• আমাদের সম্পর্কে
  • যোগাযোগ
  • গোপনীয়তা নীতি
মঙ্গলবার, জুন 23, 2026
  • Login
BnBoi.Com
  • বাংলাদেশী লেখক
    • অতুলচন্দ্র গুপ্ত
    • অভিজিৎ রায়
    • আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    • আনিসুল হক
    • আবু ইসহাক
    • আবু রুশদ
    • আবুল আসাদ
    • আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন
    • আবুল বাশার
    • আরজ আলী মাতুব্বর
    • আল মাহমুদ
    • আসাদ চৌধুরী
    • আহমদ ছফা
    • আহমদ শরীফ
    • ইমদাদুল হক মিলন
    • উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    • কাসেম বিন আবুবাকার
    • জসীম উদ্দীন
    • তসলিমা নাসরিন
    • দাউদ হায়দার
    • দীনেশচন্দ্র সেন
    • নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    • নিমাই ভট্টাচার্য
    • প্রফুল্ল রায়
    • প্রমথ চৌধুরী
    • ময়ূখ চৌধুরী
    • মহাদেব সাহা
    • মাহমুদুল হক
    • মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    • হুমায়ূন আহমেদ
  • ইন্ডিয়ান লেখক
    • অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়
    • অতুল সুর
    • অদ্রীশ বর্ধন
    • অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    • অনীশ দেব
    • অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    • অমিয়ভূষণ মজুমদার
    • আশাপূর্ণা দেবী
    • আশুতোষ মুখোপাধ্যায়
    • ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    • কাজী নজরুল ইসলাম
    • ক্ষিতিমোহন সেন
    • তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    • তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়
    • দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    • নারায়ণ সান্যাল
    • নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    • নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    • পাঁচকড়ি দে
    • পূর্ণেন্দু পত্রী
    • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    • বিমল মিত্র
    • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    • হেমেন্দ্রকুমার রায়
  • বিভাগসমূহ
    • আত্মজীবনী
    • ইতিহাস
    • উপন্যাস
    • কবিতা
    • কল্পকাহিনী
    • কাব্যগ্রন্থ
    • খেলাধুলার বই
    • গল্পের বই
    • গোয়েন্দা কাহিনী
    • ছোট গল্প
    • জীবনী
    • দর্শন
    • ধর্মীয় বই
    • নাটকের বই
    • প্রবন্ধ
    • বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী
    • বৈজ্ঞানিক বই
    • ভূতের গল্প
    • মুক্তিযুদ্ধের-বই
    • রহস্যময় গল্পের বই
    • রোমাঞ্চকর গল্প
    • রোম্যান্টিক গল্পের বই
    • শিক্ষামূলক বই
    • সমগ্র
  • সিরিজ বই
    • মিসির আলী সমগ্র
    • হিমু সিরিজ
No Result
View All Result
  • বাংলাদেশী লেখক
    • অতুলচন্দ্র গুপ্ত
    • অভিজিৎ রায়
    • আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    • আনিসুল হক
    • আবু ইসহাক
    • আবু রুশদ
    • আবুল আসাদ
    • আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন
    • আবুল বাশার
    • আরজ আলী মাতুব্বর
    • আল মাহমুদ
    • আসাদ চৌধুরী
    • আহমদ ছফা
    • আহমদ শরীফ
    • ইমদাদুল হক মিলন
    • উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    • কাসেম বিন আবুবাকার
    • জসীম উদ্দীন
    • তসলিমা নাসরিন
    • দাউদ হায়দার
    • দীনেশচন্দ্র সেন
    • নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    • নিমাই ভট্টাচার্য
    • প্রফুল্ল রায়
    • প্রমথ চৌধুরী
    • ময়ূখ চৌধুরী
    • মহাদেব সাহা
    • মাহমুদুল হক
    • মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    • হুমায়ূন আহমেদ
  • ইন্ডিয়ান লেখক
    • অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়
    • অতুল সুর
    • অদ্রীশ বর্ধন
    • অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    • অনীশ দেব
    • অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    • অমিয়ভূষণ মজুমদার
    • আশাপূর্ণা দেবী
    • আশুতোষ মুখোপাধ্যায়
    • ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    • কাজী নজরুল ইসলাম
    • ক্ষিতিমোহন সেন
    • তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    • তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়
    • দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    • নারায়ণ সান্যাল
    • নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    • নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    • পাঁচকড়ি দে
    • পূর্ণেন্দু পত্রী
    • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    • বিমল মিত্র
    • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    • হেমেন্দ্রকুমার রায়
  • বিভাগসমূহ
    • আত্মজীবনী
    • ইতিহাস
    • উপন্যাস
    • কবিতা
    • কল্পকাহিনী
    • কাব্যগ্রন্থ
    • খেলাধুলার বই
    • গল্পের বই
    • গোয়েন্দা কাহিনী
    • ছোট গল্প
    • জীবনী
    • দর্শন
    • ধর্মীয় বই
    • নাটকের বই
    • প্রবন্ধ
    • বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী
    • বৈজ্ঞানিক বই
    • ভূতের গল্প
    • মুক্তিযুদ্ধের-বই
    • রহস্যময় গল্পের বই
    • রোমাঞ্চকর গল্প
    • রোম্যান্টিক গল্পের বই
    • শিক্ষামূলক বই
    • সমগ্র
  • সিরিজ বই
    • মিসির আলী সমগ্র
    • হিমু সিরিজ
No Result
View All Result
BnBoi.Com
No Result
View All Result

সাইমুম সিরিজ – আবুল আসাদ

ডেসপিনার মাথা আরও নুয়ে গেল লজ্জায়। সে তাড়াতাড়ি উঠে বলল,আপনারা কথা বলুন, আমি আসছি। বলে ডেসপিনা ছুটে বেরিয়ে গেল ঘরের বাইরে।
সেদিকে তাকিয়ে বেগম খানম মিষ্টি হেসে বলল, লক্ষী মা আমার। দু’জনকে এক সাথে দাঁড় করিয়ে কবে যে দেখতে পাব।

