দানিয়ুবের কাল বুক চিরে একটা ইঞ্জিন বোট এগিয়ে যাচ্ছিল। বেশ বড় বোট।
বোটের ডেকে অনেকগুলো প্লাস্টিক বস্তা। বস্তাগুলো শুকনো কাপড়ে ঠাসা।
বোটের পেছনে ইঞ্জিনের পাশে ছোট্ট একটা ইস্পাতের ষ্ট্যান্ডে একটা নেমপ্লেট। কালো প্লেট সাদা অক্ষরে লেখা ‘মেসার্স দানিয়ুব লন্ড্রী হাউস’ প্রোপ্রাইটর কালহান ফিহার নং ১৯।
নতুন সরকার বেসরকারী খাতে শিল্প-কারখানা স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে। মেসার্স দানিয়ুব লন্ড্রী হাউস সে ধরনেরই একটা বেসরকারী প্রতিষ্ঠান।
বোটে দু’জন মানুষ।
একজন ইঞ্জিনের কাছে বসে আছে। হ্যাটে তার কপাল পর্যন্ত ঢাকা। গায়ে ওভারকোট জড়ানো।
আরেকজন বসে আছে বোটের মাঝখানে। তার মাথায় সাদা উলের হেড কভার, গায়ে ওভার কোট।
ইঞ্জিনের কাছে ডেক চেয়ারে যে লোকটি বসে আছে তারই নাম কালহান ফিহার। দানিয়ুব লন্ড্রী হাউসের মালিক।
বোটের নেমপ্লেটে তার নাম কালহান ফিহার লেখা থাকলেও তার আসল নাম ওমর বিগোভিক।
ওমর বিগোভিক বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের একজন কৃতি অধ্যাপক। প্রায় ২৫ বছর চাকুরী করার পর ক’য়েকমাস আগে সে চাকুরী হারিয়েছে। তার সুপারিশে ভর্তি হওয়া দুজন মুসলিম ছাত্র সাম্প্রদায়িক অর্থাৎ মুসলিম জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে জেলে যায়। তাদের অপরাধের সাথে ওমর বিগোভিককেও জড়ানো হয়। তবে তাকে এইটুকু দয়া করা হয়েছে যে, তাকে জেলে না পাঠিয়ে চাকরীচ্যুত করা হয়েছে। আর যেহেতু সে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাদানের যোগ্যতা হারিয়েছে অতএব কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই আর তার চাকুরী হবে না।
চাকুরী হারিয়ে ওমর বিগোভিক একেবারে পথে বসে।
অনেক চিন্তা করে ব্যবসায় ছাড়া আর কোনো বিকল্প দেখে না। অলঙ্কারাদি, কিছু আসবাবপত্র বিক্রি করে তার সাথে সঞ্চয়ের কিছু টাকা যোগ করেও মূলধন যথেষ্ট হয় না। অবশেষে দ্বারস্থ হতে হয় বন্ধু-বান্ধবদের। এভাবে সে মূলধন যোগাড় করে দানিয়ুব লন্ড্রী হাউস চালু করে। দানিয়ুবের তীরে একটা ছোট্ট বাড়ি ভাড়া নিয়ে এই ব্যবসায় তার শুরু হয়েছে। ব্যবসায় করতে গিয়ে তাকে তার মুসলিম নাম পাল্টিয়ে যুগোশ্লাভ খৃষ্টান নাম গ্রহণ করতে হয়। মুসলিম নাম নিয়ে ব্যবসায় করতে পদে পদে বাধা-বিপত্তি, অসহযোগিতা এবং সমস্যা-সংকটের ভয় আছে।
ওমর বিগোভিকের ইঞ্জিন বোট তখন দানিয়ুব ব্রীজের কাছাকাছি এসে পড়েছে। এমন সময় বিশ্রী এক শব্দ তুলে বোটের ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেল।
ওমর বিগোভিক ইঞ্জিন স্টার্ট দিতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো।
বোটটি ধীরে ধীরে চলতে চলতে ব্রীজের তলায় এসে দাঁড়ালো।
ওমর বিগোভিক মুখ তুলে বোটের মাঝখানে বসে থাকা দ্বিতীয়জনকে লক্ষ্য করে বলল, মা নাদিয়া ব্রীজের থামের সাথে বোট বেঁধে দাও, স্রোতে বোট ভেসে যাবে। ইঞ্জিন খুলে দেখতে হবে কোথায় গন্ডগোল
নাদিয়া ওমর বিগোভিকের মেয়ে। নাম নাদিয়া নূর।
নাদিয়া নূর কাপড়ের বস্তা থেকে নেমে বোটের সামনের গলুইয়ে গিয়ে ছোট বৈঠা দিয়ে বোটকে ব্রীজের থামের কাছে টেনে নিলো। তারপর ব্রীজের হুকের সাথে নৌকা বেঁধে ফেলল।
দড়ি বাঁধা নৌকা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে দুলতে লাগল।
ওমর বিগোভিক বোটের ইমারজেন্সি বক্স থেকে টর্চ বের করে ইঞ্জিনের দিকে এগুলো।
আর নাদিয়া নৌকার গলুই থেকে তার আগের জায়গায় ফিরে আসার জন্যে পা বাড়াল।
ঠিক এই সময়েই উপর থেকে ভারি কিছু নৌকার মাঝখানে বস্তার উপর এসে পড়লো।
নৌকা প্রচন্ডভাবে দুলে উঠলো।
নাদিয়া নৌকা থেকে পড়ে যেতে যেতে বেঁচে গেল। ওমর বিগোভিক ডেকের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল।
ওমর বিগোভিক তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে টর্চ জ্বালল দেখার জন্যে কি পড়ল বোটের উপর।
টর্চ জ্বেলেই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল ওমর বিগোভিকের। নাদিয়া নূরও এগিয়ে এসেছিল। সে ভয়ে চিৎকার করে উঠলো।
