মাজুভের সাথে মাজুভের বোনের বাড়িতে উঠেছিল আহমদ মুসা। সেখানেই সে অবস্থান করছে। হাসান সেনজিক তার বাড়িতে যাবার জন্যে আহমদ মুসাকে অনুরোধ করেছে, জেদ করেছে, কিন্তু আহমদ মুসা যায়নি। হেসে বলেছে, স্থান পরিবর্তন না করে যেখানে এসে উঠেছি সেখানেই থাকি। যাচ্ছি তো তোমাদের বাড়িতে প্রতিদিনই। ডেসপিনা অভিমান করেছে। তার জবাবে আহমদ মুসা গম্ভীর কণ্ঠে বলেছে, বোনদের কাছ থেকে দূরে যেতেই হবে, তাই আর কাছে যেতে চাই না।
সেদিন মাজুভের বোনের বাড়িতে হাসান সেনজিক এবং সালেহ বাহমন ও ওমর বিগোভিক পরিবারের দাওয়াত ছিল।
আহমদ মুসা খুব সকালে বাইরে গিয়েছিল। ফিরল ১১টার দিকে।
ভেতরে ফ্যামিলি ড্রইংরুমে বসেছিল নাতাশা, ডেসপিনা, নাদিয়া এবং মাজুভের বোন।
আহমদ মুসা বাইরের ড্রইংরুমে এসে বসার সাথে সাথেই ডেসপিনা দরজায় পর্দার আড়ালে এসে দাঁড়াল। বলল, ভাইয়া, আপনি বেরিয়ে যাবার পরপরই ভাবী টেলিফোন করেছিলেন। ঠিক সময়ে এসেছেন, ১১টার পরেই ভাবী টেলিফোন করতে চেয়েছেন।
‘জরুরী কিছু বলেছে?’ উদ্বেগ ঝরে পড়ল আহমদ মুসার কণ্ঠে।
‘না তেমন কিছু নয় আপনি টেলিফোন করে তাঁকে পাননি, তাই তিনি টেলিফোন করেছিলেন।’ বলল ডেসপিনা। এই সময় এসে ড্রইংরুমে ঢুকল মাজুভ, সালেহ বাহমন, জাকুব এবং হাসান সেনজিক।
ওরা সবে বসেছে, এই সময়ই ভেতর থেকে নাতাশা বলে উঠল, এসেছে টেলিফোন।
মাজুভ কিছু জানত না। সে বলে উঠল, কার টেলিফোন, কিসের টেলিফোন?
‘ভাইয়ার টেলিফোন, সিংকিয়াং থেকে ভাবী করেছেন।’ বলল নাতাশা।
মাজুভ তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে নাতাশার কাছ থেকে টেলিফোনের কর্ডলেস রিসিভার নিয়ে এসে আহমদ মুসার হাতে দিল।
আহমদ মুসা টেলিফোন ধরে সালাম দিল। আমিনা সালাম নিয়ে বলল, কেমন আছ?
-ভালো।
-তুমি কাল যখন টেলিফোন করেছিলে আমি আম্মাকে নিয়ে তখন মার্কেটে গিয়েছিলাম। তুমি কবে পৌঁচেছ যুগোশ্লাভিয়ায়?
-আর্মেনিয়া থেকে এসেছি একমাস হলো। আর যুগোশ্লাভিয়ায় এসেছি ২৭দিন।
-সকালে ডেসপিনা, নাতাশা ও নাদিয়ার সাথে কথা বলেছি। তোমার প্রশংসা করতে করতেই সময় শেষ করেছে। আমি খুব খুশি হয়েছি।
-কেন? কিসে?
-কেন তোমার গৌরবে।
-গৌরব আমার নয়, তোমার। তোমার ত্যাগটাই বড়।
-কি ত্যাগ করলাম?
-কেন তোমার অধিকার ত্যাগ করেছ।
-ইস, চাইলেই তো অধিকারকে ধরে রাখতে পারতাম না।
-পারতে কিনা আমি জানি এবং তুমিও জান।
-তাই?
