প্রিষ্টিনা প্রাদেশিক রাজধানী শহর। বেশ বড়। প্রিষ্টিনার মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত সিটনিক নদী। সিটনিকের স্বচ্ছ পানি,দু’তীর বরাবর সুদৃশ্য এভেনিউ, সিটনিকের বুকে ভাসমান নানা বর্ণের বোটের সারি প্রিষ্টিনাকে দিয়েছে অপরুপ এক সাজ।
সিটনিকের দু’পাশের এভেনিউ বরাবর গড়ে উঠেছে প্রিষ্টিনার অভিজাত এলাকা।
সিটনিকের পশ্চিম তীর বরাবর যে এভেনিউ তার নাম,’লাজারাস এভেনিউ’। ‘লাজারাস’ ষ্টিফেন পরিবারের সেই রাজা ষ্টিফেনের পিতা রাজা লাজারাস। কসভো প্রান্তরে ১৩৮৯ সালে এই লাজারাসের সাথেই যুদ্ধ হয়েছিল তুরস্কের সুলতান মুরাদের।
এই লাজারাস এভেনিউকে সামনে রেখেই লাজার মাজুভের সুন্দর বাড়ীটি। লাজার মাজুভের পিতা ছিলেন প্রেসিডেন্ট টিটোর প্রিয়পাত্র যুগোশ্লাভ সেনাবাহিনীর একজন জেনারেল। উত্তরাধিকার সূত্রেই সে এই বাড়ীর মালিক হয়েছে। অবশ্য লাজার মাজুভও সেনাবাহিনীর একজন কৃতি সেনাধ্যক্ষ ছিলেন। কর্নেল র্যাঙ্কে থাকাকালে তিনি অবসর নিয়েছেন।
আহমদ মুসা ও হাসান সেনজিক মাজুভের বাড়ীতে এসে উঠেছে। নাতাশার অনুরোধ তারা এড়াতে পারেনি।
প্রিষ্টিনায় ঢুকে গাড়ি নিয়ে তারা সোজা মাজুভের বাড়ীতেই এসেছিল। মাজুভদের নামিয়ে দেয়ার পর সংগে সংগেই তারা চলে যেতে চেয়েছিল।
মাজুভকে নিয়ে নাতাশা যখন ভেতরে চলে গিয়েছিল,আহমদ মুসা তখন ড্রাইভারকে তার ভাড়া চুকিয়ে দেবার জন্যে দু’শো যুগোশ্লাভ দিনার তার হাতে গুঁজে দিয়েছিলো। প্রিজরীন থেকে প্রিষ্টিনা পর্যন্ত ভাড়া ঠিক হয়েছিলো দেড়শ’ দিনার।
ড্রাইভার টাকার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে বলেছিল,ভাড়া তো দেড়শ’দিনার, পঞ্চাশ দিনার বেশী এসেছে।
‘প্রয়োজনের চেয়ে বেশী সময় তুমি দিয়েছ,তাছাড়া আমাদের আরেকটু এগিয়ে দেবে বাস ষ্ট্যান্ড পর্যন্ত’, বলেছিল আহমদ মুসা।
ড্রাইভার ছেলেটি কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে ছিল। সে যখন মাথা তুলেছিল,তখন তার চোখের কোণটি ভিজা। সে তার হাতের দু’শ দিনার সবটাই আহমদ মুসার হাতে গুঁজে দিয়ে বলেছিল,আমি আপনার কাছ থেকে টাকা নিতে পারবো না।
কথা বলার সাথে সাথে তার চোখ থেকে দু’ফোটা পানি গড়িয়ে পড়েছিল।
আহমদ মুসা তার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলেছিল,কাঁদছ তুমি?
ড্রাইভার ছেলেটি দু’হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠে বলেছিল আমি মিথ্যা বলেছি, আমি মুসলমান।
–তুমি মুসলমান?
–হ্যাঁ। আমার নাম দরবেশ জুরজেভিক।
–মিথ্যা কথা বলেছিলে কেন?
