কথাটা মনে হতেই মাহমুদ শেখ জামালকে নির্দেশ দিলেন এক গামলা পানি আনতে।
পানি এলে মিঃ হুগোর ডাইরী থেকে ওয়াল্টার কুটের প্যাডের চার ভাঁজ পাতাটি এনে ভাঁজ খুলে পানিতে ডুবিয়ে দিল।
সাফ্যলের আনন্দ খেলে গেল মাহমুদের মুখে। কাগজের বুকে সাদা সাঁদা অক্ষর ফুটে উঠেছে। মাহমুদ শেখ জামালকে বলল, ‘‘তাড়াতাড়ি কাগজ কলম আনো। কাগজ বেশীক্ষণ পানিতে রাখা যাবে না।
শেখ জামাল মাহমুদের অনুসরণ করে লিখ যেতে লাগলঃ
‘‘প্রেরক ওয়াল্টার কুট, অধিনায়ক বিশ্ব শান্তি সেনা।
-প্রাপক স্যামুয়েল শার্লটক, প্রধানমন্ত্রী, ইসরাইল।
আনন্দের সাথে জানাচ্ছি যে, যুদ্ধ বিরতি সীমারেখার ওপারে যুদ্ধবিরতি তদারককারীদের মধ্যে আমরা কিছু ইসরাইল সন্তানকে সন্নিবিষ্ট করতে পেরেছি। ‘ইরগুন জাই লিউমি’র মাধ্যমে তারা তথ্য সরবরাহ করবে। কিন্তু জরুরী পরিস্থিতিতে যোগাযোগের জন্য আমরা তাদের রেডিও মিটার পাঠালাম। বিশেষভাবে বলা হচ্ছে, কোন পরিস্থিতিতেই তাদের নাম জানার চেষ্টা করা চলবে না।
- 44 11. GH . 43. 07 GH . 45 33 GV . 32 . 13, JZ 54; 05, GR. 47, 55. GR 44, 77, GR, 39, 17, SZ 40, 99, SZ. 38. 66, SZ. 51 . 02. SZ . 47. 21, SZ 48,81,”
ইরগুন জাই লিউমি’হচ্ছে গুপ্ত বিশ্ব ইহুদী গোয়েন্দা চক্রগুলোর একটি। মেসেজ পরিস্কার। ইসরাইলের বিধ্বস্ত স্পাই রিং এর আংশিক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা তাতে করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হল ডবল ভূমিকায় অভিনয়কারী জাতিসংঘের প্রতিনিধির মুখোশ পরা প্রতিনিধিবর্গ কারা বোঝা যাচ্ছে, GH অর্থাৎ গোলান হাইট, GV অর্থাৎ হুলেহ ভ্যালি, JZ অর্থাৎ জেজরিস ভ্যালি, GR অর্থাৎ জর্দান রিভার, SZ অর্থাৎ সুয়েজ খাল অঞ্চলে ওরা মোতায়েন আছে। মাহমুদ ভেবে দেখল শুধু রেডিও মিটার দিয়ে ওদের চিহ্নিত করা যাবে না। সুতরাং যে কোন মূল্যেই ওদের নাম জানতে হবে।
মাহমুদ উঠে গিয়ে মিঃ হুগোর একেবারে মুখোমুখি দাঁড়াল। মিঃ হুগোর চোখের মনি দু’টোতে স্থির চক্ষু নিবদ্ধ করে সে বলল, মিঃ হুগো যুদ্ধ বিরতি রেখার ওধারে যারা ইসরাইলের হয়ে কাজ করছে, তাদের নাম বলতে হবে। মিঃ হুগো নীরব। মাহমুদ বলল, অধিবেশনে না বসলে বুঝি কথা বলবেন না।
মিঃ হুগোর চোখ দু’টি চঞ্চল হয়ে উঠল। আশংকার একটি বিষাদ রেখা তার মুখের উপর দিয়ে খেলে গেলে।
মাহমুদ শেখ জামাল কে বলল, পর্দাটা সরিয়ে দাও জামাল। মি হুগো অধিবেশনের ব্যবস্থাটা একটু দেখে নিক।
ঘরে উত্তর দিকে টাঙ্গানো পর্দা সরিয়ে ফেলল জামাল। কাঠের একটি সুদৃঢ় পাটাতন, তাতে চামড়ার ফিতা লাগান। পাটাতনে শায়িত মানুষকে মজবুত করে বাঁধার কাজে তা ব্যবহৃত হয়। পাটাতনের পাশে সুইচবোর্ড। একটি ইলেকট্রিক মেগনেটো পড়ে আছে পাটাতনের উপর, তার উপর সাদা বোতাম জ্বলজ্বল করছে।
মাহমুদ ঐ দিকে অঙ্গুলি সংকেত করে বলল, ঐ তড়িৎ অধিবেশনের সাথে তোমরা তো খুব পরিচিত। আমাদের কথা বলার অভিযানের ওটা প্রথম অস্ত্র। এরপর একে একে আসবে অন্যগুলো।