বস্তার উপর একজন যুবকের সংজ্ঞাহীন দেহ। রক্তে ভেসে যাচ্ছে তার শরীর।
ওমর বিগোভিক তাড়াতাড়ি যুবকটির পাশে বসে তার হাত তুলে নিয়ে নাড়ি পরীক্ষা করলো। তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, না- যুবকটি মরে যায়নি।
ওমর বিগোভিক তাড়াতাড়ি যুবকটিকে পাঁজাকোলা করে তুলে এনে বোটের সমতল ডেকে শুইয়ে দিলো। বলল, মা নাদিয়া একটু পানি দাওতো। নাদিয়া তাড়াতাড়ি ফ্লাক্স থেকে একটি পট নিয়ে নদী থেকে পানি তুলে আনলো।
ওমর বিগোভিক অল্পকিছু পানি তার মুখে ছিটিয়ে দিলো এবং বলল, মা ছেলেটি এখনও বেঁচে আছে।
–কিন্তু এখানে কোত্থেকে, কিভাবে এল? বলল নাদিয়া।
–মনে হয় ছেলেটির কোনো শত্রু ছেলেটিকে মারার পর মরেছে মনে করে নদীতে ফেলে দিয়েছিল। ছেলেটির ভাগ্য নৌকার উপর এসে পড়েছে।
ক’য়েক মিনিট গেল, ছেলেটির জ্ঞান ফিরে এলো না।
ওমর বিগোভিক ভাবলো, আঘাত নিশ্চয় খুব মারাত্মক। কোথায় আঘাত দেখার জন্যে ওমর বিগোভিক বুক ও পিঠের জামা উঠিয়ে বীভৎস দৃশ্য দেখে কেঁপে উঠলো।
টর্চ ধরেছিল নাদিয়া। সে আরেক দফা আর্তনাদ করে উঠলো।
বুক, পিঠ গোটাটাই ফেটে ক্ষত-বিক্ষত। রক্ত ঝরছে এখনও সেগুলো থেকে।
ছেলেটিকে চীৎ করে শুইয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল বিগোভিক
নাদিয়ার টর্চ ছেলেটির মুখের উপর গিয়ে পড়েছে।
সুন্দর নিষ্পাপ চেহারা ছেলেটির। চোখ নীল, কিন্তু চুলগুলো কালো। অথচ স্লাভদের মতো সাদা চেহারা। তবে এই সাদার মধ্যে একটা সোনালী রং আছে।
–ছেলেটি কোনো ক্রিমিনাল নয়, ক্রিমিনালের চেহারা এ রকম হয় না। বলল ওমর বিগোভিক।
পিওর স্লাভ নয়। বলল নাদিয়া।
–ঠিক বলেছ। কিন্তু এখন কি করি বলত, দ্রুত চিকিৎসা দরকার ছেলেটির।
আমাদের ইঞ্জিন নষ্ট। কি করতে পারি। ঠিক এই সময় দক্ষিণ দিকে একটা হেডলাইট ছুটে আসছে দেখা গেল।
আশান্বিত হলো ওমর বিগোভিক। নিশ্চয় কোনো লঞ্চ অথবা মোটর বোট হবে।
হেডলাইটটি কাছে চলে এল। ছোট একটা মোটর লঞ্চ।
ওমর বিগোভিক টর্চ জ্বেলে বোটের পেছনে দাঁড়িয়েছিল। মোটর লঞ্চটি কাছাকাছি হতেই ওমর বিগোভিক বলল, আমার বোটের ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেছে।
আহত মূমুর্ষ একজন আমার বোটে। সাহায্য করলে বাধিত হবো।
লঞ্চের গতি কমে গেল।
লঞ্চ থেকে হেড লাইটের আলো এসে বোটের উপর পড়ল। আলোর বন্যায় ভেসে গেল বোট।
নাদিয়া আহত যুবকটির পাশে উত্তরমুখী হয়ে বসে ছিল। তার মুখে আলো পড়লো না।
লঞ্চটি ধীরে ধীরে বোটের পাশে চলে এলো। লঞ্চটিকে দু’তলায় বলা যায়। তবে দু’তলায় উন্মুক্ত ডেকের মাঝখানে একটা কেবিন মাত্র।
লঞ্চ থেকে কে একজন বলল, কোথায় যাবেন?
–টিটো পোর্টে পৌঁছতে পারলেই হবে। বলল ওমর বিগোভিক।
–আপনার নাম কি?
–কালহান ফিহার।
লঞ্চের লোকটি কয়েক মুহূর্ত কথা বলল না। মনে হয় কারো সাথে পরামর্শ করছে।
একটু পরেই বলল, ঠিক আছে, আপনার বোট লঞ্চের পাশে বেঁধে নিন।
ওমর বিগোভিক দ্রুত সামনের গলুইয়ে গিয়ে দড়িটা পিলারের হুক থেকে খুলে নিয়ে লঞ্চের পাশের আংটার সাথে বেঁধে নিল।
লঞ্চ আবার চলতে শুরু করল। তার সাথে বোটটিও।
লঞ্চে দড়ি বাঁধার সময় এক তলার খুলে দেয়া জানালা দিয়ে ওমর বিগোভিকের নজর গিয়েছিল ভেতরে। ভেতরে নজর পড়তেই আঁৎকে উঠলো ওমর বিগোভিক।
জানালার পাশেই একটা শ্বেত পাথরের টেবিল। টেবিলে তখন কেউ নেই। টেবিলটির মাঝখানে ফনা তোলা একটা কালো সাপের মাথা। ফনার উপরটা ঘিরে অর্ধ চন্দ্রাকারে লেখা ‘মিলেশ’। অর্থাৎ মিলেশ বাহিনীর লঞ্চ।
ওমর বিগোভিক নাদিয়ার কাছে এসে নিচু গলায় বলল, এটা মিলেশ বাহিনীর লঞ্চ, সাবধান থাকতে হবে। পরিচয় প্রকাশ না হয়। তুমি ঐ পেছনটায় ইঞ্জিনের কাছে গিয়ে বসে থাক, কথা বলবে না।
নাদিয়া বুঝল। সে জানে মিলেশ বাহিনী বর্বর। সে পিতার হ্যাটটি মাথায় দিয়ে নৌকার পেছনে গিয়ে বসল।
লঞ্চের সেই আগের লোকটি আবার দু’তলায় কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে ডেকের প্রান্তে দাঁড়িয়ে বলল, আপনার আহত লোকটা কেমন?
–এখনও জ্ঞান ফিরেনি, বলল ওমর বিগোভিক।
–আমাদের ডাক্তার আছে, পাঠাব নাকি?