নাদিয়া নূর তাদের গেস্ট রুমটা গোছগাছ করছিল। গতকাল চলে গেছে সালেহ বাহমন। সে সুস্থ হয়ে উঠেছে। এরপরও সে চলে যাক, নাদিয়া নূরের মন সায় দেয়নি। কেন জানি তার মনে হয়েছে সালেহ বাহমন এখানে নিরাপদ,বাইরে বেরুলে আবার বিপদে পড়বে। কিন্তু নাদিয়া নূর এবার বাধা দিতে পারেনি লজ্জায়। এমনকি সালেহ বাহমনের বিদায়ের সময় নাদিয়া নূর সেখানে হাজির ছিল না। ‘মা’ পরে বলেছিল, এ কেমনরে নূর,ছেলেটা চলে গেল,বাড়ীতে থেকেও তুই সেখানে গেলি না। কি ভাববে বলত?
জবাবে নাদিয়া বলেছিল,উনি কিছুই ভাববেন না আম্মা, মুসলিম মেয়েদের এভাবে যাওয়া উচিত নয়, উনিই এটা সবচেয়ে ভাল জানেন।
মা একটু মিষ্টি হেসে নাদিয়ার মুখটি উপরে তুলে ধরে বলেছিল,ছেলেটাকে কেমন মনে হয় নূর?
এক ঝলক রক্ত এসে নাদিয়া নূরের মুখ ঢেকে দিয়েছিল। লজ্জায় মুখ রাঙ্গা হয়ে উঠেছিল নাদিয়ার। মায়ের এ কথার অর্থ সে বোঝে।
সে ‘আম্মা’ বলে মায়ের বুকে মুখ গুজেছিল।
মা আর কিছু বলেনি। হাসি ভরা মুখে মেয়ের পিঠে আদর করে হাত বুলিয়ে দিয়েছিল।
গেস্টরুমের টেবিল গোছাচ্ছিল নাদিয়া। রাইটিং প্যাড তুলে ড্রয়ারে রাখতে গিয়ে প্যাডের তলায় প্যাডের একটা আলগা পাতা পেল। পাতাটিতে সুন্দর করে নাদিয়া নূরের নাম লেখা। চার দিকের নানা আঁচড়-অক্ষর দেখে মনে হয় লেখক যেন আনমনে আঁকা-আঁকি করতে গিয়েই অনেকক্ষণ ধরে নামটি লিখেছে।
নাদিয়ার চিনতে অসুবিধা হলোনা সালেহ বাহমনের হস্তাক্ষর। প্রসন্ন একটুকরো হাসি ফুটে উঠল নাদিয়ার ঠোঁটে, তাতে লজ্জাও মেশানো ছিল।
নাদিয়া পাতাটি যত্নের সাথে ভাজ করে বুকে জামার নিচে গুঁজে রাখল।
বাইরে গেটে নক করার শব্দ হল এ সময়।
নাদিয়ার আব্বা ঘরে ঢুকছিল। নাদিয়াকে গেটের দিকে যেতে উদ্যত দেখে বলল, তুমি দাঁড়াও নাদিয়া, আমি দেখি।
নাদিয়ার আব্বা ওমর বিগোভিক গিয়ে দরজা খুলল। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে একটা ফুটফুটে তরুণী। গায়ে ঢিলা জামা। মাথায় ওড়না জড়ানো। চোখে—মুখে আভিজ্যাত্যের ছাপ।
ওমর বিগোভিক কিছু বলার আগেই মেয়েটি সালাম দিল। বলল, আপনিকি নাদিয়ার আব্বা?
–হ্যাঁ মা।
–নাদিয়া আছে?
–আছে এস, মা।
বলে ওমর বিগোভিক দরজার এক পাশে সরে তরুণীটিকে অভ্যার্থনা জানাল এবং পাশের গেস্টরুম দেখিয়ে বলল, নাদিয়া ওখানেই আছে।
তরুণীটি ঘরের দিকে গেল। আর ওমর বিগোভিক দরজা বন্ধ করার জন্যে সামনে এগুলেন। দরজা বন্ধ করতে করতেই ওমর বিগোভিক নাদিয়ার হৈ চৈ শুনতে পেল।
গেস্টরুমের দরজা দিয়ে ঢোকার সময়ই তরুণীটি নজরে পড়ল নাদিয়ার। তার উপর নজর পড়তেই ভূত দেখার মত চমকে উঠে নাদিয়া বলল,‘আরে ডেসপিনা’ তুমি? বিস্ময়ের ঘোর নাদিয়াকে মুহূর্ত কয়েকের জন্যে বোবা করেদিয়েছিল। হা করে তাকিয়ে ছিল ডেসপিনার দিকে। তারপরেই ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরল ডেসপিনাকে। বলতে লাগল ‘কি সৌভাগ্য আমাদের’, ‘কি সৌভাগ্য আমাদের’।
চিৎকার করে ডাকল,আব্বা-আম্মা এস, দেখ কে এসেছে,আমাদের কি সৌভাগ্য!
নাদিয়ার আব্বা-আম্মা দু’জনেই এসে ঢুকল।
নাদিয়া ডেসপিনাকে জড়িয়ে ধরেই তার আব্বা-আম্মার সামনে টেনে নিয়ে বলল,তোমাদের ডেসপিনার কথা বলেছিলাম না। এ সেই ‘ডেসপিনা জুনিয়র’-স্টিফেন পরিবারের মেয়ে।
ডেসপিনা সালাম দিল নাদিয়ার আব্বা-আম্মাকে।
তারা সালামের উত্তর দিল। নাদিয়ার আব্বা হাত তুলে বলল, বেঁচে থাক মা।
নাদিয়ার মা এগিয়ে এল ডেসপিনার দিকে। ডেসপিনার চিবুকে আলতো একটা চুমু দিয়ে বলল, আল্লাহ তোমাকে বাঁচিয়ে রাখুন মা।
–কিছুতেই বিশ্বাস হতে চাইছে না,ডেসপিনা আমাদের বাড়ীতে,সত্যিই আমাদের সৌভাগ্য। বলল নাদিয়া।
–কিছু মনে করবেন না খালাম্মা, খালুজান, নাদিয়া ছেলে মানুষী করছে। লজ্জায় মুখ লাল করে বলল ডেসপিনা।
–ঠিক আছে মা। তোমাকে আমাদের মাঝে পেয়ে আমরা গর্ব বোধ করছি। তুমি জাননা,স্টিফেন পরিবার বলকানের মুসলমানদের জন্যে কি। সবাই পরম শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সাথে এ পরিবারকে দেখে, এ পরিবারের কথা স্মরণ করে। নাদিয়ার উচ্ছাস সবার অন্তরকেই প্রতিধ্বনিত করছে। কথাটা বলে নাদিয়ার মা ডেসপিনার হাত ধরে তাকে নিয়ে সোফায় বসাল। পাশের সোফায় গিয়ে বসল নাদিয়ার আব্বা-আম্মা। নাদিয়া বসল ডেসপিনার পাশে।
নাদিয়ার মা’র কথায় ডেসপিনা মাথা নিচু করে গম্ভীর হয়েছিল। সোফায় বসে মুখটা একটু তুলে ডেসপিনা নাদিয়ার মা’র দিকে চেয়ে বলল, আজকের স্টিফেন পরিবার সেই স্টিফেন পরিবারের এক কংকাল, তাদের তো কিছু নেই খালাম্মা।
–জানি বাছা। কিন্তু স্টিফেন পরিবার সেই স্টিফেন পরিবারই আছে। না হলে তাদের উপর আজ দুঃখ-মুসিবত কেন? বলল নাদিয়ার মা।
–কিন্তু খালাম্মা এই পরিবার তো তার দায়িত্ব পালন করতে পারছে না,বরং তারই কারণে জাতির মুসিবত আরও বাড়ছে।
–দিন কারো সমান যায় না মা, আজ পারছে না, কাল পারবে।
–আপনি বলছেন পারবে খালাম্মা? চোখ দু’টি উজ্জ্বল হয়ে উঠল ডেসপিনার।
–পারা তো শুরু হয়ে গেছে মা। হাসান সেনজিক ইতিমধ্যেই মিলেশ বাহিনীর রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। এত বছর গেল, ওদেরকে এইভাবে চ্যালেঞ্জ আর কেউ করতে পারেনি। বলল ওমর বিগোভিক।
–আপনার কথা ঠিক খালুজান। কিন্তু এ ব্যাপারটা এখানে বিরাট বিপদের সৃষ্টি করেছে। আমি সেই বিপদের কথা নিয়েই আপনাদের এখানে ছুটে এসেছি।
–কি বিপদ মা?
উদ্বেগ ভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল ওমর বিগোভিক।
–গতকাল মিলেশ বাহিনির লোকেরা আমার খালাম্মার বাড়ীতে মানে হাসান সেনজিকের বাড়িতে এসেছিল হাসান সেনজিকের খোঁজে। গোটা বাড়ীতে তারা ভাংচুর করেছে, তছনছ করে দিয়েছে বাড়ীর সব কিছু। তারা দাবি করেছিলো হাসান সেনজিককে বের করে দিতে অথবা সন্ধান দিতে কোথায় আছে। অবশেষে যাবার সময় অসুস্থ খালাম্মা কে বলে গেছে, ঠিক সাত দিন পরে তারা আসবে, এসে হাসান সেনজিককে না পেলে বা তার কোন সন্ধান না দিলে খালা আম্মাকেই ওরা পণবন্দী করে নিয়ে ……।
কথা শেষ করেতে পারলনা ডেসপিনা। কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।
নাদিয়া ডেসপিনাকে কাছে টেনে নিল। নাদিয়ার মা এসে ডেসপিনাকে কাছে টেনে সান্তনা দিতে লাগল। ডেসপিনা রুমাল দিয়ে দু’চোখ মুছে বলল, ফুফু আম্মা খুবেই অসুস্থ। বিছানা থেকে উঠবার শক্তি তার নেই। অবস্থার এই চাপ তিনি সহ্য করেতে পারবেন না, কিছু যদি ঘটে যায়……।
কথা শেষ করল না, কথা বন্ধ করে কান্না চাপতে লাগল ডেসপিনা।
এই সময় বাহিরের দরজায় আবার নক করার শব্দ হল।
ওমর বিগোভিক উঠে দাঁড়াল। দেখি কে এল বলে ওমর বিগোভিক বের হয়ে গেল।