–সব সময় ঐ মিথ্যা পরিচয়ই দেই। মুসলিম পরিচয়ে কাজ পাওয়া যায় না,তাছাড়া জীবনেরও ভয় আছে। আপনারা মুসলিম জানলে আমি মিথ্যা পরিচয় দিতাম না।
চোখ মুছে কথাগুলো বলেছিল দিমিত্রি।
আহমদ মুসা দু’পা এগিয়ে এসে দিমিত্রিকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল,তুমি আমার ভাই খুব খুশি হয়েছি তোমার এই পরিচয় পেয়ে।
দিমিত্রির চোখে পানি। কিন্তু মুখ তার আনন্দে উজ্জ্বল।
আহমদ মুসা তাকে আলিংগন থেকে ছেড়ে দিয়ে বলেছিল,ভাইয়ের একটা কথা কিন্তু মানতে হবে।
‘কি কথা’ বলেছিল দিমিত্রি।
আহমদ মুসা পকেট থেকে এক হাজার দিনারের একটা নোট বের করে দিমিত্রির হাতে গুঁজে দিয়ে বলেছিল,ভাইয়ের কাছ থেকে ভাইকে উপহার।
দিমিত্রি নোটের দিকে একবার তাকিয়ে বলেছিল,কিন্তু এ টাকা আপনার কাছ থেকে নিলে আমি চিরদিন কষ্ট পাব।
আহমদ মুসা দিমিত্রির পিঠ চাপড়ে বলেছিল,আমি তোমাকে কাজের বিনিময় দিচ্ছি না ভাইকে ভাইয়ের উপহার ওটা।
কয়েক মুহুর্ত মাথা নিচু করে থেকে দিমিত্রি টাকা পকেটে রেখে বলেছিল,আপনারা ওদের কাছে সত্য পরিচয় দিয়ে ঠিক করেননি। ওদের কাউকে বিশ্বাস নেই।
–তাই কি? বলেছিল আহমদ মুসা।
–আমার পরিচয় পেলে আমাকে এভাবে ওরা গাড়ি চালাতে দেবে না। গাড়িটাও কেড়ে নেবে। একটু থেমেই আবার বলেছিল,চলুন স্যার।
আহমদ মুসা গাড়ির দিকে এগুতে এগুতে বলেছিল,স্যার নয় ভাই।
এই সময় ছুটে বেরিয়ে এসেছিল নাতাশা বাড়ী থেকে। ছুটে এসে আহমদ মুসার সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল,আমার ভুল হয়েছিল,আমি ওকে নিয়ে চলে গেছি। আপনাদের কিছু বলে যেতে পারিনি। আপনাদের যাওয়া হবে না,আমি যেতে দেব না। শিশুর মত জেদ নাতাশার কন্ঠে ঝরে পড়ল।
আহমদ মুসা হেসে বলেছিল,কোন ভুল হয়নি বোন। তোমার এই আমন্ত্রনের জন্য তোমাকে ধন্যবাদ,কিন্তু আমরা প্রিষ্টিনায় দেরি করতে পারবো না,বেলগ্রেড যাব আমরা। এখন বাস ষ্ট্যান্ডে যাচ্ছি।
নাতাশা দু’হাত মেলে আরও শক্ত করে দাঁড়িয়ে বলেছিল,আমি কোন কথা শুনব না। আপনাদের যাওয়া হবে না। মাজুভ আপনাদের কিছু বলতে পারেনি আমি ওর হয়ে মাফ চাচ্ছি।
–এভাবে কথা বললে দুঃখ পাব বোন। বলেছি তো তোমাদের কোন ভুল হয়নি। তোমারা দু’জনেই অসুস্থ। মাজুভের জন্য এখনই তোমাকে ডাক্তার ডাকতে হবে। অযথা ঝামেলা বাড়িয়ো না। আর আমাদের জরুরি কাজ, তাড়াতাড়ি যেতে হবে। বলেছিল আহমদ মুসা।
–দেখুন কথা বাড়িয়ে লাভ হবে না, আমি যেতে দেব না, আমি বলেছি। একটা নিখাঁদ আন্তরিকতার সুর নাতাশার কথায়।
নাতাশার এই অনুরোধ উপেক্ষা করে চলে যাওয়া আহমদ মুসা ও হাসান সেনজিকের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
পুরো দুই দিন হলো তারা নাতাশার বাড়িতে। এর মধ্যে যাবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু নাতাশা যেতে দেয়নি। গত দুই দিনে আত্মীয়-স্বজনের স্রোত এসেছে নাতাশার। আহমদ মুসারাই যে তাদের জীবন রক্ষা করেছে, না হলে গাড়ির সাথে পড়ে যে ছাই হয়ে যেতে হতো, এ কথাটা সবার কাছে বার বার বলেছে। পরিচয় করিয়ে দিয়েছে নতুন জীবনদাতা হিসেবে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় কারো কাছেই নাতাশা, আহমদ মুসাদের মুসলিম পরিচয় প্রকাশ করেনি। এর কারণ হিসেবে আহমদ মুসাকে নাতাশা বলেছে, অহেতুক প্রশ্ন সৃষ্টি করে, আর পরিবেশ খারাপ করে লাভ কি। মুসলিম পরিচয় যে এখানে কত অগ্রহণযোগ্য, কত বিপদের কারণ আহমদ মুসা তা এ থেকে আরও বেশি বুঝেছে। এ জন্যেই দিমিত্রি মুসলিম পরিচয় প্রকাশ করার ব্যাপারে আপত্তি তুলেছিল।