–খুব ভাল হয়।
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার নেমে এল নৌকায়। একটা ব্যাগ তার হাতে।
ডাক্তার যুবকটির শরীরে একবার নজর বুলিয়েই বলল, এগুলো চাবুকের ক্ষত।
বুক, নিশ্বাস, ইত্যাদি পরীক্ষা করে বলল, অমানুষিক মেরেছে, আর অল্প হলেই মারা যেত। জীবনী শক্তি শেষ প্রান্তে পৌঁছেছিল।
একটু থেমে বলল, এখনি জ্ঞান ফিরে আসবে। তবে এর যে ড্রেসিং দরকার তা আমার কাছে নেই। হাসপাতালেই নিতে হবে।
বলে ডাক্তার ব্যাগ খুলে তুলার কিছু এলকোহল ঢেলে যুবকটির নাকে ধরল।
লঞ্চের ডেক থেকে আসা আলো নৌকাকেও আলোকিত করছিল।
ডাক্তার বসেছিল যুবকটির মাথার কাছে। ওমর বিগোভিক বসেছিল যুবকটির উত্তর পাশে ডেকের উপর। নাদিয়া একটু দূরে নৌকার গলুইয়ে বসে সব কিছু দেখতে পাচ্ছিল।
–এর এ অবস্থা হলো কেন? কে তাকে অত্যাচার করল। জিজ্ঞাসা করল ডাক্তার।
মুস্কিলে পড়ে গেল ওমর বিগোভিক। নিজের লোক বলে পরিচয় দেওয়াও মুস্কিল। তাহলে বলতে হবে কি করে ঘটনা ঘটল এবং ঘটনার জড়িয়ে যেতে হবে। তাছড়া যুবকটির জ্ঞান ফিরলেই সব ফাঁস হয়ে যাবে যে, সে চেনা নয়। আবার নিজের লোক না বললে বলতে হবে কোথায় পেলাম, কি করে পেলাম। নৌকার উপর এসে পড়েছে, একথা কেউ বিশ্বাস করবে না।
ওমর বিগোভিক চিন্তা-ভাবনা করে দেখল, শেষের পন্থাটিই ঠিক এবং সত্য কথা বলারই সিদ্ধান্ত নিল।
–ইঞ্জিন নষ্ট হবার পর আমাদের নৌকা ব্রীজের তলায় বাধা ছিল। যুবকটি ব্রীজের উপর থেকে এসে আমার নৌকায় পড়েছে। সম্ভবতঃ কেউ মেরে ফেলে দিতে চেয়েছিল। বলল ওমর বিগোভিক।
অবাক দৃষ্টিতে ডাক্তার ওমর বিগোভিকের দিকে তাকাল। সে অবিশ্বাস করল মনে হল না।
–অলৌকিক ভাবে যুবকটি বেঁচে গেছে। পানিতে পড়লে সলিল সমাধি হতো। বলল ডাক্তার।
এই সময় যুবকটির হাত-পা নড়ে উঠল ঈষৎ। যুবকটি ধীরে ধীরে চোখ খুলল।
চোখে কোন চাঞ্চল্য নেই, কোন উদ্বেগ নেই। শান্ত চোখে একবার সে চারদিক চোখ বুলাল। বোধহয় বুঝে নিতে চেষ্টা করল সে কোথায়। তারপর চোখটি তার আবার অর্ধ নীপিলিত হয়ে গেল। কোন কথা সে বলল না।
অবাক হলো ওমর বিগোভিক। মনে হয় আবাক হয়েছে ডাক্তার এবং নাদিয়াও। এরকম একটা পরিস্থিতিতে আহত-মুমুর্ষ একজনের কাছ থেকে নানা জিজ্ঞাসা আসবে ও উদ্বেগ প্রকাশ পাবে, সেটাই স্বাভাবিক।
সবাই নিরব।
নিরবতা ভাঙল ডাক্তার।
বলল, আপনি কে, নাম কি?
–আমি সালেহ বাহমন, একজন ছাত্র। বলল আহত যুবকটি।
নাম শুনে চমকে উঠল ডাক্তার, চমকে উঠল ওমর বিগোভিক, নাদিয়াও।
কিন্তু ডাক্তারের চমকে উঠার মধ্যে ছিল দু’চোখ ভরা ঘৃণা। আর ওমর বিগোভিক ও নাদিয়ার মধ্যে ছিল উদ্বেগ।
ডাক্তার মুখ বাঁকা করে উঠে দাঁড়াল। বলল, পণ্ডশ্রম করলাম মিঃ কালহান। এ হিদেন ব্যাটা নিশ্চয় কোন ধাড়ি শয়তান হবে। এর মরাই উচিত। বলে ডাক্তার লঞ্চে উঠে গেল।
ওমর বিগোভিকের মুখে কোন কথা যোগাল না।
এরপর কি ঘটে সেই চিন্তায় তার মন দুরু দুরু করতে লাগল। মিলেশ বাহিনী হিটলারের নাজী বাহিনীর একটা প্রতিরূপ। মুসলমানদের অস্তিত্ব এদের কাছে অসহ্য। মুসলমানদের উপর আঘাত হানার কোন সুযোগই এরা হাত ছাড়া করে না। বলকানে এ বাহিনী গঠিত হয়েছে। মুসলমানদের এবং তাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য নির্মূল করার জন্যই।
নিরবতা ভাঙল লঞ্চের ডেকের উপর থেকে আসা একটা আওয়াজে। ডেকের উপর দাঁড়িয়ে সেই আগের লোকটি বলল, লোকটির পরিচয় তো পেয়েছেন মিঃ কালহান। আমাদের জাত শত্রু, কাল সাপ। নদীতে ফেলে দিন। ডুবে মরুক। আমরা ওকে কোন সাহায্য করতে পারব না।
লোকটি ডেক থেকে চলে গেল।
পর মুহূর্তেই লঞ্চের সাথে বোট বেঁধে রাখা দড়িটি খুলে দিল।
ওমর বিগোভিক একটুও দুঃখিত হলো না। বরং আল্লাহ্র লাখো শুকরিয়া আদায় করল এই বলে যে, তারা নিজেরা যুবকটিকে নদীতে ফেলে দিয়ে যায়নি।
ওমর বিগোভিক উঠে দাঁড়াল। বলল, মা নাদিয়া তুমি এখানে ছেলেটির কাছে বস। আমি বৈঠা ধরি। নৌকা ভেসে যাবে।
বলেই ওমর বিগোভিক আবার যুবকটির মাথার কাছে ঝুকে পড়ে বলল, বাবা আল্লাহ্ তোমাকে বাঁচিয়েছে, তুমি এখন নিরাপদ।
একটু থেমে বলল, খুব কষ্ট হচ্ছে তোমার?
