• আমাদের সম্পর্কে
  • যোগাযোগ
  • গোপনীয়তা নীতি
সোমবার, জুন 8, 2026
  • Login
BnBoi.Com
  • বাংলাদেশী লেখক
    • অতুলচন্দ্র গুপ্ত
    • অভিজিৎ রায়
    • আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    • আনিসুল হক
    • আবু ইসহাক
    • আবু রুশদ
    • আবুল আসাদ
    • আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন
    • আবুল বাশার
    • আরজ আলী মাতুব্বর
    • আল মাহমুদ
    • আসাদ চৌধুরী
    • আহমদ ছফা
    • আহমদ শরীফ
    • ইমদাদুল হক মিলন
    • উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    • কাসেম বিন আবুবাকার
    • জসীম উদ্দীন
    • তসলিমা নাসরিন
    • দাউদ হায়দার
    • দীনেশচন্দ্র সেন
    • নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    • নিমাই ভট্টাচার্য
    • প্রফুল্ল রায়
    • প্রমথ চৌধুরী
    • ময়ূখ চৌধুরী
    • মহাদেব সাহা
    • মাহমুদুল হক
    • মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    • হুমায়ূন আহমেদ
  • ইন্ডিয়ান লেখক
    • অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়
    • অতুল সুর
    • অদ্রীশ বর্ধন
    • অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    • অনীশ দেব
    • অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    • অমিয়ভূষণ মজুমদার
    • আশাপূর্ণা দেবী
    • আশুতোষ মুখোপাধ্যায়
    • ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    • কাজী নজরুল ইসলাম
    • ক্ষিতিমোহন সেন
    • তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    • তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়
    • দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    • নারায়ণ সান্যাল
    • নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    • নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    • পাঁচকড়ি দে
    • পূর্ণেন্দু পত্রী
    • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    • বিমল মিত্র
    • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    • হেমেন্দ্রকুমার রায়
  • বিভাগসমূহ
    • আত্মজীবনী
    • ইতিহাস
    • উপন্যাস
    • কবিতা
    • কল্পকাহিনী
    • কাব্যগ্রন্থ
    • খেলাধুলার বই
    • গল্পের বই
    • গোয়েন্দা কাহিনী
    • ছোট গল্প
    • জীবনী
    • দর্শন
    • ধর্মীয় বই
    • নাটকের বই
    • প্রবন্ধ
    • বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী
    • বৈজ্ঞানিক বই
    • ভূতের গল্প
    • মুক্তিযুদ্ধের-বই
    • রহস্যময় গল্পের বই
    • রোমাঞ্চকর গল্প
    • রোম্যান্টিক গল্পের বই
    • শিক্ষামূলক বই
    • সমগ্র
  • সিরিজ বই
    • মিসির আলী সমগ্র
    • হিমু সিরিজ
No Result
View All Result
  • বাংলাদেশী লেখক
    • অতুলচন্দ্র গুপ্ত
    • অভিজিৎ রায়
    • আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    • আনিসুল হক
    • আবু ইসহাক
    • আবু রুশদ
    • আবুল আসাদ
    • আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন
    • আবুল বাশার
    • আরজ আলী মাতুব্বর
    • আল মাহমুদ
    • আসাদ চৌধুরী
    • আহমদ ছফা
    • আহমদ শরীফ
    • ইমদাদুল হক মিলন
    • উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    • কাসেম বিন আবুবাকার
    • জসীম উদ্দীন
    • তসলিমা নাসরিন
    • দাউদ হায়দার
    • দীনেশচন্দ্র সেন
    • নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    • নিমাই ভট্টাচার্য
    • প্রফুল্ল রায়
    • প্রমথ চৌধুরী
    • ময়ূখ চৌধুরী
    • মহাদেব সাহা
    • মাহমুদুল হক
    • মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    • হুমায়ূন আহমেদ
  • ইন্ডিয়ান লেখক
    • অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়
    • অতুল সুর
    • অদ্রীশ বর্ধন
    • অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    • অনীশ দেব
    • অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    • অমিয়ভূষণ মজুমদার
    • আশাপূর্ণা দেবী
    • আশুতোষ মুখোপাধ্যায়
    • ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    • কাজী নজরুল ইসলাম
    • ক্ষিতিমোহন সেন
    • তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    • তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়
    • দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    • নারায়ণ সান্যাল
    • নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    • নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    • পাঁচকড়ি দে
    • পূর্ণেন্দু পত্রী
    • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    • বিমল মিত্র
    • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    • হেমেন্দ্রকুমার রায়
  • বিভাগসমূহ
    • আত্মজীবনী
    • ইতিহাস
    • উপন্যাস
    • কবিতা
    • কল্পকাহিনী
    • কাব্যগ্রন্থ
    • খেলাধুলার বই
    • গল্পের বই
    • গোয়েন্দা কাহিনী
    • ছোট গল্প
    • জীবনী
    • দর্শন
    • ধর্মীয় বই
    • নাটকের বই
    • প্রবন্ধ
    • বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী
    • বৈজ্ঞানিক বই
    • ভূতের গল্প
    • মুক্তিযুদ্ধের-বই
    • রহস্যময় গল্পের বই
    • রোমাঞ্চকর গল্প
    • রোম্যান্টিক গল্পের বই
    • শিক্ষামূলক বই
    • সমগ্র
  • সিরিজ বই
    • মিসির আলী সমগ্র
    • হিমু সিরিজ
No Result
View All Result
BnBoi.Com
No Result
View All Result

