• আমাদের সম্পর্কে
  • যোগাযোগ
  • গোপনীয়তা নীতি
সোমবার, জুন 22, 2026
  • Login
BnBoi.Com
  • বাংলাদেশী লেখক
    • অতুলচন্দ্র গুপ্ত
    • অভিজিৎ রায়
    • আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    • আনিসুল হক
    • আবু ইসহাক
    • আবু রুশদ
    • আবুল আসাদ
    • আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন
    • আবুল বাশার
    • আরজ আলী মাতুব্বর
    • আল মাহমুদ
    • আসাদ চৌধুরী
    • আহমদ ছফা
    • আহমদ শরীফ
    • ইমদাদুল হক মিলন
    • উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    • কাসেম বিন আবুবাকার
    • জসীম উদ্দীন
    • তসলিমা নাসরিন
    • দাউদ হায়দার
    • দীনেশচন্দ্র সেন
    • নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    • নিমাই ভট্টাচার্য
    • প্রফুল্ল রায়
    • প্রমথ চৌধুরী
    • ময়ূখ চৌধুরী
    • মহাদেব সাহা
    • মাহমুদুল হক
    • মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    • হুমায়ূন আহমেদ
  • ইন্ডিয়ান লেখক
    • অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়
    • অতুল সুর
    • অদ্রীশ বর্ধন
    • অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    • অনীশ দেব
    • অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    • অমিয়ভূষণ মজুমদার
    • আশাপূর্ণা দেবী
    • আশুতোষ মুখোপাধ্যায়
    • ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    • কাজী নজরুল ইসলাম
    • ক্ষিতিমোহন সেন
    • তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    • তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়
    • দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    • নারায়ণ সান্যাল
    • নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    • নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    • পাঁচকড়ি দে
    • পূর্ণেন্দু পত্রী
    • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    • বিমল মিত্র
    • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    • হেমেন্দ্রকুমার রায়
  • বিভাগসমূহ
    • আত্মজীবনী
    • ইতিহাস
    • উপন্যাস
    • কবিতা
    • কল্পকাহিনী
    • কাব্যগ্রন্থ
    • খেলাধুলার বই
    • গল্পের বই
    • গোয়েন্দা কাহিনী
    • ছোট গল্প
    • জীবনী
    • দর্শন
    • ধর্মীয় বই
    • নাটকের বই
    • প্রবন্ধ
    • বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী
    • বৈজ্ঞানিক বই
    • ভূতের গল্প
    • মুক্তিযুদ্ধের-বই
    • রহস্যময় গল্পের বই
    • রোমাঞ্চকর গল্প
    • রোম্যান্টিক গল্পের বই
    • শিক্ষামূলক বই
    • সমগ্র
  • সিরিজ বই
    • মিসির আলী সমগ্র
    • হিমু সিরিজ
No Result
View All Result
  • বাংলাদেশী লেখক
    • অতুলচন্দ্র গুপ্ত
    • অভিজিৎ রায়
    • আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    • আনিসুল হক
    • আবু ইসহাক
    • আবু রুশদ
    • আবুল আসাদ
    • আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন
    • আবুল বাশার
    • আরজ আলী মাতুব্বর
    • আল মাহমুদ
    • আসাদ চৌধুরী
    • আহমদ ছফা
    • আহমদ শরীফ
    • ইমদাদুল হক মিলন
    • উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    • কাসেম বিন আবুবাকার
    • জসীম উদ্দীন
    • তসলিমা নাসরিন
    • দাউদ হায়দার
    • দীনেশচন্দ্র সেন
    • নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    • নিমাই ভট্টাচার্য
    • প্রফুল্ল রায়
    • প্রমথ চৌধুরী
    • ময়ূখ চৌধুরী
    • মহাদেব সাহা
    • মাহমুদুল হক
    • মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    • হুমায়ূন আহমেদ
  • ইন্ডিয়ান লেখক
    • অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়
    • অতুল সুর
    • অদ্রীশ বর্ধন
    • অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    • অনীশ দেব
    • অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    • অমিয়ভূষণ মজুমদার
    • আশাপূর্ণা দেবী
    • আশুতোষ মুখোপাধ্যায়
    • ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    • কাজী নজরুল ইসলাম
    • ক্ষিতিমোহন সেন
    • তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    • তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়
    • দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    • নারায়ণ সান্যাল
    • নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    • নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    • পাঁচকড়ি দে
    • পূর্ণেন্দু পত্রী
    • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    • বিমল মিত্র
    • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    • হেমেন্দ্রকুমার রায়
  • বিভাগসমূহ
    • আত্মজীবনী
    • ইতিহাস
    • উপন্যাস
    • কবিতা
    • কল্পকাহিনী
    • কাব্যগ্রন্থ
    • খেলাধুলার বই
    • গল্পের বই
    • গোয়েন্দা কাহিনী
    • ছোট গল্প
    • জীবনী
    • দর্শন
    • ধর্মীয় বই
    • নাটকের বই
    • প্রবন্ধ
    • বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী
    • বৈজ্ঞানিক বই
    • ভূতের গল্প
    • মুক্তিযুদ্ধের-বই
    • রহস্যময় গল্পের বই
    • রোমাঞ্চকর গল্প
    • রোম্যান্টিক গল্পের বই
    • শিক্ষামূলক বই
    • সমগ্র
  • সিরিজ বই
    • মিসির আলী সমগ্র
    • হিমু সিরিজ
No Result
View All Result
BnBoi.Com
No Result
View All Result

সাইমুম সিরিজ – আবুল আসাদ

আহমদ মুসা দরজার নব ঘুরিয়ে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল।
দরজা থেকে গাড়ি বারান্দার সবটাই দেখা যায়। সামনে তাকাতে গিয়ে আহমদ মুসার দৃষ্টি এমনিতেই জীপের দিকে গেল। জীপের দিকে চাইতেই দেখতে পেল, সেই এ্যাটেনডেন্ট জীপ থেকে নামছে। আহমদ মুসা জীপের দরজা বন্ধ করে আসেনি।
দৃশ্যটা দেখে চমকে উঠল আহমদ মুসা। মনে পড়ল আসার সময় দেখা এ্যাটেনডেন্টের সেই কুঞ্চিত কপাল এবং চমকে ওঠা চোখের কথা। কৌতুহলবশতঃ খোলা জীপে ওঠা অস্বাভাবিক হয়তো নয়। কিন্তু কুঞ্চিত কপাল এবং চমকে ওঠা চোখের সাথে এটা যোগ করলে ঘটনা তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। হঠাৎ আহমদ মুসার মনে পড়ল, এখান থেকে বেরিয়ে গেটে গিয়েই তো সালমান শামিল কিডন্যাপ হয়েছে। সালমান শামিলের এখানে আসার খবর কে হোয়াইট ওলফকে দিয়েছিল? যে দিয়েছিল সে কি এই এ্যাটেনডেন্ট হতে পারে না? এ্যাটেনডেন্ট হোয়াইট ওলফের কেউ, না চর? সে কি আহমদ মুসাকে চিনতে পেরেছে? চিনতে পারার জন্যেই কি চমকে ওঠা এবং কপাল কুঞ্চিত হওয়া? হোয়াইট ওলফ তার ফটো সব জায়গায় তো পৌঁছাতেই পারে।
মাথা নিচু করে চিন্তা করছিল আহমদ মুসা। সে মনে করল ডঃ পল জনসনকে সব কথা বলেই আসা দরকার।

