আহমদ মুসা সিড়ি দিয়ে উঠেই দেখতে পেলেন নেইজেন ও মেইলিগুলি দুজন জড়াজড়ি করে বসে।
আহমদ মুসাকে দেখে দুজনেই তাদের চাদর ঠিক করে নিল। নেইজনে উঠে দাঁড়াল। মনে হল সে কেঁদেছে। কিন্তু ঝগড়াটে দৃষ্টি নিয়ে সে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। আর মেইলিগুলি ভালো করে চাদরটা টেনে দিয়ে অন্য মুখো হয়ে মাথা এলিয়ে দিয়েছে সোফায়।
চাচাজান, চাচিমা কোথায় নেইজেন?
আমি এসে ওঁদের পাইনি, বাইরে গেছেন।
আহমদ মুসা একটু চিন্তা করলেন। তারপর বললেন, ঠিক আছে, মেইলিগুলির সাথে কথাটা সেরে নিই। বলে আহমদ মুসা এ প্রান্তের একটা সোফায় বসলেন। তাঁর মুখটা উত্তরমুখী। মেইলিগুলি বসে আছে পশ্চিম প্রান্তের একটা সোফায়। নেইজেন চলে যাচ্ছিল।
আহমদ মুসা বললেন, তুমিও বস নেইজেন।
আসছি ভাইয়া, কথা বলুন।
বলে নেইজেন কিচেনের দিকে চলে গেল।
‘আমিনা’ শুরু করলেন আহমদ মুসা। আজ ভোর চারটায় টেলিফোন পেয়েছিলাম হাসান তারিকের। জরুরী একটা পরামর্শ বৈঠক ছিল সাড়ে চারটায়। আমি চলে গিয়েছিলাম। জানিয়ে যেতে পারিনি। তোমরা কষ্ট পেয়েছ, এ জন্য আমি দুঃখিত।
মেইলিগুলি কিছু বলল না।
আবার শুরু করলেন আহমদ মুসা। বললেন, ককেশাস থেকে খারাপ খবর আগেই পেয়েছিলাম। কিন্তু মারাত্মক খবর এসেছে গত রাতে।
আহমদ মুসার সামনে এক কাপ চা রেখে নেইজেন গিয়ে বসেছে মেইলিগুলির পাশে। আহমদ মুসা চায়ে একটা চুমুক দিয়ে বললেন, গত কয়েক মাস ধরে ককেশাসে হত্যাকান্ড চলছে, মুসলমানদের অনেক গ্রাম উজাড় হয়েছে। অনেক মুসলমান এলাকা ছেড়া আশ্রয় নিয়েছে শহরে। এতদিন এসব ছিল অনেকটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। বিভিন্ন ঘটনা-দুর্ঘটনা উপলক্ষ্যে সংঘটিত এসব ঘটনার রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দুর্বল ছিল। গত পনের দিন ধরে ঘটনা ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। পনের দিনে বিভিন্ন মুসলিম সংগঠনের পঁচিশজন প্রভাবশালী মুসলিম নেতা হারিয়ে গেছে। শত চেষ্টাতেও কোথাও কোন চিহ্ন তাদের পাওয়া যায়নি। মধ্য এশিয়া থেকে সাইমুমের একটি ইউনিট সেখানে গেছে কিন্তু তারা ঘটনার কোন কুল কিনারা করতে পারেনি। একটা অদৃশ্য আতংক ছড়িয়ে পড়েছে গোটা মুসলিম সমাজে। এই সন্ত্রাস পরিকল্পনায় সাহায্য করছে শক্তিশালী ক্লু-ক্লাক্স-ক্লান, ফ্র, এবং রাশিয়ান রিপাবলিক এবং পশ্চিমের কয়েকটি দেশ। গ্রোজনিতে ঘাঁটি করে বসে রাশিয়ান রিপাবলিক বাহিনীর সতর্ক প্রহরাধীন আজার বাইজানের দুর্বল আধা মুসলিম সরকার এই সন্ত্রাস এবং বাইরের চাপের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছে। ভেতর থেকেও মীরজাফরদের মাধ্যমে এই সরকারকে ধ্বংস করার চেষ্টা চলছে। সরকার ভেঙ্গে পড়লে সেখানকার মুসলমানরা আজ যে বিশৃঙ্খল অবস্থায় আছে তাতে সম্মিলিত চক্রান্তের মুখে মুসলমানদের অস্তিত্ব হয়তো তৃণের মত ভেসে যাবে। এই অবস্থায় সব দিক বিবেচনা করে আমরা সেই মজলুম ভাইদের কাছে ছুটে যাবার সিদ্ধান্ত না নিয়ে পারিনি।
থামলেন আহমদ মুসা।
কিন্তু ভাইয়া……………
কথা শেষ করতে পারলো না নেইজেন। একটা বাঁধ ভাঙ্গা আবেগ এসে তার কন্ঠ ভেঙে দিল। দুহাতে মুখ ঢাকল সে।
তুমি যা বলতে চাচ্ছ আমি তা জানি। হয়ত আমি অবিচারও করছি। কিন্তু……..