সাইমুম সিরিজ – আবুল আসাদ

ক্ষুধা তৃষ্ণায় অবসন্ন আহমদ মুসার চোখে কেমন তন্দ্রার ভাব এসে গিয়েছিল। দরজার চাবি খোলার ধাতব শব্দে তার তন্দ্রার ভাব কেটে গেল। ভাবল সে, আবদুল্লাহহ হাত্তাকে নিয়ে এলো বোধ হয়। আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি উঠে বসল। মনটি প্রসন্ন হয়ে উঠল তার।
দরজা খুলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে এক ঝলক আলো এসে ভাসিয়ে দিল কক্ষটি। বাইরের করিডোরটি সোডিয়াম লাইটের উজ্জ্বল আলোতে হাসছে।
দরজায় দাঁড়িয়ে একজন দীর্ঘদেহী। হাত দু’টি প্যান্টের পকেটে ঢোকানো।
হ্যাল্লো, Cased Lion কেমন আছ। বাঁকা হাসি তার চোখে-মুখে।
উত্তরের অপেক্ষা না করে মুখটি ঈষৎ ফিরিয়ে বলল, এসো ডার্লিং এই যে।
তার কথা শেষ হতেই এক তরুনী এসে দরজার মুখে দাঁড়ালো। জ্বলন্ত আগুন যেন মেয়েটি। দেহের দুধে আলতা রংগে লাল জ্যাকেট আরও অপরূপ করে তুলেছে। বব কাট চুল। টানা নীল চোখ। কিছুটা বেঁটে মেয়েটি। অনেকটা মালয়ী বৈশিষ্ট্য দেহে।
লোকটি বলল, দেখ, আমার ডার্লিং-এর তোমাকে দেখার বড় ইচ্ছা।
-চিড়িয়াখানার জন্তু বানিয়েছ কি না। নিরুত্তাপ কন্ঠ আহমদ মুসার।
-No sir, you are more then that, মেয়েটির মুখে চটুল হাসি।
-Definitely, তুমি যা করেছ, চিড়িয়াখানার জন্তুর চেয়ে তা শতগুনে অদ্ভুত। তরল রসিকতার স্বরে বলল লোকটি।
-কিন্তু ক্যাপটেন, এঁকে এমন করে তোমরা জন্তু জানোয়ারের মত করে রেখেছ কেন। তোমাদের সাথে এর কোন শত্রুতা নেই। মেয়েটির স্বর নরম।
-বললাম তো, এ হলো Cased Lion. একটু সুযোগ, কিংবা খাঁচার একটু দুর্বলতা পেলে খাঁচা থেকে পালাবে। জানো তো, তাহলে আমাদের কত ক্ষতি। কম নয় ৫০ মিলিয়ন ডলার- ৫ কোটি ডলার।
-যাই বল, আমি হলে কিন্তু আমার কাছ থেকে সামান্য সহযোগিতাও পেতনা। দু’চোখে দেখতে পারি না ওদের আমি। জানো যুক্তরাষ্ট্রকে ওরা কেমন শোষণ করছে।
আহমদ মুসা যেন ব্যাপারটা আঁচ করতে পারল। টাকার বিনিময়ে ট্রিপল সি, কি তাহলে ইহুদীদের পক্ষে কাজ করছে। ইহুদীদের হাতে তাকে তুলে দেয়াই কি এদের আসল লক্ষ্য? পরখ করার জন্য আহমদ মুসা মেয়েটিকে সরাসরি প্রশ্ন করে বলল, আপনি কি ইহুদীদের কথা বলছেন?
দু’জনেই ওরা চমকে উঠে আহমদ মুসার দিকে তাকাল। পরে লোকটি বলল, ‘বুঝে ফেলেছ তাহলে, তা তোমার বুঝবার কথাই বটে।’ একটু থেমে লোকটি হেসে বলল, ভয় করছে না ইহুদীদের।
-কাউকেই আমি ভয় করি না। বলল আহমদ মুসা।
-তাহলে ঘৃণা করেন? মৃদু হেসে ত্বরিত কন্ঠে বলল মেয়েটি।
-কোন মানুষকেই আমি ঘৃণা করি না।
-ওদের সাথে তাহলে শত্রুতা কেন? লোকটি বলল।
-অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, অত্যাচারীর প্রতিরোধ করা আমার ধর্ম।
মেয়েটি মুগ্ধ চোখে তাকিয়েছিলো আহমদ মুসার দিকে। বলল, তোমার ধর্মের কথা নাকি ওটা?
-নিশ্চয়, ‘তা মুরুনা বিল মারুফে ওয়া তানহাওনা আনিল মুনকার’ (ন্যায়ের জন্য নির্দেশ দাও, অন্যায়ের প্রতিরোধ কর)- এটা আমার নয়, আল কোরআন-এর কথা।
এ সময় একটি ট্রে হাতে একজন লোক এসে দরজায় দাঁড়াল।
তার পিছনেই সাব মেশিনগান হাতে একজন প্রহরী।
ওদের দেখেই পূর্বোক্ত লোকটি মেয়েটিকে লক্ষ্য করে বলল, এসো স্মার্থা এবার যাওয়া যাক। খাবে এখন।
ওরা চলে গেল। মেয়েটির প্রতি লোকটির শেষ সম্বোধন আহমদ মুসার দৃষ্টি এড়ালো না। তাহলে মেয়েটি লোকটির স্ত্রী নয়?
খেতে খেতে আহমদ মুসা ভাবছিল। অনেক কিছই তার কাছে এখন পরিস্কার। কিন্তু জাহাজ এখন কোথায়? কোথায় যাচ্ছে এ জাহাজ? হঠাৎ তার মাথায় একটি বুদ্ধি খেলে গেল। খাওয়া শেষে যখন থালা-বাসন গুছিয়ে নিচ্ছিল বেয়ারা লোকটি, তখন আহমদ মুসা বলল, দ্বিতীয় খানা আবার কবে হবে বেয়ারা।
বেয়ারা আহমদ মুসার দিকে চাইল। প্রশ্নের ধরনে বোধ হয় সে কিছুটা কৌতুক বোধ করল। বলল সে, কর্তার যখান ইচ্ছা। একটু থেমে সে বলল, কাল দুপুর নাগাদ আমরা মিন্দানাওয়ে পৌছে যাব। কাল সকালে একবার খাবার দেবার হুকুম হতেও পারে।
চট করে আহমদ মুসা প্রশ্ন করল, এখন কয়টা বাজে বেয়ারা?
-সন্ধ্যা ৭টা।
ওরা চলে গেল। আবার বন্ধ হয়ে গেল কক্ষের দরজা। সেই নিঃসীম ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে গেল আহমদ মুসা।
পেটের জ্বালা কমল। মিন্দানাও পৌছার পূর্বে ইহুদীদের হাতে তাকে হস্তান্তর করা হচ্ছে না, এ সম্পর্কেও সে নিশ্চিত। কিন্তু আবদুল্লাহ হাত্তার জন্য মনটি তার অস্থির হয়ে উঠেছে। হাত্তা সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন আহমদ মুসা ইচ্ছা করেই ওদেরকে জিজ্ঞাসা করেনি।
এ কক্ষ থেকে কিভাবে বের হওয়া যায়? দরজার ইন্টারলক ল্যাসার বিম দিয়ে গলিয়ে সহজেই বের হওয়া যায়, কিন্তু এটা তাদের চোখে পড়বে সহজেই। আহমদ মুসা ওদের মনে তার সম্বেন্ধে কোন সন্দেহের উদ্রেক করতে চায় না। তাহলে?
আহমদ মুসা চিন্তা করল, নিশ্চয়ই এই ঘরের সারিতে আরও ঘর আছে এবং সে ঘরগুলোতে নিশ্চয়ই কোন লোক বাস করে না। গোডাউন হিসেবে ব্যবহৃত হয় ঘরগুলো। সুতরাং পাশের ঘর দিয়ে বের হওয়াই নিরাপদ।
চিন্তার সঙ্গে সঙ্গেই কাজ শুরু করে দিল আহমাদ মুসা।
কি জানি কেন ওরা যাবার সময় বেঁধে রেখে যায়নি তাকে। আহমদ মুসার শান্ত ব্যবহারে ওরা বোধ হয় ওকে কিছুটা নিরাপদ বোধ করেছে।
সুতরাং আহমদ মুসার সুবিধা হলো। জুতার গোড়ালির একাংশে চাপ দিতেই উপরের অংশ এক পাশে সরে গেল। গোড়ালির খোপ থেকে দু’ ইঞ্চি পরিমাণ লম্বা একটি ল্যাসার বিম টর্চ বের করে নিল সে।
