সবাই মুখ নীচু করে চুপ বসে আছে। অখন্ড নীরবতা। দেয়ালের ঘড়িটি টিক্ টিক্ করে সময় নির্দেশ করে চলেছে। ধীরে মাথা তুললেন স্যামুয়েল শার্লটক। বললেন, IIt is now all clear, another war is coming near, কিন্তু পথ কি বলুন?’’
আবার নীরবতা। নীরবতা ভঙ্গ করে পার্লামেন্ট প্রতিনিধি মিঃ সিমসন বললেন, ‘‘আমরা ১৯৬৭ সালের পুনরাবৃত্তি করব।’’ মিঃ সিমসনের কথায় ইসরাইল সশস্ত্র বাহিনীর অধিনায়ক জেনারেল ইসরাইল তালের ঠোঁটে মৃদু হাসির রেখা খেলে গেল। কিন্তু কিছু বললেন না। তিনি জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রধান ডেভিড বেঞ্জামিন এতক্ষণ চুপ করে বসেছিলেন। এবার তিনি ধীরকন্ঠে বললেন,‘‘১৯৬৭ সালে আমাদের সেনাবাহিনীর সামনে ছিল সিনাই এবং জর্দান উপত্যকার অনুকুল যুদ্ধ পরিবেশ।
দ্বিতীয়তঃ আমাদের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় স্পাই রিং বিধ্বস্ত এবং তৃতীয়তঃ আরব সেনাবাহিনীর নৈতিক উন্নতি ও তাদের সচেতনতা। সুতরাং ১৯৬৭ সালকে আবার ফিরিয়ে আনতে পারব না।’’ তিনি একটু থামলেন। ধীরে ধীরে আবার শুরু করলেন, ‘‘আমাদের সামনে আজ তিনটি পথ খোলা আছে, এর যে কোন একটি আমাদের অনুসরণ করতে হবে।
১। অবিলম্বে আমাদের যুদ্ধে নামতে হবে এবং গঠনমুখী আরব বাহিনীকে ১৯৬৭ সালের মত বিধ্বস্ত করতে হবে। কিন্তু এটা যে যুক্তিসম্মত নয়, তা আমি আগেই বলেছি।
২। অধিকৃত সব আরব এলাকা ছেড়ে দিয়ে তাদের সাথে আপোষ করতে হবে। কিন্তু আমাদের জাতির কেউই এ সিদ্ধান্ত মেনে নিবে না বিধায় এ সিদ্ধান্ত আমরা নিতে পারি না।
৩। যুদ্ধ এড়াতে হবে এবং সেই সুযোগে আরব এলাকায় আমাদের ‘স্পাই রিং, পূনর্গঠিত করে একদিকে তাদের সব তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা করতে হবে অপরদিকে ভিতর থেকে তাদের মধ্যে বিভেদের বীজ বপন করতে হবে। বাইরে থেকে নয় ভিতর থেকে আঘাত দিয়েই শুরু মুসলমানদেরকে পর্যুদস্ত করা সম্ভব। আপনারা জেনারেল শামিল এর ফানের বক্তব্য থেকে বুঝেছেন সাইমুমকে বাইরে থেকে আঘাত দিয়ে ওদের শক্তিকে শুধু বাড়িয়েই তোলা হবে, ক্ষতি কিছু করা যাবে না সুতরাং শক্তির পথ পরিহার করে কৌশলের আশ্রয় নিতে হবে। এজন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার। কিন্তু যুদ্ধ এড়াতে না পারলে কিছুই সম্ভব নয়। যুদ্ধ এড়াতে হলে জাতিসংঘের মাধ্যম গ্রহণ করেত হবে। জাতিসংঘের মাধ্যমে আরবদের সামনে আশার আলো জালিয়ে কালক্ষেপণ করা যেতে হবে। আমাদের সরকার এবং রাশিয়া, বৃটেন, আমেরিকা ও জাতিসংঘ চত্তরের সুযোগ্য ইসরাইল সন্তানরা এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ আছেন।’’
সবাই করতালি দিয়ে ডেভিড বেঞ্জামিনের শেষোক্ত প্রস্তাবকে সমর্থন জানাল। পন্থাটির খুঁটিনাটি দিক নিয়ে আলোচনা চলল তাদের মধ্যে।
