ব।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
দরজার উপর-নিচ বরাবর ভার্টিক্যাল দুই ধার আহমদ মুসা পরীক্ষা করতে লাগল কোথায় লক আছে তার সন্ধানে। আহমদ মুসা দেখল দরজাটির ষ্টিলের পাল্লা ডান দিকের দেয়ালের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু দরজা কভার করার পর বাম দিকের দেয়ালের ভেতরে ঢুকে যায়নি। তার মানে লকের মাধ্যমে দেয়ালের সাথে দরজা আটকে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। লক একাধিক থাকতে পারে।
কিন্তু লকের কোন চিহ্ন আহমদ মুসা দরজার গায়ে দেখতে পেল না। লককে বাইরে থেকে দৃশ্যমান করা হয়নি, সেজন্য বাইরে লক খোলার ব্যবস্থা নেই।
কিন্তু লকের অস্তিত্ব তো বের করতেই হবে। আহমদ মুসা আবার বাম দিকে দরজা ও দেয়ালের সংযোগ স্থানটা পরীক্ষা করল। কিন্তু লকের অস্তিত্ব বের করতে পারলো না। দেয়াল ও দরজার পাল্লার মধ্যেকার ফাঁকটা এতই সুক্ষ্ণ যে চোখের দৃষ্টি তার মধ্যে প্রবেশ করে না।
আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকাল নিনা নাদিয়ার দিকে। বলল, আমি করিডোরের এদিককার কয়েকটা বাল্ব নিভিয়ে দিতে চাই। আমার মনে হচ্ছে করিডোরটাকে অন্ধকার করলে দরজার লক বা লকগুলোর সন্ধান পাওয়া যাবে।
নিনা নাদিয়া গম্ভীর মুখে সপ্রশংস দৃষ্টিতে আহমদ মুসার দরজা খোলার চেষ্টাকে দেখছিল। চোখের অশ্রু এখন শুকিয়ে গেছে। কিন্তু মুঝের থমথমে গাম্ভীর্যটা যায়নি।
আপনি নেভাতে পারেন, আমার আপত্তি নেই। আহমদ মুসার প্রশ্নের জবাবে বলল নিনা নাদিয়া।
সংগে সংগেই আহমদ মুসা তার হাতের ‘ব্ল্যাক ক্যানন’-এর নল উপরে তুলে একে একে চারটি বাল্বে গুলী করে গুঁড়ো করে দিল। করিডোরের এ প্রান্তটা বেশ অন্ধকারে ছেয়ে গেল।
আহমদ মুসা দ্রুত এগোলো দরজার বাম দিকের প্রান্তের দিকে।
দেয়াল ও দরজার ফাঁকের দিকে তাকাতেই আহমদ মুসা খুশি হয়ে উঠল। ফাঁক বরাবর সুক্ষ্ম আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে। আলোর ভার্টিক্যাল রেখার দুই জায়গায় সে ছেদ দেখতে পেল, উপরের দিকে এক জায়গায় এবং নিচের দিকের এক জায়গায়।
নিনা নাদিয়া পাশে এসে দাঁড়িয়ে ছিল।
মিস নিনা নাদিয়া দরজার দুই জায়গায় লক আছে। লকগুলোর ব্যাসও দেড় ইঞ্চির মত হবে।
একটু থামল আহমদ মুসা। একটু ভাবল। বলল, মিস নাদিয়া, আমি লকগুলো কাটতে যাচ্ছি। আমি যতটুকু অনুমান করছি, তাতে লকগুলো কাটার সাথে সাথেই দরজা ডান দিকের দেয়ালে ঢুকে যাবে।
ঠিক সেই মুহূর্তে ওদের গুলীও ছুটে আসতে পারে। সুতরাং আমাদের সাবধান থাকতে হবে। বলল নিনা নাদিয়া। আগের চেয়ে অনেকখানি সহজ কণ্ঠ তার।
ধন্যবাদ মিস নাদিয়া। আপনাকে করিডোরের ডান পাশ ঘেঁষে দরজার কাছাকাছি জায়গায় শুয়ে পড়তে হবে। নিচের লকটা কাটার পর আমিও শুয়ে পড়ব। প্লিজ আপনি ওপাশে যান। বলল আহমদ মুসা।
তার মানে ওদের আক্রমণের প্রথম শিকার আপনি হতে চান। কারণ দরজা খুলতে শুরু করার সাথে সাথে ওদের আক্রমণ এ প্রান্ত দিয়েই শুরু হবে। আমার ও প্রান্ত থেকে ওদেরও আক্রমণ হবে না, দরজার ব্লক থাকায় আমিও শুরুতে কিছু করতে পারবো না। আমিও বরং এ পাশেই থাকি। বলল নিনা নাদিয়া।
প্লিজ মিস নাদিয়া, দু’জন শুরুতেই এক সাথে বিপদে পড়া যৌক্তিক নয়। আপনি প্রাথমিক টার্গেটের বাইরে থাকলে ওদের বিরুদ্ধে আক্রমণে আসা আপনার জন্য সহজ হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমাদের দিক থেকে আক্রমণের সুযোগ দুই প্রান্ত থেকেই থাকা দরকার। বলল আহমদ মুসা।
নিনা নাদিয়া তাকাল আহমদ মুসার দিকে। আহমদ মুসার কথাগুলো এত কোমল এতটাই হৃদয়-নিসৃত যে, নিনা নাদিয়ার হৃদয়-মনকে তা নিমিষেই দখল করে ফেলল। নিনা নাদিয়া মুগ্ধ দৃষ্টিতে একবার তাকানো ছাড়া আর কিছুই বলতে পারল না।
নির্দেশ পালন করল নিনা নাদিয়া।
আহমদ মুসা ‘গামা রে বিমার’ দিয়ে দ্রুত লক কাটতে শুরু করল।
নিচের শেষ লকটি বাম হাত দিয়ে কাটার সময় ডান হাতে ‘ব্ল্যাক ক্যানন’ ভেতরের দিকে টার্গেট করে ট্রিগারে আঙুল রাখল।
দরজা কাটা শেষ হতেই একটা ‘হিশ’ শব্দ ওঠলো এবং দরজা ডান দিকে সরতে শুরু করল।
দরজা কাটা শেষ করেই আহমদ মুসা শুয়ে পড়েছিল।
দরজা যতটুকু ফাঁক হচিছল, আহমদ মুসার ‘ব্ল্যাক ক্যানন’ ততটুকুকে কভার করছিল।
কয়েক ইঞ্চি ফাঁক হতেই আহমদ মুসা তার রিভলবারের নল করিডোরের গা ঘেঁষে ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছিল।
ফুট খানেক ফাঁক হওয়ার সংগে সংগেই তার রিভলবারের নল দরজার সমান্তরালে ডান দিকে ঘুরিয়েই গুলী করতে শুরু করে দিল। আহমদ মুসা রিভলবারের ট্রিগারে আঙুল চেপে রেখেই বাম দিক পর্যন্ত ঘুরিয়ে নিল।
তার রিভলবারের নল বাম দিকে আসার আগেই দরজা ডান দিকের দেয়ালে ঢুকে গেল। আহমদ মুসা দেখল, ডান দিকে গেটের তিন চার গজ ভেতরে একটা চেয়ারের ওপর একটা লাশ পড়ে আছে।
আহমদ মুসা খুশি হলো, দু’জনের একজন তাহলে সে।
বাম দিক থেকে গুলীবর্ষণ তখন শুরু হয়ে গেছে আহমদ মুসার দিক লক্ষ্য করে।
ডান দিকে গুলী শুরু হলে বাম দিকের লোকটি নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল। এখন সে আক্রমণে এসেছে।
আহমদ মুসা তার গুলী বন্ধ করে পেছনে সরে এসেছে, যাতে সে আহমদ মুসাকে টার্গেট করার জন্যে বেরিয়ে আসে।
বেরিয়ে সে এল।
নিনা নাদিয়ার টার্গেটে সে এল। এরই অপেক্ষা করছিল নিনা নাদিয়া।
নিনা নাদিয়া তার রিভলবার থেকৈ পরপর দু’বার গুলী করল।
আহমদ মুসাকে লোকেট করার জন্যে বেরিয়ে আসা দ্বিতয়ি গার্ডকে নিনা নাদিয়ার দু’টি গুলী গিয়েই আঘাত করল। লুটিয়ে পড়ল তার দেহ গেটের ভেতরের পাশে।
নিনা নাদিয়া উঠে দাঁড়িয়েছে।
আহমদ মুসাও উঠে দাঁড়াল।
দু’জনেই গেটের ভেতরে ঢুকে গেল।
ধন্যবাদ মিস নাদিয়া। আমার পক্ষে তাকে গুলী করা অসুবিধাজনক ছিল। বলল আহমদ মুসা।
নিনা নাদিয়ার মুখ উজ্জল হয়ে উঠেছে। বলল, কৃতিত্ব আপনার প্রাপ্য। গেম মেকার আপনি। আমি মাত্র ছুটে আসা বলে পা ছুইয়েছি, বল আপনাতে গোলে গেছে।
কথা শেষ করেই নিনা নাদিয়া সামনের দরজার দিকে ইংগিত করে বলল, আসুন ঐ দরজার ওপারেই ওঁরা আছেন।
ছুটল দু’জন দরজার দিকে।
দরজা ঠেলতেই খুলে গেল।
সামনের দিকটা উন্মুক্ত হয়ে গেল। চোখে পড়ল ‘কেবিন বন্দীখানা’ গুলো।
সামনেই পাশাপাশি দুই কেবিনে বন্দী আছে এমিলিয়া ও বায়তুল আকসার খতিব শেষ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান।
এমিলিয়া ও খতিব দু’জনেই দেখতে পেয়েছে আহমদ মুসাকে।
