গাড়ির এক মিছিল চলছে এয়ারপোর্টের দিকে। সামনে পেছনে এম্পায়ার গ্রুপের কর্মীদের গাড়ী। মাঝখানে পর পর চারটি করে। সামনেরটিতে হাসান তারিক, যুবায়েরভ, আবুল ওয়াফা, ও আব্দুল্লায়েভ। তারপর আহমদ মুসার গাড়ী। আহমদ মুসা নিজেই ড্রাইভ করছেন। তার পাশে মেইলিগুলি। আহমদ মুসার পেছনে আহমদ ইয়াং এবং নেইজেনের গাড়ী। তার পরের গাড়িতে আছেন নেইজেনের মা ইউজিনা এবং মেইলিগুলির আব্বা-আম্মা।
ধীর গতিতে চলছে গাড়ী। স্টিয়ারিং হুইল ধরা আহমদ মুসার হাত। তার দৃষ্টি সামনে। মেইলিগুলি মুখ নিচু করে বসে আছে। তার চোখ দুটি ভারী।
আহমদ মুসা মেইলিগুলির দিকে চোখ ফিরিয়ে বললেন, কথা বলছ না যে?
মেইলিগুলির মুখটা লাল হয়ে উঠল। একটু চুপ করে থেকে সে বলল, এমনটা হয়ে গেল কিছু মনে করনি তো?
আল্লাহ হয়তো আমার জন্য ভালটাই করেছেন। এখন কি মনে হচ্ছে জানো? মনে হচ্ছে, আমার একটা শিকড় আছে। আগে আমার সামনেটাই ছিল সব, পেছন বলতে কিছুই ছিল না। কিন্তু এখন পেছনে এক প্রবল আকর্ষন।
এ আকর্ষণ তোমার কাজের গতির ক্ষতি করবে না তো?
এ আকর্ষণ পেছনে টানার আকর্ষণ নয়। জীবনটাকে আরো ভালবাসার আকর্ষণ। সত্যি আমিনা শূণ্যতা যে একটা ছিল এখন পূর্ণতার পরই তা বুঝতে পারছি।
আহমদ মুসা কথাটা শেষ করেই একবার মেইলিগুলির দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বললেন, সবাই অন্তত একটা দিন থাকতে বলল, তুমি তো কিছু বললে না।
বললে তুমি যেতে পারবে না এ ভয়ে।
ভয় কেন?
ককেশাস সম্পর্কিত তোমার পরিকল্পনার ক্ষতির ভয়। আমি চাইনি আমাদের এই মিলন আন্দোলনের ক্ষতির কারণ হোক। তোমাকে তো সেখানে কত কষ্ট করতে হবে। তার সাথে আমার এ ভাগ্যটুকু জুড়ে দিতে পেরে খুবই গর্ব বোধ করছি।
আহমদ মুসা মুগ্ধ দৃষ্টিতে মেইলিগুলির দিকে তাকালেন। তারপর ডান হাত স্টিয়ারিং হুইলে রেখে বাঁ হাত বাড়িয়ে দিলেন মেইলিগুলির দিকে। মেইলিগুলি একটু সরে এল । আহমদ মুসা তার ডান হাতটা তুলে নিয়ে তাতে চুমু খেলেন। বললেন আমিনা, তুমি হবে আমার সামনে এগুবার শক্তি, আমার সংগ্রামের প্রেরণা।
মেইলিগুলি আহমদ মুসার হাতটি আর ছাড়ল না। হাতটি দুহাতে জড়িয়ে ধরে তাতে মুখ গুঁজল।
আহমদ মুসা হাত টেনে নিলেন না।
মেইলিগুলির চোখের পানিতে আহমদ মুসার হাত ভিজে গেল।
কাঁদছ তুমি আমিনা? নরম কন্ঠে বললেন আহমদ মুসা।
মেইলিগুলি আহমদ মুসার হাত ছেড়ে দিয়ে চোখ মুছে বলল, তুমি কিছু মনে করো না, এ আমার কান্না নয়, আনন্দ। বিদায়ের আগে এতটুকু স্পর্শ তোমার পাই, আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করেছিলাম। আল্লাহ তা পূরণ করেছেন।
গাড়ি বিমান বন্দরে এসে পৌঁছল। বিমান উড়ার আর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি।