নাতাশা এবং বাড়ির অন্যান্যদের আন্তরিক ব্যবহার আহমদ মুসাদের মুগ্ধ করেছে, বরং যত্নের আতিশয্যে তারা বিব্রতই বোধ করেছে। কিন্তু একটা বিষয় আহমদ মুসা বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেছে, মিঃ মাজুভ যেন তাদের কাছে সহজ হতে পারছে না। সে কথা বলে, কিন্তু তার সাথে যেন অন্তরের কোন যোগ নেই। একটা জমাট গাম্ভীর্য, একটা বিষন্নতা যেন সব সময় তাকে ঘিরে থাকে। আহমদ মুসা লক্ষ্য করেছে, নাতাশাও অনেক সময় এতে বিব্রত বোধ করেছে। মাজুভের এই আচরণের কোন ব্যাখ্যা আহমদ মুসা খুজেঁ পায়নি।
এই ব্যাখ্যা নাতাশাও খুজেঁ পায়নি। সেই গাড়ি থেকেই মাজুভের এই গাম্ভীর্য, এ বিষন্নতা নাতাশা লক্ষ্য করছে। অথচ মাজুভ এমন নয়। সে অত্যন্ত হাসি-খুশি এবং অতিথিপরায়ণ। কেন সে হঠাৎ এমন হয়ে গেল। এটা তার মাথায় আঘাত লাগার কোন প্রতিক্রিয়া কি! এই চিন্তা মনে আসলেই নাতাশা ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে।
সেদিন রাত ১১টা। নাতাশা এসে শুয়ে পড়েছে। কিন্তু মাজুভ শুতে আসেনি। নাতাশা বিছানা থেকে উঠল।
এগুলো স্টাডি রুমের দিকে। দেখল, মাজুভ চেয়ারে গা এলিয়ে ছাদের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার চোখ-মুখ গভীর চিন্তায় আচ্ছন্ন। সেই বিষন্নতার একটা প্রলেপ সারা মুখে।
নাতাশা ধীরে ধীরে গিয়ে মাজুভের ঘাড়ে হাত রাখল। মাজুভের তাতে কোন ভাবান্তর হলো না। সে ঐভাবেই উপর দিকে চেয়ে রইল।
উদ্বেগে আকূল হয়ে উঠল নাতাশার বুক।
নাতাশা তার মাথাটি ধীরে ধীরে মাজুভের কাঁধে রেখে বলল, ওগো তোমার কি হয়েছে, তোমাকে এত গম্ভীর, এত বিষন্ন, এত চিন্তান্বিত তো আর কোন সময় দেখিনি।
বলতে বলতে নাতাশা কেঁদে ফেলল।
মাজুভ ঐভাবে থেকেই নাতাশার একটা হাত টেনে নিল নিজের হাতের মধ্যে। বলল, বুঝতে পারছি নাতাশা তুমি কষ্ট পাচ্ছ, কিন্তু আমিও যে খুব কষ্টে আছি। দ্বন্দ্ব-সংঘাতে আমার হৃদয় যে ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে।
–আমাকে বলতে পার না সেটা কি? কোন দিন তো তুমি কিছু গোপন করনি।
–শুনলে তুমিও কষ্ট পাবে, নাতাশা।
–এ কথা কেন ভাবছ তুমি, তোমার কষ্টের শেয়ার আমার তো প্রাপ্য।
–বিষয়টা আহমদ মুসা ও হাসান সেনজিককে নিয়ে। আমি ভয়ানক উভয় সংকটে পড়েছি।
চমকে উঠল নাতাশা স্বামীর কথায়। ওদের নিয়ে আবার সংকট কি! বলল, বল ওদের নিয়ে কি সে সংকট। ওরা তো অত্যন্ত ভাল লোক।
–ভাল বলেই তো সংকট বেড়েছে, নাতাশা।
–তোমার কথা আমি কিছুই বুঝছি না।
–যে লোকটাকে আমরা হন্যে হয়ে খুঁজছি, যে লোকটিকে ধরার জন্যে হাজার হাজার ডলার খরচ হচ্ছে, যে লোকটি আজ বলকানের খৃস্টান সমাজের লক্ষ্যবস্তু, হাসান সেনজিক সেই লোক।
–এই হাসান সেনজিক সেই হাসান সেনজিক?
–হ্যাঁ
–আর যে ভয়ংকর লোকটি হাসান সেনজিককে হোয়াইট ওলফের হাত থেকে উদ্ধার করেছে, যে ভয়ংকর লোকটি তিরানার জেমস জেংগার মত দুর্ধর্ষ লোককে পরাভূত ও নিহত করে হাসান সেনজিককে মুক্ত করেছে, যে ভয়ংকর লোকটি কাকেজীর ব্ল্যাক ক্যাটের দখল থেকে পুনরায় হাসান সেনজিককে তুলে এনেছে, যে ভয়ংকর লোকটি ফিলিস্তিন, মিন্দানাও, মধ্য এশিয়া এবং ককেশাস বিপ্লবের নায়ক, সেই ভয়ংকর লোকটিই হলো আহমদ মুসা।
নাতাশা কোন কথা বলতে পারলো না। প্রায় কাঁপতে কাঁপতে সে গিয়ে মাজুভের পাশের চেয়ারে বসল। বহুক্ষণ সে দু’হাতে মাথা ধরে টেবিলে কনুই ভর দিয়ে মাথা নিচু করে বসে থাকল। বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে যেন সে।
মাজুভ ধীরে ধীরে নাতাশার পিঠে হাত বুলিয়ে বলল, বলেছি না নাতাশা, যে তুমি কষ্ট পাবে শুনলে, আমার চেয়ে বেশি কষ্ট।
অনেকক্ষণ পরে মুখ তুলল নাতাশা। উদ্বেগ ও আতংকে বিধ্বস্ত তার মুখ। বলল, মাজুভ সত্যই চিনেছ তাঁদের তুমি?
