হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল সালমান শামিলের। ঘড়ির রেড়িয়াম ডায়ালের দিকে চেয়ে দেখল রাত দুটা। এ সময়ে ঘুম ভাঙল কেন?
এই সাথে খেয়াল হল, সে তো বিছানায় শুয়ে নেই, সোফায়। মনে পড়ল, সোফায় হেলান দিয়ে চিন্তা করতে করতেই সে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছে।
সোফিয়ার দেয়া তথ্য নিয়েই চিন্তা করছিল সালমান শামিল। ককেশাসের মুসলিম কম্যুনিটির এ পর্যন্ত পঁচিশজন নেতা হারিয়েছে।
সালমান শামিল জানে। এই হারিয়ে যাওয়ার তালিকায় সেও থাকতে পারে। প্রতিভাবান ও সম্বাবনাময় ছাত্র বলে শুধু নয় । তার সবচেয় বড় অপরাধ হল সে ইমাম শামিল এর বংশধর।
ঈমাম শামিল ককেশীয় মুসলমাদের কিংবদন্তীর নায়ক অকুতভয় স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং ককেশীয় মুসালমানদের অবিসংবাদিত আধ্যাত্তিক নেতা। ইমাম শামিল উনিশ শতকের মধ্য ভাগের প্রায় চার দশক ধরে ককেশীয় মুসলমানদের নেতৃত্ব দিয়েছেন। জনগণকে সংঘবদ্ধ করে রাশিয়ার জারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। বহু বছর তিনি জারের সংগ্রাম ঠেকিয়ে রেখেছিলেন। রুশ বিপ্লবের পর লিখিত সোভিয়েত এনসাইক্লোপেডিয়ার প্রথম সংস্করণেও তার জার বিরোধী সংগ্রামের প্রশংসা আছে । তাতে পরিস্কার বলা হয়ছিল ককেসীয় পাহাড়ী জনগণের জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের মহান নায়ক ছিলেন শামিল। জার শাসিত রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধেই ছিল তার সংগ্রাম।
কিন্তু পরবর্তীকালে সোভিয়েত কম্যুনিস্টরা যখন দেখল শামিলকে স্বীকৃতি দিলে শামিলের ইসলামী আন্দোলনের প্রতিও স্বীকৃতি দেয়া হয়ে যা, তখন তারা ইতিহাস পাল্টায়। ককেশাসের মীরজাফর বাগীরভ ও দানিয়ালভদের দ্বারা ঘোষণা করা হলো শামিলকে জাতীয় নেতা বলে স্বীকার করা যেতে পারে না। বলা হলো শামিলের ইসলামী আন্দোলন প্রগতিশীল ও স্বাধীনতাকামী হতে পারে না।
সেই ইমাম শামিল এর বংশধর সালমান শামিলের ভর্তি নিয়েও অনেক টাল বাহানা হয়েছে। কিন্তু তার ব্যতিক্রমধমী রেজাল্টই ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের দরজা তার সামনে খুলে দিয়েছে।
সোফিয়ার ওটুকু ইংগিতই সালমান শামিলের জন্য যথেষ্ট হয়েছে। সালমান শামিল ইমাম শামিলের প্রতিষ্ঠিত ইসলামী আন্দোলন ককেশাস ক্রিসেন্ট এর যুব শাখার প্রধান। তার চিন্তার বিষয় ছিল, এখন তার কি করনীয়। অদৃশ শত্রুর বিরুদ্ধে কি করে সে লড়াই করবে? এ অদৃশ শত্রুদের তারা চেনে। কিন্তু কারা কোত্থেকে কিভাবে কাজ করে চলেছে এটাই জানা নেই তাদের। এরা অত্যন্ত কুশলী এবং দক্ষ। তারা কাজ করে কিন্তু পেছনে কোন চিহ্ন রেখে যায় না।
সালমান শামিল দুচোখ ভালো করে রগডে সোফা থেকে উঠতে যাচ্ছিল। হঠাৎ একটা ধাতব গন্ধ তার নাকে প্রবেশ করল। বিজ্ঞানের ছাত্র সালমান শামিল সংগে সংগে বুজতে পারল এটা গলিত ইস্পাতের গন্ধ। বুঝার সাথে সাথেই আঁৎকে ঊঠল সালমান শামিল। তাহলে কি ঘরের ইস্পাতের লক গলিয়ে ফেলা হচ্ছে!