দরজায় নক করেছিল সালেহ বাহমন। ওমর বিগোভিক সালেহ বাহমনকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলো।
কথা শুনেই নাদিয়া বুঝতে পেরেছিল।
গেস্ট রুমের পাশেই ফ্যামেলি ড্রয়িং রুম। মাঝখানে একটা সংযোগ দরজা। নাদিয়া, নাদিয়ার মা এবং ডেসপিনা গিয়ে ভিতরের ড্রয়িং রুমে বসলো।
ওমর বিগোভিক সালেহ বাহমনকে নিয়ে গেস্ট রুমে এল।
সালেহ বাহমন বসেই বলল চাচাজান আপনার লন্ড্রি হাউসে মিলেশ বাহিনীর যে লোকটি আসে তাকে চিনে নিতে চাই। মিলেশ বাহিনির হেডকোয়ার্টার যেখানে ছিল সেখানে এখন আর নেই। বদলেছে। কোথায় আমরা তার সন্ধান পাচ্ছিনা। আপনার ঐ লোকটাকে ফলো করে কোন ঠিকানায় পৌঁছা যায় কিনা দেখতে হবে।
–তোমরা ওদের ফলো করছো কেন?
–ওদের গতিবিধি সম্পর্কে অবহিত হবার জন্য।
–কিন্তু ওরা টের পেলে তো সংঘাত বেধে যাবে।
–সংঘাত তো বাধবেই, কিন্তু আমরা যদি ওদের সম্পর্কে না জানি, ওদের গতি বিধি আমাদের কাছে পরিস্কার না থাকে, তাহলে সে সংঘাতে আমারা জয়ী হতে পারবো না।
–জয়ী হবার আশা কর বাহমন?
–করতেই হবে চাচাজান, দেশ শুদ্ধ সব মুসলমান দেশ ছেড়ে চলে যেতে পারে না। সুতরারং টিকে থাকার জন্য আত্মরক্ষার সংগ্রামে আমাদের জয়ী হতেই হবে।
দরজার ওপাশে নাদিয়াদের গল্প বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। তারা কান দিয়েছিল সালেহ বাহমন এবং নাদিয়ার আব্বার আলোচনার দিকে। নাদিয়ার আম্মা কি কাজে উঠে গিয়েছিলো।
নাদিয়া নূর ডেসপিনার পাশেই বসেছিলো। ডেসপিনা তাকে কনুই-এর এক গুতা দিয়ে বলল, এই বুঝি তোমার সেই সালেহ বাহমন?
আমার কেন বলছ? আমি যদি বলি হাসান সেন……
ডেসপিনা নাদিয়ার মুখ চেপে ধরে বলল। মাফ চাচ্ছি, প্রত্যাহার করে নিচ্ছি কথা। বল এই কি সেই সালেহ বাহমন?
–উত্তর দিবনা। অভিমান করে বলল নাদিয়া।
–ঠিক আছে উত্তর দিওনা এসব প্রশ্নের উত্তর না দেওয়াই বড় উত্তর।
নাদিয়া হেসে ডেসপিনাকে জড়িয়ে ধরে বলল, তুমি যাই ভাব, আসল ব্যাপার হল ও আমাকে জানে না, ওকে আমি জানি না।
–কিন্তু আমি তো তোমাকে জানি। নাদিয়াকে একটা চিমটি কেটে বলল ডেসপিনা।
ঠিক এই সময়েই সালেহ বাহমন ও নাদিয়ার আব্বার মধ্যে কথা শুরু হয়ে গিয়েছিল এবং ওদিকে কান দিতে গিয়েই তাদের কথা বন্ধ হয়ে যায়।
সালেহ বাহমনের কথায় ওমর বিগোভিকের মুখ উজ্জল হয়ে উঠেছিল। বলল সে, ধন্যবাদ বাহমন আশার কথা শুনালে। আমাদের ছেলেরা সবাই এভাবে ভাবছে?
–সবাইকে তো জানিনা চাচাজান, যাদের জানি তারা এর চাইতেও বেশি ভাবছে।
–কিন্তু সংখ্যা শক্তি ও সুযোগ সব দিকেই ওরা ভালো অবস্থায়, ওদের মোকাবিলা কি সহজ হবে ?
–হবে না। কিন্তু মোকাবিলার তো বিকল্প নাই। আমরা তো নিরবে আত্নসমর্পণ করে জাতির অস্তিত্ব বিলীন করে দেবার পথ বেছে নিতে পারি না।
–তুমি তো ডেসপিনার নাম শুনেছ। সে এসেছে। একটা……………
–ডেসপিনা মানে স্টিফেন পরিবারের ডেসপিনা এসেছে?
–হাঁ
–আল-হামদুলিল্লাহ। আজকেই আমরা স্টিফেন পরিবারের সাথে যোগাযোগের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছি। চেষ্টা করেও ওদের পরিবারে কারো সাথে আলোচনা করার সুযোগ হয়নি। একদিকে পরিচিত বাড়িগুলি মিলেশ বাহিনীর চররা চোখে চোখে রেখেছে, অন্যদিকে বড়ীগুলোর চাকর-বাকর কিংবা কেউ মুখ খুলতে নারাজ। আলোচনা করতে গিয়ে মনে হয়েছে, ওরা সবাইকে মিলেশ বাহিনীর লোক বলে সন্দেহ করছে। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি, ডেসপিনা যোগাযোগের একটা পথ বাতলে দিবে।
ডেসপিনা মারাত্নক একটা দুঃসংবাদ নিয়ে এসেছে। বলল ওমর বিগোভিক। কি দুঃসংবাদ? উদ্ভিগ্ন কন্ঠে বলল সালেহ বাহমন।
ওমর বিগোভিক সেদিন হাসান সেনজিকের বাড়ীতে যা ঘটেছিল তার পুরো বিবরণ দিল। শেষে বলল হাসান সেনজিককে ওদের না দিলে বেগম খানমকে ওরা পণবন্দী করবেই।
শোনার পর সালেহ বাহমন অনেকক্ষন কথা বললেন না। তার উদাস দৃষ্টি দেয়ালে নিবদ্ধ ছিল।
অনেকক্ষণ পর তার দৃষ্টি ফিরে এল। সে সোফায় হেলান দিয়ে বসল। তার ঠোঁটে ফুটে উঠলো এক টুকরো হাসি। বলল, ওরা পাগল হয়ে উঠেছে।
–কিন্তু এই পাগলামিকে যদি রোধ করা না যায়?
সাত দিন তো দেরি আছে চাচাজান, হাসান সেনজিকরা ততোদিন বেলগ্রেড এসে পৌঁছাবে।
–তুমি নিশ্চিত হচ্ছ কেমন করে ?
–আমার নিশ্চিত হবার কারণ, হাসান সেনজিকরা এ পর্যন্ত তাদের প্রতিরোধ খেলনার মত ভেঙ্গেছে। আমার আর একটি ধারনা, যে শক্তি ও যে বুদ্ধি দিয়ে ওরা মিলেশদের প্রতিরোধ ভাঙছে, সেই শক্তি ও বুদ্ধি যদি মিলেশদের রুখে দাঁড়ায় তাহলে ওদের পাগলামি বন্ধ করা যাবে।
–এসবই তোমার একটা অনুমান।
–শুধু অনুমান নয় চাচাজান, আমরা খবর পেয়েছি আলবেনিয়ার রাজধানীর দুধর্ষ সন্ত্রাসী জেমস জেংগা এবং কাকেজীর ত্রাস ব্ল্যাক ক্যাটকে ওরা যে ভাবে নিমিষে শেষ করেছেন তাতে আমাদের বুক ফুলে উঠেছে।
–কিন্তু ভুলে যেওনা মিলেশ বাহিনী জেমস জেংগা এবং ব্লাক ক্যাট নয়, বলকান অঞ্চলের সবচেয়ে সুগঠিত ও শক্তিশালী বাহিনী।
–জানি চাচাজান কিন্তু ওদের মধ্যে কম্পন শুরু হয়েছে, হেডকোয়ার্টার গোপন স্থানে সরিয়ে নেয়া এরই প্রমাণ।
ওমর বিগোভিক মুহুর্ত কয়েক চুপ থাকল। তারপর বলল আচ্ছা বাহমন, হাসান সেনজিকের সাথের ঐ লোকটা কে যে আমাদের কল্পনাকেও হার মানাচ্ছে।
–আমি জানি না তিনি কে? কিন্তু আমি অনুমান করি, তিনি আহমদ মুসা ছাড়া আর কেউ নন। হাসান সেনজিককে নিয়ে যুগোস্লাভিয়ার চরম প্রতিকুল মাটিতে পা রাখার দুঃসাহস একমাত্র তিনিই রাখেন।
–কিন্তু একজন মানুষ কি করে এত বড় চ্যালেঞ্জ … ওমর বিগোভিক কথা শেষ না করেই থেমে গেল।
সালেহ বাহমন একটু হাসলো। বলল, তার ইতিহাস তো এটাই চাচাজান। ফিলিস্তিনে তিনি একা গিয়েছিলেন, মিন্দানাও, সোভিয়েত মধ্যে এশিয়া, সিংকিয়াং এবং ককেশাশেও তিনি একা গিয়েছিলেন এবং আল্লাহ তাকেই জয়ী করেছেন। চাচাজান, তিনি রূপ কথার রাজপুত্র,তার সামনে কোন প্রতিরোধই টিকে না।
ওমর বিগোভিক কোন কথা বলল না। তার মুখ দু’টি আনন্দে উজ্জল হয়ে উঠল। তার শূন্য দৃষ্টি দেয়ালে নিবদ্ধ। বোধ হয় সে মনে মনে সালেহ বাহমনের সুন্দর কথাগুলো নাড়াচাড়া করছে।
ডেসপিনা এবং নাদিয়া নূরের মুখেও কোন কথা নেই। তাদের সামনেও তখন সালেহ বাহমনের কথাগুলোই প্রতিধ্বনি হচ্ছে।
অনেকক্ষণ পর নাদিয়া নূর বলল, ওর কথা সত্য হলে আহমদ মুসা আমাদের জন্যে সৌভাগ্য বহন করে আনছেন।
‘কিন্তু আমি ভাবছি নাদিয়া’বলতে লাগল ডেসপিনা, ‘মানুষের ভার নিয়ে দেশ থেকে দেশান্তরে এইভাবে ঘুরে বেড়ায় এমন মানুষও আজ দুনিয়াতে তাহলে আছে।’
নাদিয়া কিছু বলতে যাচ্ছিল।
এই সময় ডাইনিং রুম থেকে নাদিয়াকে ডাকল তার মা।
‘আসি’ বলে নাদিয়া ছুটে গেল ডাইনিং রুমের দিকে।

