এগার তারিখ অর্থাৎ আজ রাত ৯-২৫ মিনিটে হুগো গালার্ট নামছেন তেলআবিবে। মনে মনে হিসাব করলো মাহমুদ।
গভীর চিন্তায় ডুবে গেল সে। হুগো গালার্ট কি মিশন নিয়ে আসছে? কোন মেসেজ বা কোন গোপন তথ্য? তাই হবে হয়তো। কিন্তু সে সব লিখিতভাবে না মৌখিক কানে কানে। হুগো গালার্ট যখন প্রতিনিধি মাত্র তখন তার মারফতে লিখিত মেসেজ বা তথ্য আসবে, সেটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু কোন পথে এগুনো যাবে? হুগো যদি পূর্বাহ্নে তার বিপদ আঁচ করতে পারে, তাহলে সব প্রয়োজনীয় রেকর্ড নষ্ট করে ফেলবে। এজন্য এমন স্বাভাবিক পথ অনুসরণ করতে হবে যা হুগোর মনে কোন সন্দেহের উদ্রেক করবে না। চিন্তা করল মাহমুদ।
মাহমুদ হিসেব করল, বিমান বন্দর থেকে তেলআবিব ৯ মাইল। মিডিয়াম স্পিড যদি ধরা যায় তাহলে এই ৯ মাইল পথ অতিক্রম করতে ৭ থেকে ৯ মিনিট সময় লাগবে। এই সময়কেই কাজে লাগাতে হবে। বহনকারী তথ্যকে হস্তান্তরের সামান্য সুযোগও হুগোকে দেয়া চলবে না। অবশ্য বিমান বন্দরেই হুগো এটা করে ফেলেন কিনা তাও দেখতে হবে।
মনে মনে পরিকল্পনার এক ছক এঁকে নিল মাহমুদ। তারপর শেখ জামাল, আফজল ও হাসান কামালকে ডেকে তাদের সাথে পরামর্শ করে।
রাত ৮ টা ৪৫ মিনিট। মাহদুদ তার কার্ডিলাক নিয়ে বের হলো। বালফোর রোড গিয়ে পড়েছে এয়ার পোর্ট রোড ধরে ছুটে চলল। এয়ারপোর্টে মাহমুদ যখন পৌঁছল তখন ৮ টা ৫৬ মিনিট।
‘সিনবেথ’ এর নয়া তেলআবিব প্রধান মিঃ বেকম্যান ওয়েটিং রুমের সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে একটি ম্যাগাজিনের উপর চোখ বুলাচ্ছে। মাহমুদ তার সামনের সোফাটিতে বসে পড়ল। মনে মনে ভবল, ভালই হলো। যাত্রা শুভ।
৯ টা বিশ বাজল। মিঃ বেকম্যান উঠে দাঁড়াল। সে হলের দোর গোড়ায় দাঁড়াতেই একজন লোক এসে তার সামনে দাঁড়াল। মিঃ ব্যাকম্যান তাকে কি যেন বললো, তারপর ফিরে এলো আবার। সোফা থেকে চশমা আর ম্যাগাজিনটি তুলে নিয়ে ঢুকে গেলো ভিতরে। মাহমুদ বুঝলো, রানওয়েতে হুগোকে অভ্যর্থনা জানানোর বন্দোবস্ত এটা। বেকম্যান উঠে যাবার পর মাহমুদও উঠে গিয়ে এদিক ওদিক পায়চারী করল। মাহমুদ দেখতে পেল, আফজল বিশেষ অতিথিদের দরজাটির আশেপাশেই রয়েছে। যদিও মাহমুদ স্থির নিশ্চিত যে সাধারণ যাত্রী নির্গমনের পথ দিয়ে ওরা বেরোবে না, সময় বাঁচানোর জন্য ওরা ভি আই পি’র পথই বেছে নিবে। তবু মাহমুদ অতিরিক্ত এ ব্যবস্থা করে রেখেছে।
ঠিক ৯-২৬ মিনিটে রায়াল এয়ারফোর্সের একটি বিমান রানওয়েতে ল্যান্ড করল। সিনবেথের গাড়ী দাঁড় করানো ছিল ওয়েটিং রুমের পূর্ব পার্শ্বের দরজার বামপাশে। আর মাহমুদ তার গাড়ী দাঁড় করিয়েছিল হলের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তের দরজার সামনে। ৯ – ৪০ মিনিটে একটি বোয়িং তেলআবিব থেকে যাত্রা করছে, সেজন্য যাত্রী ও তাদের বন্ধু বান্ধবদের আনাগোনায় বেশ ভীড় জমে উঠেছে।