সালমান শামিল দ্রুত সন্তর্পণে ছুটে গেল প্রথমে বাইরের ব্যালকনির দিকের দরজার কাছে। দরজার লকের দিকে তাকাতেই কীহোল দিয়ে ক্ষুদ্র একবিন্দু চোখ ধাঁধানো নীল আলো দেখতে পেল। বুঝলো ল্যাসার বিম দিয়ে দরজার লক গলিয়ে ফেলা হচ্ছে।
সালমান শামিলের কাছে সব পরিস্কার হয় গেল। মনে পড়ল সোফিয়ার সাবধান বানীর কথা।
সালমান শামিল তাড়াতাড়ি দরজার পাশে রাখা ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করার বাড়তি ব্যবস্থা লোহার মোটা বার তুলে সন্তর্পণে চৌকাঠের দুই হুকে ঢুকিয়ে দিল। সালমান শামিল জানে ল্যাসার বিম দিয়ে গোটা দরজাই উড়িয়ে দেয়া যাবে। তবু এই ব্যবস্থা এ জন্যই যে, কিছুটা সময় হাতে পাওয়া যাবে।
সালমান শামিল দ্রত ভেতরের দরজা খুলে বাড়ির ছাদে উঠে এল। সিড়ি দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করল না। সেখানে পাহারা থাকবে নিশ্চিত।
সালমান শামিলের এ বাড়িটি সেন্ট জন পল রোডের পাশেই। এ রোডের মাঝামাঝি গোল্ডেন প্লাজা এলাকায় একটা ছোট রাস্তা সেন্ট জন পল রোড থেকে পূর্বদিকে বেরিয়ে গেছে। এই রাস্তা দিয়ে শ’দুয়েক গজ গেলেই এই বাড়ি। বাড়িটির উত্তর পাশ দিয়েই ঐ রাস্তাটির পূর্ব ও দক্ষিন পাশ খোলা। পশ্চিম পাশে একটা বাড়ি। দুই বাড়ির মাঝখানে অন্ধকার। সুইপার প্যাসেজ। প্যাসেজটির মাথায় একটি ভাঙা দরজা।
আটটি ফ্ল্যাট বিশিষ্ট চারতলা বিল্ডিং এর টপ ফ্লোরে একটা ফ্ল্যাট নিয়ে থাকছে সালমান শামিল। তার চার রুমের দুরুম সে থাকতে দিয়েছে একটি মুসলিম পরিবারকে অবশিষ্ট দুরুম নিয়ে সে থাকে।
সালমান শামিল ছাদে উঠে দ্রুত পানির পাইপ বেয়ে বাড়ির মধ্যকার সেই অন্ধকার প্যাসেজে নেমে গেল। তারপর গুটি গুটি করে এগুলো রাস্তার দিকে।
ভাঙ্গা দরজার কাছে এসে ফুটোয় চোখ লাগিয়ে দেখল দরজার মুখেই একটা জীপ দাড়িয়ে। রাস্তার বাতিটা বেশ খানিকটা তফাতে। তবুও জীপের ভেতরে বেশ ফর্শা। দেখল কেউ জীপে নেই। ওরা কি সবাই ভেতর ঢুকে গেছে? না ও হতে পারে, হয়তো দু একজনকে সালমান শামিলের বাসার সামনের লনটায় পাহারায় রেখে গেছে।
