মাহমুদের কথাগুলো যেন এমিলিয়া গোগ্রাসে গিলছিল। বলল সে, কিন্তু এমন কল্যাণ রাষ্ট্রের নমুনা আজ কোথায় মাহমুদ?
এর হুবহু নমুনা কোথাও হয়েতো খুঁজে পাবে না এমি। মুসলমানদের আদর্শ বিচ্যুতিই এর কারণ। এই আদর্শ বিচ্যুতির ফলে শুধু কল্যাণ রাষ্ট্রের বিলুপ্তি ঘটেছে তাই নয়, নির্যাতন আর গোলামীর শৃংখল নেমে এসেছে মুসলমানদের মাথায়। কয়েক লক্ষ ইসরাইলীর হাতে আমরা মার খাচ্ছি। তুর্কিস্তান ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে আমরা গোলামী করছি অন্য জাতির। আবিসিনিয়া ও স্পেন থেকে আমাদের অস্তিত্ব মুছে গেছে। আল্লাহ যে মুসলমানদেরকে বিশ্বের মানুষকে পথ দোখানোর দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন, সেই মুসলমানরা আজ চোখ বন্ধ করে অন্যের দেখানো পথে চলছে। আবেগ উত্তেজনায় মাহমুদের কণ্ঠ যেন বুজে আসল। থামল সে। আবার বলল, আমরা এ অবস্থার পরিবর্তনের জন্য কাজ করছি এমি। সাইমুমের হাজার হাজার মুসলিম তরুণ এ পথে জীবন দিতে প্রস্তুত। আমরা শুধু ফিলিস্তিনের মুক্তি নয়, মুসলমানদেরকে পুনগঠিত পুনর্জাগরিত করে তাদের উপর থেকে নির্যাতন আর গোলামীর অবসান ঘটাতে চাই ¬- প্রতিষ্ঠিত করতে চাই কল্যাণ রাষ্ট্র। থামল মাহমুদ।
এমিলিয়াও নীরব। সেও ভাবছে। কিছুক্ষণ পরে সে বলল, মতাদর্শ হিসাবে কম্যুনিজমও আন্তর্জাতিক চরিত্রের। সুতরাং ইসলামের সাথে তো সংঘর্ষ তার অবশ্যম্ভাবী?
মাহমুদ হেসে বলল, দৃশ্যত তা বোঝায় কিন্তু কম্যুনিজমের উপর দিয়ে স্বাভাবিক নিয়মে যে পরিবর্তনের ঢেউ বয়ে যাচ্ছে, তাতে কম্যুনিজম রূপ নিতে যাচ্ছে পুঁজিবাদে। হেগেল থেকে মার্কস, মার্কস থেকে লেনিন, লেনিন থেকে ষ্টালিন, তারপর বর্তমান রাশিয়ার ঘটনা পরস্পরের বিচার করলেই তা বুঝতে পাবে। চীনও এ পথই ধরেছে। সুতরাং আপাতত কিছু সংঘর্ষ হলেও কম্যুনিজম ইসলামের সাথে প্রতিযোগিতার যোগ্য নয় মোটেই।
-কিন্তু পরিবর্তন তো ইসলামেরও এসেছে। বলল এমিলিয়া।
-না এমি, পরিবর্তন ইসলামের নয়, পরিবর্তন এসেছে মুসলমানদের আচার আচরণে। কম্যুনিজমের নির্মাতা মানুষ, মানুষ তার পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু ইসলাম মানুষের উদ্ভাবিত নয়, সুতরাং কোন মানুষ তার পরিবর্তন ঘটাতে পারে না। আরও পড়াশুনা কর এমি, বুঝতে পারবে সব। মাহমুদ থামল।
মাথা নত করে চুপ করে বসে ছিল এমিলিয়া। মাথা তুলল সে। মাথা তুলতেই মাহমুদের সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল। আবার চোখ নামিয়ে নিল এমিলিয়া। মুখ তার রাঙ্গা হয়ে উঠেছে। বিজলী বাতির আলো রাঙ্গা মুখকে আরো সুন্দর করে তুলেছে। মাহমুদ বলল, তোমার সুন্দর ঐ মুখ মনকে স্বপনের জাগতে নিয়ে যায়, কিন্তু তোমার মনের সত্যানুসন্ধিৎসা আবার ফিরিয়ে আনে মনকে বাস্তব জগতে। স্বপ্ন আর বাস্তবের সমাহারে তুমি অপরূপ এমি।
এমিলিয়া দু’হাতে মুখ ঢেকে বলল, যাও, মানুষকে খুব লজ্জা দিতে পার। মাহমুদ হেসে বলল, যাবার সময় হল এমি। এবার সত্যিই উঠতে হবে। এমিলিয়া বলল, বারে। তোমাকে বুঝি আমি যেতে বললাম?
