মাইকেল পিটারের বাড়ি সার্চ করার সময় তখন দেখে গেছে, বাড়িতে মাত্র পিটারের স্ত্রী এবং সাত-আট বছরের একটি মেয়ে রয়েছে। গুলিগোলার শব্দে তারা ভীত ছিল। আহমদ মুসাদের দেখে তারা আতংকিত হয়ে পড়েছিল। তারা মাইকেল পিটারের মৃত্যুর খবর তখনও জানতো না। আহমদ মুসা দরজায় নক করতেই দরজা খুলে দিয়েছিল।
মাইকেল পিটারের স্ত্রী পঁচিশ-ত্রিশ বছরের একজন মহিলা। ভদ্র-নির্দোষ চেহারা। দরজা খুলে দিয়ে আহমদ মুসাকে দেখেই আঁতকে উঠেছিল। ভযে চোখ তার বড় বড় হয়ে উঠেছিল। চিৎকার করার শক্তিও সে হারিয়ে ফেলেছিল।
আহমদ মুসা খুব শান্ত, নরম কণ্ঠে বলেছিল, বোন, আপনার কোন ভয় নেই। শত্রুতা আমাদের মাইকেল পিটারের সাথে। আপনি যদি শত্রুতা না করেন, আপনার বিন্দু পরিমাণ ক্ষতি হবে না।
আহমদ মুসার কথা শুনে মেয়েটি বোধ হয় সাহস ফিরে পেয়েছিল। বলেছিল, পিটার কোথায়, কেমন আছে?
আহমদ মুসা মাথা নিচু করে বলেছিল, বোন, আপনার জন্যে কোন সুসংবাদ আমাদের কাছে নেই।
মেয়েটি এ কথা শুনে একটা চিৎকার করেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল।
চিৎকার শুনে পিটারের মেয়েও বাড়ির ভেতর থেকে ছুটে এসেছিল। মা’কে ঐভাবে দেখে সেও চিৎকার করে কেঁদে উঠেছিল।
সোফিয়া পিটারের স্ত্রীর জ্ঞান ফিরাবার চেষ্টা করছিল।
আহমদ মুসা ক্রন্দনরত বালিকাটিকে কাছে টেনে সান্ত্বনা দিয়েছিল, তোমার মা’র এখনি জ্ঞান ফিরে আসবে মা, কেঁদো না। সব ঠিক হয়ে যাবে।
সব ঠিক হয়ে যাবে কথা বলেই আহমদ মুসার মনে অসহনীয় এক খোঁচা লেগেছিল। কি করে সব ঠিক হয়ে যাবে? ওর আব্বা কি আর কোন দিন ফিরে আসবে? যখন মেয়েটি তার পিতার কথা শুনবে তার কি অবস্থা হবে? তার চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল অসহনীয় দু:খ-কান্নায় ভেঙ্গে পড়া ছোট্ট এই বালিকার ছবি।
আহমদ মুসার চোখের কোণ ভিজে উঠেছিল।
ছোট মেয়েটি আহমদ মুসার দরদভরা সান্ত্বনা শুনে তার দিকে চেয়ে যেন একটু শান্ত হয়েছিল। প্রশ্ন করেছিল, তোমরা কে? তোমাদের তো দেখিনি!
আহমদ মুসা চোখের কোণ মুছে নিয়ে বলেছিল, তোমার আব্বার শত্রু আমরা মা! দেখবে কেমন করে?
–শত্রুদের তো রিভলভার থাকে। গুলি মারে। তোমাদের বন্দুক কই?
–শত্রু সবাইকে গুলি মারে না। শুধু শত্রুকেই মারে।
–তোমরা এসেছ কেন? আম্মার কি হয়েছে?
–আমরা তোমাদের বাড়িটা দেখব।
–কেন?
–এমনি, কেন দেখতে দেবে না?
–কেন দেব না, তুমি খুব ভাল।
এ সময় পিটারের স্ত্রীর জ্ঞান ফিরে এসেছিল।
আহমদ মুসা সালমানকে বলল, তুমি একে ভেতরে নিয়ে যাও।
তারপর বালিকাকে আদর করে বলল, তুমি তোমার এই চাচ্চুর সাথে ভেতরে যাও। আমরা আসছি তোমার মাকে নিয়ে।
বালিকাটি শান্তভাবে সালমান শামিলের সাথে ভেতরে চলে গিয়েছিল।
বালিকাকে ভেতরে পাঠিয়ে আহমদ মুসা পিটারের স্ত্রীর কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল।
জ্ঞান ফেরার পর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল পিটারের স্ত্রী।
আহমদ মুসা নরম, শান্ত কণ্ঠে পিটারের স্ত্রীকে বলেছিল, আমরা ককেশাস ক্রিসেন্টের লোক। কেন আমরা পিটারের শত্রু, কেন পিটার আমাদের শত্রু আপনি জানেন। আপনার দুঃখের সাথে আমরাও দুঃখবোধ করছি বোন, কিন্তু আপনি জানেন কি জন্যে কি হয়েছে। আপনি আমাদের শত্রু নন, সামান্য ক্ষতিও আপনার হবে না। আপনার সহযোগিতা চাই। আমরা শুধু পিটারের জিনিসপত্র সার্চ করতে চাই, যা আমাদের জন্যে অত্যন্ত প্রয়োজন। আপনি অনুমতি দিন।
পিটারের স্ত্রী চোখ মুছে বলেছিল, পিটার নেই, আমি পিটারের স্ত্রী। তার দায়িত্ব এখন আমার কাঁধে। পিটার থাকলে যা হতে দিত না, আমি তা হতে দেব কেন?