‘ভাইয়া’ বলে কেঁদে উঠল এমিলিয়া।
আলহামদুলিল্লাহ। আসসালামু আলায়কুম, আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা সালাম গ্রহণ করে প্রথমে তার দরজার লকটাকে গুলী করে ভেঙে ফেলল।
অন্যদিকে নিনা নাদিয়া গিয়ে ভেঙে ফেলেছে এমিলিয়ার কেবিনের দরজার লক।
এমিলিয়াকে ধরে বের করে আনল নিনা নাদিয়াই।
খতিব আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমানকে আগেই বের করে নিয়ে এসেছে আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার নিকটবর্তী হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল এমিলিয়া।
নিনা নাদিয়া তাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে।
কান্নার সময় শেষ বোন। ওদিকে সবাই ভাল আছে, মুক্ত হয়েছ। তুমিও এখন সৈনিক। কোন কান্না নয়। এখন বের হতে হবে আমাদের।
বলে আহমদ মুসা তাকাল নিনা নাদিয়ার দিকে।
বুঝতে পারল নিনা নাদিয়া আহমদ মুসার চোখের ভাষা। বলল, বের হওয়ার একটা গোপন পথ আছে। কিন্তু আপনি যে দিক দিয়ে প্রবেশ করেছেন, সেই পথটাই নিরাপদ। ওদিক দিয়ে বাইরের প্রাচীর ডিঙালেই সাগর-কূলে পৌছা যাবে। সাগর কূলে গিয়ে কিছু একটা যোগাড় করতে হবে।
ধন্যবাদ মিস নাদিয়া। আপনি পথ দেখান। বলল আহমদ মুসা।
নিনা নাদিয়া চলতে শুরু করল।
তার পেছনে এমিলিয়া ও খতিব আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান।
সবশেষে আহমদ মুসা।
১৩
একটা মিলিটার গান-বোট চলছে ভুমধ্যসাগর ধরে পূর্বে ফিলিস্তিন উপকূলের দিকে।
গান বোটের ড্রাইভিং চেয়ারে আহমদ মুসা। তার সামনে পার্টিশন আনফোল্ড করা উন্মুক্ত কেবিনে বসে আছে এমিলিয়া ও নিনা নাদিয়া পাশাপাশি। পাশেই একটু সরে বসে আছে খতিব আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান।
মিলিটারি গানবোটটি অত্যাধুনিক।
ডেকের দু’পাশেই ক্ষেপণাস্ত্র লাঞ্চার। আর কেবিনের ছাদে বিমান বিধ্বংসি কামান।
বোটটি দখল করে রাত সাড়ে তিনটায় তারা বোটে উঠেছে।
মিলিটারি বোটটি বাঁধা ছিল প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের দক্ষিণ-পূর্ব কোণের একটা ছোট্ট গোপন জেটিতে। জরুরি অবস্থায় ব্যবহারের জন্যে এ ধরনের বোট প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের উপকূলে আরও কয়েকটি আছে।
সব সময় একজন সেনা অফিসার ও সেনা-ক্রু থাকে জরুরি অবস্থায় দায়িত্ব পালনের জন্যে।
নিনা নাদিয়াই এ বোটটা দখল করেছিল।
সে ঘাটে গিয়ে তার কার্ড দেখিয়ে সেনা অফিসার ও সেনা ক্রুকে ডাকে। তারা এলে নিনা নাদিয়া রিভলবার তাদের দিকে তাক করে বলে আপনাদের এ্যারেষ্ট করা হলো।
এ সময় আহমদ মুসা সেখানে আসে এবং তাদের দু’জনকে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলে। মুখে কাপড় গুজে তাদের চিৎকার করার পথ বন্ধ করে দেয়।
আহমদ মুসা গানবোটে উঠে সব পরীক্ষা করে দেখে বলে, সব ঠিক আছে। জ্বালানিও যথেষ্ট রয়েছে। আমরা ষ্টার্ট করতে পারি।
নিনা নাদিয়া এমিলিয়াকে হাত ধরে গানবোটে তুলে দেয়। শেখ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমানকে সম্মানের সাথে বোটে তুলে নেয় আহমদ মুসা।
নিনা নাদিয়া দাঁড়িয়েছিল নিচে।
আহমদ মুসা দাঁড়িয়ে ছিল বোটে। তার পেছনে এমিলিয়া ও শেখ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান।
নিনা নাদিয়ার মুখ ভারী। চোখে-মুখে একটা বিমূঢ় ভাবও। চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল সে।
দাঁড়িয়ে কেন, উঠুন তাড়াতাড়ি। বলেছিল আহমদ মুসা।
আমি উঠব? কোথায় যাব আমি? বলেছিল নিনা নাদিয়া। ভাঙা, কান্নারুদ্ধ কণ্ঠ তার।
কেন আমাদের সাথে, আমরা যেখানে যাচ্ছি সেখানে! বলেছিল আহমদ মুসা।
কিন্তু এখানেই তো আমার সব। বলেছিল নিনা নাদিয়া। কাঁপছিল তার কণ্ঠ।
আহমদ মুসা একটু ভাবে। বলে ‘মিস নিনা নাদিয়া, আপনি এখন আর সে নিনা নাদিয়া নন। এখানে যারা আছে, ইতোমধ্যেই তাদেরকে আপনি পরিত্যাগ করছেন। প্লিজ আপনি আসুন।
দু’হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলেছিল নিনা নাদিয়া। কাঁদতে কাঁদতেই বলেছিল, আমি আমারই বিরুদ্ধে গিয়েছি।
না মিস নিনা নাদিয়া, বিরুদ্ধে নয়, আপনি নিজের পক্ষে কাজ করেছেন। আপনি যা করেছেন নিজের বিরুদ্ধে গিয়ে কেউ তা করতে পারে না। বলেছিল আহমদ মুসা নরম সুরে।
নিনা নাদিয়া পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল আহমদ মুসার দিকে। তারপর কোন কথা না বলে ধীরে ধীরে উঠে এসেছিল বোটে।
এখন একেবারেই স্বাভাবিক নিনা নাদিয়া।
নানা রকম গল্প চলছিল এমিলিয়া ও নিনা নাদিয়ার মধ্যে। মাঝখানে দু’একটা কথা বলছিল আহমদ মুসা।
শেখ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান ফজরের নামাযের পর তসবি নিয়ে বসেছিল। ঘণ্টা খানেক পর সহজ হয়ে বসে। মাঝে মাঝেই আহমদ মুসার সাথে কথা বলছিল সে।
এক সময় শেখ আব্দুল্লাহ আব্দুর রহমানই নিনা নাদিয়াকে প্রশ্ন করল, তোমার সম্পর্কে কিছুই জানা হলো না মা।
নিনা নাদিয়া তাকাল আহমদ মুসার দিকে।
মিস নাদিয়া সম্পর্কে আমিই বলছি জনাব।
বলে আহমদ মুসা নিনা নাদিয়ার সাথে দেখা হওয়া থেকে শুরু করে প্রিজন সেলে প্রবেশ পর্যন্ত সব কথা বলল।
নিনা নাদিয়ার দিকে এমিলিয়ার বিস্ময় মিশ্রিত সম্মান ও শ্রদ্ধার দৃষ্টি।
শেখ আব্দুল্লাহ আব্দুর রহমান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে বলল, মা তুমি আল্লাহর তরফ থেকে আমাদের জন্যে সাহায্য হিসেবে এসেছ। তুমি এখন আমাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ মা। আল্লাহ তোমার মহান কাজের জন্যে অশেষ জাজাহ দান করুন।
শুভ্র চুল, শুভ্র দাড়ি এবং শক্ত দৈহিক গড়নের মানুষ শেখ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান। চোখ-মুখ থেকে পবিত্রতা যেন ঠিকরে পড়ছে। মনে স্বর্গীয় ভাব জাগায় এই চেহারা।
নিনা নাদিয়া মাথা নিচু করে বাউ করে শ্রদ্ধা জানাল শেখ খতিবকে। বলল, জনাব প্রার্থনা করুন, আমি যা ছেড়ে দিয়েছি, যা আমি গ্রহণ করেছি তা যেন আমাকে শান্তি দেয়। ভারী কণ্ঠ নিনা নাদিয়ার।
আল্লাহ তোমাকে, তোমার ইচ্ছাকে কবুল করুন মা। বলল শেখ খতিব আব্দুল্লাহ।
নিনা নাদিয়া আবার বাউ করে শ্রদ্ধা জানাল শেখ খতিব আব্দুল্লাহকে।
মিস নিনা নাদিয়া, আমার একটা কৌতুহল। বলল আহমদ মুসা।
নিনা নাদিয়া তাকাল মুগ্ধ দৃষ্টিতে আহমদ মুসার দিকে। বলল, কি কৌতূহল বলুন?