আহমদ মুসা ফিরে দাঁড়াল। দরজার নব ঘুরিয়ে প্রবেশ করল ঘরে।
দরজা খোলার শব্দে মুখ তুলল ডঃ পল জনসন।
আহমদ মুসা বলল, আসব জনাব?
এস। ডঃ জনসনের চোখে কিছুটা চাঞ্চল্য। আহমদ মুসা এসে বসতেই জিজ্ঞাসা করল, জরুরি কিছু নিশ্চয়?
আপনার এ্যাটেনডেন্ট কেমন?
পুরানো এবং বিশ্বস্ত।
আমার সন্দেহ মিথ্যা না হলে সে হোয়াইট ওলফের লোক অথবা চর।
কি বলছ তুমি?
মনে হয় আমার সন্দেহে ভুল নেই।
সন্দেহের কিছু ঘটেছে?
কিছু ঘটেছে। আমার আরও ধারণা হচ্ছে, সালমান শামিল এখানে আসার খবর সেই হোয়াইট ওলফকে জানিয়েছিল।
তুমি এটা মনে কর?
বলে একটু থেমেই আবার সে শুরু করল, হতে পারে। ওরা সকলেরই মাথা খারাপ করেছে। সে আর বাদ থাকবে কেন।
ও কোথায় থাকে জনাব?
সরেজমিনে সন্ধান করে আরও নিশ্চিত হতে চাও বুঝি? মুখে একটুকরো হাসি।
জ্বি।
এ প্রশাসনিক ভবনের দক্ষিণ পাশে অধ্যাপকদের কোয়ার্টার। এর দক্ষিণ পাশের কোয়ার্টারগুলোতে কর্মচারীরা থাকে। ও থাকে একতলার ২১ নম্বর কোয়ার্টারে।
আপনার বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার একটা ম্যাপ দিয়ে আমাকে সাহায্য করতে পারেন?
‘অবশ্যই’ বলে ডঃ পল জনসন পাশের ড্রয়ার থেকে একটি ছাপানো পুস্তিকা এগিয়ে দিল। বলল, এর মধ্যে ম্যাপ এবং সব তথ্য পাবে।
আহমদ মুসা পুস্তিকাটির পাতা উল্টাল। মাঝখানে দু’পাতা ব্যাপী বিরাট স্কেচম্যাপ। একবার নজর বুলিয়ে নিয়ে বন্ধ করল। বলল, উঠি জনাব।
ডঃ জনসনের কাছে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এল আহমদ মুসা। এবার দেখল, এ্যাটেনডেন্ট বারান্দায় সিঁড়ির মুখে তার নির্দিষ্ট জায়গায় বসে আছে।
আহমদ মুসা কাছে যেতেই উঠে দাঁড়াল। তার চোখটা নিচু। আহমদ মুসা মনে মনে হাসল। গিয়ে গাড়িতে উঠল।
এক্সপ্লোসিভ ডিটেকটর বের করে গাড়িটা একবার পরীক্ষা করল। না, সেরকম কিছু নেই। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দেখল ঠিক আছে, কম্পিউটার-আই গ্রীন সিগন্যাল দিচ্ছে। তাহলে সে গাড়িতে উঠেছিল কেন? কোন কাগজ-পত্রের সন্ধানে? সে কি সন্দেহ করেছে, না চিনতে পেরেছে? মনে হয় গেটে গেলেই এর উত্তর পাওয়া যাবে। সে চল্লিশ মিনিট কথা বলেছে ডঃ পল জনসনের সাথে। চিনতে পেরে থাকলে খবর দিয়ে এই সময়ের মধ্যে সব আয়োজন করে ফেলা সম্ভব।
আহমদ মুসা গাড়িতে স্টার্ট দিল।
ডঃ পল জনসনের অফিস থেকে সামনের রাস্তা সেন্ট জনপল রোডের দূরত্ব প্রায় ৪শ’ গজের মত। মাঝখানে ছোট আঁকা-বাঁকা রাস্তা, বাগান আর গাছের সারি। এই দূরত্বের মাঝ বরাবর জায়গায় একটা চৌমাথা। এখান থেকে একটা রাস্তা উত্তর দিকে ক্লাস বিল্ডিং এর দিকে, আরেকটা দক্ষিণ দিকে স্টাফ কোয়ার্টারের দিকে গেছে। একটা রাস্তা এডমিনিস্ট্রেটিভ বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে এসে মিশেছে চৌরাস্তায়। চৌরাস্তা থেকে চতুর্থ রাস্তাটি সোজা পূর্বদিকে বেরিয়ে, পরে দক্ষিণ দিকে একটু টার্ন নিয়ে গেট পেরিয়ে সেন্ট জনপল রোডে গিয়ে পড়েছে।
রাত তখন ৮টা।
আহমদ মুসার জীপ চত্ত্বরের সেই চৌরাস্তার কাছাকাছি আসতেই আহমদ মুসা দেখতে পেল, চৌরাস্তার ডান পাশে দু’জন লোক মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলছে। একজন পূর্বমুখী, একজন পশ্চিমমুখী। পশ্চিমজনের চোখ জীপের হেডলাইটের দিকে। ওদের দু’জনের গায়েই ওভারকোট। মাথায় হ্যাট। ওদের পশ্চিমমুখী জনের ওভারকোটের নিচের পকেট থেকে বেরিয়ে আসা ধূসর নলটিকে ওয়াকি টকির নল বলেই আহমদ মুসার মনে হল।
আহমদ মুসার মন ছ্যাঁত করে উঠল। ওরা কি গেটের মূল বাহিনীর অগ্রবাহিনী? তাহলে ওরা জাল পেতেছে?
আহমদ মুসা তার জীপ একেবারে লোকটির গা ঘেঁষে দাঁড় করাল। ওরা প্রথমটায় আঁতকে উঠে এক ধাপ পিছিয়ে গেল। কিন্তু তারপরেই আবার স্থির হলো। ওদের হাত ওভারকোটের পকেটে।
আহমদ মুসা পাশ থেকে তার এম-১০ রিভালভারটি তুলে নিয়ে ওদের ডাকল। ওরা দু’জনেই কাছে এল।
আহমদ মুসার এম-১০ রিভলভারের নলটা গাড়ি দরজার আড়াল থেকে বেরিয়ে ওদের মুখোমুখি হলো।
আহমদ মুসা দ্রুত বলল, দেখ আমি অযথা খুনো-খুনি পছন্দ করি না। তোমাদের দু’জনের রিভলভার এবং ওয়াকি টকি দু’টো আমাকে—-
আহমদ মুসার কথা শেষ হবার আগেই বিদ্যুৎ বেগে ওদের হাত কোটের পকেট থেকে বেরিয়ে এল। কাল চকচকে রিভলভার। কিন্তু তাদের রিভলভারের নল আহমদ মুসা পর্যন্ত উঠে আসার আগেই আহমদ মুসার সচেতন, ক্ষিপ্র তর্জনী এম-১০-এর ট্রিগারে চেপে বসল। নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল মেশিন পিস্তলের এক ঝাঁক গুলি। সাইলেন্সার লাগানো ছিল, একটুও শব্দ হলো না। লাশ দু’টিও নিঃশব্দে রাস্তার পাশে ছোট সুন্দর ফুলগাছগুলোর উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল।
এ সময় উত্তর দিক থেকে ছুটে আসা পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। আহমদ মুসা মুখ সরিয়ে দেখল, চৌমাথার ওপার থেকে দু’জন ছুটে আসছে। তাদেরও পকেটে হাত। আহমদ মুসা ওদের হাতে পিস্তল না দেখে বুঝল, গুলির শব্দ ওরা পায় নি, সাথীদের পরিণতিও জানতে পারে নি। জীপ দাঁড় করিয়ে সাথীদের সাথে কি করছে সেই খবর বোধহয় নিতে আসছে ওরা।
ওরা জীপের কাছাকাছি আসতেই আহমদ মুসা জীপের জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলল, দেখ আমি তোমাদের কিছুই বলব না, তোমাদের পকেটের রিভলভার এবং ওয়াকি টকি ঐ পেছন দিকে বাগানে ছুঁড়ে ফেলে দাও। আমি চলে———
এবারও আহমদ মুসার কথা শেষ করতে ওরা দিল না। বিদ্যুৎ গতিতে ওরা পা পেছনে ছুঁড়ে দিয়ে উপুড় হয়ে মাটিতে শুয়ে পড়ল। আর সঙ্গে সঙ্গেই দু’টি গুলি ছুটে এল। ওরা অদ্ভুত কায়দায় শুয়ে পড়তে পড়তেই রিভলভার বের করে পজিশন করে নিয়েছিল। ওদের একটা গুলি দরজার ডান পাশের উপরের কোণটায় গিয়ে আঘাত করল। আরেকটা গুলি ৪৫ ডিগ্রি এ্যাংগেলে জানালা দিয়ে প্রবেশ করে গাড়ির ভেতরে ছাদে গিয়ে বিদ্ধ হলো। আহমদ মুসা সিটের সাথে সেঁটে না থাকলে গুলিটা আহমদ মুসার মাথার উপরের অংশ উড়িয়ে দিত।
আহমদ মুসার এম-১০ থেকেও সঙ্গে সঙ্গে গুলি বৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু তারা শুয়ে পড়ার ফলে প্রথম দিকের গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। কিন্তু তার পরেই এম-১০ এর নল নিচে নেমে যায়। ঝাঁঝরা হয়ে যায় ওদের শুয়ে পড়া দেহ।
আহমদ মুসা দ্রুত জীপের মুখ ঘুরিয়ে নিল। স্টাফ কোয়ার্টারের দিকে। সোজা গেট দিয়ে বেরুতে গিয়ে নতুন হাঙ্গামায় সে পড়তে চায় না। তার সময়ের মূল্য অনেক। এখন তার লক্ষ্য সোফিয়া এ্যাঞ্জেলার বাড়ি। এদের সাথে শক্তি পরীক্ষার সময় সামনে আসছে।
আহমদ মুসা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাপে চোখ বুলাতে গিয়ে দেখেছিল, স্টাফ কোয়ার্টারমুখী রাস্তা দিয়ে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে সেন্ট জনপল রোডে পড়ার আগে আরও দু’টো গেট পাওয়া যাবে।
আহমদ মুসার জীপ তীর বেগে এগিয়ে চলল স্টাফ কোয়ার্টারের রাস্তা ধরে দক্ষিণ দিকে।
আহমদ মুসা গিয়ার চেঞ্জ করার সময় গিয়ারের পাশে রিভলভারের পোড়া বুলেট পড়ে থাকতে দেখল। উপরে তাকাল আহমদ মুসা। যে বুলেটটা গাড়ির ছাদে আঘাত করেছিল, সেটাই নিচে পড়েছে। লোক দু’টির অদ্ভুত ক্ষিপ্রতার কথা আহমদ মুসার মনে পড়ল। আহমদ মুসা মনে মনে হোয়াইট ওলফের ট্রেনিং এবং তাদের নিষ্ঠার প্রশংসা করল। কোন পরিস্থিতিতেই ওরা আক্রমণ থেকে পিছপা হয় না, এমনকি মৃত্যুকে অবধারিত জেনেও। মৃত্যুর আগে যেটুকুই সময় পায়, ওরা কাজে লাগায়। সত্যিই ওরা ভয়ংকর।
একেবারে সর্ব দক্ষিণের কর্মচারী কোয়ার্টার বরাবর গেট দিয়ে সেন্ট জনপল রোডে পড়ে দক্ষিণ দিকে বাঁক নেয়ার সময় একবার চকিতে উত্তর দিকে প্রশাসনিক ভবনের সম্মুখস্থ গেটের দিকে আহমদ মুসা চাইল। দেখল, সেখানে সেই মুহূর্তে তিনটি গাড়ির ছয়টি হেডলাইট জ্বলে উঠল। ছুটে আসছে ওরা।
আহমদ মুসা গিয়ার চেঞ্জ করে, পা দিয়ে একসেলেটর চেপে ধরল। দৃঢ় হাতে খামচে ধরল স্টিয়ারিং হুইল। লাফিয়ে উঠল জীপ। দেখতে দেখতে স্পিডোমিটারের কাঁটা ১২০ এ গিয়ে উঠল।
তুলনামূলকভাবে জনবিরল সেন্ট জনপল রোড রাতে আরও জনবিরল হয়ে উঠেছে। ঝড়ের বেগে এগিয়ে চলেছে আহমদ মুসার জীপ।
সামনেই মোড়। গ্রীন সিগন্যাল দেখা যাচ্ছে। আহমদ মুসা প্রার্থনা করল, গ্রীন সিগন্যালটা যেন আর বিশ-পঁচিশ সেকেন্ড থাকে।
ভাগ্য ভাল। আহমদ মুসা যখন সিগন্যাল ক্রস করল ঠিক তখনি হলুদ সিগন্যাল জ্বলে উঠেছে। হাফ ছেড়ে বাঁচল আহমদ মুসা। রেড সিগন্যালের বাঁধার সম্মুখীন ওরা হবে।
আহমদ মুসার সামনে ইয়েরেভেনের রোডম্যাপ খোলা ছিল।
সে মোড় পার হয়েই সেন্ট জনপল রোড ছেড়ে দিয়ে একটা গলির মধ্যে ঢুকে গেল। গলিটি দিয়ে শামিউন এভেনিউতে পড়া যাবে। শামিউন এভেনিউ দিয়ে কিছু এগিয়ে আরেকটা লেন পাওয়া যাবে। সে লেন দিয়ে এগোলে সংক্ষেপেই ভিক্টোরী রোডে পৌঁছা যায়। এ রোডেরই দক্ষিণ মাথায় ভিক্টোরী স্কোয়ার।
আহমদ মুসা লেনে প্রবেশ করে কিছুটা এগিয়ে একটা অন্ধকার মত স্থানে জীপ দাঁড় করাল। তারপর দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে গাড়ির নাম্বার প্লেট পাল্টে দিল। আহমদ মুসা ভয় করছিল হোয়াইট ওলফরা ওয়্যারলেসে আহমদ মুসার জীপের নাম্বার সব জায়গায় পৌঁছে দিতে পারে। পুলিশও তাদের সহযোগী।
গাড়িতে উঠে আবার গাড়ি স্টার্ট দিল আহমদ মুসা। তাড়াহুড়া নেই। একটু ধীর গতিতেই এগিয়ে চলল আহমদ মুসার জীপ।
আহমদ মুসার জীপ যখন সোফিয়া এ্যাঞ্জেলাদের ফটকে গিয়ে পৌঁছল তখন রাত ৮টা ২৫মিনিট।
গেটের সামনে গাড়ি দাঁড়াতে দেখে দারোয়ান গেট না খুলে গাড়ির কাছে এল।
দারোয়ানের লম্বা-চওড়া, পরিশ্রমলব্ধ পেটা শরীর। মুখটি প্রসন্ন নয়। গাড়ির জানালার কাছে এসে আহমদ মুসাকে জিজ্ঞাসা করল, কাকে চাই?
সোফিয়া এ্যাঞ্জেলার সাথে দেখা করতে চাই।
দারোয়ান সঙ্গে সঙ্গে কোন উত্তর দিলনা। মুখটা যেন তার আরো মলিন হয়ে উঠল। বলল সে, সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা নেই।
মাথা নিচু করে কথাটা বলল দারোয়ান।
দারোয়ানের এই ভাবান্তর আহমদ মুসার নজর এড়াল না। আহমদ মুসা আবার প্রশ্ন করল, কখন ফিরবে সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা, কখন এলে দেখা পাব?
আমি জানি না।
কালকে আসি, তুমি সোফিয়াকে বলো।
কালকে দেখা পাবেন তা বলতে পারবো না।
কেন?
দারোয়ান কোন উত্তর দিল না। তার মুখ নিচু।
এ সময় দোতলার ব্যালকনি থেকে একটা নারী কণ্ঠ ধ্বনিত হলো, ডেভিড ওকে আসতে দাও। নিচের ড্রইংরুমে নিয়ে এস।
আহমদ মুসা মুখ তুলে উপরে তাকাল। দেখল, সাদা গাউন পরা একজন মহিলা ব্যালকনি থেকে ঘরে ঢুকে গেল।
দারোয়ান গেট খুলে দিল। আহমদ মুসা গাড়ি বারান্দায় নিয়ে গাড়ি দাঁড় করাল।
দারোয়ান গেট বন্ধ করে এসে আহমদ মুসাকে ড্রইংরুমে পৌঁছে দিল।
বিশাল ড্রইংরুম। সোফায় সাজানো। পশ্চিম দেয়ালের মাঝামাঝি জায়গায় শ্বেত পাথরের একটা মূর্তি। আহমদ মুসা চিনল, মূর্তিটা আর্মেনীয় খৃস্টানদের জাতীয় বীর শামিউনের।
মূর্তির পদতলেই সিংহাসন আকৃতির একটা চেয়ার। আহমদ মুসা বুঝল, চেয়ারটায় জর্জ সাইমন বসেন।
আহমদ মুসা চেয়ারটার বাম পাশের সোফায় গিয়ে বসল।
আহমদ মুসা ভাবল, সোফিয়া বাড়িতে নেই, কেন তাহলে তাকে ভিতরে আসতে বলল? কে তার সাথে কথা বলবে? জর্জ সাইমন কি? না ঐ মহিলা? মহিলাটি কে?
আবার ভাবল আহমদ মুসা, তাকে চিনতে পারেনি তো! চিনতে পেরেই কি আসতে বলেছে?
আহমদ মুসা তার ফুল লোড এম-১০ মেশিন রিভলভার একবার স্পর্শ করল।
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না।
চেয়ারটির বাঁ পাশেই দরজা।
দরজা দিয়ে ধীর পদক্ষেপে প্রবেশ করল একজন মহিলা। একহারা, মাঝ বয়সী। সুন্দর, অভিজাত চেহারা। সবকিছু মিলিয়ে মাতৃসুলভ একটা ভঙ্গি। কিন্তু মুখ ম্লান, চেহারা জুড়ে বেদনার একটা কাল ছায়া। চোখের দৃষ্টি উদাস। আহমদ মুসার মনে পড়ল, দারোয়ানের মধ্যেও এই বিষণ্ণতাই সে দেখেছে।
মহিলাটি বড় চেয়ারটিতে না বসে আহমদ মুসার পাশের সোফায় এসে বসল।
হাঁটা বসার মধ্যে তার নিঃসংকোচ কিন্তু শান্ত ও সংযত ভঙ্গি।
মহিলাটি বসেই বলল, আমি সোফিয়ার মা।
আপনি সোফিয়ার খোঁজ করছিলেন?
জ্বি হ্যাঁ, বলল আহমদ মুসা।
আপনার পরিচয়?
আহমদ মুসা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। একটু ভাবল। বলল, আমি সালমান শামিলের ভাই।
মহিলাটি চোখ তুলে আহমদ মুসার দিকে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। বলল, আমি সোফিয়ার কাছে শুনেছি, সালমান শামিলের কোন ভাই-বোন নেই।
আমি সালমান শামিলের বিশ্বাসের ভাই। আহমদ মুসার মুখে হাসি।
সোফিয়াকে আপনার কেন প্রয়োজন?
আহমদ মুসা উত্তর দেবার আগে এবারও ভাবল। ভেবে নিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল, আপনি জানেন সালমান শামিলকে অপহরণ করা হয়েছে। আমরা তার উদ্ধারের চেষ্টা করছি। কিন্তু সামনে এগোবার মত সূত্র আমরা পাচ্ছি না। আমি যতদূর জানি সোফিয়া সালমানের বন্ধু ছিল এবং অপহৃত হবার আগে সোফিয়ার সাথে সালমানের কথাও হয়েছে। আমরা চাইছিলাম, সোফিয়া আমাদের কোন সাহায্য করতে পারে কি না।
আহমদ মুসা থামলেও সোফিয়ার মা সংগে সংগে কথা বলতে পারল না। তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়াচ্ছিল।
আহমদ মুসা এই অভাবিত অবস্থায় পড়ে বিব্রত বোধ করতে লাগল। সে বিস্মিত হলো। এমন দৃশ্য সে এখানে আশা করেনি।
সোফিয়ার মা রুমালে মুখ মুছে নিয়ে বলল, সালমান শামিলের অপহরণ আমারও সর্বনাশ করেছে।
বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল সোফিয়ার মা।
আহমদ মুসা কি বলবে, কি সান্ত্বনা দেবে তা ভেবে পেল না। তবে বুঝল, বড় ধরনের কিছু ঘটেছে। উদ্বিগ্ন হলো আহমদ মুসা।
দু’হাতে মুখ ঢেকে কাঁদছিল সোফিয়ার মা।
কিছু পর মুখ তুলল। চোখ মুছে আবার বলতে শুরু করল, যেদিন সালমান শামিল অপহৃত হয়, সেদিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরে মা আমার সারা দিন কেঁদেছে, কিছু খায়নি। রাত দশটায় ওর আব্বা বাইরে যায়। ওর আব্বা বাইরে যাওয়ার পর পরই সে কিছু না বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। আজ তিন দিন কেউ ফিরে আসেনি।
কান্না রোধ করতে দু’হাতে মুখ ঢাকল সোফিয়ার মা।
কোথাও সন্ধান করেছেন, পুলিশ কিছু করতে পারেনি? দ্রুত কন্ঠে জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা।
সন্ধান করে কোন লাভ নেই, পুলিশ কিছুই করতে পারবে না। রুমালে চোখ মুছে শান্ত হবার চেষ্টা করে বলল সোফিয়ার মা।
কেন লাভ নেই? পুলিশ কোন কিছু করতে পারবে না? বিস্মিত কন্ঠে বলল আহমদ মুসা।
সোফিয়ার মা কোন উত্তর দিল না।
আহমদ মুসা বুঝল, সোফিয়ার মা প্রশ্নটির উত্তর দিতে চাচ্ছে না অথবা দ্বিধা করছে। তবু আহমদ মুসা আবার জিজ্ঞেস করল, আপনি কি জানেন তারা কোথায় গেছে কিংবা তাদের কি হয়েছে?
আমাকে জিজ্ঞেস করবেন না।
এটা কি আপনি মনে করেন যে, সালমান শামিলকে যারা অপহরণ করেছে, তারাই ওদেরও আটকেছে?
তাই মনে করি।
ওরা কি এক সাথে গেছে?
না। সোফিয়ার আব্বা প্রতি বৃহস্পতিবারে রাত দশটায় এভাবে যান।
সোফিয়া কি ওর আব্বাকে অনুসরণ করেছে বলে মনে করেন?
সোফিয়ার মা আহমদ মুসার দিকে পরিপূর্ণ দৃষ্টি মেলে বলল, আমি তা মনে করিনি। এমন কি ঘটতে পারে?
সোফিয়া কখন বেরিয়েছে, ওর আব্বার পরেই কি?
প্রায় সংগে সংগেই। ওর আব্বার গাড়ি রাস্তায় পড়লে, সোফিয়ার গাড়ি গেট দিয়ে বেরিয়েছে।
আমার মন বলছে, সোফিয়া তার আব্বাকে অনুসরণ করেছে এবং সোফিয়া সালমানের সন্ধানেই বের হয়।
আহমদ মুসা একটু থামল। তারপর বলল, একথা সত্য হলে এটাও সত্য বলে ধরে নিতে হবে যে, তার পিতাকে অনুসরণ করলে সালমানকে সন্ধান করার সুরাহা হবে, এটা সোফিয়া মনে করেছিল।
আহমদ মুসার শেষ কথাগুলো বেশ শক্ত শোনাল।
একটু থেমে আহমদ মুসাই আবার শুরু করল, দয়া করে বলবেন, প্রতি বৃহস্পতিবার রাত দশটায় সোফিয়ার আব্বা কোথায় যেতেন?
কোন উত্তর দিল না সোফিয়ার মা। তার মুখে একটা ভয়ের চিহ্ন ফুটে উঠল।
আহমদ মুসা বুঝল, সোফিয়ার মা কিছু বলতে ভয় করছে। তার ভয় দূর করার জন্যে আহমদ মুসা বলল, আপনি সোফিয়ার মা, আমারও মায়ের মত। কোন কথা বলতে দ্বিধা করবেন না, আপনার ভয় নেই। সবকিছু জানলে হয়ত আমি আপনাকেও সাহায্য করতে পারব, আমাদেরও উপকার হবে।
পারবে না বাবা। ওরা জানতে পারলে তুমিও বিপদে পড়বে, তুমিও হারিয়ে যাবে।
আহমদ মুসা এক মুহূর্ত চিন্তা করল। তারপর পকেট থেকে এম-১০ মেশিন রিভলভার বের করে সোফিয়ার মা’র কাছে ধরে বলল, দেখুন, রিভলভার এখনও গরম আছে, এখনও এতে বারুদের গন্ধ লেগে আছে। কিছুক্ষণ আগেই এ রিভলভার ওদের একটা ফাঁদ গুড়িয়ে দিয়েছে। আপনি বিশ্বাস করুন, আমরা পারব।
সোফিয়ার মা’র চোখে প্রবল ভয় ও আশংকার চিহ্ন ফুটে উঠল। সে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়েছিল আহমদ মুসার দিকে। বলল সে ধীরে ধীরে, তুমি ওদের চেন, জান ওদের কত শক্তি?
হোয়াইট ওলফকে চিনি, ওদের শক্তি সম্পর্কেও জানি।
ভয় করো না ওদের?
না।
পিস্তল গরম থাকার কথা বলছ, কোথায় লড়াই করে এলে ওদের সাথে?
সালমান সম্পর্কে জানার জন্যে ডঃ পল জনসনের কাছে গিয়েছিলাম। সালমানের মত করেই আমাকে ধরার জন্যে ওরা ফাঁদ পেতেছিল। ফাঁদ ছিড়ে গেছে। ওদের মধ্যে চারজন সেখানে লাশ হয়ে পড়ে আছে।
কি বলছ তুমি? প্রায় আর্তনাদ করে উঠল সোফিয়ার মার কণ্ঠ।
আমি বলছি ওরা অজেয় নয়, ওদের ভয়ের কিছু নেই।
তুমি একা পারবে?
আমি একা নই। অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার লোক তৈরি আছে।
সোফিয়ার মা মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ ভাবল। বলল, আমি বেশি কিছু জানি না, জানার চেষ্টা করাও অপরাধ ছিল। সোফিয়ার আব্বা প্রতি বৃহস্পতিবার রাত দশটায় কোথায় যেত আমি কোনদিন জিজ্ঞেস করিনি। তবে গাড়ির মিটার থেকে বুঝেছি জায়গাটা এখান থেকে তেত্রিশ-চৌত্রিশ মাইল দুরে। নাম জানতাম না জায়গাটার। কিন্তু আমার কৌতুহল ছিল। আমার স্বামীর চরিত্র সম্পর্কে আমার কোন সন্দেহ ছিল না, তবুও আশংকা মনে জাগতো যে, কেন তিনি রাতেই শুধু সেখানে যান! এক বৃহস্পতিবার অসুস্থ থাকায় তিনি যেতে পারলেন না। যেতে পারবেন না-একথা জানাবার জন্যে তিনি টেলিফোন করলেন। আমি পাশেই বসেছিলাম। নাম্বারটা মনে মনে আমি মুখস্ত করলাম। তারপর কৌতুহল চাপতে না পেরে একদিন সেখানে টেলিফোন করেই বসলাম। আমার লক্ষ্য ছিল জায়গাটার নাম জানা। টেলিফোন করার পর ওপার থেকে ‘হ্যালো’ বলতেই আমি বললাম, এটা কি ‘জেগার্ড মনেস্টারী?’ জেগার্ড মন্দির ইয়েরেভেন থেকে ৩৮ কিলোমিটার দুরে। ওপার থেকে সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর এল, না আমবার্ড দুর্গ। জায়গাটার নাম আমি এভাবে জানতে পারি। কেন ঐ দিন নিয়মিত ওখানে তিনি যান, তা জানতে পারিনি। তবে সেখান থেকে ফিরে আসার বিভিন্ন সময় থেকে বুঝেছি সেখানে বিভিন্ন মেয়াদের মিটিং সিটিং হয়ে থাকে।
আহমদ মুসার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, আপনাকে ধন্যবাদ। এই তথ্যে আমাদের অনেক উপকার হবে।
একটু থেমে আহমদ মুসা আবার জিজ্ঞাসা করল, সোফিয়া তার পিতার এসব কি জানে? জানে কি সে, তার পিতা হোয়াইট ওলফের সাথে আছেন?
জানার কথা নয়। তবে বুদ্ধিমতী মেয়ে নিশ্চয় কিছু আঁচ করেছে।
আহমদ মুসা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, আমি আপনাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। বলে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
সোফিয়ার মাও উঠে দাঁড়াল। বলল, বাবা তোমার এ দুঃখিনী মা কি কিছু আশা করতে পারে?
আল্লাহ ভরসা। নিশ্চয় আশা করতে পারেন আম্মা।
ঈশ্বর তোমাদের সফল করুন।
আহমদ মুসা আসার জন্য ফিরে দাঁড়িয়েছিল।
সোফিয়ার মা বলে উঠল, আচ্ছা বল তো, তোমার নামটাই তো জানা হয়নি।
আহমদ মুসা ফিরে দাঁড়াল আবার। বলল, আমি আহমদ মুসা।
নাম শুনে কপাল কুঞ্চিত হলো সোফিয়ার মা’র। বলল, এক আহমদ মুসার কাহিনী পড়েছি পত্রিকায়। ফিলিস্তিন, মিন্দানাও এবং মধ্য এশিয়া বিপ্লবের নায়ক সে। সে নওতো তুমি?
জ্বি, আমি সেই। নরম, বিনীত কণ্ঠ আহমদ মুসার।
শুনেই সোফিয়ার মা ধপ করে বসে পড়ল সোফায়। বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকল আহমদ মুসার দিকে।
‘আচ্ছা চলি’ বলে ঘুরে দাঁড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল আহমদ মুসা।
সোফিয়ার মা বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে নেবার আগেই আহমদ মুসা বেরিয়ে গেল। কিছু বলার আর সুযোগ হলো না। তবে আহমদ মুসার গমন পথের দিকে চেয়ে থাকা সোফিয়ার মা’র বিস্ময়-বিমূঢ় চোখে একটা আশার আলোও চিক চিক করে উঠতে দেখা গেল।
আহমদ মুসা বেরিয়ে এসে দেখল, দারোয়ান গেটের গার্ডরুমের দরজায় চুপচাপ বসে আছে। গেট বন্ধ। গাড়ির দরজা খুলে উঁকি মেরে দেখল, সব ঠিক-ঠাক আছে, এমনকি সিটের উপর রেখে যাওয়া ভুয়া টেলিফোন নাম্বারের স্লিপ পর্যন্ত যেভাবে রেখে গিয়েছিল সেভাবেই আছে।
আহমদ মুসা গাড়িতে উঠতেই দারোয়ান গেট খুলে দিল।
গেট দিয়ে বেরিয়ে রাস্তায় পড়ার আগে চারদিকে একবার তাকিয়ে নিল আহমদ মুসা, না, কোন মানুষ কিংবা কোন গাড়ি অপেক্ষা করে নেই। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত ৯টা। আহমদ মুসা ভাবল, আমবার্ড দুর্গের যে ঠিকানা পাওয়া গেছে তাতেই চলে কি না? ডঃ জনসনের এ্যাটেনডেন্টের ওখানে ঢুঁ দেয়ার দরকার আছে কি না? কিন্তু চিন্তা করল, তারা যা খুঁজছে আমবার্ড দুর্গ তা নাও হতে পারে, সেটা নিছকই এক ঐতিহাসিক পবিত্র গীর্জা মাত্র। সুতরাং কোন সুযোগ হাতছাড়া না করে সবগুলো বাজিয়ে দেখা দরকার।
আহমদ মুসার জীপ তখন ছুটে চলছিল ওসমান এফেন্দীর বাড়ির দিকে। আলী আজিমভ ও ওসমান এফেন্দীকে নিয়ে যেতে হবে ডঃ পল জনসনের স্টাফ কোয়ার্টার অভিযানে।
রাত পৌনে বারটায় আহমদ মুসাদের জীপটি ডঃ পল জনসনের ইনস্টিটিউটের সীমানার কাছাকাছি পৌঁছল। আর গজ পঞ্চাশেক গেলেই স্টাফ কোয়ার্টারে প্রবেশের গেট পাওয়া যাবে।