-কেন, এয়ারপোর্টে আসার পথে কি বলেছিলে মনে পড়েনা? তুমি আমাকে থাকতে বলোনি, সে কথা ভুলে যাচ্ছ কেন?
-তোমার এত কথা মনে থাকে! আমি ভুলেই গিয়েছিলাম।
-দেখ, সব আবার ভুলে না যাও।
-আমি এক বন্দিনী, আমার গবাক্ষে আকাশ একটাই। আমি সারাক্ষন ওর দিকেই চেয়ে থাকি। আর মুক্ত বিহঙ্গ তুমি। প্রতি মুহূর্তেই তোমার কাছে নতুন আকাশ। ভোলার ব্যাপারটা তোমার ক্ষেত্রেই খাটে।
-তোমার বুঝি আশংকা হয়?
-কই তুমি তো জিজ্ঞাসা করলেনা আমি কেমন আছি?
-আমি তোমাকে বিপদে ফেলতে চাইনা।
-কেমন?
-অসত্য বলার বিপদে তোমাকে ফেলতে চাইনি। তুমি ভাল না থাকলেও বলবে ভাল আছি।
-তুমিও কি তাই বলেছ নাকি?
-আমি মিথ্যা বলিনি। ভাল থাকার অনেক দিক আছে। শরীর ভাল থাকা, মন ভাল থাকা, পরিবেশ ভাল থাকা ইত্যাদি। আমি ভাল পরিবেশে আছি।
-তার মানে তোমার শরীর ভাল নেই? উদ্বেগ ঝরে পড়ল আমিনার কন্ঠে।
-চিন্তা করোনা। আমবার্ড দুর্গে মাথায় যে আঘাত পেয়েছিলাম। সেটা এখন ভাল। আর্মেনিয়া থেকে আসার সময় বাম বাহুতে বুলেটের যে আঘাত নিয়ে এসেছিলাম সেটা সেরে গেছে। এখানে কপালের দু’পাশে আঘাত পেয়েছিলাম সেটাও এখন আর নেই। সুতরাং শারীরিক ভাবেও আমি ভাল আছি।
-আল্লাহ তোমাকে সুস্থ রাখুন। কবে আসছ তুমি?
-বলকানের কাজ শেষ। তবে তোমার কাছে ফিরতে পারছি না। আমাকে স্পেনে যেতে হচ্ছে এবং আজকেই যাচ্ছি। গতকাল তোমাকে টেলিফোন করেছিলাম একথা বলার জন্যেই। তোমার সম্মতি চাই।
-আবার চাইতে হয় বুঝি, সম্মতি কি তোমাকে দেইনি?
-দিয়েছ। তবু বার বার আমি নিশ্চিত হতে চাই আমি জুলুম করছি না। ঘরে এবং বাইরে উভয় জুলুমই সমান অপরাধের।
-তোমার কাছ থেকে আমাকে বিচ্ছিন্ন করো না, তুমি যে কাজ করছ তা আমারও কাজ।
-ধন্যবাদ আমিনা। আল্লাহ তোমাকে জাযাহ দিন।
-স্পেনে কেন যাচ্ছ?
-মিলেশ বাহিনীর হেড কোয়ার্টারে একটা ডকুমেন্ট পেয়েছি। একটা ষড়যন্ত্র। সেটাকে কেন্দ্র করেই আমাকে যেতে হচ্ছে।
একটু থেমেই প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে আহমদ মুসা বলল, দেশের খবর বল।
-তোমাকে পেয়ে দেশের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। দেশের ভেতরের দৃশ্যটা ভালো নয়।
-কি সেটা?