সালমান শামিল হামাগুড়ি দিয়ে নিঃশব্দে জীপের দিকে এগোল। তার লক্ষ জীপে এমন কিছু পাওয়া যায় কিনা যা থেকে নাম পরিচয় ঠিকানার কিছু জানা যাবে।
জীপের দরজা তারা খোলাই রেখে গিয়েছিল। জীপে প্রবেশ করে চারদিক চোখ বুলাতে গিয়ে প্যানেল বোর্ডের উপর নজর পড়তেই তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। দেখল, একটা নোট বুক। নোট বুকটা পকেটে ফেলে জীপ থেকে নামতে গিয়ে সে দেখল জীপের লকে চাবি ঝুলছে। একটা চিন্তা ঝিলিক দিয়ে উঠল তার মনে। এই জীপ নিয়েই তো সরে যেতে পারি।
যা ভাবা সেই কাজ। কী হোলে চাবি ঘুরিয়ে একসেলটারে চাপ দিল সে। গাডি গো গো করে উঠে চলতে শুরু করল সালমান শামিল গিয়ার চেঞ্জ করে স্পীড বাড়িয়ে দিল জীপের। লাফিয়ে উঠে ছুটে চলল গাড়ি। সালমান শামিল মুখ বাড়িয়ে পেছনে দিকে তাকিয়ে দেখল সালমান শামিলের গেট দিয়ে বেরিয়ে কে একজন ছুটে আসছে। মুখ ঘুরিয়ে নিল সালমান শামিল। পেছনে থেকে পর পর গুলীর আওয়াজ শুনতে পেল।
সালমান সেন্ট জন পল রোডে উঠে এসে সোজা দক্ষিণ দিকে এগিয়ে চলল। তারপর অনেক রাস্তা ঘুরে সে ব্ল্যাক টেম্পল এর পাশে এসে থামল। গাড়ির নাম্বারটা দেখে নিয়ে সালমান শামিল সেখানে থেকে পায়ে হেঁটে অপেক্ষাকৃত ছোট কিংস রোড ধরে পূর্বদিকে এগিয়ে চলল। কয়েকটা অলি গলি পেরিয়ে সে একটা ফ্লাটের দরজায় এসে দাড়াল। রাস্থার লাইটটা নষ্ট থাকায় জায়গাটা অন্ধকার। এই অবস্থায় পুলিশ তাকে এখানে দাড়ানো দেখলে নির্ঘাত চোর ডাকাত ঠাওরাবে। সে খুশি হলো যে তার জামার পকেটে আইডেন্টিটি কার্ডটা আছে। যে জামা পরে সে ইনস্টিটিউটে গিয়েছিল সে জামা আর খুলেনি। জামার পকেটে কিছু টাকাও আছে।
সালমান শামিল প্রথমে দরজার টোকা দিল। প্রথমে এক … দুই … তিন। তারপর এক ……দুই …। সব শেষে এক ……। কয়েকবার পুনরাবৃত্তি করল সে এই সিরিজের। এই সিরিজ ‘ককেসাস ক্রিসেন্ট’ এর একটা কোড।
মিনিট তিনেক পরে দরজা নিঃশব্দে খুলে গেল। সালাম দিয়ে সালমান শামিল ভেতর প্রবেশ করল।
দরজা বন্ধ করে বিস্মিত উসমান এফেন্দী লাইট জ্বেলে দিয়ে বলল কি ব্যাপার সালমান শামিল ভাই কিছু ঘটেছে?