মিঃ বেকম্যান একজন লোকের সাথে সহাস্যে কথা বলতে বলতে কর্মচারী আগমণ নির্গমনের বিশেষ দরজা দিয়ে বের হয়ে এল। লোকটির পরিধানে কালো রংএর স্যুট, হাতে সুদৃশ্য একটি এটাচী। মাথায় হ্যাট কপাল পর্যন্ত নামানো নাকের নীচে হিটলারী কায়দার গোঁফ। গল্প করতে করতে ওরা দরজার দিকে এগোলো। মাহমুদ দেখতে পেল, ওদের কয়েক গজ পিছনে আফজল এসে দাঁড়িয়েছে। আফজল ওদের পিছনে গিয়ে দরজায় মুহূর্তকাল দাঁড়িয়ে ফিরে এল। আফজল ফেরার সাথে সাথে মাহমুদ নিজের গাড়ীর দিকে চলল। মাহমুদ গাড়ীতে উঠতে উঠতে দেখতে পেল আফজল টেলিফোন বুথের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। মাহমুদের মুখে ফুটে উঠল প্রশান্তির হাসি। পেছনের সিটে শুয়ে হাসান কামাল ঘুমের কসরত করছিল। মাহমুদকে গাড়ীতে উঠতে দেখে নড়ে চড়ে ঠিক হয়ে বসল সে।
মাহমুদের গাড়ী এয়ারপোর্ট চত্বরের দ্বিতীয় গেট দিয়ে বেরিয়ে এয়ারপোর্ট রোডে পড়ল। প্রায় ৩০০ গজ সামনে আর একটি কালো রং এর গাড়ী এয়ারপোর্ট রোড ধরে এগিয়ে চলছে। রেয়ার লাইটের আলোকে গাড়ীর নাম্বার প্লেটটি দেখে মাহমুদের ঠোঁটের কোণে হাসি খেলে গেল। তার মুখে স্বগতঃ উচ্চারিত হলো, ইন্না ছালাতি ওয়া নুসুকি ওয়া মাহইয়ায়া ওয়া মামতি লিল্লাহে রাবিবল আলামিন (নিশ্চয় আমার উপাসনা প্রার্থনা আমার সাধনা, আমার জীবন, আমার মরণ সমস্তই বিশ্ব নিয়ন্তা রাব্বুল আলামিন আল্লাহর নামে নিবেদিত)। মাহমুদ গাড়ীর স্পিড একটু কমিয়ে দিল, কিন্তু গাড়ীটিকে চোখের আড় হতে দিল না। পিছনে সংকেত থেকে সে বুঝে নিল, ওটা আফজলের গাড়ী।
চার মাইল পথ এসেছে তারা। সামনেই রাস্তাটি বামদিকে বাঁক নিয়েছে। মাহমুদ অধীর আগ্রহে সামনে তাকিয়েছিল। অবশেষে দেখতে পেল, একটি উজ্জ্বল হেড লাইট/ সঙ্গে সঙ্গে মাহমুদ তার নিজের হেড লাইট থেকে কয়েকবার সংকেত দিল। সংকেতের উত্তর পেল সামনের তীব্রবেগে এগিয়ে আসা হেড লাইট থেকে। স্বস্তি লাভ করল মাহমুদ -শেখ জামাল ঠিক সময়ে পৌছেছে। কিছু দূরেই মোড়। শেখ জামালের গাড়ীর হেড লাইট থেকে বুঝা যাচ্ছে প্রায় মোড়ের সন্নিকটে পৌছে গিয়েছে সে। ওদিকে এগিয়ে চলা মিঃ বেকম্যানের গাড়িটিও মোড়ের সন্নি্কটে পৌছে গেছে। মিঃ জামালের গাড়ীর হেড লাইটের আলোতে মিঃ বেকম্যানের গাড়ী এবার স্পষ্ট হয়ে উঠল। মাত্র মুহূর্তকয়েকের ব্যবধান। সামনে থেকে তীক্ষ্ণ এক ধাতব সংঘর্ষের শব্দ শোনা গেল। মাহমুদ চঞ্চল হয়ে উঠল। দ্রুত এগিয়ে গেল তার গাড়ী। পাশ দিয়ে প্রচন্ড বেগে শেখ জামালের পাঁচ টনি ট্রাক বেরিয়ে গেল।