আহমদ মুসা গাড়িটা সেখানেই থামাতে বলল। গাড়ি থামলে আহমদ মুসা আলী আজিমভকে নিয়ে নেমে গেল। ড্রাইভিং সিটে বসা ওসমান এফেন্দীকে লক্ষ্য করে বলল, তুমি ঠিক বারোটায় গাড়ি ২১নং স্টাফ কোয়ার্টারের সামনে নিয়ে আসবে।
আহমদ মুসা ও আলী আজিমভ দু’জনেই সেন্ট জন পল রোডের ফুটপাত ধরে হাঁটতে শুরু করল।
দু’জনেরই কাল ট্রাউজারের উপর কাল ওভারকোট। আহমদ মুসার মাথায় ফেল্ট হ্যাট কপাল পর্যন্ত নামানো। আলী আজিমভের মাথায় উলের টুপি। দু’জনেরই দু’হাত ওভারকোটের পকেটে। জনমানব শূন্য রাস্তা। মাঝে মাঝে দু’একটা গাড়ি তীরবেগে ছুটে যাচ্ছে।
আহমদ মুসা ও আলী আজিমভ স্টাফ কোয়ার্টারগামী রাস্তার মুখে গিয়ে মুহূর্তের জন্যে দাঁড়াল। দেখল, রাস্তা একদম ফাঁকা। সম্ভবতঃ আজ সন্ধ্যার এ ঘটনার পর কিছুটা অস্বাভাবিক ফাঁকা অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে এ এলাকায়।
স্টাফ কোয়ার্টারের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে লাগল আহমদ মুসা এবং আলী আজিমভ।
স্টাফ কোয়ার্টারগুলো পূর্ব-পশ্চিমে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো। দক্ষিণের শেষ সারির পশ্চিমের শেষ বাড়িটা ডঃ পল জনসনের এ্যাটেনডেন্ট আলফ্রেডের।
অনেকখানি এগিয়েছে এমন সময় তারা পশ্চিম দিক থেকে একটা গাড়ি ছুটে আসতে দেখল। আলফ্রেডের বাড়ির দিক থেকেই আসছে গাড়িটা।
আহমদ মুসা ও আলী আজিমভ রাস্তার বামপাশ দিয়ে হাঁটছিল। গাড়িটা পঞ্চাশ গজের মধ্যে এসে পড়েছে। হেডলাইটের চোখ ধাঁধানো আলো তাদের প্লাবিত করেছে।
গাড়িটায় একটা ছোট হাফ ক্যারিয়ার।
গাড়িটা যখন পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিল, তখন আহমদ মুসার দৃষ্টি হঠাৎ গিয়ে পড়ল খোলা ক্যারিয়ারের উপর। দেখল, ক্যারিয়ারের মেঝেতে হাত-পা বাঁধা একজন লোক। মুখও তার কাপড় দিয়ে বাঁধা। উঠে বসার চেষ্টা করছে।
আহমদ মুসা সংগে সংগেই ঘুরে দাঁড়াল এবং কোটের পকেট থেকে তার হাত এম-১০ সহ বেরিয়ে এল একই সাথে। উঁচু হল এম-১০ এর মাথা গাড়ির চাকা লক্ষ্য করে।
গাড়িটি তখন মাত্র কয়েকগজ সামনে এগিয়েছিল। এম-১০ এর এক ঝাঁক গুলি গিয়ে ছেঁকে ধরল পেছনের দক্ষিণ পাশের চাকাটিকে। সাইলেনসার লাগানো রিভলভার কোন শব্দ তুলল না, কিন্তু টায়ার ফাটার বিকট শব্দ চারদিকের নীরবতাকে উচ্চকিত করে তুলল।
গাড়িটা খোঁড়াতে খোঁড়াতে আরও কয়েকগজ সামনে এগিয়ে ডান দিকে বেঁকে গিয়ে দক্ষিণমুখো হয়ে থেমে গেল।
থামবার আগেই দু’জন লোক এদিকের গেট দিয়ে রাস্তায় লাফিয়ে পড়ল। তাদের হাতে রিভলভার।
আহমদ মুসার এম-১০ তার মাথা উঁচু করেই ছিল। এবং ট্রিগারেও তর্জনী নির্দেশ পালনের জন্যে প্রস্তুত হয়ে ছিল। আহমদ মুসা যখন দেখল লোক দু’টির রিভলভার উঁচু হচ্ছে, তখন তর্জনী চেপে বসল ট্রিগারে। আবার একটানা এক শীষ উঠল এম-১০ থেকে। বেরিয়ে গেল আর এক ঝাঁক গুলি।
লোক দু’টির রিভলভার আর উঁচু হলো না। ঝরে পড়ল তারা মাটিতে।
আহমদ মুসা এবং আলী আজিমভ দ্রুত এগিয়ে গেল গাড়িটির ক্যারিয়ারের দিকে। আলী আজিমভ লাফিয়ে উঠল ক্যারিয়ারে।
ক্যারিয়ারে বাঁধা অবস্থায় পড়ে থাকা লোকটি উঠে বসেছিল। তার চোখ দু’টি বিস্ফারিত। কাঁপছিল সে।
আলী আজিমভ তার মুখ ও হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দিল।
আহমদ মুসা লোকটির উপর চোখ পড়তেই বিস্মিত হলো। একি! এ যে ডঃ পল জনসনের এ্যাটেনডেন্ট আলফ্রেড!
রাস্তার আলোতে চারদিকে সবকিছু মোটামুটি স্বচ্ছ দেখাচ্ছিল।
আহমদ মুসা মাথার হ্যাট খুলে বলল, আলফ্রেড তুমি এখানে, এভাবে?
আলফ্রেড আহমদ মুসার দিকে ভালো করে চেয়েই ভীষণভাবে চমকে উঠল, তার মুখ ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। কাঁপতে লাগল সে।
পরমুহূর্তে ক্যারিয়ার থেকে লাফিয়ে পড়ে আহমদ মুসার পা জড়িয়ে ধরল এবং ডুকরে কেঁদে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমাকে মাফ করে দিন, আমার স্যারকে বাঁচান, আমার স্যারকে ওরা মেরে ফেলবে।
আহমদ মুসা তাকে হাত ধরে টেনে তুলল। বলল, তুমি কি বলছ বুঝতে পারছি না। কি হয়েছে বুঝিয়ে বল।
আলফ্রেড একটু থেমে কাঁপতে কাঁপতে বলল, স্যার, প্রাণের ভয়ে ওদের হুকুম তামিল করেছি, সালমান শামিল স্যারকে ধরিয়ে দিয়েছি। তা না করলে বেটি-বাচ্চাসমেত আমাকে ওরা মেরে ফেলত। এখন ওরা আমার বড় স্যারের গায়েও হাত তুলেছে। আপনি তাকে বাঁচান, আপনি তাকে…….
বলে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
আহমদ মুসা ধমকে উঠে বলল, খবরদার কাঁদবে না, বলছি কি হয়েছে বল।
আলফ্রেড চুপ করল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, আপনাকে ধরতে না পারায় ওরা ভয়ানক ক্ষেপে গেছে। ওদের মিটিং-এ আজ রায় হয়েছে, আপনাদের সাথে ডঃ স্যারের যোগসাজশ আছে। এবং আজই তাকে কিডন্যাপ করা, শাস্তি দেয়া এবং হত্যা করার সিদ্ধান্ত ওরা নিয়েছে।
–ডঃ স্যার কে? ডঃ পল জনসন?
–হ্যাঁ। বলল আলফ্রেড।
–কিন্তু তোমাকে ওরা কিডন্যাপ করছিল কেন?
–স্যার সম্পর্কিত সিদ্ধান্তটা আমি জানতে পেরেছিলাম এবং তাকে বাঁচাবার পক্ষে কথা বলেছিলাম এই অপরাধে।
–কোথায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল?
–ওদের উত্তর ইয়েরেভেন ঘাঁটিতে।
প্রশ্নের উত্তর দিয়েই আলফ্রেড বলল, স্যার ওদের যতটুকু জানি আমি সব বলব, কিন্তু ডঃ স্যারকে এখন বাঁচান।
–কোথায় তিনি?
–ওর বাসায়। কিন্তু ওরা এতক্ষণে গেছে ওর বাসায়। রাত ১২টায় ওর বাসায় আজ ওরা হামলা চালাবে।
আহমদ মুসা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত ঠিক বারটা।
এই সময় ওসমান এফেন্দীর গাড়ি হাফ ক্যারিয়ারের ওপারে এসে থামল।
আহমদ মুসা ওসমান এফে্ন্দীকে লক্ষ্য করে বলল, ওসমান গাড়ি ওখানেই লক করে চলে এস।
তারপর আলফ্রেডকে সামনে রেখে ওরা ডঃ পল জনসনের বাড়ি লক্ষ্যে দ্রুত হাঁটতে শুরু করল।
আলফ্রেডের পাশেই হাঁটছিল আহমদ মুসা। হাঁটতে হাঁটতে বলল, হোয়াইট ওলফের হেডকোয়ার্টার কোথায় জান?
–জানি না, তবে শুনেছি ইয়েরেভেন থেকে পূর্বদিকে আরাগাত পাহাড়ের দিকে কোথায় যেন।
–সালমান শামিলের কোন খবর জান?
–এটুকু জানি তাকে মেরে ফেলেনি, তাকে খাদ্য-পানি না দিয়ে ধীরে ধীরে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
হৃদয়টা কেঁপে উঠল আহমদ মুসার। কত ক্রুর, কত নৃশংস এই হোয়াইট ওলফ! তবু এই ভেবে আহমদ মুসা আনন্দিত হল যে, সালমান বেঁচে আছে।
–তাকে কোথায় রেখেছে?
–শুনেছি, হেডকোয়ার্টারেই ওদের বন্দীখানা।
প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে আহমদ মুসা জিজ্ঞাসা করল, ডঃ পল জনসনের বাড়িতে কে কে থাকেন?
–তিনি, তার স্ত্রী এবং তার এক মেয়ে। তার ছেলে উচ্চশিক্ষার জন্যে আমেরিকায় আছে।
–দারোয়ান?
–জ্বি, গেটে একজন দারোয়ান আছে।
বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে থমকে দাঁড়াল আলফ্রেড। বাংলোর দিকে ইংগিত করে বলল, ডঃ পল জনসনের বাড়ি।
বাড়ির চারদিকে বাগান। বুক পরিমাণ উঁচু প্রাচীরে ঘেরা। বাড়ির সামনে প্রাচীরের সাথে একটা গেটরুম। গেটে ইস্পাতের একটা দরজা। দরজা পেরুলে পাথর বিছানো রাস্তা গাড়ি বারান্দা পর্যন্ত উঠে গেছে।
আহমদ মুসারা দেখতে পেল গেটটি খোলা। খোলা গেট দিয়ে ঢুকল ওরা। গেটরুমে উঁকি দিয়ে দেখল, দারোয়ান বেঘোরে ঘুমুচ্ছে। বুঝল, হোয়াইট ওলফের লোকেরা তাহলে প্রথমে প্রাচীর টপকে প্রবেশ করে দরজা খুলে দিয়েছে।
আহমদ মুসা ওসমান এফেন্দীর দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি আলফ্রেডকে নিয়ে এখানে অপেক্ষা কর।
বলে আহমদ মুসা এবং আলী আজিমভ সামনে এগোবার উদ্যোগ দিতেই আলফ্রেড বলল, ওরা কমপক্ষে পাঁচজন, আপনারা মাত্র দু’জন…..
ওসমান এফেন্দী ওকে থামিয়ে দিল।
আহমদ মুসা ওর দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, তুমি কেমন করে বুঝলে কমপক্ষে পাঁচজন ওরা এসেছে?
–স্যার, যে কোন অপারেশনে কমপক্ষে পাঁচজন ওরা যায়।
‘ধন্যবাদ’ বলে আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়াল।
আহমদ মুসা এবং আলী আজিমভ বাগানের মধ্যে সেই পাথর বিছানো রাস্তা ধরে বাংলোর দিকে এগোতে থাকল। দুজনেরই হাত ওভারকোটের পকেটে।
আহমদ মুসা এবং আলী আজিমভ গাড়ি বারান্দায় পৌঁছে দেখল, সামনের বড় দরজাটি খোলা।
তারা সিঁড়ি ভেঙ্গে বারান্দায় উঠতেই নারী কণ্ঠের কান্না শুনতে পেল।
খোলা দরজা দিয়ে আহমদ মুসা ও আলী আজিমভ ভেতরে প্রবেশ করল। বিরাট হলরুম। কার্পেটে মোড়া। সোফাসেট দিয়ে সাজানো।
হলরুমটি পেরিয়ে তারা একটা করিডোরে প্রবেশ করল। করিডোরের মাথায় গিয়ে একটা দরজা পেল। দরজাটা খোলা। দরজার ওপার থেকে কান্নার শব্দ আসছে।
আহমদ মুসা বেড়ালের মত নিঃশব্দে এগিয়ে দরজা দিয়ে উঁকি দিল। বিরাট ঘর। মনে হল ডঃ পল জনসনের শোবার ঘর।
মেঝেয় পড়ে একজন মহিলা কাঁদছে। মাঝ বয়েসী। মনে হল ডঃ পল জনসনের স্ত্রী। ডঃ পল জনসন বাইরে বেরুবার মত পোশাকে প্রস্তুত। তার মুখ স্বাভাবিক। দুয়ারের একপাশে তিনজন স্টেনগান উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দু’জন ঘরের বিভিন্ন জায়গা সার্চ করছে। মনে হয় সার্চ শেষ হয়েছে। ওদের মধ্যেকার লিডার টাইপের লোকটি ডঃ পল জনসনকে লক্ষ্য করে বলল, চল ডক্টর।
ডঃ পল জনসন সঙ্গে সঙ্গেই যাবার জন্যে পা বাড়াল। মহিলাটি কাঁদতে কাঁদতে ছুটে দিয়ে এবার লিডার টাইপ লোকটির সামনে হাত জোড় করে দাঁড়ালো। বলল, তোমরা ওকে নিয়ে যেও না, ওর কোন দোষ নেই, উনি কোন দোষ করেননি।
ডঃ পল জনসন থমকে দাঁড়িয়ে মহিলাটিকে উদ্দেশ্য করে বলল, নিরর্থক অপমানজনক কোন আবেদন করে নিজেকে আর ছোট কর না ইভা, ধৈর্য্য ধর।
বলে ডঃ পল জনসন সামনে পা বাড়াতে চাইছিল। এমন সময় পাশের দরজা দিয়ে ছুটে এল একটি মেয়ে। ‘আব্বা’ বলে চিৎকার করে জড়িয়ে ধরল ডঃ পল জনসনকে। কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে সে বলতে লাগল, আব্বা তোমাকে যেতে দেব না। তোমাকে নিয়ে যেতে পারবে না।
মেয়েটির বয়স উনিশ-বিশ বছর। ডঃ পল জনসনের একমাত্র মেয়ে। নাম মারিয়া জনসন। ইয়েরেভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী।
ডঃ পল জনসন মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, তোমরা ধৈর্য্য ধর, সবাইকেই তো একদিন যেতে হবে। দুনিয়ার–
ডঃ পল জনসনের কথা শেষ হবার আগেই সেই লিডার টাইপের লোকটা মারিয়ার একটা হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টানে মারিয়াকে সরিয়ে নিয়ে বলল, আমরা নাটক করতে আসিনি, সময় আমাদের মূল্যবান।
ক্রন্দনরত মারিয়া এবার লিডার লোকটার পায়ে গিয়ে পড়ল। বলল, তোমরা আমার আব্বাকে নিয়ে যেও না।
লিডার লোকটা সুন্দরী মারিয়ার দিকে একবার তাকাল। তার চোখটা যেন চক্ চক্ করে উঠল। সে ডঃ পল জনসনকে লক্ষ্য করে বলল, ডঃ, মেয়েটা তোমার খাসা, আমাদের দিয়ে দাও, তোমার অনেক পাপ মোচন হবে।
ডঃ পল জনসনের শান্ত চোখটি এবার আগুনের মত জ্বলে উঠল। গর্জে উঠল, অমানুষ কুকুর, মুখ সামলে কথা বল।
লিডার লোকটি হো হো করে হেসে উঠল। তারপর মুখ কঠিন করে ক্রুর হেসে বলল, কুকুর আমি, বেশ তাহলে কুকুরের ব্যবহার একবার দেখ ডক্টর।
বলে সে মারিয়াকে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
ডঃ পল জনসন বিদ্যুৎ গতিতে কয়েক পা এগিয়ে গেল। তারপর প্রচন্ড এক লাথি মারল লোকটির মুখে।
ছিটকে পড়ল লোকটি। পড়েই আবার উঠে বসল। তার নাক থেকে গল গল করে রক্ত বেরুচ্ছে। ঠোঁট দু’টিও থেতলে গেছে। তার চোখ দু’টি ভাটার মত জ্বলছে।
উঠে বসেই সে পকেট থেকে রিভলভার বের করে তাক করল ডঃ পল জনসনের দিকে।
আহমদ মুসার ডান হাতে এম-১০ রিভলভার। লিডার লোকটিকে রিভলভার বের করতে দেখেই কি ঘটতে যাচ্ছে বুঝতে পারল আহমদ মুসা। দ্রুত সে বাম হাতে পকেট থেকে ছোট কোল্ট রিভলভার বের করে নিল। লোকটির রিভলভারের নল ডঃ পল জনসনের উপর স্থির হবার আগেই আহমদ মুসার ক্ষুদ্র কোল্টটি অগ্নি উদগিরণ করল।
গুলি ঠিক তার মাথায় গিয়ে আঘাত করল। লোকটি নিঃশব্দে ঢলে পড়ে গেল মাটিতে।
গুলি করেই আহমদ মুসা ঘরে ঢুকে স্টেনগানধারী তিনজনের দিকে এম-১০ এর বাঘা নল তাক করল।
গুলির শব্দ শুনে ওরা তিনজনও এদিকে ফিরে দাঁড়িয়েছিল।
আহমদ মুসা শান্ত কণ্ঠে ওদের বলল, দেখ রক্তপাত আমি পছন্দ করি না। তোমরা স্টেনগান ফেলে দাও, তোমাদের কিছু বলা হবে না।
বেপরোয়া লোক তিনটি যেন আহমদ মুসার কথা শুনতেই পায়নি। ভয়েরও কোন চিহ্ন তাদের চোখে নেই, বরং সেখানে হিংসার এক প্রচন্ড আগুন। দ্রুত ওদের স্টেনগান ওপরে উঠে এল। নল তিনটি আহমদ মুসার সমান্তরালে উঠে আসছে।
কিন্তু আহমদ মুসা সে সুযোগ তাদের দিল না। কয়েক সেকেন্ডের জন্যে সে চেপে ধরলো এম-১০ এর ট্রিগার। ছুটে গেল এক পশলা গুলি।
পাশাপাশি দাঁড়ানো গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া তিন জনের দেহ ঢলে পড়ল মেঝেতে।
এদিকে লিডার লোকটি গুলি খাওয়ার সংগে সংগেই তার ওপাশে অল্প কিছুদূরে দাঁড়ানো ৫ম লোকটি রিভলভার বের করেছিল। বিদ্যুৎ গতিতে তা উঠে আসছিল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে। আহমদ মুসার লক্ষ্য তখন সামনেই বাম পাশে দাঁড়ানো স্টেনগানধারী তিনজনের দিকে।
৫ম ঐ লোকটির দিকে নজর রাখছিল আলী আজিমভ। যখন সে দেখল লোকটি আহমদ মুসাকে টার্গেট করেছে, আলী আজিমভ তাকে আর সময় দিল না। পিস্তল তৈরি ছিল, শুধু ট্রিগারে চাপ দিতে হল। গুলি সরাসরি গিয়ে তার মাথায় আঘাত করল। দেহ তার ছিটকে পড়ে গেল মাটিতে।
মারিয়া গিয়ে তার পিতাকে জড়িয়ে ধরেছিল। আতংকে সে পিতার বুকে মুখ লুকিয়েছিল। আর ডঃ পল জনসনের স্ত্রী ভয়ে-আতংকে যেন পাথর হয়ে গেছে। ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টি তার। নড়াচড়া, এমনকি কথা বলার শক্তিও যেন হারিয়ে ফেলেছে।
ডঃ পল জনসন অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল আহমদ মুসার দিকে। গলা শুনেই আহমদ মুসাকে চিনতে পেরেছিল। কৃতজ্ঞতায় অন্তর তার ভরে উঠেছিল। সে ভেবে পাচ্ছিল না কিভাবে এটা ঘটল।
আহমদ মুসা দুই রিভলভার দুই পকেটে রেখে মাথার হ্যাট খুলে বলল, আপনার সামনে, আপনার ঘরে রক্তারক্তির জন্যে আমি দুঃখিত জনাব। এড়ানোর উপায় ছিল না, ওদের না মেরে বাঁচা কঠিন।
–দুঃখ পরে করো। এখন বল, এ সময় তোমরা কেমন করে এসে পৌঁছলে? এখনও সবটা ব্যাপার আমার কাছে স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে।
–আমরা এসেছিলাম আলফ্রেডের কাছ থেকে তথ্য আদায়ের জন্যে, দরকার হলে তাকে কিডন্যাপ করতে। কিন্তু রাস্তায় দেখলাম, তাকেই হোয়াইট ওলফরা কিডন্যাপ করে নিয়ে যাচ্ছে। তাকে আমরা উদ্ধার করলাম। তার কাছ থেকেই জানলাম আপনার উপর এ বিপদ এসেছে। তারপর তাকে সঙ্গে নিয়েই আমরা এখানে এসেছি।
–আমার কি মনে হচ্ছে জান, ঈশ্বর যেন সাক্ষাৎ নেমে এসেছেন।
–‌আল্লাহ যাকে সাহায্য করেন এভাবেই করেন।
–কিন্তু দুঃখ, সবখানে সবাই এ সাহায্য পায় না।
–যেখানে পায় না, সেটাও আল্লাহর বিশ্ব-পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ঘটে।
–তুমি কি বুঝাতে চাচ্ছ?
–আমি বলতে চাচ্ছি, আল্লাহ যেখানে সাহায্য করেন সেখানে যেমন তার একটা মঙ্গল ইচ্ছা থাকে, তেমনি যেখানে সাহায্য করেন না, সেখানেও তার মাধ্যমে তিনি মঙ্গলকরই কিছু করতে চান।
–কিন্তু সালমান শামিলকে ঐ নরপশুদের হাতে তুলে দেবার মধ্যে মঙ্গলকর কি আছে?
–হয়তো এর মাধ্যমে আল্লাহ হোয়াইট ওলফের ধ্বংসের ব্যবস্থা করেছেন।
–তুমি একজন বিপ্লবী, দার্শনিকের মত এমন ঠান্ডা চিন্তা তুমি করতে পারো কেমন করে?
–ইসলাম ধর্মে বিপ্লবী, দার্শনিক, ধর্মনেতা, রাষ্ট্রনেতা ইত্যাদির জন্যে আলাদা আলাদা কোন অবস্থান নেই। একজন মুসলমান একই সাথে বিপ্লবী, দার্শনিক, ধর্মনেতা, রাষ্ট্রনেতা-সবই হতে পারে। আমাদের নবী তা-ই ছিলেন। এটাই তাঁর শিক্ষা।
–সালমান শামিলের চরিত্র আমাকে দুর্বল করেছে, তুমি আমাকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছ। আমার মনে এ বিশ্বাস যেন দৃঢ় হয়ে যাচ্ছে, ইসলামই একমাত্র পরিপূর্ণ ধর্ম এবং ইসলামই একমাত্র সময়ের সব দাবি পূরণ করতে পারে।
বলে ডঃ পল জনসন মেয়ে মারিয়া এবং স্ত্রী ইভার দিকে ফিরে বলল, তোমাদের পরিচয় করিয়ে দেইনি।
এরা সালমান শামিলের ভাই।
আহমদ মুসাকে দেখিয়ে তিনি বললেন, আর ইনি আহমদ মুসা, যার নাম তোমরা খবরের কাগজে পড়েছ। সেই বিপ্লবী পুরুষ ইনি।
মেয়ে মারিয়া এবং স্ত্রী ইভা অবাক বিস্ময়ের সাথে আহমদ মুসার কথা শুনছিল। তাদের চোখের পানি শুকিয়ে গিয়েছিল।
ডঃ পল জনসন থামলে তার স্ত্রী ইভা জনসন আহমদ মুসার কাছে এসে বলল, বাবা ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন, তুমি আমাদের জীবন-মান বাঁচিয়েছ। বলে কেঁদে উঠলো ইভা জনসন। দু’হাতে মুখ ঢাকল সে।
–আল্লাহরই সব প্রশংসা আম্মা। শক্তি, সুযোগ তিনিই দিয়েছেন।
মারিয়া আহমদ মুসার দিকে চেয়ে বলল, আমি আপনার কথা পড়েছি।
–কোথায় পড়েছ? ঈষৎ হেসে জিজ্ঞাসা করল আহমদ মুসা।
–‘ফ্র’ এবং ‘ক্লু ক্ল্যাকস ক্ল্যান’ দু’টো বই বের করেছে। দু’টোরই বিষয় ‘ইসলামের ভয়ংকর পুনরুজ্জীবন প্রবণতা’। সেখানে আপনার কথা বিস্তারিত আছে। বই দু’টিকে ইতিহাসের রেফারেন্স তালিকায় শামিল করা হয়েছে।
–ইসলামের বিরুদ্ধে, আমার বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াবার জন্যেই তো?
–কাউকে গালি দিতে হলে তাকে গালি দেয়ার মত বড় করে তুলতে হয় এবং তা করতে গিয়ে ঘৃণা ছড়াবার সাথে সাথে প্রশংসা ছড়াবার কাজও হয়ে যায়।
–বাঃ বোন! তোমার খুব বুদ্ধি! তোমার সাথে তো আরও কথা বলতে হবে।
কথাটা শেষ করেই আহমদ মুসা ডঃ পল জনসনের দিকে ফিরে বলল, জনাব, আপনি এখন কি করবেন মনে করছেন?
–আমি এখন আমার সহকর্মী সবাইকে ডাকব। তারপর পুলিশে খবর দেব। তাদের বলব, এরা আমাকে কিডন্যাপ করতে এসেছিল। এ সময় আরেকটা গ্রুপ এসে আমাদের বাঁচায় এবং তারপরেই তারা চলে যায়।
আহমদ মুসার মুখে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। বলল, আপনার চিন্তা ঠিক জনাব। ঘটনার এই ব্যাখ্যাই আমার মনে হয় স্বাভাবিক।
একটু থেমে আবার বলল, আপনারা কি এখানেই থাকবেন?
–হ্যাঁ, কেন? বলল ডঃ পল জনসন।
–আমার মনে হয় এখানে থাকা আপনাদের উচিত হবে না। অন্তত আগামী কয়েকদিন।
ডঃ পল জনসন মাথা নিচু করেছিল। ভাবছিল সে। বলল, তুমি ভয় করছ, ওরা আবার আসবে?
–জ্বি।
–তোমার ধারণা ঠিক। ঠিক আছে, আমার এক নিকটাত্মীয় দু’দিন হলো ইয়েরেভেনে এসেছে। তাকে কেউ এখনো চেনে নি। আমরা সেখানেই ক’দিন গিয়ে থাকতে পারবো।
এই সময় আলফ্রেড এসে ঘরে প্রবেশ করল। ঘরে চোখ পড়তেই সে আঁতকে উঠল। ভয়ে তার মুখ পাংশু হয়ে উঠল। শুকনো গলায় ডঃ পল জনসনকে লক্ষ্য করে বলল, আপনারা সব ঠিক তো স্যার?
–ঠিক আছি। তোমাকে ধন্যবাদ আলফ্রেড। তুমি——
–না স্যার, প্রশংসা এদের। এরা আমাকে বাঁচিয়েছেন, আপনাদেরকেও।
আলফ্রেড ডঃ জনসনের কথায় বাঁধা দিয়েই কথা কয়টি দ্রুত বলল। তারপর একটু থেমে ঢোক গিলে নিয়ে বলল, হোয়াইট ওলফের পক্ষে গোয়েন্দাগিরী করে যে পাপ করেছি তার কি হবে! বলে কেঁদে ফেলল আলফ্রেড।
–কেঁদো না আলফ্রেড। তোমার পাপ মোচন তুমিই করেছ। বলল ডঃ পল জনসন।
চোখ মুছে আলফ্রেড ডঃ পল জনসনের দিকে তাকিয়ে বলল, বাইরে আশপাশ থেকে কয়েকজন স্যার এসেছেন।
–তাই? দেখছি।
বলে যাওয়ার উদ্যোগ নিল ডঃ জনসন।
আহমদ মুসা বলল, তাহলে আমরা আসি জনাব।
ডঃ পল জনসন একটু থমকে দাঁড়াল। তারপর বলল, যাবে তোমরা? হ্যাঁ যেতেই তো হবে।
বলে মেয়েকে বলল, মারিয়া তোমাদের ভাইদের পেছনের দরজা দিয়ে রাস্তায় তুলে দিয়ে এস।
তারপর আহমদ মুসার মুখোমুখি হয়ে তার একটি হাত ধরে বলল, দেখা সাক্ষাত কবে কোথায় কিভাবে হবে বৎস?
একটু চিন্তা করে আহমদ মুসা বলল, সোফিয়া এ্যাঞ্জেলার মাকে বললেই আমি জানতে পারব।
–ওখানে কিছু পেলে?
–না, সোফিয়া এং তার আব্বা দু’জনেই কয়েকদিন ধরে নিখোঁজ।
‘কি বলছ, ওরাও নেই’ বলেই ডঃ পল জনসন হঠাৎ নীরব এবং পাথরের মত স্থির হয়ে গেল।
‘আসি জনাব’ বলে বেরিয়ে আসতে আসতে আহমদ মুসা আলফ্রেডকে বলল, ওসমান এফেন্দীকে গাড়ির কাছে পাঠিয়ে দাও।
মারিয়া জনসন আগে আগে চলছিল। পেছনে আহমদ মুসা এবং আলী আজিমভ।
তিনজনই নীরব। এক সময় নীরবতা ভেঙ্গে মারিয়া বলল, আচ্ছা ভাইজান, একটা প্রশ্ন করব।
–কর। বলল আহমদ মুসা।
–এই যে আব্বা বললেন, ইসলামই একমাত্র পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। এ দাবি তো সব ধর্মই করবে। তাহলে এ ঝগড়ার সমাধান কি? সেটা কি লড়াই?
–না, জ্ঞানার্জন। সৃষ্টি-প্রকৃতি ও বিশ্বব্যবস্থা সম্পকে জ্ঞানার্জন করতে হবে এবং সেই সাথে নিরপেক্ষভাবে সত্যের সন্ধান করতে হবে। তাহলে বুঝা যাবে, শেষ নবীর মাধ্যমে প্রেরিত ধর্ম ইসলামই মানবতার সর্বশেষ এবং পরিপূর্ণ জীবন-বিধান।
এক জায়গায় মারিয়া থমকে দাঁড়াল। বলল, এসে গেছি ভাইজান। এই তো রাস্তা।
আহমদ মুসা রাস্তায় উঠে বলল, তাহলে আসি বোন।
–আবার কবে দেখা হবে?
–জানি না, তবে হবে নিশ্চয়ই।
মারিয়া আহমদ মুসার দিকে দু’পা এগিয়ে এসে বলল, আমি সব কিছুই হারাতে বসেছিলাম। ভাইয়া আমাকে রক্ষা করেছেন। কিছুই করতে পারলাম না ভাইয়ার জন্যে।
–ভাইয়ার জন্যে আল্লাহর কাছে দোয়া কর বোন।
–ইসলামে কিভাবে দোয়া করে তা তো আমি জানি না।
–বেশ শিখবে। তবে এটুকু জান, ইসলামে বান্দাহ ও আল্লাহর মধ্যবর্তী কেউ নেই। তুমি যা চাইবে আল্লাহকেই সরাসরি বলবে।
–বেশ তাই করবো। আল্লাহকে বলবো, ভাইয়াকে যেন তাড়াতাড়ি আমাদের মাঝে ফিরিয়ে আনেন।
‘বেশ, তাই করো’ বলে আহমদ মুসা রাস্তায় পা বাড়াল। তার পেছনে আলী আজিমভ।
অনেকটা এগিয়ে আহমদ মুসা পেছনে তাকাল। দেখল, মারিয়া তখনও সেখানে একটা অন্ধকার ছায়ার মত স্থির দাঁড়িয়ে।
আহমদ মুসা ধীর কণ্ঠে বলল, দুনিয়াতে এত মায়া, এত মমতা থাকতে এত হানাহানি, রক্তপাত কেন আজিমভ!
‘যে রহমান নামের প্রকাশ এই মায়া, এই মমতা, তার রাজত্ব দুনিয়াতে এখনও কায়েম হয়নি বলেই হয়তো’- ধীর স্বগতঃ কণ্ঠে বলল আলী আজিমভ।