৭

কসভো হাইওয়ে ধরে ছুটে চলছিল ট্যাক্সিটি। উঁচু-নিচু পথ। কখনো পাহার উঁচু-নিচু ভুমি, কখনও নিচু-উপত্যকা, কখনও বা আবার প্রান্তরের সমভুমি ধরে এগিয়ে চলছিল ট্যাক্সিটি।
কসভো নামটা বড় প্রিয় আহমদ মুসার কাছে। এই কসভোরই কোন এক স্থানে যুদ্ধ হয়েছিল তুরস্কের সুলতান মুরাদের সাথে ইউরোপীয় খৃষ্টানদের মিলিত বাহিনীর। এই যুদ্ধে মুরাদের বিজয় ইউরোপের দরজা খুলে দিয়েছিল ইসলামের জন্য।
নিরব প্রান্তরের ভিতর দিয়ে গাড়ি ছুটে চলার শোঁ শোঁ শব্দ ছাড়া আর শব্দ নেই কোথাও। প্রথম নিরবতা ভাঙল আহমদ মুসা। ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে বলল, ধন্যবাদ ড্রাইভার, খুব সুন্দর গাড়ি চালাও তুমি।
ড্রাইভারের মুখ উজ্জ্বল হলো। সে ঘাড়টা পেছনের দিকে একটু ফিরিয়ে বলল, ধন্যবাদ।
আবার নিরবতা। নিরবতার এক প্রান্তে এসে আহমদ মুসা বলল, ড্রাইভার তোমার নাম কি?
–দিমিত্রি।
–বাড়ী কোথায় তোমার?
–প্রিজরীন।
–আমি মনে করেছিলাম প্রিষ্টিনায় হবে।
–কতদিন ধরে গাড়ি চালাও?
–এক বছর।
একটু চুপ করে থেকে আহমদ মুসা আবার জিজ্ঞেস করল, তুমি খৃষ্টান নিশ্চয়।
জবাব দিল না দিমিত্রি। মুখটা তার বিষন্ন হল যেন।
আবার প্রশ্ন আহমদ মুসার, ও তুমি তাহলে ধর্ম-টর্ম মাননা-কম্যুনিষ্ট।
–আমি এসব কোন কিছু নিয়েই ভাবি না। গম্ভীর কন্ঠে বলল দিমিত্রি।
–ভাবনা কেন? হেসে প্রশ্ন করল আহমদ মুসা।
–শুধু গন্ডগোল আর হানাহানি দেখে।
–তাই বলে তোমার কোন মত থাকবে না?
আবার নিরব হলো ড্রাইভার। উত্তর দিলনা। নিরবতা আবার।
অনেকক্ষণ পর ড্রাইভারই মুখ খুলল। বলল, স্যাররা তো খৃষ্টান?
–তোমার কি মনে হয়? হেসে বলল আহমদ মুসা।
–আমি বুঝতে পারিনি।
–আমরা মুসলমান।
ড্রাইভার চমকে উঠে পেছন ফিরে তাকিয়েছিল। স্টিয়ারিং হুইলের উপর তার নিয়ন্ত্রণ মুহূর্তের জন্যে শিথিল হয়ে পড়েছিল। বেঁকে গিয়েছিল গাড়ির গতি। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই সামলে নিয়েছিল দিমিত্রি। শক্ত হাতে ধরেছিল স্টিয়ারিং হুইল। ঝাঁকি খেয়ে গাড়ি আবার তার জায়গায় ফিরে এসেছিল।
দিমিত্রির এই পরিবর্তন আহমদ মুসার নজর এড়ায়নি। দিমিত্রি এভাবে চমকে উঠলো কেন? মুসলমান পরিচয়টাকে সে এভাবে গ্রহণ করল কেন? সন্দেহের একটা কালো মেঘ আহমদ মুসার মনে উঁকি দিতে চাইল। সেটাকে খুব একটা আমল না নিয়ে সে ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করল, ভয় পেলে দিমিত্রি?
–না স্যার।
–তবে যে চমকে উঠলে?
–চমকে উঠিনি স্যার, বিস্মিত হয়েছি।
–কেন?
–মুসলিম পরিচয় এভাবে এখানে কেউ দেয় না তাই।
–কেন দেয় না? ঠোঁটে হাসি টেনে জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
–ভয়ে। জীবনের ভয় এবং অনেক রকমের ভয়ে, যেমন পদে পদে লাঞ্ছনা ও অসহযোগিতার ভয়।
আহমদ মুসা কিছু বলার জন্য মুখ খুলেছিল। এই সময় সামনে থেকে প্রচন্ড, কর্কশ এক ধাতব শব্দ ভেসে এল। একটা এ্যাকসিডেন্ট। একটা দ্রুতগামী ট্রাকের ধাক্কায় একটা ট্যাক্সি খেলনার মত ছিটকে পড়েছে রাস্তার পাশে।
একটা বিশাল প্রান্তরের মধ্যে দিয়ে তখন চলছিল গাড়ি।
ঘাতক ট্রাকটি পাগলা দৈত্যের মত পাশ দিয়ে ছুটে চলে গেল।
আহমদ মুসাদের গাড়ি কয়েক মুহূর্তের মধ্যে এ্যাকসিডেন্টের জায়গায় আসল। কিন্তু ড্রাইভার গাড়ি না থামিয়ে চলে যাচ্ছিল।
আহমদ মুসা ড্রাইভারের কাঁধে একটা হাত রেখে বলল, গাড়ি থামাও ড্রাইভার। শক্ত কন্ঠ আহমদ মুসার।
সঙ্গে সঙ্গে ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে দিল। তার ঘাড় ফিরিয়ে বলল,স্যার এদেশে এ ধরনের ঝামেলায় কেউ সাধারণত পড়তে চায় না।
আহমদ মুসা দ্রুত গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলল, এটা ঝামেলা নয়,দিমিত্রি, এটা মানুষের পবিত্র দায়িত্ব।
বলে আহমদ মুসা দ্রুত ছুটল দূর্ঘটনার শিকার রাস্তার পাশে ছিটকে পড়া গাড়ির দিকে। তার পেছনে পেছনে ছুটল হাসান সেনজিক। ড্রাইভার দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ তার গাড়ির কাছে। তারপর সেও ধীরে ধীরে এগুলো।
ভাগ্য ভালোই বলতে হবে, এ্যাকসিডেন্টের পর গাড়িটি ছিটকে পড়ে গড়াগড়ি খেলেও শেষ পর্যন্ত গাড়িটি সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কাছে গিয়ে আহমদ মুসারা দেখল, গাড়িটি মুখোমুখি ধাক্কা খায়নি। ট্রাকের ধাক্কাটি ট্যাক্সির ডান হেডলাইটের কোণায় লেগে পিছলে বেরিয়ে গেছে। ডান হেডলাইট সমেত ডান পাশটা দুমড়ে গেছে। ডান দরজাটাও বেঁকে গেছে। ছিটকে পড়ে গড়াগড়ির ফলে গাড়ির ছাদ এবং বাম পাশটাও দুমড়ে গেছে। গাড়ির ইঞ্জিনের দিক থেকে ধোঁয়া বেরুছিল। কিন্তু আহমদ মুসারা গাড়ির কাছে পৌঁছতে পৌঁছতেই দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল।
গাড়ির ড্রাইভিং সিটে একজন যুবক। সে সিটের উপর পড়ে আছে। অজ্ঞান মনে হয়। রক্তে ভিজে যাচ্ছে গাড়ির সিট। ড্রাইভিং সিটের পাশে একজন তরুণী। তার মুখও রক্তে ভেজা। সে সিট থেকে উঠে বসতে চেষ্টা করছে।
আহমদ মুসা দ্রুত গিয়ে প্রথমে ড্রাইভং সিটের দরজা খুলতে চেষ্টা করল। দরজা খোলা গেলনা। দরজাটি ভেঙে চ্যাপ্টা হয়ে বডির সাথে কোথায় যেন আটকে গেছে।
আহমদ মুসা ছুটে ওপাশের দরজায় গেল। দরজা ভেতর থেকে লক করা। লাথি দিয়ে দরজার কাঁচ ভেঙে ফেলে দরজাটি আনলক করে দিল কিন্তু দরজাটি তবু খুলল না। দরজাটি বেঁকে কোথায় আটকে আছে।
কিন্তু এক মুহূর্তও বিলম্বের উপায় নেই। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠেছে। এখনই কেবিনে আগুন এসে পড়বে। ভেতরে মেয়েটি পাগলের মত চিৎকার শুরু করেছে।