আমি আপনাকে বাঁচিয়ে ছিলাম, আমাকে আপনি বন্দী দশা থেকে মুক্ত করলেন। কিন্তু মুক্ত করার পর ধরিয়ে দেয়ার জন্যে নিরাপত্তা বিভাগকে আমার কথা বলে ছিলেন। পরে আবার মৃত্যুর মুখ থেকে আমাকে বাঁচালেন এবং এমিলিয়া ও খতিব মহোদয়কে উদ্ধার কাজে সহযোগিতা করলেন। কেন আপনি এমনটা করলেন, খুব কৌতূহল আমার এটা জানার জন্যে।
গম্ভীর হলো নিনা নাদিয়া। বলল, আপনার কৌতুহল খুবই স্বাভাবিক। আমি আন্তরিকতার সাথে আপনাকে মুক্ত করেছিলাম। কিন্তু যখন শুনলাম আপনি আমাদের বন্দীদ্বয়কে মুক্ত করতে চান এবং আমার কাছ থেকে বন্দীরা কোথায় আছে জেনে নিলেন; তখন একটা প্রতিক্রিয়া হয়েছিল আমার মনে। আমার মনে অপরাধ বোধ সৃষ্টি হয়েছিল এই ভেবে যে, আমাদের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় যে দু’জন বন্দী, যাদের বিনিময়ে বড় কিছু পাব আশা করছি তাদেরকে মুক্ত করতে সাহায্য করেছি। এই চিন্তাতেই আমি বিষয়টা তৎক্ষণাৎ জানিয়ে দেয় ‘সিনবেথ’-এর প্রধান জেনারেল শামিল এরফানকে। তারপর আবার আপনাকে বাঁচিয়েছি বলছেন, কিন্তু আমি তখন আপনাকে বাঁচাইনি, বাঁচিয়েছি আহমদ মুসাকে। আহমদ মুসাকে বাঁচিয়েছি, সেজন্যে বন্দীদের উদ্ধারের জন্যে আহমদ মুসাকেই সাহায্য করেছি। বলল নিনা নাদিয়া।
বিস্ময় আহমদ মুসার চোখে। অপার বিস্ময় এমিলিয়ার চোখেও। বলল সে, বুঝলামনা তোমার কথা। তুমি তাঁকে বাঁচাওনি, বাঁচিয়েছ আহমদ মুসাকে। তিনি ও আহমদ মুসা তো ভিন্ন সত্তা নন।
তা ঠিক। কিন্তু তাঁকে আমি বাঁচাতে যেতাম না যদি তার নাম আহমদ মুসা না শুনতাম। বলল নিনা নাদিয়া।
বিস্ময় সবার চোখে। আহমদ মুসার চোখেও। বলল আহমদ মুসা, নামটাকে আপনি বাঁচাতে গেলেন কেন?
নিনা নাদিয়া তার মুখ নিচু করল। বলল, আহমদ মুসা নামের সাথে আমার জীবনের একটা মর্মান্তিক স্মৃতি জড়িত।’ তাই মৃত্যুর মুখে উপস্থিত তাঁর নাম যখন আহমদ মুসা শুনলাম, তখন সেই স্মৃতি এসে আমাকে পাগল করে তুলেছিল। সব কিছু ভুলে আমি তাকেই বাঁচাতে গিয়েছিলাম এবং আক্রমণে আসার জন্যে তাকে রিভলবার সরবরাহ করেছিলাম।
খুব কৌতূহল সেই স্মৃতি সম্পর্কে, যার সাথে আহমদ মুসার নাম জড়িত। আমি কি এ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে পারি বোন? বলল এমিলিয়া।
না জিজ্ঞেস করতে পারার মত ওটা কোন প্রাইভেট ব্যাপার নয়।
বলে থামল নিনা নাদিয়া। মাথা নিচু করল। বলল, সে আমার জীবনের এক দুর্ভাগ্যের কাহিনী। ইসরাইলে আমার জন্ম। আমি মুসলিম পিতা ও ইহুদি মাতার সন্তান। বড় হয়ে জেনেছি আমার পিতা ওমর আব্দুল্লাহ ফিলিস্তিন মুক্তি আন্দোলনের একজন আন্ডার গ্রাউন্ড কর্মকর্তা ছিলেন। আর মা ছিলেন ইসরাইল গোয়েন্দা সংস্থার একজন অফিসার। পরিকল্পনা করেই মা’কে আমার পিতার প্ল্যান্ট করা হয়। পিতার মাধ্যমে ফিলিস্তিন জনশক্তি ও নানা গোপন তথ্য যোগাড় করে ইসরাইলী গোয়েন্দা বিভাগকে সরবরাহ করাই ছিল আমার মায়ের কাজ। আমার জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দেখেছি, মা সর্বদা আমাকে আমার পিতা থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন। শিশুকালে আমার মা আমাকে রেখেছেন ডে-কেয়ার সেন্টারে। একটু বড় হলে আবাসিক কিন্ডার গার্টেনে। আরও বড় হলে মা আমাকে পাঠিয়ে দেন তেল আবিবে। আমি তেল আবিবে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশুনা করি। ছুটিতে বাড়ি যেতাম, তখনও দেখেছি আমি পিতার সাথে গল্প-গুজব করার মত এক্সক্লুসিভ সুযোগ পাইনি। সে সুযোগ মা আমাকে দেননি। কার্যত মা আমাকে ইহুদি হিসেবেই গড়ে তোলেন। আমার পিতা সব সময় বাইরে ব্যস্ত থাকতেন বলে এসব কোন খবর তিনি রাখতেন না, মায়ের ওপরই নির্ভর করতেন সব ব্যাপারে। আমার চিন্তা ও মন-মানসিকতা ছিল ইহুদিদের পক্ষেই। মুসলমানদের আজাদী চিন্তা আমার বিদ্রোহ বলে মনে হতো। পিতা এ সবের কিছুই জানতেন না। তিনি আমাকে অত্যন্ত ভালবাসতেন। আমার বেপরোয়া খরচে মা অনেক সময় রাগ করতেন। পিতা-মাকে বুঝাতেন, নাদিয়াই তো আমাদের সংসার। সংসারের সবকিছু তো তার জন্যে। ওর মনে কোন কষ্ট দিও না। পিতার এই ভালবাসাকে কোন দিনই মূল্য দেইনি।
তারপর এল সেই মর্মান্তিক দিন।
আমি সেদিন বাড়িতে ছিলাম।
পিতা শরীর খারাপ লাগছে বলে ঘুমাতে গিয়েছিলেন। মা ও আমি বসে টিভি দেখছিলাম।
মা’কে একটু অস্থির বলে মনে হচ্ছিল। একটু পরপর ঘড়ি দেখছিলেন তিনি।
এক সময় বলে উঠলেন। মা তুমি ঘুমাতে যাও। আমাকে একটু অফিসে যেতে হবে।
আমি জানতাম মা একটি তথ্যকেন্দ্রে কাজ করেন। তথ্যকেন্দ্রের কাজ ২৪ ঘণ্টা চলে। পরে জেনেছিলাম তথ্য কেন্দ্রটি আসলে গোয়েন্দা অফিস।
মা চলে গেলে আমি শুতে চলে গেলাম।
চিৎকার ও কথাবার্তায় আমার ঘুম ভেঙে গেল।
তাড়াতাড়ি উঠে বাইরে গেলাম।
বাড়ির ভেতরে আমার পিতা হাত-পা বাঁধা অবস্থায়। তার উপর অমানুষিক নির্যাতন চলছে। তার দেহ রক্তাক্ত। তার হাতে পায়ের আঙুলে সুচ ফোটানো হচ্ছে। চাকু দিয়ে তার গায়ের চামড়া কেটে নেয়া হচ্ছে। একজন তাকে অবিরাম জিজ্ঞাসা করে চলেছে, ‘মুসলিম কমান্ডোদের যে গোপন তালিকা তুমি আজ পেয়েছ এবং নেটওয়ার্কের যে প্ল্যান পেয়েছ, সেটা আমাদের দাও। আমরা তোমাকে ছেড়ে দেব।’ অন্যদিকে আমার পিতা বলে চলেছেন, ‘সে তালিকা ও নেটওয়ার্ক প্ল্যান তোমরা পাবে না। তোমরা যা ইচ্ছা কর।’
পিতার ওপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে চলল।
আমি ছুটে গেলাম আম্মার ঘরে তিনি আছেন কিনা দেখার জন্যে। দেখলাম তার বেড শূন্য। অর্থাৎ তিনি তখনও ফেরেননি।
আমি কি করব ভেবে পেলাম না। দেখলাম বাইরে বেরোনোর গেটে চারজন ইসরাইলী পুলিশ।
