সোফিয়া আবার ফিরে এল লাইব্রেরীতে। কিন্তু দেখল সালমানের সিটটা শূন্যই। সোফিয়া তার নিজের ব্যাগটা টেবিলে রেখে বাথরুমে গেল।
বাথরুমের সামনের করিডোরটি পশ্চিম দিকে এগিয়ে বাথরুম ঘুরে উত্তর দিকে গেছে। করিডোরটি পশ্চিম দিকে এগিয়ে বাথরুম ঘুরে উত্তর দিকে গেছে। করিডোরের উত্তর প্রান্তে বাথরুম। সুইপারদের স্টোর রুম।
সোফিয়া করিডোরের পশ্চিম প্রান্তে দুটো জুতার গোড়ালী দেখতে পেল। ওভাবে ওখানে জুতা পড়ে কেন?
বাথরুম থেকে বেরুবার পর সোফিয়ার সে কেৌতূহলটা আবার জাগল, জুতা কেন, কার জুতা!
করিডোরের পশ্চিম প্রান্তের কাছাকাছি হতেই পুরো জুতাটা তার নজরে পড়ল। একি, এ যে সালমান শামিলের জুতা!
করিডোরের মাথায় গিয়ে উত্তর দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল সোফিয়া। দেখল, সালমান নামাযে দাঁড়িয়ে। তার হাত দুটি বুকে বাঁধা, চোখ দুটি মাটির দিকে। ধ্যানমগ্ন চেহারা। ঠোঁট দুটি শুধু তার নড়ছে।
সোফিয়া সেদিক থেকে চোখ সরাতে পারল না। সালমান শামিল শুধু ভাল ছাত্র নয়, তার ব্যায়াম পুষ্ট সুন্দর সুগঠিত দেহও সকলের ঈর্ষার বস্তু। সবচেয়ে আকর্ষণীয় তার চোখ ও মুখের পবিত্র লাবণ্য। সেদিকে চাইলে মনে হয় না সে কারো শত্রু হতে পারে। তার নিষ্পাপ চেহারা শুধু কাছেই টানে কাউকে দূরে সরিয়ে দেয় না।
সোফিয়া দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সালমানের রুকু, সিজদা গোটা নামাযই দেখল। সে যে একজন সামনে দাঁড়িয়ে, কোন খেয়ালই তার নেই। যেন গোটা দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন সে, যেন মন তার অন্য কোন জগতে। নামায এই রকম, এত সুন্দর। কই গীর্জায় তো সে যায়, ফাদার কিংবা কারো মধ্যেই তো এই ধ্যানমগ্নতা, এই একাগ্রতা কোন দিন সে দেখেনি।
সালাম ফিরিয়েই সালমান শামিল সোফিয়াকে দেখতে পেল। হেসে উঠে দাঁড়ালো। কি ব্যাপার সোফিয়া, তুমি এখানে?
তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে হয়রান।
কি করে জানলে আমি এখানে?
তোমার জুতা বলে দিয়েছে। এসেছিলাম বাথরুমে। জুতার গোড়ালি দেখে সন্ধান নিতে এসে দেখি তুমি এখানে নামায পড়ছ। বলতো, সুইপারের করিডোরে এভাবে নামায পড়ছ কেন? সব জায়গায় কি নামায হয়?
আল্লাহর জমিনের সব জায়গাই পবিত্র, সব জায়গা থেকেই তাকে ডাকা যাবে।
তবু লাইব্রেরীতে তো অনেক নিরিবিলি জায়গা আছে, সেখানে তো নামায পড়তে পার।
আপত্তি উঠেছে।
আপত্তি উঠেছে? কে আপত্তি করেছে?
এসব কথা থাক সোফিয়া। তুমি অনেক কিছুই জান না, জেনে কি লাভ!
এসব নিকৃষ্ট সংকীর্ণতা।
সংকীর্ণতাকে দোষ দিচ্ছ? এ সংকীর্ণতাই তো যুগ যুগ ধরে ক্রুসেড চালিয়েছে।
কিন্তু ক্রুসেডের জন্য তো তোমরা দায়ী।
বল সোফিয়া, মুসলমানরা কি যুদ্ধ করার জন্য ইউরোপে গিয়েছিল, না ইউরোপীয়রা যুদ্ধ করতে মুসলিম ভূখন্ডে এসেছিল?
কিন্তু তোমরা তো আমাদের খ্রীষ্ট ভূমি জেরুজালেম দখল করে রেখেছিলে।
না, জেরুজালেম আমরা মুক্ত করেছিলাম, অনাচারের হাত থেকে মুক্ত করে খ্রীষ্ট এবং বহু নবীর জম্ম ও কর্মস্থানকে আমরা মর্যাদা দিয়েছিলাম। আমরা জেরুজালেম মুক্ত করেছিলাম তার প্রমাণ জেরুজালেম যখন আমাদের হাতে আসে তখন একফোটা রক্তপাত ও হয়নি, কোন মানুষের একটি টাকা ও লুন্ঠিত হয়নি। মুসলমানদের আগমনে জেরুজালেমবাসীরা হেসেছিল। কিন্তু তোমরা যখন জেরুজালেমে প্রবেশ করেছ তখন সত্তর হাজার লোক নিহত হয়েছে, কোন বাড়িই লুন্ঠনের হাত থেকে বাঁচেনি, কোন একটি বাড়িও আগুন ও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়নি।
শোন তোমার সাথে আমি ঝগড়া করতে পারব না। ভাল লাগছে না। আজ সারাদিনই এসব শুনছি।
কি শুনছ?
