উপরোক্ত খবরের পাশে আর একটি খবরও মাহমুদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ইসরাইলের সুপ্রিম নিরাপত্তা কাউন্সিলের মেম্বার ইসরাইল পার্লামেন্টের সদস্য মিঃ সিমসন স্যামুয়েল শালটক সরকারের বিরুদ্ধে আযোগ্যতার অভিযোগ এনেছেন। তিনি বলেছেন, স্যামুয়েল শার্লটক সরকারের অধীনে দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ছে এবং জাতির নিরাপত্তা বিধানকারী সংস্থাগুলো যাচ্ছে রসাতলে। খবরটি পড়ে হাসল মাহমুদ। পতন যখন ঘনিয়ে আসে, তখন সবাই পরস্পর কাদা ছোঁড়াছুড়ি করে নিজেদের দোষ ও অযোগ্যতার কথা ঢেকে রাখতে চায় এবং এইভাবে তারা নিজেদের সংশোধন ও যোগ্যতা বৃদ্ধির পথ বন্ধ করে প্রতিপক্ষের শক্তিবৃদ্ধি ও বিজয়ে সহায়তা করে।
১২
ডেভিড বেনগুরিয়ানের বাড়ী। এমিলিয়ার কক্ষ। একটি ড্রইং রুম, একটি বাথরুম ও একটি বেড রুম নিয়ে এমিলিয়ার নিজস্ব জগত। গ্রীসিও মেয়ে ভোনাস এই জগতে এমিলিয়ার একমাত্র সঙ্গী ও পরিচারিকা। পিতা ও মাতা এখানে আসেন, কিন্তু সেটা কতকটা রুটিন সফরেরর মত। তেলআবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এমিলিয়াকে তারা অবাধ বিচরণের সুযোগ দিয়েছেন।
রাত ৯ -৩০ মিনিট। বেশ গরম বাইরে। কিন্তু সেন্ট্রালি ইয়ার কন্ডিশন্ড এ বাড়ীতে গরমের কোন চিহ্ন নেই। এমিলিয়া পড়ার টেবিলে বসে। কিন্তু মন বসাতে পারল না বইতে। মন এলামেলো, বিশৃঙ্খল। শয্যায় গিয়ে সে শুয়ে পড়ল। চোখ বুঝে সে মনকে ভাবনাহীন করতে চাইল। কিন্তু পারছে না সে। খোঁচার মত বিঁধছে শুধু।
এমিলিয়ার মা ঘরে ঢুকলেন। মুহূর্তকাল দাঁড়িয়ে তিনি একবার পড়ার টেবিল ও একবার শায়িতা এমিলিয়ার দিকে চাইলেন। তারপর গিয়ে বসলেন এমিলিয়ার পাশে। তারপর ধীরে ধীরে তিনি এমিলিয়ার কপালে হাত রেখে বললেন অসুখ করেনি তো মা? চমকে উঠল এমিলিয়া। নিজেকে সামলে নিল সে। নিজের কপালে রাখা মায়ের হাতটি তুলে নিয়ে সে বলল, না মা অসুখ করেনি।
-এমন অসময়ে শুয়ে কেন তুমি? মায়ের কথায় তখন আশংকার সুর।
-ভালো লাগছে না কিছু, তাই শুয়ে আছি মা।
-এই ভাল না লাগাটাই তো অসুখ মা। তাছাড়া বেশ কিছুদিন থেকে দেখছি তুমি বাইরে কোথাও তেমন বের হওনা ঘরেই শুয়ে থাক। কিছুক্ষণ থামল এমিলিয়ার মা। বলল, না হয় গিয়ে একবার ইউরোপ ঘুরে এসো, এখন তো তেমন পড়াশুনার চাপ নেই।
-না মা তোমরা কিছু ভেব না। আমি ভাল আছি। ঘরে বসে পড়ি? বেড়াতে তেমন ভালো লাগছে না। হাসিতে মুখ রাঙ্গিয়ে বলল এমিলিয়া।
-তাই ভালো মা। দিনকাল ভাল যাচ্ছে না। ঘরে বাইরে শত্রু আজ। শ্বাসরোধ করতে চাইছে আমাদের।
-আচ্ছা মা শান্তি কি্সবে না? আমরা শক্রকে বন্ধু বানাতে পারবো না?