আমি গিয়ে কিছু বলতে পারবো না তা আমার কাছে পরিষ্কার। রাগ হলো পিতার প্রতিই। কেন তিনি মুসলমানদের জন্যে কাজ করেন, কেন তিনি তালিকাটা ও নেটওয়ার্ক প্ল্যান ওদের দিয়ে দিচ্ছেন না? এদিক থেকে আমার পিতাকে তারা অপরাধী মনে করে, বিদ্রোহী ও ষড়যন্ত্রকারী বলে মনে করে। সুতরাং শাস্তি তো তারা দেবেই।
একজন চিৎকার করে উঠল, ‘চেষ্টা করে লাভ নেই। হারামজাদা মুখ খুলবে না। শেষ করে দে তাকে।’
একজন ক্রুব্ধ মানুষ ছুড়ি নিয়ে ছুটে গিয়ে আমার পিতাকে এলোপাতাড়ি কোপাতে লাগল। আরেকজন গিয়ে তার বুকে ছুরি বসিয়ে দিল।
আমি চিৎকার করে চোখ বুঝলাম। শুনতে পেলাম পিতার কণ্ঠ। তিনি সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে বলছে, ‘তোমাদের দিন শেষ ইসরাইলিরা। আহমদ মুসা এসেছে, আহমদ মুসা, আহমদ মুসা। তিনি আল্লাহর তরফ থেকে সাহায্য স্বরূপ এসেছেন। তিনি বিজয়ী হবেন; তোমরা পরাজিত হবে। শোন, তোমরা শোন, শুনে যাও, আহমদ মুসা বিজয়ী হবেন। তিনি নতুন প্রভাত আনবেন।’
এক সময় থেমে গেল পিতার কণ্ঠ।
আমি ভয়ে ভয়ে চোখ খুললাম। দেখলাম, ওরা কেউ কোথাও নেই।
নেতিয়ে পড়ে আছে আমার পিতার দেহ।
আমি ছুটে গেলাম।
পিতা তখন জীবিত নেই।
আমি আছড়ে পড়লাম পিতার রক্তমাখা বুকের উপর। হঠাৎ মনে হলো, পিতাকে আমি খুবই ভালবাসি।
কিন্তু একথা শোনার জন্যে তখন তিনি বেঁচে নেই।
কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেছে নিনা নাদিয়ার। তার দু’চোখ থেকে নীরবে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল অবিরামভাবে। এবার সে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
সবারই চোখ ভিজা। অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল আহমদ মুসার চোখ থেকেও। কে কাকে সান্তনা দেবে!
একটু পর চোখ মুছে মাথা তুলল নিনা নাদিয়া।
বলতে লাগল ভাঙা কণ্ঠে, পিতার মৃত্যুর পর আমরা স্থায়ীভাবে উঠে গেলাম তেলআবিবে। লেখাপড়া শেষ করে মায়ের তাকিদেই ইসরাইলী গোয়েন্দা বিভাগে যোগ দিলাম। মা বিয়ে করলেন একজন গোয়েন্দা অফিসারকে।
সব ভুলে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমার সৎ পিতা গোয়েন্দা প্রধানের মুখে আহমদ মুসার নাম শুনলাম, তখন ভুলে যাওয়া পিতা আমার সামনে হাজির হলেন। ‘আহমদ মুসা বিজয়ী হবেন’-এই শব্দ আমার কানে বজ্রের মত বাজতে লাগল। যখন দেখলাম আমার পিতার সেই আহমদ মুসা মৃত্যুর মুখে এবং পরাজিত হতে চলেছে আমারই সৎ পিতা গোয়েন্দা প্রধান জেনারেল শামিল এরফানের হাতে, তখন আমি যেন পাগল হয়ে গেলাম। মনে হলো, আমার পিতার সেই আহমদ মুসাকে বাঁচানো, তাকে বিজয়ী করা আমার একমাত্র কাজ, পিতার দেয়া কাজ তার সন্তানের একমাত্র দায়িত্ব। মনে হলো, আমি মুসলিম মুক্তি সংগ্রামী ওমর আব্দুল্লাহরই সন্তান, আমার আর কিছু পরিচয় নেই। এই পরিচয়ের কথা মনে হতেই আমি গুলী করেছিলাম আমার সৎ পিতা জেনারেল শামিল এরফানকে। আবেগ-রুদ্ধ হয়ে থেমে গেল নিনা নাদিয়ার কণ্ঠ।
ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স (সিনবেথ) প্রধান জেনারেল শামিল এরফান আপনার সৎ পিতা? বলল আহমদ মুসা। তার কণ্ঠে বিস্ময়।
হ্যাঁ। আমার পিতার মৃত্যুর এক বছর পর আমার মা তাঁকে বিয়ে করেন। বলল নিনা নাদিয়া। কণ্ঠ তার ভারী।
এমিলিয়া নতমুখী নিনা নাদিয়ার কাঁধে হাত রাখল। বলল, একটা অসম্ভব কাজ আপনি করেছেন। আপনার মা বেঁচে আছেন নিশ্চয়।
হ্যাঁ, বেঁচে আছেন। তিনি গোয়েন্দা বিভাগের একজন সিনিয়র অফিসার। আমি পেরেছি কারণ আমার সৎপিতা ও তার গোয়েন্দা বিভাগই আমার পিতাকে খুন করেছে নৃশংসভাবে। আমি সেদিন না বুঝলেও পরে বুঝেছি, আমার মা জানতেন সেদিন রাতে আমার পিতাকে হত্যা করা হবে। তাই তিনি পরিকল্পিতভাবেই বাড়ির বাইরে চলে গিয়েছিলেন।
আলহামদুলিল্লাহ। মা নাদিয়া, আল্লাহ তোমার প্রতি খুশি হোন। তারই দয়ায় তোমার আসল পরিচয়ে ফিরতে পেরেছ। এ রকম বড় ঘটনা খুব কমই ঘটে। আলহামদুলিল্লাহ। বলল শেখ খতিব আব্দুল্লাহ।
নিনা নাদিয়া শেখ খতিবকে বাউ করে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাল। বলল, মুহতারাম হযরত, আমি আমার পরিচয় ফিরে পেয়েছি সবকিছু হারিয়ে। পিতার কাছে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ আমি পাইনি। এমন হল যে, আমার মাও আমাকে কোনদিন ক্ষমা করবেন না। ভারী হয়ে উঠেছিল নিনা নাদিয়ার কণ্ঠ।
মিস নিনা নাদিয়া, সবকিছু হারানোর পর সবকিছু পাওয়ার সময় আসে, এটাই সৃষ্টির একটা নিয়ম। আহমদ মুসা বলল।
কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছিল নিনা নাদিয়া। কিন্তু তার পকেটের মোবাইল বেজে ওঠল এই সময়।
নিনা নাদিয়া চুপ করে গিয়ে পকেট থেকে মোবাইল বের করল। মোবাইলের স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে মোবাইল আহমদ মুসার দিকে তুলে ধরে বলল, জনাব, আপনার টেলিফোন।
আহমদ মুসা মোবাইলটি নিল।
আহমদ মুসা গানবোটে উঠেই ফিলিস্তিনের প্রধানমন্ত্রী মাহমুদের কম্যুনিকেশন কক্ষে আহমদ মুসারা ফিরে আসছে এ খবর জানিয়ে তার কনট্যাক্ট পয়েন্ট হিসেবে নিনা নাদিয়ার নাম্বার দিয়েছিল। এর অল্প পরেই প্রধানমন্ত্রী কল ব্যাক করে আহমদ মুসাকে। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে ও আহমদ মুসাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলে যে, তাদের স্বাগত জানানোর জন্যে তারা আসছেন।
আহমদ মুসা সালাম দিতেই ওপার থেকে মাহমুদের কণ্ঠ পেল। বলল, আপনারা কোথায় আহমদ মুসা ভাই?