অবিচারকে অবিচার বলে বুঝার পর কি সে অবিচার আর করা যায়?
আহমদ মুসাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই বলল নেইজেন।
যায় না কিন্তু অনেকগুলো অবিচার যদি এক সাথে সামনে এসে যায় তাহলে বড় অবিচারকেই প্রথম মোকাবেলা করতে হয়।
ভাইয়া, আপনাকে যুক্তি দিয়ে আটকাতে পারবো না কিন্তু আপনি আপার জায়গায় একটু দাঁড়িয়ে বলুন, আপনি আপা হলে কি করতেন?
নেইজেনের প্রশ্নের ঢংয়ে এই অবস্থাতেও আহমদ মুসার মুখে হাসি ফুটে উঠল। বললেন, তোমার আপা আমি হলে কোন যাযাবরের দিকে চোখ তুলেই চাইতাম না। বিশ্বে যার কোন ঘর নেই তাকে ঘরে বাধাঁর চেষ্টাই করতাম না কিন্তু থাক এসব কথা।
‘না থাকবে না’। আহমদ মুসাকে বাধা দিয়ে বলল নেইজেন, ‘এই চাওয়াটাকে কি সব সময় মানুষের ইচ্ছাধীন বলে মনে করেন ভাইয়া?
না করি না।
আরকটা প্রশ্ন ভাইয়া, যাযাবরের কি মন নেই? যার দুনিয়াতে কোন ঘর নেই তার কি ঘর বাঁধার কোন স্বপ্ন থাকতে পারে না?
নেইজেন, এসব কথা থাক। একটা সমস্যায় আমি পড়েছি। মেইলিগুলির কাছে আমি তা তুলে ধরেছি।
‘বেশ আপনারা কথা বলুন’ বলে নেইজেন কৃত্রিম রাগের সাথে বেরিয়ে গেল ড্রয়িং রুম থেকে।
নীরবতা। আহমদ মুসা ও মেইলিগুলি দুজনেই নীরব।
আমি কি অন্যায় করেছি। মেইলিগুলিই প্রথম নীরবতা ভাঙল।
না তা আমি বলিনি।
আপনি কি একে কোন অবাঞ্ছিত, অহেতুক শৃঙ্খল বলে মনে করেছেন?
না তা মনে করিনি।
আপনি যে সমস্যা তুলে ধরলেন, তার সমাধান কিভাবে চাইছেন?
ককেশাসে আমাকে যেতে হবে, কিন্তু আমার হৃদয় বলছে, তোমার সম্মতি নিয়ে আমার যাওয়া উচিত।
মেইলিগুলির মুখ মনে হলো উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
কিছুক্ষণ কথা বলল না। তারপর বলল, যদি সম্মতি না পান?
আমিনার কাছ থেকে সম্মতি পাব না এটা কোন সময়ই আমার মনে আসেনি।
কেন?
আমাদের প্রয়োজন তুমি বুঝবে।
মেইলিগুলি কোন কথা বলল না। দুজনেই নীরব। অবশেষে কথা বলল মেইলিগুলি। বলল, জানি আমি, দায়িত্ব আপনাকে নিয়ে বেড়াচ্ছে বিশ্বময়, ফিলিস্তিন থেকে মিন্দানাও, মিন্দানাও থেকে মধ্যে এশিয়া, তারপর চীন। আর এ গতি আমি রোধ করতে পারব না।
একটু থামল, একটা ঢোক গিলল মেইলিগুলি। তারপর আবার বলতে শুরু করল, যাওয়ার আগে আমার প্রতি আপনার কি কোন নির্দেশ নেই?