মিঃ হুগো একবার চকিত দৃষ্টিতে ওদিকে চেয়ে বলল অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে কি করবে তোমরা, আমি কিছুই জানি না। কণ্ঠ তার কাঁপছে।
ওয়ার্ল্ড পিস ব্রিগ্রেডের লিঁয়াজো অফিসার মিঃ হুগো, জান কি জান না আমরা দেখব। বলে একটু থামল মাহমুদ, তারপর বলল, অমানুষিক নির্যাতন কিন্তু তোমরাই আমাদের শিখিয়েছ। এই সেদিন আলজেরিয়াতে সুসভ্য ইউরোপের তোমাদের জাত ভাইয়েরা কি করল? আলজিয়ার্সের আলবিয়ায় কোয়ার্টার আর ‘সেন্টার দ্য ত্রি’র নির্যাতন কক্ষগুলোতে তোমাদের ভাইয়েরা স্বধীনতাকামী আমাদের ভাইদের উপর কি অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছে তা মনে পড়ে নাকি তোমাদের? থামল মাহমুদ। আবার বলল, পাঁচ মিনিট সময় দিলাম তোমাকে, এরমধ্যে যদি নামগুলো বলো তাহলে মুক্তির আশা করতে পারো। এখন তুমি ভেবে দেখ একদিকে মুক্তি অন্য দিকে ভয়াবহ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে গমণ – কোনটি তুমি বেছে নেবে।
মাহমুদ বেরিয়ে এল ঘর থেকে।
মি হুগো গালার্টের স্মৃতিতে নাজি কনসেনট্রেসন ক্যাম্পের ভয়াবহ ঘনাগুলোর কথা জাগরুক রয়েছে। মাহমুদের উল্লেখকৃত আলজিয়ার্সের ‘আলবিয়ার’ ও ‘সেন্টা দ্য ত্রি’র ভয়াবহ নির্যাতন কাহিনীর সাথেও সে পরিচিত। ইলেকট্রিক সিটিং ‘পাটাতন ও ১৫ মেগনেটো’ ‘নকল ডোবনো প্রক্রিয়া, প্রভৃতির কথা স্মরণ হতেই আৎকে উঠল মিঃ হুগো গালার্ট। প্রবল ইচ্ছা শক্তি তার ধ্বসে পড়ে গেল মুহূর্তে।
পাঁচ মিনিট পরে ফিরে এল মাহমুদ। ইলেকট্রিক সিটিংএর আর প্রয়োজন হলো না। তার কাছ থেকে জানা গেল ১৪ টি নাম। লিখে নিল মাহমুদ। তারপর পরখ করে সে দেখল ওপারের যুদ্ধ বিরতি সীমা রেখা তদারককারীদের মধ্যে এসব নাম আছে কিনা।
উঠে দাঁড়িয়ে মাহমুদ বলল, তোমাকে আমরা পাঠিয়ে দেব আমাদের হেড কোয়ার্টারে, ওখান থেকেই তোমার সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তবে মুক্তি যে এক সময় তুমি পাবে, সে নিশ্চয়তা আমরা তোমাকে দিচ্ছি।
সংগৃহীত নাম ও মেসেজটি হেড কোয়ার্টারে পাঠাবার জন্য মাহমুদ দ্রুত তার মূল ঘাঁটিতে ফিরে এল।
পরদিন বিকেলে লন্ডনের ‘ইভিনিং পোষ্টে’র দু’কলাম হেডিংএর একটি সংবাদ দৃষ্টি আকৃষ্ট করলো মাহমুদের। সিরিয়া, জর্দান ও মিসর সরকার যুদ্ধ বিরতি সীমারেখা তদারককারীদের মধ্যে থেকে গোলান হাইট এলাকার মিকাইল বোরডিন, ক্লারেন্স ডিলোন, বাউন্সকভ, হুলেহ ভ্যালির রলফ বোম্যান, জেজারিল ভ্যালির ফ্রাঙ্ক কার্লসন, জর্দান নদী এলাকার মরিস চাইল্ডস, আর্নল্ড ফোষ্টার, পিটার গাবর এবং সুয়েজ খার এলাকার মিকাইল গার্ডিন, গিল বার্ট গ্রিণ ভিক্টর গ্রুজ, মার্ক গায়েন ও বিল মার্ডোর ২৪ ঘন্টার মধ্যে বহিস্কার দাবী করেছেন। আরব রাষ্ট্রসমূহের স্বার্থবিরোধী কর্ম তৎপরতার অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের প্রতি। প্রশান্ত হাসি ফুটে উঠল মাহমুদের মুখে।
