আমরা জনফ্রন্ট সূত্রে জানতে পেরেছিলাম, সাইমুমের অসংখ্য কর্মী ইসরাইলের অভ্যন্তরে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে। সাইমুমের কিছু আস্তানার সন্ধান আমরা পেয়েছিলাম, কিন্তু কোন ফল হয়নি। অদৃশ্য কোন সংকেতে ওরা
যেন হাওয়া হয়ে গেছে। এই পর্যন্ত বলে মোশে হায়ান চুপ করলেন। রুমাল দিয়ে কপালের ঘামটুকু মুছে নিলেন তিনি।
পার্লামেন্ট সদস্য মিঃ রোজন বার্জ্জ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,‘‘আমাদের সুপরিকল্পিত গোয়েন্দা কার্যক্রমের এতবড় বিপর্যয় কেমন করে সম্ভব হলো? মাননীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী অলৌকিক কিছু বিশ্বাস করাতে চাইবেন নাতো?
মোশে হায়ান আবার বললেন,‘‘অলৌকিক কিছু ঘটে নাই বটে, কিন্তু অলৌকিক ভাবেই আমাদের ‘স্পাই রিং’ বিধ্বস্ত হয়ে গেছে, আর এটা সম্ভব হয়েছে ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা সাইমুমের দ্বারা। এই প্রতিষ্ঠানই আমাদের বন্ধু প্রতিষ্ঠান জনফ্রন্টকে উৎখাত করেছে।
-এই সাইমুম কারা? ২৪ বছরে আরব রাষ্ট্রগুলো যার সন্ধান করতে পারেনি তারা তার ধবংস সাধন করলো কেমন করে? অপর একজন পার্লামেন্ট সদস্য মিঃ সিমমন উত্তেজিতেভাবে প্রশ্নটি করলেন।
মোশে হায়ান বললেন,‘‘ইসরাইল থেকে বিতাড়িত মুসলিম মোহাজের নিয়ে এই সাইমুম গঠিত। চীনের সিংকিয়াং থেকে বিতাড়িত আহমদ মুসা এই সংগঠনের প্রধান। ইখওয়ানুল মুসলিমুনের কর্মীরা এ সংগঠনের বিভিন্ন দায়িত্বে রয়েছে। ইখওয়ানুল মুসলিমুনের স্বেচ্ছাসেবকরা এ সংগঠনের মূল শক্তি। ১৯৩৮ সালের যুদ্ধ অগ্রবর্তী ঘাঁটিগুলোতে মিসরীয় বাহিনীর পাশে অত্যন্ত সক্রিয় যে শত্রু ভয়হীন স্বেচ্ছাসেবকদের দেখেছিলাম আমরা, এরা তাদেরই উত্তরসূরী।
মোশে হায়ান থামলে জেনারেল শামিল এরফান বললেন, ওরা অত্যন্ত বিপদজনকে। মনে পড়ছে আমার সেই যুদ্ধের কথা আমি তখন ইষ্টার্ণ কমান্ডের দায়িত্বে ছিলাম। খবর এল, জেরুজালেমের পার্শ্ববতী ‘সুর বাহির এ ঘাঁটি করে একদল মুসলিম সৈন্য সামনে এগুবার চেষ্টা করছে। ধূর্ত ও কুশলী সেনানায়ক লেঃ কর্ণেল এরিক স্যারনকে ‘আমি এক ব্রিগেড সৈন্য দিয়ে সেখানে পাঠালাম। স্যারন কিন্তু ‘সুর বাহির’ আক্রমণ না করে ৫০ মাইল দক্ষিণে মিসরীয়ে বাহিনীর ডিভিশন পোষ্ট ‘বির সুবীরে’র দিকে চলে গেল। পরে আমি তাকে কারণ জিজ্ঞাসা করলে উত্তর দিয়েছিলঃ
‘‘আমার সুর বাহির আক্রমণ করি নাই, কারণ সেখানে ইখওয়ানুল মুসলিমুনের এক বিরাট স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী মোতায়েন ছিল। ইখওয়ানুল মুসলিমুনের স্বেচ্ছাসেবকরা নিয়মিত সৈন্যবাহিনী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের সাধারণ সৈন্যের মত এরা যুদ্ধকে আদেশ সাপেক্ষ নিছক এক দায়িত্ব মনে করে না বরং এ যুদ্ধ এদের কাছে এক ধর্মীয় আবেগের ফল এবং হৃদয়ের একাগ্রতা তারা এ যুদ্ধে নিয়োজিত করে। এ দিক দিয়ে তারা ইসরাইলের জন্য সংগ্রামরত আমাদের সৈন্যবাহিনীর সাথে তুলনীয়। কিন্তু পার্থক্য এই যে, আমরা