‘আমার জ্ঞান ফিরে আসার পর হাসান সেনজিককে একনজর দেখেই আমি চিনতে পেরেছি, তার ফটো আমার বহুল পরিচিত। তারপর তাঁদের নাম শুনে কোন সন্দেহই আমার আর রইলনা। আর স্টিমলে’তে যে ঘটনা ঘটল তাতে তো প্রমাণই হয়ে গেল এরাই তাঁরা। স্টিমলে’তে যে লোকটি হাসান সেনজিককে ধরে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, সে লোকটিকে আমি চিনি আমাদের মিলেশ বাহিনীর লোক।’ বলল মাজুভ।
আবার অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল নাতাশা। তারপর বলল, কিন্তু পরিচয় ওদের যাই হোক, তুমি ওদের কেমন দেখলে বলত?
‘সেখানেই তো হয়েছে মুস্কিল, নাতাশা’ বলতে শুরু করল মাজুভ, ‘আমি যে পরিচয় ওদের জানি, তার সাথে যেমন ওদের দেখছি তা মিলছে না। বিপদে-আপদে সাহায্য চোর-ডাকাতরাও করতে পারে, কিন্তু যে আন্তরিকতা তাঁদের কাছ থেকে পেয়েছি, তা দুষ্ট প্রকৃতির কারও কাছ থেকে পাওয়া যেতে পারে না। আর স্টিমলে’তে একজন শত্রুর সাথে যে আচরণ আহমদ মুসা করল, তা অতি উদার ও মহৎ হৃদয়ের কাজ। এছাড়া যে ধরণের কথা তাদের কাছ থেকে শুনে আসছি, যে আচরণ আমরা পেয়ে আসছি, তা উন্নত মানব প্রকৃতির দ্বারাই শুধু সম্ভব।’
মাজুভ থামলে নাতাশা বলল, ‘আর দেখ না, ওদের নামটা ওরা যেভাবে প্রকাশ করে দিল, আমরা হলেও তা করতাম না।’
–ঠিক বলেছ, নাতাশা, আমি ওদের মুখ থেকে ওদের নাম শুনে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছি। অথচ ওরা ভাল করেই জানে ওদের চারপাশের বিপদের কথা। ওদের এই আচরণের ব্যাখ্যা দু’টো হতে পারেঃ এক, ওরা নিজেদের শক্তির উপর এতটাই আস্থাশীল যে, এসবকে তারা পরোয়া করে না, দুই. ওরা ওদের আল্লাহর উপর এতটাই নির্ভর যে, দুনিয়ার আর কাউকেই তাঁরা ভয় করে না। ব্যাখ্যা যেটাই হোক, উভয় ক্ষেত্রেই তাঁদের উন্নত চরিত্রবলের প্রমাণ হয়। বলল মাজুভ।
–আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করেছ, ওদের ব্যবহার কত শালীন ও সংযত। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ওরা কোন সময় কথা বলেনি। মাটির পৃথিবীতে এমন মানুষও আছে, তা আমি কোনদিন ভাবিনি। আর দেখ, দু’দিন ওদেরকে আমরা প্রায় জোর করেই রেখেছি। কি যে দ্বিধা-সংকোচের মধ্যে দিয়ে ওরা এই দু’টো দিন আছে। অতি উন্নত ও রুচির মানুষ না হলে এমন হতে পারে না।
–নাতাশা, মুশকিল তো এখানেই। তারা আমাদের মত সাধারণ মানুষ হলেও কখন ওদের মিলেশ বাহিনীর হাতে তুলে দিতাম। বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ওদের মহত্ব, অপরূপ চরিত্র। অন্যদিকে জাতির একজন হিসেবে, মিলেশ বাহিনীর একজন হিসেবে আমার কর্তব্য ওদেরকে ধরিয়ে দেওয়া। কর্তব্য ও মানবিক নীতিবোধের দ্বিমুখী এই সংঘাতে আমি ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছি নাতাশা।
নাতাশা কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে চুপ করে থাকল। তারপর মাথা তুলে বলল. ওদেরকে ধরিয়ে দেবার কোন প্রশ্নই ওঠে না, ওরা আমাদের কাছে কোন অন্যায় করেনি। আর ওরা অন্যায় করার মত লোক বলে আমরা বিশ্বাসও করি না।
মাজুভ হাসল। বলল. ওরা অপরাধ করেছে, একথা কেউ বলছে না, নাতাশা, অপরাধ উত্তরাধিকার সূত্রে এসে ওদের ঘাড়ে বর্তেছে।
–ব্যাপারটা কি হাস্যকর নয়? দুনিয়ার কোন আইনে এটা বৈধ?
–এসব কথা আর কারো বিবেচ্য নয়, স্টিফেন বিশ্বাসঘাতক, জাতিদ্রোহী, তার উত্তরাধিকারীদেরকে তার পাপের প্রায়শ্চিত্ব করতে হবে।
একটু থামল মাজুভ তারপর বলল, জাতির একজন সদস্য আমি নাতাশা। জাতির সাথে আমি বিশ্বাস- ঘাতকতা করব কি করে? আমি উভয় সংকটে।
নাতাশা কিছুক্ষণ ভেবে বলল, সংকট কিছু নয় মাজুভ, ওরা চলে যাবে। তুমিও ব্যাপারটা কাউকে জানাবে না, তা’হলেই হলো।
‘কিন্তু নাতাশা’ বলল মাজুভ, ‘আমার শপথ আছে, আমি শপথ ভাঙব কি করে?’