কেঁপে উঠলেন আহমদ মুসা। বুঝতে পারলেন যে, মেইলিগুলি স্পষ্টভাবে কোন কথাটা জানতে চায়।
কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলেন না আহমদ মুসা। তারপর বললেন, আমিনা, আমি অনেকটা স্রোতে ভাসা পানার মত। তার পর আমি যাচ্ছি জীবন-মৃত্যুর এক লড়াইয়ে। তোমাকে কোন নির্দেশ দিয়ে যাবার মত নিশ্চয়তা আমার কি আছে? না তা ঠিক হবে?
মেইলিগুলী কিছু বলল না। তার দুচোখ দিয়ে নেমে এল অশ্রুর দুটি ধারা। নীরব কান্নায় তার মাথাটা এলিয়ে পড়ল সোফার দেয়ালে। কাঁপতে থাকল তার দেহটা।
আহমদ মুসা কোন কথা বললেন না। কান্নায় বাধাও দিলেন না। অনেক্ষণ পর মেইলিগুলি থামল। চোখ মুছল। সোজা হয়ে বসে ধীর কন্ঠে বলল, একটা অনুমতি চাই।
কি?
যতদিন না ফেরেন ততদিন আপনার পথ চেয়ে বসে থাকব।
যদি না ফিরি?
যিনি সব দায়িত্ব পালন করেন তিনি আরেকটা দায়িত্ব অস্বীকার করবেন না আমি জানি।
কিন্তু এভাবে রাখা তোমার প্রতি আমার একটা জুলুম হবে।
তাই যদি বলেন, আমিও তো আপনার প্রতি জুলুম চাপিয়ে দিচ্ছি।
একটু থামল মেইলিগুলি। তারপর আবার বলল, আপনি যাকে আমার উপর জুলুম বলছেন সেটা আমার জন্য আনন্দ, আমার জীবনের সম্বল। কিন্তু জনাব, আমি আমার জুলুম থেকে আপনাকে মুক্তি দিচ্ছি। আমি আপনাকে বিয়ের অনুমতি দিলাম।
আমিনার কথাগুলো অত্যন্ত শান্ত। একটুও কাঁপলো না তার কন্ঠ। আহমদ মুসা মাথা নিচু করে বসেছিলো। মেইলিগুলির স্থির, শান্ত কথাগুলির এক অশরীরি শক্তি তার সমগ্র সত্তাকে আচ্ছন্ন করে দিল। তিনি ধীরে ধীরে বললেন, আমিনা দোয়া করো, যে আস্থা তুমি আমার ওপর রাখলে তার সামান্য অবমাননা যেন আমার দ্বারা না হয়।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়ালেন। বেরিয়ে গেলেন ড্রইং রুম থেকে।
নেইজেন পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়েছিল। সে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরল মেইলিগুলিকে। অশ্রুরুদ্ধ কন্ঠে বলল, এ তুমি কি করলে আপা ? আমি এ হতে দেব না।
মেইলিগুলির দুচোখ দিয়ে নিঃশব্দে জলের দুটি ধারা নেমে এল। সে বলল, নেইজেন, একটি বড় মিশন নিয়ে উনি যাচ্ছেন। নিশ্চিন্ত মন নিয়ে ওঁর যাওয়ার দরকার। তাঁর কাজ আমাদের সবার কাজ। ওঁকে আর বিরক্ত করো না। দোয়া কর ওঁর জন্যে।
আপা আপনি ভাই্য়ার মধ্যে হজম হয়ে গেছেন। তাই তাঁর মত করেই কথা বলছেন। কিন্তু আমি এ হতে দেব না।
কি করবে তুমি?
অস্ত্র আমার হাতেও আছে।
কি অস্ত্র?