পেছনে হাসান সেনজিকের দিকে তাকিয়ে আহমদ মুসা দ্রুত বলল,এস ধর।
তারপর দু’জনে মিলে বিসমিল্লাহ বলে হ্যাচকা একটা টান দিল।
দরজা খুলে গেল।
হাত ধরে প্রথমে মেয়েটিকে বের করে আনল আহমদ মুসা। তারপর ভেতরে ঢুকে গিয়ে সংজ্ঞাহীন যুবকটিকে দু’হাতে টেনে আনল গাড়ির দরজায়।
গাড়ির কেবিন তখন ধোঁয়ায় ভরে গেছে। আহমদ মুসা সংজ্ঞাহীন যুবকটিকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে দ্রুত গাড়ির কাছ থেকে সরে গেল।
আহমদ মুসা যখন যুবকটিকে রাস্তায় ঘাসের উপরে শুইয়ে দিল, তখন গোটা গাড়ি দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে। সবাই একবার সেদিকে চাইল। মেয়েটির চোখে আতংক।
আহমদ মুসা ঝুকে পড়ে যুবকটির নিঃশ্বাস পরীক্ষা করল। নাড়ী দেখল। নাড়ী সবল আছে।
মেয়েটিও এগিয়ে এসেছিল যুবকটির কাছে। তার চোখে একরাশ উদ্বিগ্ন জিজ্ঞাসা।
আহমদ মুসা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল, ভয় নেই বোন, নাড়ী ভাল আছে। কিন্তু এখনই এর রক্ত বন্ধ করা দরকার।
বলেই আহমদ মুসা পাশে দাঁড়ানো ড্রাইভারের দিকে চেয়ে বলল, এখান থেকে নিকটবর্তী হাসপাতাল বা ডিসপেনসারী কতদূর।
–প্রিস্টিনা ছাড়া এ সুযোগ পথে আর কোথাও নেই। প্রিস্টিনা এখান থেকে দু’শ মাইল। বলল ড্রাইভার।
হতাশার একটা ছায়া নামল আহমদ মুসার চোখে-মুখে।
আহমদ মুসা ঝুকে পড়ে যুবকটির ক্ষত আবার পরীক্ষা করল। দু’টো বড় ক্ষত, একটা সামনের কপালে, আরেকটা কান ও কপালের সন্ধিস্থলে। সিট বেল্ট বাঁধা থাকায় আরও বড় ক্ষতি থেকে বেঁচে গেছে।
পাশে দাঁড়ানো হাসান সেনজিকের দিকে চেয়ে আহমদ মুসা বলল, ফাস্ট এইড ব্যাগটা নিয়ে এস।
হাসান সেনজিক চলে গেল গাড়ির দিকে।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়ে মেয়েটির আহত স্থান পরীক্ষা করল। মুখের কয়েক স্থানে ছোট কাটা, ভাঙ্গা কাঁচের টুকরোর আঘাতে ওগুলো হয়েছে। চোখের উপর একটাই বড় কাটা। ওটা দিয়ে রক্ত ঝরছে এখনও।
আহমদ মুসা মেয়েটিকে জিজ্ঞাস করল, যুবকটি তোমার কে বোন?
–আমার স্বামী। স্পষ্ট কণ্ঠে বলল মেয়েটি।
মেয়েটির পরনে লাল স্কার্ট, গায়ে সাদা জামা। তার উপর ব্লু কোট। মেয়েটির বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা।
আর ছেলেটির পরনে ব্লু স্যুট। স্বাস্থ্যবান ব্যায়াম পুষ্ট শরীর। কিন্তু মুখের চেহারায় একটা কর্কশ ভাব।
–তোমার আর কোথাও কোন আসুবিধা নেই তো? জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা।
–আর কোথাও লাগেনি আমার।
একটু থেমে একটা ঢোক গিলে মেয়েটি আবার শুরু করল, আপনি ওকে দেখুন, খুব ব্লিডিং হচ্ছে ওর। মেয়েটির কণ্ঠে কান্না ঝরে পড়ল।
হাসান সেনজিক ‘ফাস্ট এইড কিট’ নিয়ে পৌঁছল।
আহমদ মুসার ‘ফাস্ট এইড কিটে তুলা, ব্যান্ডেজ, আয়োডিন, পেইন কিলার ট্যাবলেট, ছোট কাঁচি-সবই আছে।
আহমদ মুসা গা থেকে কোর্ট খুলে ফেলল। তারপর জামার হাতা গুটিয়ে তুলা ও আয়োডিনের শিশি নিয়ে যুবকটির মাথার কাছে বসে গেল।
ক্ষতস্থানে তুলা চাপা দিয়ে ব্লিডিং কমিয়ে আনা ছাড়া বিকল্প কিছু নেই।
আহমদ মুসা তুলা আয়োডিনে ভিজিয়ে যুবকটির কপালে ও কানের কাছের ক্ষতস্থানটি প্রথমে পরিষ্কার করল। তারপর পরিষ্কার তুলা দিয়ে ক্ষতস্থান দু’টো চাপা দিল এবং হাসান সেনজিককে ক্ষতস্থান দু’টি দুহাতে চেপে রাখতে বলল।
এরপর আহমদ মুসা যুবকটির মুখ-মণ্ডল থেকে তুলা দিয়ে রক্ত পরিষ্কার করল। পরে আয়োডিনের তুলা ক’য়েকবার পাল্টাতে হলো। ধীরে ধীরে কমে এল ব্লিডিং।
ইতিমধ্যে আহমদ মুসা যুবকটির জ্ঞান ফিরানোর চেষ্টা শুরু করেছে। আঘাতের ধরন দেখে আহমদ মুসার নিশ্চিত বিশ্বাস হয়েছে, তার মস্তিস্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। অতএব জ্ঞান তাড়াতাড়িই ফিরে আসবে। ছোট একটা ড্রাম ফাইলে কিছু স্পিরিট ছিল। সেটাই যুবকটির জিহ্ববায় কয়েক ফোটা ফেলে এবং নাকে ধরে রেখে তার মাথার স্নায়ুতন্ত্রীকে সজীব ও সচেতন করে তোলার চেষ্টা করছিল। কিছুক্ষন চেষ্টার পর যুবকটির চোখ মেলল। চোখ মেলেই আতংকে উঠে বসতে চেষ্টা করল।
আহমদ মুসা তাকে জোর করে শুইয়ে দিয়ে বলল, মাথা একটুও নড়াবেন না, ব্লিডিং শুরু হয়ে যেতে পারে। আপনি নিরাপদ আছেন, আপনার স্ত্রী ভাল আছেন। চিন্তা করবেন না। বলে আহমেদ মুসা যুবকটির মাথার পেছন দিকে দাঁড়ানো সেই মেয়েটির দিকে চেয়ে বলল, তুমি এর সামনে এসো বোন, যাতে তোমাকে দেখতে পান। মেয়েটি সরে এসে যুবকটির মুখের কাছে ঝুকে পড়ে বলল, চিন্তা করোনা, আমি ভাল আছি, তোমারও আর কোন ভয় নেই। এরা গাড়ি থেকে আমাদের উদ্ধার করেছেন। যুবকটি মেয়েটির একটি হাত ধরল। তারপর শান্তভাবে চোখ বুজল। আহমেদ মুসা যুবকটির মাথার পেছনে বসে ব্যান্ডেজ বাঁধছিল। বলল, তোমরা কোথায় যাচ্ছিলে বোন, প্রিস্টিনা?
–হ্যাঁ। বলল মেয়েটি।
— প্রিস্টিনায় তোমাদের বাড়ী কি?
–হ্যাঁ।
ব্যান্ডেজ বাঁধা হয়ে গেলে আহমেদ মুসা যুবকটিকে জিজ্ঞাস করল, এখন কেমন বোধ করছেন? যুবকটি চোখ খুলল। বলল, ভাল।
–মাথায় কোন যন্ত্রণা আছে?
–নাই
–খুব ভারী বোধ হচ্ছে কি মাথা?
–না। শুধু ব্যাথা বোধ হচ্ছে। আহমেদ মুসা খুশি হয়ে বলল, আর কোন বিপদ নেই।
একটু থেমে আহমেদ মুসাই বলল। এখন তা হলে আমরা যাত্রা করতে পারি।
বলে আহমেদ মুসা উঠে দাঁড়িয়ে যুবকটিকে পাঁজাকোলা করে তুলতে গেল গাড়িতে নেয়ার জন্য।
যুবকটি হেসে বলল, ধন্যবাদ ভাই, আমি হাটতে পারব।
বলে যুবকটি ধীরে ধীরে উঠে বসল।
আহমেদ মুসা তাকে ধরে দাঁড় করাল।
যুবকটি দাঁড়িয়ে একবার পেছন ফিরে গাড়ির দিকে চাইল। গাড়িটি তখনও জ্বলছিল আগুনে।
