গাড়ী ছেড়ে দিয়ে অসমান গিরি পথ দিয়ে আহমদ মুসারা হেঁটে চলছিল।
জেবেল আল শামছের গুহার মুখে একটি চৌকোণ পাথুরে বাড়ী। সুদৃঢ় দেয়ালের মাঝখানে ভিতরে প্রবেশের একটি মাত্র পথ। গেটে দু’জন ষ্টেনগানধারী প্রহরী। আহমদ মুসা ও তার অনুচররা শান্ত ও প্রসন্নমুখে সেখানে এসে দাঁড়াল। দূরে থাকতেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে প্রহরীদ্বয় তাদের পরীক্ষা করছিল। কি ভাবল তারা, নিজেদের স্থারে একটু নড়ে চড়ে দাঁড়াল। আহমদ মুসা স্বাভাবিক দ্রুত কন্ঠে বল মিটিং শেষ হয়নিত?
-জি না, একজন প্রহরী জবাব দিল।
-বাজাজ আমাদের ডেকেছেন।
একটু অপেক্ষা করতে হবে আপনাদের জনাব। বলে প্রহরীটি দরজার বাম পাশের দেয়ালে রক্ষিত সুইচ বোর্ডটি উপরে ঠেলে ধরল। সুইচ বোর্ডটি উপরে উঠে গেলে নিচে দেয়ালের সমান্তরাল করে বসিয়ে রাখা একটি কাল বেজের উপর ক্ষুদ্র একটি সাদা বোতাম দেখা গেল। বোতমে চাপ দিতেই ইস্পাতের ভারি দরজাটি নিঃশব্দে খুলে গেল।
একজন প্রহরী খোলা দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকে গেল। সঙ্গে সঙ্গে আহমদ মুসা ইউসুফকে একটি সংকেত দিয়ে, জাফর ও যুবায়েরকে নিয়ে খোলা দরজা পথে ভিতরে ঢুকে পড়ল। প্রহরীটি কয়েকপদ এগিয়ে ছিল মাত্র। পেছনে পদশব্দ শুনে ফিরে তাকাল। কিন্তু ততক্ষণে যুবায়েরের রিভলভার তার কপাল লক্ষ্যে উঠে এসেছে। ভয়ে মুখ তার বিবর্ণ হয়ে গেল। জাফর দ্রুত গিয়ে তার নাকে ক্লোরফর্মের রুমাল চেপে ধরল।
এদিকে ইউসুফ অপর প্রহরীটির কাছ থেকে ষ্টেনগানটি কেড়ে নিয়ে তাকে ঘুম পাড়িয়েছে জাফরের মত একই উপায়ে।
একটি ষ্টেনগান নিয়ে ইউসুফকে গেটে থাকতে এবং অপরটি নিয়ে যুবায়ের ও জাফরকে আসতে বলে আহমদ মুসা দ্রুত মিটিং রুমের দিকে চলল।
সংযুক্ত জনফ্রন্টের সেক্রেটারিয়েটে বসেছে মিটিং। প্রবেশের দরজাটি বন্ধ ছিল না, ভেজানো ছিল মাত্র। দরজাটি ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করল আহমদ মুসা।
একটি প্রকান্ড সেক্রেটারিয়েট টেবিল ঘিরে বসে আছে ১১ জন মানুষ। একটি রিভলভিং চেয়ারে বসে আছে আবদুর রহমান বাজাজ। তার সামনে বিরাট একটি ফাইল। তার পাশের বড় রিভলভিং চেয়ারে বসে আছে জনফ্রন্টের সহ সভাপতি আবদুল করিম হাসুনা। জর্জ বাহাশের অনুপস্থিতে সেই আজকের মিটিং এর সভাপতি। সেক্রেটারিয়েট টেবিলটির অন্য পাশে গোল হয়ে বসে আছে সংযুক্ত জনফ্রন্টের কার্যকরী কমিটির নয় জন সদস্য। দরজা খোলার শব্দে চোখ ফিরাল তারা দরজার দিকে। আহমদ মুসাকে দরজায় দাঁড়ানো দেখে বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে পড়ল সবাই। তাদের বুদ্ধির উপর দিয়ে যেন হিম শীতল এক স্রোত বয়ে গেল। কিন্তু আবদুর রহমান বাজাজ ও আবদুল করিম দ্রুত সামলে নিল নিজেকে। তারা দু’জনেই পকেটে হাত দিয়ে উঠে দাঁড়াল।