এখন আমি আবার আরেকটা কাহিনী শুরু করি। আমি পারব না। এসব কথা উচ্চারণ করতে ও আমার ঘৃণা বোধ হয়।
কোন সব কথা?
নোংরা রাজনীতির কথা।
বলে সোফিয়া তার ব্যাগ থেকে সেই হ্যান্ডবিলটা বের করে সালমানের হাতে দিতে দিতে বলল, এই কিছুক্ষণ আগে একজন এটা আমার হাতে দিল এবং দুজনে একটা বক্তৃতাও দিয়েছে।
সালমান শামিল হ্যান্ডবিলে নজর বুলিয়ে সোফিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, এ হ্যান্ডবিলটা এ ইনস্টিটিউটেও বিলি হচ্ছে?
তা বোধ হয় নয়। একজন আমাকে ব্যক্তিগতভাবে দিয়েছে।
পড়ে কি মনে করছ?
বলেছিই তো, ভাল লাগছে না। আমি এসব আলোচনা করতে রাজী নই। আমি এসেছি তোমাকে একটা কথা বলতে।
বল। সোফিয়ার দিকে চকিতে একবার চোখ তুলে বলল সালমান শামিল।
হ্যাঁ, এই সুইপার করিডোরে দাঁড়িয়ে কথা বলি! চল লাইব্রেরীতে। লাইব্রেরীতে গিয়ে দুজন বসল পাশাপাশি চেয়ারে। চেয়ারটা একটু লাগালাগি হয়ে গিয়েছিল। সালমান শামিল চেয়ারটা টেনে সরিয়ে নিল। সোফিয়া ভ্রুকুটি করে বলল, দেখ আমি বাঘ নই যে তোমাকে নিরাপদ দূরত্বে সরে থাকতে হবে।
তা নয়………
লজ্জিত সালমান শামিল তার কথা শেষ না করেই থেমে গেল।
তা নয় তো কি? পুরুষ মানুষের এত লজ্জা সাজে না। বলতো কোন মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তুমি কথা বলতে পার? বিয়ের অনুষ্ঠানে বরের মত চোখটা সব সময় নিচের দিকে। এটা কি?
সোফিয়ার কথা শুনে সালমান শামিল হাসল। বলল, সোফিয়া, পারি না বলে নয়, পারা উচিত নয় বলে তাকাই না।
উচিত নয় কেন?
ইসলামে নিষেধ আছে। নর ও নারীর বৃহত্তর স্বার্থেই এই নৈকট্য ও ঘনিষ্ঠতাকে নিষেধ করা হয়েছে।
সোফিয়া একটু ভাবল। বলল, সালমান বিষয়টাকে নিয়ে আমি এভাবে কখনও ভাবিনি। আমাকে ভাবতে হবে আরও।
তারপর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ঠিক আছে তুমি একটু দুরেই থাক, এবার শোন আমার কথা।
থামল সোফিয়া। ধীরে ধীরে শুরু করল আবার, তোমার কি শত্রু আছে সালমান?
কেন এ কথা বলছ?
এমনি, বল না?
না, আমি আমার শত্রু দেখছি না।
আচ্ছা, তুমি কারো কোন স্বার্থের ক্ষতি করেছ?
না।
কিন্তু তোমার শত্রু আছে। তারা তোমার ক্ষতি করতে চেষ্টা করবে। তোমাকে সাবধান থাকতে হবে।
এসব কথা তুমি বলছ কোথ্থেকে?
আমাকে তুমি এ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করো না। আমাকে তুমি বিশ্বাস কর, আমি ঠিক বলছি। অনুরোধ ঝরে পড়ল তার কন্ঠে।
সোফিয়ার কাছে থেকে এ ধরনের খবর শুনে কিছুটা চমকে উঠেছিল সালমান শামিল। কিন্তু চমকে ওঠাটা সে প্রকাশ হতে দেয়নি সোফিয়ার কাছে এবং সোফিয়ার কথা সে এক বিন্দুও অবিশ্বাস করেনি। কিন্তু বিষ্ময়ের ব্যাপার হলো সোফিয়ার কাছে এ খবর এল কি করে? এ বিষয়টা তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই সে প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করে বলল, বিপদের পরিচয় জানলে সাবধান হওয়া সহজ হতো সোফিয়া।
তোমার কাছে মিথ্যা বলব না সালমান। আমি কিছুই জানি না। শুধু এটুকু বুঝতে পেরেছি, তুমি কারো ভয়ানক শত্রুতার টার্গেট। এই বুঝতে পারা সূত্রটা কি তা জিজ্ঞেস করতে তোমাকে নিষেধ করছি।
শুকরিয়া সোফিয়া।
শুকরিয়া জানাতে হবে না, তুমি বল আমার কথা তুমি গুরুত্বের সাথে নিয়েছ? সাবধান থাকবে?
জীবনের ভয় কি আমার নেই সোফিয়া?
না, নেই। একদিন তুমি বলেছিলে না যে, জীবন-মৃত্যু আল্লাহর হাতে? এ নিয়ে মানুষের চিন্তার কিছু নেই।
এ কথা আমি এখনো বলি।
এখানেই আমার আপত্তি। সাবধান তুমি তাহলে কেমন করে হবে?
পাগল, যুদ্ধে জয়-পরাজয় তো আল্লাহর হাতে, তার মানে কি অস্ত্র না ধরলেও, যুদ্ধ না করলেও আল্লাহ জয় এনে দেবে?
‘ঠিক আছে, বুঝেছি’ বলে একটু হেসে উঠে দাঁড়ালো সোফিয়া। বলল, এখন আসি। বলে হাত বাড়িয়ে দিল। কিন্তু ‘স্যরি’ বলে হাত টেনে নিয়ে হাসতে হাসতে চলে গেল।