-একদিকে যেমন চীনকে আরও গণতান্ত্রিক করে গড়ে তোলার চেষ্টা ছাত্র-তরুণদের মধ্যে প্রবল, অপরদিকে তেমন মাওবাদী স্বৈরতন্ত্র জিইয়ে রাখার একটা ষড়যন্ত্র কাজ করছে এবং এই ষড়যন্ত্র ক্রমেই সরকার ও প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার করছে।
-খুব খারাপ খবর শোনালে আমিনা। যদি এই ষড়যন্ত্র উঠে দাঁড়াবার সুযোগ পায়, তাহলে সিংকিয়াংসহ মুসলিম অঞ্চলের অধিবাসীরা যে সুযোগ পেয়েছে তা হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।
-হ্যাঁ এটাই চিন্তার বিষয়।
-আমিনা, তুমি আহমদ ইয়াংসহ সবাইকে আমার পক্ষ থেকে জানাবে তারা যেন সব রকমের পরিস্থিতির জন্যে প্রস্তুতি নেয়, প্রস্তুত থাকে।
-জানাব। আর কিছু বলবে তুমি আমাকে?
-তোমাকে একটা সুখবর জানাতে চাই। তোমাকে নিয়ে এক সাথে এ বছর হজ্জ্ব করার ইচ্ছা আছে আমার।
-আল-হামদুলিল্লাহ। আল্লাহ তোমার ইচ্ছা পূর্ণ করুন, আর সে সৌভাগ্য আল্লাহ আমাকে দান করুন।
-রাখি আজকের মত।
-আচ্ছা খোদা হাফেজ।
-আসসালামু আলাইকুম।
আহমদ মুসা সালামের জবাব দিয়ে টেলিফোন রেখে দিল।
মাজুভ, হাসান সেনজিক, সালেহ বাহমন সকলেই আহমদ মুসার পাশেই বসেছিল। আর ভেতরের ড্রইংরুমে ছিল নাতাশা, নাদিয়া, ডেসপিনা এবং মাজুতের বোন। আহমদ মুসা অনুচ্চ কন্ঠে কথা বলছিল, তবু তার প্রত্যেকটি কথাই সকলে শুনেছে। প্রথমে সবাই মজা পেয়েছে, কিন্তু যখন শুনেছে আহমদ মুসা স্পেনে যাচ্ছে এবং আজই যাচ্ছে, তখন সকলেরই হাসিখুশী উবে গেছে, সকলেই হয়ে পড়েছে বিস্মিত এবং বিষাদে আচ্ছন্ন।
আহমদ মুসা টেলিফোন রাখার সাথে সাথে সবাই তাকে ঘিরে ধরল।
হাসান সেনজিক বলল, আপনি ভাবীকে ওটা কি কথা বললেন?
-কি কথা? বলল আহমদ মুসা।
-আপনি স্পেনে যাচ্ছেন এবং আজই যাচ্ছেন। বলল মাজুভ।
-হ্যাঁ যাচ্ছি। ম্লান হেসে বলল আহমদ মুসা।
-না আপনার যাওয়া হবে না, আজ তো কিছুতেই নয়। দৃঢ় কন্ঠে বলল হাসান সেনজিক।
আহমদ মুসা হাসল। পকেট থেকে বিমানের টিকেট বের করে টেবিলের উপর রাখতে রাখতে বলল বিকেল ৩টায় প্লেন। তোমরা জেদ করো না ভাই।
কেউ কোন কথা বলল না। সবাই একবার প্লেনের টিকেটের দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করল।
বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে সবার কন্ঠ।
অনেকক্ষণ পর হাসান সেনজিক অভিমান-রুদ্ধ কন্ঠে বলল, আমরা কি আপনার কেউ নই যে, আপনি এভাবে পালাচ্ছেন?