আহমদ মুসা হেসে বলল, আব্দুর রহমান, আবদুল করিম পকেট থেকে আর হাত বের করো না। লাভ হবে না কোনও। বাইরে মোতায়েন তোমাদের সব লোক ধরা পড়েছে, সবদিক ঘিরে ফেলা হয়েছে তোমাদের এ ঘাঁটি।
আহমদ মুসার কথাগুলো শান্ত কিন্তু দৃঢ়। হৃদয়ের প্রতিটি তন্ত্রীতে তা যেন আঘাত করে। নিরস্ত্র আহমদ মুসার এ কথাগুলো যেন সম্মোহিত করল ওদের। আবদুর রহমান কিংবা আবদুল করিম কারুরই হাত পকেট থেকে বের হলো না। মনে হল, আহমদ মুসার কথা তারা অবিশ্বাস করেনি।
জাফর ও যুবায়ের এসে ঘরে ঢুকল। আহমদ মুসা বলল, জাফর ওদের সব অস্ত্র নিয়ে নাও। পাঁচমিনিটের মধ্যে ওদের সকলকে বাঁধা হয়ে গেল। আহমদ মুসা এগিয়ে গিয়ে বাজাজের ফাইলটি তুলে নিল। ফাইলের দিকে মুহূর্তকাল তাকিয়ে বলল, সাইমুমের অবস্থান সমূহের তথ্য যোগাড় করছ কার জন্য বাজাজ, তোমার প্রভু ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর জন্য? বলে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকায় বাজাজের দিকে। তারপর বলল, ইসরাইলকে যে সব তথ্য সরবরাহ করেছ, তার ফাইল কোথায়? বাজাজ কোন উত্তর দিল না। আহমদ মুসা বলল, সময় নষ্ট করো না বাজাজ। তুমি তো জান কথা কেমন করে বলাতে হয়, সে পদ্ধতি আমার জানা আছে।
এই সময় পূর্ব ও উত্তর দিক থেকে ভারী মেশিনগানের শব্দ শোনা গেল। মাত্র মিনিট দেড়েক। তারপর সব নীরব।
বাজাজ বলল, টেবিলের ড্রয়ারের তলায় বোতাম আছে। বোতামে চাপ দিলে টেবিলের নিচে মেঝের কিছু অংশ সরে যাবে, সেখানে পাবে একটি আয়রণ সেল্ফ, তাতে সব পাবে।
আহমদ মুসা জনফ্রন্টের সদস্য সাবির জামালের দিকে চেয়ে বলল, তুমি বোতামে চাপ দাও। সত্যই টেবিলের নিচে আয়রণ সেল্ফ পাওয়া গেল এবং তাতে পাওয়া গেল এক স্তুপ ফাইল। ফাইলগুলোর হেডিং একবার পরীক্ষা করল আহমদ মুসা। এহসান সাবরি এসময় ঘরে প্রবেশ করল।
-সংবাদ কি এহসান? আহমদ জিজ্ঞাসা করল।
-ওরা সকলে আত্ম-সমর্পন করেছে জনাব। বলল এহসান সাবরি।
-বেশ, তুমি রক্তক্ষয় এড়াতে পেরেছ। শয়তানরা তো আমাদের মধ্যে আত্মঘাতি সংঘর্ষ লাগিয়ে আমাদের দুর্বল করতে চায়।
কিছুক্ষন হাসল আহমদ মুসা। তারপর বলল, আমরা এদের নিয়ে চলে যাচ্ছি। তুমি গোটা ঘাঁটি সার্চ্চ করে ওদের নিয়ে এস।
১১ জন বন্দীকে নিয়ে, জাফর, যুবায়ের ও ইউসুফ আহমদ মুসার সাথে আম্মানের ঘাঁটিতে ফিরে এল। আহমদ মুসা তাঁর চেয়ারে এসে বসতেই আলি সাবের এসে জানাল বাদশাহ তাঁর খোঁজ করেছিলেন।
আহমদ মুসা তার পাশে সাদা রং এর টেলিফোনটি তুলে নিল।