সালমান শামিল সোফায় বসে গাটা এলিয়ে দিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে বলল ওরা আজ আমার ওখানে গিয়েছিল।
তারপর? মুখটা কালো করে বলল উসমান।
হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে যায়। টের পেয়ে যাই। ওরা যখন ল্যাসার বিম দিয়ে দরজার তালা গলাচ্ছিল তখন আমি সরে আসি আল্লাহর ইচ্ছায়।
উসমান এফেন্দী কিছুক্ষন কথা বলতে পারল না। হা করে তাকিয়ে থাকল সালমান শামিলের দিকে। আনেকক্ষণ পর বলল আল্লাহর অশেষ দয়া এবং আমাদের ভাগ্য, ওদের হাত থেকে এইভাবে তো আর কেউ বাঁচেনি।
জীবন মৃত্যু আল্লাহর হাতে উসমান।
বলে একটু থেমে আবার বলল এসব আলোচনা পরে হবে এখন তুমি আমাকে শোবার ব্যবস্তা করে দাও।
উসমান এফেন্দী ভেতর চলে গেল।
উসমান এফেন্দী ককেশাস ক্রিসেন্ট এর যুব শাখার একজন কর্মী। কিংস রোডে তার একটা ফলের দোকান আছে।
ড্রইং রুমের পাশেই ছিল মেহমান খানা। বিছানা করে উসমান সালমান শামিল কে ডাকল।
শুতে গিয়ে হঠাৎ মনে পড়ল পকেটের সেই নোট বুকের কথা। সোজা হয়ে বসল। বলল উসমান তুমি শুয়ে পড়। আমি একটু পরে শোব।
‘আজ রাতে আমার ঘুম ধরেছে সালমান ভাই’ বলতে বলতে ভেতর চলে গেল উসমান।
সালমান শামিল পকেট থেকে নোট বুকটি বের করল। নোট বুকটি একদম সাদা। মনে হল সদ্য কেনা। হতাশ হল সালমান শামিল।
হতাশভাবে নোট বুকটির পাতা উল্টাচ্ছিল। হঠাৎ নোট বইয়ের মধ্যে থেকে একখণ্ড কাগজ বেরিয়ে এল। কাগজটি সাদা নয় লেখা।
আগ্রহের সাথে সালমান শামিল কাগজটি চোখের সামনে তুলে ধরল। একটি নামের তালিকা। প্রথমেই কর্নেল আবদুল্লা এফেন্দীর নাম। চমকে উঠল সালমান শামিল। ইনি পঁচিশজন হারানো নেতার প্রথম জন। বাকুর ‘ককেশাস ক্রিসেন্ট’ ইউনিটের প্রধান ছিলেন ইনি।
নামের তালিকা রুদ্ধশ্বাসে পড়ে গেল সালমান শামিল। পঁচিশজন হারানো নেতার নামই সেখানে। ছাব্বিশ নম্বর নামটি সালমান শামিলের। সাতাশ নম্বরে ‘ককেশাস ক্রিসেন্ট’ –এর প্রধান আল্লামা ইব্রাহীম এদতিনার নাম। পঁচিশটি নামের বামে লালা কালি দিয়ে ক্রস দেয়া। খালি আছে মাত্র তিনটা নাম।
চমকে উঠল সালমান শামিল। অর্থাৎ ‘আমি ছিলাম ছাব্বিশ নম্বর টার্গেট।’ আর …..
পরবর্তী সাতাশ নম্বর নামের কথা মনে হতেই সমস্ত শরীরটা ঝিম ঝিম করে উঠল সালমান শামিলের। আমাদের সর্বজন শ্রদ্ধেয়, ‘ককেশাস ক্রিসেন্ট’-এর সংগ্রামী নেতা আল্লামা ইব্রাহীম এদতিনা তাদের সাতাশ নম্বর টার্গেট।
সালমান শামিল তার ঘড়ির দিকে তাকাল। দেখল রাত সাড়ে তিনটা বাজে। ইয়েরেভেন থেকে কুমুখী তিনশ মাইল পথ।
আজারবাইজানের কুরা উপত্যকায় ‘কুরা’ নদী ও ‘আরাকস’ নদীর সংগমস্থলে প্রাচীন নগরী ‘কুমুখী’তে বাস করেন আল্লামা ইব্রাহীম এদতিনা। ইয়েরেভেন সড়ক পথে ওখানে যেতে লাগবে কমপক্ষে ছয়ঘন্টা। ককেশাস পর্বতের অলিগলি দিয়ে ঘন্টায় পঞ্চাশ মাইলের বেশি গাড়ি চালানো মুশকিল। আর ট্রেনে যেতে লাগবে আরো বেশি সময়।
সালমান শামিল উঠে গিয়ে আবার উসমান এফেন্দীর শোবার ঘরের দরজায় নক করল।
বেরিয়ে এল উসমান এফেন্দী। বলল কি ব্যাপার সালমান শামিল ভাই। তার কন্ঠে উদ্বেগ।
তোমার জীপ কোথায়?