৫

সোফিয়ার মা এবং আলফ্রেডের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য একত্রিত করে আহমদ মুসা সিদ্ধান্ত পৌঁছল, হোয়াইট ওলফের হেডকোয়ার্টার আরাগাত পর্বতের আমবার্ড দুর্গেই হবে।
তারপর পুরাতত্ত্ব বিষয়ক লাইব্রেরী ঘেঁটে আহমদ মুসা আমবার্ড দুর্গের ইতিহাসও পেল। আমবার্ড দুর্গ আরাগাত পর্বতের ক্রমশ সুন্দর ও সুপ্রশস্ত ধাপে অবস্থিত, যার চারদিক বেষ্টন করে ঝর্ণা-সৃষ্ট একটি পাহাড়ী নদী ধাপটির দক্ষিণ পাশের একটা অংশ দিয়ে জলপ্রপাতের আকারে গভীর উপত্যকায় নেমে যাচ্ছে।
আমবার্ড দুর্গের মুখে একটি কাঠের ব্রীজ। এই কাঠের ব্রীজ দিয়ে নদী পার হয়ে দুর্গে প্রবেশ করা যায়।
দুর্গে সাধারণের যথেচ্ছ প্রবেশাধিকার নেই। দুর্গাভ্যন্তরে পবিত্র সানাইন গীর্জা আর্মেনিয়ার ধর্মনেতাদের সাপ্তাহিক প্রার্থনা মন্দির হিসেবে ব্যবহৃত। আর্মেনিয়ার ক্যাথলিক গীর্জা-সমিতির হেডকোয়ার্টারও এই আমবার্ড দুর্গে।
এইভাবে সবদিক থেকেই আমবার্ড দুর্গ হোয়াইট ওলফের হেডকোয়ার্টার হবার সবচেয়ে অনুকূল স্থান। আর্মেনিয়ার খৃস্টান ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা মহান সেন্ট গ্রেগরীর প্রতিষ্ঠিত প্রথম গীর্জা ছিল এই আমবার্ড দুর্গে। সেই প্রথম গীর্জার স্থানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সানাইন গীর্জা। সানাইন গীর্জার ফাদার সেন্ট পল সেন্ট গ্রেগরীর উত্তর পুরুষ।
সবদিক থেকে নিশ্চিত হবার পর আহমদ মুসা আমবার্ড দুর্গে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল।
সেদিন সন্ধা ৬টা। সন্ধ্যার কাল অন্ধকারে চারদিক তখন ঢাকা পড়েছে। আহমদ মুসার জীপ এসে আমবার্ড দুর্গ থেকে পুরানো রাস্তাটা যেখানে এসে হাইওয়েতে মিশেছে সেখানে থামল।
গাড়ি থেকে প্রথমে নেমে এল আহমদ মুসা। তারপর আলী আজিমভ। সবশেষে ড্রাইভিং সিট থেকে ওসমান এফেন্দী।
তিন জনেরই দেহ কাল পোশাকে ঢাকা। কাল ট্রাউজার, কাল দীর্ঘ ওভারকোট এবং আর্মেনিয়ার ধর্মনেতারা যে ধরনের লম্বা কাল টুপি পরেন মাথায় সে ধরনের টুপি।
গাড়ি থেকে নামার পর গাড়িটা তারা রাস্তার পাশে একটা টিলার আড়ালে রেখে দিল।
তারপর তিন ছায়ামূর্তি আরাগাত পর্বতগামী পুরানো রাস্তাটা ধরে দ্রুত হাঁটতে শুরু করল। তিনজনের হাত ওভারকোটের পকেটে রিভলভারের বাঁটে।
আরাগাত রোড ধরে মাইল সাতেক এগুবার পর আহমদ মুসা থমকে দাঁড়াল, সেইসাথে সাথী দু’জনও। সমতল রাস্তার সমতল যাত্রা প্রায় শেষ। আর সিকি মাইল পর্যন্ত পথটা কোন রকমে গেছে, তারপরেই পর্বতারোহণ শুরু। আজ দিনের বেলা ওসমান এফেন্দী এ এলাকাটা ঘুরে গেছে, ট্যাক্সি ড্রাইভারের ছদ্মবেশে। খৃস্টান ফাদার, ধর্মনেতারা প্রায়ই আমবার্ড দুর্গে আসা-যাওয়া করেন। বিশেষ করে রোববার এবং সোমবার দিনের প্রথম ভাগে তাদের আসা-যাওয়া। সুতরাং এ সময় ট্যাক্সিওয়ালারা বেশ কাজ পায়। ওসমান এফেন্দী এমনি একজন ফাদারকে আজ দুপুরেই আরাগাত পর্বত থেকে ফিরতি দেবার সুযোগ পেয়েছিল। সেই সুবাদে ওসমান এফেন্দী এসেছিল আরাগাত রোডের দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত।
আরাগাত রোড যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে একটা পথের চিহ্ন ধাপে ধাপে পাহাড়ের উপরে উঠে গেছে, সেখানে রাস্তার পূর্ব পারে একটা বড় টিলা। টিলার দক্ষিণপারে আরাগাত পাহাড়ের গায়ে একটা বড় গুহা। রাস্তা থেকে কিংবা দূর থেকে গুহাটা দেখা যায় না। টিলাটা যেন গুহা মুখের দরজা-সবার চোখ থেকে গুহাটাকে আড়াল করে রেখেছে। গুহার মুখে একটা ক্রস। দিনের বেলা গুহাতে দু’একজন খৃস্টান সাধুকে সব সময়ই দেখা যায়। মাঝে মাঝে গুহামুখ থেকে ধোঁয়াও ওঠে। সাধুরা ওখানে রান্না-বান্নাও করে। মানুষ মনে করে ওটা সাধুদের পবিত্র আস্তানা-দুনিয়াত্যাগী সাধুদের সাধনার একটা স্থান। মানুষ যারা এদিকে আসে, তারা সাধুদের কিছু নজর-নিয়াজ দিয়ে পুণ্য কামাবার চেষ্টা করে। ওসমান এফেন্দীও সেই উসিলায় গুহামুখে গিয়েছিল। যখন দেখতে এসেছে, সবটাই দেখা দরকার।
গুহামুখ থেকে ভেতরে তখন একজন সাধু বসে ছিল। লম্বা দাড়ি, লম্বা চুল। গলায় বিরাট ক্রস ঝুলানো। যোগাসনে বসা, চোখ বন্ধ। ওসমান এফেন্দীর মনে হয়েছিল, তার উপর চোখ পড়ার পরেই যেন সাধু বাবাজী চোখ বন্ধ করলেন।
রীতি মোতাবেক সাধু বাবাজীর কাছে হাঁটু গেড়ে বসে সামান্য কিছু টাকা বিনীতভাবে তার সামনে রেখেছিল।
সাধু বাবাজীর শরীর দেখে ওসমান এফেন্দী বিস্মিত হয়েছিল। তার চোখে, মুখে-চেহারায় কৃচ্ছতার কোন ছাপ নেই। বরং মুষ্টিযোদ্ধার মত পেটা শরীর থেকে যেন শক্তির প্রাচুর্য ঠিকরে পড়ছে। উপঢৌকন দিয়ে উঠে দাঁড়াবার সময় ওসমান এফেন্দী সাধু বাবাজীর দিকে চেয়ে ভাবছিল, এ কেমন সাধুরে বাবা!
উঠে দাঁড়াবার পর নিচের দিকে চাইতেই সাধু বাবাজীর ডান উরুর পাশে পড়ে থাকা একটা জিনিসের দিকে নজর পড়তেই ওসমান এফেন্দী ভীষণ চমকে উঠল। সাধু বাবাজী দূরবীন দিয়ে কি করেন? ভালো করে তাকিয়ে দেখল, দূরবীনটা সাধারণ নয়। জার্মানীর সর্বাধুনিক মডেলের এ দূরবীনটির ইনফ্রা রেড আই রাত্রেও দেখতে পায়।
আহমদ মুসা আরাগাত রোডের উপর থমকে দাঁড়িয়ে ওসমান এফেন্দীর দেয়া এসব তথ্যের উপর আরেকবার চোখ বুলাচ্ছিল। আহমদ মুসা পরিষ্কার বুঝেছিল, আরাগাত পর্বতের ঐ গুহাটা আসলে হোয়াইট ওলফের অগ্রবর্তী ঘাঁটি। আর ঐ সাধুরা হোয়াইট ওলফের অগ্রবর্তী প্রহরী। আহমদ মুসা খুশিই হয়েছে, আমবার্ড দুর্গেই হোয়াইট ওলফের হেডকোয়ার্টার, এ বিষয়ে আর কোন সন্দেহ নেই।
আহমদ মুসা আলী আজিমভ ও ওসমান এফেন্দীকে লক্ষ্য করে ফিসফিসিয়ে বলল, রাস্তা ধরে আর সামনে এগুনো যাবে না, ওদের দূরবীনের ইনফ্রা রেড লেন্সে ধরা পড়ে যাব।
একটু থেমে আহমদ মুসা বলল, আরাগাতের সেই গুহাটা রাস্তার বাম পাশে না?
জ্বি, হ্যাঁ। বলল ওসমান এফেন্দী।
রাস্তা থেকে বাম পাশে উঠে গেল আহমদ মুসা। আলী আজিমভ এবং ওসমান এফেন্দী তাকে অনুসরণ করল।
বাম পাশের মাটি ছোট-বড় পাথরে ঢাকা, উঁচু-নিচু, এবড়ো-থেবড়ো।
রাস্তা থেকে অনেকখানি পূর্বদিকে এগিয়ে তারা দক্ষিণ দিকে আরাগাত পর্বত অভিমুখে যাত্রা শুরু করল। হামাগুড়ি দিয়ে সামনে এগুচ্ছে। তাদের লক্ষ্য আরাগাতের সেই গুহা।
কিছুক্ষণ চলার পর আহমদ মুসা চোখে দূরবীন লাগিয়ে সামনেটা পর্যবেক্ষণ করল। ইনফ্রা রেড দূরবীন সামনের অন্ধকার স্বচ্ছ করে দিয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে কিছু দূরে সেই বড় টিলাটা দেখতে পেল। ওই টিলার দক্ষিণ পাশেই গুহা।
আরও কিছুক্ষণ চলল। গুহায় তারা সামনের দিক থেকে নয়, পূর্ব পাশ থেকে পৌঁছতে চায়। যাতে করে ওদের সন্ধানী চোখ ফাঁকি দেয়া যায়। আহমদ মুসারা এদের চোখ এড়িয়েও পাহাড়ে উঠতে পারতো, আমবার্ড দুর্গে যেতে পারতো। কিন্তু শত্রুকে পেছনে অক্ষত রেখে সামনে এগুনো আহমদ মুসা ঠিক মনে করেনি।
আরও কিছুটা এগিয়ে আহমদ মুসা চোখে আবার দূরবীন লাগাল। দেখল, টিলাটা এবার সোজা ডানপাশে এসে গেছে। অর্থাৎ তারা এখন গুহার সমান্তরালে পূর্ব দিকে অবস্থান করছে। এখন তারা গুহা লক্ষ্যে পশ্চিম দিকে এগুতে পারে।
এবার প্রায় ক্রলিং করে তারা সামনে এগুতে লাগল। নিঃশব্দে সাপের মত এগুচ্ছে। তিনজন পাশাপাশি।
গুহার কাছাকাছি পৌঁছে চোখে আবার দূরবীন লাগায় আহমদ মুসা। গুহামুখটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। কেউ সেখানে নেই। গুহার ভেরতটা দেখতে হলে আরও অনেকখানি এগিয়ে গুহার লম্বা-লম্বি পৌঁছতে হবে।
আহমদ মুসা দূরবীনের চোখটা উত্তর দিকে টিলার দিকে সরিয়ে নিল। টিলার মাথায় দূরবীনের চোখটা স্থির হতে চমকে উঠল আহমদ মুসা। কাল ওভারকোটে সর্বাঙ্গ ঢাকা একজন লোক বসে। তার দৃষ্টি উত্তরে রাস্তার দিকে। তার কাঁধে ঝুলছে খাট-মোটা ব্যারেলের রাইফেল। ওর নিউট্রন বুলেট আশে-পাশে কোথাও এসে পড়লেও রক্ষা নেই। সংগে সংগেই মৃত্যু, নিঃশ্বাস ফেলার মত সময়ও দেয় না।
এসময় রাস্তার দিক থেকে একটা কুকুরের ঘেউ ঘেউ আওয়াজ শুনা গেল। ঘেউ ঘেউ আওয়াজটা ছুটে আসছে এদিকে।
আহমদ মুসা প্রমাদ গুনল। লুকিয়ে এসে মানুষের চোখ এড়ানো যায়, গন্ধবিশারদ কুকুরকে তো ফাঁকি দেওয়া যায় না।
টিলায় বসা লোকটা কুকুরকে এদিকে ছুটে আসতে দেখে এদিকে ফিরে বসেছে।
আহমদ মুসা বাম হাতে দূরবীন আর ডান হাতে হাসান তারিকের দেয়া লেসার পিস্তল তুলে নিয়েছে।
কুকুরটি একদম কাছে চলে এসেছে। প্রচন্ড রকম ঘেউ ঘেউ করছে। চোখ দু’টো জ্বলছে ভাটার মত। যেন লাফিয়ে পড়বে।
আজিমভ পিস্তল তাক করেছিল তার দিকে।
আহমদ মুসা হাত নাড়ল গুলি না করার জন্যে।
কুকুরটা যতক্ষণ এখানে আছে, ততক্ষণ নিউট্রন বুলেট এদিকে আসবে না।
এসময় গুহামুখে একজন লোক দেখা গেল। একটা শীষ দিল সে। সংগে সংগে শিক্ষিত কুকুর পেছন দিকে ছুটতে লাগল। গুহা মুখের লোকটির মুখে মুখোশ, হাতে রিভলভার।
কুকুরটি যখন ছুটে সরে যাচ্ছে, সে সময় টিলার সেই লোকটি, আহমদ মুসা দেখল, নিউট্রন রাইফেলটি হাতে তুলে নিচ্ছে।
আহমদ মুসা বুঝল, সেই ভয়ংকর সময়টি দ্রুত ঘনিয়ে আসছে। আর তাকে সময় দেয়া ঠিক হবে না।
আহমদ মুসা বাম হাতে দূরবীনটি চোখে ধরে ডান হাতে লেসার পিস্তলটি তাক করল টিলার সেই লোকটির দিকে।
সাদা পিস্তলের লাল ট্রিগার বোতামটি আস্তে টিপে দিল আহমদ মুসা। সংগে সংগে চোখ ধাঁধানো আলোর এক সরল রেখা বেরিয়ে গেল পিস্তল থেকে।
পরমুহূর্তেই টিলার লোকটি গড়িয়ে পড়ে গেল টিলার মাথা থেকে।
গুহামুখের লোকটি হতচকিত হয়ে ছুটে গেল টিলা থেকে পড়া লোকটির কাছে।
পরমুহূর্তেই তাকে নিউট্রন রাইফেল হাতে উঠে দাঁড়াতে দেখা গেল। তার চোখে শংকা নয়, আগুন। নিউট্রন রাইফেলটি সে তাক করল কুকুরটি ছুটে এসে যেখানে থমকে দাঁড়িয়েছিল সেদিকে।
আহমদ মুসা লেসার পিস্তলটি তাক করেই ছিল, সেই লাল বোতামে চাপ দিল আহমদ মুসা। বোতাম থেকে আঙুল সরে যাবার আগেই লোকটি পাকা ফলের মত মাটিতে ঝরে পড়ল।
আহমদ মুসারা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। কেউ আর বেরিয়ে এল না। নিশ্চয় আর কেউ নেই।
তারপর আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল এবং গুহার দিকে এগিয়ে চলল।
গুহায় ঢোকার আগে প্রাণহীন পড়ে থাকা লোক দু’টির ওভারকোটের কলার ব্যান্ড উল্টিয়ে পরীক্ষা করল। দেখল, সাদা নেকড়ের হিংস্র মুখ জ্বলজ্বল করছে। আহমদ মুসার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, তারা ঠিক জায়গাতেই এসেছে।
লোক দু’জনের পকেট সার্চ করে কিছু টাকা ছাড়া কিছুই পাওয়া গেল না। একজনের পকেটে একটা ছোট্ট চিরকুট পাওয়া গেল, তাতে একটা টেলিফোন নাম্বার লেখা। আহমদ মুসা চিরকুটটি পকেটে ফেলে গুহায় প্রবেশ করল।
গুহাতেও কিছু পাওয়া গেল না। আহমদ মুসার মনে পড়ল হোয়াইট ওলফের এ পর্যন্ত যতলোক মারা গেছে, তাদের কারো পকেটে তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ তারা সর্বাবস্থায় সাবধান থাকে।
দু’জনের কাছে দু’টি ওয়াকি টকি ছিল। সে দু’টি ওয়াকি টকি এবং পিস্তল ও নিউট্রন রাইফেল নিয়ে উপরে উঠার জন্যে তৈরি হল আহমদ মুসারা। দু’টো স্টেনগানও ছিল। সে দু’টি একটা পাথরের নিচে লুকিয়ে রাখল।
তারপর আহমদ মুসা, আলী আজিমভ এবং ওসমান এফেন্দী আরাগাত পর্বতের গা বেয়ে উঠা শুরু করল। পর্বতের গা কেটে আমবার্ড দুর্গ পর্যন্ত ধাপে ধাপে রাস্তা তৈরি হয়েছিল এক সময়। কিন্তু রাস্তাটি আজ আর তেমন নেই। চিহৃ আছে মাত্র। তবু সেই আঁকা-বাঁকা পথ ধরে পুরানো ধাপে ধাপে পা রেখে উঠা বেশ আরামদায়ক।
আহমদ মুসারা অতি সন্তর্পণে অনেকটা হামাগুড়ি দিয়ে সেই পথ ধরে উঠতে লাগল। সামনে আহমদ মুসা, তার পেছনে আলী আজিমভ এবং সবশেষে ওসমান এফেন্দী।
আঁকা-বাঁকা রাস্তাটি পর্বতের গা বেয়ে দেড় হাজার ফিট চলার পর দু’টি শৃংগের মাঝখানে একটি সংকীর্ণ লেনে গিয়ে শেষ হয়েছে।
লেনটির কাছাকাছি তখন পৌঁছেছে আহমদ মুসারা। এই সময় আহমদ মুসার কাঁধে ঝুলানো ওয়াকি টকি কথা বলে উঠল। চমকে উঠল আহমদ মুসা। থমকে দাঁড়াল এবং কানের কাছে তুলে নিল ওয়াকি টকিটা।
‘জন, জন……..’ কেউ যেন ওয়াকি টকিতে ডেকে চলেছে জন নামের একজন লোককে।
আহমদ মুসা বুঝল, টিলার উপর পাহারায় সেই লোকটিই ছিল এই জন। কান খাড়া করল, আরও সতর্ক হলো। নিশ্চয় আমবার্ড দুর্গের কল এটা।
‘জন জন’ বলে কিছু ডাক দেয়ার পর জনের সাড়া না পেয়ে কাউকে লক্ষ্য করে লোকটি বলল, শালা জন নিশ্চয় ঘুমিয়েছে, কি সর্বনাশ! তোমরা ক’জন যাও দেখ।
‘টক’ করে কানেকশান বন্ধ হয়ে গেল ওপার থেকে।
আহমদ মুসা পেছন দিকে মাথা ঘুরিয়ে বলল, তোমরা তাড়াতাড়ি কর, এখনি এপথে ওদের ক’জন আসবে।
লেনের মুখটি এখনও প্রায় ৫০ গজ উপরে। তাড়াহুড়া করে উঠার উপার নেই। একেতো অন্ধকার, তার উপর সিঁড়িগুলো ভাঙা। তাড়াহুড়া করতে গেলে বিপদ ঘটতে পারে।
পাহাড়ের গা বেয়ে রাস্তাটি ধাপে ধাপে উঠে যেখানে গিয়ে শেষ হয়েছে, সেখানে দু’শৃংগের মাঝখানে অনেকখানি প্রশস্ত জায়গা। সে জায়গাটায় রয়েছে ছোট-বড় বেশ কিছু টিলা। এই প্রশস্ত জায়গাটি কয়েকগজ দক্ষিণে এগিয়ে সংকীর্ণ হয়ে লেন আকারে দুই শৃংগের মাঝখান দিয়ে দক্ষিণে এগিয়েছে। আহমদ মুসা ইনফ্রা রেড় দূরবীন দিয়ে উপরে যতদূর দেখা যায় দেখেই বুঝেছিল, ওখানে পৌঁছতে পারলে শত্রুর নজর এড়াবার মত আড়াল পাওয়া যাবে।
কিন্তু আহমদ মুসা শেষ ধাপটা পেরিয়ে দুই শৃংগের মাঝখানের সেই প্রশস্ত জায়গাটার প্রান্তে ডান পা রেখে উঠে দাঁড়াতেই তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল সামনে তাকিয়ে। লেন থেকে বেরিয়ে এল তিনটি ছায়ামূর্তি। ওরাও থমকে দাঁড়িয়েছে আহমদ মুসাকে দেখে।
আহমদ মুসা দেখল, ওদের হাতে অস্ত্র উঠে আসেনি। বুঝল, ওরাও সম্ভবত পরিস্থিতির অভাবনীয় দৃশ্যে হতচকিত হয়েছে।
কিন্তু আহমদ মুসার হাতে অস্ত্র উঠে আসার সাথে সাথে ওদের হাতেও অস্ত্র উঠে এসেছে।
আহমদ মুসা এম-১০ হাতে নিয়েই বামপাশে ছুড়ে দিল নিজের দেহটাকে। স্টেনগানের একঝাঁক গুলি উড়ে গেল মাথার উপর দিয়ে। গুলি করার জন্যে আহমদ মুসা মুহূর্তকাল দেরি করলে গুলি করতে পারলেও সে ওদের গুলির মুখে পড়ত। আহমদ মুসা মনে মনে আবার ওদের প্রশংসা করল। অদ্ভুত ক্ষিপ্র ওরা, সময় এক মুহূর্তও নষ্ট করে না।
আহমদ মুসা দেহটাকে ছুঁড়ে দিয়েই ভূমি স্পর্শ করেই চেপে ধরল এম-১০-এর ট্রিগার।
ওরা বুঝে উঠে স্টেনগানের ব্যারেল নিচে নামানোর আগেই এম-১০ থেকে ছুটে যাওয়া গুলির ঝাঁক গিয়ে ওদের ওপর আপতিত হলো। ওরা পাশাপাশি দাঁড়িয়েছিল তিনজন। তিনজন এক সাথে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল মাটিতে।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
আলী আজিমভ এবং ওসমান এফেন্দীও তখন উঠে এসেছে। ওরা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল, মুসা ভাই আপনি ভাল আছেন তো?
‘আলহামদুলিল্লাহ, তোমরা এস, দেখি ওদের’ বলে আহমদ মুসা দ্রুত চলল ঐ তিনটি লাশের দিকে। তার পিছনে আলী আজিমভ এবং ওসমান এফেন্দীও।
তিনটি লাশেরই কলার-ব্যান্ডে সাদা নেকড়ের মুখ আঁকা পাওয়া গেল অর্থাৎ তারা হোয়াইট ওলফের লোক।
ওদের পরনে কাল ট্রাউজার, কাল ওভারকোট এবং মাথায় বিশেষ ধরনের কাল পশমী টুপি।
আহমদ মুসা বলল, এদের কাল টুপি পরে নিলেই তো এদের পোশাকের সাথে আমাদের আর কোন পার্থক্য থাকে না।
ওদের তিনটি টুপি আহমদ মুসারা তিনজনে পরে নিল।
পকেটে ওদের কিছুই পাওয়া গেল না।
লাশ তিনটি লেনের একপাশে একটু আড়ালে সরিয়ে রেখে ওরা লেন ধরে সামনে এগুলো।
লেনের দু’ধারে পাহাড়ের খাড়া দেয়াল হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেল।
থমকে দাঁড়াল আহমদ মুসা। কি যেন শব্দ কানে আসছে। কান পাতল আহমদ মুসা। হ্যাঁ, ঝর্ণার জমাটবদ্ধ শব্দ। বেশ কিছু ঝর্ণা উপর থেকে নিচে নেমে আসার সময় মিশ্র যে শব্দ তোলে ঠিক তেমনটা।
আহমদ মুসা ধীরে ধীরে লেনের মুখে গিয়ে বাইরে উঁকি দিল। তার চোখে ইনফ্রা রেড দূরবীন। দেখল সে, লেনটা কয়েকগজ নিচে গিয়ে উপত্যকায় মিশেছে। সামনে নজর পড়তেই ইতঃস্তত অনেক আলো দেখতে পেল। আমবার্ড দুর্গের বিখ্যাত উপত্যকা তাহলে এটাই, মনে মনে বলল আহমদ মুসা। তিনদিকে পাহাড় ঘেরা উপত্যকাটিকে বিশালই বলা যায়।
