-বারে! ভুলে যাচ্ছ কেন? আগে আমার পুরস্কার পরে তোমার প্রশ্নের উত্তর।
-কি চাও বল। মাহমুদ বলল হেসে।
-চাইব না, তুমিই বল, কি দেবে তুমি।
-তোমার ঐ খবর আমাকে যতখানি খুশী করেছে, তার কোন তুলনা আমার জীবনে নেই এমি। তোমার একটি প্রাপ্যের কথাই আমার মনে পড়ছে। কিন্তু এ বই সামান্য।
এমিলিয়ার শুভ্র গন্ডে এক ঝকল রক্তিম স্রোত বয়ে গেল। বলল সে বলই না শুনি? মাহমুদ এমিলিয়ার দু’টি হাত তুলে নিল হাতে। ধীর গম্ভীর স্বরে বলল, ইসরাইল রাষ্টের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, ইসরাইলের এককালীন প্রধানমন্ত্রী এবং বিশ্ব ইহুদীবাদের নেতৃস্থানীয় মস্তিস্ক ডেভিড বেনগুরিয়ানের একমাত্র নাতনি এমিলিয়া তুমি। তুমি কি সব ত্যাগ করে গোঁড়া মুসলিম মাহমুদকে নিয়ে সুখী হতে পারবে।
এমিলিয়া কোন উত্তর দিল না। দু’ হাতে মুখ ঢেকে কপালটা এলিয়ে দিয়েছে সোফার উপর।
মাহমুদ একটু ঘাড় ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করল কই, উত্তর দিলে না? তার ঠোঁটের কোণায় হাসি।
-ইস আবার জিজ্ঞেস করা হচ্ছে। দিবার কথা তুমি দিয়েছ। যে নিয়েছে সে রাখুক বা ফেলে দিক তোমার কি।
-আমার কিছু নয়, কিন্তু acknowledgementবলতে একটি জিনিস আছে? হাসল মাহমুদ।
-না, তুমি নিষ্ঠুরের মত ডুব মেরে থাক, কিছু পাবে না তুমি। বলে সরে যচ্ছিল এমিলিয়া। একটি হাত ধরে তাকে আটকিয়ে তার দিকে পরিপূর্ণ দু’টি চোখ তুলে ধরে মাহমুদ বলল, একটি কঠিন জীবন তুমি বেছে নিলে এমিলিয়া। লেহিহান অগ্নিশিখার উপর দিয়ে আমাদের চলার পথ। পথের শেষ কোথায় আমরা জানি না। এমিলিয়া মাহমুদের কাছে একটু সরে আসল। কয়েক মুহূর্তের জন্য তার চোখ দুটি বন্ধ হয়ে এল। তারপর চোখ খুলে সে বলল, আজ থেকে এমিলিয়াকে তোমাদের একজন বলে মনে করো মাহমুদ। সুখে দুঃখে তাকে তোমরা তোমাদের পাশেই পাবে।
মাহমুদ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, এটাই তোমার কছে এই মুহূর্তে চাইছিলাম এমিলিয়া। বলে একটু থামল মাহমুদ। তারপর বলল, ফেরাউনী আর শাদ্দাদী শাসনের কবলে পড়ে গোটা পৃথিবী আজ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। এই অবস্থায় প্রতিটি মুসলামানের উপর এসেছে দুর্বহ দায়িত্ব। আমি দোয়া করি মুসলিম মিল্লাতের একজন হিসাবে আল্লাহ তোমাকে তোমার দায়িত্ব পালনের তওফিক দিন।
-জানো, আজ মার সাথে অনেক তর্ক হলো।
-কি নিয়ে?
-ইসরাইল আরব সমস্যা নিয়ে।
-তুমি বুঝি আরব মুসলমানদের পক্ষ নিয়েছিলে?
-আমি ন্যায়ের পক্ষ নিয়েছিলাম। আমি বলেছিলাম, স্যামুয়েল শার্লটক রাশিয়ায় জন্মগ্রহণ করে এবং আমেরিকায় প্রতিপালিত হয়ে যদি ইসাইলের নিয়ামক হতে পারেন, তাহলে আরব মুসলমানরা ইসরাইলের শাসন ও আইন প্রণয়নের অধিকার পাবে না কেন?
-সুন্দর তোমার যুক্তি। তোমার মা কি বলেছিলেন?
