কুমুখী শহরের পথে চলতে গিয়ে মনটা আনচান করে উঠল সালমান শামিলের। যে কয়টা মসিজদ সে এ পর্যন্ত পথের পাশে পেল, সবগুলো মসজিদে সবাই গোল হয়ে বসে কুরআন শরীফ পড়ছে। কোন দুঃসময়ে কিংবা বড় কেউ মারা গেলে এইভাবে সম্মিলিত ভাবে কুরআন শরীফ পড়া ককেশাসের একটা নিয়ম। শংকা বোধ করল সালমান শামিল, বড় কিছু কি ঘটেছে? আল্লামা এদতিনার কথা মনে হতেই বুকটা আবার ধড়ফড় করে উঠল সালমান শামিলের।
সালমান শামিল তার জীপের স্পীড বাড়িয়ে দিল। মুখ ফিরিয়ে উসমান এফেন্দীকে সালমান শামিল জিজ্ঞেস করল, কি বুঝছ তুমি উসমান?
নগরীর কোন লোকের মুখে হাসি দেখছি না। সবাই মাথা নত করে হাঁটছে।
কোন দোকান-পাটও খুলেনি লক্ষ্য করেছ?
ঠিক তাই তো।
এর অর্থ কি উসমান? সালমান শামিলর গলাটা কাঁপল।
উসমান কোন জবাব দিতে পারল না।
সালমান শামিলের গাড়ি যতই নাগারনো কারাবাখ – বাকু রোড হয়ে আল্লামা এদতিনার বাড়ির কাছাকাছি পৌছতে লাগল মানুষের ভীড় ততই বাড়তে লাগল।
নাগারনো কারাবাখ সড়ক থেকে যে সড়কটি বেরিয়ে আল্লামা এদতিনার বাড়ির দিকে গেছে সে সড়ক একদম লোকে ভর্তি।
ইমাম শামিলের ছেলে যুবনেতা সালমান শামিল সবার কাছে পরিচিত। তাকে দেখে সবাই পথ করে দিতে লাগল। কিছু যুবক ত্বরিৎ এগিয়ে এসে এ কাজে সহযোগিতা করতে লাগল।
কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করার সাহস হলো না সালমান শামিলের। সালমান শামিলকে দেখে অনেকেই কেঁদে ফেলেছে, বিশেষ করে যুবকরা। সালমান শামিলের কিছু বুঝার বাকি রইল না। তার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল বেদনায়।
কিন্তু আল্লামা এদতিনার বাড়িতে পৌঁছার পর যে দৃশ্য দেখল, তাতে সালমান শামিল একদম যেন বোবা হয়ে গেল। এত নিষ্ঠুরতা, এত বর্বরতাও কোন মানুষ করতে পারে। মাদ্রাসার পাঁচশ’ ছাত্রের কেউ বেঁচে নেই। প্রত্যেকে যে যার সিটে বিছানায় শুয়ে আছে। কিন্তু কারও প্রাণ নেই। ওদের চেহারা দেখেই বিজ্ঞানের ছাত্র সালমান শামিল বুঝল, ভয়াবহ নিউট্রন গ্যাসের ফল।
আল্লামা এদতিনার বৈঠকখানার দরজায় চৌকাঠের ওপর তখন আবদুল্লাহ এতদিনা পড়ে আছে। বাড়ির সব নারী-শিশু একটি ঘরে রক্তে ভাসছে। আল্লামা এদতিনার অতি আদরের নাতি আবু জামাল এদতিনা মায়ের কোলের ভেতরই বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। মা হয়তো কোলে লুকিয়ে নিজের জীবন দিয়ে তাকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মা এবং ছেলে কেউই বাঁচেনি।
কিন্তু আল্লামা এদতিনাকে কোথাও পাওয়া গেল না। হঠাৎ সালমান শামিলের খেয়াল হলো, আগের পচিঁশজনকে জীবিত কিংবা মৃত কোন ভাবেই খুঁজে পাওয়া যায়নি। সেই তালিকায় আল্লামা এদতিনাকে পাওয়া যাবে কেমন করে?
সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে সালমান শামিল ‘কুমুখী’র ‘ককেশাস ক্রিসেন্ট’- এর প্রধান লতিফ কিরিমভকে বলল, আল্লামা হুজুর যে শেষ মুহূর্তে জানতে পেরেছিলেন এবং প্রতিরোধ করেছিলেন বারান্দার রক্তগুলোই তার প্রামাণ। নিশ্চয় তাদের মধ্যে থেকে কয়েকজন আহত-নিহত হয়েছে। আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করল, আবদুল্লাহ এদতিনার দেহে কোন গুলীর দাগ বা আঘাতের চিহৃ নেই। সেও নিউট্রন গ্যাসের শিকার। নিউট্রন বুলেটই তাদের প্রতিরোধকে সফল হতে দেয়নি।
সালমান শামিল বারান্দার মুখে এসে দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎ দেখতে পেল সিঁড়ির নিচে ভাঁজ করা একটা কাল কাগজ। কাগজটি তুলে নিয়ে ভাঁজ খুলে দেখল, আর্মেনিয়া, জর্জিয়া, আজারবাইজান, পারস্য ও তুরস্কের একটা অংশ নিয়ে বৃহত্তর আর্মেনিয়ার একটা মানচিত্র। তার ভেতরে সাদা একটা নেকড়ে আঁকা। কাগজটি লতিফ কিরিমভের হাতে তুলে দিতে দিতে সালমান শামিল বলল, ‘হোয়াইট উলফ’ তার চিহ্ন রেখে গেছে।
বারান্দার নিচে এবং দিঘির চারধার ঘিরে তখন হাজারো মানুষের ভীড়। লতিফ কিরিমভ বলল, সালমান শামিল ভাই, ভয়, আশংকা এবং শোকে মানুষ মুষড়ে পড়েছে। আপনিই এখন উপযুক্ত ব্যক্তি তাদের সান্ত্বনা দেবার জন্যে। আপনি কিছু বলুন। লোকজনকে এদিকে ডাকার জন্য আমি বলে দিয়েছি।
একজন ঘোষক ঘোষণা করে দিয়ে এল।
মানুষ এগিয়ে এল আল্লামা এদতিনার বাড়ির দিকে।
সালমান শামিল একটা টেবিলের ওপর দাঁড়ালেন। তারপর জনতার উদ্দেশ্যে বললেনঃ
ভাই সব, খৃষ্টানদের সংগঠন, ‘হোয়াইট উলফ’ অন্যান্য ঘটনার মত এ ঘটনার জন্যেও দায়ী। তারা চায় আমাদেরকে আমাদের মাতৃভূমি থেকে উৎখাত করে তাদের স্বপ্নের বৃহত্তর আর্মেনিয়া গঠন করতে। তাদের সাহায্য করছে কম্যুনিষ্ট দেশ রাশিয়া রিপাবলিক এবং পশ্চিমের কিছু খৃষ্টান দেশ। আমাদের সহায় আল্লাহ। ইতিহাস সাক্ষী, তাদের সব যড়যন্ত্রই অতীতে আমরা ব্যর্থ করে দিয়েছি। এ নতুন যড়যন্ত্রও আমরা ব্যর্থ করে দেব। আপনাদের সংগঠন ‘ককেশাস ক্রিসেন্ট’ তাদের জঘন্য ও কাপুরুষোচিত কাজের উপযুক্ত জবাব দেবে। আমি আনন্দের সাথে ঘোষণা করছি, বিশ্বের মজলুম মুসলমানদের নেতা অনেক বিপ্লবের মহানায়ক আহমদ মুসা দুএকদিনের মধ্যেই আমাদের মধ্যে আসছেন। তিনি আমাদের নেতৃত্ব দেবেন। ইমাম শামিল যে কাজ শেষ করে যেতে পারেননি, তা ইনশাআল্লাহ তিনি শেষ করবেন।
উপস্থিত শোক-সন্তপ্ত জনতা সমবেত কণ্ঠে ‘আল্লাহ আকবার’ ধ্বনি দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করল।
সালমান শামিল নেমে এল টেবিলের মঞ্চ থেকে। লতিফ কিরিমভকে বলল, শহীদদের দাফনের কি ব্যবস্থা হয়েছে?
জেলা গভর্নর শহিদভ সকালেই এসেছিলেন। তিনি সব ব্যবস্থা করছেন।
বলল লতিফ কিরিমভ।
এখানকার সব ব্যাপার গুছিয়ে নেয়ার দায়িত্ব কে পালন করবে? এ চিন্তার দায়িত্ব এখন আপনার।
ঠিক আছে, কুমুখীর ‘ককেশাস ক্রিসেন্ট’- এর প্রধান হিসেবে এখানকার দায়িত্ব তোমাকেই পালন করতে হবে।
আহমদ মুসা কবে আসছেন?
দুএকদিনের মধ্যেই আশা করছি।
তাকে বাধা দেবার জন্য ‘হোয়াইট উলফ’ রাশিয়া ও পশ্চিমের সহযোগিতায় সব ব্যবস্থাই করেছে শোনা যাচ্ছে।
আমি ইয়েরেভেনে থাকার জন্য বিস্তারিত ব্যাপারটা জানি না। জানতো আল্লামা হুজুর। আর জানে বাকুতে যে সাইমুম ইউনিট এসেছে তারা। তবে আমি এটুকু জানি, আহমদ মুসাকে বাধা দেয়ার সাধ্য ‘হোয়াইট উলফ’ এবং তার মুরুব্বীদের নেই।
এ সময় একটি গাড়িতে করে আজারবাইজান সরকারের ‘কুমুখী’ জেলার গভর্নর আহমদ শহিদভ এবং আরও কয়েকজন আল্লামা এদতিনার বাড়ির সামনে এসে নামল।
গাড়ি থেকে নেমে ওরা এসে জড়িয়ে ধরল সালমান শামিলকে। শহিদভের চোখে অশ্রু।
লতিফ কিরিমভের কাছে শুনেছি দাফন সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আপনারা নিয়েছেন। এটা আপনাদের সরকারের অনুমতিক্রমে? জিজ্ঞাসা করল সালমান শামিল।
সরকার এ ব্যাপারে বিরোধিতা করবে না, অনুমতিও দিতে পারবে না। কিছু জানে না এই ভূমিকা পালন করবে।
সালমান শামিলের মুখে একটা বেদনার হাসি ফুটে উঠর। বলল, এই নতজানু ভূমিকা কি সরকারকে রক্ষা করতে পারবে?