সামনেই কার টার্মিনালে।
টার্মিনালের গেট কখন খুলবে?
সাড়ে চারটায়।
এখন তিনটা। আর দেড় ঘন্টা।
কেন কি হয়েছে সালমান শামিল ভাই?
কুমুখী যেতে হবে, এখনি। কিন্তু এখন তো যাবার উপায় নেই। দেড় ঘন্টা অপেক্ষা করতেই হবে।
কি ঘটেছে ব্যাপার কি জানতে পারি কিছু?
উসমান এফেন্দীর কণ্ঠে উদ্বেগ।
সালমান শামিল উসমান এফেন্দীকে নামের তালিকার সব কথা জানিয়ে বলল, নাও তৈরি হয়ে নাও। ঠিক সাড়ে চারটাতেই আমরা গাড়িতে উঠব।
বলে সালমান শামিল তার বিছানায় এসে গা এলিয়ে দিল। শুয়ে হঠাৎ মনে পড়ল সোফিয়া এঞ্জেলার কথা। ও এতটা সঠিক সংবাদ পেল কোত্থেকে? বলতে চায় না। হাজার হোক তার কম্যুনিটির ব্যাপার। কিন্তু এই সাবধান করে দেবার কাজটা সে করল কেন?
ভাবতে ভাবতে কখন যেন ঘুম এসে তাকে দখল করে নিয়েছিল, টেরই পায়নি। উসমান এফেন্দীর ডাকে ধড়মড় করে উঠে বসল, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, ভোর চারটা দশ মিনিট।
টেবিলের উপর কিছু সাজানো।
উসমান এফেন্দী বলল, সালমান শামিল ভাই, আসুন কিছু খেয়ে নেই। রাস্তায় কখন কোথায় কি পাওয়া যাবে।
সালমান শামিল বাথরুমে যেতে যেতে বলল, খাবারগুলো প্যাকেট করে গাড়িতে নিয়ে নাও। গাড়িতে বসে খাওয়া যাবে।
ঠিক চারটা পঁচিশ মিনিটে ওরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল।
সালমান শামিল বলল, এক্সট্রা রিভলবার নিয়েছ তো? আমি কিন্তু খালি হাতে এসেছি।
জি এনেছি বলে উসমান এফেন্দী পকেট থেকে একটা রিভলবার বের করে সালমান শামিলের দিকে এগিয়ে দিল।
সালমান শামিলদের গাড়ি ঠিক চারটা চল্লিশ মিনিটে টার্মিনাল ভবন থেকে রাস্তায় নামল।
ব্লাক টেম্পেলের পাশ দিয়ে যাবার সময় সালমান শামিল দেখল, হানাদারদের সেই জীপটি এখনও সেখানে দাঁড়িয়ে। ড্রাইভিং সিটে বসেছিল সালমান শামিল। তার পাশে ওসমান এফেন্দী। সালমান শামিলের দৃষ্টি সামনে। বলল, আমরা কি ঠিক সময়ে পৌছতে পারব? ওদের ছাব্বিশ-সাতাশের মধ্যে গ্যাপটা কতখানি?