আহমদ মুসার চোখ সরে এল একেবারে কাছে সামনে।
সামনে যেখানে লেনটা গিয়ে উপত্যকায় মিশেছে সেখানে একটা পাথরের ঘর। ঘরের পাশ দিয়ে লম্বা কাল ফিতার মত ওটা কি? নদী না? হ্যাঁ, নদী। তাহলে আমবার্ড দুর্গের চারদিকে ঘিরে থাকা পাহাড়ী উচ্ছলা সে নদী এটাই।
আহমদ মুসার গোটা দেহে আনন্দের একটা শিহরণ খেলে গেল। নদী পেরুলেই আলো খচিত ঐ আমবার্ড দুর্গে তারা পৌঁছতে পারবে। কিন্তু নদীর এপারে এ ঘরটা কি?
হঠাৎ আহমদ মুসার মনে একটা চিন্তা ঝিলিক দিয়ে উঠল, আমবার্ড দুর্গে প্রবেশের পথে এটাই প্রথম চেকপোস্ট কি? এটাই কি আমবার্ড দুর্গে প্রবেশের পথ? ব্রীজটা কি এখানেই?
আহমদ মুসা পকেট থেকে আমবার্ড দুর্গের স্কেচটা বের করল। নজর বুলাল ভাল করে। আমবার্ড দুর্গের উত্তর পাশ দিয়ে প্রবাহিত নদীর উপর যেখানে ব্রীজের চিহ্ন আঁকা সেখান থেকে একটা ডট লাইন উত্তরে এগিয়ে গেছে, মিশেছে গিয়ে হাইওয়েতে। আহমদ মুসা খুশি হল, তারা ডট লাইনটির শেষপ্রান্তে ব্রীজের মুখে এখন দাঁড়িয়ে। সম্ভবত নদীর এপারের ঐ পাথুরে ঘরটিই ব্রীজের গেটরুম। এ ঘরের মধ্যে দিয়ে ব্রীজে উঠা যাবে। আহমদ মুসা হাসল, নদীর এপারে ঐ ঘরটিই তাহলে হোয়াইট ওলফের প্রতিরোধ ঘাঁটি। পাহারা কি ঘরটি ঘিরেই? বাইরেও কি ওঁৎ পেতে থাকা আরও পাহারা আছে?
আহমদ মুসা আলী আজিমভ ও ওসমান এফেন্দীর সাথে করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ করল। তারপর বিসমিল্লাহ বলে প্রথমে সামনে পা বাড়াল আহমদ মুসা।
হামাগুড়ি দিয়ে এগুচ্ছিল ওরা।
দু’পাশে ছোট-বড় অনেক পাথর। ছোট ছোট টিলাও বেশ আছে। এর মধ্যে দিয়েই পথের রেখা এগিয়ে সামনে গেছে। ঠিক পথ বলা যায় না। দু’পাশের তুলনায় কিছুটা সমতল ভূমি মাত্র।
গেটরুম থেকে তখনও তারা গজ পঞ্চাশেক দূরে। গেটরুমের দরজা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। দরজা বন্ধ। ঠিক দরজার উপরে একটি বাল্ব। আলো জ্বলছে। আলোটা দরজার সামনের অনেকখানি জায়গা আলোকিত করছে। কিন্তু সেই আলো চারদিকের অন্ধকার যেন আরও গাঢ় করে তুলেছে।
আহমদ মুসা যখন গেটরুমটি পর্যবেক্ষণ করছিল, সেই সময় ঘরের দু’পাশের অন্ধকার থেকে দু’জন লোক বেরিয়ে এসে দরজার সামনে দাঁড়াল। সংগে সংগেই দরজাটা খুলে গেল।
ঘরের ভেতরেও আলো। কিন্তু কোন লোক দেখা গেল না। লোক দু’জন ঘরের ভেতরে ঢুকে গেল। সাথে সাথেই দরজা বন্ধ হয়ে গেল। দরজা খুলে যাওয়া ও বন্ধ হওয়া দেখে আহমদ মুসা পরিষ্কার বুঝল, দরজা খোলা ও বন্ধ করার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা আছে। কিন্তু লোক এসেছে, দরজা এখন খুলতে হবে এটা ভেতর থেকে বুঝল কি করে? লোক দু’টি তো কোন সংকেত দেয়নি, দরজাও তারা স্পর্শ করেনি।
হঠাৎ আহমদ মুসার মনে পড়ল, লোক দু’টি আলোতে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়াবার পর দরজা খুলে গেছে। তাহলে কি দরজায় টেলিভিশন ক্যামেরা সেট করা আছে?
কথাটা মনে হবার সাথে সাথেই মন তার বলে উঠল, হোয়াইট ওলফের হোডকোয়ার্টারের জন্যে এ ধরনের ব্যবস্থাই স্বাভাবিক।
আহমদ মুসা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। আর একটু হলেই তারা আলোর নিচে গিয়ে পড়ত এবং তাদের আগমনের কথা শত্রুর জানা হয়ে যেত।
আহমদ মুসা পাশে আলী আজিমভকে তার সন্দেহের কথা জানাল এবং বলল যে, দরজা দিয়ে নয়, বিকল্প পথে আমাদের ব্রীজে পৌঁছতে হবে।
আলী আজিমভ তার কথায় সায় দিয়ে বলল, লোক দু’জন চলে গেল কেন?
আহমদ মুসা একটু চিন্তা করে বলল, প্রহরীদের ওটা ডিউটি পরিবর্তন হতে পারে। যদি তাই হয়, তাহলে নতুন দু’জনকে আমরা শীঘ্রই আসতে দেখব।
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা রাস্তা থেকে ডান দিকে নেমে পড়ল। পাথর ডিঙিয়ে টিলা পাশ কাটিয়ে গেটরুমের দিকে এগিয়ে চলল তারা।
আহমদ মুসারা গেটরুমের উত্তর দেয়ালের গোড়ায় গিয়ে পৌঁছল। পশ্চিমে অল্প নিচে দিয়ে পাহাড়ি নদী বয়ে যাচ্ছে। ফ্লাশ ওয়েভের মত প্রচন্ড বেগে বয়ে চলেছে নদী। নদীর ওপারের তীর বরাবর দুর্গের উঁচু দেয়াল। ২৫ফুট উঁচু পাথরের দেয়ালের উপর দিয়ে আবার কাঁটাতারের বেষ্টনি। দেখেই আহমদ মুসা বুঝল, কাঁটাতারের ঐ বেষ্টনি বিদ্যুতায়িত।
গেটরুমের দেয়াল ১০ফিটের মত উচু। এ দেয়ালের সাথে ব্রীজের ইস্পাতের দেয়াল একসাথে মিশে গেছে। ব্রীজটা চারদিক থেকে ঘেরা সুড়ঙ্গের মত। ব্রীজের উপরেও ইস্পাতের ছাদ দেখল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা মনে মনে প্রশংসাই করল, হোয়াইট ওলফ তাদের ঘাঁটিকে সত্যই দুর্ভেদ্য করে তুলেছে।
দুর্ভেদ্য বটে, কিন্তু কোন দুর্গই অজেয় নয়-মনকে বুঝ দিল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা পকেট থেকে সিল্কের কর্ড বের করে ছুঁড়ে দিল গেটরুমের ছাদে। তারপর টেনে দেখল, হুকটি ঠিকমতই আটকে গেছে ছাদের দেয়ালে।
আহমদ মুসা কর্ড বেয়ে প্রথমে ছাদে উঠল। পরে আলী আজিমভ ও ওসমান এফেন্দী উঠে এল।
আহমদ মুসা বলল, চল আমরা ব্রীজের ওপারে গিয়ে ছাদ কেটে ব্রীজে নামব।
ব্রীজের ছাদ দিয়ে ওরা চলে এল ব্রীজের পশ্চিম মাথায়।
ব্রীজের ছাদের পশ্চিম প্রান্ত দুর্গের দেয়ালের ভেতরে ঢুকে গেছে। ব্রীজের ইস্পাতের ছাদ এবং দুর্গের দেয়াল ভাল করে পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে আহমদ মুসার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। দেখল, ব্রীজের ছাদের ঠিক উপরে দুর্গের দেয়ালের দুই বর্গফুট পরিমাণ একটা অংশ ইস্পাতের পুরু পাত দিয়ে ঢাকা। আহমদ মুসা ভাবল, দুর্গ থেকে বেরুবার এটা একটা চোরা দরজা হতে পারে।
ইস্পাতের পাতটি টানাটানি করে, টোকা দিয়ে আহমদ মুসা বুঝল ভেতর থেকে হুক দিযে আটকানো।
ভালোভাবে পরীক্ষা করার পর আহমদ মুসা পকেট থেকে ‘লেসার কাটার’ বের করে লেসার রশ্মি দিয়ে ইস্পাতের গরাদটির ডানপাশের খাড়া-খাড়ি প্রান্তটি কেটে ফেলল। তারপর গরাদটির উপরের প্রান্ত ধরে টান দিতেই গরাদটি খুলে গেল।
গরাদ খুলে যেতেই এক গরম বাতাস বেরিয়ে এল। ওপারে ঘুটঘুটে অন্ধকার। বদ্ধ বাতাস বেরিয়ে যাবার অল্প কিছুক্ষণ সুযোগ দিয়ে আহমদ মুসা ভেতরে ঢুকে গেল। তারপর আলী আজিমভ এবং ওসমান এফেন্দীও।
ওপারে গিয়ে তারা যেখানে দাঁড়াল তা একটি সিঁড়ির মুখ। সিঁড়িটি এক অন্ধকার ঘরে নেমে গেছে। আহমদ মুসা ইনফ্রা রেড গগলস দিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখল একটা শূন্য ঘর। সিঁড়ি নেমে গিয়ে ঘরের যেখানে শেষ হয়েছে তার সামনেই দরজা।
আহমদ মুসা ঘরে নামার জন্যে সিঁড়িতে পা রাখতে যাবে, এমন সময় সিঁড়ির সামনে যে দরজা তার উপর একটি বাল্ব জ্বলে উঠল।
চমকে উঠল আহমদ মুসা, তাদের উপস্থিতি ওদের কাছে ধরা পড়ে গেছে। কিন্তু কিভাবে? তাহলে গরাদের সাথে কি কোন ইলেকট্রনিক সংকেত ব্যবস্থা ছিল? অস্বাভাবিক নয়। গোপন দরজার নিরাপত্তা বিধানের একটা ব্যবস্থা ওদের অবশ্যই থাকবে।
আলী আজিমভ ফিসফিস করে বলল, বাল্ব জ্বলে উঠল, আমরা কি ধরা পড়ে গেছি?
হ্যাঁ। দরজার সাথে কিংবা ঘরের কোথাও টেলিভিশন ক্যামেরার চোখ আছে। ওদের চোখ এড়িয়ে আমরা এক কদমও এগুতে পারবো না।
কথা শেষ করে আহমদ মুসা পকেট থেকে সাইলেন্সার লাগানো ছোট পিস্তলটা বের করে একটু ঝুঁকে পড়ে তাক করল আলো ছড়ানো বৈদ্যুতিক বাল্বটাকে। নিঃশব্দে একটা গুলি এগিয়ে গেল। ঠুস করে একটা শব্দ হল। সেই সাথে কাঁচের বাল্ব ভেঙে পড়ার শব্দ উঠল। ঘর আবার অন্ধকারে ডুবে গেল।
আহমদ মুসা দ্রুত সিঁড়ি ভেঙ্গে নামতে শুরু করল। মেঝেতে পা দিয়েই ছুটল দরজার দিকে। দরজা ধরে টানল। খুলতে পারলো না। বাইরে থেকে কি বন্ধ দরজা? হঠাৎ একটা চিন্তা আহমদ মুসার মনে ঝিলিক দিয়ে উঠল, দরজা কি গেটরুমের দরজার মতই স্বয়ংক্রিয়?
ঘেমে উঠল আহমদ মুসা উত্তেজনার চাপে। তাহলে কি তাদের মিশন ব্যর্থ হবে?
মনকে সান্ত্বনা দিল আহমদ মুসা। ওদের এই অতি সতর্কতাই প্রমাণ করে ওরা ভীত, ওদের দুর্বলতা আছে ওদের হেডকোয়ার্টারের রক্ষা ব্যবস্থায়।
আহমদ মুসা দ্রুত তার পকেট থেকে বের করল ‘লেসার কাটার’। বাটের নিচের লাল সুইচটা টিপে দরজার একটা অংশের চারদিক দিয়ে ঘুরিয়ে নিল। ইস্পাতের দরজার বিচ্ছিন্ন অংশটি সরিয়ে রেখে বেরিয়ে এল ঘর থেকে আহমদ মুসা। তার সাথে সাথে আলী আজিমভরাও।
দরজা থেকে বেরিয়ে লম্বা করিডোরে পড়ল। করিডোরটি দক্ষিণ দিকে এগিয়ে গেছে। করিডোর আলোকিত। আলোর উৎসের দিকে তাকিয়ে দেখল, করিডোরটি দক্ষিণ দিকে এগিয়ে যেখানে পশ্চিম দিকে বাঁক নিয়েছে সেখানে উত্তরমুখী একটা সার্চ লাইট।
আহমদ মুসা এম-১০ হাতে তুলে নিল সার্চ লাইটের চোখ অন্ধ করে দেবার জন্যে। এমন সময় করিডোরের দক্ষিণ মাথায় চার-পাঁচজন লোককে উদ্যত স্টেনগান হাতে আবির্ভূত হতে দেখা গেল। তারা ছুটে আসছে করিডোর দিয়ে। ওদের চোখ পড়েছে আহমদ মুসাদের উপর। ওরা দৌঁড়াতে দৌঁড়াতেই স্টেনগানের ব্যারেল ঠিক করে নিচ্ছিল। হাত ওদের স্টেনগানের ট্রিগারে। আহমদ মুসার এম-১০ এর নল উপরে উঠেই ছিল। শুধুমাত্র কিঞ্চিত নামিয়ে ট্রিগারে চাপ দিল। করিডোর ধরে ছুটে গেল এক পশলা গুলি। মুহূর্তে ওরা পাঁচজন লোকই আছড়ে পড়ল করিডোরে।
আহমদ মুসা ট্রিগার থেকে হাত না সরিয়ে এম-১০ এর মাথা সার্চ লাইটের চোখ বরাবর তুলে নিল। মুহূর্তে অন্ধ হয়ে গেল সার্চ লাইটের চোখ। অন্ধকারে ডুবে গেল করিডোর।
আহমদ মুসা ছুটলো করিডোর ধরে দক্ষিণ দিকে।
করিডোরটি দক্ষিণ দিকে কিছুদূর এগোবার পর পশ্চিম দিকে বাঁক নিয়েছে।
আহমদ মুসা করিডোর ধরে পশ্চিমে এগিয়ে চলল। এ করিডোরটি অন্ধকার। দু’পাশ দিয়ে সারিবদ্ধ কক্ষ। দরজা বন্ধ। করিডোর পশ্চিমে অনেক দূর এগুবার পর প্রশস্ত আলোকোজ্জ্বল আরেকটা করিডোরে গিয়ে পড়েছে।
আহমদ মুসা করিডোরটিতে পা দিতে গিয়েও পা টেনে নিল। নিজেকে দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে রেখে করিডোরটিতে উঁকি দিল।
উত্তর-দক্ষিণে লম্বা করিডোর। করিডোরটি উত্তর দিকে এগিয়ে পশ্চিম দিকে বাঁক নিয়েছে। আর দক্ষিণ দিকে এগিয়ে নিকটেই একটা সুন্দর সাদা গোলাকার বিল্ডিং-এর বারান্দায় গিয়ে শেষ হয়েছে।
আহমদ মুসা চোখ সরাতে যাচ্ছিল এমন সময় দেখল বিল্ডিংটির সামনের কক্ষের খোলা দরজা দিয়ে চারজন লোক বাইরে এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কি কথা বলতে লাগল। তাদের চোখে উত্তেজনা, তারা করিডোরটির দিকে তাকাচ্ছে ঘন ঘন। তাদের তিনজনের হাতে স্টেনগান, একজনের হাতে নিউট্রন রাইফেল।
আহমদ মুসা চোখ সরিয়ে নিচ্ছিল, এমন সময় উত্তর দিক থেকে অনেকগুলি পায়ের শব্দ তার চোখ টেনে নিয়ে গেল উত্তর দিকে। দেখল, চারজন লোক ছুটে আসছে। তাদের হাতে উদ্যত স্টেনগান।
দু’দিক থেকেই সমান বিপদ। একপক্ষকে রুখতে গেলে অন্য পক্ষ ছুটে আসবে।
আহমদ মুসা নিজের কাঁধ থেকে নিউট্রন রাইফেল নামিয়ে হাতে নিতে নিতে বলল, আলী আজিমভ তুমি উত্তর দিক সামলাও, আমি দক্ষিণ দিকে দেখছি।
আলী আজিমভের হাতে এম-১০ রেডি ছিল। সংগে সংগেই সে করিডোরের উত্তর দিকের দেয়াল ঘেঁষে শুয়ে পড়লো। এক ঝলক দেখে নিয়ে এম-১০ এর মাথা বাড়িয়ে দিল। তারপর ট্রিগারে চাপ দিয়ে মাথাটা দেয়ালের বাইরে নিল সে।
আলী আজিমভের এম-১০ যখন গর্জে উঠল, তার আগেই মনে হয় আলী আজিমভ দক্ষিণ দিকে ঘরের দরজার সামনে বারান্দায় দাঁড়ানো লোকদের চোখে পড়ে গিয়েছিল। বিদ্যুৎবেগে ওরা সোজা হয়ে দাঁড়াল, চোখের পলকে ওদের স্টেনগান ওদের হাতে এসে গিয়েছিল। সেই নিউট্রন রাইফেলধারীই তার রাইফেল তাক করেছিল।
আহমদ মুসার নিউট্রন রাইফেল তার অনেক আগেই তার হাতে এসে গিয়েছিল। দেয়ালের আড়ালে দাঁড়িয়ে লক্ষ্যও সে স্থির করে নিয়েছিল। আলী আজিমভের এম-১০ গর্জে উঠার সাথে সাথেই আহমদ মুসা তার নিউট্রন রাইফেলের ট্রিগারে চাপ দিল। পর পর দু’বার।
নিউট্রন রাইফেলের প্রথম বুলেটটি বিষ্ফোরিত হলো বিল্ডিংটির বারান্দায়। আর দ্বিতীয়টি খোলা দরজা পথে চলে গেল ঘরের ভেতরে।
ভোজবাজির মতই ঘটল ঘটনা। নিউট্রন বুলেট বিস্ফোরিত হবার পরমুহূর্তেই চারজন যে যেভাবে ছিল ঝরে পড়ল মাটিতে। মাটিতে পড়ার পর একটু নড়লও না। একটা আঘাত সূঁচের মত বিদ্ধ হলো আহমদ মুসার মনে। কত ভয়াবহ মারণযন্ত্র তৈরি করেছে মানুষ। ট্রিগার টেপার সুযোগ সে আগে নিতে না পারলে নিউট্রন বুলেটের বিষ নিঃশ্বাসে তারাই ঐভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত। জীবন-মৃত্যু এত কাছাকাছি!
আহমদ মুসা রাইফেল নামিয়ে উত্তর দিকে তাকাল। দেখল, আলী আজিমভ উত্তর দিক থেকে ছুটে আসা চারজনের সামাল ভালভাবেই দিয়েছে। স্তুপের মত চারটি লাশ পড়ে আছে জড়াজড়ি করে।
আর কোন দিক থেকে কেউ এলো না।
আহমদ মুসা বলল, চল আমরা আগে ঐ সাদা সুন্দর গোলাকার বিল্ডিংটা দেখবো।
–বিল্ডিংটার উপরে ওয়্যারলেস এ্যান্টেনা দেখা যাচ্ছে। নিশ্চয় ওটা কোন অফিস হবে। বলল আলী আজিমভ।
নিউট্রন বুলেটের ক্রিয়া শেষ হবার জন্যে আরও কয়েক মিনিট অপেক্ষা করার পর তারা বিল্ডিংটার দিকে এগিয়ে গেল।
উঁচু বেদীর উপর উঁচু একতলা বিল্ডিং। সিঁড়ির চারটি ধাপ পেরিয়ে ওরা বারান্দায় উঠল। দরজার সামনেই পড়ে থাকা লাশের পাশ কাটিয়ে ওরা ঘরে ঢুকলো। আহমদ মুসার নির্দেশে ওসমান এফেন্দী বারান্দায় পাহারায় থাকল স্টেনগান উঁচিয়ে। পোশাকে তাকে একজন হোয়াইট ওলফের প্রহরীর মতই দেখাচ্ছে।
ঘরটি গোলাকার। সাদা দেয়াল, সাদা কার্পেটে মোড়া। দরজা দিয়ে ঢুকতেই সামনের অর্থাৎ দক্ষিণ দেওয়ালে সাদা নেকড়ের মুখ ব্যাদানকারী হিংস্র মুখের এক বিশাল প্রতিকৃতি। প্রতিকৃতির নিচে ঘর লম্বালম্বি লম্বা সাদা টেবিল দেয়ালের সাথে সেঁটে তৈরি। লম্বা টেবিলের এক পাশে পাশাপাশি চারটি টিভি স্ক্রীন। আর এক পাশে কয়েকটি বাঘা ধরনের ওয়্যারলেস সেট।
আহমদ মুসা ঘরে প্রবেশ করে আরেক দফা শিউরে উঠল। দেখল, লম্বা টেবিলের সামনে বসা চার চেয়ারে চারজন এবং ঘরের মাঝখানে বড় একটা চেয়ারে আরেকজন ঢলে পড়ে আছে। যেন ঘুমিয়ে। ঘুমের মত করেই তাদের অজান্তে তারা নীরব মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে।
আহমদ মুসা বুঝল, দ্বিতীয় নিউট্রন বুলেটটা দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করেছিল। তারই কাজ এটা।
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল আহমদ মুসার বুক থেকে। ভাবল, মানুষ অন্যকে মারার জন্য খাদ খুঁড়ে, কিন্তু সে খাদে সেও যে পড়তে পারে-মানুষ তা মোটেই চিন্তা করে না।
ঘরটির চারদিকে একবার চোখ বুলিয়েই বুঝল, হোয়াইট ওলফের কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম এটা। আনন্দে মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল আহমদ মুসার।
টেলিভিশন স্ক্রীনগুলো সজীব। স্ক্রীনগুলোয় ঘাঁটির বিভিন্ন কক্ষ ও স্থানের ছবি ভেসে উঠেছে। টেলিভিশন স্ক্রীনগুলোর পাশেই সুইচ প্যানেল। প্রতিটি সুইচের নিচে আর্মেনীয় ভাষায় স্থানের নাম লেখা আছে। যেমন, গেটরুম, গেটব্রীজ, এত নম্বর কক্ষ, এত নম্বর করিডোর, প্রিজন ব্রীজ, প্রিজন ইত্যাদি। প্রতিটি কক্ষ, প্রতিটি করিডোরের জন্যে ভিন্ন ভিন্ন সুইচ আছে। সে সুইচ টিপলে আলোও জ্বলে, টেলিভিশন ক্যামেরাও সক্রিয় হয়।
আহমদ মুসার দৃষ্টি একটি টেলিভিশন স্ক্রীনের উপর গিয়ে আঠার মত আটকে গেল। দেখল, একটি কক্ষের মেঝেতে প্রৌঢ় একজন সৌম্যদর্শন মানুষ রক্তে ভাসছে। তার বুকের উপর পড়ে একটি তরুণী কাঁদছে। মুখ দেখা যাচ্ছে না। তাদের পাশেই রক্তে ভাসছে আরেকটি দেহ। তার মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল আহমদ মুসা। এ তো মাইকেল পিটার–হোয়াইট ওলফের প্রধান! মাইকেল পিটারের ছবি সে এরকমই দেখেছে। তার এই ভাবনায় ছেদ পড়ল। টিভি স্ক্রীনে সে দেখল, দরজা ঠেলে জনা সাতেক লোক প্রবেশ করলো ঘরে। তার মধ্যে দু’জনের হাতে পিস্তল। অন্যদের হাতে স্টেনগান। তাদের চোখে-মুখে বিস্ময় ও আতঙ্ক। তাদের সামনের দু’জনের একজন মুখ ফাঁক করলো বিরাট রকমের। মনে হয় চিৎকার করে কিছু যেন বলল। সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটি সেই লাশের বুক থেকে মুখ তুলল এবং দ্রুত হাত বাড়িয়ে পাশে পড়ে থাকা রিভলভারটি নিতে গেল। কিন্তু চিৎকার করে ওঠা লোকটিও লাফ দিল পিস্তলের লক্ষ্যে।