টের পাবে, ভাইয়াকে কাবু করার মত অস্ত্র।
দুপুর বারটায় উরুমচি থেকে আহমদ মুসার বিমান উড়বে আকাশে।
বিমান যাবে পিকিং, সেখান থেকে তাসখন্দে। বিয়ের আয়োজনটা খুব সিম্পলভাবে হলেও সময় তাতে লাগলোই। লি ইউয়ান তার প্রথম মেয়ের বিয়ে দিচ্ছে, ঘটনা খুব ছোট নয়। লি ইউয়ান তার গভর্নর ভবনে এ বিয়ের আয়োজন করেনি। যথা সম্ভব হৈ চৈ এড়ানোর জন্যে উরুমচিতে তার পৈত্রিক বাসভবনেই বিয়ের অনুষ্ঠানের ব্যবস্হা করেছে।
লি ইউয়ান আহমদ ইয়াং-এর পিতা ওয়াং চিং চাইকে বিমানে করে আনার চেষ্টা করেছিল কিন্তু তিনি অসুস্হতার জন্য আসতে পারেননি। তিনি সব ভার আহমদ মুসার উপর দিয়ে দিয়েছিলেন।
সব আয়োজন ঠিকঠাক করে বিয়ের সময়টা দশটার আগে নির্ধারণ করা কিছুতেই সম্ভব হয়নি। লি ইউয়ান এতে কিছুটা বিব্রত বোধ করেছে। কিন্তু আহমদ মুসা সান্ত্বনা দিয়ে বলেছে, না কোন অসুবিধা নেই। তারা শুধু যাবার আগে এই নতুন দম্পতিকে দোয়া করার সুযোগ চায়।
বিয়ের সব আয়োজন সম্পূর্ণ।
লি ইউয়ানের বাড়ির বাইরের ঘরটায় বর বসেছে। তার সাথে আছে আহমদ মুসা, হাসান তারিক, আবদুল্লায়েভ এবং এম্পায়ার গ্রুপের নেতৃবৃন্দ ও কর্মী। এ ছাড়াও আছে লি ইউয়ানের আত্মীয়-স্বজন।
আর মেয়েরা বসেছে বাড়ির ভেতরে পারিবারিক ড্রইংরুমে। সেখানে নেইজেনকে ঘিরে মেইলিগুলি এবং অন্যান্য আত্মীয়। নেইজেনের মা ইউজিনা এবং মেইলিগুলির মা ফাতিমা ব্যবস্হাপনা নিয়ে ছুটাছুটি করে বেড়াচ্ছে।
দশটা এক মিনিটে মেয়ের ‘এজেন’ নেবার সময় নির্দিষ্ট হয়েছে। তখন নটা পঞ্চাশ মিনিট। বিয়ে মজলিস থেকে মেয়ের ‘এজেন’ নেবার জন্যে যারা যাবে তারা তৈরি। লি ইউয়ান শেষ প্রস্তুতিটা দেখার জন্যে একটু আগে ভেতরে গেছে।
লি ইউয়ান দেরি করে ফিরে এল। তার মুখটা শুকনো। এসেই সে আহমদ মুসাকে ডাকল। আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি উঠে গেলেন তার কাছে।
লি ইউয়ান বলল, নেইজেন ভয়ানক মুশকিল বাঁধিয়েছে।
কি মুশকিল? উদ্বিগ্ন কন্ঠে বললেন আহমদ মুসা।
নেইজেন বলছে, আমি বিয়ে এখন করব না। ভাইয়া এলে তার সাথে একসাথে বিয়ে করব।
এই কথা এখন বলছে সে?
হ্যাঁ।
আপনি তাকে বুঝাননি যে, সব আয়োজন কমপ্লিট, বিয়ের আসরে সবাই বসে গেছে, এখন আর ফেরার কোন উপায় নেই।
এতক্ষণ ধরে বুঝালাম, কিন্তু তার ঐ এক কথা। সে আরো বলছে বাইরের লোক তো ডাকা হয়নি, সবাই আত্মীয়-স্বজন এবং নিজেদের লোক। কোন ক্ষতি হবে না বিয়ে স্হগিত রাখলে।
আহমদ মুসা মাথা নিচু করে চিন্তা করছিলেন। গত কয়েকদিন নেইজেনকে যতটুকু জেনেছে, তাতে বুঝেছে অত্যন্ত বুদ্ধিমতী ও বিচক্ষণ সে। জেদ আছে বটে, কিন্তু শেষ মুহূর্তে এমনটা করার মত অবিবেচক তো তাকে মনে হয়নি।
মুখ তুলে আহমদ মুসা বললেন মেইলিগুলি কোথায়?