আমাদের আবাসভূমি জাতীয় রাষ্ট প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করছি, আর ওদের কামনা হলো মৃত্যু। শুধু মৃত্যু ভয়হীন নয়, মৃত্যু কামনাকারী এসব মানুষকে আক্রমণ করা হিংস্র বন্যজন্তুর মিছিলে হামলা চালানোর শামিল। আমি এই ঝুঁকি এড়াতে চেয়েছিলাম। তাদের ধর্মীয় আবেগ উদ্দীপ্ত হবার সুযোগ দেয়াকে আমরা উচিত মনে করি নাই। তাদের সে আবেগ অন্যদের মধ্যেও সংক্রমিত হতে পারত যার ফলে ষোল আনা লাভ হতো তাদেরই আর সর্বনাশ হতো আমাদের।’’ জেনারেল একটু থামলেন। তারপর আবার শুরু করলেন, ‘‘আমি আমার এ উদাহরণের দ্বারা কিন্তু সাইমুমের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহণকে নিরুৎসাহ করতে চাইনি বরং তারা যে কত বিপদজনক তাই বোঝাতে চেয়েছি। সম্মিলিত আরব কমান্ড আণবিক বোমা দিয়েও আমাদের যা না করতে পারবে, এদের ধর্মীয় আবেগ আমাদের সর্বনাশ করতে পারবে তার চেয়ে বেশী। আরব রাষ্ট্রগুলোর সরকারসমুহের এবং সেনাবাহিনীর উপর সাইমুমের প্রভাব আমাদের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের ব্যাপার। ওরা যদি ওদের ধর্মীয় আবেগ সকলের মধ্যে সংক্রামিত করতে পারে তা হলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে তা আমরা কেউ কল্পনাও করতে পারি না।’’ জেনারেল শামিল এরফান তার কথা শেষ করলেন।
জেনারেল মরদেশাই হড বললেন, ‘‘আরব সরকারসমূহ এবং তাদের সেনাবাহিনীর উপর সাইমুমের প্রভাবের সুস্পষ্ট প্রমাণ আমরা পেয়েছি। গত তিনমাসে লেবানন, সিরিয়া, জর্দান ও মিসর সরবার তাদের সেনাবাহিনীর মোট ৩০০ জন উচ্চ পদস্থ অফিসারকে বরখাস্ত ও অন্তরীণাবদ্ধ করেছে। এ ছাড়া ১৫০০ এর মতো ননকমিশনড অফিসার ও সাধারণ সৈন্যকে বরখাস্ত ও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। এই সমস্ত উচ্চ পদস্থ ও ননকমিশনড অফিসারদের শতকরা নব্বই জনের সাথে আমাদের ছদ্মবেশী গোয়েন্দাদের সম্পর্ক ছিল। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, এটা কত নিখুঁত অনুসন্ধানের ফল। আমরা জানতে পেরেছি, সাইমুমের দেয়া তালিকা মোতাবেকই সেনাবাহিনীর ঐ সব অফিসারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আমরা আরও জানতে পেরেছি মদ্যপান, নাইট ক্লাবে গমণ প্রভৃতিকে আরব সেনাবাহিনীর জওয়ান ও অফিসারদের জন্য অমার্জনীয় অপরাধ বলে গণ্য করা হচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে আরব সেনাবাহিনীকে নতুন নৈতিক ভিত্তির উপর গড়ে তোলা হচ্ছে। ধর্মান্ধ সাইমুমের প্রভাবেরই যে ফল এটা, তা সহজেই অনুমেয়। আপনারা জানেন, নারী, নাইট ক্লাব আর মদ গোয়েন্দা কাজের প্রধান হাতিয়ার সাইমুমকে এ তিনটির কোন একটির আওতায় আনা যায় না বলে আমাদের গোয়েন্দা কার্যক্রম দুর্ভেদ্য বাধার সম্মুখীন হয়েছে। আমরা অনুভব করছি, আরবরা এতদিনে ব্যর্থতার তাদের প্রকৃত কারণ অনুধাবন করেছে। তারা সংশোধিত হচ্ছে ও পূর্ণগঠিত হচ্ছে। আর এ পূনর্গঠন ও সংশোধনের কাজে প্রধান ভূমিকা পালন করছে সাইমুম।’’ জেনারেল হড থামলেন।