আহমদ মুসা আর দেখতে পারলো না। তার হঠাৎ যেন মনে হল মেয়েটি সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা এবং সেই প্রৌঢ় সৌম্যদর্শন লোকটি সোফিয়া এ্যাঞ্জেলার আব্বা সেন্ট জর্জ সাইমন।
আহমদ মুসা আর মুহূর্ত দেরি করলো না। প্যানেল বোর্ডের দিকে একবার তাকিয়ে ঘরের নাম্বারটি দেখে নিয়ে দ্রুত আলী আজিমভকে বলল, তোমার দায়িত্বে এখন কন্ট্রোলরুম, আমি আসছি। বলে মুসা দ্রুত বেরিয়ে এল ঘর থেকে।
প্যানেল বোর্ডে সুইচের অবস্থান এবং এ পর্যন্ত দেখা কক্ষসমূহের নম্বর দেখে আহমদ মুসা বুঝে নিয়েছিল ঘটনা যেখানে ঘটছে সেই কক্ষটি পশ্চিম দিকে হবে এবং খুব দূরে হবে না।
আহমদ মুসা কন্ট্রোল রুম থেকে বেরিয়ে পশ্চিমমুখী একটা করিডোর ধরে ছুটতে লাগল। করিডোরটি অন্ধকার।
করিডোরটি কিছুটা এগিয়ে একটা উত্তর-দক্ষিণ লম্বা বারান্দায় গিয়ে শেষ হয়েছে। বারান্দার পশ্চিমে বড় একটা লন। তার পরেই আর একটা বিল্ডিং। বিল্ডিংটা একতলা এবং খুব বড় নয়। ঘরে আলো জ্বলছে। পর্দাবিহীন কাঁচের জানালা দিয়ে উজ্জ্বল আলো দেখা যাচ্ছে।
আহমদ মুসা বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিল। বারান্দা থেকে একটা পাথর বিছানো রাস্তা বেরিয়ে সামনের ঐ বিল্ডিং এবং উত্তর পাশ দিয়ে পশ্চিম দিকে এগিয়ে গেছে। আহমদ মুসা তাড়াহুড়ার জন্যে খেয়াল করেনি, বারান্দা থেকে কয়েক গজ পশ্চিমে রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে আছে তিনজন স্টেনগান হাতে। লনে আলো জ্বলছে। সে আলোতে বারান্দাও আলোকিত।
আহমদ মুসার চোখ যখন ও তিনজনের উপর পড়েছে, তখন দেখল ওরা স্টেনগান হাতে তুলে নিয়েছে। আহমদ মুসার হাতেও এম-১০। কিন্তু তা তুলবার সময় নেই।
সামনেই ছিল বারান্দার প্রশস্ত পিলার। আহমদ মুসা নিজের দেহকে ছুড়ে দিল বারান্দার উপর সেই পিলারের আড়ালে। সংগে সংগেই এক ঝাঁক গুলি বেরিয়ে গেল পাশ দিয়ে। একটু দেরি হলে বুকটা তার ঝাঁঝরা হয়ে যেত।
আহমদ মুসা নিজেকে টেনে নিয়ে গেল পিলারের গোড়ায়। তারপর পিলারের সাথে গা মিশিয়ে উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা। গুলি তখন বৃষ্টির মত এসে আঘাত করছে পিলারকে।
আহমদ মুসা এম-১০ এর নল একটু বের করে পিলারের গায়ের সাথে চেপে ধরল ট্রিগার। গুলি বর্ষণরত অবস্থায় নলটা একবার উপরে, আরেকবার নিচে নামিয়ে নিল। বেরিয়ে গেল গুলির বৃষ্টি।
মনে হল ওপক্ষের গুলিবৃষ্টিতে একটা ছন্দ পতন হলো। অর্থাৎ ফাঁকা জায়গায় দাঁড়ানো ওরা স্থান পরিবর্তন করছে। এটাই চেয়েছিল আহমদ মুসা।
বিদ্যুৎ ঝলকের মত তার ডান হাত বেরিয়ে গেল পিলারের বাইরে। ট্রিগার চেপে ধরে একবার ঘুরিয়ে নিল এম-১০ এর নল এবং তারপরেই মাথা বের করল পিলারের আড়াল থেকে। দেখল, দু’জন পড়ে গেছে মাটিতে, আর একজন ছুটে আসছে বারান্দার দিকে। সেও দেখে ফেলেছে আহমদ মুসাকে। কিন্তু তার স্টেনগানের নল আহমদ মুসার দিকে উঠে আসার আগেই আহমদ মুসার এম-১০ এর গুলি বর্ষণরত মুখ লোকটির দিকে ঘুরে গেল। স্টেনগানসমেত উপুড় হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল লোকটি।
আহমদ মুসা বেরিয়ে এল পিলারের আড়াল থেকে। ওদের দিকে ফিরে তাকাবার মত সময় নষ্ট না করে আহমদ মুসা ছুটল সামনের বিল্ডিংটার দিকে।
বিল্ডিংটা পশ্চিমমুখী এল টাইপ। ‘এল’ এর বাঁকা অংশটা উত্তরদিকে। বিল্ডিং এর এই উত্তর পাশ ঘেঁষেই এগিয়ে এসেছে রাস্তাটা।
আহমদ মুসা রাস্তা থেকে উঠে এল বিল্ডিং এর বাঁকা অংশের বারান্দায়। দেখল, বিল্ডিংটা যেখানে গিয়ে দক্ষিণ দিকে বাঁক নিয়েছে, তারপরের দরজাটা খোলা। ভেতরের একফালি আলো এসে বারান্দায় পড়েছে।
আহমদ মুসা লাফ দিয়ে এগিয়ে চলল দরজার দিকে। আহমদ মুসা যখন বিল্ডিং এর বাঁকে গিয়ে পৌঁছেছে, সে সময়েই ওরা ছয়জন বেরিয়ে এল দরজা দিয়ে। সামনেই রবার্ট র‍্যাফেলো। তার পেছনে আরও পাঁচজন। জর্জ জ্যাকব তখনও দরজার আড়ালে।
ওদের দৃষ্টি প্রথমত ছিল সামনের দিকে। কিন্তু ডান দিকে ফিরে তাকাতেই নজর পড়ল আহমদ মুসার উপর। আহমদ মুসার এম-১০ মেশিন রিভলভার তখন ওদের দিকে স্থির লক্ষ্যে উদ্যত।
–তোমরা পিস্তল স্টেনগান সব ফেলে দাও।
আহমদ মুসার শান্ত, কঠোর কণ্ঠের নির্দেশ চারদিকের নীরবতাকে ভেঙ্গে দিল খান খান করে।
কিন্তু পিস্তল স্টেনগান তাদের হাত থেকে পড়ল না। ভয়ের বদলে তাদের চোখ-মুখ আরও কঠোরই হয়ে উঠল। বিদ্যুৎ গতিতে রবার্ট র‍্যাফেলোর পিস্তল ঘুরে আসছিল আহমদ মুসার দিকে।
আহমদ মুসার বাজের মত চোখকে ফাঁকি দেয়া সম্ভব হয়নি রবার্ট র‍্যাফেলোর। তার পিস্তল ঘুরে এসে স্থির হবার আগেই আহমদ মুসার তর্জনী চেপে বসেছিল এম-১০ এর ট্রিগারে। গুলির ঝাঁক বেরিয়ে গেল এম-১০ এর নল থেকে। ঝাঁঝরা হয়ে গেল গজ চারেক সামনে দাঁড়ানো দেহগুলো।
মুহূর্ত কয়েক অপেক্ষা করল আহমদ মুসা। টেলিভিশন স্ক্রীনে লম্বা-ভারিমত আরেকজনকে দেখা গিয়েছিল সে কই? নিশ্চয় সে দরজার আড়ালে। সুযোগের সন্ধান করছে।
আহমদ মুসা দেয়াল ঘেঁষে এক পা এক পা করে দরজার দিকে এগুলো। দরজার কাছে গিয়ে আরও মুহূর্ত কয়েক দেরি করল, না, কারো সাড়া নেই।
আহমদ মুসা মুখ বাড়িয়ে দরজায় উঁকি দিল। দেখল, মেয়েটি দরজার দিকে এগিয়ে আসছে। তার বিস্ফারিত দৃষ্টি লাশের স্তুপের দিকে। ভয়ে তার মুখ ফ্যাকাশে।
আহমদ মুসা তার এম-১০ এর নল নামিয়ে বলল, বোন, আর একজন লোক ছিল সে কই?
মেয়েটি ঘরের দক্ষিণ দিকে অংগুলি সংকেত করে বলল, ঐ দিক দিয়ে পালিয়েছে।
আহমদ মুসা লাফ দিয়ে ঘরে ঢুকল। কিন্তু দক্ষিণ দিকে তাকিয়ে কিছু বুঝতে পারলো না। কাঠের পার্টিশন ওয়াল, কোন দরজার চিহ্ন কোথাও নেই।
মেয়েটি এগিয়ে গিয়ে দেয়ালে একটা সুইচ টিপে বলল, এই সুইচ টিপে সে পালিয়ে গেছে।
সুইচ টেপার সাথে সাথে কাঠের পার্টিশনটি অনেকখানি সরে গেল।
আহমদ মুসা সে দরজা পথে ঐ ঘরে ছুটে গেল। দেখল, ওপারের দরজা খোলা।
আহমদ মুসা ফিরে এসে বলল, ও পালিয়েছে। হোয়াইট ওলফের কাউকে এই প্রথম পালাতে দেখলাম। কে ছিল সে? কোন নেতা নিশ্চয়ই?
–জর্জ জ্যাকব, হোয়াইট ওলফের ডেপুটি প্রধান। বলল মেয়েটি।
–এ হোয়াইট ওলফের প্রধান মাইকেল পিটার না?
–জ্বি।
— তুমি তো সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা?
–জ্বি। বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে উত্তর দিল সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা।
সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা বিস্ময়ের সাথে দেখছে আহমদ মুসাকে। কে এই যুবক? শিশুর মত সরল, পবিত্র মুখ। চোখ দু’টি অদ্ভুত রকমের উজ্জ্বল। প্রত্যেকটি কথা ও চলাফেরার মধ্যে শালীনতা ও সৌন্দর্য্য। কিন্তু এই লোকটিকে শত্রুর মোকাবিলায় কি কঠোর দেখা গেল!
–ইনি তোমার আব্বা সেন্ট সাইমন না?
–জ্বি। আপনি আমাকে, আমার আব্বাকে চেনেন কি করে? বলল সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা।
–বুঝতে পারছি, তুমি মাইকেল পিটারকে মেরেছ, কিন্তু তোমার আব্বা নিহত হলেন কি করে?
সোফিয়া সব ঘটনা আহমদ মুসাকে বলল। শেষ দিকে কান্নায় গলা তার রুদ্ধ হয়ে গেল।
আহমদ মুসা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, আর আধা ঘন্টা আগে যদি আসতে পারতাম!
সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা চোখ মুছে বলল, আব্বা বাঁচেন নি, কিন্তু আমাকে বাঁচিয়েছেন।
একটু থেমে সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা বলল, আপনি কে? আমাদের চেনেন কি করে আপনি?
–আমি আহমদ মুসা, সালমান শামিলের ভাই।
–মধ্য এশিয়ার আহমদ মুসা? কপালে চোখ তুলে প্রশ্ন করলো সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা।
–হ্যাঁ।
–আপনিই সেই মহান বিপ্লবী?
আহমদ মুসা কোন জবাব দিল না।
সোফিয়া এ্যাঞ্জেলাই আবার বলল, এতক্ষণে মনের প্রশ্নটার জবাব পেলাম, আহমদ মুসা ছাড়া হোয়াইট ওলফের প্রধান ঘাঁটিকে এভাবে কে পদানত করতে পারে!
–আল্লাহ সাহায্য করেছেন, বলল আহমদ মুসা।
একটু থেমে আহমদ মুসা বলল, সালমান শামিল কোথায়?
আহমদ মুসার কণ্ঠে উদ্বেগের সুর।
সোফিয়া এ্যাঞ্জেলার চোখে মুখে অন্ধকার নেমে এল। বলল, আমি ওর কোন খোঁজ করতে পারি নি। সে এই ঘাঁটিতেই থাকবে।
একটু থেমে বলল, ওরা মরিয়া হয়ে তার কোন ক্ষতি করবে না তো? সোফিয়া এ্যাঞ্জেলার কথা কাঁপছে। তার মুখ ফ্যাকাশে।
–আল্লাহ সাহায্য করবেন বোন। চল আমরা কন্ট্রোল রুমে যাই। সেখান থেকে গোটা ঘাঁটিটা একবার পর্যবেক্ষণ করা যাবে। তারপর করণীয় ঠিক করব।
বলে আহমদ মুসা দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল।
সোফিয়া যাবার আগে পিতার লাশের দিকে ফিরে একবার থমকে দাঁড়াল।
আহমদ মুসা তা দেখতে পেল। বলল, ভেব না বোন, আমরা সব ব্যবস্থাই করব।
আহমদ মুসা আগে চলছে। সোফিয়া এ্র্যাঞ্জেলা তার পেছনে।
চলতে চলতে সোফিয়া বলল, আপনি কিন্তু আমার একটা প্রশ্নের জবাব দেননি। আপনি আমাদের চিনলেন কি করে? সালমান ছাড়া আমাদের তো আর কেউ চেনে না।
–ডঃ পল জনসন আমাকে সব বলেছেন। তারপর তোমার সাথে দেখা করার জন্যে তোমার বাড়িতে যাই। সেখানে তোমার মা’র কাছ থেকে তোমার হারিয়ে যাবার কথা শুনি।
মায়ের কথায় সোফিয়ার মুখ বেদনার্ত হয়ে গেল। তার পিতার কথাও এ সময় মনে পড়ল। চোখে পানি এসে গেল তার। বলল, মা কেমন আছেন? খুব বুঝি কাঁদছেন মা?
–খুব স্বাভাবিক বোন। মায়েরা তো মা-ই।
নরম, মমতাপূর্ণ কথা আহমদ মুসার।
আহমদ মুসার মমতাভেজানো স্বর সোফিয়ার অন্তর স্পর্শ করল। অপরিচিত লোকটির প্রথম সম্বোধন থেকেই মনে হচ্ছে, বড় ভাইয়ের মত কত আপন! কত পবিত্র ব্যবহার! সোফিয়ার দিকে সে চোখ তুলছেই না। সালমান শামিলের মধ্যেই এ পবিত্রতা সে দেখেছে। সত্যিকার মুসলমানরা এত ভালো! এ চরিত্র তো জগৎ জয় করবেই!
পথে সামনে আশে-পাশে অনেক রক্ত, অনেক লাশ দেখে, পাশ কাটিয়ে সোফিয়া আহমদ মুসার সাথে কন্ট্রোল রুমে প্রবেশ করল। বিস্ময়ের সাথে সে ভাবছিল, এ নরম, পবিত্র মানুষগুলো যুদ্ধে আবার এত কঠোর! একেই কি বলে জীবনের ভারসাম্যতা!
লেডি জোসেফাইন দোতলার দক্ষিণ দিকের উন্মুক্ত ব্যালকনিতে বসে ছিল। রাত তখন আটটা বাজতে যাচ্ছে।
লেডি জোসেফাইনের মুখ দারুণ উদ্বেগে পীড়িত। আধা ঘন্টাখানেক আগে হোয়াইট ওলফের একজন লোক ফাদার পলের খোঁজে তাদের বাড়িতে এসেছিল। বৈঠকখানায় লেডি, সিস্টার মেরী তার সাথে কথা বলছিল। এমন সময় সালমান শামিল সেখানে ঢুকে পড়ে। কিন্তু ঢুকেই আবার ফিরে আসে। ঐ একঝলক দেখাতেই হোয়াইট ওলফের লোক তাকে মনে হয় চিনতে পারে। সে সালমান শামিলকে দেখে চমকে উঠেছিল। এরপর লোকটা আর দেরি করেনি।
লেডি জোসেফাইন উদ্বিগ্ন তার পরিবারের জন্যে, সালমান শামিলের জন্যেও। হোয়াইট ওলফের দয়ামায়াহীন নৃশংসতার কথা সে জানে। বারে বারে ভয়ে শিউরে উঠছে সে।
সিস্টার মেরী পেছন থেকে ধীরে ধীরে এসে মায়ের কাঁধে হাত রাখল। সিস্টার মেরীর মুখও শুকনো।
ফিরে তাকিয়েই লেডি জোসেফাইন মেয়েকে কোলে টেনে নিল।
–মা, তুমি বোধ হয় খুব ভাবছ? বলল সিস্টার মেরী।
–ভাবনার কথাই তো মা!
–ভাবনার কি আছে মা, একজন অসুস্থ মানুষকে চিনে তো আর আশ্রয় দাওনি।
–আমরা তাতে বাঁচব, কিন্তু তুই কি পারবি এভাবে ভাবতে?
সিস্টার মেরী জবাব দিল না। মায়ের কোলে মুখ গুঁজে চুপ করে রইল।
লেডি জোসেফাইন মেরীর মুখটা নিজের মুখের কাছে তুলে ধরল। চোখের জলে ভেসে যাচ্ছে মেরীর মুখ।
লেডি জোসেফাইন মেয়েকে বুকে জড়িয়ে কেঁদে উঠল, একি করেছিস মা!
সিস্টার মেরীরও কান্নার বাঁধ ভেঙ্গে গেল। মাকে জড়িয়ে কান্নায় সে ভেঙ্গে পড়ল।
অনেকক্ষণ পর নিজের চোখ মুছে, মেরীর চোখ মুছে দিয়ে বলল, তুই বুদ্ধিমতি, কিছু বুঝলি না কেন তুই?
মায়ের বুকে মুখ গুঁজে মেরী বলল, আমি জানি না——।
কান্নায় তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেল।
সালমানকে কিছু বলেছিস তুই?
কি বলব?
জানে সে?
জানি না আমি।
লেডি জোসেফাইন মেরীর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, তুই এত অবুঝ!
লেডি জোসেফাইন মেরীকে পাশে বসিয়ে বলল, সালমানকে তো আজকের ঘটনা বলিসনি।
না।
ওকে জানাতে হবে, এখনই ওকে কোথাও সরাতে হবে।
কোথায়?
অন্ততঃ এ বাড়ি থেকে অন্য কোথাও যাতে ওরা ওকে খুঁজে না পায়।
ওকে একা কোথাও পাঠাতে পারব না। মেরীর কন্ঠ ভারি।
একটু দম নিল মেরী। চিন্তা করল। বলল, মা, ওকে গীর্জায় লুকিয়ে রেখে আসি।
গীর্জায়?
লেডি জোসেফাইন একটু চিন্তা করল, দ্বিধা করল, তারপর মুখটা উজ্জ্বল করে বলল, তোর প্রস্তাবটা ভালো। তাই কর।
ঠিক এই সময় স্টেনগানের ব্রাশফায়ারের শব্দ ভেসে এল। একটানা তা চলতেই থাকল।
সালমান শামিল্ও দ্রুত এসে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েছে। সে উৎকর্ণ হয়ে শুনছে।
হঠাৎ ব্রাশফায়ারের শব্দ থেমে গেল।
লেডি জোসেফাইন, সিস্টার মেরী এবয়ং সালমান শামিল নির্বাকভাবে দাঁড়িয়ে আছে।
দু’মিনিটও যায় নি।
একটানা গুলি বর্ষণের আরেকটা শব্দ ভেসে এল। তারপর চুপচাপ।
লেডি জোসেফাইন ও সিস্টার মেরীর মুখ ভয়ে সাদা হয়ে গেছে। কাঁপছে মেরী।
সালমান শামিলের মুখ গম্ভীর এবং শক্ত। সে মেরীদের দিকে তাকিয়ে বলল, দু’পক্ষের মধ্যে গুলি বিনিময় হচ্ছে।
বুঝলে কি করে? শুকনো কণ্ঠে বলল লেডি জোসেফাইন।
দু’ধরনের গান ব্যবহার হয়েছে।
কথা শেষ করে একটু থামল সালমান শামিল। তারপর লেডি জোসেফাইনের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি একটু বেরুতে চাই আম্মা।
কোথায়?
কি ঘটছে দেখা দরকার, জানা দরকার।
না বাবা, তুমি সুস্থ হওনি। গুলি গোলার মধ্যে তোমার যেয়ে কাজ নেই। তুমি একটু সরে থাক। মেরী তোমাকে গীর্জায় রেখে আসবে। অসুবিধা নেই, আমার ছেলের অফিস কক্ষে থাকবে।
কিন্তু—-
কোন কিন্তু নয়, পরিস্থিতি দেখে যা করা যায় করা হবে।
সালমান শামিল নীরব রইল।
সিস্টার মেরী বলল, মা ঠিকই বলেছেন, চলুন।
সালমান শামিল চোখ তুলল মেরীর দিকে। দেখল মেরীর দু’নীল চোখ ভরা উদ্বেগ, আকুলতা। অসহায়া হরিণীর দু’চোখের মত অতলান্ত মমতা সেখানে। সে চোখে চোখ রাখতে গিয়ে কেঁপে উঠল শামিল। সালমান শামিল নীরবে চোখ নামিয়ে নিল। বলল, চল।
সোজা সদর রাস্তা দিয়ে গেল না ওরা গীর্জায়। পেছন দরজা দিয়ে আঁকা-বাঁকা অন্ধকার গলিপথ দিয়ে ওরা চলল গীর্জার দিকে।
কারো মুখে কথা নেই।
সালমান শামিল ভাবছিল গোলাগুলির ব্যাপার নিয়ে। কি ঘটল সেখানে? কোন সেম সাইডের ব্যাপার? না ককেশাস ক্রিসেন্ট থেকে কেউ হানা দিয়েছে? কে হানা দেবে হোয়াইট ওলফের হেডকোয়ার্টারে? সে সাহস, সে শক্তি, সে বুদ্ধি কি ককেশাস ক্রিসেন্টের হয়েছে? যে অবস্থা ককেশাস ক্রিসেন্টের, তাতে উপরে আল্লাহ আর নিচে তিনিই আমাদের ভরসা। তিনি ক্রমে হাল ধরলে ককেশাস ক্রিসেন্টের ডুবন্ত তরী আবার জেগে উঠতে পারে।
নীরবতা ভাঙল মেরীই অবশেষে। বলল, আম্মা আপনাকে গীর্জায় সরিয়ে রাখছেন কেন জানেন?
–এসব গুলি-গোলা দেখে?
–না।
–তাহলে?
–তখন ড্রইংরুমে একজন লোক দেখেছিলেন, সে কে জানেন?
–না, তবে লোকটার দৃষ্টি আমার কাছে ভালো মনে হয়নি।
–লোকটা হোয়াইট ওলফের। আপনাকে চিনতে পেরেছে বলে আমার মনে হয়েছে।
–আমাকে তো বল নি? কেমন করে বুঝলে আমাকে চিনতে পেরেছে?
–আপনাকে দেখার পর আর দেরি করেনি। তার চোখ দেখেই বুঝেছি। সে চমকে উঠেছিল আপনাকে দেখে।
–আমাকে আগে বল নি কেন?
–বলতে পারিনি।
–কেন?
সিস্টার মেরী কোন জবাব দিল না প্রশ্নের। কি জবাব দেবে সে। হঠাৎ যদি কোথাও চলে যায়–এমন একটা ভয় তাকে পীড়িত করেছে। কিন্তু এই ছেলেমানুষির কথা বলবে কি করে।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল, পরে বুঝতে পেরেছি সঙ্গে সঙ্গেই আপনাকে সাবধান করা উচিত ছিল।
–অবশেষে মা-মেয়ে পরামর্শ করে আমার জন্যে গীর্জার ব্যবস্থা করেছ, এই তো! সালমান হাসল।
–আপনার ভয় করছে না?
–কেন ভয় করব? জীবনের?
–কেন, জীবনের কি ভয় নেই?