আহমদ ইয়াংসহ এম্পায়ার গ্রুপের কর্মীরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে। আহমদ ইয়াং কাঁদছে। সকলের চোখেই পানি।
গাড়ির পাশেই মায়েদের সাথে সারা গা চাদরে ঢেকে দাঁড়িয়ে আছে মেইলিগুলি এবং নেইজেন। তাদেরও চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। মেইলিগুলি কাঁদবে না ভেবেছিল। কিন্তু পারল না নিজেকে ধরে রাখতে। এম্পায়ার গ্রুপের নেতা ও কর্মীদের কাছে বিদায় নিয়ে আহমদ ইয়াং এর কাছে এসে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরল আহমদ মুসা। আহমদ ইয়াং হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। কিন্তু আহমদ মুসার চোখ একেবারে শুকনো, মুখে হাসি। আহমদ ইয়াং এর পিঠ চাপড়ে আহমদ মুসা চলে এলেন নেইজেন ও মেইলিগুলির কাছে। নেইজেনকে বললেন, বোকা বোনটি, ভাইয়ের বিদায়ের সময় হাসি দিতে হয়, কান্না নয়। ক্রন্দনরতা মেইলিগুলির কাছে দাঁড়িয়ে আহমদ মুসা বললেন, আমিনা, তাকাও আমার দিকে, দেখ আমার চোখে কোন অশ্রু নেই, আছে আল্লাহ। একজন সৈনিক হিসেবে আল্লাহর কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার আনন্দ।
মেইলিগুলি চোখ তুলে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। দেখল আহমদ মুসার চোখে নিশ্চিত প্রত্যয়ের এক প্রদীপ্ত শিখা। সে শিখা যেন সব শংকা, সব দুর্ভাবনা নিমেষে দূর করে দেয়।
মেইলিগুলি চোখ মুছল। বলল, তুমি আমাকে মাফ কর।
আহমদ মুসা বললেন, মেইলিগুলি মনে রেখ তুমি সেই মুসলিম মহিলাদের উত্তরসূরি, যারা স্বামী এবং সন্তানদের শাহাদতের খবর শুনে হাত তুলে প্রার্থনা করেছে- হে আল্লাহ; আমার আরও সন্তান থাকলে তাদেরকেও তোমার রাস্তায় শহীদ হবার জন্যে পাঠাতাম!
মেইলিগুলি বলল, আমার জন্যে তুমি দোয়া কর।
‘ফি আমানিল্লাহ’ বলে ঘুরে দাঁড়িয়ে সবাইকে সালাম দিয়ে টারমাকের দিকে পা বাড়ালেন আহমদ মুসা। বিমানের সিঁড়িতে একজন তাকে রিসিভ করার জন্যে দাঁড়িয়ে।
৫
আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভেনের নতুন অংশে সেন্ট জন পল রোড যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে নীরব- মনোরম পরিবেশ এক সবুজ টিলার উপর দাঁড়িয়ে আছে ককেশাস অঞ্চলের সবচেয়ে মর্যাদাশালী শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট অব এডভান্সড নিউক্লিয়ার ফিজিক্স’।
ইনস্টিটিউট বিল্ডিং -এর সামনে কৃত্রিম একটা লেক। তার চারপাশে বাগান। বাগানের ছায়ায় অনেক আসন পাতা। ক্লাস বিরতির সময়টুকু ছাত্ররা লাইব্রেরীতে অথবা এখানেই কাটায়।