-তিনি বলছিলেন, জাতির প্রয়োজনে অবিচার জুলুম সব সময় অন্যায় নয়। আমি বলেছিলাম, তাহলে হিটলার আর নাজিদেরকে আমরা দোষ দিতে পারব কোন দিক দিয়ে।
মাহমুদ এমিলিয়ার চোখে চোখ রেখেছিল। তার চোখ বিস্ময় -আনন্দে নাচছে।
এমিলিয়ার মুখ আরক্ত হয়ে উঠল। সে বলল, অমন করে চেয়ে থাকলে কিছু বলব না আমি।
মাহমুদ হেসে এমিলিয়ার গালে টোকা দিয়ে বলল, তুমি শুধু সুন্দরই নও এমি, তোমার যুক্তিগুলো আরও সুন্দর। ফিলিস্তিনীদের পক্ষ থেকে এমন করে এ সত্য কথাগুলো ইসরাইলীদের কানে কেউ কখনও তুলে দিতে পারেনি।
-যাও, আর কোন কথা বলব না। বলে এমিলিয়া ছুটে পালাল তার শোবার ঘরে। কিছুক্ষণ পরে এমিলিয়া প্লেটে করে মিষ্টি ও ফল অন্য হাতে এক গ্লাস পানি নিয়ে ফিরে এল। মাহমুদ বলল, রাত দুপুরে একি করছ এমি?
-কি করব সময়ে যে তোমাকে পাই না?
-সে আমার দোষ বটে।
-দোষ তোমার নয়, আমার ভাগ্যের।
-তা বটে, তানা হলে একজন নিশাচর মানুষ ভাগ্যে জুটবে কেন?
-অতএব কোন আপত্তি তো আর চলে না। হাসল এমিলিয়া।
টেবিলে প্লেট সাজিয়ে মাহমুদের সামনে এগিয়ে দিয়ে বলল, নাও আর দেরি নয়।
মাহমুদ বলল, জানি আপত্তি চলবে না। কিন্তু তোমাকেও বসতে হবে এমি। খাবার প্লেট শেষ করল দু’জনে। খাবার প্লেট সরিয়ে রেখে মাহমুদের পাশে বসল এমিলিয়া। বলল, আচ্ছা মাহমুদ, আমি পড়েছি, বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠা ইসলামের চূড়ান্ত লক্ষ্য; সুতরাং ইসলাম চরিত্রগত ভাবে সম্প্রসারণ মুখী। ইসলামের এই বৈশিষ্ট্যের সাথে সাম্রাজ্যবাদের পার্থক্য কোনখানে?
মাহমুদ বলল, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিলই সাম্রাজ্যবাদের মূল লক্ষ্য। বিজিত জাতির উপর বিজয়ী জাতির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভূত্ব প্রতিষ্ঠাই সাম্রাজ্যবাদের একমাত্র কাম্য বিষয়। অন্য পক্ষে ইসলাম এক মতাদর্শের নাম। যেহেতু বিশ্বের মানুষের জন্য বিশ্বস্রষ্ঠার এটা মনোনীত জীবন বিধান, তাই বিশ্বের মানুষের সার্বিক কল্যাণ এর মধ্যেই নিহিত। সুতরাং বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠা এর চূড়ান্ত লক্ষ্য। বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সে সানুষের কল্যাণ করতে চায় এক জাতির স্বার্থোদ্ধার বা অন্য জাতির ক্ষতি সাধন করা তার লক্ষ্য নয়। মুসলমান কখনও তার ব্যক্তিগত শাসন প্রতিষ্ঠা কিংবা মানুষকে নিজের গোলামে পরিণত করা এবং তাদের কঠোর শ্রমলব্ধ অর্থ অবৈধভাবে কেড়ে নিয়ে দুনিয়ার বুকে নিজের স্বর্গ সুখ রচনার জন্য যুদ্ধ করেনা আর মুসলমান হিসেবে এ সবের জন্যে সে সংগ্রাম ও করতে পারেনা। দুনিয়ার কোন প্রান্তের কোন দেশের বা কোন জাতির কে এসে শাসন ক্ষমতায় বসলো, তা নিয়েও কোন মাথা ব্যাথা ইসলামের নেই। ইসলাম শুধু দেখে, সে মংগলের ধর্ম ইসলামের অনুসারী কি না। বিজয়ী ও বিজেতা বলে মানুষের মধ্যে কোন বিভেদের দেয়াল তুলে দেয় না ইসলাম। মুসলমানরা যখন তাদের সংগ্রামে জয় লাভ করে, রাষ্ট্র ক্ষমতার মালিক হয়, তখন মুসলিম শাসদের উপর এক বিরাট দায়িত্ব এসে চেপে বসে। এর ফলে ঐ বেচারাদের রাতের ঘুম ও দিনের আরাম পর্যন্ত হারাম হয়ে যায়। ইসলামী রাষ্ট্রের শাসকের চাইতে বাজারের একজন নগণ্য দোকানদারের অবস্থা অনেক ভালো হয়ে থাকে। সে দিনের বেলা খলীফা বা শাসকের চাইতে বেশী উপর্জন করে এবং রাতের বেলা নিশ্চিন্তে আরামে ঘুমাতে পারে। কিন্তু খলীফা বেচারা না তার সমান উপার্জন করার সুযোগ পায় আর না পায় রাতের বেলায় নিশ্চিন্তে ঘুমানোর অবসর। দৃশ্যতঃ সাম্রাজ্যবাদও দেশ জয় করে, কিন্তু উভয়ের প্রকৃতিতে আসমান জমিন পার্থক্য বিদ্যমান।