অন্ধকারের মধ্যে হাতড়িয়ে উত্তর দিকের দেয়ালের দরজার কাছাকাছি একটি স্থান ঠিক করে নিয়ে সে বসে পড়ল। অন্ধকারের মধ্যেই সে ল্যাসার বিমের মাথার ক্যাপটি খুলে নিল, তারপর পরীক্ষামূলকভাবে ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে পিছনের দিকের ক্ষুদ্র একটি বোতাম টিপে ধরল।
সঙ্গে সঙ্গে টর্চের পিনহেড মাথা দিয়ে চোখ ঝলসানো এক আলোকশলাকা তীরের মত বেরিয়ে এলো। উজ্জ্বল এক আভায় অনেকখানি জায়গা আলোকিত হয়ে উঠল।
আহমদ মুসা ল্যাসার বিম টর্চ ইস্পাতের দেয়ালে চেপে ধরল। মোমের মত গলে পড়তে লাগল ইস্পাত। মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে ২ বর্গফুট পরিমিত স্থানের ইস্পাত সিট কেটে সরিয়ে নিল আহমদ মুসা।
সুড়ঙ্গ পথে হাত বাড়িয়ে দেখল দেয়ালের ওপারে কোন কিছু নেই। সে মাথা গলিয়ে ওপরের ঘরে ঢুকে গেল। ঘরে কি আছে আধারে কিছুই ঠাহর করতে পারলোনা সে। ল্যাসার বিম টর্চটি মুহূর্তের জন্য আবার জ্বালালো। ঘরের অনেকখানি জায়গা আলোকিত হয়ে উঠল। সেই আলোকে দেখল, ছোট ছোট কালো বাক্সে ঘরটি ভর্তি। কৌতুহল হল তার, এমন সব ক্ষুদ্র বাক্সে কি থাকতে পারে?
একটি বাক্স হাতে তুলে নিয়ে সে ল্যাসার বিম দিয়ে ঢাকনির চারটি স্ক্রু গলিয়ে ফেলল। তাপর বাম হাতে অতি সন্তর্পণে ঢাকনি খুলে নিল। ভিতরে গোলাকৃতি লোহার সিলিন্ডার। ঠিক ছোট ফুটবলের মত। সিলিন্ডারের গায়ে এক জায়গায় একটি সুইচ বসানো। লোহার এতবড় একটি সিলিন্ডার যতটুকু ভারি হতে পারে তার চেয়ে এটা অন্তত দশগুণ বেশী ভারী। বিস্মিত হলো আহমদ মুসা। হঠাৎ আহমদ মুসার মনে হলো ট্রিপল সি’র এটা কোন বিশেষ মারণাস্ত্র নয়তো? জাহাজটি কি ট্রিপল সি’র জন্য অস্ত্রের চালান নিয়ে যাচ্ছে?
এ নুতন চিন্তার উদ্রেক হবার সাথে অপর কক্ষগুলো অনুসন্ধান করে দেখার দুর্বার ইচ্ছা জাগল আহমদ মুসার মনে।
ল্যাসার বিম দিয়ে দেয়ালে সুড়ঙ্গ কেটে পরবর্তী রুমেও প্রবেশ করল আহমদ মুসা। বিভিন্ন মিলিটার কামানের গোলায় ভর্তি সে ঘর। আহমদ মুসা দেখে বিস্মিত হলো- ১৫০ মিলিটার কামানের গোলাও সেখানে রয়েছে।
অন্য ঘরগুলোও তাহলে অস্ত্রে ভর্তি, স্থির করল আহমদ মুসা।
অতঃপর সে তৃতীয় ঘরটির সামনের দেয়াল সুড়ঙ্গ কেটে করিডোরে বেরিয়ে এলো। করিডোরটি অন্ধকারে ডুবে আছে। সে একটু দাঁড়িয়ে দিক ঠিক করে নিল। তার ঘরের ওপাশের দিক থেকে লোকেরা তার ঘরে এসেছে এবং গেছে। সুতরাং ওদিক দিয়েই জাহাজের ডেকে উঠা যাবে বলে ভাবল সে।
আহমদ মুসা তার ঘর পাশে রেখে বিড়ালের মত সামনে এগিয়ে চলল। কয়েক গজ যাবার পর হঠাৎ সামনে থেকে ভারি বুটের শব্দ এলো তার কানে। কে যেন আসছে। প্রহরী নয়তো? এখনি টর্চ জ্বাললেই তো সে ধরা পড়ে যাবে। করিডোরের দু’পাশে সারিবদ্ধ ঘর। লুকোবার কোন জায়গা নেই। আহমদ মুসা দ্রুত হেঁটে লোকটির নিকটবর্তী হতে চাইল। কিন্তু তার আগেই জ্বলে উঠল টর্চ। লোকটি তখনও চার পাঁচ গজ দূরে।
টর্চ জ্বলে উঠার সঙ্গে সঙ্গে আহমদ মুসা করিডোরে ঝাপিয়ে পড়ে ফুটবলের মত গড়িয়ে দ্রুত ছুটল লোকটির দিকে। লোকটি এমনি ভূতুড়ে কিছু আশা করেনি। সে কিছু বুঝে উঠার পূর্বেই পায়ের গোড়ালীর উপর প্রচন্ড ধাক্কা খেল। লোকটি উপুড় হয়ে আহমদ মুসার গায়ের উপরই পড়ে গেল। পড়ে গিয়েই কিন্তু লোকটি জাপটে ধরল আহমদ মুসার মাথা। লোকটি তার হাত আহমদ মুসার গলায় নামিয়ে নিচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই আহমদ মুসার প্রচন্ড ঘুষি গিয়ে পড়ল লোকটির তলপেটে। পরমুহূর্তেই লোকটির হাত পা শিথিল হয়ে গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে।
আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি লোকটিকে টেনে এনে সেই সুড়ঙ্গ পথে কামানের গোলাপূর্ণ ঘরের মধ্যে গুজে দিল। তারপর লোকটির টর্চ ও রিভলবার কুড়িয়ে নিয়ে সে সামনে এগুলো।
টর্চ থাকায় কাজের অনেক সুবিধা হলো। টর্চ জ্বেলে গোটা করিডোরটাকে সে একবার দেখে নিল। দু’পাশে সারিবদ্ধ ঘর। মাত্র দুটি ঘর ছাড়া সবগুলো একদম সিল করা। এ দু’টি ঘরের একটিতে সে ছিল অন্যটিতে কি আছে? ওটা সিল করা নয় কেন? ওটাও কি তাহলে বন্দীশালা? আবদুল্লাহ হাত্তাকে ওখানে রাখা হয়নি তো?
আহমদ মুসা ফিরে এসে রুমটির সামনে দাঁড়াল। জুতার গোড়ালি থেকে ল্যাসার বিম টর্চ বের করে ইন্টারলক গলিয়ে প্রবেশ করল সে। ভালো করে দরজা এটে দিয়ে টর্চ জ্বালাল আহমদ মুসা।
ঘরটি শূন্য। একটি মাত্র লম্বা কাঠের বাক্স পড়ে আছে। বাক্সের ঢাকনির স্ক্রু আটা নয়-পল্লাস্টিক কর্ড দিয়ে বাঁধা। বাঁধন ছিড়ে ঢাকনা খুলে ফেলল আহমদ মুসা। বাক্সের মধ্যে টর্চের আলো ফেলেই আৎকে উঠল সে।
বাক্সের মধ্যে আবদুল্লাহ হাত্তার লাশ। চোখ দু’টি তার বিষ্ফারিত। গোটা দেহ কালচে হয়ে গেছে। আহমদ মুসা হাত দিয়ে দেখল, গোটা দেহটাই তার ভীষণ শক্ত।
ইলেকট্রিক শক্ দিয়ে ওকে হত্যা করা হয়েছে-স্বগত কন্ঠে বলল আহমদ মুসা।
বিমূঢ়ভাবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল আহমদ মুসা লাশের দিকে চেয়ে। তারপর স্বগত কণ্ঠে বলল, ‘‘বিদায় বন্ধু। তুমি যে দায়িত্বের বোঝা রেখে গেলে, সানন্দে আমি তা কাঁধে তুলে নিলাম। কথা দিচ্ছি যে পা আজ সামনে বাড়ালাম, একমাত্র মৃত্যু ছাড়া তাকে আর কিছুই থামিয়ে দিতে পারবে না।’’
আবদুল্লাহ হাত্তার মুখ থেকে চোখ নামিয়ে ঘুরে দাড়াল আহমদ মুসা। সামনে পা বাড়াল তারপর।

