৬৯.
তখনও পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণ ও শিক্ষিত সমাজের ধারণা, আওয়ামী লীগের কোনো জনপ্রিয়তা নাই। মুসলিম লীগ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। পাঞ্জাবে নির্বাচনের ফলাফল দেখে তাদের এই ধারণা হয়েছে। তারা বাংলার জনসাধারণকে জানেন না, আর তাদের সম্বন্ধে ধারণাও নাই। সরকার সমর্থক কাগজগুলি এমনভাবে প্রচার করে চলেছে যে, সত্য চাপা পড়ে আছে। পূর্ব বাংলার সঠিক অবস্থা, পশ্চিম পাকিস্তানকে কোনোদিন বলা হয় নাই। স্বায়ত্তশাসনের দাবি সম্বন্ধেও প্রশ্ন করা হয়েছিল, আমি তাদের পাকিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থা চিন্তা করতে অনুরোধ করেছিলাম। প্রায় দুই ঘণ্টা প্রেস কনফারেন্স চলেছিল। আমার মনে হল, তারা কিছুটা বুঝতে পেরেছিলেন। পাকিস্তান টাইমস ও ইমরোজ খুব ভালভাবে ছাপিয়েছিল আমার প্রেস কনফারেন্সের জবাবগুলি। মুসলিম লীগের অনেক পুরানা সহকর্মীদের সাথে সাক্ষাৎও হয়েছিল। শেখ মঞ্জুরুল হক দিল্লিতে মুসলিম লীগ ন্যাশনাল গার্ডের সালারে সুবা ছিল। এখন আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি হয়েছে। দিল্লিতে তার সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল। আমি এই প্রথম করাচি দেখলাম; ভাবলাম এই আমাদের রাজধানী! বাঙালিরা কয়জন তাদের রাজধানী দেখতে সুযোগ পাবে! আমরা জন্মগ্রহণ করেছি সবুজের দেশে, যেদিকে তাকানো যায় সবুজের মেলা। মরুভূমির এই পাষাণ বালু আমাদের পছন্দ হবে কেন? প্রকৃতির সাথে মানুষের মনেরও একটা সম্বন্ধ আছে। বালুর দেশের মানুষের মনও বালুর মত উড়ে বেড়ায়। আর পলিমাটির বাংলার মানুষের মন ঐ রকমই নরম, ঐ রকমই সবুজ। প্রকৃতির অকৃপণ সৌন্দর্যে আমাদের জন্ম, সৌন্দর্যই আমরা ভালবাসি।
মঞ্জুর তার জিপে করে আমাকে নিয়ে হায়দ্রাবাদ চলল। কিছুদূর যাওয়ার পরই মভূমি চোখে পড়ল। অনেক মাইল পর্যন্ত বাড়িঘর নাই, মাঝে মাঝে দু’একটা ছোট ছোট বাজারের মত। দেখলাম, সামান্য কয়েকজন লোক বসে আছে। মরকে বললাম, “তোমরা এই মরুভূমিতে থাক কি করে?” উত্তর দিল “বাধ্য হয়ে। মোহাজের হয়ে এসেছি, এই তো আমাদের বাড়িঘর, এখানেই মরতে হবে। দিল্লি তো তুমি দেখছ, এ রকম মরুভূমি তুমি দেখ নাই? প্রথম প্রথম খারাপ লেগেছিল, এখন সহ্য হয়ে গেছে। আমরা মোহাজেররা এসেছি, ভবিষ্যতে আসলে দেখ করাচিকেও আমরা ফুলে ফুলে ভরে ফেলব।”
আমরা বিকালে পৌঁছালাম। মজুর নিজেই ড্রাইভ করছিল। সে চমৎকার গাড়ি চালাতে পারে। মধুরের সাথে আমার বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। অনেক উত্থান-পতন হয়েছে, বন্ধুত্ব যায় নাই। পরে যতবার করাচি গিয়েছি, ছায়ার মত আমার কাছেই রয়েছে। যাহোক, সোজা ডাকবাংলোতে পৌঁছালাম। শহীদ সাহেব বাইরে গেছেন, রাতে ফিরবেন। আমরা দুইজনে একটা হোটেলে চলে আসলাম, সেখানে হাতমুখ ধুয়ে খাওয়া-দাওয়া করে রাত নয়টার সময় ডাকবাংলোতে এসে দেখি তখনও তিনি ফেরেন নাই। আমরা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে লাগলাম। রাত দশটায় তিনি ফিরলেন। আমাকে দেখে বললেন, “খুব প্রেস কনফারেন্স করছ পশ্চিম পাকিস্তানে এসে।” বললাম, “কি আর করি!’ আমি যে হায়দ্রাবাদ আসব তিনি জানতেন। অনেকক্ষণ পর্যন্ত আলোচনা হল।