নাতাশা একটু চিন্তা করে হাসি মুখে বলল, ঠিক আছে সব আমার উপড় ছেড়ে দাও। তোমাকে শপথ ভাঙতে হবেনা। চল এখন শুব, চল।
ওরা শোবার ঘরে চলে এল। শুয়ে পড়ল দু’জনে।
সকালে যখন মাজুভের ঘুম ভাঙল, দেখল নাতাশা মুখ ভার করে পাশে বসে আছে। চিন্তায় কপালটা কুঞ্চিত তার। বিস্মিত হলো মাজুভ। নাতাশা তো এত তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠেনা মাজুভ উঠে অনেক ডাকা ডাকি করে নাতাশাকে জাগায়।
মাজুভ তাড়াতাড়ি উঠে বসে বলল, কি ব্যাপার এত তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠেছ, আবার বসে আছ মুখ ভার করে!
নাতাশা মুখ নিচু করে বলল, আমি ব্যর্থ হয়েছি মাজুভ।
–কি ব্যর্থ হয়েছ, বুঝলামনা।
–কাল রাতে তোমাকে বলালম না, তোমার শপথ ভাঙতে হবেনা, আমার উপর ছেড়ে দাও সব।
–হাঁ বলেছিলে, তার কি হয়েছে?
–আমি সেটা পারিনি মাজুভ।
–কি পারনি?
–আমি পরিকল্পনা করেছিলাম, তোমার অজান্তে সব বলে ওদের পালিয়ে যেতে দিব। আমি তা পারিনি।
চমকে উঠল মাজুভ। এতক্ষণে ব্যাপারটা তার কাছে পরিষ্কার হলো। নাতাশার এ ধরনের একক উদ্যোগে সে বিস্মত হলো, আবার মজাও পেল। বলল, পারনি কেন? কে বাধা দিল তোমার ষড়যন্ত্রে?
–হ্যাঁ, ষড়যন্ত্রই বলতে পার। ষড়যন্ত্র করে দুই কুল রক্ষা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারলাম না।
নাতাশার মুখ গম্ভীর, কন্ঠটা তার ভারি হয়ে উঠল।
–পারনি? কেন বলনি তাদের?
–বলেছি।
–তাহলে?
–ওরা এভাবে যেতে রাজী হননি। এভাবে পালাতে চান না তারা।
–কি বলছ তুমি! তুমি জানিয়েছ যে, আমি মিলেশ বাহিনীর লোক। ওদের সব পরিচয় আমি জানি।
–বলেছি। এও বলেছি যে, তোমার অজান্তে তাদের পালাবার সুযোগ করে দিচ্ছি।
–কেন পালাল না তারা। কি বলেছে?
–তারা বলেছে, এভাবে পালিয়ে তারা আমাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি কিংবা বিরোধ সৃষ্টি করতে চায়না।
–এ কথা বলেছে তারা!
মাজুভের চোখে-মুখে অপার এক বিস্ময় ফুটে উঠল। মাজুভের মন নাতাশার এই কথা কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাইছে না। স্বামী-স্ত্রীর একটা বিরোধের দিক বিবেচনা করে মানুষ কেমন করে এত বড় বিপদ মাথায় তুলে নিতে পারে।
মাজুভ উঠে দাঁড়াল। বলল, চল নাতাশা আমি ওদের সাথে কথা বলব।
–কি বলবে তুমি?
–ভয় করো না নাতাশা, তোমার স্বামী মানুষ!
মাজুভ এবং নাতাশা এল আহমদ মূসা এবং হাসান সেনজিক যে ঘরে রয়েছে সেই ঘরে।
হাসান সেনজিক তার খাটে শুয়েছিল। আর আহমদ মুসা দাঁড়িয়ে ছিল জানালায় বাইরের দিকে মুখ করে।
দরজায় নক করে মাজুভ ঘরে ঢুকল।
আহমদ মুসা দূরে দাঁড়িয়েছিল।
মাজুভকে দেখে আহমদ মুসা হেসে দু’পা এগিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল মাজুভের দিকে। বলল, মিঃ মাজুভ আমি আপনার কথাই ভাবছিলাম।
–কি ভাবছিলেন আমার কথা? ম্লান হেসে বলল মাজুভ।
হাসান সেনজিক শোয়া থেকে উঠে বসেছিল।
আহমদ মুসা মাজুভ এবং নাতাশেকে বসার অনুরোধ করে আরেকটা সোফায় নিজে বসতে বসতে বলল, বিদায় নিতে চাই আপনার কাছ থেকে। থাকলাম তো দু’দিন রাজার হালে।
–বিদায় যদি না দিতে চাই?
–তবু বিদায় দিতে হয়ই। হেসে বলল আহমদ মুসা!
–আমি কে জানেন তো?
–জানতাম না, নাতাশা বলেছে।
–এখন যদি মিলেশ বাহিনীর হাতে তুলে দেই?
–আমরা নিষেধ করবনা।
–কেন?
–এটা না করাই আপনার জন্য অস্বাভাবিক!
