বাকু-নাগারনো কারাবাখ সড়কের একটা শাখা যেখানে দিঘির পূর্ব পাড়ের বাগানে এসে প্রবেশ করেছে, সেখানে দুজন প্রহরী স্টেনগান হাতে বসে । আরেক জন প্রহরী বাগানের উত্তর-পশ্চিম কোণ যেখানে শেষ হয়েছে তার কয়েক গজ সামনে দিঘির বাঁধানো পাড়ে বসে। তার হাতেও স্টেনগান। তার সন্ধানী দৃষ্টি আল্লামা এদিতনার বাড়ির দিকে। অন্য একজন প্রহরী দক্ষিণ দিক থেকে পায়ে চলা যে রাস্তাটি মাদ্রাসার পূর্ব পাশ দিয়ে উঠে এসেছে, তার মুখে দাঁড়িয়ে। আল্লামা এদতিনার বাড়ির উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকটায় পাহাড়। পাহাড়গুলো আবার পানি ও জঙ্গলে পূর্ণ গভীর উপত্যকা দিয়ে ঘেরা।
রাত তখন দুটা।
আকাশে চাঁদ নেই। রাস্তার বিজলী বাতিগুলো অন্ধকারের সাথে লড়াই করে অবরুদ্ধ অবস্থায় আত্মরক্ষা করে চলেছে। রাস্তার বাতি ছাড়াও আল্লামা এদতিনার বাড়ির সামনে একটা, মসজিদের সামনে একটা, মাদ্রাসার সামনে একটা এবং পূর্ব পাড়ের দিঘির ঘাটে একটা আলো জ্বলছে। সব মিলে একটা আলো-আঁধারীর এই লুকোচুরি খেলায় আঁধারকেই বিজয়ী দেখা যাচ্ছে। কালো পোশাক পরা এক ঝাঁক লোককে অন্ধকার সাপের মত গড়িয়ে গড়িয়ে আল্লামা এদতিনার বাড়ির দিকে আসতে দেখা গেল। তারা আসছে সড়ক পথ-বাদ দিয়ে পাথর ও আগাছা ভরা নিম্নভূমি দিয়ে। পিঠে তাদের একটি করে কালো ব্যাগ আছে, একটি করে খাটো নলওয়ালা রাইফেল। কোমরে ঝুলানো পিস্তল। মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে এগিয়ে আসছে।
নিঃশব্দে তারা উঠে এল বাগানে। বাগানে উঠে ওরা ব্যাগ থেকে গ্যাস মাস্ক বের করে নিল। তারপর বিনা বাক্যব্যয়ে তারা তিন দলে বিভক্ত হয়ে গেল। একদল গেল উত্তর দিকে সড়কটি যেখানে এসে মিশেছে সেই দিকে। মনে হল তাদের লক্ষ্য সড়কের মুখে বসে থাকা স্টেনগানধারী দুজন প্রহরী। দ্বিতীয় দল এগলো বাগানের মধ্য দিয়ে পশ্চিম দিকে। আর তৃতীয় দলটি বাগানের পূর্ব ও দক্ষিণ দিক ঘুরে সেই পায়ে হাঁটা রাস্তার মুখের দিকে এগুলো। মনে হল, তারা পরিস্কার জানে প্রহরীরা কে কোথায়।
বাগানে নানা রকম ফুল ও ফলের গাছ সারিবদ্ধভাবে লাগানো। বাগানের গাছের তলায় ঘুটঘুটে অন্ধকার। এই অন্ধকারকে আশ্রয় করে দুই সারির মাঝখানের সরল প্যাসেজ দিয়ে ধীরে নিঃশব্দে ওরা এগিয়ে চলল। উত্তরের দলটি সড়ক মুখে বসে থাকা সেই দুজন প্রহরীর পাঁচ গজের মধ্যে গিয়ে পৌঁছল। কিন্তু গাছের আড়ালে দেখা যাচ্ছে না ওদের। দুজনকে থামতে বলে দলের একজন আরো বাঁয়ে ঘুরে সামনে এগুলো। পেছনটা বাগানের মধ্যে বলে দলের একজন আরো বাঁয়ে ঘুরে সামনে এগুলো। পোছনটা বাগানের মধ্যে রেখে মাথা বাড়িয়ে পূর্বদিকে তাকিয়ে দেখল, প্রহরী দুজন পূর্বদিকে তাকিয়ে বসে আছে।
হাসি ফুটে উঠল লোকটির মুখে। খাটো নল রাইফেলটি পিঠ থেকে হাতে নিয়ে পাশাপাশি দুজনের একজনকে তাক করে ট্রিগারে চাপ দিল। ক্লিক করে সাড়া দিয়ে উঠল ট্রিগারটি। সাইলেন্সার লাগানো রাইফেল থেকে দুপ করে একটি ক্ষুদ্র নিউট্রন বুলেট বেরিয়ে গেল। নিউট্রন বুলেট নিউট্রন বোমার ক্ষুদ্রতম একটি সংস্করণ। বুলেটটি নির্দিষ্ট একটা দূরত্ব পার হওয়া কিংবা কারো গায়ে আঘাত করার সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরিত হয়ে যায়। তারপর সেকেন্ডের মধ্যেই পাঁচ বর্গগজের মধ্যেকার সব প্রাণী নীরবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। বাতাসে নিউট্রন বুলেটের কার্যকারিতা ত্রিশ সেকেন্ডের বেশি স্থায়ী হয় না।
প্রহরী দুজন ‘দুপ’ শব্দ শুনে চমকে পেছনে তাকয়েছিল এবং ঐ ভাবেই তারা নিঃশব্দে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। তাদের শিথিল হাত থেকে খসে পড়ল স্টেনগান।