তিনি পূর্ব বাংলার কথা জিজ্ঞাসা করলেন, নেতারা সকলেই জেলে আছেন, কি আর ভাল থাকবেন! নাজিমুদ্দীন সাহেবের সাথে আমার যে আলাপ হয়েছিল তাও বললাম। একুশে ফেব্রুয়ারি যা যা ঘটেছিল তাও জানালাম। বললাম, রাষ্ট্রভাষা সম্বন্ধে তার মতামত খবরের কাগজে বের হয়েছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “কি বের হয়েছে?” আমি বললাম, “আপনি নাকি কোন রিপোর্টারকে বলেছেন যে, উর্দুই রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত। তিনি ক্ষেপে গেলেন এবং বললেন, “এ কথা তো আমি বলি নাই। উর্দু ও বাংলা দুইটা হলে আপত্তি কি? একথাই বলেছিলাম। আরও জানালেন যে, গুলি ও অত্যাচারের প্রতিবাদও তিনি করেছেন। আমি তাকে জানালাম, “সে সব কথা কোনো কাগজে পরিষ্কার করে ছাপান হয় নাই। পূর্ব বাংলার জনসাধারণ আপনার মতামত না পেয়ে খুবই দুঃখিত হয়েছে।” তিনি আমাকে পরের দিন বিকালে আসতে বললেন, কারণ সকালে কোর্ট আছে। পিত্তি ষড়যন্ত্র মামলার বিচার হায়দ্রাবাদ জেলের ভিতরে হচ্ছে। তিনি সন্ধ্যার দিকে হায়দ্রাবাদ থেকে মোটরে করাচি যাবেন। আমিও সাথে যেতে পারব। মজুর বলল যে, সে সকালেই চলে যাবে। আমরা দুইজন হোটেলে চলে আসলাম। মঞ্জুর সকালবেলা মিস্টার মাসুদকে খোজ করে নিয়ে আসল। মাসুদ সাহেব নিখিল ভারত স্টেট মুসলিম লীগের সেক্রেটারি ছিলেন। এখন হায়দ্রাবাদে এসে বাড়ি করেছেন। শহীদ সাহেবের ভক্ত এবং আওয়ামী লীগে যোগদান করেছেন। মজুর তার কাছে আমাকে রেখে রওয়ানা করল। মাসুদ সাহেব আমাকে নিয়ে বেলা একটা পর্যন্ত ঘুরলেন। একসাথে খাওয়া-দাওয়া করলাম এবং অনেকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন।
দুটার সময় আমি মালপত্র নিয়ে শহীদ সাহেবের কাছে চলে আসলাম। শহীদ সাহেব কয়েকখানা বিস্কুট ও হরলিক্স খেলেন। এই ভর দুপুরের খাওয়া। এক এডভোকেট পেশোয়ার থেকে এসেছিল, অন্য এক আসামির পক্ষে। রাতে শহীদ সাহেব তাকে এবং আমাকে নিয়ে বানা খান। আমি বললাম, “এভাবে চলে কেমন করে?” তিনি বললেন, “বিস্কুট, মাখন, রুটিও আছে, এই খেয়েই হয়ে যায় দুপুরবেলা।” কোনো লোজনও নাই। নিজেই সকল কিছু করেন। আমরা আবার আলাপ শুরু করলাম। তিনি বললেন, “পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ কোনো এফিলিয়েশন নেয় নাই। আমি তো তোমাদের কেউ নই।” আমি বললাম, “প্রতিষ্ঠান না গড়লে কার কাছ থেকে এফিলিয়েশন নেব। আপনি তো আমাদের নেতা আছেনই। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ আপনাকে তো নেতা মানে, এমনকি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণও আপনাকে সমর্থন করে। তিনি বললেন, “একটা কনফারেন্স ডাকব, তার আগে পূর্ব-পাকিস্তান আওয়ামী লীগের এফিলিয়েশন নেওয়া দরকার। আমি তাঁকে জানালাম, “আপনি জিন্নাহ আওয়ামী লীগ করেছেন, আমরা নাম পরিবর্তন করতে পারব না। কোনো ব্যক্তির নাম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগ করতে চাই না। দ্বিতীয়ত আমাদের ম্যানিফেস্টো আছে, গঠনতন্ত্র আছে, তার পরিবর্তন করা সম্ভবপর নয়। মওলানা ভাসানী সাহেব আমাকে ১৯৪৯ সালে আপনার কাছে পাঠিয়েছিলেন। তখনও তিনি নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ গঠনের জন্য অনুরোধ করেছিলেন। তারও কোনো আপত্তি থাকবে না, যদি আপনি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ম্যানিফেস্টো ও গঠনতন্ত্র মেনে নেন।