–আল্লাহ যখন মৃত্যু নির্দিষ্ট রেখেছেন, তার আগে মৃত্যু আসবে না। সুতরাং ভয় করব কেন?
–সাবধান থাকা কি ভয়?
–অবশ্যই না।
গীর্জায় এসে পড়ল ওরা। গীর্জার পেছনের দরজা খুলে ওরা গীর্জায় প্রবেশ করল।
গীর্জার পেছন অংশে প্রার্থনা-মঞ্চের সাথে লাগানো কয়েকটা কক্ষ নিয়ে ফাদার পলের অফিস। অফিসে একটা বিশ্রাম কক্ষ আছে। সেখানে শোবার খাট, ওয়ার্ড্রোব প্রভৃতি প্রয়োজনীয় সব কিছুই আছে।
সিস্টার মেরী আলো জ্বেলে চাদর ও বালিশের কভার পাল্টিয়ে বিছানাটা ঠিক করে দিল।
সালমান শামিল মাথা নিচু করে দেখছিল মেরীর কাজ। তার চোখে বেদনার একটা ছায়া। মেরী বিছানা ঠিক করে উঠে দাঁড়াল। সালমান তার মুখ নিচু রেখেই বলল, মেরী তোমাদের এত ঋণ আমি শোধ দেব কি করে?
মেরীও চোখ নিচে নামিয়ে নিয়েছিল। মাথা নিচু হয়েছিল অনেকখানি।
অনেকক্ষণ কোন কথা বলল না মেরী। অবশেষে চোখ না তুলেই বলল, দাতা-ঘাতকের পরিচয়ই কি সব? মেরীর কণ্ঠ ভারি শোনাল।
–না মেরী, আমার কথার অর্থ তা নয়, আমি বলতে চাচ্ছিলাম, তোমরা আমার জন্যে যা করেছ………
–ঠিকই বলেছেন, কাজই যেখানে বড়, হৃদয় নয় উপকার যেখানে বিবেচনার মানদন্ড, সেখানে তো এভাবেই কথা বলতে হয়। কেঁপে কেঁপে কথাগুলো বেরিয়ে এল সিস্টার মেরীর কণ্ঠ থেকে। যেন কান্না চাপার চেষ্টা করছে সে।
–আমার প্রতি অবিচার করো না মেরী। আমার কথা তোমাকে বুঝাতে পারি নি।
সিস্টার মেরী কোন উত্তর দিল না।
মাথা না তুলেই কয়েক পা এগিয়ে ফ্রিজ খুলে দেখল। তারপর পাশের স্টোররুম থেকে একটা নরমাল ওয়াটারের বোতল এনে টেবিলে রেখে বলল, নরমাল ওয়াটার থাকল, ঠান্ডা পানি খাবেন না।
তারপরে ঘুরে দাঁড়িয়ে সালমান শামিলের দিকে চোখ তুলে ম্লান হেসে বলল, আপনাকে ব্যথা দিয়েছি।
–না, তুমিই কষ্ট পেয়েছ।
সিস্টার মেরী কোন উত্তর না দিয়ে চোখ নামিয়ে বলল, এখন যাই, আসুন দরজাটা লাগিয়ে দেবেন।
গেটের দিকে কিছুটা এগিয়ে ফিরে দাঁড়িয়ে বলল, বাথরুমে গরম পানিও আছে। গরম পানি দিয়ে অজু করবেন।
দরজার কাছাকাছি পৌঁছেছে মেরী এমন সময় দরজায় কেউ নক করল এবং সঙ্গে সঙ্গে সালমানের নাম ধরে ডাকল। থমকে দাঁড়াল মেরী। তার মুখ মুহূর্তে কাগজের মত সাদা হয়ে গেল ভয়ে।
সালমান শামিল তার পাশে এসে দাঁড়াল। তার চোখেও বিস্ময়।
আবার ডাক এল সালমানের নামে।
সালমান শামিলের মন বলল, এটা শত্রুর কণ্ঠস্বর নয়। সালমান শামিল দরজা খোলার জন্যে এগিয়ে গেল।
মেরী তার সামনে গিয়ে দু’হাত বাড়িয়ে তাকে আগলে দাঁড়াল। বলল, খুলতে হয় আমি খুলব, আপনি নন।
ভয় ও উত্তেজনায় কাঁপছে মেরী।
সালমান শামিল মেরীর চোখে চোখ রেখে বলল, আমার চোখে দেখ মেরী, কোন ভয়, দুর্বলতা দেখতে পাও? মুসলমানরা মেয়েদের বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে পেছনে থাকে না।
একটু থেমেই একটু হেসে বলল আবার, তুমি একটু পাশে দাঁড়াও, আমি দেখি। ভয় করো না। রিভলভার আমারও আছে।
বলে সালমান শামিল বাইরের সুইচ টিপে দিয়ে ডান হাত পকেটে পিস্তলের উপর রেখে বাম হাতে দরজা খুলল।
দরজার একেবারে সামনেই ওরা দাঁড়ানো। কাল টুপি, কাল ওভারকোটে দেহ ঢাকা একজন পুরুষ। তার মুখটাই শুধু দেখা যাচ্ছে। শ্মশ্রূমণ্ডিত সুন্দর মুখ। তার স্থির দৃষ্টি সালমান শামিলের উপর নিবদ্ধ। তার দৃষ্টিতে প্রসন্নতা। তার পাশেই কাল ওভারকোট জড়ানো একটা নারী মূর্তি। তার ওভারকোটের কলার কান পর্যন্ত উঠে আসা। মাথা খোলা। তারও স্থির দৃষ্টি সালমান শামিলের উপর। সে দৃষ্টিতে তীব্র এক আবেগ এবং আকুলতা।
সালমান শামিলের দৃষ্টি মেয়েটির উপর পড়তেই ভূত দেখার মতই চমকে উঠল। মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে এল, সোফিয়া তুমি……তুমি!
কথা শেষ করার আগেই সালমান শামিলের কণ্ঠ থেমে গেল।
সালমান শামিলের মাথায় তখনও ব্যান্ডেজ বাঁধা।
সোফিয়ার চোখ সালমান শামিলের উপর আটকে গেছে। এক অব্যক্ত আবেগে তার ঠোঁট থর থর করে কাঁপছে। দু’গন্ড বেয়ে গড়িয়ে এসেছে অশ্রু।
সোফিয়া দু’কদম এগিয়ে সালমানের আরও কাছে সরে এল। বলল, তুমি ভাল আছ তো?
সোফিয়ার আবেগরুদ্ধ কণ্ঠ থেকে কথাগুলো খুব কষ্ট করে বেরিয়ে এল। একটা উচ্ছ্বাস চাপতে সোফিয়া দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরেছে ঠোঁট।
–সোফিয়া তুমি আমবার্ড দুর্গে! আমি স্বপ্ন দেখছি না তো!
সোফিয়ার প্রশ্নের কোন জবাব না দিয়ে বলল সালমান শামিল। তার চোখে তখনও বিস্ময়ের ঘোর। সোফিয়া চোখ মুছে পাশে দাঁড়ানো লোকটির দিকে ইঙ্গিত করে বলল, ওকে চেন?
সালমান শামিল লোকটির দিকে চোখ তুলে দ্বিধাজড়িত কণ্ঠে বলল, না সোফিয়া।
লোকটি মাথার কাল টুপি খুলে ফেলল। টুপির তল থেকে তার বেরিয়ে এল উন্নত ললাট। মাথা ভর্তি কাল কোঁকড়ানো চুল। লোকটির ঠোঁট মিষ্টি হাসিতে ভরা। টুপি খুলেই বলল, আহমদ মুসা।
মুহূর্তেই সালমান শামিলের চেহারা পাল্টে গেল। চোখ-মুখ জুড়ে নেমে এল আনন্দ-আবেগের একটা বাঁধ-ভাঙ্গা তরঙ্গ। মুখ থেকে বেরিয়ে এল, আপনি…… আপনি…… আপনি আহমদ মুসা!
বলে দু’হাত বাড়িয়ে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরল আহমদ মুসাকে। আহমদ মুসা বুকে জড়িয়ে ধরল সালমান শামিলকে। বেশ কিছুক্ষণ থাকল ঐভাবে ওরা। যেন নীরবে হৃদয়ের ভাষায় কথা বলছে ওরা দু’জন।
পরে আহমদ মুসা তাকে বুক থেকে তুলে সালমান শামিলকে একটা চুমু দিয়ে বলল, আল্লাহর হাজার শুকরিয়া সালমান। মাঝে মাঝে আমরা হতাশ হয়েছি তোমাকে আবার আমাদের মাঝে ফিরে পাওয়া সম্পর্কে।
–আমরা জানি মুসা ভাই, আল্লাহ তাঁর সৈনিক আহমদ মুসার কপালে শুধু সাফল্যই লিখে রেখেছেন।
–এভাবে কথা বলো না সালমান। দোয়া করো, দুনিয়ার মজলুম মুসলমানরা যাতে স্বাধীনতা ও স্বস্তির মুক্ত বাতাসে প্রাণভরে শ্বাস নিতে পারে।
সালমান শামিল আহমদ মুসাকে ছেড়ে দিয়ে সোফিয়ার দিকে চেয়ে বলল, তুমি মেরীকে দেখেছো?
বলে সালমান শামিল পেছন দিকে তাকালো। দেখল, দরজার ওপারে আধো আলো-অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে মেরী।
সালমান ওদিকে এগিয়ে গেল। দেখল, মেরী কাঠের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ ফ্যাকাশে, বিধ্বস্ত। চমকে উঠল সালমান শামিল। হৃদয়ের কোথায় যেন একটা খোঁচা লাগলো। যে আশংকা সে ক’দিন থেকে করে আসছে, তা আবার তার মধ্যে মাথা তুলল। মেরী ক্রমেই অবুঝ হয়ে পড়ছে।
যেন কিছু হয়নি এমন কণ্ঠে সালমান শামিল বলল, মেরী, আমাদের নেতা আহমদ মুসা এসেছেন।
তারপর পেছন ফিরে বলল, সোফিয়া এস, দেখ কে।
সোফিয়া ছুটে এল।
মেরীর সামনে এসে মেরীর দিকে চোখ পড়তেই মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। তাকিয়ে রইল মেরীর দিকে। মেরীও চোখ তুলল। মেরীর ঠোঁটে হাসি, কিন্তু চোখের কোণায় অশ্রু। সোফিয়ার মুখে একটা কালো ছায়া ভেসে ওঠে আবার দ্রুত মিলিয়ে গেল। পরক্ষণেই সোফিয়া ঠোঁটে উজ্জ্বল হাসি টেনে জড়িয়ে ধরল মেরীকে।
–কেমন আছিস্ মেরী? বলল সোফিয়া।
–ভাল।
–সালমান শামিলকে কোথায় পেলি?
–দু’দিন আগে রাতে আমাদের বাড়ির সামনে আহত-অজ্ঞান অবস্থায় পেয়েছিলাম। দুই পুরনো বান্ধবী সোফিয়া ও মেরী কথা যেন শেষ করতে পারছিল না। একসময় আহমদ মুসা কথা বলে উঠল, দুঃখিত—সোফিয়া, এখন প্রতিটা মিনিট আমাদের জন্যে একটা দিনের সমান।
সোফিয়া মেরীকে ছেড়ে দিয়ে একটু সরে দাঁড়াল। তাকাল আহমদ মুসার দিকে।
সালমান শামিল আহমদ মুসাকে বলল, আমার উপর কি নির্দেশ মুসা ভাই?
–ককেশাসে নেতৃত্ব তোমার। ককেশাস ক্রিসেন্টের নেতৃত্ব এখন তোমাকেই দিতে হবে। আমার কোন নির্দেশ নেই, অনুরোধ আছে। মুখে মিষ্টি হাসি টেনে বলল আহমদ মুসা।
–ওসব কথা শুনিয়ে লাভ হবে না মুসা ভাই। এখন বলুন আপনার নির্দেশ।
–কন্ট্রোল রুমসহ ঘাঁটি আমাদের দখলে। কিন্তু হোয়াইট ওলফের ডেপুটি চীফ জর্জ জ্যাকব পালিয়েছে। কন্ট্রোল রুমে চল, অত্যন্ত জরুরি কাজ পড়ে আছে। কন্ট্রোল রুমের টেলিভিশন স্ক্রীনে তোমাকে এখানে দেখে সব ফেলে আমরা ছুটে এসেছিলাম। আল্লাহ আমাদের মিশন সফল করেছেন।
সালমান শামিল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকল।
কিছু বলবে সালমান?
আজ কিছুক্ষণ আগে হোয়াইট ওলফের লোক মেরীর বাড়িতে আমাকে হঠাৎ দেখে ফেলে এবং অকস্মাৎ এ গোলাগুলির আওয়াজ শোনার পর মেরীর মা গীর্জায় আমাকে লুকিয়ে রাখার জন্যে পাঠিয়েছিল। মেরীর মাকে কিছু না বলে—-
সালমান শামিল কথা শেষ না করেই চুপ করে গেল।
আহমদ মুসা ভাবছিল।
এমন সময় মেরী এগিয়ে এসে সালমানকে বলল, আমি মাকে সব বুঝিয়ে বলব, উনি ঠিক বলেছেন। আপনি ভাববেন না, মা বুঝবেন।
সালমান শামিল চোখ তুলে তাকাল মেরীর দিকে। মেরী চোখ নামিয়ে নিল।
কথা বলল আহমদ মুসা। বলল, সালমান ঠিক বলেছে বোন। আমি ওদিকটা চিন্তা করিনি। তুমি আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চল তোমার বাসায়।
আহমদ মুসার কণ্ঠে নরম স্নেহের সুর।
মেরী আহমদ মুসার দিকে চোখ তুলল। ভাই ফাদার পল এবং মা লেডি জোসেফাইন ছাড়া এমন স্নেহমাখা কণ্ঠ তো আর কোথাও শুনেনি সে! মেরী চোখ নামিয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে বলল, শুধু মা’র সাথে দেখা করার জন্যে যদি এই পরিমাণ সময় নষ্ট করেন, তাহলে আমি দুঃখ পাব।
–‘সুযোগ পেল আর বলার সৌজন্যটুকু না করেই চলে গেল’ এটা কি মানবতায় বাঁধে না? বলল আহমদ মুসা।
–বাঁধে হয়তো। কিন্তু সেটা সাধারণ ক্ষেত্রে। যুদ্ধকালীন বা কোন জরুরি পরিস্থিতিতে এটা কেউ ধরে না। তাছাড়া মা’র কাছে সৌজন্য প্রকাশের কোন প্রয়োজন নেই। তিনি সালমান সাহেবকে খুবই ভালবাসেন। সালমানের নিরাপত্তাকেই তিনি সবচেয়ে বড় করে দেখবেন।
–কিন্তু আমার খারাপ লাগছে মেরী। বলল সালমান শামিল।
–এমন খারাপ লাগার চেয়ে বাস্তবতার দাবি অনেক বড়।
সালমান শামিল মাথা নিচু করল। কোন কথা মুখে জোগাল না।
আহমদ মুসা এবং সোফিয়া এ্যাঞ্জেলাও নীরব। মেরী গীর্জার দরজা টেনে বন্ধ করে তাতে তালা লাগাল। তারপর ফিরে দাঁড়িয়ে বলল, আপনারা যান, আমি বাড়ি যাচ্ছি।
মেরীর কথার শেষ কয়েকটা শব্দ রুদ্ধ হয়ে আসা তার কণ্ঠে যেন আটকে গেল। মাথা নিচু করে কথাগুলো বলেই দৌঁড় দিল মেরী। মনে হল সে টলছে। মাথা নিচু করে, ছুটে পালিয়ে সে যেন কিছু গোপন করতে চাচ্ছে।
সোফিয়া এ্যাঞ্জেলার মুখে কোন কথা নেই। তার চোখে-মুখে একটা কালো ছায়া। রক্তিম, পাতলা ঠোঁটে তার বেদনার একটা সূক্ষ্ম কম্পন।
সালমান শামিল যখন মুখ তুলল, তার চোখে শূন্য দৃষ্টি। মুখে একটা অপ্রস্তুত ভাব। আহমদ মুসার মুখ গম্ভীর। কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পর ওদের তাড়া দিয়ে বলল, এস যাই।
বলে আহমদ মুসা হাঁটা শুরু করল। সালমান ও সোফিয়াও পা তুলল তার পেছনে পেছনে। হাঁটতে হাঁটতে আহমদ মুসা বলল, ওদের কন্ট্রোল রুমের একটা গোপন ডেস্কে হোয়াইট ওলফের ঘাঁটিগুলোর ঠিকানা, টেলিফোন নাম্বার ও ওয়্যারলেস কোডসহ তাদের নেটওয়ার্কের গোটা লগ পেয়ে গেছি। এখনই আঘাত হানার উপযুক্ত সময়। ওরা জানতে পারার আগে, সরে পড়ার আগে আমাদের আঘাত হানতে হবে।
–আমরা যদি ওয়্যারলেসে এখনি বাকু, কামি, সুমগেইট, ইয়েরেভেন, আলবার্দি, লেনিনাকান ঘাঁটিতে নির্দেশ পাঠাতে পারি, তাহলে রাতের মধ্যেই সবখানে খবর পৌঁছে যাবে এবং ভোর হবার আগেই আমরা সবখানে ওদের ওপর আঘাত হানতে পারি।
–তুমি এখনও জান না সালমান, ককেশাস ক্রিসেন্ট আগের সব ঘাঁটি ছেড়ে দিয়ে নতুন ঘাঁটিতে উঠেছে। আমরা ইচ্ছে করলেও আমাদের সব ঘাঁটিতে খবর পৌঁছাতে পারব না। তবে তুমি যা বলেছ বাকু, কামি, সুমগেইট, ইয়েরেভেন, আলবার্দি, লেলিনাকান, কিরোভাকান প্রভৃতি প্রধান ঘাঁটিগুলোর সাথে এখানে আমবার্ড দুর্গে আসার আগে আমাদের যোগাযোগ হয়েছে। আমরা ওদের কাছে নির্দেশ পৌঁছাতে পারি।
–আমরা ঘাঁটিগুলো পরিবর্তন করলাম কেন?
–শুধু তো ঘাঁটি নয়, ককেশাস ক্রিসেন্টের সব পরিচিত ব্যক্তিত্বকে আন্ডারগ্রাউন্ডে যেতে বলা হয়েছে। এসব করা হয়েছে ককেশাস ক্রিসেন্টের সব তৎপরতা ওদের চোখ থেকে আড়াল করার জন্যে। ওরা আমাদের জানত বলে ইচ্ছেমতো আঘাত করতো। কিন্তু আমরা ওদের জানতাম না, ফলে কিছু করতেও পারতাম না।
–একেই বলে নেতৃত্ব মুসা ভাই। আপনি দু’তিন দিনে যুদ্ধের মোড় একদম ঘুরিয়ে দিয়েছেন। এ সহজ বিষয়গুলোও আমরা আগে চিন্তা করতে পারিনি।
একটু থামল সালমান শামিল। তারপর বলল, আমার বিস্ময় এখনও কাটেনি মুসা ভাই, সোফিয়া এ্যাঞ্জেলাকে আপনি পেলেন কোথায়, আমবার্ড দুর্গের সন্ধান কি করে পেলেন, কেমন করে জানলেন এখানেই আমি বন্দী আছি, আর সিংহের এই অতি শক্তিশালী গুহায় কি করেই বা ঢুকলেন!
–তোমাদের স্যার ডঃ পল জনসন এবং সোফিয়া এ্যাঞ্জেলার মা আমাকে সাহায্য করেছেন। সোফিয়ার মা এবং ডঃ পল জনসনের এ্যাটেনডেন্ট আলফ্রেড যে তথ্য দিয়েছেন, তাতেই আমি স্থির নিশ্চিত হয়েছিলাম, আমবার্ড দুর্গই ওদের হেড কোয়ার্টার এবং এখানেই তোমাকে বন্দী করে রাখা হয়েছে।
সোফিয়ার মা আপনাকে সাহায্য করেছে? কেন? আপনি এদের চিনলেনই বা কিভাবে?
সোফিয়ার মুখ বেদনায় মলিন। সেও আগ্রহের সাথে শুনছিল আহমেদ মুসার কথা।
আহমদ মুসা সালমান শামিলের কথার জবাব দিতে গিয়ে বলল, এখনও তুমি অনেক কিছুই জান না সালমান।
বলে একটু থামল আহমদ মুসা। তারপর আবার শুরু করল, তুমি কিডন্যাপ হবার পর সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা গোপনে তার পিতাকে অনুসরণ করে তোমার সন্ধানে আমবার্ড দুর্গে এসেছিল। ধরা পড়ে যায় সোফিয়া। সোফিয়ার অপরাধের সাথে তার পিতাকেও জড়ানো হয়। মৃত্যুদন্ড হয় সোফিয়ার। হোয়াইট ওলফের নেতা মাইকেল পিটার সোফিয়ার আব্বার হাতে রিভলভার দিয়ে সোফিয়াকে হত্যার নির্দেশ দেয়। কিন্তু সোফিয়ার আব্বা সোফিয়াকে হত্যা না করে নিজের মাথায় গুলি করে হত্যা করে নিজেকে। এর পরপরই আমরা সেখানে পৌঁছি।
আহমদ মুসার শেষ বাক্য শেষ হবার আগেই থমকে দাঁড়িয়েছিল সালমান শামিল সোফিয়ার পথ রোধ করে তার মুখোমুখি। বেদনায় নীল হয়ে গেছে সালমান শামিলের মুখ। সোফিয়া সালমান শামিলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। তার মুখ নিচু। জলে ভরে গেছে তার দুই চোখ। দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে সে নিজেকে সামলাবার চেষ্টা করছে।
সোফিয়া? ডাকল সালমান শামিল। তার কণ্ঠ ভারি।
সোফিয়া কোন উত্তর দিল না, মাথা তুলল না। দু’হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা।
সালমান শামিলও পাথরের মত দাঁড়িয়ে। অন্তরে তার বেদনার ঝড়। সোফিয়া তার জন্যে এত করেছে, এত হারিয়েছে!
জল গড়িয়ে পড়ছিল সালমান শামিলের দু’গন্ড বেয়ে।
আহমদ মুসা কয়েক পা পিছিয়ে এল। অত্যন্ত নরম, অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বলল, সালমান, সোফিয়া এখন কাঁদার সময় নয়, সময় এখন এ্যাকশনের। অনেক কাজ বাকি আমাদের। এস।
বলে আহমদ মুসা আবার হাঁটা শুরু করল।
চোখ মুছে সালমান ও সোফিয়াও পা তুলল।
আহমদ মুসারা কন্ট্রোল রুমে পৌঁছলে প্রাথমিক সালাম, আলাপ-আলিঙ্গনের পর আলী আজিমভ বলল, জর্জ জ্যাকব সম্ভবত দুর্গের দক্ষিণ অঞ্চলে প্রিজন এলাকার কোথাও লুকিয়েছে। প্রিজন গেটের আলোটা কিছুক্ষণ হল হঠাৎ নিভে গেছে। জর্জ জ্যাকবই সম্ভবত বাল্ব ভেঙে দিয়েছে।
দুর্গ থেকে বের হওয়ার গেট তো ঠিক নজরে রেখেছ?
জ্বি, গেট আমরা সব সময় চোখের সামনে রেখেছি। এখন ওসমান এফেন্দীকে ওখানে কাজে লাগাতে পারি।
ঠিক আছে। জর্জ জ্যাকবকে আমরা পরে দেখছি। ওয়্যারলেসের কাজ আমরা সেরে নিই। পালাবে কোথায়? হোয়াইট ওলফের কোন সক্রিয় লোক আর আমবার্ড দুর্গে বেঁচে নেই। বেঁচে থাকলে না মেরে বা না মরে ওরা চুপ থাকতো না।
বলে আহমদ মুসা ওয়্যারলেস সেটের সামনে গিয়ে বসল। সালমান শামিলও গিয়ে বসল তার পাশেই এক চেয়ারে।
আহমদ মুসা হোয়াইট ওলফের নেটওয়ার্ক লগ বই বের করল। তারপর শুরু করল ককেশাস ক্রিসেন্টের ঘাঁটিগুলোতে নির্দেশ প্রেরণ। নির্দেশ তো নয় যেন হোয়াইট ওলফের মৃত্যু পরোয়ানা।
প্রত্যেক ঘাঁটিতে নির্দেশের শেষ কথা হলো, আগামীকাল ভোরের সূর্য যেন হোয়াইট ওলফের কোন ঘাঁটি আর না দেখে।