বেলা দেড়টা। শেষ বর্ষের ক্লাস থেকে ভিড় ঠেলে বেরিয়ে এল সোফিয়া এঞ্জেলা। সাদা স্কার্ট, সাদা শার্ট পরা। গলায় একটা সোনার চেন। চেনের সাথে বুকের ওপর ঝুলে আছে মূল্যবান লাল পাথরের তৈরি ক্রুশের উপর ক্রুশবিদ্ধ খ্রিস্টের ছবি। খুব সাধারণ পোশাকেও মেয়েটিকে ‘এঞ্জেলা’ অর্থাৎ দেবী বলেই মনে হচ্ছে। সোফিয়া আর্মেনিয়ার কিরকেশিয়ান গোত্রের মেয়ে। সৌন্দর্যের জন্য এরা বিখ্যাত। তুর্কী খলিফাদের অনেকেই এখান থেকে তাদের বেগম বাছাই করেছেন।
সোফিয়া এঞ্জেলা আর্মেনিয়ার নেতৃস্থানীয় রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় নেতা সেন্ট জর্জ সাইমনের মেয়ে।
সোফিয়ার চোখ দুটি চঞ্চল। সে তাকাচ্ছে এদিক-ওদিক। সে খুঁজছে সালমান শামিলকে। সালমান শামিল ক্লাসের সেরা ছাত্র। বরাবর সে ক্লাসে প্রথম হয়ে আসছে। খৃস্টান আর্মেনিয়দের পরিচালিত এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুসলমানদের উৎকট বৈষম্যের দৃষ্টিতে দেখা হয়। সে যদি আবার আজারবাইজানী হয় তাহলে তো কথাই নেই। কিন্তু সালমান শামিল আজারবাইজানী হবার পরেও তাকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা হয়নি। তার মত ছাত্র এ ইন্সটিটিউটে আর আসেনি। শিক্ষকরাও তাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করেন।
সালমান শামিল তো প্রথম সারিতেই বসেছিল, হুট করে বেরিয়ে গেল কোথায়? সোফিয়া তাকে খুঁজতে লাইব্রেরীতে এল। না লাইব্রেরীতে নেই। লাইব্রেরীতে যে চেয়ারে সে বসে সেটা খালি। এল এবার সে লেক গার্ডেনে। না, কোথাও নেই। হতাশ হয়ে ইনস্টিটিউট বিল্ডিং-এ ফেরার পথে পেল ডেভিডকে। তাদেরই সহপাঠী। সে সালমানকে দেখেছে কিনা সোফিয়া জিজ্ঞেস করল।
ডেভিড থমকে দাঁড়িয়ে সোফিয়ার দিকে মুহূর্তকাল এক দৃষ্টিতে চেয়ে বলল, বয়ে গেছে আমার ঐ খুনেদের খোঁজ রাখতে।
সোভিয়েতরা ককেশাস দখলের পর এর নাম পরিচয় অনেক কিছুই পাল্টে দিয়েছিল জাতীয় ঐক্য যাতে আসতে না পারে এজন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জাতিসত্তাকে উজ্জীবিত করে ককেশাসকে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়েছে। সৃষ্টি করা হয়েছে জর্জিয়া, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান ইত্যাদি। সবচেয়ে অবিচার করা হয়েছে ইতিহাস নিয়ে। রাজনৈতিক লক্ষ্য চরিতার্থ করার জন্য ইতিহাস নতুন করে লেখা হয়েছে। এ ইতিহাসে মুসলমানদের খুনি জাতি হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। নতুন আর্মেনিয়রা মুসলমানদের প্রতি একটা জাতি বিদ্বেষ নিয়ে তাদের বুদ্ধির চোখ মেলে।
একজনকে এভাবে বলা ঠিক নয়। বলল সোফিয়া।
সে তো একজন ব্যক্তি মাত্র নয়, একটা জাতির অংশ।
তা হোক, ওর দোষটা কি?
দোষটা টের পাবে। দুধ-কলা দিয়ে সাপ পুষছে ইনস্টিটিউট। তার প্রতিভা দিয়ে আমাদের কি?
তাদের প্রতিভা কি আমাদের কাজে লাগছে না?