আহমদ মুসা হাসান সেনজিকের পিঠে একটা হাত রেখে ম্লান হেসে বলল, তুমি উল্টো কথা বলছ হাসান সেনজিক। বিদায় যেখানে কষ্টের, সেখানেই তো মানুষ পালায়। আর বিদায় কষ্টের হয় আপনজনদের কাছেই।
-না মুসাভাই আমরা আপনাকে এভাবে কিছুতেই যেতে দেব না। কান্না জড়ানো কন্ঠ হাসান সেনজিকের।
আহমদ মুসা তৎক্ষণাৎ কোন কথা বলল না। সোফায় হেলান দিল। তারপর বলল, হাসান সেনজিক তোমার মনে আছে আলবেনিয়ার সমুদ্র সৈকতে এক নিরব সন্ধ্যায় আড্রিয়াটিকের কাল বুকের উপর চোখ রেখে তুমি স্পেনের একটা গল্প বলেছিলে। এক বৃদ্ধ প্রতিদিন সন্ধ্যায় গোয়াদেল কুইভার নদীর কার্ডোভা ব্রীজের রেলিং এ এসে বসত। নিরবে তাকিয়ে থাকত কর্ডোভার ভগ্ন প্রাসাদে ‘আল কাজারের’ দিকে। অশ্রু গড়িয়ে পড়ত তার চোখ থেকে অবিরল ধারায়। মিশে যেত তা গোয়াদেল কুইভার নদীর স্রোতের সাথে। জিজ্ঞাসা করলে সে মুখ ঘুরিয়ে চলে যেত। একদিন সে উঠে দাড়িয়ে মুখ ঘুরিয়ে চলে যায়নি। বলেছিল তোমাকেঃ ‘আমি অতীতের এক বিধ্বস্ত অবশিষ্ট, তাকিয়ে আছি অতীতের এক ধ্বংস-স্তুপের দিকে ‘আমার কান্নার আর কোন ব্যাখ্যা নেই।’ আমি তোমার বলা এই বৃদ্ধের কান্নার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম হাসান সেনজিক। কিন্তু সেদিন মিলেশ বাহিনীর হেড কোয়ার্টারে যে কাগজ পত্র পেয়েছিলাম, তার মধ্যে স্প্যানিশ কু-ক্ল্যাকস-ক্ল্যানের যে কয়েকটা ডকুমেন্ট পেয়েছি তা বৃদ্ধের সেই কান্নাকে আমার সামনে আবার বড় করে তুলে ধরেছে। একটি ডকুমেন্টে স্পেনের মুসলমানদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ এক ষড়যন্ত্রের বিবরণ আছে। স্পেনের কু-ক্ল্যাকস-ক্ল্যান মিলেশ বাহিনীর মাধ্যমে কেজিবি’কে অর্থ দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে এক বিশেষ ধরণের তেজস্ক্রিয় আমদানি করেছে। এই তেজস্ক্রিয়ের ধীর ক্রিয়া পুরো কংক্রিটের নতুন একটি বিল্ডিংকেও মাত্র ৫ বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলতে পারে। শুধু তাই নয়, এই তেজস্ক্রিয় বিল্ডিং ব্যবহারকারীদের প্রজনন ক্ষমতা ধ্বংস সহ তাদেরকে ধীর মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় যদি যথাসময়ে তারা প্রতিকারমুলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করে। স্পেনের কু-ক্ল্যাকস-ক্ল্যান এই তেজস্ক্রিয় মাদ্রিদে কোটি কোটি ডলারের সৌদি অর্থ সাহায্যে নির্মিত মসজিদ কমপ্লেক্সের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। এছাড়া কর্ডোভা, গ্রানাডা, টলেডো, মালাগা প্রভৃতি এককালের মুসলিম সিটি গুলোতে যে মসজিদ ও ঐতিহাসিক স্থাপত্য সমূহ এখনও বর্তমান আছে সেগুলো ধ্বংসের কাজেও এই