২

যেতে যেতে আহমদ মুসা ভাবল, জাহাজটি অস্ত্র বোঝাই হয়ে যাচ্ছে মিন্দানাও। অস্ত্রগুলো ব্যবহৃত হবে মিন্দানাও এর অসহায় মানুষের বিরুদ্ধে। সুতরাং জাহাজটিকে পৌছতে দেয়া যায় না মিন্দানাওয়ের মাটিতে।
মনে মনে হাসল সে । এখন সে ‘রুথ থান্ডার’- নির্মম বজ্র।
কয়েক গজ সামনে এগিয়েই বামে ঘুরে সে ডেকে উঠার সিড়ি পেয়ে গেল।
মুহূর্তের জন্য টর্চ জ্বালাল সে । সিঁড়ির মুখের দরজা খোলাই আছে দেখা গেল। খুশী হলো আহমদ মুসা।
সিঁড়ির মুখের দরজা ঠেলতে গিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ল সে। উপরের ডেকে কি প্রহরী নেই? হঠাৎ এই সময় সিঁড়ির মাঝে পায়ের শব্দ শোনা গেল। আহমদ মুসা দ্রুত সিঁড়ি ছেড়ে করিডোরের দেয়ালে গিয়ে দাড়াল।
সিঁড়ির দরজা খুলে গেল। সিঁড়ির মুখে মুখ বাড়িয়ে কে একজন চাপা গলায় ডাকলঃ ব্রাডলি, ব্রাডলি?
কিছুক্ষণ থামল। বোধ হয় উত্তরের অপেক্ষা করল। তারপর ডাকল, ‘কোথায় রে ব্রাডলি। মজা দেখবি তো আয়।’
কোন সাড়া না পেয়ে ‘শালা ঘুমিয়েছে নিশ্চয়’ বলতে বলতে লোকটি সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল। আহমদ মুসা ভাবল, যে প্রহরীটিকে সে ঘুম পাড়িয়েছে তার নামই তাহলে ব্রাডলি। এ লোকটি সে ব্রাডলির খোঁজেই আসছে।
করিডোরের মুখে দেয়ালের ভাঁজে আহমদ মুসা প্রস্তুত হয়ে দাড়িয়ে রইল। গুলী ছুঁড়ে শব্দ করা চলবে না, এটা আহমদ মুসা আগেই ঠিক করে নিয়েছিল।
লোকটি সিড়ি পথের ভাঁজ ঘুরে যখন করিডোরের মুখে পড়ল অমনি আহমদ মুসা রিভলভারের বাঁট দিয়ে প্রচন্ড এক আঘাত হানল ডান কানের নীচের ঘাড় লক্ষ্য করে।
অষ্ফুট এক শব্দ বেরুল লোকটির মুখ দেয়ে। টর্চটি সশব্দে খসে পড়ল নীচে। কিন্তু আহমদ মুসা লোকটির জ্ঞানহীন দেহটি ধরে রাখল।
এ লোকটিকেও আগের মত পূর্বোক্ত ঘরে ব্রাডলির পাশে গুঁজে দিয়ে আহমদ মুসা চলে এলো। সিঁড়ি ভেঙে খোলা দরজা পথে ডকে উঠল সে। চকিতে একবার চারদিকে সে দেখে নিল। না, কেউ কোথাও নেই।
তারকাখচিত উপরের আকাশ। চাঁদ নেই আকাশে। আদিগন্ত সাগরের বুকে যেন এক বিরাট কাল চাদর বিছানো। দু’পাশে পানি কেটে বিরাট শব্দ তুলে এগিয়ে চলেছে জাহাজটি।
মনে হল কতদিন থেকে মুক্ত বাতাসের দেখা পায়নি আহমদ মুসা। বুক ভরে সে নিঃশ্বাস নিল। কত প্রশান্তি এ মুক্ত বাতাসে।
মালপত্র বহনোপযোগী মাঝারি ধরনের জাহাজ এটি। উপরে বেশ কিছু ডেক কেবিনও রয়েছে। নীচের কেবিনগুলোর সবগুলোই বন্ধ-ভিতর থেকে বন্ধ। আলো দেখা যায় না কোন কেবিন থেকেই।
উপরের একটি কেবিনের কাঁচের গরাদ দিয়ে আলো দেখা যাচ্ছে।
রিভলভার বাগিয়ে ধীর পদক্ষেপ আহমদ মুসা সামনে এগুলো। নীচের কেবিনগুলো থেকে উপরে উঠার এ সংকীর্ণ সিড়ি দেখা গেল। সেই সিড়ি বেয়ে সে শিকারী বিড়ালের মত নিঃশব্দে উপর উঠে গেল।
কোথা থেকে যেন চাপা কথা ভেসে আসছে? উৎকর্ণ হল আহমদ মুসা। হাঁ, দক্ষিণ প্রান্তের কোন এক কেবিন থেকে কথা ভেসে আসছে?
শব্দ অনুসরণ করে আহমদ মুসা সামনে এগুলো। একটি কক্ষের সামনে এসে দাঁড়ালো সে। দরজা ভেজানো। কি হোলে চোখ লাগিয়ে সে স্মার্থা ও ক্যাপটেনকে দেখতে পেল। স্মার্থা নাইট গাউন পরা। মাথার চুল এলোমেলো। চোখে-মুখে ভয়ার্ত ভাব। হাতে তার রিভলবার। ক্যাপটেনের পরণে সেই আগের পোশাক।
স্মার্থা বলছিল, এ দুঃসাহসের জন্য তোমাকে শাস্তি পেতে হবে ক্যাপটেন। ক্যাপটেন বলল, তোমাকে পেলে আমি মরতেও রাজি আছি। জানো কতদিন থেকে আমি তোমার দিকে চেয়ে আছি। কাল তুমি নেমে যাচ্ছ মিন্দানাওয়ে। আর সুযোগ হয়তো হবে না কোনদিন।
-আমি সরদারকে সব কথা বলবো গিয়ে। জানো এর ফল কি দাঁড়াতে পারে?
-সরদারও সাধু নয় স্মার্থা।
একটু থামল ক্যাপটেন। পরে বললো, কোন ভয় দেখিয়েই তুমি আমাকে ফিরাতে পারবে না স্মার্থা। বলে সে দু’হাত বাড়িয়ে এগুতে লাগল স্মার্থার দিকে।
স্মার্থা দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে রিভলভারটি তুলে ধরে বলল, আর এক পা এগুলে গুলী করব ক্যাপটেন।
কিন্তু কথাটি স্মার্থার মুখ থেকে শেষ হবার আগেই ক্যাপটেন ঝাপিয়ে পড়ল তার উপর। স্মার্থার হাত থেকে রিভলভার ছিটকে পড়ে গেল। স্মার্থাও পড়ে গেছে মেঝের উপর কাত হয়ে।
ক্যাপটেন তার মুখে এক হাত দিয়ে চেপে ধরে তাকে তুলে নিয়ে বিছানার উপর গিয়ে পড়ল।
স্মার্থা বোধ হয় তার হাত কামড়ে ধরেছিল। ক্যাপটেন উঃ বলে তার হাত স্মার্থার মুখ থেকে সরিয়ে নিল। কিন্তু নিজেকে মুক্ত করতে পারলো না স্মার্থা। চীৎকার করে উঠল সে।
আহমদ মুসা দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করল। ক্যাঁচ করে এক শব্দ উঠলো দরজার স্প্রিং থেকে।
দরজার শব্দে পিছনে ফিরে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে ক্যাপটেন।
ক্যাপটেন মেঝেয় পড়ে থাকা স্মার্থার রিভলভারের দিকে এগুচ্ছিলো। রিভলভারের উপর ঝুঁকে পড়েছিল সে।
আহমদ মুসার গম্ভীর কন্ঠ ধ্বনিত হলো, রিভলভারে হাত দিওনা ক্যাপটেন, হাত গুঁড়ো হয়ে যাবে।
ক্যাপটেন রিভলভারে হাত দিল না। কিন্তু চোখের নিমিষে অদ্ভুত ক্ষিপ্রতার সাথে দেহটিকে মেঝের উপর দিয়ে গড়িয়ে ছুড়ে দিল আহমদ মুসার দিকে। তার জোড়া দুটি পা ছুটে এলো আহমদ মুসার তলপেট লক্ষ্য করে।
আহমদ মুসা ছিটকে এক পাশে সরে দাঁড়িয়েছিল। ক্যাপটেনের লাথি লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ায় তার তার দু’টি পা আছড়ে পড়ল মাটিতে। আর কোন সুযোগ সে পেল না। আহমদ মুসার পয়েন্টেড সু’র মারাত্মক এক লাথি গিয়ে পড়ল ক্যাপটেনের তলপেটে। সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারিয়ে এলিয়ে পড়ল সে।
ইতিমধ্যে স্মার্থা পোশাক পরে নিয়েছে। বিমূঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিল সে। আহমদ মুসা স্মার্থার দিকে চেয়ে বলল, কিছু দড়ি পেতে পারি ম্যাডাম?
স্মার্থা কিছু না বলে সামনের কাপবোর্ড থেকে পল্লাষ্টিকের তৈরী একগুচ্ছ দড়ি এনে দিল তাকে।
ক্যাপটেনকে ভালো করে বেঁধে রেখে আহমদ মুসা স্মার্থাকে বলল, ধন্যবাদ ম্যাডাম। আমি কি আরও কিছু সাহায্য পেতে পারি আপনার?
-কি সাহায্য চান?
-এক শিশি ক্লোরফরম পেলে উপকৃত হতাম।
-ক্লোরফরম কি উপকারে আসবে?
-এটা কি ভেঙ্গে বলার প্রয়োজন করে?
-একটু ভেবে স্মার্থা বলল, আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ, কিন্তু এ কাজে তো আমি আপনাকে সহযোগিতা করতে পারি না।