যুবকটি চোখ খুলল। দুর্বল কণ্ঠে বলল, এর চেয়েও বড় কষ্ট আছে। সেই সব বড় কষ্টের তুলনায় এসব কোন কষ্টই নয়।
নাদিয়া এসে পাশে দাঁড়িয়েছিল। যুবকটির কথা শুনে ওমর বিগোভিকের চোখ দু’টি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বিস্ময়ও জাগলো মনে, এ কোন সাধারণ যুবকের কথা নয়!
‘আলহামদুলিল্লাহ্’ বলে ওমর বিগোভিক নৌকার গলুই এর দিকে পা বাড়াল। কিন্তু দু’ধাপ গিয়েই আবার ফিরে দাঁড়াল।
হঠাৎ তার খেয়াল হল যুবকটি যে শুধু সার্ট গায়ে দিয়ে, শীতে জমে যাচ্ছে এটা তার চোখেই পড়েনি। ওমর বিগোভিক তাড়াতাড়ি বোটের ডেকের নিচ থেকে একটা কম্বল বের করল, আর নিজের সার্টটা খুলে ফেলল।
তখন বোটটি স্রোতের টানে ঘুরতে শুরু করেছে।
ওমর বিগোভিক তাড়াতাড়ি কম্বল ও সার্ট নাদিয়ার দিকে ছুড়ে দিয়ে বলল, ওর জামাটা পাল্টিয়ে গায়ে কম্বল দিয়ে দাও।
বলে ওমর বিগোভিক বোটের গলুইয়ে গিয়ে বৈঠা ধরল। প্রথমে সে বোটটা নদীর কিনারে টেনে নিল, তারপর বৈঠা চালিয়ে এগুতে শুরু করল। কিনারায় স্রোত কম। এগুতে খুব অসুবিধা হলো না।
নাদিয়া জামা নিয়ে সালেহ বাহমনের পাশে বসল। তারপর বাম হাতে তার মাথা মৃদু স্পর্শ করে বলল, শুনুন, আপনার জামা পাল্টাতে হবে, রক্তে ভিজে গেছে।
সালেহ বাহমন চোখ খুলল।
তারপর উঠে বসার জন্য সে মাথা তুলল। নাদিয়া তাড়াতাড়ি মাথা ধরে তাকে তুলে বসাল।
বসতে গিয়ে ককিয়ে উঠল সালেহ বাহমন।
এই প্রথম তার একটি আর্তনাদ।
নাদিয়া ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলল, খুব কষ্ট হচ্ছে কি?
সালেহ বাহমন তখন নিজেকে সামলে নিয়েছে। বলল, না।
বলে সালেহ বাহমন গা থেকে জামা খুলতে গিয়ে বেদনায় ককিয়ে উঠল আবার।
কোন কোন জায়গায় রক্ত শুকিয়ে জামা আটকে গেছে।
দ্বিতীয়বার জামা খুলতে গিয়ে আবার সেই রকম আর্তনাদ করে উঠল সালেহ বাহমন। টলতে লাগল সে।
নাদিয়া তাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে উঠল, আব্বা তুমি এস।
বৈঠা ফেলে ছুটে এল ওমর বিগোভিক।
সে এসে সালেহকে ধরল। বলল, মা দেখ, ডেকের ড্রয়ারে কাঁচি আছে। ছুটে গিয়ে কাঁচি নিয়ে এল নাদিয়া।
ওমর বিগোভিক কাঁচি নিয়ে কেটে জামা খুলে ফেলল। কয়েকটা অংশ গায়ের সাথে থেকে গেল। তারপর জামা পড়িয়ে দিয়ে শুইয়ে দিল সালেহ বাহমনকে। কম্বল দিয়ে গোটা গা ঢেকে দিল।
নাদিয়া তাঁর নিজের উলের হেডকভার সালেহ বহমানের মাথায় লাগিয়ে দিল।
বোট ততক্ষণে অনেকটা ভাটিতে ভেসে এসেছে।
ওমর বিগোভিক গিয়ে আবার বৈঠা ধরল।
নাদিয়া সালেহ বাহমনের পাশে বসে রইল। তাঁর মনে খচ খচ করে বিধছিল একটা কথা বার বার, মিলেশরা এত অমানুষ কেন? একজন ডাক্তার এত জঘন্য চরিত্রের হতে পারে কেমন করে? কেমন করে তারা একজন আহত-অসুস্থ মানুষকে নদীতে ফেলে দিতে চায়, মুসলমানরা কি দোষ করেছে? মুসলমানরা শুধু যুগোশ্লাভিয়ায় নয়, গোটা বলকানের শান্তিপ্রিয় নাগরিক। তারা কোন হাঙামায় নেই। একটাই তাদের অপরাধ। সেটা হল মুসলমান হিসেবে অস্তিত্ব রক্ষার জন্যে যা করণীয় তা তারা করতে পারছে না, এটা তারা চায়। খৃষ্টান স্লাভ, বুলগার,গ্রীক সবাই চাচ্ছে মুসলমানরা তাদের মুসলমানিত্ব পরিত্যাগ করে তাদের সাথে মিশে যাক। মুসলমানরা রাজী হচ্ছেনা, এটাই তাদের অপরাধ। এ অপরাধ থেকে মুক্তির তাদের উপায় নেই। সালেহ বাহমন এ অপরাধেই অপরাধী। কারা তাকে নির্যাতন করল, কারা তাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল? নাদিয়ার আরও মনে হলো, সালেহ বাহমন সাধারণ শ্রেণীর কেউ নন, তা তাঁর কথা, নার্ভ-শক্তি থেকেই বুঝা যাচ্ছে।
নাদিয়া বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানের একজন ছাত্রী। শীতের রাত। নিরব চারদিক। নদীর বুকে ঘন অন্ধকার। এই অন্ধকারের মধ্যে গাড় একটা ছায়ার মত এগিয়ে যাচ্ছে বোটটি। ইঞ্চি ইঞ্চি করে এগোচ্ছে টিটো পোর্টের দিকে।
৩
বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়। লাইব্রেরীর একটি নির্জন প্রান্তে একটি টেবিলে বসে আছে ডেসপিনা জুনিয়র।
তাঁর সামনে একটি বই খোলা।
তাঁর চোখ বইয়ের দিকে নিবদ্ধ। কিন্তু একটা বর্ণও সে পড়ছে না। ক্ষোভে, দুঃখে, বেদনায় বিপর্যস্ত তাঁর মুখ।
