-হাঁ, এটা তারা করছে।
-সুতরাং আমরা শান্তির আশা কেমন করে করতে পারি?
এমিলিয়ার মা কোন উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ গম্ভীর ভাবে থেকে পরে ধীরে ধীরে বলল সে, শান্তির সম্ভাবনা যে নেই প্রতিটি ইসরাইলীই তা জানে, কৌশল আর শক্তির বলেই তারা এদেশে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে, শক্তি ও কৌশলের আশ্রয় নিয়েই তাদেরকে টিকে থাকতে হবে। শুধু টিকে থাকাই নয়, তাদের থাবাকে আরও মজবুত ও বিস্তৃত করতে হবে। মায়ের দিকে এমিলিয়া পলকহীন দৃষ্টিতে চেয়েছিল। তার মায়ের কথা সেদিন ওসেয়ান কিং জাহাজে শোনা ইসরাইলী মন্ত্রীর বক্তব্যের সাথে হুবহু মিলে যাচ্ছে। তাহলে প্রতিটি ইসরাইলীই কি আরব ভূমিতে তাদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর। আত্মরক্ষাকারী জাতি বলে পরিচয় দানকারী ইসরাইলীদের একি বিভৎস সাম্রাজ্যবাদী রূপ। শিউরে উঠল এমিলিয়া।
এমিলিয়ার গম্ভীর আত্মস্থ ভাবের দিকে চেয়ে এমিলিয়ার মা হেসে বলল, ভালো যুক্তি শিখেছো এমি, তোমার আব্বা খুব খুশী হতেন শুনলে। কিন্তু সেন্টিমেন্ট দিয়ে সবকিছু বিচার করলে ভুল করবে। জাতির বৃহত্তর প্রয়োজন ও মঙ্গলের জন্য এমন অনেক কিছু করতে হয় যা নীতিশাস্ত্র অনুযায়ী অবিচার আর অন্যায়ের পর্যায়ে পড়ে।
এমিলিয়া বলল, এটাই যদি জাতীয় নীতি হয় মা, তাহলে হিটলারকে দোষ দেয়া যায় কেমন করে? নুরেনবার্গ বিচারের প্রহসনই বা তাহলে করা হলো কেন? জার্মান জাতির পরম সুহৃদ নাজিদেরকে অমানুষিক নির্যাতন আর শাস্তিরই বা শিকার হতে হল কেন?
-জাতীয় দায়িত্ব যখন কাঁধে আসবে, তখনই সব বুঝতে পাবে মা। বলে উঠে দাঁড়াল এমিলিয়ার মা। বলল, তাড়াতাড়ি খেতে এস।
এমিলিয়ার মা চলে গেল।
রাত ১১ টা। নাইটগাউন পরার জন্য এমিলিয়া ডেসিং রুমে ঢুকেছে। হঠাৎ ঘরের মেঝেয় কিছু পতনের শব্দ শুনতে পেল সে।
পার্টিশন ডোরে মুখ বাড়াল এমিলিয়া, মেঝেয় দাঁড়িয়ে আছে মাহমুদ। চোখাচোখি হয়ে গেল। মাহমুদের মুখে এক টুকরো হাসি।
এমিলিয়া প্রথমে বিস্ময়বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। বিমূঢ় ভাব কেটে যেতেই তার মুখ রাঙ্গা হয়ে উঠল। সে চোখ নামিয়ে নিল।
মাহমুদ ধীরে ধীরে এগুলো এমিলিয়ার দিকে। একেবারে মুখোমুখি দাঁড়ালো এসে। বললো, কেমন আছ এমি?
কোন উত্তর দিল না এমিলিয়া। চলবার ও কথা বলবার শক্তি যেন সে হারিয়ে ফেলেছে।
কথা বলল মাহমুদ, রাগ করেছ বুঝি তুমি?