আহমদ মুসা একটু হেসে বলল, হিসেবে ভুল হয়েছিল ম্যাডাম। মুহূর্তের জন্য শত্রু ভাবতে আপনাকে ভুলে গিয়েছিলাম। থামল আহমদ মুসা।
একটু থেমে আবার সে বলল, ক্যাপটেনকে আমার নিয়ে যেতে হচ্ছে। আর আপনাকে এ ঘরে বন্ধ থাকতে হবে। আশা করি বেঁধে রাখার দরকার হবে না।
কথা শেষ করে আহমদ মুসা টেবিল থেকে স্মার্থার চাবির রিং নিয়ে ক্যাপটেনকে টেনে ঘরের বাইরে চলে গেল।
স্মার্থার ঘরে চাবি এঁটে সে মুহূর্তের জন্য ভাবল, ঘটনা যতদূর গড়িয়েছে, তাতে এখন তার সামনে দু’টি পথ- প্রথমতঃ জাহাজটিকে ধ্বংস করে ফেলা, দ্বিতীয়তঃ জাহাজটিকে দখল করা।
আহমদ মুসার কাছে আপাতত দ্বিতীয়টিই যুক্তিযুক্ত বলে মনে হলো। প্রথমটি হবে সবশেষের সিদ্ধান্ত।
স্মার্থার ঘরটি দক্ষিণ প্রান্তের শেষ ঘর। স্মার্থার ঘরের সামনের করিডোরটি দক্ষিণ দিক দিয়ে ঘুরে পশ্চিম প্রান্তে গিয়ে শেষ হয়েছে। আহমদ মুসা ক্যাপটেনের সংজ্ঞাহীন দেহ দক্ষিণ দিকের করিডোরে রেখে প্রথমে ওয়্যারলেস রুমে যাবে ঠিক করল।
ক্যাপটেনের দেহ দক্ষিণ দিকের করিডোরে রেখে যখন সে পূর্বের করিডোরটির মুখে পা দিয়েছে, অমনি সে দেখতে পেল, দু’জন লোক উদ্যত রিভলভার হাতে ছুটে আসছে এদিকে। আর কখন যেন করিডোরের লাইটটিও জ্বলে উঠেছে।
লোক দু’টি এসে স্মার্থার দ্বারে করাঘাত করতে শুরু করল আর বলতে লাগল, কি হয়েছে স্মার্থা দরজা খোল, দরজা খোল। আহমদ মুসা চমকে উঠল। কোন সংকেতে কি ওরা ছুটে এসেছে? স্মার্থা কি কোন গোপন চ্যানেলে বিপদ সংকেত পাঠিয়েছে?
দাঁতে দাঁত চাপল আহমদ মুসা। প্রতিটি মুহূর্ত তার জন্য এখন মূল্যবান। তার কাছে এখন স্মার্থার রিভলভারসহ তিনটি রিভলভার রয়েছে।
ছয়ঘরা আমেরিকান রিভলভারটি সে হাতে তুলে নিল। ওরা তখনও দরজায় নক করছিল। আহমদ মুসা ধীরে সুস্থে পরপর দু’টি গুলী ছুড়ল। দরজার উপরেই দু’টি দেহ লুটিয়ে পড়ল। সামনে ছুটতে গিয়ে হঠাৎ আহমদ মুসার মনে পড়ল সাইমুমের সেই তত্ত্বকথা- শত্রুকে পিছনে রেখে সামনে এগিয়ো না।
আহমদ মুসা ফিরে এসে ক্যাপটেনের সংজ্ঞাহীন দেহ ছুঁড়ে দিল পার্শ্বের বিক্ষুব্ধ সাগরের বুকে।
তারপর নিঃশব্দ গতিতে দ্রুত সে এগিয়ে চলল সিঁড়ির দিকে। আহমদ মুসার ধারণা প্রহরীরা ডেক কেবিনগুলোতেই থাকে। সুতরাং ওদের ওপরে উঠার পথ আটকাতে হবে। সে নীচের সিঁড়ির মুখে গিয়ে পৌছল। নীচের সারিবদ্ধ ডেক কেবিনের করিডোরে এখন আলো জ্বলছে। মাঝখানের একটি কেবিনের দরজা খোলা। একজন মোটামত লোক বেরিয়ে এল দরজা দিয়ে। কাঁধে অফিসারের ইনসিগনিয়া। হাতে সাবমেশিন গান। সে দরজায় দাড়িয়ে ভিতরের কাউকে যেন লক্ষ্য করে বলল, ‘‘স্টিফেন্স, জিমদের ফিরতে দেরি হচ্ছে কেন, গুলীর শব্দই বা কোথেকে এলো, আমি দেখে আসি। ক্যাপটেনের নির্দেশ না পেলে এলার্ম বাজিও না।’’ বলে উপরে সিঁড়ির মুখের দিকে অগ্রসর হলো সে।
আহমদ মুসা উপরে উঠার সিড়ির বাঁকে দেয়াল ঘেঁসে দাঁড়িয়ে রইল। হাতে উদ্যত রিভলভার। লোকটি যেই সিড়ির বাঁকে এসে মোড় নিয়েছে, অমনি আহমদ মুসা রিভলভারের বাঁট দিয়ে প্রচন্ড আঘাত হানল লোকটির মাথায়। নিঃশব্দে তার দেহ গড়িয়ে পড়ল সিঁড়িতে।
তারপর সে দ্রুত নেমে এলো সিঁড়ি দিয়ে নীচে। বিড়ালের মত গুটিগুটি গিয়ে সে দাঁড়াল দরজা খোলা সেই রুমটির পাশে। দু’জনের আলাপ শুনা গেল। এই গভীর রাত্রিতে এই ধরনের জ্বালাতনে দু’জনেই বিরক্ত।
একজন বলছিল, মেয়েদেরকে কেন যে এসব কাজে সরদার টেনে আনে, আমি সেটাই বুঝি না। ওই স্মার্থা মেয়েটার প্রতি ক্যাপটেন সাহেব ও স্টুয়ার্ড বেটা দু’জনেরই চোখ পড়েছে। যতসব ঝামেলা।
অপরজন বলল, শুধু কি ক্যাপটেন আর স্টুয়ার্ড বেটা, তুমি কি চোখ বন্ধ করে আছ জন?
-চোখ খোলা থাকলেই কি লাভ বল? কত এলো, কত গেল, সে সব তো শুধু দেখেই গেলাম। ব্যাটারা মজা লুটবে কিন্তু ঠ্যালা সামলাবার বেলায় আমরা।
-কত ঠ্যালা জীবনে সামলিয়েছি জন সাহেব?
-দক্ষিণ মিন্দানাওয়ের ‘লানাডেলে, রেডিয়েশন বম্ব কে পেতে রেখে এসেছিল শুনি? এই যে বম্ব আবার যাচ্ছে, এগুলো কারা পাততে যাবে বলতো, ওরা না আমরা?
-বিনিময়ে কি কিছুই মিলে না?
-কিছু ডলার ছাড়া আর কি? এই যে স্মার্থাদের নেয়া হচ্ছে ওদেরকে শত্রুদের ভোগে লাগানো হবে। হায়রে বন্ধু না হয়ে যদি শক্র হয়ে জন্মাতাম।
এদের খোশালাপ হয়তো আরও চলতো। কিন্তু আহমদ মুসার সময় ছিল না এসব শোনার। সে ষ্টেনগান বাগিয়ে আচমকা ঘরে ঢুকে পড়ল।
ঘরে বেশ কয়েকটি চেয়ার পাতা। আর সেক্রেটারিয়েট টেবিলের পিছনেই একটি লম্বা কী বোর্ড। প্রতিটি পয়েন্টে দু’টি করে চাবি টাঙ্গানো। ওগুলো ডেক কেবিনসমূহের ইন্টারলক ও আউটার লকের চাবি।
আহমদ মুসা ওদের দিকে ষ্টেনগান উচিয়ে বলর, তোমরা হাত তুলে পিছন ফিরে দাঁড়াও। তারা হাত তুলে দাঁড়াল বটে, পিছন ফিরল না।
ষ্টিফেন্স নামক লোকটির পিছনে ছিল সুইচ বোর্ড। সে হাত তুলে ধীরে ধীরে পিছন হটে সুইচ বোর্ডের দিকে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা বলল, সুইচ বোর্ডের দিকে গিয়ে লাভ হবে না বন্ধু, এলাম সুইচে হাত দেবার পূর্বেই তোমার লাশ খসে পড়বে মাটিতে।
ষ্টিফেন্স থমকে দাড়ালো, কিন্তু পরক্ষণেই সে দরজার দিকে চেয়ে সোল্লাসে বলে উঠল, ওস্তাদ।
আহমদ মুসার মুখে ঈষৎ হাসি ফুটে উঠল। বলল সে, আবার চালাকি? তুমি দু’বার ক্ষমা পাবে না বন্ধু। বলে সে চেপে ধরল ট্রিগার। ষ্টিফেন্স অষ্ফুট আর্তনাদ করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।
আহমদ মুসার মনোযোগ এই সময় স্বাভাবিভাবে ষ্টিফেন্সর দিকে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছিল। জন এই সুযোগ হাতছাড়া করলো না। ঝাঁপিয়ে পড়ল সে আহমদ মুসার উপর।
শেষ মুহূর্তে আহমদ মুসা তার দেহকে একদিকে বাঁকিয়ে নিয়েছিল। সুতরাং জনের আঘাত কিছুটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। তবু বাম পাঁজরে জনের ডান হাতের একটি মারাত্মক ‘ব্লু’ খেল আহমদ মুসা। আহমদ মুসা একপাশে সরে যাওয়ায় ভারসাম্য হারিয়ে জন পড়ে গিয়েছিল। আহমদ মুসাও পড়ে গিয়েছিল তার সাথে। তার হাতের ষ্টেনগানটাও ছিটকে গিয়েছিল হাত থেকে।
ডান হাতে পাঁজরটি চেপে ধরে দম বন্ধ করে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। মাথাটি তার ঝিম ঝিম করছিল।