ডেসপিনা জুনিয়র ইতিহাসের একজন অত্যন্ত কৃতি ছাত্রী। অনার্সে সে প্রথম শ্রেনীতে প্রথম হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষে সে অধ্যয়ন করছে।
ইতিহাসের ক্লাসে আজ সে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছে। ইতিহাসের প্রধান অধ্যাপক ক্লাসে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। বক্তৃতার মাঝখানে ডেসপিনা বাধার সৃষ্টি করে কিছু বলার জন্য উঠে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু অধ্যাপক তাকে কিছু বলতে না দিয়ে ধমকে বসিয়ে দেয়। ক্রুদ্ধ ডেসপিনা অনুমতি না নিয়েই ক্লাস থেকে গট গট করে বেরিয়ে আসে।
অপমানিত অধ্যাপক ক্লাসে বসেই বিভাগীয় নির্দেশ জারি করেছেন, ডেসপিনা একমাসের জন্য সাসপেন্ড। একমাস তাকে ইতিহাসের ক্লাসে এলাও করা হবেনা।
এই অপমান এবং ক্ষোভে-দুঃখে জর্জরিত হচ্ছিল ডেসপিনা জুনিয়রের হৃদয়।
কারনিনা, জেমস এবং নাদিয়া লাইব্রেরীতে প্রবেশ করেই ডেসপিনাকে দেখতে পেল।
এরা সবাই ইতিহাস বিভাগের এবং ডেসপিনার সহপাঠী। ডেসপিনাকে ঘিরে বসল সবাই।
কারনিনা বলল, তোমার এভাবে অধৈর্য হওয়া এবং এভাবে বেরিয়ে আসা ঠিক হয়নি। সঙ্গে সঙ্গেই কিছু বলল না ডেসপিনা।
মুখ নিচু করে নিরব রইল। তাঁর দু’চোখ থেকে নেমে এল অশ্রু।
–আমি ঠিকই করেছি, ইতিহাস চুরি করবে কেন, ইতিহাস বিকৃত করবে কেন? বলল ডেসপিনা।
— কি বলছ, স্যার ইতিহাস চুরি করেছেন? কারনিনাই আবার বলল।
–তোমার এসব বাড়াবাড়ি ডেসপিনা, স্যারের উপর এমন মন্তব্য ঠিক নয়। বলল জেমস।
–না আমার বাড়াবাড়ি নয়। স্যার ইতিহাস শিক্ষকের মত আচরণ করেননি, তাঁর বর্ণনা একচোখা হয়েছে।
–কেমন করে বলত। বলল নাদিয়া।
ডেসপিনা একটু চুপ করে থাকল। তারপর শুরু করল, স্যার বললেন হাঙ্গেরীর রাজা লেডিস লাস ও ওয়ালেচার রাজা ডাকুলের মিলিত বাহিনীর সাথে বুলগেরিয়ার ভার্সায় ১৪৪৪ সালের ১০ ই নভেম্বর তুর্কী সুলতান দ্বিতীয় মুরাদের যে যুদ্ধ হয় তা সুলতানের নিষ্ঠুর দলননীতির ফল। সুলতান নাকি খৃষ্টানদের গ্রামের পর গ্রাম ও গীর্জা ধ্বংস করেন। এছাড়া স্যার যুদ্ধক্ষেত্রে হাংগেরীর রাজা লেডিস লাস-হত্যাকে বর্বর বলে অভিহিত করেছেন। হাংগেরীর রাজা লেডিস লাসকে হত্যা করে তাঁর মাথা তুর্কীরা তাদের পতাকার সাথে তুলে ধরেছিল।
একটু দম নিয়ে ডেসপিনা বলল, স্যারের এই কারণগুলো মিথ্যা ও আংশিক। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে হাংগেরীর রাজা লেডিস লাস হত্যাকে বর্বর বলেছেন, কিন্তু কে এই যুদ্ধ বাঁধাল, কেন এই যুদ্ধ বাঁধল তা তিনি বলেন নি। তিনি বলেননি লেডিস লাস কি ধরণের জঘন্য বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। ১৪৪৪ সালের ১০ই নভেম্বর ১০ বছরের জন্যে হাঙ্গেরী রাজ্যের সাথে সুলতান দ্বিতীয় মুরাদের একটি সন্ধি হয়। হাঙ্গেরী, পোলান্ড, সার্ভিয়া, বসনিয়া, ওয়ালেচিয়া,আলবেনিয়া (বুলগেরিয়া, রুমানিয়াসহ সার্ভিয়া বসনিয়া ও গ্রীসের গোটা অঞ্চল ছিল তখন তুর্কী সুলতানের অধীনে) থেকে সংগৃহীত মিলিত খৃষ্টান বাহিনীর সাথে দীর্ঘ বিশ বছর যুদ্ধের পর উভয় পক্ষের উদ্যোগে এই সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়। সন্ধির শর্ত অনুসারে সার্ভিয়া স্বাধীন হয়। এবং তুর্কীসৈন্যরা দুর্গগুলো খালি করে দিয়ে চলে যায়। কিন্তু দশ বছর শান্তি রক্ষার জন্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির বয়স একমাস না হতেই পোপের পরামর্শে হাঙ্গেরী রাজ সন্ধি ভংগ করলেন। তাঁর মানে ইউরোপের আরও রাজারা যোগ দিলেন। সবাই বললেন, অবিশ্বাসীদের সাথে সন্ধি রক্ষা করা নিষ্প্রয়োজন। সন্ধি ভঙ্গ করে তারা সার্ভিয়াসহ পুর্বদিকে কৃষ্ণসাগর পর্যন্ত গোটা ভূভাগ দখল করে নিলেন। অবশেষে ১৪৪৪ সালের ১০ই নভেম্বর ভার্সায় তুর্কি সৈন্যদের সাথে তারা মুখোমুখি হল। সন্ধি ভংগের মত বিশ্বাসঘাতকতায় ক্রুদ্ধ তুর্কি সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ সন্ধির দলীলকে তাঁর যুদ্ধের পতাকা হিসেবে ব্যবহার করেন এবং যুদ্ধে নিহত হাঙ্গেরী রাজের কর্তিত মাথা ঐ পতাকার সাথে উত্তোলন করেন। ইতিহাসের রায় অনুসারে তুর্কি সুলতান এখানে কোন অন্যায় করেননি, জঘন্য একজন বিশ্বাসঘাতককে তিনি শাস্তি দিয়েছেন।