এ দলটি বাগানের পাশে অন্ধকারে বসে একটু জিরিয়ে নিল। তারপর একজন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আর্মেনিয় ভাষায় বলল, চল।
তারা তিনজন রাস্তা ধরে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে চলল দিঘির পাড়ের দিকে।
বাগানের কোণায় গিয়ে উঁকি মেরে দেখল, দিঘির পাড়ে বসা প্রহরীটি ঢলে পড়ে আছে মাটিতে এবং মাঝখানের দলটি এগিয়ে যাচ্ছে মাদ্রাসার হোস্টেল ভবনের দিকে। পরিকল্পনা অনুসারে দ্বিতীয় ও তৃতীয় দলটি প্রহরীদের সরিয়ে ফেলার পর সম্মিলিতভাবে মাদ্রাসা হোস্টেলে আপারেশন চালায়। হোস্টেলের পাঁচশ নিবেদিত ছাত্রই এখানকার শক্তির উৎস। ওদেরকে আগে সরাতে হবে।
দশ সদস্যের সম্মিলিত দল উঠে গেল পাঁচ তলা হোস্টেলে। প্রতি তলায় দুজন করে। তাদের এক হাতে নিউট্রন রাইফেল, অন্য হাতে নিউট্রন স্প্রেয়ার। তারা প্রতিটি রুমে দরজার নিচ দিয়ে নল ঢুকিয়ে নিউট্রন গ্যাস স্প্রে করতে শুরু করল।
মাদ্রাসা হোস্টেলে আপারেশন শেষ করে আধা ঘন্টা পরে সম্মিলিত দলটি ফিরেএল আল্লামা এদতিনার বাড়ির সামনে পুকুরের কোণায় বসা প্রথম দলটির কাছে। অপারেশনের দ্বিতীয় পর্যায় নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হওয়ার আনন্দে ওরা হেঁটেই এল দিঘির পাড় দিয়ে।
তিনটি গ্রুপ একত্রিত হয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে চলল এদতিনার বাড়ির দিকে।
এদতিনার বাড়ির সামনে, যেখানে পাথর বিছানো পায়ে হাঁটার রাস্তাটা শেষ হয়েছে, সেখানে একটা ছাদওয়ালা খোলা উঁচু বারান্দা। মাঝে মাঝে আল্লামা এদতিনা অবসর সময়ে চেয়ার নিয়ে এখানে বসে কারো সাথে আলাপ করেন কিংবা তাকিয়ে থাকেন দিঘির স্বচ্ছ পানির দিকে, অথবা চোখ মেলে ধরেন তিনি নীল আকাশের দিকে।
পাথর বিছানো পায়ে হাঁটা রাস্তা থেকে তিন ধাপ উঠলেই বারান্দা। বারান্দা পেরিয়ে গেলে একটা বড় দরজা। ওটা একটা হলঘর … পারিবারিক বৈঠকখানা হিসেবে ব্যবহার হয়। বৈঠকখানা পেরুলে খাবার ঘর। খাবার ঘর থেকে বাম দিকের প্যাসেজ ধরে এগুলো আল্লামা এদতিনার শোবার ঘর।
আল্লামা এদতিনার বিরাট পরিবার।
কালো কাপড়ে সর্বাঙ্গ ঢাকা গ্যাস মাস্ক পরা ছায়ামূর্তিরা সেই বারান্দায় উঠে এল। সবাই নয়, বুকে কালা কাপড়ের ওপর সাদা নেকড়ে আঁকা দলপতিসহ চারজন। অন্যরা বারান্দার নিচে দাঁড়িয়ে থাকল রাইফেল বাগিয়ে প্রস্তুত হয়ে।
দলপতি লোকটা সম্ভবত লক পরীক্ষার জন্যে দরজার দিকে এগুলো। এ সময় ঝট করে দরজা খুলে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গেই দরজা দিয়ে ছুটে এল এক ঝাঁক গুলী।
বারান্দায় দাঁড়ানো চারজন কিছু বুঝার আগেই ঢলে পড়ল ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া দেহ নিয়ে।
কিন্তু যারা বারান্দার নিচে দাঁড়িয়েছিল, তাদের মাথার উপর দিয়ে চলে গেল গুলী। ফলে তারা বসে পড়ার এবং পাল্টা আক্রমণের সুযোগ পেয়ে গেল। তাদের কয়েকজনের নিউট্রন রাইফেল থেকে সেই ‘দুপ’ আওয়াজ উত্থিত হলো। নিউটন বুলেটগুলো ছুটে গেল ভেতরে।
স্টেনগান হাতে আল্লামা এদতিনা এবং তার ছেলে আবদুল্লাহ এদতিনা গুলী করতে করতে তখন দরজা পর্যন্ত ছুটে এসেছিলেন। কিন্তু নিউট্রন বুলেট তাদের এগুতে দিলনা। পাকা ফলের মতো তাদের দেহ ঝরে পড়ল দরজার ওপরেই।
বারান্দার নিচের ছায়ামূর্তিগুলো উঠে এল বারান্দায়। কালো মুখোশের নিচে তাদের চোখগুলোতে হিংসার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। তাদের কয়েকজন ছুটল বাড়ির ভেতরে। একজন চিৎকার করে নির্দেশ দিল, নিউট্রন বুলেট নষ্ট করবেনা। ওদের স্টেনগান দিয়েই ওদের সৎকার করে এস।
ভেতর থেকে ভেসে এল স্টেনগানের একটানা গুলীর শব্দ এবং শিশু ও নারীর বুকভাঙা আর্তনাদ।