তেজস্ক্রিয় ব্যবহার করা হচ্ছে। বহু বছরের বহু চেষ্টা সাধনার পর মাদ্রিদে নতুন মসজিদ নির্মাণের মাধ্যমে স্পেনে মুসলমানদের যে নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে তাকে এই ভাবে তারা ধ্বংস করতে চায়। ডকুমেন্টে কোন তারিখ নেই। এই ষড়যন্ত্রের বাস্তবায়ন কবে থেকে শুরু হয়েছে জানি না। সুতরাং ব্যাপারটা অত্যন্ত জরুরী। এই ষড়যন্ত্রকে যদি যথাসময়ে রোধ করা না যায়, তাহলে শুধু মসজিদগুলো ধ্বংস হবে তা নয়, মসজিদগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট গোটা মুসলিম কম্যুনিটি ধ্বংস হয়ে যাবে। হাসান সেনজিক তুমি গোয়াদেল কুউভার নদীর সেতুর উপর বসা বৃদ্ধের চোখে যে অশ্রু দেখেছ সেই অশ্রু ঐ বৃদ্ধের নয়, সেটা কর্ডোভার অশ্রু, গ্রানাডা, মালাগা, টলেডোর অশ্রু। যদি ঐ ষড়যন্ত্র বানচাল করা না যায় তাহলে স্পেনে অশ্রুর আরেক অধ্যায় রচিত হবে। আহমদ মুসা থামল।
হাসান সেনজিক, মাজুভ, সালেহ বাহমন, জাকুব এবং ভেতরে ডেসপিনা, নাদিয়া, নাতাশা সকলেই সমোহিতের মত আহমদ মুসার কথা শুনছিল।
আহমদ মুসা থামলেও কেউ কোন কথা বলতে পারলো না। সবার মাথা নিচু, সবাই নিরব।
ভেতর থেকে ডেসপিনা কথা বলে উঠল। বলল, স্পেনে আমাদের ভাইদেরকে এ ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়ে দিলেই তো হয়ে যায় ভাইয়া।
‘কু-ক্ল্যাকস-ক্ল্যান অত্যন্ত ভয়ংকর সংগঠন। তারা ঠান্ডা মাথায় নিরবে কাজ সারতে চাচ্ছে। কিন্তু যখনি দেখবে তাদের ষড়যন্ত্র প্রকাশ হয়ে পড়েছে, তখনি তারা হয়ে উঠবে ভয়ংকর। সাপের মত নিঃশব্দে জীবন-বিনাশী ছোবল মেরে চলবে একের পর এক।’ বলল আহমদ মুসা।
সবাই শিউরে উঠল। কু-ক্ল্যাকস-ক্ল্যানের কথা কমবেশি সকলেই জানে।
ডেসপিনাই আবার কথা বলল, ‘কিন্তু আপনি একা ওদের বিরুদ্ধে…….’ কথা শেষ না করেই থেমে গেল ডেসপিনা।
‘আমি একা কোথায়। আল্লাহ আছেন সাথে। আর ওদের আমি কিছুটা চিনি। ফিলিস্তিনে এবং মিন্দানাও-এ ওদের আমি মোকাবিলা করেছি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আচ্ছা, মুসা ভাই একটা কথা বলব। আপনার দায়িত্ব চিন্তার বাইরে এসে আপনি আপনার মনের কথা কি কখনও ভাবেন, কখনও কি ফিরে তাকান আপনার মনের দিকে?’ ভারী কন্ঠে বলল হাসান সেনজিক।
‘কেন, মন কি আমার মাথা থেকে ভিন্ন সংসারে বাস করে মনে কর?’ হাসতে হাসতে বলল আহমদ মুসা।
‘না, মুসা ভাই, ককেশাস থেকে বিদায়ের সময় সালমান শামিল, সোফিয়া এ্যাঞ্জেলাদের কান্না আমি দেখেছি, আলবেনিয়ার মোস্তফা ক্রিয়া ও সালমা সারাকায়াদের কান্নাও আমি দেখেছি, আমি শুনেছি আরো পেছনের অনেক কান্নার কথাও। এত কান্নার স্মৃতি যার বুকে তার মন কেমন করে সুস্থ থাকতে পারে।’ গম্ভীর কন্ঠে বলল হাসান সেনজিক।