–নাতাশা বলার পর কেন আপনারা নিরাপদে যাবার সুযোগ ছেড়ে দিলেন?
–আমাদের জন্য কেউ অসুবিধায় বা বিপদে পড়ুক তা আমরা চাইনা।
–এভাবে আপনারা ধরা দিতে চাচ্ছেন কেন?
–না, আমরা ধরা দিতে চাইনা।
–তাহলে আপনি কি মনে করেন, আমি চাইলেও মিলেশ বাহিনীর হাতে আপনাদের ধরিয়ে দিতে পারব না?
–আমি তা বলিনি, আমি বলেছি আমরা ধরা দিতে চাইনা। হেসে বলল আহমদ মুসা।
–ধরা দিতে চান না,কিন্তু ধরা তো দিয়েছেন। আপনারা এখন আমার হাতে। মিলেশ বাহিনীর হাতে তুলে দিতে পারি আপনাদের।
–আপনি চেষ্টা করবেন ওদের হাতে তুলে দিতে, আমরা চেষ্টা করব ধরা না পড়তে। ফল কি হবে আমরা জানিনা।
মাজুভ কোন জবাব দিলনা। মূহুর্ত কয়েক চুপ করে থেকে বলল, বুঝতে পারছি নিজের শক্তির উপর অসীম আস্থা আপনাদের।
–না, আমরা নির্ভর করি আল্লাহর সাহায্যের উপর, কারণ আমরা ন্যায়ের উপর রয়েছি।
–এ দাবী তো আমাদেরও, ন্যায়ের উপর আছি।
–ন্যায় তো দু’টি হতে পারেনা?
–ঠিক।
–এখন বলুন হাসান সেনজিক কি অন্যায় করেছে, কোন ক্ষতি করেছে আপনাদের কারো?
–না।
–তাহলে বিনা অপরাধে সে যখন জুলুম –নির্যাতনের শিকার, তখন আমরাই ন্যায়ের পক্ষে।
–হাসান সেনজিক প্রত্যক্ষ কোন অপরাধ করেনি, কিন্তু তার পূর্ব-পুরুষ রাজা স্টিফেনের পাপের ভার তার উপরও এসে বর্তেছে, তাকে পাপের প্রায়শ্চিত্য করতে হবে।
–আপনার বিচার-বুদ্ধি কি এতে সায় দেয়?
–সেটা ব্যক্তিগত ব্যাপার। এটা তো ঠিক, রাজা স্টিফেন বিশ্বাসঘাতক, জাতির দুশমন।
–রাজা স্টিফেন আর যাই হোন বিশ্বাসঘাতক ছিলেন না। বলল হাসান সেনজিক।
এতক্ষন সে চুপ করে বসে আলোচনা শুনছিল। এবার সে আলোচনায় যোগ দিল।
–বিশ্বাসঘাতক ছিলেন না বলছেন? বলল মাজুভ।
–হ্যাঁ, বরং তিনি বিশ্বাস ও প্রতিশ্রুতির মর্যদা রক্ষা করতে গিয়েই সুলতান বায়েজিদের পক্ষে খৃস্টান-মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছিলেন।
–ইতিহাসকে ইচ্ছে মত সাজালে হবেনা বন্ধু।
–না মিঃ মাজুভ আমি ইতিহাসের কথাই বলছি।
দৃঢ়তার সাথে বলল হাসান সেনজিক।
একটু দম নিয়েই সে আবার শুরু করল, ১৩৮৯ সালের ২৭শে আগষ্ট কসভোর ভয়াবহ যুদ্ধে স্টিফেনের পিতা লাজারাস তুরস্কের সুলতান মুরাদের বিরুদ্ধে একাই লড়াই করেছিলেন। লাজারাস পরাজিত ও নিহত হলেন। এই সময় বুলগেরিয়ার রাজা সিসভেনও পরাজিত হন এবং তার রাজ্য তুর্কি-সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায়। এই বলকান অঞ্চলের রাজা ও জনগণ গ্রীক চার্চের অন্তর্ভক্ত খৃস্টান বলে তাদের এই দুর্দিনে হাংগেরী, জার্মানী, ইতালি অর্থাৎ ক্যাথলিক খৃস্টান ধর্মমতের অনুসারী পশ্চিম ইউরোপ তাদের সাহায্যে আসেনি। বুলগেরিয়া তুর্কি-সাম্রাজ্যের অধীনে চলে যাবার পর লাজারাসের পুত্র স্টিফেন তার রাজ্য সার্ভিয়াকে রক্ষার জন্য সুলতান বায়েজিদের সাথে সন্ধি করেন। এ সন্ধির মাধ্যমে তিনি তার রাজ্য রক্ষা করেন। স্টিফেনের অপরাধ এই সন্ধির প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন। তিনি সন্ধি ভংগ করতে রাজী হননি। যে ক্যাথলিক পশ্চিম ইউরোপ এবং ক্যাথলিক পশ্চিম ইউরোপের যে ধর্মগুরু পোপ নবম বেনিফেস সার্ভিয়ার দুর্দিনে টু শব্দটিও করেননি, সেই তারা তাদের স্বার্থে ১৩৯৪ সালে এসে স্টিফেনকে বলল সন্ধি ভংগ করার জন্যে। কিন্তু রাজা স্টিফেন এই সুবিধাবাদী লোকদের পরামর্শে সন্ধি ভংগ করে দেশকে, জাতিকে বিপদগ্রস্ত করতে রাজী হননি। আপনি রাজা স্টিফেনকে বিশ্বাসঘাতক, দেশদ্রোহী বলছেন, কিন্তু সার্ভিয়া, বোসনিয়া অর্থাৎ আজকের যুগোশ্লাভিয়ার কোন লোক তাঁকে বিশ্বাসঘাতক, দেশদ্রোহী বলতেই পারেন না। বরং তাদের উচিত ক্যাথলিক পশ্চিম ইউরোপের কু-পরামর্শের শিকার হয়ে তিনি দেশ ও জাতিকে ধ্বংস ও পরাধীনতার দিকে ঠেলে দেন নি এ জন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া।