মেয়েটিও তাকিয়েছিল সেদিকে। ধীরে ধীরে বলল মেয়েটি, মাজুভ, ওরা আমাদের গাড়ির দরজা ভেঙে বের না করলে আমাদের দেহ এতক্ষণ ছাই হয়ে যেত।
যুবকটি আহমদ মুসার দিকে চেয়ে বলল, শুধু ধন্যবাদ দিয়ে এ ঋণ আমি শোধ করতে চাই না। নতুন জীবন দিয়েছেন আপনারা আমাদের।
–কোন মানুষ কোন মানুষকে জীবন দিতে পারে না ভাই। বলল আহমদ মুসা।
মেয়েটি বলল, আমাদের তো পরিচয় এখনও হয়নি।
পরিচয়ের কথা উঠতেই যুবকটির চোখ গিয়ে পড়ল আহমদ মুসা ও হাসান সেনজিক উভয়ের দিকেই। হাসান সেনজিকের দিকে তাকিয়ে যুবকটির চোখ দু’টি কেমন যেন চঞ্চল হলো।
মেয়েটি কথা বলছিল। সে যুবকটিকে দেখিয়ে বলল, এ হলো লাজার মাজুভ, আর আমি নাতাশা। আমি কলেজে পড়াই, আর ও সেনাবাহিনী থেকে আগাম অবসর নিয়ে ব্যবসা করছে।
আহমদ মুসা কি পরিচয় দেবে তা নিয়ে ভাবল। পাসপোর্টের ছদ্মনাম বলতে তার মন কিছুতেই সায় দিলনা। মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিয়ে সে বলল, আমি আহমদ মুসা, আর ও হাসান সেনজিক। আমরা আসছি আর্মেনিয়া থেকে।
মেয়েটা সংগে সংগেই বলল, আপনারা মুসলমান?
–হ্যাঁ বোন। বলল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা খেয়াল করলে দেখতে পেত তাদের নাম বলার সাথে সাথে যুবকটি অর্থাৎ লাজার মাজুভের মুখে একটা গভীর বিষন্নতা নেমে এসেছিল, আর ড্রাইভারের মুখে ফুটে উঠেছিল একটা বিস্ময় মেশানো আনন্দ।
আহমদ মুসা মাজুভকে হাত ধরে এনে গাড়ির পেছনের সিটে শুইয়ে দিল। নাতাশাকে সে বলল মাজুভের মাথার কাছে বসতে।
মাজুভ শোয়া থেকে উঠে বলল, আপনারা দু’জন কোথায় বসবেন?
–সামনের সিটে আমরা দু’জন বসব। বলল আহমদ মুসা।
–অসুবিধা হবে, বসতে পারবেন না। তার চেয়ে আমার পাশে আসুন। আমি বসেই যেতে পারব।
–আপনার কিছুতেই বসে যাওয়া হবে না, গাড়ির ঝাকুনিতে এখনই আবার ব্লিডিং শুর হবে।
–কিন্তু আপনাদের কষ্ট হবে ঐ ছোট্ট এক সিটে দু’জন বসে যেতে।
–কষ্টটা অনেকটা মনের ব্যাপার, কষ্ট মনে না করলে আর কষ্ট থাকেনা।
আবার এমনও কষ্ট আছে যা আনন্দদায়ক।
–আনন্দদায়ক কষ্টটা কি?
–মানুষ মানুষের জন্য যে কষ্ট করে সেটা আনন্দদায়ক।
–কিন্তু তার জন্যে তো শর্ত মানুষ মানুষকে ভালবাসবে।
–এই ভালোবাসাই তো স্বাভাবিক, এর উল্টোটা ব্যতিক্রম।
–এই ব্যতিক্রমটাকেই তো আমরা সাধারণ হিসেবে দেখছি।
–তা ঠিক। এটা মানুষের ক্রটি, মানবতা কিন্তু এর দ্বারা কলুষিত হয়নি।
–আপনি দর্শন চর্চা করেন বুঝি? বলল নাতাশা।
–এটা দর্শনের কথা নয় নাতাশা, খুব পরিচিত মানব-প্রকৃতির কথা। বলে আহমদ মুসা গাড়ির দরজা বন্ধ করে দিয়ে এসে সামনের সিটে হাসান সেনজিকের পাশে বসল।
আহমদ মুসা গাড়িতে উঠে বসতেই গাড়ি ছেড়ে দিল। গাড়ি ছুটতে শুরু করল।
আহমদ মুসা একটু মাথা ঘুরিয়ে বলল,নাতাশা মিঃ মাজুভের মাথাটা একটু উঁচুতে থাকা দরকার যাতে মাথায় রক্তের চাপ কম হয়।
নাতাশা কোন উত্তর দিল না। ঠোঁটে একটুকরো হাসি ফুটে উঠল। নিরবে সে মাজুভের মাথা তার উরুর উপর তুলে নিল।
মাজুভ আগের চেয়ে অনেক আরাম বোধ করল। সে নড়ে-চড়ে শুয়ে স্বগত কণ্ঠে বলল, আশ্চর্য সাবধানি উনি,ওর চোখ থেকে কোন ছোট জিনিসও দেখছি এড়ায়না।
নাতাশা মাজুভের মাথার চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বলল, ঠিক বলেছ, সব মিলিয়ে উনি সাধারণের মধ্যে পড়েন না।
মিঃ মাজুভ কোন কথা আর বলল না। আবার সেই গভীর বিষন্নতা তার মুখে দেখা দিল। গম্ভীর হলো মিঃ মাজুভ। গাম্ভীর্যের সাথে একটা যন্ত্রণার ভাবও তার মুখে ফুটে উঠল।
ছুটে চলছিল গাড়ি।
প্রায় পৌনে একশ’ কিলোমিটার চলার পর গাড়ি ‘স্টিমলে’ নামক স্থানে এসে পৌছল। স্টিমলে একটা ছোট্ট বাজার। রাস্তার দু’পাশের কিছু দোকান নিয়ে এই বাজার। পাশ দিয়ে একটা ছোট্ট নদী প্রবাহিত। বাজার সংলগ্ন নদীর ঘাটে বেশ কিছু নৌকাও রয়েছে।
রাস্তার ধার ঘেঁষেই দোকানগুলো।
আহমদ মুসা ড্রাইভারকে একটা কনফেকশনারী দেখে গাড়ি দাঁড় করাতে বলল। পেছন ফিরে মিঃ মাজুভকে লক্ষ্য করে বলল, মিঃ মাজুভ, আপনার পানি ধরণের তরল কিছু খাওয়া দরকার।
একটা কনফেকশনারীর পাশে গাড়ি গিয়ে দাঁড়াল। আহমদ মুসা হাসান সেনজিকের হাতে কিছু টাকা তুলে দিয়ে বলল, তুমি আপেল বা কোন ফলের কয়েকটা জুস নিয়ে এস।
হাসান সেনজিক নেমে গেল গাড়ি থেকে। আহমদ মুসা গা এলিয়ে আরাম করে সিটে বসল। তার উদ্দেশ্যহীন দৃষ্টি গাড়ির জানালা দিয়ে এদিক-সেদিক ঘুরে ফিরছে।
মিঃ মাজুভও উঠে বসেছে।
হাসান সেনজিক পাশের দোকানেই গিয়েছিল জুস কিনতে। আহমদ মুসার দৃষ্টি এদিক-সেদিক ঘুরে সেই দোকানের উপর নিবদ্ধ হলো।
একজন মাত্র দোকানি। একমাত্র খদ্দের হাসান সেনজিক তার সাথে কথা বলছিল আর একজন লোক দোকানের অন্য পাশে দাঁড়িয়েছিল। তার দৃষ্টিটা হাসান সেনজিকের উপর নিবদ্ধ। সে ধীরে ধীরে এসে হাসান সেনজিকের পাশে দাঁড়াল।
হাসান সেনজিক একটা প্লাস্টিক ব্যাগে জুসের টিনগুলো নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে এল। আহমদ মুসা দেখল লোকটিও হাসান সেনজিকের পেছনে পেছনে আসছে। লোকটির হাবভাব ও হাটা আহমদ মুসার কাছে স্বাভাবিক মনে হলো না হাসান সেনজিক গাড়ির কাছে এসে পড়েছে।
আহমদ মুসা দরজা খুলে গাড়ি থেকে বেরুল।
হাসান সেনজিক গাড়িতে ঢুকতে যাচ্ছিল। হঠাৎ সেই পেছন পেছন আসা লোকটি তার হাত চেপে ধরে বলল,আপনাকে আমার সাথে একটু যেতে হবে।
হাসান সেনজিক পেছনে ফিরে বলল, কেন? কোথায়?
‘এই এইখানে কাছেই’ বলল লোকটি।
‘কেন’ আবার জিজ্ঞেস করল হাসান সেনজিক।
লোকটি অসহিষ্ণুভাবে হাসান সেনজিকের হাত ধরে একটা হ্যাচকা টান দিয়ে বলল, সব কিছু বলব, চলুন।