উসমান এফেন্দী শুধু শুনল। কোন জবাব তার কাছেও নেই।
কাস্পিয়ান সাগর তীর থেকে পঞ্চাশ মাইল ভেতরে কুরা ও আরাকস নদীর সংগমস্থলে কুমুখী একটি সবুজ নগরী। ছোট ছোট পাহাড় উপত্যকাগুলো সবই সবুজ। প্রায় চারশ বছর আগের এই শহরটি তুর্কি সুলতানরা প্রতিষ্ঠিত করে।
শহরের পশ্চিম অংশটা পুরনো। এই অংশেই একেবারে পশ্চিম প্রান্তে একটা পাহাড়ের পাদদেশে আল্লামা ইব্রাহিম এদতিনার বাড়ি। বাড়িটি বিরাট এবং পুরনো। বাড়ির সামনে মসজিদ এবং মাদ্রাসা। এসবের গায়ে কিছু কিছু নতুন প্রলেপ লাগলেও কাঠামোটা অতীতকে বুকে নিয়ে ঠিকই দাঁড়িয়ে আছে।
এই বাড়িটি ককেশীয় মুসলমানদের কাছে অনেকটা তীর্থের মত। গোটা ককেশাসে এই এদতিনা মাদ্রাসা বিখ্যাত। ককেশীয় মুসলমানদের আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক নেতা ইমাম শামিল এই মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করেন। আল্লামা ইব্রাহিম এদতিনার পূর্বপুরুষ আরচি জামাল এদতিনা এই বাড়ি, এই মাদ্রাসা, এই মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা। তিনিই ইমাম শামিলের উস্তাদ ছিলন।
একটি সুন্দর স্বচ্ছ-জল দিঘির উত্তর পাড়ে পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত দক্ষিণমুখী বাড়ি আল্লামা ইব্রাহিম এদতিনার। দিঘিটির পশ্চিম পাড়ে মসজিদ এবং দক্ষিন পাড়ে মাদ্রাসা। বিশাল মাদ্রাসাটি দিঘির একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। ককেশাস, তাতারিয়া এবং ক্রিমিয়ার প্রায় পাঁচশত ছাত্র লেখাপড়া করে এই মাদ্রাসায়। ইমাম শামিল প্রতিষ্ঠিত ‘ককেশাস ক্রিসেন্ট’ – এর জন্যে লোক তৈরির একটা কেন্দ্র এই মাদ্রাসা। এখানে যুদ্ধ বিদ্যাকে দ্বীনি শিক্ষার অপরিহার্য অঙ্গ বলে ধরা হয়। দিঘির পূর্ব পাড়ে চারদিকে বাগান ঘেরা এক বিশাল মাঠ। আল্লামা ইব্রাহিম এদতিনা মাগরিবের নামায থেকে এশার আযান পর্যন্ত ছাত্রদের একটা ক্লাশ নেন। তারপর এশার নামায শেষে মসজিদ সংলগ্ন দরবার কক্ষে আধা ঘন্টার জন্যে বসেন। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা লোকজনকে সাক্ষাৎ দেন। এটাই তাঁর দিনের শেষ রুটিন। তারপর তিনি ঘরে ফেরেন। খাওয়া-দাওয়ার পর রাত দশটার দিকে ঘুমাতে যান।
সেদিনও তিনি এশার নামায শেষে দরবার কক্ষে ঢুকলেন। আজ সাক্ষাতের জন্য বেশি লোক ছিল না। দুজন লোক এল। উস্কো-খুস্কো চুল। সফরের ক্লান্তি তখন তাদের চোখে-মুখে।
ওরা এখান থেকে ষাট মাইল দূরে ‘কুরা’ তীরের পার্বত্য গ্রাম ‘মুগীর’ এর বাসিন্দা। প্রায় পাঁচশ মুসলিম পরিবার নিয়ে সমৃদ্ধ গ্রামটি।
দরবার কক্ষে ঢুকেই ওরা কেঁদে উঠল। বলল, হুজুর, আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। গোটা গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে। সবগুলো ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে পেট্রল ছিটিয়ে ওরা আগুন ধরিয়ে দেয়। দুচারজন ছাড়া আর কেউ বেরুতে পারেনি, সবাই পুড়ে মারা গেছে। আমাদের বাগান, শস্য ক্ষেতও ওরা পুড়িয়ে ছাই করে দিয়ে গেছে।
