আনন্দ ও এ্যকশনের মধ্যে দিয়ে অনেকগুলো দিন যেন চোখের পলকেই কেটে গেল আহমদ মুসার।
আনন্দটা হলো হাসান সেনজিকের সাথে ডেসপিনার এবং সালেহ বাহমনের সাথে নাদিয়া নুরের বিয়ে। হাসান সেনজিকের বিয়েতে খুব বেশি ধুমধাম হয়েছে। কয়েক যুগের মধ্যে ষ্টিফেন পরিবারের কোন বিয়ে প্রকাশ্যে হয়নি, ধুমধামতো দূরে থাক। বিয়ের ভোজ চলেছে তিনদিন ব্যাপী। বোসনিয়া, হারজেগোভিনা, কসভো প্রভৃতি রাজ্যসহ গোটা দেশের উল্লেখযোগ্য মুসলিম পরিবারগুলো দাওয়াত পেয়েছে বিয়েতে। ডেসপিনা ও নাদিয়া নুরের বিয়ে একই দিনে অনুষ্ঠিত হয়েছে হাসান সেনজিকের বাড়িতেই।
আরও একটা বড় আনন্দের ঘটনা ঘটেছে। সেটা হলো বোসনিয়া ও হারজেগোভিনা রাজ্যে অর্ধশতাব্দির কম্যুনিষ্ট শাসন অবসানের পর প্রথম যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো, তাতে একজন মুসলমান প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন এবং তিনি হাসান সেনজিকের দাওয়াতে এসেছিলেন। আহমদ মুসার সাথে তার অনেক কথা হয়েছে। তিনি তো আহমদ মুসাকে না নিয়ে কিছুতেই যাবেন না তাঁর রাজধানীতে। পরে অবশ্যই যাবে এই ওয়াদা দিয়ে আহমদ মুসা রক্ষা পেয়েছে।
বোসনিয়া ও হারজেগোভিনাতে এই বিজয় কি করে সাধিত হলো তার জবাব আহমদ মুসা প্রেসিডেন্টের কাছ থেকেই জানতে পেরেছিলেন, জনসংখ্যার ৪০ ভাগ মুসলমান ঐক্যবদ্ধ ছিল এবং তাদের প্রধান শত্রু মিলেশ বাহিনী হঠাৎ করে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। বোসনিয়া ও হারজেগোভিনার প্রেসিডেন্ট আলিজ্য ইজ্বেত হাসান সেনজিককেও উৎসাহ দিয়ে গেছেন, নির্বাচনের জন্যে তৈরী হবার। সার্ভিয়ার মুসলিম জনসংখ্যাও বোসনিয়ার মতই। আর হাসান সেনজিক তাদের সবারই প্রিয়। সুতরাং সাহসের সাথে তাকে জাতির নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসতে হবে।
আনন্দের সাথে সাথে দিনগুলো এ্যাকশনের মধ্যে দিয়েও কেটেছে।
সেদিন হাসান সেনজিকের বাড়ীতে কনষ্টানটাইন নিহত হবার পর আহমদ মুসা জাকুবকে নিয়ে ডেসপিনার ওখানে আসে এবং ঐ রাতেই মাজুভ ও জাকুবকে সাথে নিয়ে মিলেশ বাহিনীর হেড কোয়র্টারে আবার হানা দেয়। কোন বাধাই তারা পায়নি। তাদের আগমন টের পেয়েই কয়েকজন যারা ছিল পালিয়ে যায়।
আহমদ মুসা মিলেশ বাহিনীর অফিস অনুসন্ধান করে তাদের কাগজপত্র ও দলিল দস্তাবেজ হস্তগত করে। কনষ্টানটাইনের পার্সোনাল ফাইল ক্যাবিনেটের গোপন কুঠুরীতে কিছু যুগোশ্লাভ দিনার সহ প্রায় ১লাখ মার্কিন ডলার পায়। আহমদ মুসা টাকায় হাত দেয়নি। আহমদ মুসা তিন তলা থেকে কনষ্টানটাইনের স্ত্রীকে ডেকে এনেছিল। তার সামনেই সে এ অনুসন্ধানের কাজ করেছে। কনষ্টানটাইনের স্ত্রী প্রথমে আসতে ভয় করেছে। আহমদ মুসা স্বয়ং গিয়ে তাকে অভয় দিয়ে নিয়ে এসেছে। আহমদ মুসা প্রাপ্ত টাকা তার হাতে তুলে দিয়ে বলেছে, আমরা মিলেশ বাহিনী সংক্রান্ত কাগজপত্র অনুসন্ধানের জন্যে এসেছি, টাকার জন্যে নয়।
গোটা সময় কনষ্টানটাইনের স্ত্রী একটা কথাও বলেনি। ভয় ও শোকে যেন সে পাথর হয়ে গিয়েছিল।
অনুসন্ধান শেষে বিদায়ের সময় আহমদ মুসা কনষ্টানটাইনের স্ত্রীর সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল, আপনাকে বিরক্ত করতে হলো, এজন্যে দুঃখিত।
বলে আহমদ মুসা আসার জন্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু কয়েক পা এগিয়েই আবার সে ফিরে দাঁড়িয়ে বলেছিল, যা কিছু ঘটে গেল, তার জন্যে আমরা দায়ী নই। আমরা আত্মরক্ষা করেছি মাত্র।
‘এই যে রাতে এখানে হানা দিলেন, এটাও কি আত্মরক্ষার জন্য?’ এটাই প্রথম কথা ছিল কনষ্টানটাইনের স্ত্রীর।
উত্তরে আহমদ মুসা বলেছিল, ‘হ্যাঁ আত্মরক্ষার জন্যেই এই হানা। মিলেশ বাহিনীর রেকর্ড থেকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে মিলেশ বাহিনীর ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আরও সম্যক ধারণা আমরা পেতে চাই।’
বলে আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়িয়েছিল যাবার জন্যে। ‘শুনুন’ পেছন থেকে ডেকে উঠেছিল কনষ্টানটাইনের স্ত্রী।
আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়ালে কনষ্টানটাইনের স্ত্রী বলেছিল, শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিলেন না?