আহমদ মুসা আবারো হাসল। বলল, হাসান সেনজিক, জীবনটা পায়ে চলার পথ। এ চলার পথে হাসি এবং কান্না উভয়ের সঞ্চয়ই তোমার থাকবে। সে সঞ্চয় নিয়ে তুমি হাসবে, কাঁদবে, পেছনেও ফিরে তাকাতে পার বার বার, কিন্তু থমকে দাঁড়াতে পারো না। কাল এবং জীবন উভয়ই বহমান, স্থবির নয়।
আহমদ মুসা থামলে কথা বলে উঠল নাতাশা। বলল, ভাইজান, কোন স্থান বা কারো মায়ার বাধনে বাঁধা পড়া বহমান জীবনের প্রতিকুল তো নয়।
‘ঠিক। কিন্তু সামনে থেকে আরও অশ্রুর হাতছানি, আরো দায়িত্বের আহ্বান যদি টেনে নিয়ে যায় কাউকে সামনে, তাহলে সেটাও জীবনের একটা বাস্তবতা। এ বাস্তবতাকেও স্বীকার করতে হবে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘মুসা ভাই, আপনি বলেছেন চলার পথে না থেমেও পেছন ফিরে তাকাতে পারি। আপনি পেছন ফিরে তাকান না? কত হাসি, কত কান্না, কত ঘটনার মিছিল আপনার পেছনে। আপনার কষ্ট হয় না?’ বলল মাজুভ।
‘অতীত শুধু কষ্টের নয়, অনুপ্রেরণারও। আমি অনুপ্রেরণা গ্রহণ করি অতীত থেকে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কিছুই কষ্ট লাগেনা? এই আমরা যারা আপনার এত নিকট, আমরা সবাই কি আপনার জীবন থেকে হারিয়ে যাব?’ ভারি কন্ঠে বলল হাসান সেনজিক।
আহমদ মুসা তৎক্ষণাৎ জবাব দিল না। চোখ বন্ধ করে সোফায় গা এলিয়ে দিল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, হাসান সেনজিক এটাই সবচেয়ে কষ্টের যে মানুষ ইচ্ছা করলেই তার স্মৃতিকে মুছে ফেলতে পারে না। তাই মানুষের কর্মহীন দিনের অবসর মুহুর্ত এবং ঘুমহীন রাতের নিরব প্রহরগুলো অনেক সময়ই তার জন্যে পীড়াদায়ক হয়ে ওঠে।’
‘আচ্ছা মুসা ভাই, আপনার ঘটনাবহুল জীবনের কোন ঘটনাটি আপনার সবচেয়ে বেশী মনে পড়ে? আপনি কিন্তু এ প্রশ্রের জবাব দেয়ার জন্যে ওয়াদাবদ্ধ আছেন।’ হেসে বলল হাসান সেনজিক।
অনেকক্ষণ পর কথা বলল আহমদ মুসা। বলল, দুঃখিত হাসান সেনজিক তোমার প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি পারছি না। কাকে ছেড়ে আমি কার কথা বলব, অতীতকে আমি এভাবে বাছাই করতে পারবো না।
‘অতীত থাক, সবচেয়ে সাম্প্রতিক একটা বলুন।’ জেদ ফুটে উঠল হাসান সেনজিকের কন্ঠে।
আহমদ মুসা ধীর কন্ঠে বলল, ‘আমি সেদিন কনষ্টানটাইনের স্ত্রীর মুখোমুখি হতে গিয়ে খুব কষ্ট অনুভব করেছি। সে যখন বলেছে আমার উপর, আমার সন্তানদের উপর প্রতিশোধ নিলেননা কেন তখন আমার মন বেদনায় চিৎকার করে উঠতে চেয়েছে। ঠিক এ রকমই হয়েছিল আমি যখন ককেশাসের হোয়াইট ওলফের নেতা মাইকেল পিটারকে হত্যার পর তার স্ত্রী সভেতলানা এবং শিশু কন্যার মুখোমুখি হয়েছিলাম। খবর শুনেই সভেৎলানা জ্ঞান হারিয়েছিল, আর তার মা’র জ্ঞান হারানো দেখে শিশু কন্যা কেঁদে উঠে জিজ্ঞাসা করেছিল তার মা’র কি হয়েছে? অবুঝ শিশুর ঐ প্রশ্নের মুখে আমার সমগ্র সত্তা অব্যক্ত এক যন্ত্রণায় কেঁদে উঠেছি।’