ওরা থামল।
আল্লামা ইব্রাহিম এদতিনা ওদের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ওদের সব কথা মনোযোগের সাথে শুনলেন। ওরা থামলে তার দৃষ্টি জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকারে নিবদ্ধ হলো। তার দৃষ্টিটা শূন্য। সেখানে যেন বাইরের অন্ধকারের মতই একটা অনিশ্চয়তা। কোন কথা বললেন না তিনি।
অনেকক্ষণ পর তাঁর দৃষ্টি বাইরে থেকে ফিরিয়ে এনে আবার নিবদ্ধ করলেন লোক দুজনের মুখের উপর।
আল্লামা এদতিনার চুল-দাড়ি সফেদ। চোখের ভ্রুও সাদা হয়ে গেছে। কিন্তু স্বাস্থ্যটা অটুট আছে। প্রশস্ত ললাট। মুখে একটা পবিত্র দীপ্তি। কঠিন দুঃসংবাদেও ম্লান হয়নি। একটু গম্ভীর মনে হচ্ছে মুখ, আর তাঁর চোখে একটা বেদনার রেখা।
গম্ভীর মুখের ঠোঁট দুটি নড়ে উঠল আল্লামা এদতিনার, ‘যারা বেঁচে আছে তারা কোথায়?’
পাহাড়ের ওপরে এক গুহায় আশ্রয় নিয়েছে।
খাওয়ার ব্যবস্থা?
জঙ্গলে ফল আছে।
কতজন?
তিরিশ জন। তার মধ্যে শিশু মাত্র এক, নারী দুই।
অর্থাৎ গ্রামের প্রায় তিন হাজার লোককে ওরা পুড়িয়ে মেরেছে। আল্লামা এদতিনা মুহূর্তের জন্যে তাঁর চোখটা একবার বুজেছিলেন। বোধ হয় ধাক্কাটা শামলে নিলেন তিনি।
চেখ খুলে শান্ত কন্ঠে বললেন, লোক এখনি পাঠাচ্ছি ওখানে। তোমরা খেয়ে বিশ্রাম নাও। আল্লামা এদতিনা তাঁর আসন থেকে উঠতে উঠতে বললেন, ওরা মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করতে চায় ককেশাসের মাটি থেকে। যে কোন ক্ষতির জন্যে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে, ধৈর্য ধরতে হবে। আল্লাহর সাহায্য আমরা পাবই। বলে আল্লামা এদতিনা দরবার কক্ষ থেকে বেরিয়ে বাড়ির দিকে চললেন।
বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই নাতি আবু জামাল এদতিনা এসে আল্লামা এদতিনাকে জড়িয়ে ধরল। বলল, দাদু- আম্মা বলেছে, বড় হলে আমাকে যুদ্ধ করতে হবে? নাতিকে কোলে তুলে নিয়ে বললেন, তা তো করবেই।
যুদ্ধ করলে কি করতে হয় দাদু?
গুলী করতে হয়।
তাহলে যে মানুষ মরে যাবে, গুলী করব কেন?
তোমাকে যখন কেউ গুলী করতে আসবে?
আমাকে গুলী করতে আসবে কেন?
আল্লাহর শত্রু অনেক দুষ্ট লোক আছে দুনিয়ায়।
রাসুল (স:) যুদ্ধ করেছেন দাদু?
হ্যাঁ।
গুলী করেছেন?
আল্লামা এদতিনা মুশকিলে পড়ে গেলেন। বললেন, দাদু তখন তো বন্দুক ছিল না। তলোয়ার ছিল।
কথা শেষ করেই আল্লামা এদতিনা নাতিকে মেয়ে সালমার কোলে তুলে দিয়ে বলল, নাও তোমার সর্ব-সন্ধানী ছেলেকে।
আল্লামা এদতিনা একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে খাবার ঘরের দিকে পা বাড়ালেন।
আল্লামা এদতিনার বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে। মাদ্রাসার ছাত্ররাও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