আহমদ মুসা নিরবে দাঁড়িয়ে দেখছিল।
এবার সে দু’পা এগিয়ে লোকটির মুখোমুখি হয়ে শান্ত-কঠোর কণ্ঠে বলল, হাত ছেড়ে দাও।
লোকটি আহমদ মুসার দিকে একবার তাকিয়ে হাত ছেড়ে দিয়েই পকেট থেকে পিস্তল বের করল। আহমদ মুসার দিকে পিস্তল তাক করে বলল, সরে যাও, বাঁচতে চাইলে।
বলে লোকটি আবার হাসান সেনজিকের হাত ধরে ফেলল।
হাসান সেনজিকের হাত ধরার জন্যে যখন লোকটি মনোযোগ দিয়েছে সেই ক্ষণের সুযোগ গ্রহণ করল আহমদ মুসা। লোকটির কব্জিতে আঘাত করতেই তার হাত থেকে পিস্তল পড়ে গেল।
হাত থেকে পিস্তল পড়ে যেতেই লোকটি হাসান সেনজিকের হাত ছেড়ে দিয়ে ডান হাতের এক প্রচন্ড ঘুষি ছুটল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে।
পিস্তল হারাবার পর এ ধরণের ঘুষিই যে তার কাছ থেকে আসবে, সে ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল আহমদ মুসা। চকিতে মাথা একদিকে সরিয়ে নিয়ে ঘুষি এড়িয়ে গেল সে।
লোকটি ভারসাম্য হারিয়ে সামনের দিকে একটু ঝুঁকে পড়েছিল। সে সোজা হয়ে উঠার সংগে সংগেই আহমদ মুসা ডান হাতের একটা কারাত চালাল লোকটির ঘাড়ে, ডান পাশে একেবারে কানের নিচেই।
টলতে টলতে লোকটি গোড়া কাটা গাছের মত আছড়ে পড়ল মাটিতে।
আহমদ মুসা পিস্তলটি কুড়িয়ে নিয়ে লোকটির পকেটে গুজে দিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে এল।
হাসান সেনজিক গাড়িতে ঢুকে গিয়েছিল। আহমদ মুসা উঠে বসেই গাড়ি ছাড়তে বলল।
গাড়ি স্টার্ট নিল। চলতে শুরু করল গাড়ি।
সিনেমার একটা দৃশ্যের মতই ঘটে গেল ঘটনাটা।
ড্রাইভার ও নাতাশার চোখে আতংক। কিন্তু মিঃ মাজুভ বসেছিল পাথরের মত। তার মুখে ভয় উদ্বেগের কোন চিহ্ন নেই, আছে এক প্রকারের কাঠিন্য এবং সেই বিষন্নতা।
গাড়ি তখন ফুল স্পীডে চলতে শুরু করেছে।
আহমদ মুসা আপেল জুসের দু’টো টিন পেছনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, মিঃ মাজুভ আপনি এবং নাতাশা খেয়ে নিন।
মিঃ মাজুভ হাত বাড়ালো না, হাত বাড়াল নাতাশা।
নাতাশা জুস নিতে নিতে বলল আমার গা এখনও কাঁপছে। কি সাংঘাতিক। দিনে-দুপুরে এইভাবে হাইজ্যাক। ঠিক শাস্তি দিয়েছেন। কিন্তু যদি গুলি করত?
আহমদ মুসা ভাবছিল মিলেশ বাহিনীর কথা। আশ্চর্য, ওদের জাল দেখছি সর্বত্র। মনে হয় ওদের প্রতিটি ইউনিট, প্রতিটি লোকের কাছেই হাসান সেনজিকের ফটো পৌঁছেছে, নির্দেশও পৌঁছেছে তাকে ধরার। হাসান সেনজিককে লোক চক্ষুর আড়ালে রাখাই এখন দেখছি সবেচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
নাতাশার কথা হাসান সেনজিকের চিন্তাকে আর আগাতে দিল না। আহমদ মুসা বলল, জীবন-মৃত্যু একদম পাশাপাশি বিরাজ করছে নাতাশা, এ নিয়ে চিন্তা করে লাভ নেই।
‘আপনার খুব সাহস’, বলল নাতাশা।
–এ সাহস সবার আছে নাতাশা। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে এ সাহস আপনাতেই এসে হাজির হয়।
–কিন্তু আপনি পিস্তলটা ওর পকেটে দিয়ে এলেন কেন?
–বাইরে পড়ে থাকলে কেউ নিয়ে নিতে পারত, তাই।
–সেটা ভালই তো হতো।
–হতো হয়তো, কিন্তু ভাবলাম যার জিনিস তারই থাক।
–আশ্চর্য মানুষ আপনি, শক্রুর জন্যে এমন করে কেউ ভাবে?
–জানি না। তবে সে যতটুকু শত্রুতা করেছে,ততটুকু উত্তর আমি দিয়েছি। এর বেশি কোন ক্ষতি তার আমি চাইনি।
–কি জানি, আমি এসব বুঝি না। শত্রু শত্রুই। কথায় আছে শত্রুর শেষ রাখতে নাই।
–আমিতো এই শত্রুকে চিনি না। কি কারণে,কোন অবস্থায় সে একাজ করতে এসেছে তা আমি জানি না। সুতারাং তাকে ঐভাবে শত্রু ভাবা ঠিক নয়।
–আপনার এ কথাটা একজন প্রতিপক্ষের নয়,বরং একজন বিচারকের। একটি পক্ষ এবং একজন বিচারকের ভূমিকা এক হতে পারে না।
–পারে। পারা উচিত। পক্ষগুলো যদি বিচারকের বিচার বুদ্ধি দ্বারা সজ্জিত হয়,তাহলে পক্ষগুলোর পার্থক্য ও বিরোধ দূর হবে এবং তাতে হানাহানি দূর হয়ে সমাজ, পৃথিবীতে শান্তি আসবে।
–আপনি দার্শনিক ও সংস্কারকের সুরে কথা বলছেন,আমি পারবো না আপনার সাথে কথায়।
মাজুভ একটা কথাও বলেনি। সে এক বিষন্ন গভীরতা নিয়ে এইকথাগুলো শুনছিলো। শুনতে শুনতে সেই বিষন্নতার মধ্যে তার চোখে-মুখে একটা বিস্ময় ফুটে উঠেছিলো।
নাতাশা আর কথা বলেনি। জুসের একটা টিন খুলে সে মাজুভের দিকে তুলে ধরল। মাজুভ নাতাশার হাত থেকে জুস নিয়ে নিরবে খেতে শুরু করল।
মাজুভের নিরবতা ও গাম্ভীর্য নাতাশার চোখ এড়ায়নি। এতবড় ঘটনা ঘটে গেল,সে একটা কথাও বলল না। এতে তার খারাপই লাগছিল। ব্যাপারটা তার কাছে দৃষ্টি কটুও মনে হয়েছে। আবার সে উদ্বিগ্নও হয়ে উঠেছে। তার শরীর খারাপ করছে নাতো। নাতাশা বলল,তোমার কি খুব খারাপ লাগছে মাজুভ? কষ্ট হচ্ছে?
মাজুভ হাসতে চেষ্টা করে বলল, না নাতাশা আমি ভাল আছি।
আহমদ মুসা সিটের উপর দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলল,মিঃ মাজুভ,আপনার ব্রেনের নার্ভগুলোর রেষ্ট দরকার খুব বেশী। আপনার বসে থাকা চলবে না।
মাজুভ আগের মতই হাসতে চেষ্টা করে বলল, ধন্যবাদ। বলে মাজুভ শুয়ে পড়ল আগের মতই নাতাশার উরুতে মাথা রেখে।
নাতাশা মাজুভের চুলে হাত বুলাতে লাগল। এক সময় মাথা নিচু করে মুখটা মাজুভের কানের কাছে এনে নাতাশা ফিসফিসিয়ে বলল,গাড়ি কিংবা লাগেজের জন্য কি খারাপ লাগছে তোমার?
মাজুভ নাতাশার একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলল,আমরা বেঁচেছি,তোমাকে এতটা সুস্থ পেয়েছি,এটাই এখন আমার কাছে দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় পাওয়া নাতাশা।
নাতাশা আর কিছু বলল না।
আরেকটু জোরে নাতাশা আকড়ে ধরল মাজুভের হাত।
তীব্র বেগে ছুটে চলছে তখন গাড়ি প্রিষ্টিনার দিকে।