জন পড়ে যাওয়ায় উবু অবস্থা থেকে উল্টে গিয়ে আহমদ মুসার ষ্টেনগানটি কুড়িয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছিল। মোক্ষম সুযোগ। আহমদ মুসার ডান পা বিদ্যুতগতিতে ছুটে গেল জনের তলপেট লক্ষ্যে। মুখ দিয়ে ক্যাঁৎ করে শব্দ করে আবার লুটিয়ে পঢ়ল সে মেঝেতে।
আহমদ মুসা এবার তাড়াতাড়ি ‘কী বোর্ড’ থেকে চাবিগুলো নিয়ে নিল। প্রত্যেক চাবিতে নম্বর রয়েছে। মোট বিশটি চাবি। ডেক কেবিনগুলোতে এদের আরো অনেক প্রহরী ও লোকজন রয়েছে, ওদের বাইরে বেরুবার পথ বন্ধ করতে হবে-চাবি নিয়ে বেরুতে এটা স্থির করে নিল আহমদ মুসা। পিছনের দিকটা নিরাপদ না করে সে ওয়্যারলেস রুমে যাবে না।
ডেক কেবিনের আউটার লকের নম্বরের সাথে চাবির নম্বর মিলিয়ে আহমদ মুসা নীচের সবগুলো ডেক কেবিন বন্ধ করে দিল।
সর্বশেষে ষ্টুয়ার্ড রুমে চাবি এঁটে বাইরে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করল সে। না, কোন দিক থেকে কোন শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। সে নিশ্চিত হলো নীচে আর কোন প্রহরী নেই কিংবা কোন লোকও নেই। থাকলে গুলীর শব্দে নিশ্চয় ছুটে আসতো।
রিভলবার বাগিয়ে ধরে নিঃশব্দ পায়ে সিঁড়ি বেয়ে সে উপরে উঠতে লাগল।
ওয়্যারলেস রুমে যাবার আগে ক্যাপটেনের কক্ষ সে একবার দেখে নেবে, মনে মনে ঠিক করল আহমদ মুসা।
উপরে কেউ নেই। ক্যাপটেন কক্ষের দুই পাশে আর দু’টি কক্ষ খোলা ক্যাপটেনের কক্ষ বন্ধ। ক্যাপটেন স্মার্থার ওখানে যাবার সময় বন্ধ করে গিয়েছিল তাহলে।
আহমদ মুসা জুতার গোড়ালি থেকে ল্যাসার বিম টর্চ বের করে নিল আবার। দু’মিনিটের মধ্যে খুলে গেল দরজা।
কক্ষে একটি স্টিলের আলমারী। একটি সেক্রেটারীয়েট টেবিল, একটি গদি আটা চেয়ার ও একটি সিঙ্গল খাট।
টান দিতেই ড্রয়ার খুলে গেল। ড্রয়ারে একটি চাবির রিং ও একটি দূরবীন পেল আহমদ মুসা। চাবিটি আলমারির, চিন্তা করল সে। দূরবীনটি তুলে নিতে গিয়ে ড্রয়ারের শেষ প্রান্তে একটি ডাইরি পেল সে। ডাইরীটিও তুলে নিল।
ডাইরীর মধ্যে ক্যাপটেনের বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য ও দৈনন্দিন হিসাব নিকাশ রয়েছে।
ডাইরীর পাতা উল্টাতে গিয়ে একটি চিঠি বেরিয়ে পড়ল। খামের মুখে সিল আটা। উপরের ঠিকানা চেয়ারম্যান , ‘ক্লু’-ক্লাক্স-ক্লান’, মিন্দানাও বেজ (দিভাও)।
আহমদ মুসা চিঠি পকেটে পুরতে পুরতে বলল, জাহাজ তাহলে ওদের মিন্দানাওয়ের দিভাও বেজে যাচ্ছে।
দূরবীনটিও পকেটে পুরলো সে। তারপর তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে ওয়্যারলেস রুমের দিকে চললো। ওপরে কোন প্রহরী চোখে পড়ল না মুসার।
জাহাজের ওয়্যারলেস কনট্রোল রুম। কক্ষটি ভিতর থেকে বন্ধ।
আহমদ মুসা দরজায় নক করল। নক করার সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে কে একজন মুখ বাড়াল। আহমদ মুসা প্রস্তুত হয়েছিল। মুখ বাড়িয়ে লোকটি কিছু বলার জন্য মুখ খুলেছে, কিন্তু কথা বেরুবার পূর্বেই আহমদ মুসার রিভলভারের বাট গিয়ে আঘাত করল তার মাথায়। দরজার উপরই সে কাত হয়ে পড়ে গেল।
এক মুহূর্ত নষ্ট করল না আহমদ মুসা। দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল।
ভিতরে হোয়েলম্যান ছাড়াও একজন ওয়্যারলেস অপারেটর এবং চীফ নেভিগেটর ছিল। যে লোকটি মুখ বাড়িয়েছিল, সে ওয়্যারলেস অপারেটর। অপারেটরকে আর্তনাদ করে পড়ে যেতে দেখে চীফ নেভিগেটর উঠে দাঁড়িয়েছিল। আহমদ মুসাকে ঘরে ঢুকতে দেখেই সে দ্রুত সামনের ড্রয়ারের দিক ঝুঁকে পড়ল। আধখোলা ড্রয়ারের মধ্যে একটি কালো রিভলবার চকচক করছিল।
কিন্তু ড্রয়ার থেকে রিভলবারটি নিয়ে সে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াতে পারল না, আহমদ মুসার রিভলভার নিখুঁতভাবে লক্ষ্য ভেদ করল। একটি বুলেট লোকটির কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। লোকটির দেহ ডেস্ক থেকে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ল।
আহমদ মুসা কক্ষে প্রবেশ করার পর দরজা বন্ধ করে দিল। ষ্টিয়ারিং হোয়েলের লোকটি পাথরের মত বসে ছিল। মুখ তার ছাইয়ের মত সাদা।
আহমদ মুসা তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বলল, শুনুন, গোটা জাহাজ আমাদের দখলে নির্দেশ মত জাহাজ না চালালে এই নেভীগেটরের মতই হবে তোমার অবস্থা।
নেভীগেটরের ডেস্ক থেকে মানচিত্র তুলে নিয়ে জাহাজের গতিপথ দেখে নিয়ে বলল, ড্রাইভার, এখন জাহাজ কোথায়?
লোকটি একবার আহমদ মুসার দিকে চেয়ে দেখল। তারপর বলল, জাহাজ এখন সেলিবিস সাগরে। জাম্বুয়াংগো প্রণালী থেকে ১০০ মাইল দক্ষিণে রয়েছে।
আহমদ মুসা কম্পাসের দিকে চেয়ে দেখল। জাহাজ উত্তর মুখে এগিয়ে চলেছে। আহমদ মুসা ড্রাইভারকে বলল, জাহাজের মুখ একটু পশ্চিম কোণে ঘুরিয়ে নাও। ব্যাছিলান প্রণালী পার হবার পর জাম্বুয়াংগ ডাইনে রেখে উত্তর দিকে যেতে হবে।
সংগে সংগে জাহাজের মুখ একটু ঘুরে গেল। ঘণ্টা তিনেক চলার পর জাহাজ সোজা উত্তর দিকে এগিয়ে চলল।
আবদুল্লা হাত্তার শেষ কথাটি মনে আছে আহমদ মুসা। তাকে আপো পর্বতে যেতে হবে। মনে হয় আপো পর্বতই পিসিডার হেড কোয়ার্টার।
মানচিত্র দেখে হিসেব করল, আপো পর্বতের উপকূল এখন তিন শ’ মাইল দূরে। আগামীকাল সকালেই জাহাজ পৌছে যাবে।
অসংখ্য চিন্তার জট আহমদ মুসার মাথায়। জাহাজে প্রতিরোধ করার মত আর কেউ নেই-এ সম্পর্কে সে নিশ্চিন্ত। কিন্তু চিন্তা সামনের ভবিষ্যত নিয়ে। পিসিডার কাউকেই সে চিনে না। জাহাজ উপকূলে নেয়ার পর সে কি করবে? পিসিডার লোকদের কি সেখানে পাওয়া যাবে? তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সে কি পারবে? তাকে বিশ্বাস করবে কি তারা?
আহমদ মুসার সম্বল তার কোড নাম- ‘রুড থানডার-রুথ’। আবদুল্লাহ হাত্তার উত্তরাধিকারীর এ অতি গোপনীয় কোডনাম একমাত্র তার মনোনীত ব্যক্তির পক্ষেই জানা সম্ভব-একথা নিশ্চিয় পিসিডার কর্মিরা সবাই জানে। তাছাড়া পিসিডার সহকারী প্রধানের প্রকৃত নাম ও ‘কোড’ নাম সে জানে। এটাও তাতে সাহায্য করবে।
আহমদ মুসার আর একটি সুবিধা হল ভাষার আনুকূল্য। মিন্দানাওয়ের প্রধান ভাষা ‘তাগালগ’ ও ‘আরবী’। তাগালগ ভাষা সে জানে না বটে, কিন্তু আরবী তার প্রায় মাতৃভাষার মত। সুতরাং মিন্দানাওয়ের মানুষের সাথে তার আরবীতে কথা বলতে কোন অসুবিধা হবে না।
আহমদ মুসার মনটা প্রসন্ন হয়ে উঠল।