একটু থামল ডেসপিনা।
কিছু বলার জন্য জেমস মুখ খুলেছিল।
ডেসপিনা বাধা দিয়ে বলল, আমার কথা শেষ হলে তারপর বলবে।
বলে আবার শুরু করল, যুদ্ধের আগে তুর্কিরা খৃষ্টানদের অজস্র গ্রাম ও গীর্জা পুড়িয়ে ছারখার করেন, স্যারের এ বক্তব্য মিথ্যা শুধু নয়, উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর শামিল। ইতিহাসের সাক্ষী হল, পোপের মন্ত্রনায় হাঙ্গেরীর রাজ লেডিস লাসের নেতৃত্বে গঠিত বিশাল ক্যাথলিক বাহিনী স্বাধীন সার্ভিয়া পদানত করে যখন কৃষ্ণসাগরের দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন তখন তাদের হাতেই গ্রীক-খৃষ্টানদের হাজার হাজার গ্রাম ও গীর্জা ধ্বংস হয়েছিল, পুড়ে ছারখার হয়েছিল অসংখ্য শস্যক্ষেত ও জনপদ। তাইতো দেখা যায় ভার্ণা যুদ্ধের পর সার্ভিয়া ও বসনিয়া আবার যখন তুর্কি অধিকারে আসল তখন সেখানকার গ্রীক-ধর্ম সমাজের খৃষ্টানরা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছিল, মুসলমানদের তারা স্বাগত জানিয়েছিল।
একটু দম নিয়েই ডেসপিনা বলল, ইতিহাসের আরেকটা সাক্ষের কথা তোমাদের বলি, সার্ভিয়ার এই দুর্যোগ প্রাক্কালে সার্ভিয়ার খৃষ্টান রাজা ব্রাংকোভিচ হাঙ্গেরী রাজকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তিনি জয়লাভ করলে ধর্ম সম্বন্ধে কি ব্যবস্থা করবেন? উত্তরে হাঙ্গেরী রাজ বলেছিলেন, সমগ্র দেশকে বলপূর্বক রোমান ক্যাথলিক করা হবে। ব্রাংকোভিচ এই প্রশ্ন তুর্কি সুলতান দ্বিতীয় মুরাদকেও করেন। উত্তরে সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ জানিয়েছেন, তিনি প্রত্যেক মসজিদের নিকট একটি করে গীর্জা নির্মাণ করে দেবেন, লোকে স্বাধীনভাবে যেখানে ইচ্ছা গমন করবে। এরপর সার্ভিয়ার মানুষ তুর্কী শাসনকেই স্বাগত জানায়। স্যার এসব ঐতিহাসিক সত্য চেপে গিয়ে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়েছেন।
ডেসপিনা থামল।
জেমস এর চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠেছে। তাতে বিরক্তি ও ক্ষোভের চিহ্ণ স্পষ্ট। সে বলল, ডেসপিনা তুমি এই যে কথাগুলো আমাদের কাছে বললে, তা বাইরে কখনো বলো না। যতই ইতিহাস হোক আমরা এগুলো মানিনা। স্যার ঠিকই আছেন।
–তুমি তা বলতে পার, ইতিহাস চুরি যদি পাপ না হয়।
–এ পাপ নয়। জাতিকে তুমি ভালোবাসনা ডেসপিনা?
–কোন জাতি কি মিথ্যা বলতে শেখায়, ইতিহাস চুরি করতে বলে?
জেমস-এর মুখ ক্রোধে রক্তবর্ণ ধারন করেছে। সে চিৎকার করে কি বলতে যাচ্ছিল। কারনিনা তার মুখে হাত চাপা দিয়ে বলল, জেমস আমি তোমাকে এখানে টেনে এনেছি ঝগড়া করার জন্যে নয়। তুমি যে দিকটা বলছ সেটা রাজনৈতিক, আর ডেসপিনা যে বিষয়ের উপর জোর দিচ্ছে সেটা ঐতিহাসিক। দু’জনেই ঠিক আছ।
জেমস অনেকখানি শান্ত হল।
কারনিন ও জেমস বিশ্ববিদ্যালয় চত্তরের এক সুপরিচিত জুটি-মঞ্চ-নেপথ্য সবখানেই। আবার এরা ডেসপিনাকে ভালোবাসে তার সারল্য, সুব্যবহার ও সুশিক্ষার জন্যে।
শান্ত হয়ে জেমস বলল, কারনিনা তোমার বান্ধবী ডেসপিনার ক্ষতি হবে যদি এরকম কথা সে বলে। তার ভবিষ্যৎ আছে, আমরা তার ভাল চাই।
ডেসপিনা তখন গম্ভীর হয়ে উঠেছে। বলল, ধন্যবাদ জেমস।
‘ধন্যবাদ’ বলে জেমস ঘড়ির দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল। বলল, কাজ আছে একটু।
জেমস-এর সাথে কারনিনাও চলে গেল।
নাদিয়া তার চেয়ার টেনে ডেসপিনার আরও কাছে সরে এল, ঘনিষ্ঠ হলো আরও।
ডেসপিনার একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলল, ডেসপিনা অনেকদিন থেকে একটা সন্দেহ আমার মনে জাগছে, আজ সেটা ঘনিভূত হলো।
–কি সন্দেহ? নাদিয়ার দিকে মুখ তুলে জিজ্ঞাসা করল ডেসপিনা।
–বলব? বলল নাদিয়া।
–বল।
–আমার সন্দেহ তুমি মুসলিম।
ডেসপিনা মুখ নামিয়ে নিল। একটুক্ষণ চুপ থেকে বলল, তোমার সন্দেহ মিথ্যা নয় নাদিয়া।
–তাহলে প্রতিদিন আমার কাছেও পরিচয় গোপন করছ কেন, তুমি জান যে আমি মুসলমান।
–আমার উপর হুকুম, এ পরিচয় কাউকেই বলা যাবে না।
–কেন? আমি তো পরিচয় গোপন করিনি?