আহমদ মুসা গানবোটের ড্যাশ বোর্ডের লোকেশন চার্টের দিকে চেয়ে তাদের অবস্থানের অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ বলে দিল।
ওপার থেকে মাহমুদ বলল, আপনারা আমাদের জল সীমায় এসে গেছেন। আমরাও এসে গেছি।
অল্পক্ষণের মধ্যেই জংগী বিমান, হেলিকপ্টারের শব্দ শোনা গেল।
কয়েক মুহূর্ত পরেই আকাশে তিনটি জংগী বিমান দুটি হেলিকপ্টার দেখা গেল। ওগুলো গানবোটের উপরে টহল দিতে লাগল।
আর কিছুক্ষণ পরে এল দুটি নৌ যুদ্ধ জাহাজ।
জাহাজ দু’টি দু’দিক থেকে আহমদ মুসাদের গান বোটের দিকে এগিয়ে এল। গান বোট থেকে জাহাজে প্রথম উঠে এল শেখ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান দের ইয়াসিনি। তাকে স্বাগত জানাল প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ।
তারপর একে একে নেমে এল নিনা নাদিয়া ও এমিলিয়া। সব শেষে জাহাজে উঠল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসাকে জড়িয়ে ধরল প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ। কথা বলতে গিয়েও মাহমুদ কথা বলতে পারল না। আবেগে ভেঙে পড়ল তার কণ্ঠ। দু’চোখ থেকে তার নেমে এল অশ্রুর ঢল, কৃতজ্ঞতার অশ্রু, আনন্দের অশ্রু।
পাশে দাঁড়িয়েছিল এমিলিয়া, নিনা নাদিয়া। তাদের চোখেও অশ্রু টলটল করছে।
শেখ আব্দুল্লাহ আব্দুর রহমান আগেই বসেছেন একটা ডেক চেয়ারে। বলল ধীর কণ্ঠে, মাহমুদ কৃতজ্ঞতার অশ্রু দিয়ে আহমদ মুসাকে দুর্বল করো না। আল্লাহর সৈনিক হিসেবে যা করার সেটাই তো করেছে।
নিনা নাদিয়া তাকাল শেখ আব্দুল্লাহ আব্দুর রহমানের দিকে। চোখের সামনে ভেসে ওঠল তার পিতার অন্তিম দৃশ্য। তিনি জীবন দিয়েছেন, কিন্তু মুসলিম কমান্ডোদের তালিকা ও তাদের নেটওয়ার্কের বিবরণ শত্রুর হাতে অর্পণ করেননি। তিনি আল্লাহর এমন একনিষ্ঠ সৈনিক ছিলেন! গর্বে ফুলে ওঠল নিনা নাদিয়ার বুক।
১৪
এক মাস পরের ঘটনা। হাইফা নৌ-ঘাঁটির সদর দফতরে বসে আছে আহমদ মুসা। প্রশস্ত উন্মুক্ত জানালা দিয়ে ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশি দেখা যাচ্ছে। সাগর ছোঁয়া স্নিগ্ধ বাতাস তার শরীরে শান্তির পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে। আহমদ মুসা চেয়েছিল সামনে। নীল দিগন্ত রেখা পেরিয়ে হারিয়ে গেছে তার দৃষ্টি। তার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে মধ্য এশিয়ার এক বিরাট জনপদ। জনমানবের চিহ্ন কোথাও নেই। জনপদের বুকের উপর গড়ে উঠেছে কার্পাস ক্ষেতের সরকারি ফার্ম। মসজিদের ধসে পড়া ভিত ঢাকা পড়েছে গভীর বনে। এ বিধ্বস্ত জাতিরই সে একজন। একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার বুক চিরে। জাতির জন্য কতটুকু কি করতে পেরেছে সে! চোখের সামনে দিয়ে সাগরের বুক চিরে ছুটে যাচ্ছিল ফিলিস্তিন জাতীয় সরকারের একটি যুদ্ধ জাহাজ। ওর বুকে পতপত করে উড়ছে পতাকা। পতাকার ছয়টি তারকা অন্তর্হিত হয়ে সেখানে স্থান পেয়েছে চাঁদ ও তারা। আহমদ মুসা ভাবল, মুসলমানদের যুদ্ধ জাহাজগুলো এমনিভাবে বিজয়ীর গর্বে ঘুরে বেড়াত একদিন সমগ্র ভুমধ্যসাগরে! সেদিন কি ফিরে আসবে? পাবে কি ফিলিস্তিনের সাইমুমকর্মীরা সে গৌরবময় দিনের পুনরুজ্জীবন করতে? তারিকের জন্ম হবে না কি আমাদের মধ্যে আর? আহমদ মুসার চোখের কোণে চিক চিক করে উঠল দুই ফোঁটা অশ্রু।
নৌ-সদর দফতরের গেটে জাতীয় সরকারের পতাকাশোভিত একটি গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে নামল ফিলিস্তিন জাতীয় সরকারের প্রধান মাহমুদ। সে হাত ধরে নামাল এমিলিয়াকে। তার সাথে নামল নিনা নাদিয়াও। সর্বাঙ্গ কাল চাদরে ঢাকা এমিলিয়া। তার পরনেও ফুল আরবীয় পোশাক। তার উপর মাথায় চাদর। এমিলিয়া ও নাদিয়া দু’জন হাত ধরাধরি করে সিঁড়ি ভেঙে ঢুকে গেল ভেতরে।
তারা রেষ্টরুমে পৌছে গেলে মাহমুদ চলে এল অফিস কক্ষে। দরজা ঠেলে প্রবেশ করে দেখতে পেল জানালা দিয়ে সাগরের দিকে চেয়ে বসে আছে আহমদ মুসা। তন্ময়তার কোন অতল গভীরে ডুবে আছে সে! চোখের কোণের দু’ফোটা অশ্রু মাহমুদের দৃষ্টি এড়াল না। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল আহমদ মুসার কাছে। কাঁধে একখানা হাত রেখে ডাকল, মুসা ভাই।
চোখ না ফিরিয়েই আহমদ মুসা বলল, মাহমুদ এসেছ?
জি হ্যাঁ? কি ভাবছেন মুসা ভাই অমন করে?
প্রাথমিক কাজ ফুরালো, এবার শুরু করতে হবে দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ। আল্লাহর এই জমীনে আল্লাহর বান্দাদের সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য খোদায়ী বিধানের প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করতে হবে এবার।
এ বিরাট দায়িত্ব। আমাদের সকলের অনুরোধ এ দায়িত্বভারও আপনি গ্রহণ করুন—- আমাদের পরিচালনা করুন মুসা ভাই।
না, মাহমুদ, আমার সিদ্ধান্তে ভুল হয়নি। তুমি পারবে এ দায়িত্ব পালন করতে। একটু থামল আহমদ মুসা। তারপর বলল, আমাকে এবার যেতে হবে মাহমুদ।
কোথায়? চমকে উঠল মাহমুদ।
মধ্য এশিয়ায়?