৩

আপো পর্বত শৃঙ্গের নীচে আপোয়ান উপত্যকা। উপত্যকা ও পর্বতের গাত্রদেশ ঘনবনে আচ্ছাদিত। যেন সবুজ চাদরে ঢেকে রাখা হয়েছে সবদিকটাই। উপর থেকে দেখলে তাই মনে হয়। কিন্তু সে সবুজ চাদরের নীচে উপত্যকা ও পর্বতের গাত্রদেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। পাহাড়ের গা বেয়ে ঘুরে ঘুরে নেমে এসেছে রাস্তা নীচের উপত্যকায়। পথ যেখান থেকে শুরু হয়েছে, সেখানে এক পর্বত গহবরে এক পাথুরে বাড়ী। এটাই পিসিডার সদর দফতর। নীচের উপত্যকা ভূমিতে পর্বতের দেয়াল ঘেঁষে আরও অনেক সবুজ রঙের পাথুরে বাড়ী। তিনদিকে পর্বত ঘেরা চার হাজার ফুট উঁচুতে এই আপোয়ান উপত্যকাই পিসিডার প্রধান ঘাটি-রাজধানী।
সদর দফতরের অভ্যন্তরে একটি প্রকোষ্ঠ। বৈদ্যুতিক আলোয় উজ্জ্বল। ঘরের কোণে খাটিয়ায় বিছানা পাতা। এর বিপরীত দিকের কোণে একটি টেবিল। তার পাশে ঈজি চেয়ার।
ঈজি চেয়ারে এক যুবক গা এলিয়ে পড়ে আছে। চক্ষু মুদ্রিত। কপালে চিন্তার বলি রেখা। গৌর বর্ণ মুখমন্ডলে বিষাদের কালো ছায়া। তার সামনে টেবিলে এক গ্লাস দুধ। ঠান্ডা হয়ে গেছে।
যুবকটি মুর হামসার। পিসিডার সহকারী অধিনায়ক। মুর হামসারের আর একটি পরিচয় আছে সে মিন্দানাওয়ের ‘মাগনদানা’ রাজ বংশের রাজপুত্র। তার পূর্ব পুরষ সুলতান আবুবকর ওরফে পাদুকা মহাশারী মওলানা আস-সুলতান শরিফ আল-হাশমি বিখ্যাত সুলু সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি আনুমানিক ১৪৫০ খৃঃ সুলু দ্বীপে আগমন করেছিলেন। মিন্দানাও ও সুলু দ্বীপপুঞ্জের গ্রাম-গ্রামান্তরে ইসলামের আলো ছড়িয়েছেন তিনি। স্পেন ও পরে মার্কিনীদের বিরামহীন বিরোধীতা ও হামলা সত্ত্বেও বর্তমান শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত সুলু ও মিন্দানাও দ্বীপপুঞ্জে এই রাজবংশের হাতে মুসলমানদের স্বাধীন রাজত্বব প্রতিষ্ঠিত ছিল। রাজকুমার মুর হামসার মিন্দানাও বাসীদের রক্ষার জন্য তাদের প্রতিরোধ সংগ্রামে সকলের সাথে আজ নেমে এসেছে পথে।
ধীরে ধীরে কক্ষটির দরজা খুলে গেল। উঁকি দিল একটি মুখ। যুঁই-এর মত অপরূপ শুভ্র ও পবিত্র সে মুখ। তারুণ্যের চাঞ্চল্য দু’টি চোখে।
দরজা ঠেলে সে ভিতরে ঢুকল। পাতলা একহারা গড়ন দেহের। বয়স বিশের বেশী হবে না। যৌবনের জোয়ার এসেছে দেহে। নীল গাত্রাবাস বাড়িয়ে দিয়েছে দেহের সুষমা।
ঘরে ঢুকে গল্লাসের দুধের দিকে নজর পড়তেই মেয়েটি বলল, দুধতো একটুকুও খাননি ভাইয়া?
মুর হামসার মাথা তুলল না। যেমনি ছিল তেমনি পড়ে রইল। মেয়েটি মুর হামসারের মাথার কাছে গিয়ে ধীর স্বরে বলল, বৃথাই চিন্তা করছেন ভাইয়া, দেখবেন দু’ একদিনের মধ্যেই জনাব হাত্তা এসে পড়বেন।
ধীরে ধীরে চোখ খুলল মুর হামসার। বলল, বিধির বিধান বোধ হয় অন্য রকম শিরী।
-কেন?
-ইয়াসির সিঙ্গাপুর থেকে কিছুক্ষণ হলো ফিরে এসেছে।
-কি খবর এনেছে ভাইয়া?
-পিসিডার জন্য মারাত্মক দুঃসংবাদ বোন।
-কি?
-আবদুল্লাহ হাত্তাকে কিডন্যাপ করা হয়েছে।
-ভাইয়া! আর্তনাদ করে উঠল শিরীর কন্ঠ। কিছুটা থেমে সে বলল, কেমন করে এটা সম্ভব হলো? কোথা থেকে?
-জেদ্দা থেকে বিমান ছাড়ার পর জেদ্দা ও করাচির মাঝ পথ থেকে বিমান কিডন্যাপ করে নিয়ে গিয়েছিল ভারত মহাসাগরের এক জনশূন্য দ্বীপে। সেখানে নামিয়ে নেয়া হয়েছে আবদুল্লা হাত্তাকে। হাত্তার পরে নাকি আরও একজন লোককেও নামিয়ে নেয়া হয়েছে। তারপর বিমান ফিরে এসেছে। মুর হামসার থামল।
কিছুক্ষণ দু’জনেই কথা বলতে পারল না। পরে শিরী জিজ্ঞেস করল, কিন্তু দ্বীপে গিয়ে কেউ কোন খোঁজ নিল না ভাইয়া?
-বিমান ফিরে আসার পর সেখানে উদ্ধারকারী এক স্কোয়াড্রন বিমান গিয়েছিল করাচী থেকে। কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে তৈরী করা বিমান বন্দর এবং এক পরিত্যক্ত বাড়ী ছাড়া সেখানে আর কিছই পায়নি।
আবার দু’জনেই নীরব। বিষাদের ছায়া দু’জনের চোখে মুখে। নীরবতা ভাঙ্গল শিরীই। বলল সে, এটা কাদের কাজ বলে অনুমান করছেন ভাইয়া?
সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের প্রতিভূ ক্লু-ক্লাক্স-ক্লানেরই কাজ এটা।
মুর হামসারের কথা শেষ হতেই টেবিলের পাশে বোর্ডে লাল সংকেত জ্বলে উঠল। মুর হামসার সোজা হয়ে বসল। বলল, শিরী তুমি আড়ালে যাও। আবার কোন বিপদ বার্তা এলো নাকি দেখি। ভারী শোনাল মুর হামসারের কথা।
-এমনভাবে ভেঙ্গে পড়লে তো চলবে না ভাইয়া? আমাদের ভরসা তো কোন মানুষ নয়! আমরা বিপদে ভয় পাব কেন?
মুর হামসার ছোট বোনটির মুখের দিকে একবার তাকিয়ে বলল, সত্যি বলেছিস বোন। একটু থেমে বলল আবার, মিন্দানাওয়ের হতভাগ্য মুসলমান সবাই যে দিন তোর মত করে ভাবতে শিখবে সেদিনই আমাদের জীবন থেকে অমানিশার অবসান ঘটবে।
শিরী ঘরের পিছন দিকের একট পর্দা ঠেলে আড়ালে চলে গেল। মুর হামসার চাপ দিল একটি সুইচে।
মুহূর্ত কয়েক পরেই খোলা দরজা দিয়ে প্রবেশ করল পিসিডার কর্মী শায়রা আলী। সে এসে ছালাম জানিয়ে মুর হামসারের সামনে দাঁড়াল। হাপাচ্ছে সে। চোখে মুখে তার উত্তেজনা।
-কি খবর শায়রা? উদগ্রীব কন্ঠ মুর হামসারের।
-আমাদের উপকূলে একটি জাহাজ ভিড়ছে।
-জাহাজ? আমাদের উপকূল রক্ষীরা…………….
মুর হামসারকে কথা শেষ করতে না দিয়েই শায়রা বলল, জাহাজ আমাদের উপকূলের দিকে এগিয়ে আসতেই আমাদের রক্ষীরা জাহাজ লক্ষ্য করে গুলী ছুড়তে শুরু করে। একজন লোক জাহাজের ডেকে নেমে আসে। সে কিছু বলার জন্য এগিয়ে এসেছিল। একটি গুলি লেগে সে পড়ে যায়। আমরা দূরবীন দিয়ে তাকে বাম হাত চেপে ধরে ক্যাপটেন ব্রীজের দিকে উঠে যেতে দেখি। পরে জাহাজের মাইক থেকে তিনি বলেন, ‘মিন্দানাওয়ের মুসলিম ভাইয়েরা, আমি ‘রুড থান্ডার’। আমি ‘ব্রাইট ফ্লাস’ মুর হামসারের সাথে কথা বলতে চাই। তিনি আসার আগে কাউকে জাহাজে না উঠার জন্য আমি অনুরোধ করছি।
মুর হামসার উত্তেজিতভাবে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। সে দ্রুত কন্ঠে বলল, ‘কি বললে শায়রা, তাঁর নাম কি বলেছিল?’
-রুড থান্ডার।
-আর আমার?
-ব্রাইট ফ্লাস।
দুই হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়ল মুর হামসার। তার আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। মুর হামসার ভেঙে পড়ল কান্নায়।
শায়রার কাছে এ দৃশ্য অভাবিত। বিস্ময় বিমূঢ় কণ্ঠে সে বলল, জনাব আপনি……….
শায়রা কথা শেষ করতে পারলো না। মুর হামসার তাড়াতাড়ি সোজা হয়ে বসল। রুমাল দিয়ে অশ্রু মুছে বলল, আবদুল্লাহ হাত্তা আর এই দুনিয়ায় নেই শায়রা! যাও তুমি। সবাইকে বল গিয়ে, তাঁর যেন কোন ক্ষতি না হয়। জাহাজের কোন ক্ষতি করো না তোমরা। আমি আসছি।
শায়রা চলে গেল। আড়াল থেকে বেরিয়ে এল শিরী। বলল সে, কি বললেন ভাইজান, জনাব হাত্তা নেই?
-নেই বোন।
-‘কাল বাজ’ চলে গেছে আমাদের ছেড়ে। এবার ‘রুড থান্ডার’ আমাদের নেতা।
-অর্থাৎ? বিস্ময় বিষ্ফরিত শিরীর দু’টি চোখ।
মুর হামসার শিরীকে বুঝিয়ে বলল, পিসিডার গোপন গঠনতান্ত্রিক কোড অনুসারে ‘কালো বাজ’ আবদুল্লাহ হাত্তার পরে যিনি নেতা হবেন। তাঁর কোড নাম হবে ‘রুড থান্ডার’।
-কিন্তু একজন অজানা অচেনা লোক এ দাবী তুলতে পারেন কেমন করে?
-সেটাই রহস্য। তাঁর কাছে গেলেই এটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমার যতদূর বিশ্বাস আবদুল্লাহ হাত্তার সাথে তাঁর দেখা হয়েছে।