–তোমার আব্বা ছিলেন একজন মুসলিম অধ্যাপক, তোমার পরিচয় গোপন করার প্রশ্ন ওঠে না। তাছাড়া……
চুপ করল ডেসপিনা কথা শেষ না করেই।
–তাছাড়া কি?
ডেসপিনা পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে নাদিয়ার দিকে তাকাল। নাদিয়ার চোখে চোখ রেখে কি যেন ভাবছে ডেসপিনা।
–বলতে আপত্তি আছে ডেসপিনা?
–তোমাকে বলতে আপত্তি নেই, তোমার আব্বাও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তিনি চাকুরী হারিয়েছেন দু’জন মুসলিম ছাত্রকে সাহায্য করে।
একটু থামল আবার ডেসপিনা। তারপর শুরু করল, আমি এক হতভাগ্য পরিবারের সন্তান নাদিয়া। আমাদের পরিবারের কোন পুরুষ ছেলেক বাঁচতে দেয়া হয়না, মেয়েরা বাঁচে, কিন্তু তাদেরকেও সংসার গড়তে দেয়া হয়না, দুর্বিসহ একাকিত্ব নিয়ে তাদের জীবন কাটাতে হয়।
নাদিয়ার চোখ দুটি বিস্ময়ে বিস্ফারিত।
সে চোখ দু’টি দিয়ে যেন ডেসপিনাকে গিলছে।
ডেসপিনা চুপ করেছে।
নাদিয়ার মুখেও কথা সরছে না।
অনেকক্ষণ পর নাদিয়া তার বিস্ময়ের ঘোর নিয়েই জিজ্ঞাসা করল, তুমি কি স্টিফেন পরিবারের মেয়ে, যে সার্ভিয়া রাজ স্টিফেনের বোন লেডি ডেসপিনার বিয়ে হয়েছিল তুরস্কের সুলতান বায়েজিদের সাথে?
–হ্যাঁ নাদিয়া। বলল ডেসপিনা।
নাদিয়া জড়িয়ে ধরল ডেসপিনাকে পাগলের মত। কপালে চুমু খেল। বলল, ডেসপিনা, স্টিফেন পরিবারের জন্য আমরা গর্ব করি, কিন্তু এই পরিবারের কাউকে দেখার সৌভাগ্য আমার কোনদিন হয়নি।
–স্টিফেন পরিবারকে তোমরা জান?
–শুধু আমরা নই, বলকান অঞ্চলের সব মুসলিম পরিবারই জানে এবং তারা এ পরিবারের জন্যে গর্ব করে।
–তাদের সম্বন্ধে সবকিছুই কি জান?
–সবকিছু মানে, তুমি যে বিষয়টা বললে, সেটা আমি শুনেছি আব্বার কাছে।
–তিনি কি সব জানেন যে, আমাদের উপর কি নিপীড়ন চলছে যুগ যুগ ধরে?
–মনে হয় তিনি জানেন। তাঁর কাছে আরও আমি শুনেছি, এই পরিবারের মাত্র একজনই নাকি উপযুক্ত ছেলে জীবিত আছে, নাম হাসান সেনজিক। বিদেশে মানুষ হয়েছেন, বিদেশেই থাকেন।
–হ্যাঁ নাদিয়া, হাসান সেনজিক আমার খালা আম্মার ছেলে।
একটা কিছু বলতে গিয়েও ডেসপিনা বলতে পারলনা। তার গলা যেন বন্ধ হয়ে গেল। হঠাৎ থেমে গেল সে।
নাদিয়া তার দিকে তাকিয়েছিল। দেখল, ডেসপিনার চোখ দু’টি ছলছল করছে।
নাদিয়া কিছু বলতে পারল না।
ডেসপিনাই কথা বলল অল্পক্ষণ পরে। বলল, তারও কোন খবর নেই ১৫ দিন হল। আমার খালাম্মা মুমূর্ষ। তাঁকে দেখার জন্যে দেশে আসবে বলে স্পেন থেকে সে যাত্রা করেছিল ১৫ দিন আগে। তারপর আর কোন খোঁজ নেই তার।
ডেসপিনার শেষের কথাগুলো কান্নায় জড়িয়ে গেল।
নাদিয়াও অভিভূত হয়ে পড়েছে। বলল, কোন খোঁজ নেওয়া যায়নি?
–কে নেবে? শত্রুরা জালের মত ছেয়ে আছে, খোঁজ করতে গেলেও তার বিপদ হবে। হাসান সেনজিকের নাম নেওয়াও বিপদের কারণ।
–কিন্তু একটা পরিবারকে এভাবে ধ্বংস করা কেন? ইচ্ছা করলে সবাইকে তো একেবারে মেরে ফেলতে পারে? না, তারা তা করবে না। এই বংশকে তারা তিলতিল করে মারবে।
–ঠিক তাই। আব্বার কাছে শুনেছি, খৃষ্টানরা, খৃষ্টান যাজকরা, বিশেষ করে মিলেশ বাহিনী মনে করে স্টিফেন পরিবারই বলকান দেশগুলোতে ইসলাম প্রচারের নিমিত্ত হিসাবে কাজ করছে। তারা আরও মনে করে স্লাভ ও মুসলিম রক্তকে মিশিয়েছে এই পরিবারই।
–ঠিকই তিনি বলেছেন, এসবই আমাদের পরিবারের অপরাধ।
–কিন্তু ডেসপিনা, সব অত্যাচারেরই তো একটা শেষ আছে। এরও একটা শেষ অবশ্যই আছে।
–কিভাবে, ওদের শক্তির বিরুদ্ধে কে দাঁড়াবে? আগে কম্যুনিষ্ট সরকার ওদের পাপেট ছিল, আজকের গণতান্ত্রিক সরকারও ওদের মন রক্ষা করেই চলছে শুধু নয়, মনে মনে তারা মিলেশ বাহিনীর কাজে ভীষণ খুশি।
সরকার মনে করছে, তাদের কাজটাই মিলেশ বাহিনী করে দিচ্ছে।
নাদিয়ার মনে পড়ল সালেহ বাহমনের কথা। আপনাতেই মুখটা যেন তার আরক্ত হয়ে উঠল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও কাজ হচ্ছে ডেসপিনা।
বলে নাদিয়া সালেহ বাহমনের সব কাহিনী খুলে বলল এবং জানাল যে, মুসলিম যুবকরা হোয়াইট ক্রিসেন্ট নামে একটা সংগঠন গড়ে তুলেছে। মিলেশ বাহিনীকে প্রতিরোধের প্রস্তুতি তারা শুরু করেছে।
ডেসপিনা নাদিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে তার কথা শুনছিল। শুনতে শুনতে ডেসপিনার ঠোঁটে এক টুকরো হাসির রেখা ফুটে উঠেছিল।
নাদিয়া থামলে ডেসপিনা বলল, তোমার সালেহ বাহমন এখন কোথায়?