৬

আমবার্ড দুর্গের প্রিজন এলাকা এবং দুর্গের কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না জর্জ জ্যাকবকে। আমবার্ড দুর্গ থেকে বেরুবার একমাত্র পথ দিয়ে যে সে বেরুতে পারেনি, সে বিষয়ে কোনই সন্দেহ নেই। তাহলে গেল কোথায়? জর্জ জ্যাকবকে যে খুঁজে পেতেই হবে। নেতাদের মধ্যে সেই মাত্র জীবিত বলা যায়। প্রধান সব ঘাঁটি থেকেই খবর এসেছে, অভিযান সফল। হোয়াইট ওলফের কিছু লোক ধরা পড়েছে, অধিকাংশই সংঘর্ষে নিহত হয়েছে।
কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বে আছে আলী আজিমভ। আর সেখানে সহযোগিতায় রয়েছে ওসমান এফেন্দী। জর্জ জ্যাকবের সন্ধানে বেরিয়েছে আহমদ মুসা, সালমান শামিল এবং সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা। সোফিয়া এ্যাঞ্জেলাই চেনে জর্জ জ্যাকবকে।
সব খোঁজা শেষ করে ফেরার পথে ফাদার পল অর্থাৎ মেরীদের বাড়ির মুখোমুখি হলো আহমদ মুসারা। সালমান দেখাল ঐ বাড়িটা মেরীদের।
চল খবর নিয়ে যাই ওদের। বলল আহমদ মুসা।
হ্যাঁ, যাওয়া যেতে পারে আপনি মনে করলে। ওর মা’র সাথে দেখাটাও হয়ে যাবে।
সালমান শামিল মুখে একথা বলল, কিন্তু তার মনে প্রবল একটা অস্বস্তি। সালমান শামিলের মনে পড়ল গীর্জা থেকে মেরীর চলে আসার দৃশ্যটা। এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি তাকে আর হতে হোক সে তা চাইছিল না। কিন্তু এখানে এসে মেরীর মা’র সাথে দেখা না করে চলে যাওয়া কঠিন।
সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা নীরব রইল। কোন কথা সে বলল না। কিন্তু তার মুখের উপর সেই কাল ছায়াটা এসে আবার মিলিয়ে গেল।
মেরীর বাড়ির দিকে চলছিল ওরা। বাড়ির সামনে লনটির কাছাকাছি পৌঁছে সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা জিজ্ঞেস করল, কোথায় তুমি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলে?
লনের মাঝ খানে একটা জায়গা দেখিয়ে দিল সালমান শামিল।
তিন দিন খাদ্য-পানি স্পর্শ না করে এমন সব বাঁধা ডিঙিয়ে ঐভাবে তুমি পালাতে পারলে কিভাবে?
আমারও বিশ্ময় লাগে এখন সোফিয়া।
মনের শক্তি সব শক্তির চেয়ে বড়।
না সোফিয়া, আল্লাহর সাহায্যই সবচেয়ে বড়। দেখ, আমি যে মনের জোরে এ পর্যন্ত এসেছিলাম, সে আমি এখানে পৌঁছার পর শত চেষ্টা করেও নিজের জ্ঞানটা ধরে রাখতে পারিনি। এ থেকে বুঝা যায়, আল্লাহর ইচ্ছা ছিল এ পর্যন্ত পৌঁছি। এখানে পৌঁছার পর মনে হয় আল্লাহ আমার উদ্ধারের প্রয়োজনেই আমার জ্ঞান হারাবার ব্যবস্থা করেছিলেন।
ঠিক বলেছ সালমান। পরিকল্পনা করেই যেন আল্লাহ তোমাকে এনেছিলেন। ভাবতে পারি না, মেরীরা না হয়ে, অন্য কারো হাতে পড়লে কি ঘটত? পালিয়েও আবার শত্রুর হাতে পড়ার নজির আছে।
তাহলে আমাদের আল্লাহর প্রতি তোমার বিশ্বাস বেড়েছে তো! মুখ টিপে হেসে বলল সালমান শামিল।
আল্লাহ কি তোমাদের একার?
একার নয়, কিন্তু তোমরা তো আবার ত্রি- ঈশ্বরে বিশ্বাসী।
বহুবচনে কথাটা বলছ কেন, ‘আমরা’ তো বলছি না।
‘তোমরা’ থেকে তুমি যে ভিন্ন, তোমার সে মনের কথা তো জানি না। ঠোঁটে হাসি টেনে বলল সালমান শামিল।
তোমার জানার তো দরকার নেই, আল্লাহ জানলেই হলো। এই সময় আহমদ মুসা ফিরে এল।
সালমান শামিল ও সোফিয়া লনের মুখে দাঁড়িয়েছিল। আহমদ মুসা সম্ভবত বাড়ির ওপাশটা দেখার জন্যে একটু লনের ওধারে গিয়েছিল।
সে ফিরে এলে তারা লনে প্রবেশ করে বাড়ির দিকে এগুলো।
আগে সালমান শামিল। তার পেছনে সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা। সবশেষে আহমদ মুসা।
গাড়ি বারান্দায় পৌঁছে সামনের দিকে চাইতেই চমকে উঠল সালমান শামিল। দরজা খোলা কেন? এইভাবে রাত তিনটায় দরজা খোলা থাকবে কেন? এমন তো হবার কথা নয়।
সালমান শামিল থমকে দাঁড়াল। পাশে এসে দাঁড়াল আহমদ মুসাও। ব্যাপারটা তার চোখেও ধরা পড়ল।
কি ব্যাপার, দরজা খোলা যে! দু’চোখ কপালে তুলে প্রশ্ন করল আহমদ মুসা।
বুঝতে পারছি না মুসা ভাই, এমন তো হবার কথা নয়।
আহমদ মুসা ও সালমান শামিল দু’জনেই রিভলভার হাতে নিয়ে এক পা দু’পা করে সামনে দরজার দিকে এগুলো।
প্রথমেই ড্রইংরুম। খোলা দরজা দিয়ে তারা তিনজনই ড্রইংরুমে প্রবেশ করল। ড্রইংরুম খালি।
ড্রইংরুমে আলো নেই। করিডোরে আলো।
তারা ড্রইংরুম থেকে করিডোরে পা দিল। করিডোরে ছাড়া নিচে আর কোন রুমে আলো নেই।
সোফিয়াকে সিঁড়ির মুখে দাঁড় করিয়ে রেখে আহমদ মুসা ও সালমান দ্রুত নিচের ঘরগুলো দেখল। না, কেউ কোথাও নেই।
উপরে উঠার সিঁড়িতে আলো
সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠল। সিঁড়ির মুখেই পারিবারিক ড্রইংরুম। তারও দরজা খোলা এবং ঘরে আলো জ্বলছে। কিন্তু শূন্য ঘর।
সালমান শামিলের চোখে তখন বিস্ময়ের বদলে উদ্বেগ এসে বাসা বেঁধেছে। আহমদ মুসারও কপাল কুঞ্চিত।
সালমান ড্রইংরুমে একবার চোখ বুলিয়েই ছুটল সিস্টার মেরীর রুমের দিকে। মেরীর রুমের দরজাও খোলা। ঘর শূন্য। শূন্য ঘরের দিকে একবার তাকিয়েই সালমান শামিল ছুটল লেডি জোসেফাইনের রুমের দিকে। সেখানেও একই দৃশ্য। দরজা খোলা, ঘর শূন্য।
শূন্য ঘরের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধভাবে দাঁড়িয়ে রইল সালমান শামিল। কিছু আর ভাবতে পারছে না সে। তার চিন্তা শক্তি যেন ভোঁতা হয়ে গেছে।
তার পাশে এসে দাঁড়ালো আহমদ মুসা। তার চোখে বিস্ময়।
পাশে এসে দাঁড়াতেই সালমান শামিল বলল, কিছু বুঝতে পারছেন মুসা ভাই?
বুঝতে পারছি।
কি? ওরা কোথাও চলে গেছেন?
চলে গেছেন তো বটেই, কিন্তু তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
কেমন করে বুঝলেন?
সে তো স্পষ্ট, দরজাগুলো খোলা, আলোও নিভানো নয়।
কে তাদের নিয়ে গেল, হোয়াইট ওলফ?
তা বলতে পারবো না, তবে যে বা যারাই হোক, তারা মেরীদের একেবারে অপরিচিত নয়। তাকে বা তাদের ভেতরের ড্রইংরুমে বসানো হয়েছিল। সে ড্রইংরুমে আসেন লেডি জোসেফাইন এবং মেরী। সেখান থেকেই তাদের নিয়ে যাওয়া হয়।
এটা তো অনুমান।
অনুমান, কিন্তু এটাই ঘটেছে। দেখ না, ড্রইংরুম থেকে নেমে বেরিয়ে যাবার পথ, সিঁড়ি এবং করিডোরেই শুধু আলো।
এই সময় সোফিয়া এ্যাঞ্জেলা এসে ঘরে ঢুকল। সে ছোট্ট একটি চিরকুট তুলে দিল আহমদ মুসার হাতে।
আহমদ মুসা চিরকুটটিতে নজর বুলিয়েই তা তুলে দিল সালমান শামিলের হাতে।
সালমান শামিল চিরকুটটি হাতে নিয়ে লেখার দিকে তাকিয়েই চিনতে পারল। লেখাটা মেরীর হাতের। পড়ল সালমানঃ
“প্রিয় ভাই, ফাদার পল,
জর্জ জ্যাকব এসেছেন। কোথাও আমাদের নিয়ে যাচ্ছেন। না গেলে বেঁধে নিয়ে যাবেন। রিভলভার হাতে করেই এসেছেন। সব কথা লেখার সময় নেই। ওদের কাছে অপরাধ আমাদের একটা আছে, কিন্তু সে অপরাধটা আমার জন্যে পরম সৌভাগ্য ভাইয়া।
মেরী।”
চিরকুটটা মুড়ে হাতের মধ্যে নিয়ে সালমান শামিল বলল, ব্যাপারটা পরিষ্কার মুসা ভাই। আমাকে আশ্রয় দেয়ার ব্যাপারটা হোয়াইট ওলফ নেতৃবৃন্দ জানতে পেরেছে। পরাজিত জর্জ জ্যাকব তাই সম্ভবত প্রতিশোধ নিতে চেয়েছে ওদের উপর দিয়ে। তাই ওদের ধরে নিয়ে গেছে।
আহমদ মুসা চুপ করে ছিল। সে অন্যমনস্ক। সালমান শামিলের কোন কথাই বোধ হয় কানে গেল না। অনেকক্ষণ পর মুখ তুলে বলল, আমবার্ড দুর্গের এ দিকে প্রাচীরে নিশ্চয় কোন গোপন দরজা আছে।
বলে আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়াল। বলল, চল সব দরজা বন্ধ করে আলো নিভিয়ে দিয়ে আমরা নিচে নেমে যাই।
গেটের দরজাটা লক করে আহমদ মুসা, সালমান শামিল ও সোফিয়া লনে বেরিয়ে এল। আহমদ মুসার মুখ গম্ভীর। আর একটি কথাও বলেনি আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার এ গাম্ভীর্যের সাথে সালমান শামিল ও সোফিয়া ইতোমধ্যেই পরিচিত হয়ে উঠেছে। আহমদ মুসা যখন কোন সিরিয়াস বিষয় হাতে নেয়, তখন সে এমন গম্ভীর ও অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে।
লনে বেরিয়ে এসেই আহমদ মুসা সালমান ও সোফিয়ার দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে বলল, আমবার্ড দুর্গের এ দিকের বহির্দেয়াল আমি পরীক্ষা করতে চাই। তোমরা কন্ট্রোল রুমে ফিরে যাও। সোফিয়ার কষ্ট হচ্ছে।
সালমান শামিল ও সোফিয়া একসংগেই বলে উঠল, কন্ট্রোল রুমে আমাদের কোন কাজ নেই। আপনার সাথেই আমরা থাকব।
আহমদ মুসা চোখ বন্ধ করে একবার আরাগাত পর্বত ও আমবার্ড দুর্গের অবস্থানের দিকে দৃষ্টিপাত করল। তার মনে হল, আমবার্ড দুর্গের পূর্ব দিকের আরাগাত পর্বত দুর্গম ও ক্রমশঃ উঁচু হয়ে উঠেছে। পশ্চিম দিকের অবস্থা সে রকম নয়। আহমদ মুসা স্থির করল, দুর্গের পশ্চিম দেয়াল থেকেই তারা অনুসন্ধান শুরু করবে।
আহমদ মুসা পা চালাল দুর্গের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের দিকে।
আহমদ মুসা আগে আগে হাঁটছিল। পেছনে সালমান শামিল ও সোফিয়া।
কি সাংঘাতিক ঘটনা ঘটল বলতো? বলল সোফিয়া।
আমি নিজেকে খুব অপরাধী বোধ করছি সোফিয়া।
হোয়াইট ওলফ তোমাকে ওখানে দেখেছে, এটা জানার পর ব্যাপারটাকে যে গুরুত্ব দেয়া দরকার ছিল, তা দেয়া হয়নি। মেরীকে রাতে ঐ ভাবে ছাড়া, তার বাড়িতে না যাওয়া বোধহয় আমাদের ঠিক হয়নি।
হয়তো তাই। ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিলে, তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করলে, এ মর্মান্তিক ঘটনা হয়তো এড়ানো যেত।
তুমি মেয়েটির মুখোমুখি হতে ভয় করেছ, তাই মেয়েটি যা বলল তা মেনে নিয়ে তার বাড়িতে গেলে না। তাদের নিরাপত্তার কথাও চিন্তা করতে পারনি এই কারণেই।
হবে হয়তো, কিন্তু আমি যা করেছি, আমার জন্যে সেটাই স্বাভাবিক ছিল সোফিয়া।
তুমি তো কোন দিকে চোখ তুলে চাও না, তুমি কি কোন সময় তার চোখের দিকে চেয়েছ?
চেয়েছি। কিন্তু যা দেখেছি, তাতো আমি দেখতে চাইনি।
তোমার চাওয়ার উপরই কি সব নির্ভর করবে? তাদের কথায় ছেদ পড়ল।
আহমদ মুসা প্রিজন ব্রীজের মুখে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। সালমান শামিল ও সোফিয়া কিছু পিছিয়ে পড়েছিল। আহমদ মুসা ডাকল, এখান থেকেই আমাদের কাজ শুরু হবে, এস তোমরা।
আহমদ মুসার হাতে বিরাট রকমের একটা হাতুড়ি।
সালমান শামিল ও সোফিয়া গিয়ে তার কাছে পৌঁছল।
পশ্চিম প্রাচীর ধরে তারা এগিয়ে চলল। যেখানেই সন্দেহ হচ্ছিল আহমদ মুসা হাতুড়ির ঘা দিয়ে প্রাচীর পরীক্ষা করছিল।
আহমদ মুসার বিশ্বাস, কোনও ভাবে প্রাচীর ডিঙিয়ে দুর্গের বাইরের পাহাড়ী নদী অতিক্রম করেই জর্জ জ্যাকব পালিয়েছে। কিন্তু প্রাচীরের কাঁটাতারের বেড়ায় যেহেতু বিদ্যুৎ স্বাভাবিক আছে এবং কোথাও কোন ছেদ পড়েনি, তাই তারা প্রাচীর ডিঙিয়ে যায়নি এটা পরিষ্কার। প্রাচীরের গায়ে নিশ্চয় কোনও গোপন পথ আছে, সেই পথেই জর্জ জ্যাকব পালিয়েছে। কিন্তু পালিয়েছে তা স্পষ্টভাবে না জানা পর্যন্ত এটা অনুমান এবং অনুমানের উপর ভিত্তি করে কোন পদক্ষেপই নেয়া যায় না।
প্রাচীরের গোড়া দিয়ে হেঁটে তারা প্রাচীর বরাবর চলছিল। এক জায়গায় এসে তাদের গতি রুদ্ধ হয়ে গেল। দুর্গের প্রাচীরের সাথে প্রাচীর ঘেরা আরেকটা বাড়িতে এসে তাদের গতি রুদ্ধ হয়ে গেল।
তারা প্রাচীর ঘুরে বাড়িটির সামনে এল। চারিদিকে টর্চ ফেলে এবং বাড়িটি দেখে বুঝল, এটা হোয়াইট ওলফ নেতা মাইকেল পিটারের বাড়ি। এ বাড়ি তারা কিছুক্ষণ আগেই সার্চ করে গেছে।
আহমদ মুসার মনে হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মত একটা চিন্তা এল, দুর্গের প্রাচীরের সাথে দেয়াল ঘিরে এ বাড়ি তৈরি কেন? তাহলে কি দুর্গ থেকে নদী পথে বেরুবার মত প্রাচীরের সেই গোপন দরজা কি মাইকেল পিটারের বাড়ির ভেতর দিয়েই? আহমদ মুসার কেন জানি মনে হল, তার এ চিন্তার মধ্যে কোনও ভুল নেই।
আহমদ মুসা সালমান শামিলের দিকে চেয়ে বলল, সালমান, আমরা বোধ হয় প্রাচীরের সেই গোপন দরজা পেয়ে গেছি।
কোথায়?
–আমার মনে হচ্ছে, মাইকেল পিটারের বাড়ির সীমার মধ্যে প্রাচীরের যে অংশ পড়েছে, তার কোথাও সেটা আছে।
সালমান শামিলেরও মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, বলল, ঠিক ধরেছেন মুসা ভাই। দুর্গের প্রাচীরে সেরকম দরজা যদি আর থাকেই, তাহলে সেটা এখানেই। আমারও এটা নিশ্চিত বিশ্বাস।

Page 118 of 165
Prev1...117118119...165Next
Previous Post

পরী – আলাউদ্দিন আল আজাদ

Next Post

বিচিত চিন্তা – সাহিত্য চিন্তা – আহমদ শরীফ

Next Post

বিচিত চিন্তা – সাহিত্য চিন্তা - আহমদ শরীফ

বিচিত চিন্তা - সংস্কৃতি চিন্তা - আহমদ শরীফ

মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সাম্প্রতিক প্রকাশনাসমূহ

  • তিন গোয়েন্দা ভলিউম ১১৫: ভূমিকম্প – শামসুদ্দীন নওয়াব
  • তিন গোয়েন্দা ভলিউম ১১৮: বিভীষিকার প্রহর – রকিব হাসান
  • তিন গোয়েন্দা ভলিউম ১১৭: বড়দিনের ছুটি – রকিব হাসান
  • তিন গোয়েন্দা ভলিউম ১১৭: আলাস্কা অভিযান – রকিব হাসান
  • তিন গোয়েন্দা ভলিউম ১১৭: আমিই কিশোর – রকিব হাসান

বিভাগসমূহ

  • আত্মজীবনী
  • ইতিহাস
  • উপন্যাস
  • কবিতা
  • কাব্যগ্রন্থ
  • গল্পের বই
  • গোয়েন্দা কাহিনী
  • ছোট গল্প
  • জীবনী
  • দর্শন
  • ধর্মীয় বই
  • নাটকের বই
  • প্রবন্ধ
  • বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী
  • বৈজ্ঞানিক বই
  • ভূতের গল্প
  • রহস্যময় গল্পের বই
  • রোমাঞ্চকর গল্প
  • রোম্যান্টিক গল্পের বই
  • শিক্ষামূলক বই
  • আমাদের সম্পর্কে
  • যোগাযোগ
  • গোপনীয়তা নীতি

© 2023 BnBoi - All Right Reserved

No Result
View All Result
  • বাংলাদেশী লেখক
    • অতুলচন্দ্র গুপ্ত
    • অভিজিৎ রায়
    • আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    • আনিসুল হক
    • আবু ইসহাক
    • আবু রুশদ
    • আবুল আসাদ
    • আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন
    • আবুল বাশার
    • আরজ আলী মাতুব্বর
    • আল মাহমুদ
    • আসাদ চৌধুরী
    • আহমদ ছফা
    • আহমদ শরীফ
    • ইমদাদুল হক মিলন
    • উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    • কাসেম বিন আবুবাকার
    • জসীম উদ্দীন
    • তসলিমা নাসরিন
    • দাউদ হায়দার
    • দীনেশচন্দ্র সেন
    • নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    • নিমাই ভট্টাচার্য
    • প্রফুল্ল রায়
    • প্রমথ চৌধুরী
    • ময়ূখ চৌধুরী
    • মহাদেব সাহা
    • মাহমুদুল হক
    • মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    • হুমায়ূন আহমেদ
  • ইন্ডিয়ান লেখক
    • অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়
    • অতুল সুর
    • অদ্রীশ বর্ধন
    • অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    • অনীশ দেব
    • অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    • অমিয়ভূষণ মজুমদার
    • আশাপূর্ণা দেবী
    • আশুতোষ মুখোপাধ্যায়
    • ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    • কাজী নজরুল ইসলাম
    • ক্ষিতিমোহন সেন
    • তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    • তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়
    • দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    • নারায়ণ সান্যাল
    • নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    • নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    • পাঁচকড়ি দে
    • পূর্ণেন্দু পত্রী
    • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    • বিমল মিত্র
    • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    • হেমেন্দ্রকুমার রায়
  • বিভাগসমূহ
    • আত্মজীবনী
    • ইতিহাস
    • উপন্যাস
    • কবিতা
    • কল্পকাহিনী
    • কাব্যগ্রন্থ
    • খেলাধুলার বই
    • গল্পের বই
    • গোয়েন্দা কাহিনী
    • ছোট গল্প
    • জীবনী
    • দর্শন
    • ধর্মীয় বই
    • নাটকের বই
    • প্রবন্ধ
    • বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী
    • বৈজ্ঞানিক বই
    • ভূতের গল্প
    • মুক্তিযুদ্ধের-বই
    • রহস্যময় গল্পের বই
    • রোমাঞ্চকর গল্প
    • রোম্যান্টিক গল্পের বই
    • শিক্ষামূলক বই
    • সমগ্র
  • সিরিজ বই
    • মিসির আলী সমগ্র
    • হিমু সিরিজ

© 2023 BnBoi - All Right Reserved

Welcome Back!

Login to your account below

Forgotten Password?

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In