বলতে বলতে আহমদ মুসার কন্ঠ ভারি হয়ে উঠল, তার দু’চোখের কোণায় দেখা দিল দু’ফোটা অশ্রু। থামল আহমদ মুসা।
সবাই নিরব। আহমদ মুসার অনুভূতি সবাইকেই যেন স্পর্শ করেছে।
পরে সালেহ বাহমন বলল, মুসা ভাই এত নরম মন নিয়ে এত কঠিন কাজ আপনি করেন কি করে? শত্রুকে, শত্রুর পরিবারকে, শত্রুর সম্পদকে ধ্বংস করাইতো সাধারণ ব্যাপার।
‘না বাহমন, ইসলামে নারী, শিশুর গায়ে হাত দিতে নিষেধ করা হয়েছে। ঘোষিত যুদ্ধের সময়ও নারী, শিশু এবং শত্রুর শস্য ক্ষেতের ক্ষতি না করতে মুসলিম সৈন্যবাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হতো।’
ভেতর থেকে এ সময় নাতাশা বলে উঠল, মুসা ভাই এর টেলিফোন।
মাজুভ কর্ডলেস রিসিভার এনে আহমদ মুসার হাতে দিল।
আহমদ মুসা টেলিফোনের মেসেজটি শুনে নিয়ে টেলিফোন রেখে হেসে বলল, বিমানের দু’ঘন্টা লেট হবার কথা ছিল তা হচ্ছেনা। এখন ঠিক সময়েই প্লেন ছাড়ছে। অর্থাৎ ১টায় বোর্ডিং।
খবর শুনে সকলের মুখেই বিষাদ নেমে এল। ভেতর থেকে ডেসপিনা ও নাদিয়া প্রায় এক সঙ্গেই ভারি কন্ঠে বলে উঠল ভাইজান, নিষ্ঠুরের মতো আপনি আমাদের কাছ থেকে পালাচ্ছেন।
আহমদ মুসা কোন উত্তর দিলনা। ম্লান হেসে সোফায় গা এলিয়ে দিল।
মাজুভ উঠে দাঁড়াল। বলল, মুসা ভাই আপনার গোছ-গাছ তো কিছুই হয়নি।
আহমদ মুসা হাসান সেনজিকের দিকে তাকিয়ে বলল, আমার কাপড়-চোপড়গুলো ব্যাগে ভরে দাও হাসান সেনজিক। আর মাজুভ ফার্ষ্ট এইডের কয়েকটা জিনিস শেষ হয়েছে। তুমি গিয়ে দেখ, কিনে আনতে হবে।
মাজুভ এবং হাসান সেনজিক ড্রইংরুম থেকে বেরিয়ে গেল।
সালেহ বাহমন ও জাকুব উঠতে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা বলল, তোমরা বস তোমাদের হোয়াইট ক্রিসেন্ট সম্পর্কে আরও কয়েকটা কথা বাকি আছে।
ওরা আবার বসল।
ভেতর থেকে নাতাশা বলল, খাবার রেডি ভাইজান।
একটু থেমে নাতাশা বলল, ডেসপিনা ও নাদিয়া কাঁদছে।
‘ডেসপিনা, নাদিয়া বোন, তোমাদের এ কান্না আমার জন্যে বেদনাদায়ক হবে। সব তোমরা শুনেছ। অনেক ভাই, অনেক বোনের বিপদ ও দুঃখ-বেদনার কথা স্মরণ করে তাদের সাহায্যে ভাইকে তো হাসি-মুখে তোমাদের বিদায় দেয়া উচিত।’
‘মাফ করবেন আমাদের, এমনভাবে আপনি যাবেন তা আমরা কেউ ভাবিনি। আমার বাড়ি, নাদিয়ার বাড়ি কারো বাড়িতেই আপনি একদিনও থাকলেন না।’ বলল ডেসপিনা কান্না জড়িত কন্ঠেই।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ঠিক আছে এবার এলে তোমাদের ওখানেই উঠবো।
বলে আহমদ মুসা সালেহ বাহমন ও জাকুবের দিকে মনোযোগ দিল।