মুখ তুলল এবার এমিলিয়া। দুফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল দু’গন্ড বেয়ে তার।
-তুমি কাঁদছ এমি? নীরব অশ্রুর ঢল নেমেছে তখন তার দু’চোখে।
-তুমি কোথায় ছিলে? চকিতে মুখ তুলে প্রশ্ন করল এমিলিয়া।
-তেলআবিবেই ছিলাম।
-এখানেই ছিলে? একটু থামল এমিলিয়া। ঢোক গিলে বলল সে, আমি মনে করেছিলাম, অন্তত আমার জন্মদিনে তুমি আসবেই।
-তুমি পথ চাইবে আমি জানতাম। কিন্তু আসিনি আমি।
-আসনি কেন?
-তোমাদের গোয়েন্দারা সেদিন সারারাত আমার জন্য অপেক্ষা করেছে তোমাদের বাড়ীর চারদিকে।
চমকে উঠে মুখ তুলল এমিলিয়া। তার চোখে বিস্ময়। মাহমুদ বলল, বিস্মিত হবার কিছু নেই। সেই রাতের ঘটনার পর থেকে ‘সিনবেথ’ গোয়েন্দারা তোমার উপর চোখ রেখেছে আমাকে ধরার জন্য। তারা নিশ্চিত ছিল, জন্মদিনে আমি আসছিই।
-ওরা তাহলে সন্দেহ করছে আমাকে?
-সন্দেহ নাও হতে পারে। হতে পারে ওরা নিশ্চিত হতে চেয়েছিল। তোমার জন্মদিনের পর ওরা কিন্তু আর তোমাদের বাড়ীতে পাহারায় আসছে না।
-তুমি এসে ফিরে গিয়েছিলে।
-না এমি, পা বাড়ালে আমি আসতামই। তোমাদের গোয়ান্দারা আমার পথ রোধ করতে পারত না। কিন্তু আমি চাইনি অপ্রীতিকর কিছু ঘটুক চেয়েছি, কোন সন্দেহই যাতে তোমাকে স্পর্শ না করে।
-কোন পথ না পেয়ে শেষে আমাদের বাড়ীতেই পাহারা বসাতে হল। এমন অসহায় যে ইসরাইল গোয়েন্দা বাহিনী আমি ধারণা করিনি কোনদিন। বলে এমিলিয়া মৃদু হেসে বলল, তোমাকে বসতে বলিনি পর্যন্ত। বসবে চল।
মাহমুদ সোফায় গিয়ে বসল। সোফার উপর কনুই দু’টি ঠেস দিয়ে সোফার পিছনে দাঁড়াল এমিলিয়া। মাহমুদের মাথা এমিলিয়ার গায়ে অনেকটা যেন ঠেস দিল। মাহমুদ মাথাটা একটু সরিয়ে নিল।
-জানো, একটা সুখবর দিতে পারি। বলল এমিলিয়া।
-কি সুখবর? বলল মাহমুদ।
-বলব না। আগে বল বিনিময় কি হবে?
মাহমুদ বলল, কেমন সুখবর না শুনলে কেমন পুরস্কারের যোগ্য হবে কি করে বুঝব?
-কেন বলতে পার না, যা চাইবে তাই।
-বেশ যা চইবে, তাই।
এমিলিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার দু’হাতের আঙ্গুলগুলো তখন মাহমুদের জামার কলার নিয়ে খেলা করছিল। সে ধীরে ধীরে বলল, জানো, সেদিন আমি গাজায় গিয়েছিলাম। ওখানকার মোহামেহডান বুক ষ্টোর থেকেঃ Towards understanding Islam, Rights of non Muslim in Islamic State, Islam in Theory and Practice – বই তিনটি কিনে এনেছি। এর মধ্যে Towards understanding islam বইটি শেষ করে ফেলেছি। Islam in Theory and Practice বইটি পড়তে শুরু করেছি। মাহমুদের প্রতি ধমনিতে, প্রতিটি রক্ত কণিকায় আনন্দের স্রোত বয়ে গেল। আল্লাহ তার প্রার্থনা মঞ্জুর করেছেন। মাহমুদ বলল, Towards understanding Islam ইসলামকে জানার জন্য প্রাথমিক স্তরের একখানা অতি উৎকৃষ্ট বই, কেমন লাগল এমি?