থামল হাসান সেনজিক।
কথাগুলো খুব আগ্রহের সাথে শুনছিল মাজুভ। নাতাশার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল।
হাসান সেনজিক থামলেও মাজুভ বেশ কিছুক্ষণ কথা বলল না। ভাবছিল সে। বলল বেশ কিছু পর, মিঃ হাসান সেনজিক আপনি একটা নতুন দৃষ্টিকোণ তুলে ধরেছেন। ক্যাথলিক পশ্চিম ইউরোপের সাথে গ্রীক অর্থোডক্স বালকান অঞ্চলের এই পার্থক্যের কথা আমি কোন সময় ভাবিনি। আর পোপ নবম বেনফেস ঘোষিত যে ক্যাথলিক ক্রুসেডে শামিল হবার জন্যে রাজা স্টিফেনকে সন্ধি ভংগ করতে বলেছিল সেটা সার্ভিয়ার মানুষের স্বার্থের অনুকূলে ছিল কি না তাও কোনো দিন ভেবে দেখিনি। এদিকটা থাক। একটা কথা বলুন, রাজা স্টিফেন সন্ধি শর্ত ভংগ করলেন না ঠিক আছে, কিন্তু নিকোপলিসের ভয়ানক যুদ্ধে রাজা স্টিফেন কেন ইউরোপীয় খৃষ্টান শক্তির বিরুদ্ধে সুলতান বায়েজিদের পক্ষে যোগ দিলেন? সবাই আমরা জানি, রাজা স্টিফেন সুলতান বায়েজিদের পক্ষে যোগ না দিলে সম্ভবত খৃষ্টান শক্তিরই জয় হত।
হাসান সেনজিক হাসলো। বলল, এখানেও রাজা স্টিফেন বিন্দুমাত্র অন্যায় করেন নি। দু’টো কারণে রাজা স্টিফেন নিকোপলিসের যুদ্ধে সুলতান বায়েজিদের পক্ষে যোগ দিয়েছিলেন। প্রথম কারণ, সার্ভিয়ার জনগণের উপর ক্যাথলিক ক্রুসেডারদের অত্যাচার। রাজা স্টিফেন সন্ধি ভংগ করতে রাজী না হলে ক্যাথলিকদের মিলিত বাহিনী সার্ভিয়ার জনপদে নিষ্ঠুর লুন্ঠন চালায় এবং এর শস্য-জনপদ বিরান ভূমিতে পরিণত হয়। এ ছাড়া এই ক্যাথলিক খৃষ্টান বাহিনী সার্ভিয়ার দানিয়ুব সীমান্তের ভাদিন এলাকা এবং আর্সোভা দুর্গ দখল করে নেয়। এরপর সার্ভিয়ার রাকো দুর্গে যে হত্যাকান্ড তারা চালায় তার নজির ইউরোপে খুব কমই আছে। দুর্গের সৈন্যেরা অস্ত্রত্যাগ ও আত্মসমর্পণ করে তাদের আশ্রয় প্রর্থণা করলেও রাকো দুর্গের সব সৈন্যকে তারা নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। এরপরই রাজা স্টিফেন নিকোপলিসের যুদ্ধে সুলতান বায়েজিদের পক্ষে যোগদান করেন। দেশ ও জনগণের অস্তিত্বের প্রয়োজনেই এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল রাজা স্টিফেনকে। এছাড়া সন্ধির শর্ত অনুসারে সুলতান বায়েজিদ আইনত রাজা স্টিফেনকে সাহায্যের জন্য ডাকতেও পারতেন। সুতরাং নিকোপলিসের যুদ্ধে সুলতান বায়েজিদের পক্ষে যোগদান করে রাজা স্টিফেন কোন দিক দিয়েই অন্যায় করেন নি।
থামলো হাসান সেনজিক।
গভীর মনোযোগের সাথে হাসান সেনজিকের কথা শুনছিল মাজুভ। তার মুখের মলিন গাম্ভীর্য দূর হয়ে সেখানে আনন্দের উজ্জ্বলতা এসেছিল।
হাসান সেনজিক থামলে মাজুভ বলল, ধন্যবাদ মিঃ হাসান সেনজিক, আপনি আমার চোখ খুলে দিয়েছেন। কিন্তু একটা প্রশ্ন, রাজা স্টিফেনের উপর মিলেশ বাহিনী বিশেষ ক্ষুব্ধ এই কারণে যে, তিনি তার বোন ডেসপিনাকে সুলতান বায়েজিদের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন, এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কি?