Page 130 of 165
Prev1...129130131...165Next
Previous Post

পরী – আলাউদ্দিন আল আজাদ

Next Post

বিচিত চিন্তা – সাহিত্য চিন্তা – আহমদ শরীফ

Next Post

বিচিত চিন্তা – সাহিত্য চিন্তা - আহমদ শরীফ

বিচিত চিন্তা - সংস্কৃতি চিন্তা - আহমদ শরীফ

মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সাম্প্রতিক প্রকাশনাসমূহ

  • তিন গোয়েন্দা ভলিউম ১১৫: ভূমিকম্প – শামসুদ্দীন নওয়াব
  • তিন গোয়েন্দা ভলিউম ১১৮: বিভীষিকার প্রহর – রকিব হাসান
  • তিন গোয়েন্দা ভলিউম ১১৭: বড়দিনের ছুটি – রকিব হাসান
  • তিন গোয়েন্দা ভলিউম ১১৭: আলাস্কা অভিযান – রকিব হাসান
  • তিন গোয়েন্দা ভলিউম ১১৭: আমিই কিশোর – রকিব হাসান

বিভাগসমূহ

  • আত্মজীবনী
  • ইতিহাস
  • উপন্যাস
  • কবিতা
  • কাব্যগ্রন্থ
  • গল্পের বই
  • গোয়েন্দা কাহিনী
  • ছোট গল্প
  • জীবনী
  • দর্শন
  • ধর্মীয় বই
  • নাটকের বই
  • প্রবন্ধ
  • বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী
  • বৈজ্ঞানিক বই
  • ভূতের গল্প
  • রহস্যময় গল্পের বই
  • রোমাঞ্চকর গল্প
  • রোম্যান্টিক গল্পের বই
  • শিক্ষামূলক বই
  • আমাদের সম্পর্কে
  • যোগাযোগ
  • গোপনীয়তা নীতি

© 2023 BnBoi - All Right Reserved

No Result
View All Result
  • বাংলাদেশী লেখক
    • অতুলচন্দ্র গুপ্ত
    • অভিজিৎ রায়
    • আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    • আনিসুল হক
    • আবু ইসহাক
    • আবু রুশদ
    • আবুল আসাদ
    • আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন
    • আবুল বাশার
    • আরজ আলী মাতুব্বর
    • আল মাহমুদ
    • আসাদ চৌধুরী
    • আহমদ ছফা
    • আহমদ শরীফ
    • ইমদাদুল হক মিলন
    • উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    • কাসেম বিন আবুবাকার
    • জসীম উদ্দীন
    • তসলিমা নাসরিন
    • দাউদ হায়দার
    • দীনেশচন্দ্র সেন
    • নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    • নিমাই ভট্টাচার্য
    • প্রফুল্ল রায়
    • প্রমথ চৌধুরী
    • ময়ূখ চৌধুরী
    • মহাদেব সাহা
    • মাহমুদুল হক
    • মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    • হুমায়ূন আহমেদ
  • ইন্ডিয়ান লেখক
    • অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়
    • অতুল সুর
    • অদ্রীশ বর্ধন
    • অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    • অনীশ দেব
    • অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    • অমিয়ভূষণ মজুমদার
    • আশাপূর্ণা দেবী
    • আশুতোষ মুখোপাধ্যায়
    • ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    • কাজী নজরুল ইসলাম
    • ক্ষিতিমোহন সেন
    • তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    • তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়
    • দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    • নারায়ণ সান্যাল
    • নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    • নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    • পাঁচকড়ি দে
    • পূর্ণেন্দু পত্রী
    • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    • বিমল মিত্র
    • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    • হেমেন্দ্রকুমার রায়
  • বিভাগসমূহ
    • আত্মজীবনী
    • ইতিহাস
    • উপন্যাস
    • কবিতা
    • কল্পকাহিনী
    • কাব্যগ্রন্থ
    • খেলাধুলার বই
    • গল্পের বই
    • গোয়েন্দা কাহিনী
    • ছোট গল্প
    • জীবনী
    • দর্শন
    • ধর্মীয় বই
    • নাটকের বই
    • প্রবন্ধ
    • বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী
    • বৈজ্ঞানিক বই
    • ভূতের গল্প
    • মুক্তিযুদ্ধের-বই
    • রহস্যময় গল্পের বই
    • রোমাঞ্চকর গল্প
    • রোম্যান্টিক গল্পের বই
    • শিক্ষামূলক বই
    • সমগ্র
  • সিরিজ বই
    • মিসির আলী সমগ্র
    • হিমু সিরিজ

© 2023 BnBoi - All Right Reserved

Welcome Back!

Login to your account below

Forgotten Password?

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In