ওখানেই আছে।
ওকে একটু ডেকে দিন।
আহমদ মুসা ও লি ইউয়ান দুজনেই ভেতরে গেলেন। একটা কক্ষে আহমদ মুসাকে রেখে মেয়েদের বিয়ের আসরে গেল মেইলিগুলিকে ডাকতে। মেইলিগুলি এসে দরজার আড়ালে দাঁড়াল। বলল, আমাকে ডেকেছেন জনাব?
হ্যাঁ আমিনা। নেইজেন কি পাগলামী শুরু করেছে বল তো?
সে কারো কথাই শুনছে না। চাচি আম্মা তো বসে বসে কাঁদছেন।
তুমি তাকে বুঝিয়েছ?
শুধু বোঝানো সহজ নয়। আমি তার হাত ধরে অনুরোধ করেছি সকলের মান-সম্মান রক্ষা করার জন্যে। কিন্তু তার কথা থেকে সে একটুও নড়েনি।
তাহলে?
একমাত্র আপনিই তাকে রাজি করাতে পারেন বলে মনে হয়। তাকে আপনি একটু বলুন।
পিতা-মাতা, মেইলিগুলি সবাই যদি ব্যর্থ হয়ে থাকে তার কথা কি আর থাকবে,আহমদ মুসা ভাবলেন। তিনি মেয়েটাকে বোন ডেকেছেন।
এমনি অনেককেই তো আহমদ মুসা বোন ডাকেন। কিন্তু ডাকের সাথে সাথেই নেইজেন যেন আহমদ মুসার বোন হয়ে গেছে। ওর ‘ভাইয়া’ ডাকে কোন কৃত্রিমতাই আহমদ মুসা দেখেন না। বোনের মত সে ভাইয়ার সাথে কথা বলে আবদার জানায়। আহমদ মুসার ছোট বোন নেই। ছিল লায়লা, মারা গেছে সে ছয় বছর বয়সে। তার ভাইয়া ডাক এখনও তার কানে বাজে।
নেইজেনর ভাইয়া ডাকের মধ্যে লায়লার কন্ঠই যেন শুনতে পায়। ইতিমধ্যেই অপরিসীম একটা স্নেহের সৃষ্টি হয়েছে নেইজেনের জন্যে তার মনে।
আহমদ মুসা পাশে দাঁড়ানো লি ইউয়ানকে বললেন, নেইজেনকে একটু ডাকুন, আমি কথা বলে দেখি।
নেইজেন এল। বিয়ের সাজ তার গায়ে। সে এসে দরজার বাইরে দেয়ালের আড়ালে দাঁড়াল।
বলুন ভাইয়া। কথা শুরু করল নেইজেন।
কি পাগলামী তুমি শুরু করেছ বলতো?
পাগলামী নয়, খুব সামান্য কথা বলেছি।
এটাকে তুমি সামান্য বলছো?
কেন বিয়ে স্থগিত হয় না?
হয়, কিন্তু স্থগিত হওয়ার মত কোন অসুবিধা-গণ্ডগোল কিছুই তো এখানে নেই।
কিন্তু আমি তো আমার অসুবিধার কথা বলেছি।
কি অসুবিধা?
আমার ভাইয়া একটা বড় মিশনে যাচ্ছেন, আমি এখন বিয়ে করব না। ভাইয়া ফিরে এলে বিয়ে করব।
কিন্তু তোমার ভাইয়াই তো চেয়েছেন এখনই বিয়ে হোক।
কিন্তু আমি চাচ্ছি না।
তোমার ভাইয়াকে অপমান করবে?
এত ক্ষুদ্র ঘটনায় অপমানিত হবার মত ছোট আমার ভাইয়া নন।
তোমার ভাইয়া তোমাকে যদি এখন নির্দেশ দেয়?
