মোড়ে এসে দ্রুত গাড়ী থেকে নেমে মাহমুদ দেখল, মিঃ বেকম্যানের গাড়ীটি একপাশে কাত হয়ে পড়ে গেছে। গাড়ীর ডানপাশের অংশ দুমড়ে গেছে। ড্রাইভার তার সিটের একপাশে কাত হয়ে পড়ে আছে। ধীরে ধীরে উঠবার চেষ্টা করছে সে। মিঃ বেকম্যানের কপালে আঘাতে লেগেছে, রক্ত বেরুচ্ছে। সে নিঃসাড়ভাবে পড়ে আছে। বোঝা গেল না জ্ঞান হারিয়েছে কিনা। মিঃ হুগো মিঃ বেকম্যানের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলেন, এটাচী কেসটি কিন্তু তার হাতছাড়া হয়নি। মাহমুদ গাড়ীর কাছে পৌছতেই সে উঠে বসতে চেষ্টা করল। মাহমুদ হুগোকে বলল, ‘‘বেরিয়ে আসুন।’’ বলে মাহমুদ তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে গেল। বের করে এনে তাকে নিজের গাড়ীর কাছে নিয়ে গিয়ে বলল, ‘‘বসুন ভিতরে গিয়ে।’’
মিঃ হুগো কেমন যেন চঞ্চল হয়ে উঠলেন। কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার হাত থেকে এটাচী কেসটি কেড়ে নিয়ে তাকে ধাক্কা দিয়ে ভিতরে ঢুকিয়ে দিয়ে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসতে বসতে বলল মাহমুদ, ‘‘হাসান কামাল, মিঃ হুগোকে এবার ঘুমিয়ে দাও।
মাহমুদ বলার আগেই হাসান কামাল তার কাজে লেগে গিয়েছিল। কয়েকবার ঝটপট করলেন মিঃ হুগো, কিন্তু তারপর ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে এল তার দেহ।
গাড়ী ছেড়ে দিল মাহমুদ। সব কাজ সম্পন্ন করতে তার আধ মিনিটের মত সময় লাগল। আফজলের গাড়ী যখন মোড়ে পৌছল, মাহমুদের গাড়ী তখন চলে গেছে কয়েকশ গজ সামনে। আফজলের পর আরো কয়েকটি গাড়ী এসে পৌছল। একটি হৈ চৈ পড়ে গেল চারদিকে।
এই সময় মিঃ বেকম্যানের জ্ঞান ফিরে এল। চারিদিকে চেয়ে প্রথমেই সে বলল, ‘‘মিঃ হুগো ………….।’’ একটু থেমে ঢোক গিলে পুনরায় সে বলল, ‘‘গাড়ীতে আর এক জন লোক ছিল, সে কোথায়? ’’
উপস্থিত কেউ এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারল না। ড্রাইভার তখনও সীটের উপর পড়েছিল। তার মাথার ও বুকে আঘাত লেগেছে। সে ধীরে ধীরে বলল, ‘‘দুর্ঘটনার পরেই একটি গাড়ী তাকে তুলে নিয়ে গেছে।’’
-তুলে নিয়ে গেছে। সে কি গুরুতর আহত ছিল? তার কণ্ঠ যেন কেঁপে উঠল।
– আমি জানি না, তবে বুঝতে পেরেছিলাম তার জ্ঞান ছিল।
আর কোন প্রশ্ন করল না বেকম্যান। চোখ বুজে মুহুর্তকয় চিন্তা করে উঠে দাঁড়াল। আঘাতের কথা সে যেন ভুলে গেছে। বলল সে, ‘‘এখনি পৌঁছতে হবে হেড কোয়ার্টারে।’’
অনেকেই তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এল। মিঃ বেকম্যানকে গাড়ী এগিয়ে চলল ‘সিনবেথ’ এর হেড কোয়ার্টার এর দিকে। মিঃ বেকম্যানের লক্ষ্য বুঝতে পারল আফজল। মাহমুদের পশ্চাৎদিকের নিরাপত্তায় মোতায়েন আফজল এবার নিশ্চিন্ত হয়ে তার গাড়ী ছেড়ে দিল।