তুমি সেন্ট সাইমনের মেয়ে বটে। কিন্তু অন্ধ। বই ছাড়া কিছুই বুঝ না। সামনে দিনটা কি আসছে জান?
কি?
দুই প্রদীপ তো একসাথে থাকতে পারে না, এই ককেশাসে হয় তারা থাকবে, না হয় আমারা থাকব।
দেখ এসব রাজনীতির কথা। নতুন কথাও নয়। এসব আমি বুঝি না। বল দেখেছ কিনা সালমানকে, ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেল কোথায়?
কি দরকার তাকে, ঐ মুসলমানের বাচ্চাটাকে?
সামনে পরীক্ষা মনে নেই, ওর একটা নোট আজ আমাকে দেবার কথা।
তাহলে পালিয়েছে। ও হিংসুক, কোন উপকার করবে আমাদের?
এ সময় আরেক সহপাঠী রাফেলো সেখানে এসে দাঁড়ালো। বলল, কার কথা বলছিসরে ডেভিড?
খুনি কুকুরদের কথা, সালমানদের কথা।
কি উপকার করবে সে?
সোফিয়া একটা নোট চেয়েছে তার কাছে। দেবার কথা আজ। পালিয়েছে।
রাফেলো সোফিয়ার দিকে কটাক্ষ করে বলল, যতই সুন্দরী হও, স্বর্গের অপ্সরী হও, ও ব্যাটারা কিন্তু কাজে ঠিক আছে। কলা দেখাবে তোমাকে। তুমি চেন না ওদের।
বলে ডেভিডের পিঠে একটা থাপ্পড় দিয়ে বলল, চল লাঞ্চ সেরে আসি। ক্লাসের দেরি হবে আমাদের।
ডেভিড যাবার জন্যে পা বাড়িয়ে পকেট থেকে একটা হ্যান্ডবিল বের করে সোফিয়ার হাতে দিয়ে বলল, রাজনীতি তো বুঝ না, পড়ে একবার বুঝতে চেষ্টা করো।
তারা চলে গেল।
সোফিয়া হ্যান্ডবিলটির দিকে নজর বুলাতে বুলাতে ইন্সটিটিউটের দিকে পা বাড়াল।
হ্যান্ডবিলটি প্রচার করেছে ‘জাগ্রত আর্মেনিয় জনগণ’ -এর পক্ষে ‘হোয়াইট উলফ’। হ্যান্ডবিলে এ অঞ্চলের খৃস্টান জনগণের ওপর মুসলমানদের নির্যাতন ও গণহত্যার বিবরণ দেয়া হয়েছে। তারপর বলা হয়েছে, তাদের হাত থেকে ককেশাস অঞ্চল মুক্ত করতে না পারলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি আবার ঘটবে। সুতরাং ‘হোয়াইট উলফ’ -এর সাথে সকলে একাত্ম হওয়া এবং দেশকে খুনিদের হাত থেকে মুক্ত করার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। হ্যান্ডবিলটির শেষে ফুটনোটে লেখা হয়েছে, হ্যান্ডবিলটি বার বার পড়ুন, সংরক্ষণ করুন এবং অন্যকে পড়ান, খ্রিস্ট খুশি হবেন।
সোফিয়া পড়ে হ্যান্ডবিলটি ব্যাগে রেখে দিল। একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার বুক থেকে। কি হচ্ছে এসব দেশে? এমন অসহনশীল ছিল না মানুষ। এই ডেভিড, রাফেলোকে তো সে আজ থেকে থেকে চিনে না। তারা এমন মানুষ ছিল না। এই তো এক বছর আগে সালমান যখন অনার্সে ফার্স্ট হলো, ডেভিডই তো তাঁকে কাঁধে তুলে নিয়েছিল, যদিও মুসলমান বলে একটা ঘৃণা, একটা বিদ্বেষ তার প্রতি ছিল। কিন্তু এই এক বছরের মধ্যে কি ঘটে গেল, তারা এমন হয়ে গেল কেন? শুধু তারা কেন, সর্বত্রই তো ধূমায়িত বিক্ষোভ দেখছি।