হ্যাঁ, ভাই। তুমি তো জান, হাসান তারিককে WRF ধরে নিয়ে গেছে। ওকে উদ্ধারের সব অভিযান ব্যর্থ হয়েছে। এ দিকের কাজ আপাতত শেষ। এবার আমাকেই যেতে হবে ওদিকে। তাছাড়া ডাকছে মধ্য এশিয়া আমাকে হাতছানি দিয়ে।
মাহমুদও এমনি আশংকা করছিল। কোন কথা বলতে পারল না কিছুক্ষণ। দু’ফোটা অশ্রু নেমে এল মাহমুদের দু’গন্ড বেয়ে। বলল সে, জানি, আপনি যাবেন কিন্তু আপনি আমার মাথার উপর না থাকলে……..।
মাহমুদকে কথা শেষ করতে না দিয়েই আহমদ মুসা বলল, তোমার আমার সাহায্যকারী তো কোন মানুষ নয় মাহমুদ। এই মহাবিজয় যিনি আমাদের দিলেন, তিনিই তোমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করবেন।
ক্রিং ক্রিং করে বেজে উঠল টেলিফোন। আহমদ মুসা বলল, মাহমুদ টেলিফোনটা দেখ।
মাহমুদ টেলিফোনে কথা বলল, পরে আহমদ মুসাকে জানাল, প্লেন ছাড়ছে বেলা দু’টোয়।
এখন বেলা একটা। সময় তো বেশি নেই মাহমুদ। চল উঠি।
প্লে….. কেন, কোথায় যাবেন? কাঁপল যেন মাহমুদের কণ্ঠ।
আপাতত মদিনায়। সেখান থেকে যাব রিয়াদে বাদশাহ ফয়সালের কবর জিয়ারতে। তাঁর অর্ধ সমাপ্ত কাজ আমরা সমাপ্ত করেছি, তাঁর স্বপ্ন আমরা স্বার্থক করে তুলতে পেরেছি মাহমুদ। বায়তুল মোকাদ্দাস আজ মুক্ত। পবিত্র ভূমি থেকে ইহুদি পতাকা ডুবে গেছে ভূমধ্যসাগরে। জীবন দিয়ে হলেও এটিই তো চেয়েছিলেন শাহ ফয়সল। একটু থামল আহমদ মুসা। বলল আবার, রিয়াদ থেকে বাগদাদ হয়ে যাব মধ্য এশিয়ায়।
আজই, এখনি যাচ্ছেন? মাহমুদের কণ্ঠ যেন আর্তনাদ করে উঠল। সে আহমদ মুসাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘না, মুসা ভাই, এমন করে আমরা আপনাকে ছেড়ে দিতে পারি না।’ তার দু’গ- বেয়ে নেমে এল সেই অশ্রুর ধারা।
আহমদ মুসা মাহমুদকে সান্তনা দিয়ে বলল, ‘আবেগপ্রবণ হয়ো না মাহমুদ। বসে থাকার সময় কোথায়- অজস্র কাজ সামনে। নিপীড়িত মানবতার ক্রন্দন রোলে দেখ পৃথিবীর বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। আল্লাহর এ বান্দাদের বাঁচানোর দায়িত্ব তো মুসলমানদের।’ বলেই আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। টেবিলে রাখা একটি ব্যাগ তুলে নিল হাতে।
আহমদ মুসার সাথে মাহমুদ এয়ারপোর্টে যেতে চাইল। কিন্তু আহমদ মুসা নিষেধ করল। বলল, ‘কথা তো হলোই।’
আহমদ মুসা যখন গাড়িতে উঠে বসল নাদিয়া ও এমিলিয়া তখন গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে। তাদের পাশে মাহমুদ। তিনজনের চোখেই অশ্রু।
আহমদ মুসা ওদের দিকে চেয়ে বলল, অশ্রু মোছ মাহমুদ। কেঁদো না বোন এমিলিয়া ও নাদিয়া। মাটির মায়া, স্নেহের বাঁধনের চেয়ে একজন মুসলমানের কাছে মজলুম মানবতার ক্রন্দন অনেক বেশি মূল্যবান।
বলে আহমদ মুসা গাড়ি থেকে নামলেন। দাঁড়াল এমিলিয়া ও নাদিয়ার সামনে। বলল এমিলিয়াকে, বোন নাদিয়া এখন একা। আমি তাকে তোমার হাতে দিয়ে গেলাম।’
ফুপিয়ে কেঁদে উঠল এবার নাদিয়া।
একটু থেমে আহমদ মুসা তাকাল মাহমুদের দিকে। বলল, ‘এহসান সাবরির সাথে আমার কথা হয়েছে। নিনা নাদিয়াও জানে তাকে। দু’টি জীবনকে তোমরা এক করে দিও। আমি উপস্থিত থাকতে পারবো না কিন্তু আমার দোয়া থাকবে।
কথা শেষ করেই আবার গাড়িতে উঠে বসল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার গাড়ি নড়ে উঠল। কিছু বলতে গিয়েছিল মাহমুদ। পারল না। কান্নায় ডুবে গেল কথা।
সাইমুমের কর্মীরা সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। সকলেই কাঁদছে। স্বজন হারানোর সে কি করুণ দৃশ্য তাদের চোখে মুখে! তাদের দিকে চেয়ে মধুর হেসে আহমদ মুসা বলল, ‘তোমরা না আল্লাহর সৈনিক! কোন ব্যক্তি, কোন মাটি নয়, কাজ আর দায়িত্বই হবে তোমাদের কাছে সবচেয়ে বড়।’ বড় নরম আর মমতায় ভরা আহমদ মুসার সে কথাগুলো।
সাইমুমকর্মীদের অশ্রু যেন আরও উথলে উঠল। আহমদ মুসাকে নিয়ে ছুটে চলল গাড়ি এয়ারপোর্টের পথ ধরে।
১৫
দানবীয় গতিতে এগিয়ে চলেছে ‘প্যানামে’র বোয়িংটি। নীচে আরব সাগরের অথৈ জল। জেদ্দা ছেড়ে অনেকক্ষণ, আরব-উপদ্বীপের আদিগন্ত বালির রাজ্য আর দেখা যায় না। ইবরাহীম-ইসমাইল (আঃ)-এর স্মৃতিভূমি, মহানবী (সঃ)-এর পূর্ণ কর্মক্ষেত্র, নীল গম্বুজের দেশ শাহ ফয়সলের দেশের ওপর প্রসারিত আকুল দু’টো চোখ এবার আহমদ মুসা বিমানের অভ্যন্তরে সরিয়ে নিল।
বিমানের মধ্যভাগ দিয়ে লম্বালম্বী এক সরু গলিপথ। এর দু’পার্শ্বে সারিবদ্ধ আসন।
প্রথম শ্রেণীর বাম ধারের দ্বিতীয় সারির একেবারে বামপ্রান্তে জানালার ধারে বসেছে আহমদ মুসা।
জানালা থেকে চোখ ঘুরিয়ে ডানপাশে তাকাতে গিয়ে একটি লোকের সাথে হঠাৎ চোখাচোখি হয়ে গেল আহমদ মুসার। লোকটি বসেছে ওধারে দ্বিতীয় সারির প্রথম সিটটিতেই।
শ্বেতাংগ লোকটি। গাঢ় নীল স্যুট পরনে। লম্বাটে মুখ। খাড়া নাক। জোড়া ভ্রু। ছোট করে ছাঁটাচুল। ডান ভ্রুর নীচে চোখের মোহনায় একটি আঁচিল। সবচেয়ে লক্ষণীয় তার কুতকুতে কুৎসিত দু’টো চোখ।
চোখাচোখি হতেই লোকটি অপ্রতিভভাবে চোখ সরিয়ে নিল। মুখও ঘুরে গেল তার সেই সাথেই।
বিস্মিত হল আহমদ মুসা। লোকটি অমন করে মুখ ঘুরিয়ে নিল কেন? তার দিকে অমন করে চোরা দৃষ্টি রাখার কারণ কি লোকটির? সমগ্র অতীতকে সে একবার হাতড়িয়ে দেখল না এই মুখ সে কখনও দেখেনি। হঠাৎ তার মনে পড়ল জেদ্দার রেস্ট হাউসে তার পাশের রুমটিতে এই লোকটিকেই তো সে ঢুকতে দেখেছিল। তখন তার ছিল আরবী পোশাক-আরবী রমাল ছিল মাথায়।