আহমদ মুসা বলেছিল, আপনার এই মতকে আমি শ্রদ্ধা করি। কিন্তু আমরা তো সার্চ করতে চাই। তাহলে কি হবে এখন?
–কেন, পিটারকে যেভাবে হত্যা করেছেন, সেভাবে আমাদের মেরে ফেলে শুধু সার্চ করা কেন, সব কিছু নিয়ে যেতে পারেন।
–পিটারের মত আপনাদের কাছ থেকে আঘাত এলে কিংবা আপনারা শত্রু হয়ে দাঁড়ালে আমরা তাও করতে পারি। কিন্তু আপনাদের ঐ নির্দোষ, নির্মল বালিকা কখনোই শত্রু হতে পারে না। ওরা অবধ্য।
–আঘাত দেবার শক্তি আমাদের নেই, কিন্তু মুখ দিয়ে, ঘৃণা দিয়ে প্রতিরোধ আমরা করতে পারি।
–সেটা পারেন বোন। পিটারের স্ত্রী হিসেবে এ অধিকার আপনার আছে। কিন্তু এ অধিকারের জন্যে আমরা তো আপনাদের হত্যা করতে পারি না।
অত্যন্ত নরম কণ্ঠে বলেছিল আহমদ মুসা।
একটু থেমে আহমদ মুসা বলেছিল, আমি আপনার মেয়েকে শত্রু বলেই পরিচয় দিয়েছি। কিন্তু তবু সে বাড়ি দেখাতে সম্মত হয়েছে। সার্চ করার সময় আপনি আমাদের সাথে থাকুন আমরা চাই।
আমি এখানেই থাকব। বলে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিল পিটারের স্ত্রী।
আহমদ মুসা মাথা নিচু করে বলেছিল, আমি দুঃখিত মিসেস পিটার। আমাকে আমার দায়িত্ব পালন করতেই হবে।
বলে চলে গিয়েছিল আহমদ মুসা বাড়ির ভেতরে।
সোফিয়া বসে পিটারের স্ত্রীকে পাহারা দিয়েছিল। তার একটা হাত কাপড়ের ভেতর পিস্তলের বাঁটে ছিল। পিটারের বাড়ির বাইরের গেট বন্ধ ছিল। ভেতরে ঢুকার পরেই দরজা লাগিয়ে দেয়া হয়েছিল।
সার্চ করতে দশ মিনিটের বেশি লাগেনি।
সার্চ করে যখন বাইরে বেরিয়ে এসেছিল, তার সাথে এসেছিল পিটারের ছোট মেয়েটিও।
পিটারের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময় আহমদ মুসা পিটারের স্ত্রীকে বলেছিল, বোন, তোমরা সবদিক দিয়েই নিরাপদ থাকবে। তোমরা এখানেই থাকতে পারো। কিংবা অন্য কোথাও যেতে চাইলে আমরা পৌঁছে দেব। পিটারের যাবতীয় সম্পদ তোমারই থাকবে।
পিটারের স্ত্রী কিছু বলেনি। তার নত মুখটি একবার তুলেছিল। তাকাল আহমদ মুসার দিকে। চোখ দু’টি জলে ভরা।
পাশে দাঁড়ানো বালিকাই কথা বলেছিল, না চাচ্চু, আমরা কোথাও যাব না।
আহমদ মুসা বালিকাকে কাছে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বলেছিল, মা, আমরা যাই।
–তোমরা আবার কখন আসবে? আব্বা এলে আমি বলব।
বালিকার কথা শুনে আহমদ মুসা মুহূর্তের জন্যে আনমনা হয়ে গিয়েছিল। একসময় বালিকার দিকে চোখ ফিরিয়ে ধীর কণ্ঠে বলেছিল, তোমার আব্বা যদি না আসেন মা?
–না, এই তো আব্বা এখনি আসবেন।
–তোমার মত হাজারো বালক—বালিকার আব্বা ঘর থেকে বেরিয়ে আর ফিরে আসেনি। তোমার আব্বাও তো এমন হতে পারে?
–না না, তুমি জান না।
আহমদ মুসার চোখ দু’টি ভারি হয়ে উঠেছিল। বালিকাটির আস্থায় সে আর ঘা দিতে চাইল না।
আহমদ মুসা আসার জন্যে ঘুরে দাঁড়াতে দাঁড়াতে অনেকটা স্বগতঃ কণ্ঠেই বলেছিল, দুনিয়ার সব মানুষ যদি এই শিশুদের মত সরল-সহজ, সুন্দর হতো!
আহমদ মুসার কণ্ঠ ভারি হয়ে উঠেছিল। কথাগুলো বলতে বলতেই গেট দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল আহমদ মুসা।