ঢং ঢং করে ঘড়িতে রাত ১১ টা বাজল। মিটিং সমাপ্ত করে সবাই উঠে দাঁড়াল। সবার মুখে হাসি কিন্তু জোর করে টেনে আনা রুটিন হাসি, তা বুঝতে কষ্ট হচ্ছে না মোটেই। যুদ্ধ এড়ানোর আশা সবাই করছে, কিন্তু চাইলেই কি যুদ্ধ এড়ানো যাবে? তাছাড়া আরবদের আসন্ন সংগ্রামের প্রকৃতি কেমন হবে, তাই বা কে জানে? প্রধানমন্ত্রীর কথা সকলের মনে নতুন করে জাগছে – ‘‘দুর্যোগের এক কালো মেঘ আমাদের পিতৃভূমিকে গ্রাস করতে এগিয়ে আসছে।’’
১১
পরিষ্কার নীলাকাশ। উইলো গাছ আর জলপাইকুঞ্জে সকালের রোদ ঝিলমিল করছে। কোরআন শরীফ বন্ধ করে টিবিলে রেখে এসে মাহমুদ চেয়ারে বসল। সেদিনের দৈনিক কাগজ এসে গেছে, সে দেখতে পেল। কাগজটি উল্টে পাল্টে দেখতে লাগল মাহমুদ। সিংগল কলাম হেডিং এর একটি ছোট্ট খবরে মাহমুদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো। ‘‘বেনগুরিয়ান তনয়ার জন্ম বার্ষিকী।’’ খবরটিতে বেনগুরিয়ান তনয়া এমিলিয়ার একবিংশ জন্ম বার্ষিকী অনুষ্ঠান সূচীর কিছু পরিচয় দেয়া হয়েছে।
এমিলিয়ার নাম মনে পড়তেই মাহমুদের স্নায়ুতন্ত্রীতে এক উত্তপ্ত স্রোত বয়ে গেল। মায়াময় নীল দু’টি চোখ বেদনাপীড়িত মুখ শুভ্রগন্ডে অশ্রুর দু’টি ধারা – বিদায় মুহূর্তের এমিলিয়া মাহমুদের মানসচোখে ফুটে উঠল। মনে পড়ল তার সেই করুণ আকুতি আবার কবে দেখা হবে?’’ মাহমুদ তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেনি এ পর্যন্ত। অনেকবার মনে হয়েছে কিন্তু মাহমুদ চায়নি ফুলের মত সুন্দর ঐ জীবনটির উপর কোন সন্দেহের মেঘ নেমে আসুক – কোন অসুবিধায় পড়ুক সে। আজ ওর পরম খুশির দিন। মাহমুদ কি পারে না এই খুশির দিনে তার পাশে দাঁড়াতে। মাহমুদের ঠোঁটে ফুটে উঠল এক রহস্যময় হাসি। স্বগতঃ তার কন্ঠে উচ্চারিত হলো – পারি, কিন্তু আকাঙ্খার পরিতৃপ্তিকে জ্ঞান ও কর্তব্যের উর্ধ্বে স্থান দিতে পারি না আমি।
সা’দ আলি ঘরে ঢুকল। পায়ের শব্দে পিছনে ফিরে চাইতেই সা’দ বলল, ‘‘হেড কোয়ার্টারের মেসেজ জনাব।’’
মাহমুদ তাড়াতাড়ি হাত পেতে কাগজটি নিল। দ্রুত চোখ বুলাল কাগজটিতেঃ
World peace brigade এর অধিনায়ক মেজর জেনারেল ওয়ালটার কুট এর বিশেষ প্রতিনিধি হুগো গালার্ট গোপনে তেলআবিব আসছেন। তিনি ১১ তারিখ সন্ধ্যায় বৃটিশ রয়াল এয়ারফোর্সের বিশেষ বিমান যোগে রাত ৯ টা ২৫ মিনিটের সময় তেলআবিব নামছেন।
মাহমুদ স্মরণ করল, মেজর জেনারেল ওয়াল্টার মুটের ইহুদী নাম জেরম ইজাক রোমেন। সুইচ আর্মির প্রাক্তন অফিসার। ওয়াল্টার কুট নাম নিয়েছেন তিনি। প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক গোপন ইহুদী আন্দোলনের ইনি একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। আর হুগো গালার্ট হচ্ছেন বার্লিনের দুর্দান্ত ইহুদী জ্যাকব গ্রিমব।