-কেমন করে? শক্ররা যদি শক্রতা না ছাড়তে চায়?
-কিন্তু আমরা তো শক্রতা ছাড়ছি না?
-কেমন করে?
-যে সব আরব মুসলমানকে আমরা তাদের ঘরবাড়ী থেকে তাড়িয়েছি, তাদেরকে ফিরিয়ে এনে যথাযোগ্য অধিকার তাদের আমরা কেন দিচ্ছি না?
-যথাযোগ্য কি অধিকার মা?
-দেশের শাসন ও আইন প্রণয়নের অধিকার।
এমিলিয়ার মা হাসল। বলল, পাগল মেয়ে, ওদেরকে দেশের শাসন ও আইন প্রণয়নের অধিকার দিলে ইসরাইললের সন্তানরা দাঁড়াবে কোথায়?
-কেন, আমরা যেহেতু সংখ্যালঘিষ্ট, তাই সংখ্যালঘিষ্টের অধিকারই প্রাপ্য।
-কিন্তু জার্মানিতে সংখ্যালঘিষ্ট ইহুদীদের অবস্থার কথা তুমি কি জান না?
-জানি। কিন্তু তাই বলে আরব মুসলমানদেরকে হিটলারের আসনে বসাবার কি কোন যুক্তি আছে মা?
-নিশ্চয়। তুমি নিশ্চয় জান, মুসলমানদের পয়গম্বর মোহাম্মদ কেমন করে ইহুদীদেরকে প্রথমে মদীনা, তারপর খায়বর, সর্বশেষ তাদের আরব থেকে বিতাড়িত করেছিল।
-কিন্তু মা, নবী মোহাম্মদ কি বিনা কারণে ইহুদীদের বহিস্কার করেছিলেন? ইসলামের নবীর সাথে তাদের সম্পাদিত চুক্তি তিনবার ইহুদীরা ভংগ করেছে এবং বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এর পর তারা মদীনা থেকে বহিস্কৃত হয় এবং খায়বরে আশ্রয় পায় কিন্তু খায়বরকে ঘাঁটি করে আবার তারা ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার পথ অনুসরণ করল, এরপর তাদের আরব থেকে বিতাড়িত করা ছাড়া উপায় ছিল কি?
-এমিলিয়ার মা আবার মুখ টিপে হাসল। বলল যে কারণে নবী মোহাম্মদ ইহুদীদেরকে বিতাড়িত করেছিল, সে কারণে আমরা ও আরব মুসলমানদের বিতাড়িত করেছি।
-কিন্তু মা উভয় স্থলে তো একরকম কার্যকারণ নেই।
নবী মোহাম্মদ পৌত্তলিকদের ধর্মান্তরিত করে স্বাভাবিক ভাবেই মদীনা ও আরবের মালিক হয়েছিলেন, মালিকানা তিনি ইহুদীদের কাছ থেকে কেড়ে নেননি। অন্যপক্ষ আমরা আরব মুসলমানদের বিতাড়িত করে তাদের দেশ ফিলিস্তীনকে আমরা ইসরাইল রাষ্ট্র বানিয়েছি।
-তোমার কথা ঠিক এমি। কিন্তু আমাদের জাতির স্বার্থে এর প্রয়োজন ছিল এবং ভবিষ্যতে থাকবে।
-এক জাতির প্রয়োজনে অপর জাতির ধ্বংস সাধন কেমন সুবিচার মা?
-রূঢ় বাস্তবতার সাথে তোমাদের পরিচয় নেই মা, অবিচার সব সময় অবিচার নয়।
-কিন্তু মা, অন্যায় করে যাদের অধিকার হরণ করা হল, তারা কি অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবে না। আমাদের প্রধানমন্ত্রী সা্যমুয়েল শার্লটক রাশিয়ায় জন্মগ্রহণ করে আমেরিকায় প্রতিপালিত হয়ে হঠাৎ উড়ে এসে ইসরাইলের নিয়ামক হয়ে বসার অধিকার যদি পায়, তাহলে বংশ পরস্পরায় বসবাসকারী আরব মুসলমানরা তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে তো এগিয়ে আসবেই।