অন্য সকলের কাছে ভাইয়া নেতা, সুতারাং তার নির্দেশ সকলের শিরোধার্য। কিন্তু আমার কাছে ভাইয়া ভাইয়াই। বোনের ওপর ভাইয়ার অধিকার আছে, সেই অধিকারে ভাইয়া নির্দেশ দেবেন। বোনেরও তো ভাইয়ার ওপর অধিকার আছে, সেই অধিকারে বোন নির্দেশ অমান্য করবে। আমার পরিষ্কার কথা। ভাইয়া ফিরে এলে ভাই বোন এক সাথে বিয়ে করব।
নেইজেনের শেষ কথায় হঠাৎ তার মনোভাব আহমদ মুসার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। পরিষ্কার হওয়ার সাথে সাথে চমকে উঠলেন আহমদ মুসা। এটা কি সম্ভব এখন? আর দুঘণ্টা সময় আছে, এর মধ্যে মেইলিগুলির সাথে তার বিয়ের আয়োজন কি সম্ভব, না উচিত! কিন্তু পরিষ্কার হয়ে গেছে নেইজেন তার শর্ত থেকে সরে দাঁড়াবে না। সে ভেবে চিন্তেই এ অবস্থার সৃষ্টি করেছে। যাতে আর কোন বিকল্প না থাকে।
তবু আহমদ মুসা বললেন, বোন নেইজেন, তুমি কি বলতে চাও এতক্ষনে আমি বুঝেছি। এই জেদ কি তোমার ঠিক হচ্ছে? তুমি তো জান, আমি আমিনার সম্মতি নিয়েছি।
আমি এই সম্মতি মানি না, মানবো না।
নেইজেনের শেষের কথাগুলো ভেঙ্গে পড়ল কান্নায়। সে কান্না জড়িত কন্ঠে বলতে লাগল, ভাইয়ার ভালমন্দ চিন্তা করার অধিকার বোনের আছে। আমার ভাইকে আর এক মুহূর্ত আমি যাযাবর থাকতে দেব না, ঘরহীন থাকতে দেব না, তার ঠিকানা অবশ্যই একটা থাকবে।
তোমার কোন কথাই আমি অস্বীকার করছি না নেইজেন। কিন্তু এর একটা সময় তো আছে। নরম কণ্ঠে বুঝাতে চেষ্টা করলেন আহমদ মুসা নেইজেনকে।
কোন সময় অসময় নয়। আমি জিজ্ঞেস করি ভাইয়া, বিয়ে করে যুদ্ধ যাত্রার ইতিহাস কি ইসলামে নেই?
আহমদ মুসা কথা বললেন না। মাথাটা একটু নিচু করলেন। একটু চিন্তা করলেন। তারপর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন দশটা বাজে। আহমদ মুসা বললেন, ঠিক আছে নেইজেন। বোনের কাছে ভাইয়া হার স্বীকার করল। তোমাদের ‘এজেন’টা ঠিক সময়ে হয়ে যাক। তারপর তোমার ভাইয়েরটা।
‘ভাইয়া’ বলে একটা চিৎকার করে ছুটে গেল নেইজেন। গিয়ে জড়িয়ে ধরল মেইলিগুলিকে।
আহমদ মুসা তার পাশে দাঁড়ানো লি ইউয়ানকে বললেন, আপনি আমিনার মতটা নিন এবং তার পিতামাতাকে বলুন।
লি ইউয়ান নতমুখে দন্ডায়মান আহমদ মুসাকে জড়িয়ে ধরল। বলল, বাবা তোমাদের দুভাইবোনের কথা শুনলাম। আমার কোন ছেলে নেই এ দৃশ্য আমার কাছে অভূতপূর্ব। আমার আজ গর্বে বুক ফুলে উঠছে এক ছেলে পেয়ে। বাবা আমার বেঁচে থাক।
আহমদ মুসাকে আলিঙ্গন থেকে ছেড়ে দিয়ে বলল, বাবা তুমি আহমদ ইয়াং-এর কাছে যাও। আমি এদিকে সব ব্যবস্থা করছি। আর নেইজেনের ‘এজেন’ নেবার জন্যে ওদেরকেও পাঠাও।
আহমদ মুসার চোখের দুকোণায় দুফোঁটা পানি এসে জমা হয়েছিল। চোখ মুছে তিনি চলে গেলেন বিয়ের আসরে।
আহমদ ইয়াং ও নেইজেনের বিয়ের পর আহমদ মুসা ও মেইলিগুলির বিয়ে সম্পন্ন করতে এগারটা পনের মিনিট বেজে গেল। মেইলিগুলির সম্মতি আদায়ে বেশ সময় নিয়েছে। তার বক্তব্য ছিল আহমদ মুসাকে চাপের মুখে ফেলে এই সম্মতি আদায় ঠিক হয়নি, কিছুতেই এ বিয়ে এভাবে হতে পারে না এ নিয়ে বহু কাঁদাকাটি সে করেছে। অবশেষে আহমদ মুসাকে মেইলিগুলির সাথে কথা বলতে হয়েছে। আহমদ মুসা তাকে বলেছেন, নেইজেনের উপর রাগ করো না আমিনা। সে যেটা করেছে , আল্লাহর ইচ্ছা হয়তো সেটাই।
বিয়ে অনুষ্ঠান শেষে প্রীতিভোজের পাঠ চুকাতে আরো পঁচিশ মিনিট চলে গেল। এয়ারপোর্টে কমপক্ষে এগারটা পঁয়তাল্লিশ মিনিটে যাত্রা করতেই হবে।
খাওয়া শেষ করে আহমদ মুসা ভেতরে আসতেই নেইজেনের মা প্রায় কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলল, বাবা মেইলিগুলির সাথে যে তোমাকে দেখা করাতেই পারলাম না। কালকে গেলে হয় না বাবা?