-না বললেও যেতে হবে।
-কিন্তু এত তাড়াতাড়ি?
-রাত এখন বারটা। ওরা খুব ভাববে।
-ওরা কারা?
-আমার সহকর্মীরা।
-তুমি এখনে এসেছ ওরা জানে?
-হাঁ জানে। আমরা কিছু গোপন করতে পারি না এমি? প্রথম দিনই আমি এ বিষয়টি আমাদের হেড কোয়ার্টারে আমাদের অধিনায়ক আহমদ মুসাকে জানিয়েছি।
-তিনি কি বলেছেন। অধীর কন্ঠে বলল এমি।
-তিনি বলেছেন, তুমি মুসলমান – একথা স্মরণ রেখে পথ চললে কোন কাজেই তোমার ভুল হবে না। থামল মাহমুদ। আবার বলল, ইসলামের প্রতি তোমার অনুরক্তির কথা শুনালে তিনি খুব খুশী হবেন।
-এ কথাও জানাবে বুঝি?
-নিশ্চয়।
-আচ্ছা তোমার সংগঠন যদি তোমাকে আমার থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিত?
-সংগঠন দ্বিমত পোষণ করতে পারে বা জাতির কোন ক্ষতি হতে পারে, এমন কোন সিদ্ধান্ত আমি নিতে পারি না, একথা আমি যেমন জানি, আমার সংগঠনও তেমনি জানে।
-আচ্ছা ধর, এমন সিদ্ধান্ত যদি নিতো।
-আমি সংগঠনের সিদ্ধান্ত মেনে নিতাম।
-এমন নিষ্ঠুর হতে পারতে? কষ্ট হত না?
-হয়তো হতো, কিন্তু জ্ঞান ও কর্তব্যের নির্দেশ সবচেয়ে বড়।
এমিলিয়া হাসল। বলল, ভাগ্যবতী আমি তাই না?
মাহমুদ বলল, তুমি ভাগ্যবতী কিনা জানি না। কিন্তু আমার যাযাবর জীবনে তোমাকে পেয়েছি এক স্নিগ্ধ আলোর মতো। যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ি, যখন দেহমন শান্তির সন্ধানে উন্মুখ হয়, তখন তোমার স্মরণ আমাকে শান্তি দেয় এমি। দেহ মনকে সজীব করে নতুন শক্তিতে।
এমিলিয়া একটুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরে ধীরে বলল, আমি তোমার ঠিকানা জানতে চাই না, জিজ্ঞাসাও করব না তোমাকে কোথায় পাব। কিন্তু কথা দাও, তুমি মাঝে মাঝে দেখা দিয়ে যাবে। জানি তুমি ব্যস্ত। কাজ তোমাদের গুরুত্বপূর্ণ, তবু আমার অনুরোধ, উদ্বেগ যাতনায় জর্জরিত একটি হৃদয়ের শান্তনার জন্য তুমি আসবে।
-সময় পেলেই আমি আসব এমি। বলে থামল, তারপর বলল, আমার এবার যে উঠতে হয়।
-এমিলিয়া বলল, আর একটি কথা। ক্লাবে রেস্তোরায় আর যাই না। ইউনিভার্সিটির পড়াতেও মন বসাতে পারেছি না। শত চেষ্টা করেও মনকে ফিরিয়ে রাখতে পারি না তোমার চিন্তা থেকে। তুমি আমাকে কোন কাজ দাও, তোমার দেওয়া কাজ করে হয়তো হৃদয়ে শান্তি পাব।