সালমান শামিল ভাই, আমি গত পরশু দিন বাকুতে ছিলাম। ঐ দিন রুশ, বৃটিশ ও মার্কিন এমবাস্যাডর আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করেন। তারা বলে দিয়েছেন, ‘ককেশাস ক্রিসেন্ট’-এর মত সাম্প্রদায়িক সংগঠনকে আজারবাইজন সরকার যদি সহযোগিতা করে, তাহলে তারা আজারবাইজানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
আপনাদের প্রধানমন্ত্রী ‘হোয়াইট উলফ’-এর হত্যা, সন্ত্রাস ও পোড়ামাটি নীতি সম্পর্কে কিছু বলেননি? বলেনি যে, আর্মেনিয়া, জর্জিয়া এবং তারাও কিভাবে ‘হোয়াইট উলফ’ কে সাহায্য করছে?
বলেছে। কিন্তু তাদের বক্তব্য হলো, এসব হত্যা, সন্ত্রাস মুসলমানদের আভ্যান্তরীন গ্রুপ দ্বন্দ্বের ফল এবং ‘ককেশাস ক্রিসেন্টে’র কারণেই এসব ঘটেছে। ‘হোয়াইট উলফ’ নামে কোন সংগঠনকে তারা চেনে না।
সালমান শামিল হাসল। একটি দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলল, ঠিক আছে। আমরা জানি, মুসলমানদের আল্লাহ ছাড়া কোন বন্ধু নেই, আল্লাহ ছাড়া তাদের কোন সাহায্যকারী নেই। আমরা তাঁরই ওপর নির্ভর করছি।
বলে সালমান শামিল, লতিফ কিরিমভের দিকে ফিরে বলল, লতিফ তুমি এঁদের সাথে শহীদদের দাফনের আয়োজন কর। আমি আল্লামা হুজুরের অফিসটা একটু চেক করি।
মসজিদের পাশে দরবার কক্ষের সাথে সংলগ্ন ‘ককেশাস ক্রিসেন্ট’-এর নাম সাইনবোর্ডহীন সদর দফতর। আল্লামা এদতিনা এখানেই বসতেন।
সালমান শামিল বারান্দা থেকে নেমে ঐ অফিসের দিকে চলে গেল।
৬
বাকুর ‘ককেশাস সিক্রেট’ প্রধান মুহাম্মদ বিন মুসার সাথে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ করে এবং বাকুতে অবস্থানরত সাইমুম প্রতিনিধি দলের নেতা আলী আজিমভের সাথে প্রয়োজনীয় আলোচনা সেরে সালমান শামিল সেদিন রাতেই ইয়েরেভেনে ফিরে এসেছে। ‘কুমুখী’ ও ‘মুগী’ গ্রামের ভয়াবহ হত্যাকান্ড এবং আল্লামা ইব্রাহীম এদতিনার হারিয়ে যাওয়া সালমান শামিলকে অস্থির করে তুলেছে। ‘হোয়াইট উলফ’ দেখা যাচ্ছে ‘ককেশাস ক্রিসেন্ট’-এর সব কিছুই জানে এবং তাদের পরিকল্পনা মুতাবিক একের পর এক ঘটনা ঘটিয়েই চলেছে, কিন্তু ‘ককেশাস ক্রিসেন্ট’ তাদের কোন নাগালই পাচ্ছেনা। তাদের একজন লোকেরও পরিচয় জানা যায়নি। তাদের বিরুদ্ধে ‘ককেশাস ক্রিসেন্ট’ কার্যত এক ইঞ্চিও এগুতে পারেনি। এই ব্যর্থতার বেদনা সালমান শামিলের অন্তরকে স্থির থাকতে দিচ্ছেনা। আল্লামা ইব্রাহিম এদতিনার হারিয়ে যাওয়ার পর আন্দোলন পরিচালনার বিরাট দায়িত্ব তার ওপর অর্পণ করা হয়েছে। সাংগঠনিক অনেক কাজ তার পড়ে রয়েছে। এরপরও কিছুমাত্র দেরি না করে ছুটে এসেছে ইয়েরেভেনে। তার আশা এখান থেকেই সে সামনে এগুবার একটা ‘ক্লু’ পাবে।
সালমান শামিলের লক্ষ্য সোফিয়া এঞ্জেলা। তার ধারণা সোফিয়া এঞ্জেলার কাছ থেকে একটু সূত্র পাওয়া যাবে। সালমান শামিলকে সাবধান করার মত ‘এ্যকুরেট’ খবর সোফিয়া যে সূত্র থেকে পেয়েছে, সে সূত্র ধরে এগুলেই, সালমান শামিলের বিশ্বাস, ‘হোয়াইট উলফ’ এর একটা ঠিকানায় পৌঁছা যাবে।