সেই যে মুখ ঘুরিয়েছে লোকটি, আর ফিরে তাকালো না। আহমদ মুসার সন্ধানী মনের কোথায় যেন খচ খচ করতে লাগল।
কেবিন-মাইক থেকে ক্যাপটেনের কণ্ঠ শোনা গেল, লেডিজ এন্ড জেন্টলম্যান, আমরা এখন ৩৩ হাজার ফিট ওপর দিয়ে ঘন্টায় ৫৫০ মাইল বেগে এগিয়ে চলেছি। আর আধ ঘন্টর মধ্যে করাচীতে ল্যান্ড করব।
ক্যাপ্টেনের কথা শেষ হবার সাথে সাথে রোলিং টেবিলে করে নাস্তার ট্রে নিয়ে আগমন ঘটল বিমান বালাদের। স্টুয়ার্ট ককপিটের দিক থেকে নেমে এসে ফার্স্ট ক্লাস রুম হয়ে পিছনের দিকে চলে গেল।
এমন সময় সারির দু’টো আসন থেকে দু’জন লোক উঠে দাঁড়াল। দু’জনেই কালো ধরনের ঢিলা প্যান্ট ও ওভারকোট গায়ে। ওরা সামনের পার্টিসন ডোর ঠেলে অতি দ্রুত চলে গেল ককপিঠের দিকে।
এক মিনিটও অতিক্রান্ত হয়নি। ওদের একজন ফিরে এল। ডান হাতে তার রিভলভার। বাম হাতে বাঘা সাইজের একটি গ্রেনেড সেফটিফিন তুলে নেয়া।
এই সময় বিমানটি দ্রুত বড় ধরনের একটি মোড় নিল। থর থর করে কেঁপে উঠল বিমানটি। ক্যাপ্টেনের কণ্ঠ শোনা গেল কেবিন লাউডস্পীকারে, ভদ্রমহিলা, ভদ্রমহোদয়গণ, আমি দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, বিমানের গতিপথ পরিবর্তন করতে আমাকে বাধ্য করা হয়েছে। মহাশূন্যের বুকে বিমানের ৯০ জন যাত্রীর মূল্যবান জীবনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়ার চাইতে, বিমান দস্যুদের নির্দেশ পালন অধিকতর শ্রেয় বলে মনে করেছি। আমরা তাদের নির্দেশে এখন দক্ষিণে গভীর সাগরের দিকে এগিয়ে চলেছি। ঈশ্বর আমাদের রক্ষা করুন।
যাত্রীদের মধ্যে প্রথমে মৃদু গুঞ্জন এবং পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি হল। কিন্তু তারপরই তাদের মধ্যে মৃত্যু স্তব্ধতা বিরাজ করতে লাগল। প্রত্যেকের চোখে উদ্বেগ-আতংকের ঢেউ।
আহমদ মুসা শান্ত চোখে পার্টিশন ডোরে দাঁড়ানো লোকটিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল। শ্বেতবর্ণ চেহারা কিন্তু মুখাকৃতি ও দেহের মাপে লোকটি জাপানী ও ফিলিপিনোদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। লোকটি পাথরের মুর্তির মত স্থির অচঞ্চল দাঁড়িয়ে আছে।
এ বিমান-দস্যুতার কারণ কি? অর্থ লাভ, না কোন যাত্রী অপহরণের বিশেষ উদ্দেশ্য? কিন্তু কোন যাত্রীর প্রতিই তাদের মন দিতে দেখা যাচ্ছে না তো। আহমদ মুসা জেদ্দার রেস্টহাউসে দেখা সেই সহযাত্রীটির দিকে তাকাল। দেখল, সে তাকিয়ে আছে সেই বিমানদস্যুর দিকে। তার মুখে কিন্তু উদ্বেগ-আতংকের লেশমাত্র নেই, বরং কেমন একটা উন্মুখ ভাব তার চোখে। বিস্মিত হলো আহমদ মুসা।
জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল আহমদ মুসা। নিঃসীম নীল জলরাশি। নীল জলের নীল সীমানা নীল আকাশের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে। সে নীলের সীমানা পেরিয়ে হারিয়ে গেল আহমদ মুসার মন। পাকিস্তান হয়ে কারাকোরামের সিল্ক রোডের পথ ধরে সে প্রবেশ করবে মধ্য এশিয়ায়-এই ছিল তার পরিকল্পনা। কিন্তু কোথায় এখন চলেছে সে? অবশ্য কোন দুঃশ্চিন্তা তার মনে নেই। জ্ঞান ও বিবেকের রায় নিয়ে সে কাজ করে যেতে পারে, ফল তো তার হাতে নেই। আর ফলদানের যিনি মালিক তিনি সর্বজ্ঞ। সুতরাং চিন্তা কি তার!
আহমদ মুসার চিন্তা স্রোতে বাধা পড়ল। কেবিন-মাইক থেকে ঘোষিত হল, ভদ্রমহিলা, ভদ্রমহোদয়গণ! আমরা অল্পক্ষণের মধ্যেই ভারত মহাসাগরের কোন এক দ্বীপে ল্যান্ড করছি। আমি বেল্ট বেধে নেবার জন্য সকলকে অনুরোধ করছি।
আহমদ মুসা তার সন্ধানী চোখ নীচের নীল জলরাশির ওপর মেলে ধরল। আহমদ মুসা মনে মনে হিসেব করে দেখল, বিমান দু’হাজার মাইলের মত এসেছে। বিমান নীচে নামতে শুরু করেছে।
আরো দশ মিনিট কেটে গেল। অবশেষে দৃষ্টির পরিসীমায় ভেসে উঠল ছবির মত একটি দ্বীপ। ক্রমশ স্পষ্টতর হয়ে উঠল দ্বীপটি। চারদিকে অথৈ সাগর জলের মাঝে ছোট একখন্ড মরুদ্যানের মত মনে হচ্ছে দ্বীপটিকে।
চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে বিমানটি নেমে যেতে লাগল দ্বীপের ওপর, গভীর অরণ্যে আচ্ছাদিত দ্বীপ। আহমদ মুসা সবিস্ময়ে লক্ষ্য করল অল্প কিছু দুরত্বে পাশাপাশি দু’টি গাছের ওপর দু’টি সাদা নিশান উঠে এল। দু’টি নিশানের পাশ দিয়ে মেটে রংয়ের দীর্ঘ একটি রানওয়েও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
ভৌতিক সে রানওয়েতে ল্যান্ড করল বোয়িংটি। বিমান দস্যুদের মত একটি চেহারার একদল লোক এসে ঘিরে দাঁড়াল বিমানটিকে। ভিতরের বিমান-দস্যুটি কিন্তু যেমন দাঁড়িয়ে ছিল, তেমনিভাবে দাঁড়িয়ে রইল।
কি ঘটে কি হয় রুদ্ধ নিঃশ্বাসে সবাই মুহূর্ত গুণছে। বিমানের ফ্লোরে অনেক পায়ের শব্দ শোনা গেল। সাত আটজন ওরা উঠে এসেছে বিমানে। হাতে ওদের সাব-মেশিন গান। ওদের কয়েকজন এসে ঢুকল প্রথম শ্রেণীর কেবিনে। ইতিমধ্যে ককপিটের বিমান-দস্যুও এসে প্রবেশ করল এখানে। ওদের একজন বলল, ভদ্র মহিলা, ভদ্র মহোদয়গণ, “আমরা দুঃখিত যে একজন মাত্র লোকের জন্য আপনাদের কষ্ট দিয়েছি। আমরা তাকে নিয়ে যাচ্ছি। এরপর আপনারা মুক্ত।”
বক্তার দেহটি দামী কাল স্যুটে আবৃত। টাইটিও কাল। কাল টাইয়ের বুকে ধবধবে সাদা একটি সাপ আঁকা। সাপের মুখে রক্তাক্ত তিনটি ‘C’। উষ্ণ এক রক্তস্রোত বয়ে গেল আহমদ মুসার গোটা শরীরে। ট্রিপল সি? সেই কুখ্যাত ‘কু ক্লাক্স ক্লান’ এরা, যাদের হাতের প্রাণ দিচ্ছে লক্ষ লক্ষ অশ্বেতাংগ মানুষ?