নাদিয়া চমকে উঠে তাকাল ডেসপিনার দিকে। তার মুখ লাল হয়ে উঠেছে।
হাসল ডেসপিনা। বলল, কিছু মনে করোনা নাদিয়া, সালেহ বাহমন এখন কোথায়?
–এবাবে তোমার বলা ঠিক হয়নি ডেসপিনা। মুখ ভার করে বলল নাদিয়া।
একটু থেমেই আবার বলল নাদিয়া, আমিও তোমার চোখের অশ্রুতে একটা আলো দেখতে পেয়েছি।
–প্রতিশোধ নিচ্ছ ?
–প্রতিশোধ নয়, তোমার হৃদয় কি হাসান সেনজিকের জন্যে উম্মুখ হয়ে নেই ?
উত্তর দিল না ডেসপিনা।
মুহুর্তেই বদলে গেল তার মুখ। বিষাদের এক কালো ছায়া নামল সে মুখে। ধীরে ধীরে বলল, তোমার কথার প্রতিবাদ করব না নাদিয়া। কিন্তু কি জান, আমার দু’চোখ কোন দিন ওকে দেখেনি, দেখবেও কিনা জানিনা।
শেষের কথাগুলো যেন তার গলায় আটকে যাচ্ছিল।
নাদিয়া তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ পাল্টাবার জন্যে বলল, তোমার প্রশ্নের উত্তর দেয়া হয়নি ডেসপিনা। সালেহ বাহমন এখনও আমাদের বাসায়, উঠে বসার মত অবস্থা তার এখনও হয়নি।
ডেসপিনা রুমাল দিয়ে চোখ ভাল করে মুছে নিয়ে বলল, তাঁদের যে সংগঠনের কথা বললে সেটা কি শুধু বেলগ্রেডে, না গোটা দেশে?
–গোটা দেশে শুধু নয়, গোটা বলকানে ওরা কাজ শুরু করেছে।
–আলহামদুল্লিাহ। আমাদের সামনে শুধুই অন্ধকার ছিল, আলোর কোন রেশই ছিলনা, কোন অবলম্বনের চিন্তা করতেও আমরা ভুলে গেছি। আমার খালাম্মার শেষ আশা হয়তো পূরণ হবে না। ছেলেকে হয়তো তিনি দেখতে পাবেন না। উনি নিখোঁজ হবার দুঃসংবাদ আমরা তাকে দেইনি। তিনি সহ্য করতে পারবেন না।
নাদিয়া বলল, চিন্তা করো না ডেসপিনা, আল্লাহই আমাদের সাহায্য করবেন।
একটু থেমেই নাদিয়া আবার বলল, কিন্তু ডেসপিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে তোমার পরিচয় গোপন রেখেছ কেমন করে?
–আমি স্টিফেন পরিবারের পরিচিত বাড়ীগুলোর কোনটাতেই থাকি না। আমি জন্মের পর থেকে বাবা মার সাথে বুলগেরিয়ায় মানুষ হয়েছি। বেলগ্রেডে এসেও স্টিফেন পরিবার থেকে ভিন্ন বাড়ীতে বাস করেছি। মায়ের নামও খৃষ্টান নাম। আব্বাও খৃষ্টান নাম নিয়ে আমাদের থেকে ভিন্নভাবে ভিন্ন বাড়ীতে বাস করেন। সবাই এখানে জানে আমার পিতা নেই। মায়ের পরিচয়েই আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। রাতের অন্ধকারে আমরা আব্বার সাথে দেখা করি এবং পরিবারের অন্যান্যদের সাথে দেখা সাক্ষাত এভাবেই আমাদের হয়।
–কি দুঃসহ জীবন। বলল নাদিয়া।
একটু থেমে বলল আবার, ডেসপিনা আমাদের বাসায় যাবে, আব্বা আম্মা খুব খুশী হবেন স্টিফেন পরিবারের লোক পেলে।
–ঠিক আছে,একদিন যাব।
–আরেকটা কথা ডেসপিনা, তোমার নামটা ঠিক হয়নি। রাজা স্টিফেনের বোন সুলতান বায়েজিদের স্ত্রী লেডি ডেসপিনার নামে তোমার প্রকাশ্য নাম রাখা ঠিক হয়নি। ডেসপিনা জুনিয়র বলে আরও প্রকাশ করে দিচ্ছ সব।
–তুমি ঠিকই বলেছ নাদিয়া। কিন্তু আব্বা আম্মা এ নাম গোপন করতে রাজী নন। তারা এ নাম অত্যন্ত ভালবাসেন এবং এতে তারা সৌভাগ্যের প্রতীক বলে মনে করেন।
–এ নাম আমারও গর্ব ডেসপিনা। লেডি ডেসপিনা বলকানে যে পরিবর্তন একদিন এনেছিলেন, ডেসপিনা জুনিয়র সে পরিবর্তন আবার আনুন আমরা চাই।
আবেগে নাদিয়ার গলা কেঁপে গেল, তার চোখ দু’টি উজ্জল হয়ে উঠল।
–আমার নাম নিয়ে এভাবে বলো না নাদিয়া।
তোমার নাম নিয়ে বলছি না, তোমার নাম আমাদের এক স্বর্ণোজ্জল অতীতের প্রতীক। আমরা চাচ্ছি সেই অতীত আবার ফিরে আসুক।
এক সময় ঢং ঢং করে বারোটা বাজার শব্দ হলো দেয়াল ঘড়িতে। ১২ টা থেকে ৩ টা পর্যন্ত লাইব্রেরীর বিরতির সময়।
ডেসপিনা এবং নাদিয়া দু’জনেই ওঠে দাঁড়াল লাইব্রেরী থেকে বেরুবার জন্যে।