না আম্মা, দেরী করা যাবে না। একদিন দেরী করে গেলে গোটা পরিকল্পনা গরমিল করে দেবে। এয়ারপোর্টে যাবার পথে আমার গাড়িতে মেইলিগুলিকে তুলে নেব। গাড়িতেই ওর সাথে কথা বলব।
তা হয়না বাবা।
কিছু চিন্তা করবেন না আম্মা। চলুন, আমিনার আম্মা-আব্বা কোথায়।
মেইলিগুলির পিতামাতা, মেইলিগুলি ও নেইজেন সবাই এক ঘরে বসে ছিল। আহমদ মুসা তাদের সালাম দিলেন।
মেইলিগুলি আহমদ মুসাকে দেখে মাথার চাদরটা টেনে দিয়েছিল। মুখের অর্ধেকটাই ঢেকে গেছে চাদরে। নেইজেন উঠে চাদরটা টেনে মাথা পর্যন্ত সরিয়ে এনে বলল, এখন আর ভাইয়ার কাছে মুখ ঢাকার পর্দা তো দরকার নেই। মেইলিগুলির মা নেইজেনের মায়ের মতই চোখ মুছতে মুছতে বলে উঠল, বাবা অন্তত একটা দিন কি থাকা যায় না?
না আম্মা, একটা দিন দেরী করলে গোটা পরিকল্পনাই ঢেলে সাজাতে হবে।
ককেশাসে তুমি কবে যাচ্ছ?
তাসখন্দে পৌছার পরই আমি বিস্তারিত জানতে পারব আম্মা।
ককেশাসের সাথে আমাদের যোগাযোগ কিভাবে হবে?
সেখানে যাওয়ার আগে সবকিছুই আমার কাছে অন্ধকার।
ভাইয়া, আমার ভয় করছে, আপনার ভয় করছে না সেই ভয়ংকর অন্ধকারে পা বাড়াতে? বলল নেইজেন।
কিসের ভয় করব. জীবনের ভয়?
জীবনের মায়া করলে তো হাসি মুখে এবং দ্বিধাহীন চিত্তে মৃত্যুমুখে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারব না। আর তা না পারলে শত্রুর সাথে আমরা লড়ব কি করে?
মৃত্যুকে জ্বলজ্যান্ত দেখে ভয় করে না? আমি সেই কথাই বলছি। বলল নেইজেন।
ভয় করবে কেন? মৃত্যু তো একবারই আসবে এবং আসবে আল্লাহ যখন নির্ধারিত করেছেন তার এক মিনিট আগেও নয় পরেও নয়।
আহমদ মুসা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, আম্মা-আব্বা আপনারা আমাকে দোয়া করুন। আর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আমাকে বেরুতে হবে। প্রস্তুতির কিছু বাকিও আছে আমার। এই সময় চোখ তুলে মেইলিগুলি আহমদ মুসার দিকে তাকাল। তার দুচোখ জলে ভরা। বিয়ের পর এটাই প্রথম দৃষ্টি বিনিময়। আহমদ মুসা এই প্রথম দেখল মেইলিগুলিকে পরিপূর্ণ দৃষ্টি মেলে। দুজনের কেউই চোখ সরাতে পারছিল না। অবশেষে আহমদ মুসাই তার চোখ টেনে নিয়ে বললেন, তুমি তৈরী হও আমিনা। আমার সাথে তুমি এয়ারপোর্টে যাবে।