লোকটির কথা শেষ হতেই রিভলভার নিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা বিমান দস্যুটি অকস্মাৎ সামনের আসনের একজন লোকের মাথায় রিভলভারের বাঁট দিয়ে আঘাত করে বলল, “হ্যালো, কালো বাজ, এখনও তোমার ঘুম ভাঙেনি, বুঝতে পারনি যম এসেছে তোমার?
‘কালো বাজ’ নামক লোকটি উঠে দাঁড়াল। সেও জাপানী বা ফিলিপাইনোদের মতই খাটো। কিন্তু তার নাসিকা উন্নত, নীল টানা চোখ, মাথায় ঘন কাল কোঁকড়ানো চুল।
লোকটি উঠে দাঁড়াতেই আরও দু’জন বিমান দস্যু তার দিকে এগিয়ে এল এবং তারা তাকে দু’দিক থেকে ধরে টেনে নামিয়ে নিয়ে গেল বিমান থেকে।
বিমান দস্যুদের সবাই বিমান থেকে নেমে গেল। আহমদ মুসা দেখল, জেদ্দা রেস্টহাউসে দেখা সেই কুতকুতে চোখের সহযাত্রীটিও তাদের পিছনে নেমে যাচ্ছে।
বিমান এবার মুক্ত। কেবিন-মাইকে ক্যাপ্টেন বললেন, আমরা কিছুক্ষণের মধ্যে আকাশে উড়ব। বিমানের গেট বন্ধ হতে যাবে, এমন সময় কয়েকজন বিমান দস্যু, আর সেই কুতকুতে চোখের লোকটি দ্রুত ফিরে এল। বিমানে প্রবেশ করল তারা। সোজা এসে তারা দাঁড়াল আহমদ মুসার সামনে। একজন আহমদ মুসাকে বলল, আপনি নেমে আসুন।
এই অভাবিত ঘটনা আহমদ মুসাকে চমকে দিয়েছিল। সে কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে গিয়েও চুপ করে গেল কি মনে করে। তারপর শান্তভাবে নেমে গেল বিমান থেকে তাদের সাথে।
বিমান থেকে নেমে মেটে রংয়ের রানওয়ে ছেড়ে সরু পাথরের গুড়ি বিছানো পথ ধরে তারা এগিয়ে চলল। দু’দিকেই জংগল। অপরূপ সবুজের রাজ্য এই দ্বীপটি। আহমদ মুসা ভাবল, বিচ্ছিন্ন ও বিজন এই দ্বীপে এত বিরাট, এত সুদৃঢ় রানওয়ে এল কোথা থেকে? রানওয়েটি বেশ পুরাতন। তাহলে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালে কোন শক্তির কি গোপন কোন বিমান ঘাঁটি ছিল এটা?
সেই সরু পথটি তাদেরকে সবুজ বৃহ্ম-লতা পরিবেষ্টিত একতলা এক সবুজ বাড়িতে নিয়ে এল। বাড়িটি একতলা হলেও বিরাট পাথরের তৈরী বাড়িটি খুবই মজবুত।
ইসপাতের দরজাওয়ালা দু’টি ঘর পেরিয়ে তারা এসে পৌঁছল এক হল ঘরে। ঘরে তখন তিনটি প্রাণী। কালো টাইয়ে সাদা সাপওয়ালা সেই লোকটি গা এলিয়ে বসে আছে সোফার পিছনে। আর কিছুক্ষণ আগে বিমান থেকে ধরে আনা ‘কালোবাজ’ নামক লোকটি পড়ে আছে মেঝেতে। তার নগ্ন পিঠে চাবুকের রক্তাক্ত দাগ। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে লোকটি জ্ঞান হারিয়েছে। আহমদ মুসা হল ঘরে প্রবেশ করতে করতে ভাবলো, ঐ চাবুক হয়তো তারই অপেক্ষা করছে। এক যন্ত্রণাদায়ক অনুভুতি এসে তার মনকে আচ্ছন্ন করতে চাইল। কিন্তু আহমদ মুসা আমল দিল না সে চিন্তাকে।
পায়ের শব্দে সোফায় গা এলিয়ে দেয়া সেই লোকটি চোখ খুলল। একবার আহমদ মুসার ওপর চোখ বুলিয়ে নিয়ে কুতকুতে চোখের সেই লোকটিকে বলল, এই কি আপনার আহমদ মুসা, মিঃ কোহেন?
-হাঁ, মিঃ স্মিথ।
এবার মিঃ স্মিথ নামক লোকটি সরাসরি আহমদ মুসার দিকে চেয়ে বলল, সত্যিই আপনি কি সেই আহমদ মুসা? আপনি কি সাইমুমের অধিনায়ক?
-হাঁ। পরিষ্কার কন্ঠে বলল আহমদ মুসা।
মিঃ স্মিথ উঠে দাঁড়িয়ে মিঃ কোহেনের দিকে চেয়ে বললেন, ‘আমাদের দাবী মেনে নিলে আমরা আপনার প্রস্তাবে রাজী আছি। জানিয়ে দিন আপনার বসদের। তারপর সে চাবুকধারীদের দিকে চেয়ে বলল, এ ঘরেই এরা থাকবে, বাইরে থেকে তালা দিয়ে চাবি মিস মার্গারেটকে দিয়ে দিও। আর তোমরা চারজন বাইরের ফটক ছেড়ে কোথাও যেও না।
সবাই বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। দরজা বন্ধ হল, দরজায় তালা লাগানোর শব্দ পাওয়া গেল সেই সাথে। ওপরে কয়েকটি ঘুলঘুলি এবং ঐ একটি মাত্র দরজা ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়ার আর দ্বিতীয় কোন পথ নেই।
এবার মেঝেতে পড়ে থাকা লোকটির দিকে মনোযোগ দিল আহমদ মুসা। তার মুখের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে দু’হাতে তার মুখ একটু তুলে ধরল। সঙ্গে সঙ্গে লোকটির চোখ দু’টিও খুলে গেল। নির্বিকার ও নিরুত্তাপ তার দৃষ্টি। আবার চোখ বুজল সে।
-এখন কেমন বোধ করছেন?
লোকটি চোখ খুলল। বিস্ময় তার চোখে। বলল সে, কে আপনি?
-বিমান থেকে আমাকেও ওরা ধরে এনেছে। ‘এ ব্যাপারে আমি আপনার মতই অন্ধকারে।’ বলেই আহমদ মুসা পকেট থেকে রুমাল বের করে তার পিঠের রক্ত ধীরে ধীরে মুছে দিতে লাগল।
-আমাদের অস্তিত্বই আমাদের অপরাধ।
-অর্থাৎ?
-আমাদেরকে ওরা পৃথিবীর বুক থেকে মুছে ফেলতে চায়।
-আপনার দেশ কোথায়?
-মিন্দানাও।
-ফিলিপাইনের মিন্দানাও দ্বীপে! আপনি মুসলমান?
-হাঁ, আমি মুসলমান।
আহমদ মুসা চিন্তা করল। যেন কিছু মিলিয়ে নিচ্ছে সে। তারপর বলল, আপনি কি আবদুল্লাহ হাত্তা? প্যাসেফিক ক্রিসেন্ট ডিফেন্স আর্মির অধিনায়ক কি আপনিই?
-হাঁ, কিন্তু আপনি কে? এত কথা জানেন কেমন করে? চোখে তার একরাশ বিস্ময়।
আহমদ মুসা অপলক চোখে তাকিয়ে ছিল আবদুল্লাহ হাত্তার দিকে। তার চোখে-মুখে বিস্ময় ও আনন্দের অপূর্ব জ্যোতি। তারপর ধীরে ধীরে মুখ খুলল সে। বলল, ফুল ফুটলে সৌরভ ছোটে।
-কিন্তু আপনি কে?
-আমি আহমদ মুসা।
-কোন আহমদ মুসা। ফিলিস্তিন বিজয়ী সাইমুমের অধিনায়ক আহমদ মুসা?
-হাঁ, সেই হতভাগা আমি।
দু’জনের চোখেই আনন্দের উজ্জ্বল ঢেউ। জড়িয়ে ধরল দু’জন দু’জন কে। আবদুল্লাহ হাত্তা ভুলে গেছে যেন সব বেদনা-সব যন্ত্রণা। তার দু’চোখ বেয়ে নামছে আনন্দের অশ্রু।