‘কোথায় শত্রু?’ বলেছিল আহমদ মুসা।
‘কেন আমি এবং আমার সন্তানেরা?’
‘না আপনাদের সাথে আমাদের কোন বিরোধ নেই।’
‘আমার স্বামী থেকে আমি এবং আমার সন্তান বিচ্ছিন্ন নই।’
‘তা ঠিক, কিন্তু কনষ্টানটাইন আপনারা নন। আপনার কাছে পিস্তল আছে, কিন্তু সুযোগ পেয়েও আপনি সে পিস্তল ব্যবহার করেননি। কনষ্টানটাইন হলে সামান্য সুযোগও হাতছাড়া করতো না।’ একটু হেসে বলেছিল আহমদ মুসা।
‘কেমন করে জানলেন আমার কাছে পিস্তল আছে?’ চোখে বিস্ময় টেনে বলেছিল কনষ্টানটাইনের স্ত্রী।
‘আপনি পিস্তল হাতে না নিয়ে শত্রুর ডাকে আসতে পারেন না। সন্ধ্যা রাতে আপনিই তিনতলা থেকে গুলি করেছিলেন।’
বিস্ময় ফুটে উঠেছিল কনষ্টানটাইনের স্ত্রীর চোখে। সে বলেছিল, তাহলে তো প্রমাণ হলো আমি আপনার শত্রু। কিন্তু বললেন যে আপনার শত্রু নই।
আহমদ মুসার মুখে হাসি ফুটে উঠেছিল। বলেছিল, বলেছিতো আপনি পিস্তল ব্যবহার করেননি, যা করতো কনষ্টানটাইন।
কনষ্টানটাইনের স্ত্রী তৎক্ষণাৎ কোন উত্তর দেয়নি। সে গম্ভীর হয়ে উঠেছিল। একটুক্ষণ নিরব থেকে সে আহমদ মুসার দিকে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে বলেছিল, ‘আপনাকে ধন্যবাদ, আমার একটি নতুন অভিজ্ঞতা হলো। আমার স্বামী কি করতেন আমি জানি। তিনি এ অবস্থায় আপনার পরিবারকে ছাড়তেন না।’
‘একজনের অপরাধে অন্যের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ মুসলমানরা করে না, এ অনুমতি ইসলামে নেই। ধন্যবাদ।’ বলে আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়িয়ে চলে এসেছিল।
আহমদ মুসা মিলেশ বাহিনীর হেড কোয়র্টারে মূল্যবান অনেক তথ্য পেয়েছিল। তার মধ্যে মিলেশ বাহিনীর বিভিন্ন শাখা অফিসের ঠিকানা এবং লোকদের পরিচয়। এই তথ্য গুলোই আশু প্রয়োজন ছিল আহমদ মুসার।
মিলেশ বাহিনীর শাখা অফিসগুলো ভেঙ্গে দেয়া এবং পরিচয় প্রাপ্ত লোকদের পাকড়াও করার পরিকল্পনা আহমদ মুসা সেই রাতেই গ্রহণ করে। এ পরিকল্পনা মোতাবেক আহমদ মুসা, মাজুভ, জাকুব এবং সালেহ বাহমন হোয়াইট ক্রিসেন্টের কর্মীদের সাথে নিয়ে গোটা যুগোশ্লাভিয়ার এ শহর থেকে সে শহরে, এ শাখা ঘাটি থেকে সে শাখা ঘাটিতে দিনের পর দিন পাগলের মত ছুটে বেড়ান। পরিশ্রমের ফলও তারা লাভ করে। মিলেশ বাহিনীর গোটা অবকাঠামোই ভেঙ্গে পড়ে, মাত্র দেড় সপ্তাহে মিলেশ বাহিনীকে ছিন্ন-ভিন্ন করে দেওয়া সম্ভব হয়। সেই সাথে হোয়াইট ক্রিসেন্টের শক্তিশালী একটা কাঠামো গড়ে তোলা হয়।
এই বিজয়ের পর পরই খবর আসে বোসনিয়া ও হারজেগোভিনা রাজ্যে মুসলমানদের নির্বাচন বিজয়ের। এই বিজয়-সংবাদের উত্তপ্ত অবস্থার মধ্যেই ডেসপিনা এবং নাদিয়ার বিয়ে আনুষ্ঠিত হয়।
এ সবের মধ্য দিয়ে সপ্তাহ তিনেক সময় কোন দিক দিয়ে কেটে গেল তা বুঝতেই পারলো না আহমদ মুসা।