Page 55 of 165
Prev1...545556...165Next
Previous Post

পরী – আলাউদ্দিন আল আজাদ

Next Post

বিচিত চিন্তা – সাহিত্য চিন্তা – আহমদ শরীফ

Next Post

বিচিত চিন্তা – সাহিত্য চিন্তা - আহমদ শরীফ

বিচিত চিন্তা - সংস্কৃতি চিন্তা - আহমদ শরীফ

মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সাম্প্রতিক প্রকাশনাসমূহ

  • তিন গোয়েন্দা ভলিউম ১১৫: ভূমিকম্প – শামসুদ্দীন নওয়াব
  • তিন গোয়েন্দা ভলিউম ১১৮: বিভীষিকার প্রহর – রকিব হাসান
  • তিন গোয়েন্দা ভলিউম ১১৭: বড়দিনের ছুটি – রকিব হাসান
  • তিন গোয়েন্দা ভলিউম ১১৭: আলাস্কা অভিযান – রকিব হাসান
  • তিন গোয়েন্দা ভলিউম ১১৭: আমিই কিশোর – রকিব হাসান

বিভাগসমূহ

  • আত্মজীবনী
  • ইতিহাস
  • উপন্যাস
  • কবিতা
  • কাব্যগ্রন্থ
  • গল্পের বই
  • গোয়েন্দা কাহিনী
  • ছোট গল্প
  • জীবনী
  • দর্শন
  • ধর্মীয় বই
  • নাটকের বই
  • প্রবন্ধ
  • বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী
  • বৈজ্ঞানিক বই
  • ভূতের গল্প
  • রহস্যময় গল্পের বই
  • রোমাঞ্চকর গল্প
  • রোম্যান্টিক গল্পের বই
  • শিক্ষামূলক বই
  • আমাদের সম্পর্কে
  • যোগাযোগ
  • গোপনীয়তা নীতি

© 2023 BnBoi - All Right Reserved

No Result
View All Result
  • বাংলাদেশী লেখক
    • অতুলচন্দ্র গুপ্ত
    • অভিজিৎ রায়
    • আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    • আনিসুল হক
    • আবু ইসহাক
    • আবু রুশদ
    • আবুল আসাদ
    • আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন
    • আবুল বাশার
    • আরজ আলী মাতুব্বর
    • আল মাহমুদ
    • আসাদ চৌধুরী
    • আহমদ ছফা
    • আহমদ শরীফ
    • ইমদাদুল হক মিলন
    • উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    • কাসেম বিন আবুবাকার
    • জসীম উদ্দীন
    • তসলিমা নাসরিন
    • দাউদ হায়দার
    • দীনেশচন্দ্র সেন
    • নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    • নিমাই ভট্টাচার্য
    • প্রফুল্ল রায়
    • প্রমথ চৌধুরী
    • ময়ূখ চৌধুরী
    • মহাদেব সাহা
    • মাহমুদুল হক
    • মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    • হুমায়ূন আহমেদ
  • ইন্ডিয়ান লেখক
    • অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়
    • অতুল সুর
    • অদ্রীশ বর্ধন
    • অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    • অনীশ দেব
    • অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    • অমিয়ভূষণ মজুমদার
    • আশাপূর্ণা দেবী
    • আশুতোষ মুখোপাধ্যায়
    • ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    • কাজী নজরুল ইসলাম
    • ক্ষিতিমোহন সেন
    • তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    • তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়
    • দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    • নারায়ণ সান্যাল
    • নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    • নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    • পাঁচকড়ি দে
    • পূর্ণেন্দু পত্রী
    • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    • বিমল মিত্র
    • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    • হেমেন্দ্রকুমার রায়
  • বিভাগসমূহ
    • আত্মজীবনী
    • ইতিহাস
    • উপন্যাস
    • কবিতা
    • কল্পকাহিনী
    • কাব্যগ্রন্থ
    • খেলাধুলার বই
    • গল্পের বই
    • গোয়েন্দা কাহিনী
    • ছোট গল্প
    • জীবনী
    • দর্শন
    • ধর্মীয় বই
    • নাটকের বই
    • প্রবন্ধ
    • বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী
    • বৈজ্ঞানিক বই
    • ভূতের গল্প
    • মুক্তিযুদ্ধের-বই
    • রহস্যময় গল্পের বই
    • রোমাঞ্চকর গল্প
    • রোম্যান্টিক গল্পের বই
    • শিক্ষামূলক বই
    • সমগ্র
  • সিরিজ বই
    • মিসির আলী সমগ্র
    • হিমু সিরিজ

© 2023 BnBoi - All Right Reserved

Welcome Back!

Login to your account below

Forgotten Password?

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In