হাসান সেনজিক বলল, এটাও কোন কারণ আসলে নয়। এটাই যদি কারণ হয়, তাহলে গ্রীক সম্রাট ক্যান্টাকুজেনী, যিনি তার কন্যা থিয়োডরাকে তুর্কি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ওসমানের পুত্র অর্থানের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন, এবং বুলগেরিয়ার রাজা ক্রাল সিসভেন, যিনি সুলতান মুরাদকে তার কন্যাদান করেছিলেন, প্রমুখের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ ওঠেনা কেন?
মাজুভ হাসল। বলল, স্টিফেন পরিবারের বিরুদ্ধে আরেকটা অভিযোগ হলো, সুলতান বায়েজিদের বেগম লেডি ডেসপিনার মাধ্যমে স্টিফেন পরিবার শুধু ইসলাম গ্রহণ-ই করেনি, গোটা বলকানে ইসলামের বাণী ছড়াবারও সব ব্যবস্থা করে।
মাজুভ থামার সংগে সংগেই হাসান সেনজিক উৎসাহের সাথে জবাব দিলো, এ অভিযোগ আমি মাথা পেতে নিচ্ছি। বলকানে ইসলাম প্রচারের ব্যবস্থা করে স্টিফেন পরিবার অন্যায় করেনি। সকলেরই নিজ নিজ ধর্ম প্রচারের অধিকার রয়েছে। ধর্ম প্রচার করা যদি স্টিফেন পরিবারের দোষ হয়, তাহলে এ দোষে ক্যাথলিকরাও মহাদোষী। কারণ গ্রীক-অর্থোডক্স খৃষ্টান অধ্যুষিত বলকানে তারা জুলুম অত্যাচারের মাধ্যমে ক্যাথলিক ধর্মমত প্রচার করেছে, স্টিফেন পরিবার এ জুলুম অত্যাচার অন্তত কারো উপর করেনি।
হাসান সেনজিকের কথা শেষ হবার সাথে সাথে মাজুভ উঠে দাঁড়িয়ে কয়েক পা এগিয়ে হাসান সেনজিককে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, ঠিক বলেছেন মিঃ হাসান সেনজিক, ক্যাথলিকরা তাদের ধর্মমত বলকানের উপর চাপিয়ে দেবার জন্য যে জুলুম-অত্যাচার ও নৃশংশতা করেছে, তার এক আনাও ইসলাম করেনি।
তারপর সোফায় ফিরে গিয়ে মাজুভ বলল, আমি খুবই আনন্দ বোধ করছি। আমার প্রিয় মাতৃভূমি সার্ভিয়ার ইতিহাসকে এমন স্বচ্ছভাবে কোন সময় আর দেখিনি।
মাজুভ থামলে হাসান সেনজিক শুরু করল। বলল, আমার মনে হয় কি জানেন মিঃ মাজুভ, মিলেশ বাহিনীর নেতা ক্যাথলিক কনস্টানটাইন স্টিফেন পরিবারের উপর প্রতিশোধ নিচ্ছে এই কারণে যে, রাজা স্টিফেন ক্যাথলিকদের বিরোধিতা করেছিল। একই সাথে কনস্টানটাইন এদেশে ক্যাথলিক ধর্মমত প্রতিষ্ঠা এবং স্টিফেন পরিবারকে নির্মুল করার আড়ালে বলকান থেকে ইসলামকে নির্মূল করতে চায়। এতে গ্রীক-অর্থোডক্স ধর্মমত এবং ইসলাম দু’ই শেষ হয়ে যাবে। অতএব স্টিফেন পরিবারের কোনো অপরাধ নয়, বরং ক্যাথলিক স্বার্থ চরিতার্থই…..
‘থামুন মিঃ হাসান সেনজিক’ হাসান সেনজিককে বাধা দিয়ে বলতে শুরু করলো মাজুভ,’কি বললেন মিলেশ বাহিনী বলকানে ক্যাথলিক খৃষ্টানদের স্বার্থ রক্ষা করছে? তাই কি?
বলে মাজুভ নিরব হলো মুহূর্তের জন্যে। তারপর সোফায় গা এলিয়ে অনেকটা স্বগত কণ্ঠেই বলল,’মিলেশ বাহিনী ক্যাথলিক স্বার্থের প্রতিভূ বলেই কি মিলেশ বাহিনীর নেতা কনস্টানটাইনের অফিসে তার মাথার উপর সম্রাট সার্লেম্যানের পূর্ণ দৈর্ঘ্য ছবি টাঙানো? এই সম্রাট সার্লেম্যানকেই তো ক্যাথলিক পোপ রোম সম্রাটের মুকুট পরিয়েছিলেন।’
অনেকটা আনমনাভাবেই বসা থেকে ওঠে দাঁড়াল মাজুভ। ঘর থেকে বেরিয়ে আসার জন্যে পা বাড়াল সে।
নাতাশাও উঠে দাঁড়াল। তার মুখে মিস্টি হাসি। আহমদ মুসাদের লক্ষ্য করে বলল, আপনারা নাস্তা করতে আসুন।