ওয়াইজম্যান রোডের একটি প্রকান্ড বাড়ী। বাইরে থেকে দেখতে একটি সাদমাটা ত্রিতল। কিন্তু ভিতরে গেলে বুঝা যায় বাড়ীর বিরাটত্ব। প্রকান্ড গাড়ী বারান্দা। পাঁচ ছয়টি গাড়ী খুব সহজভাবেই এখানে স্থান পেতে পারে। সব মিলে খান তিরিশেক ঘর। মেঝের তল দিয়ে বিলম্বিত এক সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে সবগুলো ঘরকে ইন্টারকানেক্টেড করা হয়েছে। পরিশেষে এই সুড়ঙ্গ পথ ওয়াইজম্যান রোডের দক্ষিন পার্শ্ব দিয়ে সমান্তরালভাবে চলে যাওয়া মরদেশাই রোডের একটি ফলের দোকানে গিয়ে শেষ হয়েছে। তেলআবিবে সাইমুমের এটা চতুর্থ আস্তানা।
মাহমুদ মিঃ হুগো গালার্টকে এই আস্তানাতে এনে তুলল। বাইরের কোন লোককে সাইমুম কখনও তাদের মূল ঘাঁটিতে নিয়ে যায় না। এমন কি দলীয় সদস্যদেরও যোগাযোগ কেন্দ্র এই আস্তানাগুলো। মূল ঘাঁটির অধিকতর নিরাপত্তার জন্যই এই ব্যবস্থা।
হুগো গালার্টকে সার্চ করা হলো। তার বৃহদাকার এটাচী থেকে পাওয়া গেল হুগোর প্রয়োজনীয় কিছু কাপড়। আর পাওয়া গেল একটা ডাইরী এবং কিছু পাউন্ড মুদ্রা। ডাইরীতে হুগোর নিজস্ব খরচ পত্রের খুঁটিনাটি এবং তার কিছু ট্যুর রেকর্ড। ডইরীর মধ্যে পাওয়া গেল World peace Brigade এর অধিনায়ক মিঃ ওয়াল্টার কুটের নিজস্ব প্যাডের একটি চার ভাঁজ করা সাদা পাতা।
হুগোর জুতার তলা এবং তার পায়ের পাতা থেকে শুরু করে মাথার চুল পর্যন্ত সব কিছুই তন্ন তন্ন করে সার্চ করা হলো। তার পোশাকের সন্দেহজনক কোন অংশই বাদ দেয়া হলো না। অবশেষে হুগোর এটাচী কেস ফেঁড়ে ফেলা হলো, তার অতিরিক্ত কাপড় চোপড় গুলো ও পরীক্ষা করা হলো। কিন্তু কিছুই মিলল না।
কপালের ঘাম মুছে শেখ জামাল এসে চেয়ারে ধপ করে বসল। মাহমুদ চেয়ে চেয়ে দেখছিল/ শেখ জামাল বসতেই মাহমুদ মিঃ হুগোর দিকে চেয়ে বলল, ‘‘মিঃ হুগো আপনি কি হাওয়া খাওয়ার জন্য গোপন সফরে তেলআবিব এসেছেন?’’
মিঃ হুগো শুধু মিট মিট করে চাইলেন। কোন উত্তর এল না তার কাছ থেকে। মাহমুদ জানে, হুগো ওরফে জ্যাকব গ্রিমবের মুখ খোলার জন্য মুখের কথা যথেষ্ট নয়। মাহমুদ হুগোকে আর কিছু বলল না। গভীর চিন্তায় আবার ডুব দিল সে।
হঠাৎ সোজা হয়ে বসল মাহমুদ। মুখ তার খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তার মনে পড়ে গেল, লেনিন যখন জেলে ছিলেন তখন তাঁর স্ত্রী তার কাছে পড়ার জন্য ম্যাগাজিন পাঠাতো। লেনিন ম্যাগাজিনের সাদা অংশগুলোতে দুধ দিয়ে তাঁর মেসেজ লিখতেন কর্মীদের উদ্দেশ্যে। দুধের এ লেখাগুলো এমনিতে দেখা যেত না, কিন্তু পানিতে ডোবালেই তা স্পষ্ট হয়ে উঠত। লেনিনের স্ত্রী তার স্বামীর কাছ থেকে ম্যাগাজিন ফেরত নিয়ে গিয়ে মেসেজগুলো উদ্ধার করে পৌঁছাতেন কর্মীদের নিকট।
